Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৯

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৯

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৯
অধরা মিনহা

খাওয়া শেষ করে আনতারা প্লেটটা নিয়েই ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে প্লেটটা সহ ধুয়ে নিয়ে আসে। ফিরে আসতেই ইফরাদ বলে ওঠে,
— রেস্ট নাও। একটু পর বের হবো।
আনতারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কোথায়?
ইফরাদ বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে এলোমেলো করে নিয়ে বলে,
— শপিংয়ে!
আনতারা একটু দ্বিধায় পড়ে বলে,

— ইফরাদ, বোরখা নেই আমার। আমি বেপর্দা হয়ে বের হবো না।
ইফরাদ কোনো উত্তর দেয় না। যেন আনতারার কথাই শোনেনি, এমন ভাব করে থাকে। সে ফোনে কাউকে কল করে কানে ফোন লাগিয়ে বেলকনির দিকে চলে যায়।
আনতারা ওয়াশরুম থেকে ওযু করেই এসেছিল মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য। সে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। নামাজ শেষে তসবিহ হাতে নেয়।
এই সময় ইফরাদ বেলকনির দরজা দিয়ে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে,
— বললাম রেস্ট নিতে।
আনতারা শান্ত স্বরে বলে,
— দোয়া দুরুদ পড়া ভারী কাজ না। অকারণে বসে সময় নষ্ট না করে একটু দোয়া দুরুদ পড়ি, সময়টা কাজে লাগবে। বিনিময়ে সওয়াবও পাবো।
ইফরাদ আর কিছু না বলে গিয়ে বেডে পা তুলে বসে পড়ে।
আনতারাও উঠে জায়নামাজ তুলে নেয়। তারপর এসে বেডে বসে তসবিহ পড়তে থাকে। পড়তে পড়তেই একবার ইফরাদের ফোনের দিকে উঁকি দেয়, সে কী করছে দেখার জন্য। কিন্তু কিছু বুঝতে পারে না। তাই আবার চোখ সরিয়ে নেয়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর দরজায় নক হয়। ইফরাদ নিজেই উঠে গিয়ে দরজা খুলে। মেইড একটা প্যাকেট দিলে সেটা নিয়ে দরজা বন্ধ করে আনতারার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

— এই নাও। তাড়াতাড়ি রেডি হও।
আনতারা তসবিহ পড়তে পড়তেই হাতের ইশারায় জিজ্ঞেস করে,
— কি এটা?
ইফরাদ এবার ত্যাড়ামো করে বলে,
— তোমাকে দেখে তো কোনো দিক থেকে বিকলাঙ্গ প্রতিবন্ধী মনে হচ্ছে না যে প্যাকেট খুলে দেখতে পারবে না।
ইফরাদের কথায় আনতারা মুখটা গোমড়া করে প্যাকেট খুলে দেখে ভিতরে বোরখা, হিজাব, নিকাব, হাত মোজা আর পা মোজা আছে।
ইফরাদ আলমারির দিকে যেতে যেতে বলে,

— দ্রুত উঠে রেডি হয়ে নাও। আমি রেডি হয়ে যেন দেখি তুমি রেডি হয়ে আছো। এক মিনিট যদি লেইট করো, মেয়ে, তাহলে তোমাকে আমি পান্তা ভাতে চুবিয়ে মারবো।
ইফরাদের কথা শুনে আনতারা ইফরাদের অগোচরে মুখ বাঁকায়। লোকটার কথায় যেন একফোঁটা মধুও নেই, সবই ঝাঁঝ! একটু আগেই আদর করে বিরিয়ানি এনে খাইয়ে দিল, আর এখন বলছে পান্তা ভাতে চুবিয়ে মারবে! সত্যিই, লোকটার স্বভাব অসভ্যের মতো। এসবই ভাবতে থাকে মনে মনে আনতারা।
তসবিহ পড়া শেষ করে আনতারা উঠে বোরখা-নিকাব পরে নেয়। এদিকে ইফরাদ ওয়াশরুম থেকে চেঞ্জ করে বের হয়ে দেখে, আনতারা এরই মধ্যে বোরখা পরে ফেলেছে, এখন হাত মোজা আর পা মোজা পরছে।
ইফরাদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে থাকে। আনতারা মোজা পরা শেষ করে অপেক্ষা করতে থাকে। ইফরাদ আয়না থেকে সরে গেলে সে হিজাব-নিকাব পড়বে।
ইফরাদ সেটা বুঝে একটু সরে পাশে জায়গা দিয়ে বলে,

— আসো, হিজাব পড়ে নাও।
আনতারা একটু সংকোচ নিয়ে বলে,
— না, সমস্যা নেই। আপনি আগে…
ইফরাদ কথাটা শেষ করতে না দিয়ে বলে,
— দুই লাইন কম বুঝো তাহলে লেইট কম হবে।
অগত্যা আনতারা এসে ইফরাদের পাশেই দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে হিজাব-নিকাব পড়ে নেয়। ইফরাদ আয়নার কাছ থেকে সরে আলমারির জুতার সেকশন থেকে লোফার বের করে পরে নেয়। জুতা পড়া শেষে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,

— শেষ?
আনতারা ছোট করে বলে,
— জি।
— তাহলে চলো।
তারপর দুজনেই রুম থেকে বের হয়ে যায়। লিভিং রুমে বসে ছিলেন শার্লিন ইমরোজ। সন্ধ্যার ঘটনাটা এখনও উনার মাথায় ঘুরছে। ইফরাদের আচরণ উনাকে বিস্মিত করে তুলেছে। যে ছেলে শুরু থেকেই বউ মানতে চায়নি, সেই ছেলে আজ বউয়ের হয়ে প্রতিবাদ করেছে! তাহলে কি সত্যিই ইফরাদ আনতারাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছে? এমন সময় সিঁড়ি দিয়ে নামার শব্দে উনার চিন্তায় বাধা পড়ে। তিনি তাকিয়ে দেখেন, ইফরাদ নামছে, কিন্তু তার পাশে কে? পুরো শরীর ঢাকা বোরখা-হিজাবে একজন মেয়ে। প্রথমে চিনতে পারেন না। তারপর হঠাৎই মনে হয়, এটা কি আনতারা?
ওরা কাছে আসতেই নিশ্চিত হন, হ্যাঁ, এটা তো আনতারা।
ইফরাদ কিছু না বলেই বেরিয়ে যেতে নিলে পেছন থেকে শার্লিন ইমরোজ ডাক দেন,

— কোথায় যাচ্ছো রাদ?
আনতারা থেমে যায়। ইফরাদ পেছন ফিরে শান্ত গলায় বলে,
— শপিংয়ে।
শার্লিন ইমরোজ আনতারার দিকে ইশারা করে প্রশ্ন করেন,
— ও কোথায় যাচ্ছে?
ইফরাদ আগের মতোই শান্ত কন্ঠে বলে,
— একসাথে যেহেতু বের হয়েছি, তার মানে আমার সাথেই!
শার্লিন ইমরোজ আবার জিজ্ঞেস করেন,
— ওকে কেন নিচ্ছো?
— প্রয়োজন আছে, সেজন্য নিচ্ছি!
শার্লিন ইমরোজের শরীরটা রাগ আর হিংসায় যেন জ্বলে উঠছে। তবুও সেটা ইফরাদকে বুঝতে না দিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেই বলে,

— সবাই কি ভাববে? তুমি এমন মেয়েকে নিয়ে বের হচ্ছো?
ইফরাদ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,
— সবাই কি ভাববে, আমি কিভাবে জানবো?
শার্লিন ইমরোজ আবার বলতে যান,
— রাদ, সবাই….
ইফরাদ মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলে,
— মাম্মা, লেইট হচ্ছে। অলরেডি অনেক লেইট করে ফেলেছো।
তারপর আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— চলো, তাড়াতাড়ি।
শেষে শার্লিন ইমরোজকে উদ্দেশ করে বলে,
— গেলাম, মাম্মা।
বলেই ইফরাদ আনতারাকে নিয়ে বের হয়ে যায়। ছেলের এমন গা-ছাড়া আচরণে শার্লিন ইমরোজ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
বাইরে এসে ইফরাদ দেখে তার কথামতো ড্রাইভার আগেই গাড়ি বের করে রেখেছে। ড্রাইভার দরজা খুলে দেয়।ইফরাদ আগে আনতারাকে বসার জন্য ইশারা করে।
আনতারা গাড়িতে ওঠার আগে মনে মনে পড়ে নেয়,

— বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ।
তারপর সে গাড়িতে উঠে বসে। ইফরাদ অন্য পাশ দিয়ে উঠে বসে। গাড়ি চলতে শুরু করে। গাড়িতে বসেই ইফরাদ আবার মোবাইল চালাতে থাকে। আনতারা ইফরাদের কাজে অবাক হয়। তার মাথায় ঢুকে না, ইফরাদ এত ফোন কিভাবে চালায় ? বাসায় থাকুক বা বাইরে, সবসময়ই ফোনে ডুবে থাকে।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামে। ড্রাইভার নেমে ইফরাদের দরজা খুলে দেয়। ইফরাদ পকেট থেকে মাস্ক বের করে পরে নেয়। কারণ শপিংমলে গেলে ভিড় জমে যেতে পারে তাকে দেখে। ইফরাদ গাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়ির ভেতরে ঝুঁকে আনতারাকে বলে,

— আসো।
আনতারা নেমে আসে। ইফরাদ আনতারার হাত ধরে শপিংমলের ভেতরে হাঁটতে শুরু করে। আনতারা একটু অবাক হয় ইফরাদের হাত ধরায়, তবে কিছু বলে না।ভেতরে ঢুকে ইফরাদ সরাসরি একটা গ্রোসারি শপে যায়।
একটা বাস্কেট নিয়ে আনতারার হাতে দিয়ে বলে,
— কি কি লাগবে, সেগুলো এই স্টোর থেকে নিয়ে বাস্কেটে রাখবে।
আনতারা মাথা নাড়িয়ে বলে,
— আমার কিছু লাগবে না।
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
— লাগবে না মানে? তুমি কি না খেয়ে থাকবে? শপিংয়ে এসেছি তোমার যা যা প্রয়োজন, সব নাও। তুমি আর বাসার কিছু খাবে না। তুমি যা যা খাও ডেইলি, সেগুলো নিয়ে নাও।
এবার আনতারা বুঝতে পারে, কেন তাকে এখানে আনা হয়েছে। সন্ধ্যায় তাকে করা অপমানটা ইফরাদ তাহলে বেশ কড়াভাবেই নিয়েছে।
ইফরাদ আবার বলে,

— কি হলো? দাঁড়িয়ে আছো কেন?
আনতারা আস্তে বলে,
— ইফরাদ, আমি তো তেমন কিছু বুঝি না। আপনার যা ইচ্ছে নিন, সেগুলোই খাবো আমি।
— ওকে।
এরপর ইফরাদ একে একে চিপস, চকলেট, নিউট্রেলা, বিস্কুট, কেক, বিভিন্ন ফ্রোজেন খাবার নিতে থাকে। অল্প সময়েই দুইটা বড় বাস্কেট ভর্তি হয়ে যায়। আনতারা শুধু ইফরাদের পেছন পেছন হাঁটে। চা-কফির সেকশনে এসে ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,
— চা নাকি কফি? কোনটা খাও?
আনতারা বলে,
— এসবকিছুর অভ্যাস নেই আমার।
ইফরাদ দুই প্যাকেট কফি বাস্কেটে রাখতে রাখতে বিরবির করে বলে,
— আজব পিস!
আনতারা সেটা শোনে না। ইফরাদ সামনে এগিয়ে আরো অনেক জিনিস নিতে থাকে। আনতারা পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা র‍্যাকে খেজুর দেখে থেমে যায়।
ইফরাদ হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ খেয়াল করে পাশে আনতারা নেই। পেছনে তাকিয়ে দেখে আনতারা একটু দূরে খেজুরের প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ইফরাদ এগিয়ে গিয়ে আনতারার কাছে গিয়ে বলে,

— খেজুর নিবে?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— জি। খেজুর খেয়ে ইফতার শুরু করা সুন্নত।
— তাহলে একটা কেন? বাড়িয়ে নাও।
বলে ইফরাদ নিজেই ৬-৭টা খেজুরের প্যাকেট নিয়ে বাস্কেটে রাখে।
আনতারা অবাক হয়ে বলে,
— এতগুলো কেন নিয়েছেন? অনেক টাকা হয়ে যাবে তো!
ইফরাদ আনতারার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে বলে,
— তুমি ভুলে যাচ্ছো মাই জানা, তোমার জোর করে বিয়ে করা হাসবেন্ড ইজ ড্যাম রিচ!
আনতারা নিকাবের নিচে মৃদু হাসে ইফরাদের কথায়।
ইফরাদ আবার সামনে হাটতে থাকে। কিছু দূর গিয়ে খেয়াল করে, আবার আনতারা পাশে নেই। পেছনে তাকিয়ে দেখে সে আবারও বেশ দূরে। আস্তে আস্তে হেঁটে আসছে। ইফরাদ থেমে যায়। আনতারা এসে ইফরাদের পাশে দাঁড়ায়। ইফরাদ আনতারার মধ্যে কিছুটা সংকোচ দেখে জিজ্ঞেস করে,

— কি হয়েছে?
আনতারা একটু ইতস্তত করে বলে,
— ইফরাদ, আমার কিছু কিতাব, সীরাহ লাগতো।
ইফরাদ ভ্রু সামান্য ভাঁজ করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— কিতাব চিনি, বাট সীরাহ কি?
— সীরাহ হলো আমাদের নবীজীর জীবনকাহিনী। উনার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি দিকের বিস্তারিত বিবরণ।
ইফরাদ মাথা নেড়ে বলে,
— ওকে, চলো। বই সেক্টর ঐদিকে।
তারপর সে আনতারাকে নিয়ে বইয়ের সেকশনে যায়।
সেখানে গিয়ে আনতারা মন দিয়ে বই দেখতে শুরু করে। আনতারাকে এত মনোযোগী দেখে ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,

— তোমার বই পড়ার অভ্যাস আছে?
আনতারা বইয়ের দিকেই তাকিয়ে হালকা হেসে বলে,
— জি। বই পড়তে আমার ভালো লাগে। ইসলামের কত ইতিহাস, কত কিছু জানা যায়।
তারপর ইফরাদের দিকে তাকিয়ে হাতে থাকা বইটা দেখিয়ে বলে,
— এই যে, এই কিতাবের নাম বুলুগুল মারাম। এটা বাসায় আমার কাছে ছিল। শুধু এটা না সহীহুল বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, তারিখুত তাবারী, আর-রাহীকুল মাখতূম, মুহাম্মাদ: মিন আস-সিয়ারিল আওয়াইয়াহ আরও অনেক বই আছে বাসায়।
ইফরাদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

— সত্যি পড়ো?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— হুম।
আনতারা একে একে রেক থেকে বই বেছে নিতে নিতে কখন যে সে ১৯টা বই, কিতাব আর সীরাহ বাস্কেটে ভরে ফেলেছে, সেটা খেয়ালই করেনি। হঠাৎ বাস্কেটের দিকে চোখ পড়তেই আনতারা চমকে ওঠে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— এতোগুলো বই? এতোগুলো বই নিয়ে নিয়েছি?
ইফরাদ তখন ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলে,
— ইয়েস, মাই জানা।
আনতারা একটু অস্বস্তি নিয়ে বলে,
— দাঁড়ান, কিছু কমিয়ে নিচ্ছি।
ইফরাদ বাস্কেটটা সামনে ঠেলে দিয়ে বলে,
— তার আর প্রয়োজন নেই। আপাতত এগুলো থাকুক। আর বই লাগলে বলো, অনলাইনে অর্ডার করে দিবো।
ইফরাদ কথা বলতে বলতেই সামনে এগিয়ে যায়। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই থেমে পেছনে ঘুরে আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,

— এই?
আনতারা সাড়া দেয়,
— জি?
— তোমার রেগুলার পড়ার মতো কাপড় আছে?
— জি, আছে। আপনার বাবা দিয়েছিলো।
ইফরাদ শপের একজন স্টাফকে ডেকে তিনটা বাস্কেট দেখিয়ে বলে,
— এগুলো কাউন্টারে নিয়ে যান।
স্টাফ মাথা নেড়ে বলে,
— ওকে, স্যার।
তারপর ইফরাদ আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— চল।
ইফরাদ আনতারাকে নিয়ে লেডিস ড্রেস সেকশনে যায়। সেখানে গিয়ে একের পর এক কাপড় নামিয়ে দেখতে থাকে। দেখতে দেখতে আনতারাকে জিজ্ঞেস করে,

— তুমি কী ধরনের ড্রেস পড়ো?
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— আমার লাগবে না, ইফরাদ। আমার কাপড় আছে।
ইফরাদ এবার পাশ ফিরে আনতারার দিকে তাকায়। তারপর সরাসরি বলে উঠে,
— যেগুলো আছে, ওগুলো আর পড়বে না। ওগুলো মাম্মার। আমি নতুন কিনে দিচ্ছি। এগুলোই পড়বে।
আনতারা চুপ করে যায়। আনতারার কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে ইফরাদ নিজেই বলে,
— বলতে হবে না তোমার। আমি নিজেই নিয়ে নিচ্ছি। তারপর ওগুলো পড়ো। কোনো নাকড়া করতে পারবে না।
এবার আনতারা আস্তে করে বলে,
— সুতি কাপড়ের দুটো থ্রি-পিস দিন। তাহলেই হবে।
ইফরাদ শুনে ঠিকই কিন্তু কোনো উত্তর না দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। থ্রি-পিসের সেকশনে গিয়ে একসাথে সুতি ১০টা আর জর্জেট ৫টা থ্রি-পিস তুলে নেয়।
এতগুলো কাপড় দেখে আনতারা বিস্ময়ে বলে ওঠে,
— এতগুলো কাপড় কেন, ইফরাদ? এতগুলো লাগবে না আমার।
ইফরাদ একটু বিরক্ত হয়ে বলে,

— এতোক্ষণ যেহেতু মুখে তালা লাগিয়ে রেখেছিলে, এখনো তালা মেরে রাখো। কী লাগবে আর কী লাগবে না, সেটা আমি দেখছি।
— ইফরাদ, অকারণে এতোগুলো টাকা নষ্ট করছেন। দুনিয়ার সবকিছুর হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হয়। একটার বদলে দশটা কিনে ফেলার হিসাবও দিতে হবে।
কিন্তু ইফরাদ আনতারার কথা শুনেও না শোনার ভান করে। সে আরও ভারী কাজের ১০টা থ্রি-পিস তুলে নেয়।
আনতারা মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার কাছে এতগুলো কাপড় অপ্রয়োজনীয়। অতিরিক্ত সবকিছুরই হিসাব দিতে হয়। অতিরিক্ত খাওয়া, কেনাকাটা, অর্থ অপচয়, সবকিছুরই জবাবদিহি আছে আল্লাহর কাছে। এমনকি অতিরিক্ত একটা জামারও হিসাব দিতে হবে।
ইফরাদ সব কাপড় এক স্টাফের হাতে দিয়ে বলে এগুলো কাউন্টারে নিয়ে যেতে। স্টাফ সেগুলো নিয়ে চলে যায়।
তারপর ইফরাদ আনতারার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

— আর কিছু আছে নেওয়ার?
আনতারা কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনি তার চোখে পড়ে সামনে তিন-চারজন তাদের ভিডিও করছে। মুহূর্তেই আনতারা দ্রুত গিয়ে ইফরাদের প্রশস্ত বুকের ভেতর একদম ছোট্ট বিড়ালের মতো গুটিয়ে গিয়ে নিজেকে আড়াল করে ফেলে। ইফরাদ অবাক হয়ে কিছু বলতে যাবে, তখনি আনতারা নিচু স্বরে বলে,
— ইফরাদ, ভিডিও করছে।
কথাটা ইফরাদের কানে যেতেই সে ডানে-বামে, সামনে তাকায়। কাউকে দেখতে পায় না। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখে তিনজন ছেলে আর একজন মেয়ে মোবাইল হাতে ভিডিও করছিল। ধরা পড়ে যাওয়ায় তারা দ্রুত ফোন লুকিয়ে ফেলে। ইফরাদের মেজাজ সঙ্গে সঙ্গে খারাপ হয়ে যায়।
আনতারাকে সরিয়ে বড় বড় পা ফেলে তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,

— উইথআউট পারমিশন ভিডিও করার সাহস কোথা থেকে এসেছে?
ছেলেগুলো ভয় পেয়ে যায়। সবাই মিলে বলতে থাকে,
— সরি, স্যার…
কিন্তু মেয়েটা উল্টো জোর গলায় বলে,
— কোথায় ভিডিও করেছি? কোনো ভিডিও করিনি আমি।
ইফরাদ ঠান্ডা কিন্তু কড়া গলায় বলে,
— আমি নিজের চোখে দেখেছি। সবাই ভালোভাবে ভিডিও ডিলিট করুন! নয়ত খারাপ হবে!
ছেলেগুলো তাড়াতাড়ি বলে,
— আচ্ছা, আমরা এক্ষুনি ভিডিও ডিলিট করছি।
তারা ইফরাদের সামনে দাঁড়িয়েই ভিডিও ডিলিট করতে থাকে। সব শেষ হলে ইফরাদ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলে,
— আপনি ভিডিও ডিলিট করছেন না কেন?
মেয়েটি জেদ ধরে বলে,

— কী ভিডিও ডিলিট করবো? আমি তো কোনো ভিডিও করিনি!
ইফরাদ চোয়াল শক্ত করে বলে,
— ভালোভাবে বলছি ভিডিও ডিলিট করে দিতে! নয়ত পরে খারাপ কিছু হলে আমি দায়ী না।
মেয়েটা এবার কিছুটা জোরেই শাসিয়ে ওঠে,
— কী খারাপ কিছু হবে? আপনি আমাকে থ্রেট দিচ্ছেন? আমি এক্ষুনি আপনাদের সেলিব্রিটিদের আসল রূপ ভাইরাল করছি…
বলেই মেয়েটা আবার ফোনের ক্যামেরা চালু করতে যায়।
এরপর মুহূর্তের মধ্যে ইফরাদ মেয়েটার হাত থেকে ফোনটা টেনে নিয়ে জোরে মাটিতে আছাড় মারে। ফোনটা সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
ইফরাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— থ্রেট দিচ্ছিলাম না। আমার কাজের আগাম বার্তা দিচ্ছিলাম। বাট ইউ মিস ইট!
এরই মধ্যে আশেপাশে মানুষ জড়ো হয়ে যায়, শপের ম্যানেজারও চলে আসে। মেয়েটা রাগে আর বিস্ময়ে বলে,

— আপনি কিভাবে পারেন একজনের ফোন ছোঁ মেরে নিয়ে ভেঙে ফেলতে? ম্যানারস জানেন না আপনি?
ইফরাদ শক্ত গলায় পাল্টা প্রশ্ন করে,
— একজনের পারমিশন ছাড়া ভিডিও করাটা কোথাকার ম্যানারস?
মেয়েটা বলে,
— আপনি একজন পাবলিক ফিগার! আপনার ছবি ভিডিও আমরা করতেই পারি!
ইফরাদ তীক্ষ্ণ স্বরে বলে,
— আমি পাবলিক ফিগার, বাট নট আ পাবলিক প্রোপার্টি!
এসময় এক ছেলে পাশ থেকে বলে,

— স্যার, আমরা আপনাকে পাবলিক প্রোপার্টি ভাবিনি। আসলে আমরা আপনার অনেক বড় ফ্যান। আপনাকে প্রথমবার সামনে দেখে এক্সাইটেড হয়ে ভিডিও করছিলাম।
বাকিরাও তার সঙ্গে সম্মতি দেয়। ইফরাদ একটু শান্ত হয়ে বলে,
— আমার সাথে আমার ওয়াইফ আছে। সে পর্দা করে। সে এসব ক্যামেরা, লাইটিং, মিডিয়া পছন্দ করে না। তাই আমি ভদ্রভাবে বলেছিলাম ভিডিও ডিলিট করতে।
তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলে,
— কিন্তু এই মেয়েটা বাড়াবাড়ি করেছে!
মেয়েটা প্রতিবাদ করে বলে,

— আমি একটা ভিডিও করেছি বলে আপনি আমার এতো দামি ফোনটা ভেঙে দিবেন?
ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,
— কত দাম ছিল ফোনটার?
মেয়েটা বলে,
— ৪০ হাজার টাকা।
ইফরাদ এবার ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে বলে,
— আপনি এই শপের ম্যানেজার, না?
ম্যানেজার মাথা নেড়ে বলে,
— জি, স্যার।
ইফরাদ বলে,

— এরাউন্ড সিক্সটি থাউজ্যান্ড টাকার একটা ভালো ফোন দেন।
এ কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে যায়। ম্যানেজার দ্রুত একজন কর্মচারীকে ফোন আনতে পাঠায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে একটা নতুন ফোন নিয়ে আসে এবং ইফরাদের হাতে দেয়।
ইফরাদ ফোনের বক্সটা মেয়েটির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— আপনারটার থেকে দামী ফোন। আর নেক্সট টাইম কারো ভিডিও করার আগে পারমিশন নিয়ে করবেন। নয়ত অন্য কেউ ফোন ভাঙলে ভর্তুকি নাও দিতে পারে!
বলেই ইফরাদ একবার চারপাশে তাকিয়ে কড়া গলায় বলে,
— সবাইকে বলে দিচ্ছি, আমার ওয়াইফের ভিডিও কিংবা ছবি যেন কারো ফোনে না থাকে। নয়ত যদি কোনো কিছু সোশ্যাল মিডিয়ায় লিক হয় আমার ওয়াইফকে ঘিরে, আই সোয়ার, আমি তাকে খুঁজে বের করে জানে মেরে ফেলবো!
ইফরাদের কথা শুনে আশেপাশের সবাই ভয়ে চুপ হয়ে যায়। এসময় শপের ম্যানেজার একটু ইতস্তত করে বলে,

— স্যার, শপের সিসিটিভি ফুটেজে আপনার ওয়াইফ হয়তো ক্যাপচার হয়েছে। এখন আমরা…
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— ডিলিট করে দিন সিসিটিভি ফুটেজ। যত টাকা লাগে দিবো। বললামই তো, আমার ওয়াইফ পর্দা করে। এসবের মধ্যে থাকতে চায় না। আর আমি স্বামী হিসেবে আমার বউয়ের পর্দা রক্ষা করার দায়িত্ব আমার!
ম্যানেজার মাথা নেড়ে বলে,
— ওকে, স্যার।
ইফরাদ এরপর মাটিতে পড়ে থাকা ভাঙা ফোনটার ওপর জুতা দিয়ে চাপ দিয়ে পিষতে পিষতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলে,

— নেক্সট টাইম পারমিশন ছাড়া আমার কিংবা আমার ওয়াইফের দিকে ক্যামেরা ধরলে এর থেকে খারাপ অবস্থা করে দিবো আমি। মনে রাখবেন সবাই।
বলেই ইফরাদ ভিড় থেকে বের হওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়। সবাই দ্রুত সরে গিয়ে ইফরাদকে বের হওয়ার রাস্তা করে দেয়। ভিড় থেকে বের হয়ে ইফরাদ খেয়াল করে, আনতারা এখানে নেই। ইফরাদের বুক ধক করে ওঠে। সে দ্রুত চারপাশে তাকাতে থাকে। এক সেকশন থেকে আরেক সেকশনে দৌড়ে যায়। কোথাও আনতারার দেখা নেই।
মুহূর্তেই ইফরাদের মাথা ঘুরে ওঠে। আনতারা কোথায় গেল? ভয় পেয়ে কি কোথাও চলে গেছে? এত বড় শপিংমলে তাকে খুঁজে পাবে কিভাবে? এসি চলা ঠান্ডা পরিবেশেও ইফরাদের শরীর ঘামে ভিজে যায়। উদ্বেগে সে দ্রুত চারদিকে খুঁজতে থাকে। হঠাৎ ইফরাদের চোখে পড়ে, একটা ফ্রিজের পাশে কালো ওড়নার এক কোণা উড়ছে। সন্দেহ নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখে, ফ্রিজের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে আনতারা।

আনতারা দেয়ালের সাথে লেগে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। এত মানুষের ভিড়, ইফরাদের রাগারাগি, আর চারপাশে ভিডিও করা সব মিলিয়ে সে ভয়ে সেখান থেকে সরে এসে লুকিয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন তার আরও বেশি ভয় লাগছে। সে তো ইফরাদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে! এত বড় জায়গা, কিছুই চেনে না, এমনকি ইফরাদের বাড়ির ঠিকানাও জানে না। সে ইফরাদের কাছে যাবে কিভাবে? এই ভয়ে আনতারার চোখে পানি চলে আসে।
ঠিক তখনি কেউ তার ডান হাত শক্ত করে ধরে। চমকে উঠে তাকিয়ে দেখে, ইফরাদ!
ইফরাদ তার হাতটা এমনভাবে ধরে আছে যেন ছাড়লেই সে আবার হারিয়ে যাবে। দ্রুত শ্বাস নিতে নিতে শক্ত গলায় বলে,

— পাগল তুমি? এখানে কি করছো?
ইফরাদকে দেখে আনতারার যেন প্রাণ ফিরে আসে। সে নিজের বাম হাত দিয়ে ইফরাদের হাত শক্ত করে ধরে চোখে জল নিয়ে বলে,
— এসেছেন আপনি, ইফরাদ? এটা আপনিই?
ইফরাদ বুঝতে পারে, আনতারা কাঁদছে, ভয় পেয়েছে। সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু এতক্ষণ ধরে দুশ্চিন্তা আর রাগ, দুটোই তাকে চেপে ধরেছে। তবুও একটু নরম গলায় বলে,
— হুম, আমিই। কিন্তু আমাকে ছেড়ে চলে এলে কেন?
আনতারা দুই হাত দিয়ে ইফরাদের হাত আঁকড়ে ধরে বলে,
— ভয় পেয়ে গেছিলাম। আপনি রাগারাগি করছিলেন, আবার সবাই দূর থেকে ভিডিও করছিল। আমি যদি ভুল করে ভিডিওতে এসে পড়ি, তাই সেখান থেকে চলে আসি। কিন্তু দূরে চলে এসে পথ ভুলে এখানে আটকে যাই। কিছুই চিনতে পারছিলাম না। খুব ভয় পেয়েছিলাম।
ইফরাদ গভীর শ্বাস নিয়ে বলে,
— চিনবে কীভাবে? এত বড় শপ। আচ্ছা, এখন ভয় ছাড়ো। আর ভয় পেও না। আমি আছি।
আনতারা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তারপর ইফরাদ আনতারাকে সাথে নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে আসে। আগেই তাদের সব জিনিস প্যাকেট করা ছিল। সে কার্ড বের করে পেমেন্ট করে। শপের স্টাফরা জিনিসগুলো তুলে নেয় গাড়িতে তুলে দেওয়ার জন্য। বাইরে বের হতেই হঠাৎ একদল সাংবাদিকের সামনে পড়ে যায় ওরা।
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে আনতারাকে নিজের পেছনে সরিয়ে নিয়ে আড়াল করে ফেলে। তারপর জোরে বলে ওঠে,

— লোয়ার দা ক্যামেরা!
সবাই প্রথমে হতবাক হয়ে যায়। ইফরাদ আরও জোরে চেঁচিয়ে বলে,
— আই সেইড, লোয়ার দা ক্যামেরা!
এবার সবাই দ্রুত ক্যামেরা নামিয়ে নেয়। একজন সাংবাদিক জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে, স্যার?
ইফরাদ দৃঢ় গলায় বলে,
— আমার বউ সাথে আছে। আর আমি আগেই বলেছি, আমার বউ পর্দা করে। সো কেউ কোনো ভিডিও করবে না। কোনো ক্যামেরা অন হবে না।
সবাই বাধ্য হয়ে ইফরাদের কথা মেনে নেয়।
ইফরাদ আনতারাকে নিয়ে চলে যেতে যাবে, ঠিক তখনি পেছন থেকে কারও কণ্ঠ ভেসে আসে,
— এই মেয়েটা কি সেই হোটেলেরই মেয়ে? নাকি অন্য কোনো মেয়ে? সেজন্যই ক্যামেরা সামনে আনতে চাচ্ছে না। সব ফাঁস হয়ে যাবে ভয়ে….
ইফরাদ থেমে যায়। ঘুরে তাকায়। দেখে, একজন হালকা পিংক শার্ট পরা লোক। ইফরাদ ঘুরে তাকাতেই লোকটা চুপ হয়ে যায়। ইফরাদ আনতারার হাত ছেড়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে লোকটার সামনে দাঁড়ায়। চোখে রাগ, চোয়াল শক্ত। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

— কান খুলে শুনে রাখ, এটা আমার বউ। জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো, যদি আবার হোটেলের মেয়ে বলিস।
তারপর আরও কড়া গলায় বলে,
— তোর মতো বিশ-ত্রিশটা সাংবাদিকের ক্যারিয়ার শেষ করতে আমার বেশি সময় লাগবে না। তাই সাংবাদিকতা করছিস। সেটাই কর। কুটনি প্রতিবেশী হতে যাস না। নয়ত পথে ঘাটে ভিক্ষা করে খাওয়ার অবস্থায় এনে ফেলবো।
ইফরাদ কথাগুলো বলেই একটু সরে দাঁড়ায়। তারপর আঙুল তুলে আনতারার দিকে দেখিয়ে আবার বলে,
— এগেইন মাথায় ঢুকিয়ে নে, ঐ দূরে বোরখা পরে থাকা মেয়েটা ইফরাদ রিদান চৌধুরীর বউ।
এরপর চারপাশে থাকা সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলে,

— জীবনে যাতে আর কারোর মুখ থেকে আমার বউকে অসম্মানমূলক কথা না শুনি।
বলেই ইফরাদ আর দাড়ায় না। ঘুরে এসে আনতারার হাত শক্ত করে ধরে। এতগুলো ক্যামেরা আর মানুষের ভিড়ে আনতারা ভয়ে গুটিয়ে থাকলেও ইফরাদের কথাগুলো শুনে তার ভেতরে অন্যরকম অনুভূতি জাগে। ইফরাদ তার জন্য এভাবে দাঁড়িয়েছে, তার হয়ে কথা বলছে, এটা ভাবতেই আনতারা অবাক হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে, ইফরাদের মুখে জোর দিয়ে আমার বউ বলাটা। এমন ইফরাদকেই তো সে চেয়েছিলো।
ইফরাদ আনতারার হাত ধরে হাঁটতে থাকে। আনতারা হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে চোখ তুলে ইফরাদের দিকে তাকায়। ইফরাদের মুখ তখনও কঠোর। গাড়ির কাছে এসে ইফরাদ আগে আনতারাকে বসায়, তারপর নিজেও উঠে বসে। গাড়ি চলতে শুরু করে। গাড়িতে বসে ইফরাদ নিজের শার্টের খোলা বোতামগুলোর সঙ্গে আরেকটা বোতাম খুলে দিয়ে সিটে হেলান দিয়ে বলে,

— একে তো বডিগার্ড ছাড়া বের হয়েছি, তার ওপর আবার তোমাকে নিয়ে কতকিছু পোহাতে হচ্ছে।
আনতারা মাথা নিচু করে আস্তে বলে,
— ধন্যবাদ, ইফরাদ। আমার জন্য এতোকিছু করাী জন্য।
ইফরাদ সে কথার উত্তর দেয় না। ক্লান্ত গলায় বলে,
— আমি আর কখনো তোমাকে নিয়ে বের হলে গার্ড ছাড়া বের হবো না।
প্রায় এক ঘণ্টা পর গাড়ি এসে থামে চৌধুরী বাড়ির সামনে। গাড়ির ভেতর থেকেই দেখা যায়, সামনে সাফিন দাঁড়িয়ে আছে, সাথে আরও তিনজন লোক। গাড়ি থামতেই সাফিন এগিয়ে এসে দরজা খুলে দেয়।
ইফরাদ নেমে জিজ্ঞেস করে,

— এনেছো?
সাফিন মাথা নেড়ে বলে,
— জি, স্যার। মাত্রই আনলাম। আপনি যে সাইজের বলেছেন, ঠিক তেমনটাই।
ড্রাইভার আনতারার দিকের দরজা খুলে দেয়। আনতারা নেমে সালাম দেয় সাফিন। সাফিনও হেসে সালামের জবাব দেয়। তিনজন লোক সামনে থাকা একটা বড় বক্সকে ধরাধরি করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেতে থাকে। সাফিনও পেছন পেছন যায়। আনতারা ইফরাদের কাছে এসে সামনে রাখা বড় বক্সটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে,

— এটা কী?
ইফরাদ বলে,
— ফ্রিজ।
আনতারা আর কিছু বলে না। সে মনে করে হয়তো ইফরাদের বাসার ফ্রিজ নষ্ট হয়ে গেছে, তাই নতুন ফ্রিজ আনা হয়েছে। আনতারা ইফরাদের সাথে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপর ইফরাদের পেছন পেছন রুমে আসতেই দেখে লোকগুলো ফ্রিজটা ইফরাদের রুমে রাখছে।
সাফিন জিজ্ঞেস করে,
— স্যার, জায়গা ঠিক আছে? এখানেই রাখবো?
ইফরাদ বলে,
— হ্যাঁ, ঠিক আছে।
লোকগুলো ফ্রিজটা রেখে চলে যায়। ইফরাদ আবার বলে,
— গাড়িতে থাকা জিনিসগুলো দিয়ে যেও।
সাফিন বলে,
— ওকে, স্যার।
বলেই সাফিন চলে যায়। সাফিন চলে গেলে আনতারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

— ফ্রিজ এখানে কেন?
ইফরাদ আনতারার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলে,
— জিনিসপত্র যে কিনে এনেছি, সেগুলো রাখবে না?
আনতারা বলে,
— কিচেনে তো ফ্রিজ আছে।
ইফরাদ সরাসরি বলে,

— ঐটা আমরা ইউজ করছি না। এটা আমাদের আলাদা ফ্রিজ। যা যা কিনে এনেছি, সব এতে রাখবে। এই বাড়ির কিছু খাবে না৷ এমনকি পানিও না। পানির বোতল সাফিন এনে দিচ্ছে। লাঞ্চ-ডিনার বাইরে থেকে খাবার আনবো। আর যা লাগবে, আমাকে বলবে।
এই কথা শুনে আনতারা স্তব্ধ হয়ে যায়। শার্লিন ইমরোজের তাকে অপমানের কারণে ইফরাদ সবকিছু আলাদা করে ফেলেছে। এমনকি নিজেও আলাদা হয়ে গেছে! ইফরাদ তার জন্য এতকিছু করেছে? আনতারার কাছে সবকিছুই অবিশ্বাস্য লাগে। মনে হয় যেন স্বপ্ন দেখছে।
আনতারার ভাবনার মাঝেই ইফরাদ আরেকটা কাজ করে ফেলে। আনতারার নিকাবের ওপর একটা পাতলা কালো কাপড় ছিল, যেটা দিয়ে আনতারার চোখ ঢাকা ছিলো। ইফরাদ সেটা সরিয়ে দিয়ে বলে,

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৮

— আমরা এখন বাসায় এসেছি। এটা এখনো চোখের উপর দিয়ে অন্ধের মতো ঘুরছো….
কাপড়টা সরাতেই ইফরাদ থমকে যায়। কালো নিকাবের মাঝে আনতারার ঘন পাপড়িওয়ালা বড় বড় চোখ দুটো ধরা পড়ে, যার মণি বাদামী রঙের। মুহুর্তেই ইফরাদের চোখে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে। এতটাই সুন্দর আর আকর্ষণীয় সেই চোখ যে ইফরাদ পলকহীনভাবে তাকিয়ে থাকে। আনতারাও ইফরাদের চোখে চোখ রেখে চেয়ে থাকে। চোখাচোখির সেই মুহুর্তটা থমকে যায়।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১০