Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৬ (২)

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৬ (২)

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৬ (২)
অধরা মিনহা

রাত তখন প্রায় তিনটা। ইফরাদ এলোমেলো পায়ে রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে। পা টলমল করছে। কোনো রকমে বেডের কাছে এসে দাঁড়াতেই ধপ করে বিছানার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে যায়। এটা ইচ্ছাকৃত ছিল না। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকা আর অতিরিক্ত নেশার কারণেই শরীরটা হঠাৎ ছেড়ে দেয়। ইফরাদ বিছানায় পড়তেই পুরো বেড কেঁপে ওঠে। আর তাতেই আনতারার ঘুম ভেঙে যায়। সে ধড়মড় করে উঠে বসে। চারপাশে তাকাতেই চোখে পড়ে, বেডের ওপর পড়ে আছে ইফরাদ।
ইফরাদ বেসামাল হয়ে পড়ে যাওয়ায় মাথা তুলে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলে,

— সরি, মাই জানা।
ইফরাদের কণ্ঠ শুনেই আনতারার বুক কেঁপে ওঠে। আনতারার ভেতরে অজানা ভয় আর সন্দেহ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে ভয়ে ভয়ে ইফরাদের কাছে মুখটা এগিয়ে নেয়।
আর ঠিক তখনি আনতারার নাকে আসে মদের তীব্র গন্ধ।
সঙ্গে সঙ্গে আনতারা চোখ বন্ধ করে নেয়। নাক কুঁচকে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। বিষয়টা বুঝতে পেরেই আনতারার চোখ থেকে টুপ করে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। আনতারা আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকে না। সরে যায়। বেড থেকে নেমে পড়ে।
ইফরাদের চোখে পানির ফোঁটা পড়তেই সে চোখ খুলে তাকায়। কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে আবার চোখ বন্ধ করে নেয়। আর আনতারা দাঁড়িয়ে থাকে বেডের পাশে।বিছানায় পড়ে থাকা ইফরাদকে দেখে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। ইফরাদ মদ খেয়ে এসেছে? সেই মদ? যে মদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, মদপান কারীদের জন্য ভয়ংকর শাস্তি রয়েছে? এই হারাম, নিষিদ্ধ কাজ ইফরাদ করেছে?

এই কাজ করার আগে কি একবারও ইফরাদের ভয় হয়নি?
মানুষের অন্তর থেকে যখন ঈমানের ভয় কমে যায়, তখনি মানুষ পাপ করতে ভয় পায় না? কেমন দুনিয়ায় বাস করছে ইফরাদ? পাপ করতে তার বুক কাঁপে না। ভয় হয় না। দিব্যি পাপ করে যাচ্ছে। আনতারা আর ভাবতে পারে না। তার মাথা ঘুরতে থাকে। এই মুহূর্তে তার শুধু আল্লাহর শান্তি প্রয়োজন। এই মাথা যদি আল্লাহর দরবারে না ঠেকে, তাহলে শান্তি আসবে কোথা থেকে? আল্লাহ ছাড়া তার কষ্ট দূর করার ক্ষমতা আর কার আছে? আনতারা চোখ মুছে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। তার মনে সন্দেহ হয়, যদি ইফরাদের স্পর্শ লেগে থাকে? আর সন্দেহ নিয়ে নামাজ হয় না তাই পরনের কাপড় বদলে নেয়। এরপর সে ওযু করে বেরিয়ে আসে।
জায়নামাজ বের করে বিছাতে গিয়েও হঠাৎ থেমে যায়।আনতারার মনে সন্দেহ জাগে, এই রুমে জায়নামাজ কীভাবে বিছাবে? না জানি ইফরাদ কোথায় কোথায় পা রেখেছে সেই অপবিত্র জায়গা থেকে এসে। তাই এই জায়গায় জায়নামাজ বিছায় কিভাবে? এই চিন্তায় আনতারা আর রুমের ভেতরে জায়নামাজ বিছায় না। আনতারা বেলকনিতে চলে যায়। সেখানে জায়নামাজ বিছিয়ে তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। প্রথম দুই রাকাআত নামাজ পড়ার পর আনতারা দুই হাত তুলে মোনাজাতে বসে। কান্নাভেজা কণ্ঠে বলতে থাকে,

— “হে আমার মালিক, আজকের দিনটা তো কত সুন্দর ছিল। উনি কত ভালো ছিলেন। তাহলে কেন আবার এসব খেয়ে এলেন, আল্লাহ? ওনি কেন হারাম ছাড়ছেন না? কেন বারবার সেই হারাম জিনিসগুলোর কাছে ফিরে যাচ্ছেন? হে আমার রব, আপনি ওনাকে বদলে দিন না। ওনাকে হেদায়েত দান করুন। এসব হারাম থেকে ফিরিয়ে এনে আপনার পথে চলার তাওফিক দিন। ওনার অন্তরটা আপনার নূরে ভরে দিন।
হে আল্লাহ, আমি আপনাকে সন্তুষ্ট করার মতো খুব বেশি ইবাদত করতে পারি না। আমার আমলও খুব অল্প। তবুও আপনি তো পরম দয়ালু, পরম করুণাময়। আপনার রহমতে আমার এই সামান্য আমলটুকু কবুল করুন, আর আমার এই চাওয়াটাও ফিরিয়ে দেবেন না। হে আল্লাহ, আমার রাদকে একজন দ্বীনদার, নেককার মানুষ হিসেবে গড়ে দিন। আমি চাই, ওনার হৃদয় আপনার ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হোক। ওনার জীবন আপনার আনুগত্যে সুন্দর হয়ে উঠুক।
হে আল্লাহ, আমার এই চাওয়াটা আপনি কবুল করে নিন। আমার চোখের অশ্রুকে বিফল করবেন না। আপনি তো হৃদয়ের সব কথা জানেন। আপনার জন্য কোনো কিছুই অসম্ভব না। আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।”

মোনাজাত শেষ করে আনতারা চোখ মুছে আবার নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে পড়তেই আকাশে হালকা আলো ফুটতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফজরের আজান হবে। ফজরের আজান পড়তেই আনতারা ফজরের নামাজের নিয়ত করে। দুই রাকাআত সুন্নত শেষে দুই রাকাআত ফরজ নামাজ শেষ করেও আবার মোনাজাতে বসে। এই মোনাজাতেও অনেকক্ষণ ধরে কান্না করে। এরপর নামাজ পড়ে, দোয়া-দরুদ পড়ে নেয়। তারপর জায়নামাজটা হালকা উল্টে নিয়ে রুমে ফিরে আসে। রুমে এসে দেখে, ইফরাদ অচেতন হয়ে ঘুমাচ্ছে। একদম এলোমেলো অবস্থায়। তার পরনের কালো জ্যাকেটটা নিচে পড়ে আছে। পায়ের জুতাও এখনো খোলা হয়নি।
আনতারা এগিয়ে ইফরাদের কাছে এসে দাড়ায়। তারপর একবার সূরা ফাতিহা এবং তিনবার সূরা ইখলাস পড়ে ইফরাদের দিকে ঝুঁকে ফুঁ দেয়। ফুঁ দেওয়া শেষে অশ্রুভেজা চোখে কয়েক মুহূর্ত ইফরাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে,

— আপনার মনে আল্লাহর ভয় নেই। আর যে আল্লাহকে ভয় করলো না, তার জন্য আমার ভয় হয়। আমি আপনাকে নিয়ে ভয়ে বাঁচতে চাই না। আল্লাহ আপনাকে তার পথে সামিল করে নিক।
কথাটা বলেই আনতারা আর দাঁড়িয়ে থাকে না। আবার ফিরে আসে বেলকনিতে। জায়নামাজের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে কাঁচের গ্লাসে পিঠ ঠেকিয়ে তসবিহ পড়তে থাকে। দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়। নীল, স্নিগ্ধ আকাশ। চারপাশে পাখির কিচিরমিচির শব্দ। শব্দগুলো আনতারার কানে আসছে, কিন্তু সেদিকে আনতারার কোনো খেয়াল নেই। এই সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করার মতো মনও তার নেই। চারদিক পুরোপুরি আলোকিত হয়ে গেলে আনতারা উঠে দাঁড়ায়। জায়নামাজ তুলে নেয়। ভাঁজ করে হাতে নিয়ে বেলকনি থেকে বেরিয়ে আসে। ইফরাদ এখনো গভীর ঘুমে।
জায়নামাজ হাতে নিয়েই আনতারা রুম থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর ইরাইনার দরজায় গিয়ে নক করে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ইরাইনা। সে জেগেই ছিল। ফজরের নামাজের জন্য ঘুম থেকে উঠেছিল। নামাজ শেষ করে আবার ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনি দরজায় শব্দ হয়। দরজা খুলেই সামনে আনতারার কান্নাভেজা মুখ দেখে ইরাইনা অবাক হয়ে যায়। কান্নায় আনতারার চেহারা ফুলে গেছে।
ইরাইনা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,

— কী হয়েছে আনতারা?
আনতারা শুধু নিচু স্বরে বলে,
— আপনার সাথে থাকা যাবে?
ইরাইনা বুঝতে পারে, ইফরাদের সঙ্গে কিছু একটা হয়েছে।
আর যেহেতু বিষয়টা স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাপার, তাই এ নিয়ে বেশি প্রশ্ন না করাই ভালো। তাছাড়া আনতারাও কথাটা ইগনোর করেছে। তাই ইরাইনা শুধু মাথা নেড়ে বলে,
— হ্যাঁ, আসো।
আনতারা রুমের ভেতরে ঢুকে আসে। ইরাইনা দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর আনতারার হাতে থাকা জায়নামাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
— জায়নামাজটা সোফায় রেখে দাও।
আনতারা সোফার ওপর জায়নামাজটা রেখে দেয়। ইরাইনা গিয়ে বেডের এক পাশে বসে। তারপর অন্য পাশ দেখিয়ে বলে,
— এখানে শুয়ে পড়ো।
আনতারা গিয়ে ইরাইনার পাশে শুয়ে পড়ে। কিন্তু আনতারার চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। বালিশে মাথা রেখে আনতারা আবার নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে।আনতারার চোখের প্রতিটা অশ্রুবিন্দু বালিশে পড়ে বালিশটা ভিজিয়ে দিতে থাকে। পাশে শুয়ে থাকা ইরাইনা সেই কান্না অনুভব করে।

দুপুর তখন প্রায় বারোটা। ইফরাদের ঘুম ভাঙে। ধীরে ধীরে আধো আধো চোখ খুলে। চারপাশটা ঝাপসা লাগে। মাথার ভেতর একটা চাপ অনুভব হয়। গত রাতের নেশার ভার এখনো শরীরে রয়ে গেছে। ইফরাদ আধো ঘুমঘুম চোখ নিয়েই বিছানায় উঠে বসে। কিছুক্ষণ পর চোখ পুরোপুরি খুলে চারপাশে তাকায়। প্রথমেই তার চোখ খোঁজে আনতারাকে। কিন্তু আনতারা রুমে নেই। ইফরাদ নিজের দিকে তাকায়। দেখে, এখনো তার পায়ে জুতা পরা। ইফরাদ পা থেকে জুতা খুলে নেয়। তারপর বেলকনিতে যায়, এই মনে করে, হয়তো আনতারা সেখানে আছে। কিন্তু বেলকনিও খালি। আনতারা কোথাও নেই।
ইফরাদ ভাবে, হয়তো নিচে গেছে।

ইফরাদ কাভার্ড খুলে একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে ওয়াশরুমে ঢোকে। শাওয়ার নিলেই শরীরটা একটু হালকা লাগবে। গতরাতের নেশার রেশও কেটে যাবে, মাথার ভারটাও কমবে। আধা ঘণ্টা পর শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে ইফরাদ। বের হয়েই রুমে আনতারাকে না দেখে ইফরাদ অবাক হয়ে যায়। এতক্ষণেও আনতারা রুমে আসেনি? এতক্ষণ তো আনতারার রুমের বাইরে কোথাও থাকার কথা না। ব্যাপারটা কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগে ইফরাদের কাছে।
এবার ইফরাদের মনে সন্দেহ জাগে। আনতারার কোথায় গেলো? এতক্ষণে তো তার কাছে চলে আসার কথা। চুল মুছা শেষে ইফরাদ রুম থেকে বেরিয়ে নিচে নামে।
ডাইনিং এরিয়ায় এসে শাহানারাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করে,

— আনতারা কোথায়?
শাহানারা শান্ত গলায় বলে,
— স্যার, আমি জানি না।
ইফরাদের ভ্রু কুঁচকে যায়।
— জানো না মানে? ও নিচে আসেনি?
শাহানারা মাথা নেড়ে বলে,
— না। সকাল থেকে ম্যামকে দেখিনি।
এবার ইফরাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। আনতারা রুমে নেই। নিচেও নেই। তাহলে গেল কোথায়? সে কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবতে থাকে। আনতারা কি তার ওপর রাগ করে আছে? রাগ করে আছে, এটা সে নিশ্চিত।নাহলে এতক্ষণ অন্তত তার থেকে দূরে থাকতো না। তার কাছে আসতো। কিন্তু কেন রাগ করে আছে? গত রাতে যখন সে বের হয়েছিল, তখন তো আনতারা খুশিই ছিল। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। তাহলে কি রাতে ফিরে আসার পর কিছু হয়েছে? সে কি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় এসে কোনো খারাপ ব্যবহার করেছে? ইফরাদের কিছুই মনে পড়ছে না।নাকি তার মদ খেয়ে আসাটাই আনতারার রাগের কারণ?
ইফরাদের চিন্তার মাঝেই শাহানারা জিজ্ঞেস করে,

— স্যার, আপনাকে কফি দিবো?
— না।
বলেই ইফরাদ সেখান থেকে চলে আসে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে করিডোর ধরে হাঁটতে থাকে ইফরাদ। হঠাৎ ইরাইনার রুম পার হওয়ার পর দুই কদম এগিয়েই থেমে যায়। আনতারা কি ইরাইনার রুমে আছে? নিচে নেই, তার রুমেও নেই। তাহলে তো ইরাইনার কাছেই থাকার কথা। আনতারা তো বাইরে কোথাও যাবে না। তাছাড়া এই বাড়িতে তার পর ইরাইনাই আনতারার কম্ফোর্ট জোন। ইফরাদ ফিরে এসে ইরাইনার দরজার সামনে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ চিন্তা করে দরজায় নক করে। কিছু সময় অপেক্ষা করেও কোনো উত্তর আসে না। কেউ দরজাও খুলে না। ইফরাদ আবার নক করে। এবার একটু জোরে। এবার কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে যায়।
দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে ইরাইনা। তার পরনে হিজাব। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে নামাজ পড়ছিল। ইরাইনাকে দেখেই ইফরাদ সরাসরি প্রশ্ন করে,

— আনতারা কোথায়?
ইরাইনা কোনো কথা না বলে ভেতরের দিকে ইশারা করে।
ইফরাদ একটু উঁকি দিয়ে দেখে, আনতারা নামাজ পড়ছে।
ইফরাদ ইরাইনাকে মাথা নেড়ে ইশারা করে বাইরে আসতে বলে। ইরাইনা রুম থেকে বের হয়ে দরজাটা আস্তে করে লাগিয়ে দেয়। তারপর দরজা থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ায়।
ইরাইনা ইফরাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
— কী করেছো তুমি?
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— কিছু করিনি আমি।
ইরাইনা চোখ সরু করে বলে,
— কিছু না করলেই আনতারা ফজরের নামাজের সময় রুম থেকে বের হয়ে আমার রুমে আসে?
একটু থেমে আবার বলে,

— তারপর সারারাত ঘুমায়নি। বালিশে চোখের জল ফেলেছে।
ইফরাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে হালকা স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— রাতে ড্রাংক হয়ে এসেছিলাম? এটার জন্য?
ইরাইনা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
— আমি কী জানি? তোমার বউ, তুমি জানবে!
— আচ্ছা, তুমি একটু লিভিং এরিয়াতে অপেক্ষা করো। আমি ওর সঙ্গে কথা বলবো।
ইরাইনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— সেখানে কেন?
ইফরাদ স্বাভাবিকভাবে বলে,
— হাসবেন্ড-ওয়াইফের কথা শোনা ভালো না।

ইফরাদ আসল কারণটা বলে না। কারণটা বললে তার ইজ্জত থাকবে না। আনতারা রেগে আছে। অবশ্যই তার কাছে গিয়ে আকুতি-মিনতি করে মাফ চেয়ে আনতারাকে রুমে নিয় যেতে হবে। কিন্তু ইরাইনা যদি সেখানে থাকে এবং দেখে ফেলে যে সে নিজের বউয়ের কাছে মাফ চেয়ে তাকে রুমে নিয়ে যাচ্ছে, তাহলে? সারাদিন এত ইগো নিয়ে চলা মানুষকে বউয়ের কাছে মাফ চাইতে দেখা, এটা তো একেবারে ইজ্জতের দফারফা হয়ে যাওয়া ব্যাপার। যা ইজ্জত গেছে, সেটা শুধু বউয়ের কাছেই যাক। আর কেউ না জানুক।
ইরাইনা চোখ সরু করে বলে,
— আমি তোমাদের কথা শুনবো কীভাবে? আমার রুম সাউন্ড প্রুফ। তবে হ্যাঁ, মারের চিৎকার শোনা যেতে পারে। তাছাড়া আনতারা যে পরিমাণ রেগে আছে অঘটন ঘটলেও ঘটতে পারে!
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে,
— এটা ইফরাদ রিদান চৌধুরী। আমি শুধু গিয়ে বলবো রুমে যাওয়ার কথা, আর সঙ্গে সঙ্গে আনতারা কাঁপাকাঁপি শুরু করে দেবে। এতটাই ভয় পায় আমাকে আনতারা। তুমি নিচে যাও আমি আনতারাকে ম্যানেজ করে আসছি।
ইরাইনা শান্তভাবে বলে,

— বেশি সময় নিও না। আমার নামাজ অর্ধেক বাকি।
কথাটা শুনেই ইফরাদ থেমে দাঁড়িয়ে যায়। তারপর বলে,
— আমি তোমার জায়নামাজ দিয়ে দিচ্ছি। অন্য একটা রুমে পড়ে নাও নামাজ।
বলেই ইফরাদ ইরাইনার রুমে ঢুকে যায়। ইরাইনাকে কিছু বলার সুযোগই দেয় না। ইরাইনা মানা করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ইফরাদ ভেতরে ঢুকে পড়ে। রুমে ঢুকে ইফরাদ দেখে, আনতারার জায়নামাজের পাশে আরেকটা জায়নামাজ বিছানো। এটাই ইরাইনার। ইফরাদ জায়নামাজটা তুলে নেয়। তারপর রুমের দরজা একটু খুলে ইরাইনাকে দিয়ে বলে,
— এই নাও জায়নামাজ।
ইরাইনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— অন্য কোথায় নামাজ পড়বো?
ইফরাদ জায়নামাজটা ইরাইনার হাতে দিতে দিতে বলে,

— বাড়িতে এত রুম থাকতে নামাজ পড়ার জায়গা পাও না তুমি?
কথাটা বলেই ইফরাদ দরজা লাগিয়ে দেয়। ইরাইনার আর কিছু বলার থাকে না। সে জায়নামাজ নিয়ে নিচে চলে যায়। গেস্ট রুমে গিয়ে নামাজ পড়ে নেবে।
এদিকে ইফরাদ দরজা বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর একটা ঢোক গিলে আনতারার জায়নামাজের পাশে ফ্লোরে বসে পড়ে। আনতারা তখন তাশাহহুদে। ইফরাদ চুপচাপ বসে আনতারার দিকে তাকিয়ে থাকে।
আনতারার ফর্সা মুখ, গাল আর নাক কান্নায় লাল হয়ে আছে। মুখটা একদম ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। নির্ঘুম রাত আর অতিরিক্ত কান্নার কারণেই এমন অবস্থা। ইফরাদ চুপচাপ আনতারার পাশে বসে রইল। কিন্তু নামাজ শেষ হওয়ার পরও কথা বলার কোনো সুযোগ পেল না ইফরাদ। আনতারা ইফরাদকে গুরুত্ব না দিয়ে গম্ভীর মুখে উঠে গেল। তারপর কুরআন শরীফ এনে বসে গভীর মনোযোগে তিলাওয়াত শুরু করে। ইফরাদ কিছু বলার সাহস করে না।

এখন যদি কুরআন তিলাওয়াতের মাঝে কোনোভাবে ব্যাঘাত ঘটায়, তাহলে আনতারা তাকে আগুন হয়ে ঝলসে দেবে, এটা ইফরাদ ভালো করেই বুঝতে পারছে। তাই সে আর সাহস করে না। আর সত্যি বলতে, এই মুহূর্তে ইফরাদের নিজের মধ্যেই কোনো সাহস নেই। বাইরে থেকে সে একদম শান্ত থাকলেও ভেতরে বুক কাঁপছে সামনে বসে থাকা এই বউ নামক বাঘিনীকে দেখে। একবারও চোখ তুলে তাকায়নি। আনতারা এমনভাবে কুরআন পড়ছে, যেন আশেপাশে কেউ নেই। ইফরাদ আন্দাজ করার চেষ্টা করে, আনতারা তার ওপর কতটা রেগে আছে।
কিন্তু কোনোভাবেই বুঝতে পারে না। অথচ সে এসে বসে আছে প্রায় বিশ মিনিট হয়ে গেছে। তবুও গলা থেকে একটা শব্দ বের করার সাহস হচ্ছে না। আনতারা খুব নিচু স্বরে, গভীর মনোযোগ দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করছে। পাশে কে বসে আছে, সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। আরো প্রায় বিশ মিনিট পর আনতারার কুরআন পড়া শেষ হয়। আনতারা কুরআন শরীফ বন্ধ করে একবার চোখ তুলে ইফরাদের দিকে তাকায়। আনতারার দৃষ্টি গম্ভীর। উদাসীন। পরক্ষণেই আবার চোখ সরিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
ইফরাদ নিজেকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করে। কী বলবে? কিছুই মাথায় আসে না। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে অবশেষে বলে,

— শুনো, আমি বলি? আমি কোনো ভুল করলে তুমি আমাকে বকবে, রাগ করবে। কিন্তু এটা কী করছো? রুম ছেড়ে চলে আসা, আবার এই সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট!
আনতারা অন্যদিকে তাকিয়েই দৃঢ় গলায় বলে,
— যান এখান থেকে।
— হ্যাঁ, চলো আমরা আমাদের রুমে গিয়ে ডিসকাস করি।
আনতারা অবিচল গলায় বলে,
— আমি যাবো না।
ইফরাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলে,
— কেন অকারণে রাইনাকে কষ্ট দিচ্ছো? এটা তো ওর রুম। ওর প্রাইভেসি নষ্ট হচ্ছে।
আনতারা চোখ তুলে ইফরাদের দিকে তাকায়।
— রাইনা আপু কি আপনাকে বলেছেন, তার সমস্যা হচ্ছে?
— না, বলেনি। কিন্তু আমি বুঝে নিয়েছি।
আনতারার চোখদুটোতে এবার অভিমান এসে জমা হয়।

— সবার মনই বুঝতে পারেন। শুধু আমার মনটাই আপনি বুঝতে পারেন না।
কথাটা শুনে ইফরাদের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। নরম গলায় বলে,
— এমন করছো কেন? রুমে চলো। খুব ক্ষিদে পেয়েছে। কিছুই খাইনি। খেতে দাও?
আনতারা ঠান্ডা স্বরে বলে উঠে,
— রাতে যেটা খেয়েছেন, সেটাতেই তো আপনার পেট ভরে থাকার কথা।
ইফরাদ হাত বাড়িয়ে আনতারার হাত ধরতে গেল।
— তুমি সারারাত কান্না করেছিলে?
হাতে ইফরাদের স্পর্শ পেতেই আনতারা দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে শক্ত গলায় বলে,
— ছুঁবেন না আমাকে। আপনার মুখসহ পুরো শরীর অপবিত্র। আর আমি জায়নামাজে, পবিত্র জায়গায় বসে আছি।
ইফরাদ হাত সরিয়ে নেয়। ধীর গলায় বলে,
— এক রাতে এত পরিবর্তন? কাল আমাকে এক মুহূর্তও দূরে যেতে দিচ্ছিলে না, আর আজ ছুঁতেও দিচ্ছো না?
আর নিজেকে সামলাতে পারে না আনতারা। বুকভাঙা কান্না বেরিয়ে এলো।

— হ্যাঁ, ছুঁতে দেবো না। আমি আপনার সঙ্গে কথা বলব না। আপনার দিকে ফিরেও তাকাব না। আর সেই রুমেও যাব না, যে রুমে আপনি ওসব ছাইপাঁশ খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন।
ইফরাদ তড়িঘড়ি করে উঠে এসে আনতারার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। দুহাতে আলতো করে আনতারার গাল জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল গলায় বলে
— এই…..সরি, সরি। আমার ভুল হয়েছে। জীবনে আর কোনোদিন মদ খাব না। খাওয়া তো দূরের কথা, ছুঁয়েও দেখব না। ছোঁয়া তো দূরের কথা, নামটাও মুখে আনব না। প্লিজ, কান্না বন্ধ করো।
আনতারা ইফরাদের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে গাল থেকে।
— ছাড়ুন। আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না।
ইফরাদ হাত সরায় না গাল থেকে। বরং আরো গভীরভাবে আনতারাকে আগলে রেখে বলে,
— সত্যি বলছি। আর কোনোদিন খাব না। এবার বিশ্বাস করো। প্রমিজ করছি।
আনতারা কাঁদতে কাঁদতেই ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,

— আল্লাহর কসম?
এক মুহূর্তও দেরি না করে ইফরাদ বলে উঠে,
— আল্লাহর কসম। এবার কান্না বন্ধ করো। তুমি যদি কান্না না থামাও, তাহলে তোমার সাথে আমিও কেঁদে দেব।
আনতারা নাক টেনে ধীরে ধীরে কান্না থামায়। ইফরাদ দুহাতে আনতারার চোখ-মুখের অশ্রু মুছে দেয়।
আনতারা গাল ফুলিয়ে বলে,
— আমার দেওয়া আল্লাহর কসম ভাঙলে কিন্তু আপনাকে মেরে ফেলব।
ইফরাদ অসহায়ের মতো করে বলে,
— সে তুমি মেরেই ফেলো। কিন্তু এমন রাগ করে চুপ হয়ে থেকো না।
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে বলে,
— তার মানে আপনি কসম ভাঙবেন?
ইফরাদ দ্রুত মাথা নাড়ে।

— এটা কোথায় বললাম? বললাম, যদি কখনো ভুল করি, তাহলে মেরে ফেলো। কিন্তু এমন করে আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেও না।
আনতারা ঠোঁট বাঁকিয়ে অভিমানী গলায় বলে,
— হ্যাঁ, আপনি ওসব খেয়ে আসবেন, আর আমি তো আপনার কাছ থেকে একদম সরবই না। একদম গা ঘেঁষে লেগে থাকব, তাই না?
ইফরাদ অসহায় গলায় বলে,
— একটা কথাও ছাড় দিচ্ছো না।
আনতারা এবার আর কোনো কিছু বলে না। ইফরাদ আনতারার চুপ থাকা দেখে নরম গলায় বলে,
— আচ্ছা, রুমে চলো। খুব ক্ষিদে পেয়েছে। খেতে দাও।
আনতারা শান্ত স্বরে বলে
— আপনি যান। আমি আসছি।
ইফরাদ আবারও আলতো করে দুহাতে আনতারার গাল ছুঁয়ে দেয়। তারপর নিজের নাক দিয়ে আনতারার নাকে হালকা ঘষা দিতে দিতে আদুরে গলায় বলে,
— এই, আগের মতো হয়ে যাও না। তোমাকে এমন দেখতে একদম ভালো লাগছে না। প্লিজ, আমার আগের মাই জানা হয়ে যাও। আমি তো তোমার যত্নে ব্যস্ত! আইম নট ইউস্ট টু ইউ ইগনোরিং মি লাইক দিস!
আনতারা হেসে ফেলে। না হেসে উপায় আছে? এমন আদুরে কথায় কেই বা গলে না! আনতারার হাসি দেখে ইফরাদও হেসে উঠে।

— চলো, আমাদের রুমে গিয়ে হাসি। এখানে প্রাইভেসি নষ্ট হচ্ছে।
আনতারা হালকা হেসে জিজ্ঞেস করে,
— কার? রাইনা আপুর?
ইফরাদ চোখ টিপে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,
— আমাদের।
এবার আনতারা জোরে হেসে উঠে,
— কী সব বলেন আপনি!
ইফরাদ উঠে দাঁড়িয়ে আনতারার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৬

— হাতটা ধরে আমার সঙ্গে চলো। তোমাকে আরো অনেক কথা বলব।
আনতারা ডান হাতে কুরআন শরীফটা বুকে আগলে রাখে। তারপর বাম হাত বাড়িয়ে ইফরাদের হাত ধরে। ইফরাদ আলতো টানে আনতারাকে দাঁড় করিয়ে একদম নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নেয়। আনতারা মৃদু হেসে মুখ তুলে ইফরাদের দিকে তাকায়। ইফরাদও আনতারার চোখে চোখ রেখে গভীর গলায় বলে,
— আমার শিরায় শিরায় রাগ থাকার পরেও তোমার কাছে আমি ভীষণ দুর্বল মাই জানা!

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৭