রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৮
মহাসিন
সিরাজ ক্লান্ত গলায় বলল,
“আর এভাবে থাকতে ভালো লাগছে না। আমার হাত পায়ের বাঁধন খুলে দাও।”
দীপা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“আমার তো খেয়ে দেয়ে কাজ নেই না?”
সিরাজ অনুনয় করে বলল,
“প্লিজ দীপা। আমার হাত পায়ের বাঁধন খুলে দাও। কথা দিচ্ছি আমি পালাবো না। সত্যি প্রমিস।”
দীপা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সিরাজের দিকে তেড়ে এলো।
“এই, আপনি চুপ করুন তো! আর একটা কথা বললে আপনার মুখ বেঁধে রাখব। এখন যে কথা বলতে পারছেন, তাও পারবেন না।”
সিরাজ আবার বলল, “ছেড়ে দাও। সত্যি আমি পালাবো না।”
কথা শেষ হতেই দীপা রাগে সিরাজের গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল। তারপর এক টুকরো কাপড় দিয়ে শক্ত করে ওর মুখটা বেঁধে দিয়ে দূরে এসে বসে পড়ল।
সিরাজ একদৃষ্টিতে দীপার দিকে তাকিয়ে আছে।
দীপার আর ভালো লাগছে না। মেয়েটা ভীষণ ক্লান্ত। বুকের ভেতর কষ্টের পাহাড় জমে আছে। হঠাৎ দীপা চিৎকার করে কেঁদে উঠল। চোখ বেয়ে শ্রাবণ মেঘের মতো অশ্রুধারা নামতে লাগল।
আর সিরাজ? সে শুধু চুপচাপ তাকিয়ে আছে। বাঁধা মুখে কিছু বলতে পারছে না।
দীপা আর পারল না।
ধীর পায়ে সিরাজের কাছে এসে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। গলার সবটুকু শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলল,
“যা যা জানেন সব বলে দেন প্লিজ! আর এসব ভালো লাগছে না। আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে… সব কিছু!”
কথা বলতে বলতে ওর চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সিরাজের সামনে বসেই দুই হাতে মুখ ঢাকল। হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হলো।
দীপা চমকে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত চোখের পানি মুছে নিয়ে ধীর পায়ে দরজার কাছে এলো। দরজা খুলতেই দেখল ঐশী দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা খাবারের ব্যাগ।
ব্যাগটা দীপার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঐশী জিজ্ঞেস করল, “কিছু কি জানতে পারলি?”
দীপা মাথা নিচু করে বলল, “না। কিছু জানতে পারি নাই।”
ঐশী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আচ্ছা, আসি তাহলে। নিজের খেয়াল রাখিস।”
“এখুনি চলে যাবি?” দীপা মলিন গলায় বলল।
“হ্যাঁ।” বলে ঐশী আর দাঁড়াল না, চলে গেল।
দীপা দরজা আটকে দিল। কয়েক সেকেন্ড ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে আবার সিরাজের কাছে ফিরে এলো। একটা চেয়ার টেনে ওর সামনে বসল।
ব্যাগ থেকে খাবারের বাটি বের করল। তারপর কাঁপা হাতে সিরাজের মুখের বাঁধনটা খুলে দিল।
সিরাজ কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
দীপা এক লোকমা ভাত তুলে ওর মুখের কাছে ধরল। সিরাজ খেতে লাগল। কিন্তু ওর চোখ? ওর চোখ এক মুহূর্তের জন্যও দীপার মুখ থেকে সরছে না।
দীপার অস্বস্তি হতে লাগল। সে বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই, আপনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
সিরাজ খাবার চিবোতে চিবোতে শান্ত গলায় বলল, “তোমাকে দেখছি।”
দীপা ফোঁস করে বলল, “কেন? আমার কি রূপ বেয়ে বেয়ে পড়ে?”
সিরাজ মৃদু হেসে বলল,
“এত সুন্দর একটা মেয়ে সামনে থাকলে… না তাকিয়ে থাকা যায়?”
দীপা আর কিছু বলতে পারল না। শুধু বাটির দিকে তাকিয়ে আবার এক লোকমা ভাত তুলে দিল।
দীপা কোনোমতে তাড়াহুড়ো করে সিরাজকে খাবার খাইয়ে দিয়ে সরে গেল।
সিরাজের একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকাটা ওর বুকের ভেতর কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করছিল। অস্বস্তি, রাগ, আর অজানা ভয় সব মিশে যাচ্ছিল।
সিরাজ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“কি হলো? এমন তো নয় যে তুমি আমার প্রেমে পড়ে গেলে?”
দীপা চোখ রাঙিয়ে তাকাল। রাগে ওর গলা কেঁপে উঠল।
“আপনার মতো নোংরা মানুষের প্রেমে আমি কখনো পড়ব না।”
সিরাজ হেসে মাথা নাড়ল।
“তুমি মিথ্যা বলছো। তোমার চোখ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এতদিন আমার সাথে থেকে থেকে তুমি আমার প্রেমেই পড়ে গেছো। আর পড়বে নাই বা কেন? আমি কি কম হ্যান্ডসাম নাকি?”
“এসব আজেবাজে কথা বলা বন্ধ করুন!” দীপা দাঁতে দাঁত চেপে বলল। “আর না হলে আবার আপনার মুখ বেঁধে দেব।”
সিরাজ একটুও দমল না। বরং আরও গলা উঁচিয়ে বলল,
“আমি কিন্তু তোমার প্রেমে পড়ে গেছি দীপা। যাকে বলে একদম উষ্টা খেয়ে প্রেমে পড়া।”
“উফ্! আপনি চুপ করুন তো!” দীপা কান চেপে ধরল। “আপনার কথা-বার্তা আর সহ্য হচ্ছে না।”
কিন্তু সিরাজ থামল না। সে সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আই লাভ ইউ দীপা! আই লাভ ইউ! রিয়েলি রিয়েলি লাভ ইউ!”
পরের মুহূর্তেই দীপা ছুটে এসে আবার সিরাজের মুখটা শক্ত করে বেঁধে দিল।
ঘৃণা আর কষ্ট মিশিয়ে বলল,
“আপনার মতো নোংরা মানুষকে ভালোবাসার চেয়ে সারাজীবন সঙ্গীহীন থাকা অনেক ভালো। আপনার মতো জঘন্য মানুষ কখনো কাউকে ভালোবাসতে পারে না।”
কথাগুলো বলে সে গিয়ে বিছানায় বসে পড়ল।
সিরাজ শুধু করুণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। বাঁধা মুখ, কিন্তু চোখ দুটোয় হাজারটা কথা।
দীপা মনে ভাবতে লাগল, _এই লোকটা কি সত্যি সত্যি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে? নাকি এটা তার কোনো চাল? এখান থেকে পালানোর নতুন ফাঁদ?_
কিছুক্ষণ পর দীপা বিছানা থেকে উঠল। ধীরে ধীরে এসে সিরাজের পায়ে লোহার শিকল বেঁধে দিল। তারপর ওর মুখের বাঁধন খুলে দিল। চেয়ারের সাথের বাঁধনও খুলে দিল, শুধু হাত দুটো বাঁধা রইল।
সিরাজের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“এবার শুয়ে পড়ুন।”
এই বলে দীপা নিজে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
আর সিরাজ? সে নিঃশব্দে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। ঘরের বাতিটা মৃদু আলো দিচ্ছে। দুইজন দুই প্রান্তে, মাঝখানে শুধু নীরবতা আর অজস্র অপ্রশ্নের দেয়াল।
পরের দিন সকাল। সকালের রোদ জানালা গলে ঘরে ঢুকছে। সিয়াম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই ঠিক করছে। অফিসে যাওয়ার তাড়া।
হঠাৎ শাপলা পেছন থেকে এসে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, আপনাদের না অনাথ আশ্রম আছে?”
“হ্যাঁ, আছে তো। তবে ওসব দেখাশোনার দায়িত্ব বাবার বন্ধুর উপর। আমাদের কখনো ওইসবের দায়িত্ব দেয়নি।”
“কেন দেয়নি?”
“জানি না।”
শাপলা আরেকটু কাছে এসে বলল, “ওই জায়গায় তো অনাথ মেয়েদের জন্য অনেক সুযোগ সুবিধা আছে, তাই না?”
“হ্যাঁ। ওদের পড়াশোনা করানো হয়। আশ্রমেই অনেক কিছু তৈরি করে ওরা। হাতের কাজ, নকশী কাঁথা, জামা কাপড়… সেগুলো বিদেশে বিক্রি হয়।”
শাপলা কৌতূহলী গলায় বলল, “টাকাগুলো কি করে? ওদেরকেই দিয়ে দেওয়া হয়?”
সিয়াম হেসে বলল, “আমি যতটুকু জানি, হ্যাঁ। ওদের একাউন্টেই জমা হয়। তা হঠাৎ এসব কেন জিজ্ঞেস করছিস?”
শাপলা আমতা আমতা করে বলল, “না… এমনি। হঠাৎ মনে হলো তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
“আচ্ছা, আমি তাহলে অফিসে যাই।”
এই বলে বেরিয়ে গেল।
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
শাপলা একা একা দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতে লাগল,
“যেভাবেই হোক… আমাকে ওই অনাথ আশ্রমে যেতেই হবে।”
কথাটা বলেই সে ধীর পায়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলো।
সোফায় কলি, কবিতা আর নীলাঞ্জনা বসে টিভি দেখছে।
শাপলা কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা নীলাঞ্জনার পাশে ধুপ করে বসে পড়ল।
শাপলা হঠাৎ উৎসাহে বলে উঠল, “ভাবী, চলুন না সবাই মিলে বাইরে ঘুরতে যাই।”
নীলাঞ্জনা একটু অবাক হয়ে তাকালো।
“কিন্তু গাড়ি চালাবে কে?”
পাশ থেকে কবিতা তীক্ষ্ণ চোখে শাপলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিরে শাপলা, হঠাৎ সবাইকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার শখ হলো কেন? তোর মতলবটা কী বল তো?”
শাপলা হাসতে হাসতে বলল,
“আরে মতলব টতলব কিছু না। মন চাইল, তাই বললাম। এত সন্দেহ কেন?”
নীলাঞ্জনা আবার বলল, “ঘুরতে যাব তো যাব, কিন্তু গাড়ি চালাবে কে?”
কলি মাঝখান থেকে বলে উঠল, “পলাশ ভাই তো একদিন বলেছিল সে গাড়ি চালাতে পারে। তাকেই নিয়ে যাই চলেন।”
শাপলা খুশিতে বলল, “তাহলে তো হয়েই গেল।”
কবিতা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল, “তা কোথায় যাবি ঠিক করেছিস?”
শাপলা একটু থেমে বলল, “ অনাথ আশ্রমে। ওখানে গিয়ে ঘুরে আসলে ভালো লাগবে। আমি তো কখনো যাইনি।”
কলি অবাক হয়ে বলল, “কোন অনাথ আশ্রম?”
কবিতা হেসে বলল, “আছে তো। আমি একবার গিয়েছিলাম, তবে ভিতরে যাই নাই।”
একটু থেমে কবিতা শাপলাকে খোঁচা দিয়ে বলল, “শাপলার বাবা তো আমাদের ফ্যাক্টরির দারোয়ান ছিলেন। ওই ফ্যাক্টরিতেই অনাথ আশ্রমের মানুষের জন্য খাবার রান্না হয়।”
সবাই মিলে ঠিক হয়ে গেল। তারা বেরিয়ে পড়ল। পলাশ গাড়ি চালাচ্ছে। গাড়ির ভিতরে হালকা হাওয়া, সবার মধ্যে একটা উৎসাহের আমেজ। কিন্তু পলাশ বারবার রিয়ার ভিউ মিরর দিয়ে কবিতার দিকে তাকাচ্ছে।
কবিতা খেয়াল করল। চোখ রাঙিয়ে বলল, “এই পলাশ, তোর সমস্যা কী? ওভাবে তাকাচ্ছিস কেন?”
নীলাঞ্জনা ধমক দিয়ে বলল, “উফ, চুপ করো তো কবিতা।”
কবিতা আবার বলল, “না ভাবী, ও সত্যি সত্যি আমার দিকে তাকাচ্ছে।”
শাপলা হেসে বলল, “কই তাকাচ্ছে? সে তো গাড়ি চালাচ্ছে। আপনার মুখ সবসময় কী চুলকায় বলুন তো? সারাক্ষণ কারো না কারো পিছনে লেগে থাকেন।”
কিছুক্ষণ পর তারা অনাথ আশ্রমে এসে পরলো। সায়েক আহমেদের বন্ধু জাবেদ আলী তাদের স্বাগত জানিয়ে ভিতরে নিয়ে এলেন। সে তাদের চারপাশ ঘুরিয়ে দেখাতে লাগল। ছোট ছোট শিশুদের খেলার মাঠ, ডরমিটরি। নরম আলোয় জায়গাটা শান্ত ও মায়াময় দেখাচ্ছে।
ঘুরে দেখার পর সবাই একটা বড় ঘরে বসল। তাদের জন্য নাস্তা আনা হলো, গরম গরম সিঙ্গারা, চা আর মিষ্টি। সবাই খেতে খেতে গল্প করছে। হঠাৎ শাপলা নীলাঞ্জনার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
“ভাবী, আমি একটু আসছি।”
এই বলে সে চুপিচুপি বেরিয়ে এলো। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলো। এখানে ১০ থেকে ১৬ বছরের মেয়েরা থাকে। শাপলা এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে লাগলো। তারপর তিনতলা, চারতলা… কিন্তু কোথাও ১৭ থেকে ২৩ বছর বয়সী মেয়েদের দেখা পেল না। শুধু ছোট মেয়ে আর ২৫-৪০ বছরের বড়রা। শাপলা সবাইকে তাদের বয়স জিজ্ঞেস করতে লাগল। কেউ কেউ উত্তর দিল, কেউ চুপ করে রইল।
শাপলার ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। এখানকার মেয়েদের মধ্যে খুব কমই সুন্দরী। অধিকাংশের মুখে কালো দাগ, রোদে পোড়া চামড়া।
হঠাৎ একটা ব্যালকনিতে একটা মেয়েকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল শাপলা। সে ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এলো।
“তোমার নাম কী?” শাপলা জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটি মৃদু গলায় বলল, “প্রেমা।”
“নামটা খুব সুন্দর। তুমি এখানে কীভাবে এলে?”
প্রেমা দূরের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার মনে নেই। এখানকার দিদিরা বলে, আমাকে নাকি হাসপাতাল থেকে পেয়েছে। আমার কেউ নেই।”
শাপলা জিজ্ঞেস করল, “এখানে বড় সুন্দরী মেয়ে কেন দেখছি না?”
প্রেমা হালকা হেসে বলল, “আছে তো। তারা ১২তলায় থাকে। অনেকে এখান থেকে চলে যায়ও।”
“তুমি যাবে না?”
“জানি না।”
“পড়াশোনা করো?”
“করি। আমাদের স্কুল আছে। কেউ করে, কেউ করে না।”
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৭
শাপলা আর কথা বাড়াল না। সে চুপচাপ নীচে নেমে নীলাঞ্জনার কাছে ফিরে এলো। তার মনে কী যেন একটা অস্বস্তি, একটা অদ্ভুত কৌতূহল ঘুরপাক খাচ্ছে। অনাথ আশ্রমের এই নীরব দেওয়ালগুলো যেন অনেক অজানা গল্প লুকিয়ে রেখেছে।
বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে সবাই চুপচাপ। শুধু শাপলার চোখে একটা অদ্ভুত দ্যুতি।
