Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৩

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৩

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৩
সোহানা ইসলাম

জারা দৌড়ে গিয়ে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে দেয়। দু’জনেই ভেঙে পড়ে কান্নায়। মারজিয়া বেগম বারবার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, যেন সেই স্পর্শে মেয়ে সত্যিই ফিরে এসেছে তা নিশ্চিত হন।
— “তোকে সুস্থ দেখে আমার বুকের ভেতর থেকে পাথর নেমে গেল মা… আল্লাহ্‌র রহমত ছাড়া কিছুই না।”
রোহান, রাশেদ আর জাহেদ সম্মানের সাথে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা চুপচাপ এ দৃশ্যটা দেখছিল। জিনিয়াও চোখ মুছছিল বারবার।ফিহা আর মিম পাশেই দাড়িয়ে আছে।
মিম ফিসফিস করে ফিহাকে বলে

— “আজ যদি আরমান ভাই না থাকতেন,তাহলে ওই বদমাইশটা আমাদের জানুর হয়তো কোনো ক্ষতি করে দিত।”
মারজিয়া বেগম তাদের দিকে তাকিয়ে শুধু মাথা নেড়ে কৃতজ্ঞতা জানালেন। রোহানরা কিছু বলার সুযোগ না পেলেও, মারজিয়া বেগম এর মনে একটাই কথা বারবার বাজছিল— এই ছেলেমেয়েগুলো আজ যদি না থাকতো তাহলে আমার মেয়ের অনেক বড় ক্ষতি করে দিত রহিম। আমার মেয়ের জন্য সত্যিই আশীর্বাদ হয়ে এসেছে ওরা।
মারজিয়া বেগম রোমানদের থেকে যেতে বললেন। কিন্তু রোহান জানিয়ে দিল, তারা থাকতে পারবে না।সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসে তারা।
ফিহা, মিম আর জিনিয়া জারার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। শুধু নির্ঘুম রাত কাটে মারজিয়া বেগমের। তিনি মেয়েগুলোর মাথার কাছে বসে আছেন, মাঝেমাঝে স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দেন।
রোহানরাও ফিরে আসে। দীর্ঘসময়ের ক্লান্তি তাদের শরীর ভর করেছে, বিশ্রামের দরকার তাদেরও। এদিকে আরমান নিজের রুমে শুয়ে মোবাইল হাতে নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়। ভাবছিল, একবার জারাকে কল করে জিজ্ঞেস করবে—সে কী করছে। কিন্তু রাত অনেক হওয়ায় শেষমেশ আর কল করা হয়নি।

সকাল সাতটা। রান্নাঘরে ব্যস্ত মারজিয়া বেগম।এতো কিছুর পরে কলেজে যাওয়ার মতো মনমানসিকতা নেই জারা’র।জারা কলেজে যাবে না মানে তার দুই বেস্ট ফ্রেন্ড ও যাবে না ।
জোহানকে নিয়ে জিনিয়া, ফিহা আর মিম চলে যায় সাদে। জারা মায়ের কাজে সাহায্য করছে।
সাদে পৌঁছে জোহান আর তিন জন মিলে খুনসুটি করছে হাসাহাসির মধ্যে।জোহানেরও ভালো লাগছে এখন সবার সঙ্গে।
হঠাৎ নাস্তা করার জন্য ডাক পড়ে, সবাই নিচে চলে আসে। একসাথে বসে নাস্তা করে সবাই। মিম আর ফিহা খাওয়া শেষ করে জানায়, তারা একটু পরেই বাড়ি চলে যাবে।
মারজিয়া বেগম সবাইকে যত্ন নিয়ে খাওয়াচ্ছেন। জারা মুখে খাবার তুলছে কম, চিন্তা করছে বেশি। ” কাল যা হলো, এসবের কিছুই তো আম্মু জানে না। যখন জানবে, তখন কি মেনে নেবেন আমাদের?মনের ভেতরে এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জারার।”
খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই বসে ড্রইংরুমে আড্ডা দিচ্ছে।

এদিকে, আরমান মাএ ঘুম থেকে উঠেছে। রোহান, জাহেদ আর রাশেদ অনেক আগেই উঠে গেছে। ফ্রেশ হয়ে আরমান রাশেদকে ডাক দেয়। কিছুক্ষণ পর রাশেদ মাথা নিচু করে তার রুমে ঢোকে। আরমান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে।
—“চড়টা খুব জোরেই লেগেছিল কাল।”
রাশেদ চট করে মাথা তুলে তাকায়।
—“না স্যার ।”
আরমান ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলে,
—“ আমার উপর রাগ করেছিস?।”
রাশেদ ডানে বামে মাথা নাড়িয়ে বোঝায় “না সে রাগ করে নি। ”
___” আম্মু যখন বলল তুই শেষ রাতে বাইক নিয়ে এখানে এসেছিস তখন মাথায় রাগ উঠে যায়। যদি কোনো বিপদ হয়ে যেত?”
রাশেদ কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলে,
—“আপনি আছেন তো, আমার কিচ্ছু হবে না স্যার।”
আরমান তার কাঁধে হাত রাখে। চোখে একরকম দৃঢ়তা—
—“ আমি শুধু কাজের সময় তোর স্যার।তোকে বলেছি না কাজ ছাড়া সব সময় ভাই বলে ডাকবি। ”
__” আ আচ্ছা ভাইয়া। ”
__” নাস্তা করেছিস তোরা। ”
রাশেদ মাথা নেড়ে না বলে। ঘরের ভেতরে এক মুহূর্তের জন্য ভারী নীরবতা নেমে আসে।
__” আচ্ছা যা! আমি আসছি সবাই একসাথে খাবো। ”

মারজিয়া বেগম রান্নাঘর থেকে বের হয়ে ড্রইংরুমে মেয়েদের সাথে বসলেন। কিন্তু জারা যেন অন্য জগতে হারিয়ে গেছে। সবাই কথা বলছে, হাসছে, অথচ জারার চোখ বারবার জানালার দিকে চলে যাচ্ছে।
মারজিয়া বেগম খেয়াল করলেন, মেয়ে একদম চুপচাপ।
—“কি রে জারা, শরীর খারাপ নাকি?”
জারা জোর করে হাসল।
—“না আম্মু, ঠিক আছি।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার বুক ধড়ফড় করছে। যদি আম্মু সব জেনে যায়… যদি আরমানকে মেনে নিতে না পারবে…!
এদিকে ফিহা মজা করে বলল,

—“জিনিয়া আপু চলো একদিন সবাই মিলে শাপলা বিল থেকে গুরে আসি। ”
__” আইডিয়া টা কিন্তু দারুণ। কি বলো মিম?”বলল জিনিয়া।
__” যাওয়া যায়। কিন্তু কবে যাবে? ”
__” আমি তো এখান কার কিছু চিনি না, তোমার ডেট ফিক্স করে আমাকে বলো কেমন! ”
এতো কথার মাজে জারা একটা কথাও বলে না। মন মস্তিষ্ক সব অন্য চিন্তায় মত্য ওর।
ফিহা জারা’র কাঁধে ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলে __” কোথায় হারিয়ে গেছিস জানু? ভাইয়ার কথা ভাবছিস তাই না। ”
জারা কপাট করে তাকায় ফিহার দিকে। ওর কথা আবার আম্মু শুনে ফেলেনি তো? কিন্তু না, মারজিয়া বেগম কে দেখে মনে হচ্ছে না কিছু শুনেছে বলে।
জারা রাগ দেখিয়ে ফিহাকে মাথায় একটা গাট্টা মারে। ফিহা মাথায় হাত ডলতে থাকে।
তা দেখে মিম আর জিনিয়া হো হো করে হেসে উঠল। জারার ঠোঁটে সেও এক মুহূর্তের জন্য হাসি ফুটল, কিন্তু চোখের কোণে অজান্তেই অশ্রু চিকচিক করে উঠল।
মারজিয়া বেগম এবার একদম কাছে এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
—“তোকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে মা। রুমে গিয়ে একটু বিশ্রাম নে।”
জারা কিছু না বলে মাথা নিচু করল। তার ভেতরে তখন শুধু একটাই চিন্তা—আরমান ফোন করলো না কেন এখনো?নাকি কাল বিয়ে করেছে আর আজকেই ভুলে গেছে তাকে?

সকালের নাস্তা করতে বসেছে সবাই। আরমান পাশের আসনে বসা রোহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“রোহান, নাস্তা করে গিয়ে জিনিয়াকে নিয়ে আসবি মানজারাদের বাড়ি থেকে।”
রোহান কোনো উত্তর দিল না। শুধু মাথা নিচু করে চুপচাপ খেতে লাগল। যেন কিছুই শোনেনি।
আরমান ভ্রু কুঁচকে আবার বলল,
—“কি বলছি শুনতে পেয়েছিস?”
রোহান এবার ধীর গলায় বলল,
—“আমি পারব না। জাহেদকে বল, ও গিয়ে আনুক।”
জাহেদ পাশে বসা, সে চুপ করে থাকল। কিন্তু আরমান রোহানকে যতবার বলে, রোহান ততবারই না করে দেয়। তার গলাতেই বোঝা যায় একরকম জেদ জমে আছে।
তখন হঠাৎ রাশেদ মুখ খুলল—
—“আমি যাই… জিনিয়া ম্যাডামকে নিয়ে আসি।”
এই কথা শোনার সাথে সাথেই রোহানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। ভেতরে ভেতরে রাগ চেপে গেল তার।
—“তুই ওর থেকে দূরে থাকবি… জিনিয়ার কাছ থেকে দূরে থাকতে শিখ। কোনো দরকার নেই তোর যাওয়ার।”

সবার সামনে রাশেদ হতভম্ব হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল,”যাব্বাবা! আমি আবার কী করলাম? কেউ যেতে চাইছিল না, তাই তো রাজি হলাম। এখানে আমার দোষ কোথায়!
রোহানের বুকের ভেতরে তখন অদ্ভুত এক জেলাসির আগুন জ্বলছে। কোনো কিছু আর না ভেবেই হঠাৎ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
—“আমি নিজেই যাচ্ছি।”
নাস্তা শেষ না করেই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল রোহান।
আরমান তার পেছনের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল। চোখে-মুখে খেলে যাচ্ছে একধরনের খুশি—যা চাইছিলাম, ঠিক সেটাই হলো…

আরমান রাশেদকে নিয়ে ফ্যাক্টরির ভেতরে ঢুকল। রহিমদের দেখতে এসেছে সে। ভেতরে গিয়ে দেখে, সবাই অচেতন হয়ে মাটিতে ছড়িয়ে আছে।
আরমান গার্ডদের দিকে চোখের ইশারা করল।
—“ওদের জ্ঞান ফেরাও।”
গার্ডরা দৌড়ে গিয়ে প্রত্যেকের গায়ে পানি ঢালতে লাগল। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে সবার জ্ঞান ফিরল। গোঙানি আর আতঙ্কের শব্দে ভরে উঠল চারদিক।
আরমান চেয়ারে বসে ঠান্ডা চোখে সব দেখছিল। তাদের পুরোপুরি জ্ঞান ফিরতেই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর সোজা রহিমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
হঠাৎ করেই তার চুল শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে
ঠাসস!পর পর কয়েকটা চড় বসিয়ে দিল আরমান।
চোখ লাল হয়ে আছে তার, গলায় ঝড়ের মতো গর্জন—

—“কার দিকে তাকিয়েচ্ছিস মাঙ্গের নাতি? কালই তোকে শেষ করে দিতাম কুত্তার বাচ্চা । কিন্তু আমার ছোট্ট লক্ষ্মী বউটা ছিল বলে কিছু করিনি।”
রহিম ব্যথায় কুঁকড়ে গেল, মুখ থেকে কোনো শব্দই বের হলো না। তার চোখে শুধু ভয় আর অপমানের ছাপ।
__”দয়া করে ছেড়ে দিন আমাদের। আর কোনো দিন ওর দিকে তাকাব না। এবারের মতো ছেড়ে দিন। ”
__” হুমম! ছেড়ে তো দিব অবশ্যই। তোদের দিয়ে আমি করব বল? কিন্তু তুই যে আবার ওর দিকে তাকাবি না তার গ্যারান্টি আছে? ”
__” তাকাব না… তাকাব না সত্যি বলছি। আমার চোখ যদি দ্বিতীয় বার ওর দিকে যায় তো আমি আর এই গ্রামেই থাকব না। ”
__” হুম বোঝলাম! কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না। ”
আরমান গার্ডদের দিকে তাকিয়ে বলে

__” সারারাত নেচেছিল? ফুটেজ আছে সবগুলো? ”
__” হ্যাঁ স্যার! সারারাত নাচিয়েছি। ভোরবেলা বেহুশ হয়েছিল সবগুলো। ”
__” ওদের সবগুলোর কাপড় জ্বালিয়ে দাও। আর যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায় ছেড়ে দাও। এখন বাড়ি কীভাবে ফিরবে এটা ওদের বিষয়। ”
আরমানের কথা শুনে গার্ড গুলো কেমন ঘ মেরে দাড়িয়ে আছে। এমন উলঙ্গ অবস্থায় ছেড়ে দিবে তাদের?
__” স..স্যার এমন নেংটা অবস্থায় ছেড়ে দিব?”
গার্ডের কথা শুনে আরমান ভ্রু কুঁচকে তাকায় তাদের দিকে।
__” তোমার অতি মায়া লাগলে নিজের কাপড় খুলে দিয়ে দাও। ”
গার্ডগুলো মেকি হেসে ভয়ে ভয়ে বলে __” না স্যার! বোঝে গেছি আপনার কথা। এই ভাবে ছেড়ে দিব। আপনি নিশ্চিন্তে যান। ”
ফ্যাক্টরি ভিতর থেকে আরমান রাশেদকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এল।আরমানের পাশে চুপচাপ রাশেদ হাটছে, আর আরমান তার পাশ দিয়ে তাকিয়ে আছে।
কিন্তু আরমানের মনে অন্য চিন্তা নেই—তার চোখ, মন, সমস্ত ধ্যান জারার দিকে। জারা এখন কী করছে? এখন পর্যন্ত একটাও কল করলো না? শরীর খারাপ করলো না তো আবার—এই সব প্রশ্নগুলো তার মাথায় গুরুপাক খাচ্ছে।

এদিকে রোহান জারাদের বাড়িতে পৌঁছেছে। জিনিয়াকে নিয়ে গ্রামের ছোট রাস্তায় হেটে যাচ্ছে। রোহান সামনের দিকে, জিনিয়া তার পিছনে। পথটা নিরিবিলি, কিন্তু দুজনের মধ্যে কোনো কথোপকথন নেই। শুধু বাতাসের শব্দ আর পায়ের আওয়াজ।
হঠাৎ বিপত্তি ঘটল। রাস্তার একপাশ থেকে দুটি কুকুর দৌড়ে আসে জিনিয়ার দিকে।
জিনিয়া প্রথমে ভাবল, হয়তো পাশ দিয়ে চলে যাবে—কিন্তু কুকুরগুলো যখন তার খুব কাছাকাছি এসে পৌঁছালো, তখন ভয়ে চিৎকার করে দৌড় দেয়
রোহান জিনিয়ার চিৎকার শুনে পিছনে গুরার সাথে সাথে জিনিয়া রোহানের বুকে লাফিয়ে পড়ল।
রোহান reflexively হাত বাড়িয়ে ধরে জিনিয়াকে।এক মূহুর্ত যেন সে স্তম্ভ হয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা হাতে জিনিয়াকে তার বুকের কাছে লুকিয়ে নিল, হঠাৎ ভয়, হৃদয় ধুকধুক করা, আর রোহানের স্পর্শে সামান্য সান্ত্বনা মিলছে।

—“ কী হয়েছে! এমন চিৎকার করলে কেন?,” রোহান কণ্ঠে শক্তি আর নির্ভরতার ছাপ দিয়ে বলল।
জিনিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলে
___” কু..কু কুকুর তেড়ে আসছে আমার দিকে। ”
জিনিয়ার মনে তখন এক অদ্ভুত মিলিত অনুভূতি—ভয়, আস্থা, আর অজান্তে আগের দিনের স্মৃতি। সে অনুভব করল, যে মানুষটা পাশে আছে, তার পাশে থেকে এই ভয়ও কমে যেতে পারে।
কিছু মুহূর্ত চুপচাপ কাটল।রোহান দেখে কুকুরগুলো দূরে চলে যায়। জিনিয়া রোহানের হাত থেকে ধীরে ধীরে সরে এল। তবে মনটা এখনো উৎকণ্ঠিত।
রোহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“ভয় পেয়েছো অনেক?।”
জিনিয়া মাথা নেড়ে হ্যা বোঝায়। সে ভয় পেয়েছে।
__” তাহলে আমার পাশে পাশে হাঁটো! ”
জিনিয়া শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তার ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি—একদিকে ভয়, অন্যদিকে রোহানের উপস্থিতি। কিন্তু তার মনের ভেতরে এখনও ঝাঁপিয়ে পড়ে একটু আগের ঘটনা।
পথের শেষ দিকে পৌঁছেও তারা এখনও একদম চুপচাপ। গ্রামের রাস্তা, বাতাস, আর দুইজনের ।

রোহান জিনিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই ফিহা আর মিমও জারাদের বাড়ি থেকে বের হয়। গ্রামের সরু রাস্তা ধরে তারা পাশাপাশি হাঁটছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু রাতের ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।
হঠাৎ ফিহার ফোনটা বাজতে শুরু করল। স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠল—জাহেদ।
ফিহার ঠোঁটে লাজুক হাসি ছড়িয়ে গেল। সে ফোন রিসিভ করে নিচু গলায় কথা বলতে শুরু করল—
___ “কী করছেন? ”

ফিহা ফোনে ডুবে যেতেই মিমের চোখ হঠাৎ নিজের হাতে থাকা ফোনে আটকে গেল। স্ক্রিনে আলো জ্বলছে না, নীরব। তবুও মিমের মনে হলো এই অন্ধকার স্ক্রিনের ভেতর লুকিয়ে আছে হাজারো স্মৃতি, হাজারো অপরিস্কার অনুভূতি।
“রাশেদ, আপনি কি জানেন আপনার না-পাওয়া মেসেজগুলোতে কত কথা জমে থাকে আমার? কত অপরিস্কার ভালবাসা, কত অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষা? আপনি কবে হাসতে হাসতে সব মুছে ফেলে একবার কল করবেন?আমি তা ভেবেই ভেতরে ভেতরে কেঁদে যাই। কী অদ্ভুত আমাদের সম্পর্ক—আপনি আছেন আমার সামনে,কিন্তু আপনার জীবনে এখন আমি নেই। সাহস করে বলতে পারছি না রাশেদ আমি আপনার মিহু! আমি আপনাকে ছুঁতে চাই, অথচ হাত বাড়ালেই হাওয়া হয়ে যান । কাছে থেকেও আপনি দূরে, দূর থেকেও আপনি আমার মনে ভেতরে কেমন জাগয়া করে বসে আছেন। ”
আজ যদি সাহস পেতাম… তাহলে আপনার সামনে দাড়িয়ে বলতাম—‘রাশেদ, ওইদিনের সব মিথ্যা। ওই পোস্ট ওই স্টেটাস সব কিছু। আমি আপনাকে ছাড়া সত্যিই অন্য কাউকে কোনো দিন ভালোবাসিনি। ’ কিন্তু আমি পারি না। শুধু দূর থেকে আপনার ছায়াটাই আঁকড়ে ধরেছি। আপনাকে চাওয়ার ভেতর দিয়েই আমি বেঁচে আছি।”
মিমের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। সে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নেয়, যেন ফিহা দেখে না ফেলে।
ফিহা ফোন কেটে পাশে তাকায়।ফিহা হাসিমুখে মিমকে জিঙ্গেস করে
___”কিরে মিম, তোর মুখ এমন গম্ভীর কেন হঠাৎ?”
মিম কেবল মৃদু হাসি দিল। ভেতরের ঝড়টা মুখে ফুটিয়ে তুলল না। ফোনটা আবার ব্যাগে রেখে নিঃশব্দে হাঁটা শুরু করল।

জারা নিজের রুমে একা শুয়ে আছে। ছাদে লাগানো ফ্যানটা ধীরে ধীরে ঘুরছে, তবুও তার শরীরে এক অদ্ভুত ক্লান্তি ভর করেছে। বিছানায় তার খোলা চুল গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু চোখ দুটো একজায়গায় একটুও আটকে নেই। অস্থির লাগছে তার।আরমানের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু লোকটা কল করছে না। হঠাৎ করেই ফোনটা টুংটাং করে বাজতে শুরু করে।
চার্জারে লাগানো ফোনটা বিছানার একেবারে অপর প্রান্তে রাখা। জারা অলসভাবে চোখ মেলে তাকায়, কিন্তু নড়েচড়ে ওঠে না। ভাবছে—”নিশ্চয়ই মিম বা ফিহা হবে। পরে কল ব্যাক করব।”
কিন্তু কলটা কেটে যাওয়ার পরপরই আবার বাজে। একবার… দু’বার… তিনবার… পর পর মোবাইল টা বাজতেই থাকে। বিরক্তি জমে ওঠে মনে। মুখ ভার করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় জারা। ফোনটা হাতে নেওয়ার সাথে সাথেই বুকের ভেতর কেমন হিম হিম ঠাণ্ডা হয়ে যায়। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে একটাই নাম
— “সুইট বয়”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪২ (২)

আঙুল কাঁপতে থাকে রিসিভ বাটনের ওপর। ভয়ে বুক ধড়ফড় করছে। ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে। এতবার কল করার পরও সে ধরেনি—এখন ফোন ধরলে আরমানকে কি বলবে? কেমন করে কথা শুরু করবে? রেগে বোম হয়ে আছে মনে হয় ?বকবে নিশ্চয়?
জারা গভীর নিঃশ্বাস টেনে কলটা রিসিভ করে। কণ্ঠ আটকে আসা গলায় শুধু বলল—
“হ-হ্যালো…”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here