রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৩৭
মহাসিন
রাত দশটা।
পুরো বাড়িটা ডুবে আছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায়। বাইরে ঘন অন্ধকার। দূর থেকে ভেসে আসছে কোনো কুকুরের একটানা ডাক। সেই ডাকটাই যেন নীরবতার ভার আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।নীলাঞ্জনা পা টিপে টিপে শাশুড়ির রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজায় মৃদু টোকা দিলো। কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলে গেল। মহুয়া দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
“একি! তুমি এত রাতে এখানে?”
“মা, তোমার সাথে জরুরি কিছু কথা আছে।”
মহুয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর দরজা পুরোটা খুলে দিয়ে বললেন,
“আসো আমার সাথে।”
দুজন বেরিয়ে এলো পাশের ব্যালকনিতে। রাতের ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগছে। মহুয়া রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নীলাঞ্জনার চোখের দিকে তাকালেন।
“কি কথা বলবে?”
নীলাঞ্জনা কাঁপা গলায় বলল,
“মা… সিয়ামকে যেভাবেই হোক বাড়িতে ফিরিয়ে আনো।”
মহুয়ার মুখটা মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল। তিনি মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
“কিন্তু আমি ওই শাপলাকে মেনে নিতে পারবো না। মেয়েটাকে এত ভালোবাসলাম… আর শেষমেশ ও কি করলো? কাউকে কিছু না বলেই সিয়ামকে বিয়ে করে নিলো। আমাদের সবাইকে বোকা বানিয়ে।”
নীলাঞ্জনা এক পা এগিয়ে এলো। গলা ধরে এলো তার।
“মা, তুমি কেন বুঝছো না? শাপলার এই পৃথিবীতে এখন কেউ নেই। মা বাবা, বোন… সবাই ম*রে গেছে। এখন তুমি ওর খালা হয়ে যদি ওকে দূরে সরিয়ে দাও, তাহলে ও যাবে কোথায়?”
একটু থেমে দম নিয়ে আবার বলল, “হ্যাঁ, শাপলা যা করেছে ঠিক করে নি। এতে শুধু ওর একার দোষ না, সিয়ামেরও দোষ আছে।”
মহুয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। রেলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমি না হয় মেনে নিলাম… কিন্তু তোমার শ্বশুর? উনি কি মেনে নেবেন?”
“তুমি রাজি করাবে, মা। যে করেই হোক।” নীলাঞ্জনার গলায় আকুতি।
একটু চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করলো,
“আচ্ছা, শাপলা এখন কোথায় আছে?”
মহুয়া অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন,
“হয়তো ওর চাচার বাড়িতেই আছে। তা ছাড়া আর যাবেই বা কোথায়?”
নীলাঞ্জনা শক্ত গলায় বলল,
“যেখানেই থাকুক। তুমি বাবাকে যেভাবেই হোক রাজি করাও, মা। প্লিজ।”
কথা শেষ হতেই দুজনেই চুপ। তারপর যে যার মতো ঘরে চলে গেল।
অন্যদিকে…
বিরাজ বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে। চোখ বন্ধ করলেই সেই “আগুন সুন্দরী”র মুখটা ভেসে উঠছে। আর থাকতে না পেরে ধড়ফড় করে উঠে বসলো। ফোনটা হাতে নিয়ে জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো। জানালা খুলতেই বাইরের ঠান্ডা বাতাস এসে লাগলো মুখে।
নাম্বারটা কল করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটা মিষ্টি কিন্তু ঝাঁঝালো গলা,
“হ্যালো, কে আপনি?”
বিরাজ ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে বলল, “আপনি যে আমার গাড়িতে ধাক্কা খেয়েছিলেন, আমি সেই।”
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ।
“ওহ! ফোকরা মশাই যে! চিনতে পেরেছি।”
বিরাজ কপাল কুঁচকালো। “কে ফোকরা মশাই, হ্যাঁ?”
“কেন, আপনি!” কলির গলায় দুষ্টুমি, “গাড়ি চালাতে পারেন না, আবার ফোকরা মশাই না তো কি?”
বলে খিলখিল করে হেসে উঠলো মেয়েটা। বিরাজ চুপ করে তার হাসিটা শুনলো। তারপর নিচু গলায় বলল,
“আগুন সুন্দরী… আপনার হাসিটা কিন্তু জোস।”
“সুন্দরী বলছেন ঠিক আছে। কিন্তু এর আগে ‘আগুন’ জুড়ে দিলেন কেন?” কলি ভ্রু কুঁচকালো ওপাশ থেকে।
“কারণ আপনি আগুনের মতো উ*ত্ত*প্ত সুন্দর। তাই আগুন সুন্দরী।” বিরাজের গলা গম্ভীর, কিন্তু চোখে দুষ্টু হাসি।
কলি নাক কুঁচকালো, “ও তাই? তো তাড়াতাড়ি টাকাটা পাঠিয়ে দেন তো। না হলে কিন্তু আগুন সুন্দরীর আ*গুনে পুড়ে ছা*ই হয়ে যাবেন।”
বিরাজ জানালার গ্রিলে আঙুল ঘষতে ঘষতে বলল, “আমি আ*গুনে বারবার পু*ড়তে রাজি… যদি সেই আ*গু*নটা তুমি হও।”
“মানে? ঠিক বুঝলাম না।” কলি থতমত খেলো।
“থাক, আপনাকে আর বুঝতে হবে না। তা কত টাকা দিতে হবে শুনি?” বিরাজ প্রসঙ্গ ঘোরালো।
“আপনি কত দিতে পারবেন?” কলি পাল্টা প্রশ্ন করলো।
“চাইলে কোটি টাকাও দিতে পারি।” বিরাজ গর্বের সাথে বলল।
ওপাশ থেকে খ্যাঁক করে হাসি, “আপনার কাছে থাকলে তো দেবেন! কোটি লাগবে না। বিশ হাজার টাকা দিলেই হবে।”
বিরাজ হেসে ফেললো, “মাত্র এই ক’টা টাকা? ঠিক আছে। পাঁচ মিনিট পর আবার কল দিচ্ছি।”
ফোন রাখার পাঁচ মিনিটের মাথায় বিরাজ টাকাটা পাঠিয়ে দিলো। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে রাখলো।
ঠিক দুই মিনিট পর ফোনটা কেঁপে উঠলো। আগুন সুন্দরী কল দিছে। বিরাজ বুঝতে পেরেই মুচকি হেসে কলটা রিসিভ করলো।
“হ্যাঁ, আগুন সুন্দরী… টাকাটা পেয়েছেন তো?”
ওপাশ থেকে কলির গলা ভেসে এলো। গলায় বিরক্তি আর অবাক হওয়া মিশে আছে।
“আসলেই আপনি একটা ফোকরা মশাই। না হলে অচেনা একটা মেয়েকে এতগুলো টাকা কেউ দেয়?”
বিরাজ জানালার গ্রিলে আঙুল টোকা দিতে দিতে বলল, “তা আগুন সুন্দরী… আপনার নামটা কি জানতে পারি?”
“কেন? নাম জেনে কি করবেন?” কলির গলায় সন্দেহ।
বিরাজের হাসিটা আরো গাঢ় হলো। গলা নামিয়ে বলল, “করবো তো অনেক কিছুই। আগে নামটা বলুন।”
কলি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “আমার নাম কলি।”
একটু থেমে আবার বলতে লাগলো,”আপনার এত টাকা আমি নিতে পারবো না।” কলির গলায় দৃঢ়তা। “টাকাটা আমি আবার পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি ভালো থাকবেন। বাই।”
টুট… টুট… টুট…
লাইনটা কেটে গেল। বিরাজ ফোনটা কানের কাছ থেকে নামিয়ে একদৃষ্টে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে।
কয়েক মিনিট পরেই ফোনে মেসেজের টুং শব্দ। বিরাজ স্ক্রিন অন করতেই দেখলো – তার একাউন্টে টাকাটা আবার ব্যাক এসেছে।
বিরাজ বিড়বিড় করে বলতে লাগলো,
“টাকা ফেরত দিলে কি হবে। তুমি যে আ*গুন জ্বা*লিয়ে দিলে… সেই আ*গুন নেভানোর দায়িত্ব তোমার নিতে হবে।”
আরিফ ল্যাপটপের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে বসে আছে। কিবোর্ডের টক টক শব্দে ঘরটা গুমগুম করছে। ঘড়ির কাঁটায় রাত এগারোটা ছুঁই ছুঁই।
নীলাঞ্জনা সোফার কোণে বসে বসে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আপনি এবার ল্যাপটপটা বন্ধ করুন তো। আর কত কাজ করবেন? সেই কখন থেকে ল্যাপটপে মুখ গুঁজে বসে আছেন।”
“আরে আর একটু। কাজটা শেষ হয়ে গেলেই উঠছি।”
নীলাঞ্জনা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো। আরিফ এখনো টাইপ করেই যাচ্ছে। রাগটা মাথায় চড়ে গেল তার। হুট করে উঠে গিয়ে আরিফের কাছ থেকে ল্যাপটপটা কেড়ে নিয়ে ধপ করে বন্ধ করে দিলো।
আরিফ ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“এটা কি করলে তুমি, হ্যাঁ? কাজটা তো এখনো শেষ হয়নি।”
নীলাঞ্জনা চোখ দুটো বড় বড় করে বলল, “সারাদিন অফিসে কাজ করেন, তারপর বাসায় এসেও ল্যাপটপ নিয়ে বসেন। এসব আমার একদম সহ্য হয় না।”
আরিফ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। নীলাঞ্জনার দিকে তাকালো।
“তো কি এখন? তোমার সাথে রো*মা*ন্স করতে হবে? তাহলে চলো, শুরু করি।”
নীলাঞ্জনা নাক কুঁচকালো। “ধ্যাত! আপনার কাছে তো শুধু এসব কথাবার্তা। বিরক্তিকর।”
“কেন? আমাকে ভালো লাগে না?” আরিফ উঠে দাঁড়ালো। নীলাঞ্জনার একদম কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “আমি কি তোমাকে তৃ**প্তি দিতে পারি না?”
নীলাঞ্জনা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিলো। “ধ্যাত! এসব কথাবার্তা রাখুন তো।”
একটু থেমে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “বাবার সাথে কথা বলতে হবে।”
“কি কথা?” আরিফ ভ্রু তুললো।
“সিয়াম আর শাপলাকে যেন মেনে নেয়।”
“কিন্তু আমার কথা কি মানবে?”
“আগে বলেই দেখুন।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। কাল অফিসে গিয়ে বাবার সাথে কথা বলবো।”
একটু চুপ করে থেকে আবার বলল, “বাবা মা মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি বাইরের দেশে চলে যাবে।”
নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে তাকালো। “কেন যাবে?”
“আমাদের বিজনেস ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তাই বাবা মা বিদেশে সেটেল হবে। এখানকার সব দায়িত্ব আমাদের সামলাতে হবে।”
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়লো। আরিফ আবার বলল, “আমি একটা সিদ্ধান্ত নিতে চাই। তুমি রাজি হলে…”
“কি সিদ্ধান্ত?”
“আলোকে বাবা মায়ের সাথে পাঠিয়ে দিলে কেমন হয়? বিদেশে গিয়ে উন্নত পড়াশোনা করবে মেয়েটা।”
নীলাঞ্জনার মুখে হাসি ফুটলো। “হ্যাঁ, এটা তো ভালোই হবে।”
একটু থেমে হাই তুলে বলল, “আচ্ছা এখন এসব কথাবার্তা রাখুন। ঘুমাতে হবে।”
কথা শেষ হতেই দুজনেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো।
পরের দিন সকাল।
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক দশটা। সিয়ামের মনটা অন্ধকার। শাপলা যেখানে যেখানে যেতে পারে ঠিক সেখানে সেখানে খুঁজছে। কোথাও নেই মেয়েটা।
শেষ ভরসা হিসেবে সিয়াম এসে দাঁড়ালো শাপলার বান্ধবী দীপার বাড়ির সামনে। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। কাঁপা হাতে কলিং বেলে আঙুল রাখলো।
টিং টং… টিং টং…
কয়েক সেকেন্ড পর দরজাটা খুলে গেল। দীপা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে তাকালো।
“একি! আপনি এখানে, সিয়াম ভাই?”
সিয়ামের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তবুও নিজেকে সামলে জিজ্ঞেস করলো,
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৩৬
“শাপলা… ও কি এখানে এসেছিল, দীপা?”
দীপা মাথা নিচু করে ফেললো।
“হ্যাঁ, এতদিন তো আমার কাছেই ছিল। কিন্তু আজকে সকাল ৮ টা বাজে ওর চাচার বাড়িতে চলে গেছে।”
সিয়াম কিছু না বলেই সে পেছন ঘুরে হাঁটা ধরলো। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“চাচা বাড়ি…”
দীপা দরজার দিকে তাকিয়ে ডাকতে ডাকল, “সিয়াম ভাই, শুন…” কিন্তু সিয়াম আর পেছন ফিরে তাকালো না। তার ছায়াটা ধীরে ধীরে রোদের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
