রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২২
সোহানা ইসলাম
আরমান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবারো মোবাইলটা হাতে তুলে নিলো।
দশটা পনেরো।সন্ধা থেকে সে একটানা জারাকে কল করে যাচ্ছে। কখনো রিং হয়, কখনো ব্যস্ত টোন… কখনো আবার কেটে দেয়।প্রতিবার কল কাটার পর তার বুকটা হালকা কেঁপে উঠে, যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল তার আর জারার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে।তবুও কল করেই যাচ্ছে সে।অভিমান কি এমন কঠিন হয়?
আবার ফোন করলে সাথে সাথে রিসিভ হয়।
” হ্যালো হাফ ইঞ্চি মেয়ে …”
কিন্তু কোনো কথা নেই।
“জারা, প্লিজ কথা বলো… আমি জানি আমি দেরি করেছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস করো, এটা ইচ্ছে করে হয়নি। আমি আজ সারাদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম। আমি তোমায় সেই সন্ধা থেকে ফোন করছি তুমি ধরছো না কেনো? আমার রাগ হচ্ছিল, আবার ভয়ও করছিল খুব।”
আরমান আবার বললো, ” সরি হাফ ইঞ্চি মেয়ে। অনেক অনেকগুলো সরি তোমায়। এমন টা আর হবে না সত্যি বলছি।
জারা কিছু বলছে না শুধু মোবাইল কানে ধরে আছে। লোকটা তাকে এভাবে কৈফিয়ত দিবে, সরি বলবে, এতোগুলো কল,মেসেজ করবে তা সে আশা করে নি। সে লোকটার পরিচিত বা আপন কেউ না তাহলে সে ফোন না ধরায় এমন অস্থির হচ্ছে কেনো?
” তুমি চুপ করে থাকলে আমি কিভাবে বুঝব তুমি আমার উপর কতো টা অভিমান করেছ ?”
এইবার হালকা একটা নিশ্বাস ফেলে। সে কী সত্যি আরমানের উপর অভিমান করছে। কিন্তু তার তো অভিমান করা সোভা পায় না। আরমান কথা মতো আসেনি বলে তো তার কষ্ট পাওয়ার কথা না। তার সাথে তো লোকটার কোনো সম্পর্ক নেই। লোকটার একবার বলা কথায় সে কেন দাড়াতে গেল? সে চাইলে নাও দাঁড়াতে পারতো। আর এতোক্ষণ ওর কল বা মেসেজ এর উত্তর না করে রেগে থাকার মানে কী সে আরমান এর উপর অভিমান করা? ”
“তুমি আমার উপর খুব রাগ করে আছো, তাই না?”
আরমান তপ্ত নিশ্বাস ফেলে আবারও বলে,” সরি বলছি তো আমি, তাহলে কথা বলছো না কেন হাফ ইঞ্চি মেয়ে? ”
জারা’র কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রাগ উঠে যায় আরমানের। দাঁতে দাঁত খিঁচে ধমক দিয়ে বলে —
” কথা বলছিস না কেনো বা* ”
হঠাৎ করেই জারা ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। সে কেন কাঁদছে তা সে নিজেও যানে না। কিন্তু আরমান না আসায় সে কষ্ট পেয়েছে। জারা নাক টানতে টানতে অভিমানী কন্ঠে বলে –“আপনি কেনো আসেন নি ? আমি কি নিজে বলছি আপনার সাথে কথা আছে, নাকি আপনি বলেছিলেন।আমি তো ইচ্ছে করে দাঁড়াতে চাই নি। জানেন আমি কতোটা সময় ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। রাস্তার মানুষজন আমার দিকে কী ভাবে তাকিয়ে ছিলো?”
কথা বলতে বলতে তার গলা কেঁপে উঠছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে যাচ্ছে।তারপর ও সে তার কথা না থামিয়ে বলতে থাকে –” আপনি জানেন, আমি আপনার কথা রাখতে শুধু অপেক্ষা করছি।ভেবেছিলা আমি না দাঁড়ালে আপনি কষ্ট পাবেন। ভেবেছিলাম কোনো জরুরি কথা বলবেন আপনি। আপনি আমার সাথে কথা বলবেন বলে আমাকে দাঁড়াতে বললেন , কিন্তু আপনি আর এলেন না। নিজে দোষ করে এখন আমাকে ধমকাচ্ছেন কেন,শয়তান লোক? ”
আরমান স্তব্ধ। সে কখনো ভাবতে পারেনি তার না যাওয়া নিয়ে এতো টা কষ্ট পাবে, অভিমান করবে হাফ ইঞ্চি মেয়ে। জারার এমন অভিমানী অভিযোগ তার হৃদয়ে ভালো লাগার শিহরণ বয়ে যাচ্ছে। এই আনন্দ আরমানের মন চাচ্ছে একটা লুঙ্গি ডান্স দিতে। কি যে ভালো লাগছে তার।তার হাফ ইঞ্চি মেয়ে তার সাথে অভিমান করছে।তার সাথে রাগ দেখাচ্ছে। সে তো এটাই চায়। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে –” আমি কে? যার একবার বলা কথায় অপেক্ষা করবে? আমি কে, আমি না যাওয়ায় কষ্ট পাবে? অভিমান করবে? ”
আরমানের কথা শুনে চুপ হয়ে যায় জারা।শব্দটা বুকের মধ্যে কেঁপে কেঁপে বাজে…”আমি কে”
সত্যিই তো লোকটা কে? সে কিছু বলে না।কোনো কথা ছাড়াই কল টা কেটে দেয়। চোখের পলকে হালকা কাঁপন, ঠোঁট শক্ত করে বন্ধ করে রাখে।
আর মনের ভেতর তখন চলতে থাকে এক নীরব, গভীর, আবেগে ডুবে থাকা বাণী।
“আমি তো সত্যিই জানি না, এই মানুষটা কে।
তবু তার না আসায় বুকটা এত ভারী হয়ে গেল কেন?”জারা চোখ মেলে তাকায় জানালার বাইরে।চাঁদটা আজ যেন একটু বেশিই ফাঁকা ফাঁকা লাগে।একটুখানি দম নিয়ে আবার নিজেকে জিজ্ঞেস করে—” বলদ জারা তুই কেন কষ্ট পেয়েছিস, অভিমান কেনো করছিস তুই লোকটার উপর ? লোকটা না আসায় বেক্কল এর মতো কান্না করতে গেলি কেন? “আমি নিজেকেই বুঝতে পারছি না, আমি কষ্ট কেন পেলাম? ”
একটু চুপ করে নিজেকে প্রশ্ন করে—
“সে বলল, ‘আমি কে?’কিন্তু প্রশ্নটা তো আমার…’সে কে?’
হিসাব মেলাচ্ছে জারা। কিন্তু পারছে না গোলমেলে হয়ে যাচ্ছে। নিজেই নিজেকে হাজার টা গালি দিচ্ছে। রাগে চুল ছিঁড়তে মন চাচ্ছে তার।
রাগে দুঃখে, নাক মুখ ঢেকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পরলো।
সকাল আটটা। হালকা রোদের মধ্যে ধোঁয়ার কুয়াশা ছড়িয়ে আরমান ঘাট থেকে কিছুটা ধূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। তার চোখে ক্লান্তি, অথচ ঠোঁটে একরকম উদাস হেসে থাকা। এই সময়েই কলেজগামী তিন বান্ধবী — জারা, মিম আর ফিহা। কলেজের উদ্দেশ্যে ঘাটের দিকে যাচ্ছে। জারা চোখ পড়েছিল আরমানের দিকেই।
আরমান জারা’র জন্যই দাড়িয়ে আছে এখানে। জারা কে দেখে আরমান তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। আরমান লক্ষ করে জারা তার দিকে তাকিয়ে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়।
জারা আরমান কে দেখেও কিছুটা না দেখার ভঙ্গিতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফিহার হাত শক্ত করে চেপে ধরে নৌকায় উঠে যায়। বাকিরাও তার সাথেই তাল মিলিয়ে যায়।
আরমান নিঃশব্দে ধোঁয়া ছেড়ে একটু হেসে ফেলে। “বাপরে কি পরিমাণ রাগে আছে?লাইসেন্স পাওয়ার আগেই এমন রাগ দেখায়,লাইসেন্স পাওয়ার পর কী করবে এই হাফ ইঞ্চি মেয়ে ? ,” মনে মনে বলে সে।
দুপুর ১২ টা। জারাদের আরও দুইটা ক্লাস আছে তারপর ছুটি কলেজ। কিন্তু তিন বাটপার মিলে ক্লাস ফাকি দিয়ে কেন্টিনে বসে আছে। টেবিলে সিঙ্গারা, চপ, পেঁয়াজু, কোলা সাথে কথার ঝুরি নিয়ে আড্ডায় মেতেছে তারা । মিম সিঙ্গারা কামড় দিয়ে বলে–“এইটা বুঝি লাইফ! ক্লাস কামাই, ক্যান্টিনে সিঙ্গারা আর প্রেমের গরম খবর!”
জারা পেঁয়াজু মুখে পুরে বলে–“তুই না খালি খাইতেই আসিস! আগে ফিহার মুখের প্রেমের খবর শুন!”
” আরে ভালো কথা মনে করিয়েছিস তুই জানু। এই ছেমড়ি ক তাড়াতাড়ি কাল জাহেদ ভাইয়া তোকে কী বলেছিল?”
ফিহা আস্তে করে লাজুক হেসে বলে –“বলব কিন্তু হাসতে বা আমাকে নিয়ে মজা করবি না বল?”
মিম চোখ সরু করে, সিঙ্গারা নামিয়ে বলে–“আরে ক ছেড়ি? আমরা ভালা মানুষ, মজা নিতে পারি না !”
“হ যানি কত ভালা মানুষ তোরা।বদ বেডি মানুষ।ফিহা মুখে লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে বলে –“জাহেদ খান আমাকে প্রপোজ করছে কাল।”
ফিহার কথা শুনে মিম আর জারা কোলা গিলে ফেলতে গিয়ে কাশি উঠে যায়। কাশতে কাশতে মিম বলে
—“কি? জাহেদ ভাইয়া তোকে প্রপোজ করেছে? এটা হতে পারে না তুই মিথ্যা বলছিস ! যার সাথে কথা বলতে গেলেই তুই ঝগড়া করিস, সে তোকে প্রপোজ করবে ?”
” দেখলি তাহলে সেদিন রাতে কিছু একটা হয়েছে। সন্দেহ টা ঠিক ছিলো আমাদের? “বলল জারা।
” মিম এবার জারাকে চোখ টিপ দিয়ে বলে –” চুরকে সম্মানহীন থেকে বাঁচাতে গিয়ে ধপাস করে প্রেম হয়ে গেছে। বিষয় টা এমন হলো না “মানে, তুই যারে ঝাড় দিস গালি দিয়া, সে-ই তোরে বলছে ‘ভালোবাসি’ ফিহা? এই হইছে নতুন লেভেলের প্রেমে পড়ার টেকনোলজিসয়া !”
ফিহা লাজুক গলায় বলে –” জাহেদ খান আমার সাথে দুষ্টু মিষ্টি প্রেম করতে চাই। বলেই হাত দিয়ে ফিহা মুখ ঢেকে ফেলে লজ্জায়। ”
মিম বলে –” জানু তোর প্রেম তো দেখতেছি — ঝগড়া দিয়ে শুরু, সিঙ্গারা ফুরায়া দিয়ে শেষ!”
ফিহা চোখ পাকিয়ে বলে–“তোরা না! আমি কিছু ভাবিনাই এখনো। কিন্তু কেমন যেন মনে হয়, না দেখলে মিস করি ওরে।”
জারা পেপসি খেতে খেতে বলে –“মিস করিস? মানে ঝগড়ার অভাব ফিল করিস, এই তো সত্যি প্রেম!”
ফিহা হেসে বলে –” তুমি আমায় নিয়ে মজা নিও না জানু। তুমিও কিন্তু বটগাছ, গুড নাইট, গুড নাইট। ”
ফিহার কথায় জারা বিষম খেয়ে পেপসি মাথার তালুতে উঠে যায়। জারা নিজেই মাথায় চাপড় দিতে দিতে বলে–” বাজে কথা বলবি না একদম। ওই শয়তান লোকটা কাল আসেনি, আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে। ”
মিম আফসোস এর সুরে বলে –” আহাহা আমার জানু তাহলে কষ্ট পেয়েছিলে বোঝি অনেক? থাক কাল হয়নি তো অন্য দিন হবে! ”
জারা ভ্রু কুঁচকে তাকায় মিমের দিকে। সন্দেহ ভঙ্গিতে বলে– “কি হওয়ার কথা বলছিস তুই? ”
“আরে জানু দেখা হওয়ার কথা বলছি আমি। তুই অন্য কিছু ভাবলি না কি আবার?? ”
ফিহা কথার মাজে বলে উঠে –” দেখলি আমার জানুর কেমন কালা মাইন্ড! নেগেটিভ, নেগেটিভ ভাবনা দুষ্ট! ”
ফিহার কথা শুনে জারা না চাইতেও হেঁসে দিলো। তিনজন হো হো করে হেসে উঠে।
প্লেটের সিঙ্গারা শেষ, ঝালমুড়ি ভাগাভাগি,
কিন্তু প্রেম আর পঁচানির রস — অফুরন্ত।
“দুপুরের চড়া রোদে কলেজ থেকে ফিরছিল জারা’রা। গরমে হাঁপিয়ে উঠেছে পুরো শরীর, কলেজ ড্রেস ঘামে ভিজে গেছে। শরীরের ক্লান্তি আর পিপাসা চোখে মুখে স্পষ্ট। রোদের তীব্রতা যেন তাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে আরও ভারী করে দিচ্ছে৷
নদীর ঘাটে দুপুরের কড়া আলো পড়েছে চিকচিক করে ল। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদের ঝিলিক নদীর জলে পড়ছে। আরমান চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, চোখে অস্থিরতা।
হঠাৎ দূরে ধুলো উড়িয়ে হেঁটে আসছে জারা। গায়ের কলেজ ড্রেস ঘামে ভিজে গেছে, শরীরের গরমে ক্লান্ত, চোখে বিরক্তির ছায়া। কিন্তু আরমানের চোখ আটকে যায় এক জায়গায়—ড্রেসের ভেজা কাপড়ে হালকা লাল রঙা ই*না*রের আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আরমানের মুখ শক্ত হয়ে যায়। সে কিছু না বলে এগিয়ে আসে, এক ঝটকায় জারার হাত ধরে ফেলে। জারা চমকে ওঠে—
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২১
“আরে কী করছেন টা কি? আমার হাত ধরে টানছেন কেন?”
কোনো জবাব নেই। রাগে-অভিমানে চোখ লাল। সে ধীরে ধীরে তাকে মাঠের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ যেন না দেখে, যেন এই অস্থির অনুভূতিগুলো কোথাও গিয়ে ফেটে পড়ে।
জারার মুখেও অভিমান—কিন্তু চোখে একধরনের অচেনা অনুভব। ও কিছু বলে না, শুধু চুপচাপ হাঁটে।
