রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৭
সোহানা ইসলাম
রাত তখন প্রায় ১১টা ছুঁই ছুঁই। ইসলামপুর গ্রামের নিস্তব্ধ পরিবেশে শুধু কুকুরের মাঝে মাঝে ডাক আর দূরে গাছের পাতার মৃদু শব্দ। গ্রামের অন্য বাড়িগুলো তখন অন্ধকারে ঢেকে গেছে, শুধু এক তলা বাড়ির জানালা দিয়ে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। সেই আলোয় বসে আছে আরমান খান—একদম সিরিয়াস মোডে।
টেবিলের উপর ল্যাপটপ খোলা, স্ক্রিনে একটার পর একটা গ্রাফ, রিপোর্ট, আর এক্সেল শিট। পাশে গরম কফির মগ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে তীক্ষ্ণ ফোকাস। কালকের মধ্যে প্রজেক্ট ফাইনাল না করলে কোটি কোটি টাকার ডিল শেষ।
আরমান ল্যাপটপে মনোযোগী হয়ে কিছু লিখছে, হঠাৎ—
ট্রিং ট্রিং… ট্রিং ট্রিং…
মোবাইল ভাইব্রেশনের সঙ্গে রিংটোনে চমকে উঠল সে। চোখ কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। নাম দেখে ঠোঁটের কোণে বিরক্তির রেখা স্পষ্ট হলো—
“রাশেদ কলিং…”
আরমান দাঁত চেপে বলল,
“এই ছেলেটা আবার কেন কল করছে!”
একবার কেটে দিল।দুইবার কেটে দিল।
তৃতীয়বার আবার একই নাম—রাশেদ কলিং…
আরমানের ধৈর্য শেষ। মোবাইল তুলে গর্জে উঠল
___“what the hell রাশেদ! তোকে কতবার বলেছি late night call করিস না? আমি কি তোকে বলি নাই I am busy?”
ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ। তারপর ভয়ে ভয়ে রাশেদের বলে
—“স্যার, সরি স্যার! আমি জানি আপনি busy। কিন্তু আমার একটু urgent কথা ছিল।”
আরমান চেঁচিয়ে বলে
__“urgent? urgent তোর বাপের নাম! আমি ল্যাপটপে বসে মাথা খাচ্ছি, deadline মাথার উপর… আর তুই আমাকে বিরক্ত করছিস!”
রাশেদ কণ্ঠ কাঁপিয়ে বলল—
“স্যার, আমি promise করছি last call। কিন্তু আমার কথা শুনেন।”
___“কেন শুনবো তোর কথা? আমি কি তোর shrink নাকি, তোর সব problem শোনার জন্য বসে আছি?”
___“স্যার, actually আমি আপনার কাছে আসতে চাচ্ছিলাম।”
আরমান রাগে দাঁত চেপে ধমকে বলে
___“কি??? তুই আমার কাছে আসবি? আমি কি তোর বউ নাকি যে রাত ১১টায় তোর কাছে আসতে হবে?”
রাশেদ ঢোক গিলল। গলায় কাঁপন নিয়ে বলে
___“না স্যার! বউ না। কিন্তু আমি তো আপনার assistant। আপনার কাছে থাকাটা important।”
আরমান ব্যঙ্গ করে বলে
___“important তোর মাথায় আগুন! আমি কি তোর oxygen নাকি, যে আমার কাছে না থাকলে তুই মারা যাবি?”
রাশেদ ভয়ে ভয়ে বলে
___“স্যার, আমি এখানে একা বোধ করছি।”
আরমান হাসতে হাসতে রেগী গলায় বলে
___“lonely feel করছিস? তুই কি আমার কাছে cuddle করতে আসবি?”
রাশেদ হকচকিয়ে উঠে।
___“না না স্যার! cuddle না। শুধু একটু বসবো, কথা বলবো। আপনার ছোট ছোট সব কাজ আমি করে দিব। ”
আরমানের এবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে তার। এই ছেলেকে সামনে পেলে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতো আরমান। রাগের চুটে দাঁতে দাঁত চেপে বলে
___”বা*ল বড় হচ্ছে। তুই এসে না হয় আমার বা*ল ফালানোর কাজ টা করে দিস? ”
___” স্যার তাহলে কোন কোম্পানির মেশিন আনব? ”
এবার আরমানের পুরোদমে ধৈর্য শেষ। সে চিৎকার করে বলে __” মাঙ্গের নাতি তোর চাকরি শেষ! ”
___” Thank you স্যার!
রাশেদ ও অন্য দেনে ছিলো । কি উত্তর দিয়েছে সে এটা নিজেই যানে না। যখন বোদ হয় তখন হকচকিয়ে উঠে তাড়াতাড়ি করে বলে
__” ইন্না-লিল্লাহ! এসব কি বলছেন স্যার? ”
__” তুই যা শুনেছিস!”
___” সরি স্যার। প্লিজ আসি আমি আপনার কাছে। প্রমিজ করছি আপনাকে ডিস্টার্ব করব না। ”
____“disturb করবি না? তুই এখন যা করছিস সেটা কি dance নাকি? তুই আমাকে literally disturb করতেছিস।”
রাশেদর প্রায় কাঁদো কাঁদো অবস্থা।
___“স্যার please… আপনি রাগ করবেন না। আমি আপনাকে খুব miss করছি।”
আরমান এবার রাগে দুঃখে হাসি পাচ্ছে। রাগ নিয়েও হাসতে হাসতে বলে
___“তুই আমাকে miss করছিস? রাশেদ, তুই কি আমার প্রেমিক নাকি?”
রাশেদ তোতলাতে লাগল___“না না স্যার! প্রেমিক না। আপনি আমার boss, আমার life। আমি আপনার ছাড়া থাকতে পারি না।”
___“ওহ গড! তুই কি আমাকে propose করতেছিস নাকি?”
রাশেদ তাড়াতাড়ি করে বলে ___“না স্যার! propose না। শুধু আসতে চাই।”
আরমান রেগে বলে___“রাশেদ, তুই জানিস আমি তোকে চড় মারবো যখন আসবি?”
___“আমি চড়ের জন্যও ready স্যার। কিন্তু allow করেন।”
আরমান গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। এই ছেলের একগুয়ে অবস্থা দেখে হতাশ হয়। এই ছেলে টা তার কাছে আসার জন্য কি করছে।
__“ড্যাম ইট! ঠিক আছে, আয়। কিন্তু এক কথা শুন—যদি আমার mood খারাপ করিস, তোর চাকরি শেষ!”
রাশেদ খুশিতে চিৎকার করে উঠে।
__“thank you স্যার! আমি এখনই আসতেছি।”
আরমান চেঁচিয়ে বলে
__“চিৎকার করিস না গাধা! তুই আয়, কিন্তু আমার চোখের সামনে কোনো অকাজ করবি না।”
ফোন কেটে দিল আরমান। মোবাইল টেবিলে ছুঁড়ে মারল, মাথা ঝাঁকাল—“এই ছেলেটা একদিন আমাকে পাগল করে ছাড়বে!”
রাত ১টা। ঘরের বাতি নিভিয়ে জানালার পাশে বসে আছে জারা। হাতে মোবাইল ফোন, স্ক্রিনে একটানা তাকিয়ে আছে। বারবার আশা করছে—হয়তো এবার কল আসবে।কিন্তু স্ক্রিন অন্ধকার। কোনো রিংটোন বাজেনি, কোনো মেসেজও নেই।
জারা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। দুপুরের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর হাহাকার শুরু হলো।
সে দৃশ্যটা এখনো স্পষ্ট—আরমান তার হাত ধরেছিল, নিজের কাছে টেনেছিল,তাকে আপত্তি কর ভাবে ছুয়েছিল, কিন্তু চোখে ছিল ভালোবাসার দাবী। তাতে কোনো খারাপ কিছু ছিল না। কিন্তু তখন জারা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আর সেই ভয়েই যে কথাটা বেরিয়ে এসেছিল তার মুখ থেকে—“আপনি আমাকে খারাপভাবে ছুঁয়েছেন।”
এই একটা কথাই সবকিছু বদলে দিয়েছে।
জারা কাঁপা গলায় ফিসফিস করল—“আমি কেন এমন বললাম?”মনে হচ্ছে বুকের ভেতর কেউ কষ্টের পাথর চেপে দিয়েছে।“ওই লোকটা আমাকে ভালোবাসে। আমার জন্য পাগল। আমাকে কাছে পাওয়ার জন্য ওই সব করেছে। আমি কেন বুঝলাম না? কেন তাকে আঘাত করলাম?”
চোখে পানি জমে উঠল। সে নিজেকে থামাতে পারছে না।
“সে তো চেয়েছিল আমাকে হালাল করতে। আমার হাতটা ধরতে চেয়েছিল, তাতে কী দোষ ছিল? আমি কেন সেটা মেনে নিতে পারলাম না?”
হঠাৎ একটা ভয় মাথায় চেপে বসল—
” উনি কি খুব রেগে গেছে? তাই তো কল দিল না? হয়তো আর কখনো কল দেবে না।”
এই ভাবনায় বুকের ভেতর হাহাকার উঠল। সে কল লিস্টে গিয়ে আরমানের নামের দিকে তাকাল। আঙুল উঠল কল আইকনে… কিন্তু থেমে গেল।“যদি সে রেগে থাকে? যদি খারাপ কিছু বলে? আমি সেটা শুনতে পারব না।”
জারা মোবাইলটা বুকের সাথে চেপে ধরল। ঠোঁট কাঁপছে, চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। ফিসফিস করে বলল—“আরমান, একবার কল করেন.. শুধু একবার।”
কিন্তু স্ক্রিন অন্ধকার। কোনো রিং নেই।
অপরাধবোধে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। সে বিছানায় শুয়ে পড়ল, মোবাইলটা বুকে চেপে ধরে কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে গেল।চোখে শেষ ভেজা প্রার্থনা—“কাল হয়তো সব ঠিক হবে… হয়তো সে ক্ষমা করবে।”
কিন্তু রাতটা শুধু নীরবতার মধ্যে গড়িয়ে গেল।
রাশেদ ফোন কেটে খুশিতে লাফাফালি করছে প্রায় । নিজের সাথে কথা বলতে লাগল—“স্যার পারমিশন দিল! ও মাই গড, আমি এখন কিং! নাচব, গাইব, আর স্যারের পিছন পিছন ঘুরব! ”
হাসতে হাসতে ব্যাগ গুছাচ্ছে—টুথপেস্ট, ব্রাশ, চার্জার, এমনকি পারফিউমও নিচ্ছে।আরমান কল কাটার পর থেকে প্রায় পাঁচ ঘন্টা ধরে সে গোছগাছ করছে । নিজের reflection দেখে বলল—“রাশেদ, তুই একনম্বর চালাক। স্যারের কাছে পৌঁছালে সব tension শেষ।”
হাঠাৎ কি মনে করে যেন বিছানায় ধুম করে বসে পরে রাশেদ। টেনশন শেষ হয়েও যেন শেষ হলো না। যার জন্য এতো লাফালাফি করছে, কিন্তু এতো রাতে সে যাবে কি ভাবে? এখন কোনো বাসও পাওয়া যাবে না। তাহলে? মাথায় বুদ্ধি আসে। তাড়াতাড়ি মোবাইল টা নিয়ে আরমান কে কল করে। রাত প্রায় সাড়ে তিনটার মতো বাজে।
আরমান এখনো ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছে। কাজের মাঝে আবার কল আসায় নাক, মুখ কুঁচকে যায় আরমানের। এতো রাতে তাকে কে কল করছে। মনে হঠাৎ একটা নাম লিখে উঠে। মানজারা! দুপুরে বাড়ি পৌঁছে এখন পর্যন্ত আরমান জারাকে একটা কল বা মেসেজ করেনি। কাজের চাপ ছিল, এবং কিছু টা ইচ্ছে করে দেয় নি সে। তার কল, মেসেজ না পেয়ে হয়তো কল করছে। সময় নষ্ট না করে মোবাইল টা হাতে নেয় রিসিভ করার জন্য। কিন্তু স্কিনে নাম টা দেখে মাথা যে ঘি ঢালা আগুনের মতো জ্বলে উঠে। রাশেদ কল করেছে। ধরবে না ধরবে না করেও ধরে। যদি আর্জেন্ট কোনো দরকারে কল করে।
__” হ্যাঁ! বল রাশেদ। ”
রাশেদ কাঁদো কাঁদো গলায় সুর দিয়ে বলে
___” স্যার….”
রাশেদের এমন গলার স্বর শুনে আরমান ভয় পেয়ে যায়। বুকটা মুচড় দিয়ে উঠে। তার পরিবারের কারোর কিছু হয়নি তো আবার। মা-বাবা সবাই ঠিক আছে তো?
__” কী হয়েছে রাশেদ? তোর গলা এমন শুনা যাচ্ছে কেন?”
__” স্যার গো আমি আপনার কাছে আসব কীভাবে? ”
মধ্য রাতে ফোন দিয়ে জানতে চাইছে সে এখানে কী করে আসবে? সব চিন্তা দূর হয়ে মাথায় রাগ উঠে যায় আরমানের। রাগের চুটে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে __” গাধার বাচ্চা! তুই আমার মাথায় বসে আসবি এখানে। ”
রাশেদ চিন্তায় পড়ে যায়। সে তো ময়মনসিংহে আর স্যার ইসলাম পুড় গ্রামে। তাহলে সে কীভাবে যাবে স্যারের মাথায় করে।
__” স্যার আপনি তো ইসলাম পুড় গ্রামে। তাহলে আমি কী ভাবে আপনার মাথায় বসে আসব? ”
__ ” ইডিয়ট ? ”
__” স্যার আপনি তো গাড়ি নিয়ে গেছেন? তাহলে আপনার বাইক টা নিয়ে আসি ? ”
__” তুই এখানে আসবি মানজা মেরে ঘুরার জন্য? যে তোর বাইক নিয়ে আসতে হবে, তাও আবার আমরা টা?”
__” আমার একটা বাইক নেই বলে, এমন করে বলছেন স্যার। ” মন খারাপের ভান করে বলে রাশেদ।
__” শা*লা বাঁচাল। নিয়ে আয়। ”
বলেই কল টা কেটে হাতে থাকা মোবাইল টা জোরে ছুরে মারে বিছানায়। রাগের সিমান্ত যেন সব শেষ হয়েছে গেছে তার। রাগের চুটে কি বলবে? কি করবে ভেবে পাচ্ছে না । হাতের কাছে এখন কাউকে পেলে ইচ্ছে মতো দিবে এমন পায়তারা করছে সে। সকালের পর থেকে কাজের চাপে এখন পর্যন্ত খাওয়া হয়নি তার। খালি পেটে থাকলে এমনিতেই মাথা গরম থাকে। তারউপরের এই বলদের সব উদবাস্তু কাজ।
চোখের মুখে পানি দেওয়া প্রয়োজন এখন। মাথা ধরেছে। বসা থেকে উঠে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়। দরকার খুলে ভিতরে ঢুকবে এমন সময় দরজায় নক পরে।
ঠক ঠক ঠক!
তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
আরমান থমকে গেল। এত রাতে কে এভাবে দরজায় কড়া নাড়বে? বিরক্তি যেন মুহূর্তেই মাথার ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দিল। মনে মনে গালি দিতে শুরু করল সে—”এত রাতে আবার বা*লের সাহস হলো আমার দরজায় নক করার?”
রাগে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ভুরু কুঁচকে, ঠোঁট চেপে। দরজা খুলেই বলতে চাইছিল, “কে এত রাতে পাগলামি করছিস?”—কিন্তু দরজা খোলার পর শব্দগুলো যেন গলায় আটকে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে রোহান।আরমানের সেরা বন্ধু, তার ছায়াসঙ্গী। কিন্তু আজ রোহানকে যেন অন্যরকম লাগছে। মুখ শুকনো, চোখে ক্লান্তি, কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। এই মুখ দেখে রাগ আরও বেড়ে গেল আরমানের। এত রাতে বন্ধুর এভাবে আসা তাকে মোটেই ভালো লাগল না।
—”এই সময়ে দরজায় কড়া নাড়িস কেন? মাথা খারাপ নাকি তোর?” বিরক্তি ভরা কণ্ঠে বলল আরমান।
রোহান কোনো জবাব দিল না। ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। তার চোখে যেন হাহাকার, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল,
—”আরমান… আমার ৪ তারিখে ফ্লাইট। হাতে মাত্র তেরো দিন সময় আছে বাংলাদেশের মাটি ছোঁয়ার। তারপর… হয়তো দীর্ঘদিন ফিরব না।”
আরমান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
—”তাতে আমাকে এত রাতে বিরক্ত করার মানে কী?”
রোহান কষ্টভরা হাসি দিল।
—”বাবা বিয়ে করার জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু… আমি তো জানি, আমার মন, আমার হৃদয় শুধু এক জায়গায় আটকে আছে। আমার চাঁদ সুন্দরী ছাড়া অন্য কাউকে আমি বিয়ে করব না।”
আরমান তার কথায় বিরক্ত হলো।
—”তোকে কতবার বলেছি, এসব নাটক বাদ দে। যদি ও তোকে না ভালোবাসে, তবে কেন এত জোর করছিস? এটা তো বাচ্চাদের মতো জেদ।”
রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—”তুই বুঝবি না আরমান। ভালোবাসা কখনো জোরে আসে না, আবার যায়ও না। ও হয়তো আমাকে ভালোবাসে না, কিন্তু আমি তো ওকে ছাড়া জীবন কল্পনা করতে পারি না। তাই ঠিক করেছি, বাংলাদেশে থেকে কোনো মানে নেই। চলে যাব। অন্তত দূরে গিয়ে সব ভুলে থাকতে পারব।”
আরমান ঠান্ডা গলায় বলল,
—”তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এমন করে কেউ নিজের জীবন নষ্ট করে না। আর তোর এই কান্না-কাটি শোনার সময় আমার নেই।”
রোহান তাকিয়ে রইল বন্ধুর চোখে। সে জানে, আরমানের মেজাজ খারাপ, কিন্তু অন্তরের গভীরে সে একজন সত্যিকারের বন্ধু। হয়তো মুখে কঠিন কথা বলছে, কিন্তু তার মন খারাপটা বোঝার মতো মানুষ এই দুনিয়ায় যদি কেউ থাকে—সে আরমানই।
—”তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তাই তোর কাছেই এসেছি। জানতাম, তুই হয়তো রাগ করবি, হয়তো শুনবি না। কিন্তু কারো কাছে তো নিজের কষ্টটা বলতেই হবে।”
আরমান মুখ ফিরিয়ে নিল। রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—”আমাকে নাটকের চরিত্র বানাবি না রোহান। তুই যদি চাঁদ সুন্দরীকে না পাস, তবুও তোর জীবন থেমে যাবে না। আমেরিকা চলে যা, কাজ কর, নতুন জীবন শুরু কর। তোর বাবার কথাও ভেবে দেখ। মানুষ কি শুধু নিজের জন্য বাঁচে?”
রোহান চুপ করে শুনতে লাগল। তার চোখে জমে থাকা জল ঝাপসা করে দিচ্ছিল দৃষ্টি।
—”জীবন কি এত সহজ, আরমান?” মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল সে।
—”আমার কাছে মনে হয়, আমি যদি ওকে না পাই, তাহলে সবকিছুই অর্থহীন। হ্যাঁ, হয়তো বাঁচব, খাওয়া-দাওয়া করব, মানুষের মতো চলব… কিন্তু সেটা কি বেঁচে থাকা হবে?”
এই কথাগুলো শুনে আরমানের ভেতরে হালকা ঝাঁকুনি লাগল। কারণ সে নিজেও জানে ভালোবাসার যন্ত্রণা কতটা ভয়ংকর। কিন্তু তবুও রাগ চেপে রাখতে চাইল।
—”ভালোবাসা মানে কি শুধু এক মেয়ের জন্য পুরো পৃথিবী ফেলে দেওয়া? তুই যদি নিজেকে সামলাতে না শিখিস, তাহলে কারো প্রেম পাওয়ার যোগ্যও না। বুঝলি?”
রোহান কষ্টের হাসি দিল।
—”হয়তো তাই। তবুও জানিস, আমি চেষ্টা করেছি। বহুবার নিজেকে বুঝিয়েছি, কিন্তু পারিনি। আমি যদি আমেরিকা যাই, অন্তত দূরে থেকে তো এই কষ্ট কিছুটা ভুলতে পারব।”
আরমান বিরক্ত হয়ে হাত নেড়ে বলল,
—”যা খুশি কর। আমার মাথা খাস না। আমি তোর আবেগী গল্প শোনার জন্য রাত জেগে বসে নেই।”
কথাগুলো কেটে গেল রোহানের বুকের ভেতর। সে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল—
—”তুই হয়তো বুঝিস না, কিন্তু তুই আমার জীবনে সবচেয়ে কাছের মানুষ। তুই পাশে থাকিস বা না থাকিস, আমি তোকে সবসময়ই বন্ধু মনে করব।”
এই বলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল সে।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে ঘরটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আরমান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে থেকে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে, কিন্তু তার বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলছে। মুখে সে যতই শক্ত হোক, ভেতরে ভেতরে বন্ধুর কষ্টটা তারও মনে গেঁথে গেছে।
সে ফিসফিস করে বলল নিজের সাথে—
” ৪তারিখে ফ্লাইট আর ২ তারিখেই নাচানাচি করবে আমেরিকায় না যাওয়ার জন্য গাধা। ”
কিন্তু মুখে আর কিছু বলল না। চুপ করে গিয়ে আবার বিছানায় বসে পড়ল। সারা রাত আর ঘুম হয় না আরমানের।
ঘড়ির কাঁটা ঘুরে ঘুরে রাত ভোর হলো, কিন্তু একটুও ঘুম আসেনি। শরীর ক্লান্ত, মাথা ভারী হয়ে আছে। ঠিক ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল বাবার নাম।
আরমান ফোন ধরল। অপর প্রান্ত থেকে বাবার কড়া কণ্ঠস্বর—
—“তুমি এখনই রেডি হয়ে ময়মনসিংহ এর জন্য বের হয়ে যাও। ইমিডিয়েটলি একটা মিটিং আছে। দেরি করো না।”
কোনো কথা বলার সুযোগই পেল না সে। ফোন কেটে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে উঠল আরমান। শরীরটা যেন টেনে তুলতে হচ্ছে। মাথা ঘুরছে, চোখ লাল হয়ে আছে, অথচ সামনে কোনো বিকল্প নেই।
ওয়াশরুমের আয়নায় নিজের মুখটা দেখল সে—ফ্যাকাশে, ক্লান্ত। মুখে কষ্টের ছাপ লুকিয়ে আছে। কল খুলে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল মুখে। একটু সতেজ লাগলেও ভেতরের ক্লান্তি মিলল না।
সময় নষ্ট না করে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল। খাওয়ার মতো সময়ও পেল না। টেবিলে রাখা সকালের নাস্তা অ untouched পড়ে রইল। ক্ষুধা নেই, তাড়া আছে।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল জেরিন। জেরিন যেন আগেই প্রস্তুত ছিল। কারণ সে জিনিয়াকে বলে জেরিন কে রেডি করিয়ে দিতে বলেছে। বাচ্চা মানুষ এখানে এতো দিন থাকা সম্ভাব না। কিন্তু জেরিন তাদের ছেড়ে যেতে নারাজ। মুখটা ভাট করে রেখেছে।
আরমানের চোখেমুখে হালকা দুশ্চিন্তা। নরম গলা বলে—“চল, সিস্টার দেরি হয়ে যাবে,” শুধু এই কথাটুকুই বলল আরমান।
দুজনে দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল। ইঞ্জিনের শব্দে চারপাশের নিস্তব্ধতা ভাঙল। গাড়ি ধীরে ধীরে বড় মাঠ পেরিয়ে রাস্তায় উঠল।
গাড়ি চলতে শুরু করলেও আরমানের মনটা অন্য কোথাও আটকে ছিল।তার মানজারা।কাল থেকে এখন পর্যন্ত যার সাথে একটাও কথা হয়নি তার। তার চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, মাথায় চাপা টেনশন। জেরিন কয়েকবার কিছু বলতে চাইলেও থেমে গেল। বুঝতে পারছিল, আরমান এখন কোনো কথায় সাড়া দেবে না।
তবে গাড়ি ছুটে চলার ফাঁকে একটা বিষয় নিয়ে মনে মনে যুদ্ধ করছিল আরমান—সে জিনিয়াকে আসার জন্য কিছুই বলে না।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৬
কারণ, সে জানে এই মুহূর্তে জিনিয়াকে বাড়িতে নিয়ে আসা সম্ভব না। পরিস্থিতি জটিল হয়ে যাবে, হয়তো নতুন সমস্যাও তৈরি হবে। তাই চুপ করে সব এড়িয়ে যাওয়াই এখন ভালো।
রাস্তায় হালকা কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছে। ভোরের বাতাস ঠান্ডা, চারপাশে নিস্তব্ধতা। গাড়ির ভেতরে নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠছিল।
আরমান জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। মনের ভেতর প্রশ্নের পাহাড় জমছে—রোহানের কথা, নিজের অস্থিরতা, বাবার হঠাৎ ডাকা—সব মিলিয়ে যেন একটা বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে তার বুকের ওপর।
কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেছে গন্তব্যের দিকে।
