Home রুপুর বিয়ে রুপুর বিয়ে পর্ব ৩

রুপুর বিয়ে পর্ব ৩

রুপুর বিয়ে পর্ব ৩
Bobita Ray

ঘড়িতে রাত ন’টা বাজে। রাত আটটার আগে বিনয় বাড়ি ফিরেছে। এখনো রুপুর সাথে দেখা হয়নি। বিনয় বাড়ি এসে প্রথমে মায়ের ঘরে গেছে। রুপুর ধারণা ছিল মায়ের সাথে দেখা করে একবার হলেও রুপুর কাছে আসবে। এক ঘণ্টারও বেশি সময় পার হওয়ার পরও বিনয় এই ঘরে আসেনি। রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেলিভিশন চালিয়ে দিল। এই বাড়ির প্রতিটা ঘরে একটা করে টেলিভিশন আছে। রুপু বিছানায় পা তুলে বসে একের পর এক চ্যালেন পাল্টাতে লাগল।

রুপুর তিনতলায় ডাক পড়ল রাত দশটার পরে। খাবার ঘরে গিয়ে দেখল, শাশুড়ীমা থমথমে মুখে কোণার টেবিলে বসে আছে। ময়নার মা গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত সবার থালায় বেড়ে দিচ্ছে। রুপুর শ্বশুরের নাম বিধান বাবু। বয়স পঞ্চান্ন। অনেক লম্বা ও অতিরিক্ত ফর্সা হবার কারণে বয়স যে খুব বেশি তা বোঝা যায় না। সেই তুলনায় রুপুর শাশুড়ীমা দেখতে মোটেও ভালো না। অনেক খাটো, গায়ের রঙ চাপা, খাটো হওয়ার কারণেই নাকি কে জানে দেখতে অনেক মোটা-সোটা লাগে। চেহারার কাটিং ততটাও সুন্দর না। ওনার বড় ছেলে বিনয়ও ওনার মতো হয়েছে। তবে শুধু বাবার মতো লম্বা-চওড়া হয়েছে।
রুপুর শ্বশুর যে অত্যন্ত ভালো মানুষ। তা রুপু বুঝল পর পর দুটো ঘটনার পর। সেদিন ওনার জন্যই রুপুর বিয়ে ভালো ভাবে সম্পূর্ণ হয়েছিল। সেদিন ওনি সেখানে উপস্থিত না থাকলে বিনয়ের মামা-মেসোরা সামান্য গহনার জন্য ওদের বিয়ে হতে দিতো না। আর আজ খাবার টেবিলে বসার পর বুঝল। ভদ্রলোক অত্যন্ত স্নেহের কণ্ঠে রুপুকে বলল,
“মা তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন? আমাদের সাথে ভাত খেতে বসে যাও।”
রুপুকে গহনার ব্যাপারে কেউ কিছুই বলল না। রুপু সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই ওনাদের সাথে ভাত খেতে বসল। রুপুর শ্বশুর ভাত খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে রুপুর পাতে খুব যত্ন করে এটা-সেটা তুলে দিতে দিতে বলল,
“আমিও তোমার আরেকটা বাবা। কখনো মনে ভয় সংশয় রাখবে না। তোমার যখন যা প্রয়োজন হবে নির্দ্বিধায় আমাকে অথবা বিনয়কে বলবে।”

এতক্ষণের গুমোট বাঁধা পরিবেশটা ওনি খুব সহজেই স্বাভাবিক করে ফেলল। গহনার ব্যাপারে রুপুর শাশুড়ী কিছুই বলল না। তবে রুপুর শ্বশুরের অমায়িক ব্যবহারে
মনে হলো রুপুর শাশুড়ীর চুপ থাকার পেছনে ওনার অবদান আছে। রুপু শ্বশুরবাড়িতে আসার পর এই প্রথম তৃপ্তি করে ভরপেট ভাত খেলো।
রুপু ঘরে গিয়ে দেখল, বিনয় বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোন দেখছে। রুপুকে দেখে উঠে বসল বিনয়। রুপু বিনয়কে দেখেও দেখল না। ওদের ঘরে বড় একটা আয়না আছে। আয়নার সামনে গিয়ে বসল রুপু। তারপর কোমর পর্যন্ত সিল্কি চুলগুলো বেণী বাঁধতে শুরু করল। বিনয় আয়নার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে রুপুর দিকে তাকিয়ে আছে। রুপুর গায়ের রঙ শ্যামলা। তবে চোখ-মুখ সুন্দর। শুধু সুন্দর বললে ভুল হবে ভয়ংকর সুন্দর। এত মায়াকাড়া চেহারা সচরাচর দেখা যায় না। বিনয় প্রথমবার মুগ্ধ হয়েছিল রুপুর হাসি দেখে। ছোট ছোট দাঁতগুলো এত সমান আর ঝকঝকে। ওর হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে ওর শত্রুও বোধহয় ওর বদনাম করতে পারবে না। তবে ওর চোখদুটো বেশি সুন্দর। কী অদ্ভুত রুপুর এই সুপ্ত সৌন্দর্য কী মায়ের চোখে পড়ে না? অবশ্য মায়ের চোখে না পরারই কথা। মা সুন্দর বলতে বুঝেই ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ। চেহারা যেমনই হোক। তাতে মায়ের কিছু যায় আসে না। অবশ্য মা নিজে কালো দেখেই ফর্সা মেয়ের প্রতি এত আসক্তি। তাছাড়া মায়ের একটা ভুল ধারণা হলো। বিনয় শ্যামবর্ণ, এখন যদি বিনয়ের বউও কালো হয়। তাহলে বাচ্চাগুলোও তো কালো হবে।

“কী দেখছো হা করে?”
বিনয় শুকনো ঢোক চিপে অন্যদিকে তাকাল। খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে রুপুর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। একহাত রুপুর কাঁধে রাখার আগেই রুপু চট করে সরে গেল। বলল,
“বাড়িতে এসেছো আটটায়। অথচ একবারও তো আমার সাথে দেখা করতে এলে না?”
“আসলে মা…”
“তোমার মায়ের তো আমার… আমার বাড়ির লোকের প্রতি অনেক অভিযোগ। আমার সাথে দেখা করার থেকেও আমাদের নামে তোমার মায়ের মুখে অভিযোগ শুনতেই তোমার বেশি ভালো লেগেছে। তাই হয়তো আমার সাথে একবারও দেখা করার প্রয়োজন বোধ করোনি।”
“তুমি আমাদের ভুল বুঝছো রুপু। আমার মা এতটাও খারাপ না। আসলে..
“আসল নকল পরে হবে। আগে আমাকে একটা কথা বলোতো, তোমার কী একবারও আমার সাথে দেখা করতে ইচ্ছে করেনি?”

“খুব করেছে।”
“তাহলে দেখা করলে না কেন?”
“মা খুব আগ্রহ নিয়ে গল্প শুরু করল। গল্পের মাঝখানে উঠে এলে মা খুব মন খারাপ করতো।”
“আর আমার মন খারাপের কোনো গুরুত্ব নেই তোমার কাছে? অবশ্য দুদিনের বউয়ের জন্য মাকে কষ্ট দেওয়া ঠিক হতো না।”
“তুমি আমাকে শুধু শুধু ভুল বুঝছো রুপু।”
“আমি তোমাকে মোটেও ভুল বুঝছি না। এতদিন ভুল বুঝেছিলাম। এখন ঠিক বুঝছি। তোমার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে চারমাস মতো ছিল। এই চারমাসে আমরা অজস্রবার ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছি। সেই তুমির সাথে এই তুমিকে কিছুতেই মেলাতে পারছি না আমি। আমি যদি ভুল করেও জানতাম.. তাহলে!”
“তাহলে কী?”

“তাহলে তোমাকে জীবনেও বিয়ে করতাম না।”
কথাটা বলেই দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলল রুপু। বিনয় রুপুকে স্পর্শ করার সাহস পেল না। তবে ওর এইমুহূর্তে রুপুকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। বলতে ইচ্ছে করছে। মা যা খুশি বলুক। তুমি কিছু মনে করো না রুপু। আমি.. আমি তো তোমাকে পছন্দ করি। খুব বেশি পছন্দ করি।”
বিনয় ভেবেছিল রুপু হয়তো মুখ ঢেকে কাঁদছে। অথচ রুপু কাঁদছে না। মুখ থেকে হাত সরিয়ে আয়নায় নিজেকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। রুপুর মায়াকাড়া চোখে বিষাদের ঘন ছায়া।
“তোর ঘরে এখনো লাইট জ্বলছে কেন বিনয়? এখনো ঘুমাসনি?”
রুপুর মুখে বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠল। বিনয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“এইতো ঘুমাব মা।”

“লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পর বাবা। অনেক রাত হয়েছে। আর জেগে থাকিস না।”
“তুমি এতরাতে এখানে কী করছো মা?”
“ঘরে জল নেই। জল নিতে এসে দেখি তোর ঘরের লাইট জ্বালানো।”
“দরজা খুলে দেব? তুমি কী ঘরে আসবে মা?”
“না বাবা। তোর বাবা দেখলে রাগ করবে। তুই ঘুমিয়ে পড়। আমি থাকতে থাকতে লাইট অফ কর।”
বিনয়ের খুব অস্বস্তি হচ্ছে। বিনয় মায়ের মুখের উপরে কখনো না বলতে পারে না। এখনও পারবে না। তবে রুপু এখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে ঘরের মেঝেতে দাঁড় করিয়ে রেখে লাইট অফ করা ভালো দেখায় না। ওকে এখন শুয়ে পড়ো বলতেও ইচ্ছে করছে না। খুব করে কাছে পেতে ইচ্ছে করছে। নিষিদ্ধ ইচ্ছেরা মাথায় ঝাঁকিয়ে বসেছে। রুপু কী এই নিশি নির্জনে বিনয়ের ডাকে সারা দেবে?”

“কী হলো বাবা? এখনো লাইট অফ করছিস না কেন?”
রুপু জায়গাটা থেকে একচুলও নড়ল না। ওর ভীষণ দেখার ইচ্ছে বিনয় এখন কী করে। বিনয় বেশ বেকায়দায় পরে গেল। লাইট অফ করা ছাড়া ও আর কোনো পথ খোলা পেল না। অথচ ও কিন্তু চাইলেই একটু বুদ্ধি করে বলতে পারতো। তুমি শুয়ে পড়ো মা। একটু পর লাইট অফ করছি।
বিনয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের বড় লাইট অফ করে জিরো বাল্ব জ্বেলে দিল। রুপু ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বিছানায় শুতে গেল।
বিনয় শুয়ে শুয়ে ছটফট করতে করতে আচমকা রুপুর একহাত চেপে ধরল। রুপু চাপা কণ্ঠে গর্জে উঠে বলল,

রুপুর বিয়ে পর্ব ২

“হাত সরাও .. হাত সরাও বলছি। খবরদার আমাকে স্পর্শ করবে না তুমি।”
“রুপু…”
“যেদিন সারারাত ঘরের লাইট জ্বেলে রাখতে পারবে। ঘরের লাইট জ্বেলে রেখে নির্দ্বিধায় আমার কাছে আসতে পারবে। সেদিন…শুধুমাত্র সেদিনই আমাকে স্পর্শ করার অধিকার তুমি পাবে। তার আগে না। না মানে না।”

রুপুর বিয়ে পর্ব ৪