রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৫
মহাসিন
রাত ১০টা বাজে। বাড়ির সবাই রাতের খাবার শেষ করে যে যার রুমে চলে গেছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। শুধু বাইরে থেকে মাঝে মাঝে ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে। আর রাতের প্রকৃতি তার মৃদু হাওয়া চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ঘরের ভেতর, বিছানার ঠিক মাঝখানে একটা কোলবালিশ। যেন ছোট্ট একটা পাঁচিল। শিখা আর বির দুজন দুই পাশে শুয়ে আছে। এত কাছাকাছি যে একটু ফিরলেই দুজনে দুজনের মুখ দেখতে পাবে।ঘর জুড়ে হালকা হলুদ আলো।
শিখা চোখ মেলে বিরের দিকে তাকিয়ে আছে। এক দৃষ্টিতে। বুকের ভেতর অজানা একটা অস্থিরতা।
মনে মনে বলে,
“কেন আপনার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছি না? এত কেন দেখতে ইচ্ছে করছে? কেন আপনাকে এতো কাছে দেখলে হার্টবিট কয়েক গুণ বেড়ে যায়? তার মাকে কি আপনাকে ভালোবেসে ফেলছি? আপনাকে দেখার এই ইচ্ছা অন্য রকম অনুভুতি এটা কি ভালোবাসার লক্ষন?”
বির এখনো ঘুমায়নি শুধু ঘুমের ভান ধরে আছে।হঠাৎ বির চোখ দুটো খুলে ফেলল।
শিখা তড়িঘড়ি করে চোখ নামিয়ে নিল তার দিকে থেকে। বুক ধকধক করছে। স্বাস ঘন হয়ে আসতে।
এক অজানা অনুভূতি তাকে ঘিরে রেখেছে।
বির মুচকি হাসল। সে বেশ ভালো করে বুঝতে পারছে, শিখা তাকে এতোক্ষণ দেখছিলো।
বির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি নিয়ে বলল
“কী দেখছিলে অমন করে?”
শিখার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। কাঠগোলাপের মতো টকটকে।কি বলবে বুঝতে পারছে না। সে শুকনো ঢোঁক গিলে আমতা আমতা করে কোনো মতে বলল,
“না… কিছু দেখি নাই।”
“তুমি মিথ্যা বলছো। সত্যি করে বলো।”
“আরে সত্যি বলছি তো। আমি কিছু দেখি নাই।”
বির হেসে বলল,
“ঠিক আছে, বলতে হবে না।”
একটু থেমে, শিখার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“তুমি লজ্জা পেলে তোমাকে কিন্তু খুব সুন্দর লাগে।”
শিখা বিরের কথা শুনে আরো বেশি লজ্জা পেলো। তাই তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“ধ্যাত! কী সব বলছেন।”
“হুম, সত্যিই বলছি। তুমি যখন লজ্জা পাও তখন তোমার গোলু মোলু গাল দুটো লাল কাঠগোলাপের মতো বর্ণ ধারণ করে। তোমার দিক থেকে চোখ ফেরানো যায় না। ইচ্ছা করে তোমার ওই গালে
চু_ মু দেই।”
শিখা অবাক হয়ে বলল, “কিহ্?”
“কিছু না।” একটু থেমে আবার বলতে লাগলো,
” সত্যি তুমি লজ্জা পেলে তোমাকে এতো বেশি সুন্দর লাগে যে চোখ সরানো যায় না। তোমার এই সৌন্দর্যে যেকোনো পুরুষকে গায়েল হতে বাধ্য।”
শিখা ছোট করে বলল,
“তো আমার দিকে তাকাবেন না, তাহলেই তো হয়।”
বির একটু ঝুঁকে বলল,
“এত সুন্দর একটা মেয়ের দিকে না তাকিয়ে কীভাবে থাকব বলো?”
শিখা ফিসফিস করে বলল, “যেভাবে বলতেছেন মনে হয় আমি আপনার বউ।”
বির সোজা উত্তর দিল, “হুম, তুমি আমার বউ।”
শিখা চমকে উঠল, “কিহ্!”
বির আবার হাসল, “আরে না, মজা করলাম।”
শিখার চোখে ঘুম নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বিছানা থেকে উঠে গেল। বিরও উঠে গেল।
শিখা ধীর পায়ে জানালার কাছে চলে এলো। জানালা খুলতেই ঠান্ডা বাতাসের সাথে মুষলধারে বৃষ্টির শব্দ ঘরে ঢুকল। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
আর প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হচ্ছে।
বির নিঃশব্দে এসে শিখার পাশে দাঁড়াল। দুজনের মাঝে কয়েক ইঞ্চি দূরত্ব। বৃষ্টির ছাঁট এসে শিখার চুল ভিজিয়ে দিচ্ছে। শিখা এই বৃষ্টি উপভোগ করছে। বেশ ভালো লাগছে তার।কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।বির নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“বিছানা থেকে উঠে এলে যে?”
“ঘুম আসছে না, তাই।”
“তুমি তো আর তিন দিন পর চলে যাবে, তাই না?”
শিখার গলাটা কেঁপে উঠল।
“হুম। আমাদের ডিল অনুযায়ী আর তিন দিন পর চলে যেতে হবে। এটাই তো কথা ছিল।”
বির দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তুমি চলে গেলে তোমাকে অনেক মিস করব।”
শিখা অবাক হয়ে ফিরে তাকাল,
“আমাকে মিস করবেন কেন?”
“জানি না।” বির থেমে বলল,
“তুমি চিরদিনের জন্য থেকে যাবে?”
শিখা ম্লান হাসল,
“আমি তো আপনার কেউ হই না। তাহলে কীভাবে থাকব বলুন?”
বিরের মুখটা কেমন নিভে গেল।
“হ্যাঁ… তাই তো। তুমি তো আমার কেউ হও না। তাহলে থাকবে কীভাবে।”
একটু থেমে আচমকা জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, তুমি কি কারো সাথে রিলেশনে আছো?”
“না। হঠাৎ এমন প্রশ্ন?”
বির চোখ নামিয়ে নিল,
“ইচ্ছে হলো, তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
বাইরে বৃষ্টির বেগ আরও বাড়ল। আর ঘরের ভেতর দুজনের মাঝের নীরবতাটা আরও গাঢ় হলো।
বির নিঃশব্দে এসে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়ল। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠছে। সে বুঝে গেছে, অজান্তেই সে শিখাকে ভালোবেসে ফেলেছে। আর মাত্র কয়েকটা দিন পরেই শিখা চলে যাবে এই ভাবনাটাই তাকে কুঁ’ড়ে কুঁ’ড়ে খা’চ্ছে।
সময় গড়িয়ে অবশেষে সেই দিনটা এসে গেল।
যেদিন শিখা এই বাড়ি থেকে বিদায় নেবে।বাতাসটাও যেন ভারী হয়ে আছে।শিখা ধীর পায়ে বিরের সামনে এসে দাঁড়াল। চোখে পানি টলমল করছে, কিন্তু ঠোঁটে জোর করে ফুটিয়ে তোলা হাসি। সে কাঁপা গলায় বলল,
“সময় হয়ে গেছে। এবার শেষ ঝগড়াটা শুরু করুন।”
বির অসহায়ের মতো তাকালো শিখার দিকে। কিছুক্ষণ শিখার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কীভাবে শুরু করব?”
“জানি না। কোনো একটা বিষয় নিয়ে শুরু করুন।”
বির মাথা নিচু করে ফেলল, “তুমিই শুরু করো।”
শিখা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। কান্না আটকাতে গিয়ে গ’লাটা ভে’ঙে যাচ্ছে।
“আমি আপনার সাথে সংসার করতে চাই না! আমার আর আপনাকে ভা’লো লাগে না! আমি থাকবো না আপনার সাথে! চলে যাবো!”
“হ্যাঁ, চলে যাও। তোমার মতো মেয়েকে আমার বউ হি”সেবে চাই না। চলে যাও।”
ওদের চিৎকার শুনে সবাই ছুটে এলো।
নজির সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন,
“কী হয়েছে? এভাবে চিৎকার করছো কেন?”
শিখা চোখের পানি মুছে বলল,
“আপনার ছেলের সাথে সংসার করা আমার পক্ষে সম্ভব না। তাই চলে যাচ্ছি।”
নজির সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছো?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আর বাঁধা দিবো না। তোমাদের জীবন, যা ইচ্ছা করো।”
এই বলে সবাই নীরবে চলে গেল।
ঘরটা ফাঁকা। শুধু শিখার হাতে একটা লাগেজ।
সে কয়েক পা এগোল। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠছে। পা দুটো আর চলছে না। প্রতিটা পদক্ষেপে মনে হচ্ছে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
পেছন থেকে বিরের গলা ভেসে এলো, কাঁপা কাঁপা।
“সত্যি চলে যাচ্ছো?”
শিখা পেছন ফিরল না। শুধু ফিসফিস করে বলল, “হুঁ।”
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর বির আমতা আমতা করে বলল,
“আমি… আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই।”
শিখা চোখ বন্ধ করে বলল, “বলেন।”
বিরের গলার স্বর কেঁপে উঠল।
“আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি শিখা। তোমাকে আমার বউ বানাতে চাই। সত্যি কারের বউ। যেখানে থাকবে কোনো নাটকীয়তা।”
কথাটা কানে যেতেই শিখার পৃথিবীটা থমকে গেল।
হাত থেকে লাগেজটা ধপ করে পড়ে গেল।
আর এক মুহূর্তও নিজেকে ধ’ রে রাখতে পারল না।
শিখা দৌড়ে এসে বিরকে শক্ত করে জ’ ড়ি’ য়ে ধরল। কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“আমিও আপনাকে ভালোবাসি! খুব বেশি ভালোবাসি! আপনাকে ছাড়া থাকতে পারব না!”
এই কয়েকটা দিন…
মাত্র পনেরোটা দিন। অথচ এই পনেরো দিনেই শিখা বিরের সাথে থাকতে থাকতে কখন যে তার প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে মি’ শে গেছে, নিজেও বুঝতে পারেনি। বিরও একইভাবে। প্রতিটা সকালের চা, প্রতিটা রাতের নীরবতা, প্রতিটা নাটকীয় ঝগড়া আর প্রতিটা অভিমানের মাঝে অজান্তেই শিখার মায়ায় তলিয়ে গেছে। এতটাই গভীরে… যে এখন আর ফিরে আসার রাস্তা নেই তার কাছে।
আর সেই মায়া থেকেই জন্ম নিয়েছে ভালোবাসা।
ভালোবাসা! এই একটা শব্দের যে কত শক্তি!
এটা দরজা নক করে আসে না। অনুমতি চায় না। হুট করে একদিন, নিঃশব্দে এসে মানুষের গোছানো, শান্ত হৃদয়টাকে তছনছ করে দেয়। রাতের পর রাত ঘুম কেড়ে নেয়। বুকের ভেতর দলা পাকানো কষ্ট জমিয়ে দেয়। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় তখন।
শিখা আর বিরের সাথেও ঠিক এমনটাই হলো।
একটা সময় ছিল… যখন দু’জন দু’জনের মুখও দেখেনি। নামটাও জানত না। দুটো সম্পূর্ণ অচেনা, অজানা মানুষ।
এই পনেরো দিনের নাটকীয় ঝগড়া, অভিমান, চুপ করে থাকা, আর ছোট ছোট খুনসুটির মাঝে… মায়া থেকে, অভ্যাস থেকে… দু’জন এমন ভয়ংকর ভালোবাসায় জড়িয়ে গেছে।
এমন ভালোবাসা যেখানে আমি চলে যাচ্ছি বললেই কষ্ট হয়।
যেখানে অন্য মানুষটার চোখে এক ফোঁটা পানি দেখলে নিজের বুকের ভেতর ঝড় ওঠে।
ভালোবাসা বোধহয় এমনি হয়…
নীরবে আসে, পায়ের শব্দ হয় না।
কিন্তু যাওয়ার সময় পুরো পৃথিবীটা অন্ধকার করে দিয়ে যায়।
আচমকা শিখা বিরকে ছেড়ে দিলো।
দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল… শাপলা দাঁড়িয়ে আছে।
শাপলা গম্ভীর মুখে বলল,
“চল আপু। আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।”
শিখা চুপ। ওর বুকের ভেতর ঝড় বইছে। পা দুটো যেন মেঝের সাথে আটকে গেছে।
শাপলা আবার বলল, কণ্ঠে বিরক্তি।
“কি হলো? চল। আর এখানে থাকা যাবে না।”
শিখা ধীরে মাথা তুলল। চোখে পানি।
“হ্যাঁ… তবে তুই যা। আমি যেতে পারব না।”
শাপলা ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“মানে? বুঝলাম না। কি সব কথা বলছিস? মাথা ঠিক আছে তোর?”
শিখা কাঁপা গলায় বলল,
“ঠিকই বলছি। আমি যেতে পারব না।”
“কেন যেতে পারবি না?”
শিখা একবার বিরের দিকে তাকাল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“কারণ… আমি বিরকে ভালোবেসে ফেলেছি।”
কথাটা শুনে শাপলা পাথরের মতো জ’মে গেল।
ওর পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে মনে হলো।
এতদিন শিখাকে সঙ্গ দিয়েছে, সাহায্য করেছে… সব ভুল ছিল? শাপলার গলা ধরে এলো,
“না আপু। তুই এমনটা করতে পারিস না।”
শিখার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
“আমি যে এমনটাই করেই ফেলেছি। না চাইতেও করে ফেলেছি।”
শাপলা বিরের দিকে তাকাল।
“আপনি… আপনি কি আপুকে ভালোবাসেন?”
বির এক পা এগিয়ে এলো। গলা কাঁপছে, তবুও দৃঢ় গলায় বলল,
“হ্যাঁ। আমিও শিখাকে ভালোবাসি।”
ব্যস। শাপলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ধুপ করে মেঝেতে বসে পড়ল।
ওর মাথার ভেতর শুধু একটাই চিন্তা…
“মা বাবা যদি জানতে পারে? যদি জানতে পারে আমি এসবের মধ্যে ছিলাম? তাহলে কি হবে?”
শিখা কাঁদতে কাঁদতে শাপলাকে টেনে তুলতে এলো। শাপলা ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“না! একদম ছুঁ’বি না আমাকে! প্রথমে কি বলেছিলি আর এখন কি করছিস? তোর কথা শোনা আমার একদম উচিত হয়নি!”
শিখা অসহায়ের মতো বলল,
“আমি কি করব বল? ভালোবাসা কি এত হিসাব মানে রে? তুই যেদিন কাউকে ভালোবাসবি, সেদিন বুঝবি।”
শাপলা উঠে দাঁড়াল। চোখ লাল।
“আমার বোঝার দরকার নেই। এখনো সময় আছে। চল আমার সাথে। এই পাগলামি করিস না। এতদিন যা ছিল সব নাটক ছিল। লোভে পড়িস না।”
শিখা মাথা নাড়ল। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে।
“না চাইতেও যে ভালোবাসার লোভে পড়ে গেছি রে।”
শাপলা শিখার হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
“চল। এক মুহূর্তও না। মা যদি জানতে পারে অনেক কষ্ট পাবে।”
শিখা হাত ছাড়িয়ে নিলো।
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৪
“তুই যা। আমি সময় মতো যাব। বিয়ে করে যাব। কারণ আমি জানি, মা কোনোদিন এটা মেনে নেবে না।”
শাপলার বুক ফেটে কান্না আসছে।
“তুই আমার বড় হয়ে বেঁচে গেলি। নাহলে এখনি গালে চ_ড় মা_রতাম।মা বাবার চোখে তুই শুধু নিজে খারাপ হবি না, আমাকেও খারাপ বানাবি।”
এই বলেই শাপলা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
