রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬০
সোহানা ইসলাম
রাশেদ হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে আরমানের রুমের দিকে। মুখে একরকম উৎকণ্ঠা, আবার মনের ভেতর উত্তেজনাও কম নয়। আজ তার বিয়ে! কিন্তু সকাল সকাল ঘুম ভাঙতেই মনে পড়ল—আরমান স্যারের কাছে এখনো তার অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র পড়ে আছে, যা ওর দরকার।
রুমে ঢুকেই রাশেদ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
— “স্যার! স্যার উঠেন! ”
বিছানার চাদরের ভেতর থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে,
— “এই সকাল সকাল কে মরছে আবার?”
রাশেদ কাছে এসে বলে,
— “স্যার আমি রাশেদ… উঠেন প্লিজ, ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।”
আরমান একচোখ খুলে রাশেদের দিকে তাকায়, গলায় ঘুমের ভার,
— “তোরা কি আমায় ঘুমাতে দিবি না? রাত তিনটায় ঘুমালাম।”
এরই মধ্যে দরজার বাইরে থেকে রোহান আর জাহেদ ঢুকে পড়ে। রোহানের হাতে কফির মগ, মুখে সেই আগের মতোই চিরচেনা ব্যঙ্গের হাসি।জোহান রাশেদ কে চোখ টিপ দিয়ে বলে
— “কি হয়েছে বর সাহেব?”
রোহান বলে,
__“বিয়ের আগে দৌড়াদৌড়ি শুরু?”
রাশেদ গলা নামিয়ে আরমানকে বলে,
— “স্যার.. আমার কিডনি গুলো যদি আজ দিয়ে দিতেন… ওই যে আপনার বিয়ের কাবিননামায় যে আমার কিডনি দিয়েছিলেন?…”
রোহান হাসে,
__ “কিডনি চাইতে এসেছো? তাহলে আমাদের টা কি হবে?”
জাহেদ বলে,
___“ ভাইয়া চলো আমরা চলে যাই। সকালে ভইয়ার মেজাজ… জানোই তো।দেখো কীভাবে তাকিয়ে আছে ।”
রাশেদ হাল ছাড়ে না। মুখে কাঁদো কাঁদো ভাব এনে বলে,
— “স্যার, আজ তো আমার বিয়ে!”
আরমান তখনো বিছানায় আধশোয়া, চোখ আধখোলা। ধীরে বলে,
— “হুম, তো?”
রাশেদ একটু সাহস পেয়ে এগিয়ে আসে,
— “স্যার, আপনি যদি ওই কিডনিগুলো এখন যদি দিয়ে দিতেন..।আপনি তার বিনিময়ে আমার বেতন থেকে টাকা কেটে দিয়েন। .”
এক মুহূর্তে ঘরের বাতাস থমকে যায়। আরমান ধীরে ধীরে উঠে বসে, দু’হাত দিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে বলে,
— “এইদিকে আয়।”
রোহান চোখ বড় করে বলে,
__“না, যাস না ভাই, আমার মনে হচ্ছে ঝড় আসছে।”
জাহেদও ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে,
__“আজকের দিনে থাপ্পড় খেলে ফটো ভালো আসবে না রাশেদ ভাইয়া।”
কিন্তু রাশেদ সরল মুখে বলে,
— “স্যার তো ডাকছে, কিছু বলবে নিশ্চয়।”
সে হাসিমুখে কাছে আসে।আরমান তাকায় একদৃষ্টিতে, তারপর হঠাৎ—ঠাসসসসসস!
থাপ্পড়ের শব্দে রুমটা কেঁপে ওঠে।রাশেদ হতভম্ব, গালে হাত দিয়ে চেয়ে থাকে। রোহান কফি ছিটিয়ে ফেলে হাসি চেপে বলে,
— “এইতো, বিয়ের গিফট আগেই পেয়ে গেলি!”
রাশেদ তো একেবারে বোকা হয়ে গেছে।
— “স্যার… আমি কী ভুল করলাম?”
আরমান উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
— “এই টা দিলাম, সারাক্ষণ ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো ‘স্যার স্যার’ করার জন্য। আরেকটা দেবো, আমার ঘুম ভাঙানোর জন্য।”
রাশেদ ভয় পেয়ে দ্রুত পেছাতে থাকে।রোহান হেসে বলে,
— “এখন পিছনে আসচ্ছিস কেনো?তখন না করলাম শুনলিনা কেন,!”
আরমান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রাশেদকে বলে,
— “বল, কি বলার ছিল তোর?”
রাশেদ গালে হাত দিয়ে মৃদু স্বরে বলে,
— “স্যার… মানে ভাইয়া… আমার তো আজ বিয়ে। যদি আমার কিডনি গুলো দিয়ে দিতেন…। আমার সব কিছু তো বউয়ের হয়ে যাবে আজ থেকে।কিডনি যদি না থাকে তাহলে বলবে আমি অন্য মেয়েকে দিয়ে দিয়েছি।”
ঘরে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা। রোহান আর জাহেদ হেসে ফেটে পড়ে। আরমান আয়নায় নিজের চুল ঠিক করতে করতে বলে,
— “কিডনির দাম কত?”
রাশেদ একটু ভেবে বলে,
— “ভাইয়া, বাজারে এখন আট লাখ।”
আরমান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
— “তাহলে আট লাখ বার আমার বউকে ভাবি ডাকবি। তারপর কিডনি ফেরত পাবি।”
রোহান বলে,
__“ভালো ডিল! ভাবি ডাকলেই কিডনি রিটার্ন পলিসি।”
জাহেদ যোগ করে,
__“তাহলে আজ পুরো বিয়েতেই ভাবি ভাবি চিৎকার শুনব মনে হচ্ছে।”
রাশেদ রাগে গজগজ করে বলে,
— “আপনারা শুধু মজা করেন, আমি কিন্তু সত্যি নার্ভাস।এতো বার ভাবি ডাকলে মুখ বাঁকা হয়ে যাবে আমার।”
আরমান তখন রাশেদের কাঁধে হাত রাখে, মুখে মৃদু হাসি,
— “শোন, রাশেদ…বিয়ে যদি করতে হয় তাহলে মানজারাকে ভাবি ডাকতে হবে। দুই টা কিডনির দাম ১৬ লাখ। আর তোর বিয়ে শুরু হওয়ার আগে ১৬ লাখ বার ভাবি বলে শেষ করতে হবে। ”
রোহান বলে,
— “ভাই আমাদের টা দিবি না। দুদিন পর তো আমিও বিয়ে করব!”
__“ তাহলে রাশেদের মতো তোরাও কাজে লেগে পর। ” বাঁকা হেসে বলে আরমান।
__“ থাক ভাই আমাদের কিডনি লাগবে না। পারলে নতুন থেকে কিনে নিব! ”
আরমান হেসে রাশেদের দিকে তাকায়,
— “যা, এখন বাথ নিয়ে বের হ। আজ তোকে বর সাজতে হবে। তবে মনে রাখিস, যদি আবার ঘুম থেকে আমায় ওঠাস বারোটার আগে,এবার থাপ্পড় না,পুরো মিশাইল যাবে তোর উপর দিয়ে ।”
সবাই হেসে ওঠে।রাশেদ মুখ চেপে হাসে,
— “ঠিক আছে ভাইয়া, আর উঠাবো না। কিন্তু কিডনির কথাটা মনে রাখবেন।”
রোহান বলে,
— “তুই কি ইসলাম পুড় যাবি না? এখন যে ঘুমাচ্ছিস। ”
__“ আমাকে নিয়ে তোর চিন্তা করতে হবে না। ”
সবাই হেসে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। রাশেদ যাওয়ার আগে আয়নায় নিজের মুখ দেখে নিচু স্বরে বলে,
— “থাপ্পড় খাওয়ার দাগে মনে হয় সাজের নিচে হাইলাইট হয়ে যাবে!”
রোহান পেছন থেকে বলে,
— “এইটা তোর লাভ, এখন তোকে লাইটেও আলাদা দেখাবে!”
ঘর ভরে যায় হাসির শব্দে। আরমান হালকা হেসে বিছানায় আবার বসে, নিচু গলায় বলে,
— “আমার বউ টা না যানি কি করে?”
আকাশে হালকা গোধূলি নেমেছে। চারপাশে আলোর মালা টিমটিম করছে। গাড়ির সারি সাজানো, ড্রাম, ঢোল, শানাইয়ের সুর মিশে এক মায়াবী পরিবেশ। রাশেদ বর সেজেছে, সোনালি পাগড়ি, মুখে আত্মতৃপ্তির হাসি। পাশে রোহান, জাহেদ, আরমান, আর বাকি বরযাত্রীরা। সবাই আজ জমকালো পোশাকে।
ঘড়িতে বাজে ঠিক দুপুর দুইটা। আরমানের বাবার নির্দেশ, “বারাত ছাড়ো।”ঢোলের তালে তালে বরযাত্রীদের সারি রওনা দেয় মেয়ের বাড়ির দিকে।
সন্ধ্যা ছয়টায়। গেটের সামনে আলোয় ঝলমল একটা পরিবেশ। দুই পাশে ফুলের সাজ, মাথার ওপরে লাইটের ঝাড়বাতি দুলছে হাওয়ায়। আর সেখানে দাঁড়িয়ে আছে মেয়ের দল—চঞ্চল, হাসিখুশি, চোখেমুখে দুষ্টুমি।
সামনে জারা। কালো গাউন পরা, চুল খোলা, চোখে হালকা কাজল—চোখ যেন এক মায়াজাল।
তার পাশে ফিহা, লাল গাউন পরে, মাথায় হালকা ফুলের টায়রা।
আরেক পাশে রিম—মিমের মামাতো বোন, একটু বেশিই চঞ্চল। আর সবার মাজে ছোর সদস্য জোহান। আরও কিছু বান্ধবী, কাজিন—সবাই আজ একটাই মিশনে: “গেট আটকানো।”
রাশেদের বারাত গেটের কাছে থামতেই মেয়েরা এগিয়ে আসে। ছেলে পক্ষ আর মেয়ে পক্ষের মাঝে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শুরু হয়।রিম চিৎকার দিয়ে বলে,
— “টাকা না দিলে গেট খুলব না!”
ফিহা যোগ করে,
— “হ্যাঁ, আজ গেট পার হতে হলে বকশিশ লাগবেই।”
রোহান হেসে বলে,
— “তোমরা জানো না, আজকাল গেট খোলার টাকাও ইনফ্লেশনে পড়ে গেছে!”
সবাই হেসে ওঠে।জাহেদ বলে,
— “এই গেটের তো দাম অনেক বেশি মনে হচ্ছে!”
রিম বুক ফুলিয়ে বলে,
— “এই গেট শুধু গেট না, এটা মেয়েপক্ষের মর্যাদা!”
মেয়েরা একসাথে হেসে ওঠে।
গুরুজনেরা ভেতরে পেন্ডেলের ভিতর চলে যায়। বাইরে এখন শুধু তরুণ তরুণীদের কোলাহল।
ডিজে বক্সে হিন্দি গানের তালে তালে আলো ঝলমল করছে চারপাশ।
আরমানের দৃষ্টি – জারা’র দিকে। আরমানের চোখ অন্যদিকে ঘুরছে না এক মুহূর্তও। জারা আজ যেন অন্য এক মানুষ। কালো গাউনে তার সৌন্দর্য যেন মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে আরমানকে।
চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে, চোখে হালকা কাজলের ছোঁয়া।আরমানের বুকের ভিতর হঠাৎ ধুকপুক করে ওঠে।
“আজ আমার বউ এমন লাগছে যেন পুরো পৃথিবী থমকে গেছে শুধু ওকে দেখার জন্য,”
মনে মনে ভাবে আরমান।
জারা একটু লজ্জা পেয়ে নিচু হয়ে চুলটা কানের পাশে সরিয়ে নেয়। কিন্তু তবুও চোখাচোখি হয়ে যায়। দুজনের মধ্যে এক চুপচাপ নীরবতা—চারপাশের সব আওয়াজ হারিয়ে যায় তাদের দৃষ্টির ভেতর।
এদিকে জাহেদ ফিহার দিকে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। মেয়েটা যেন প্রতিদিন নতুন একটা রূপ দেখায়। আজ ফিহা এমন লাগছে, যেন কোনো সিনেমার ফ্রেম থেকে নেমে এসেছে।
ফিহা টের পেয়ে হেসে ফেলে, বলে,
— “কি দেখছেন এভাবে বেয়াই?”
জাহেদ হেসে বলে,
— “তোমাকে! এভাবে সেজেছো, না দেখলে পাপ হবে আমার।”
তাদের কথোপকথন শুনে রোহান হেসে বলে,
— “বিয়েতে একটা জোড়া না, দুইটা জোড়া তৈরি হবে মনে হয়!”
সবাই হেসে ওঠে। গেটের ঝামেলা শুরু। রাশেদ তো একদম চিন্তায়। বিয়ের আসর কাছে, কিন্তু মেয়েরা গেট খুলছে না। জারা দুই হাত কোমড়ে রেখে বলে,
— “না, না, টাকা না পেলে কোনো ভাবেই ঢুকতে দিব না!”
রোহান বলে,
— “তোমরা কি ডাকাতি করছো?”
ফিহা হেসে বলে,
— “না, এটাকে বলে ট্রাডিশন।”
ছেলেরা দর কষাকষি শুরু করে, মেয়েরাও ছাড় দিচ্ছে না। হাসি, তর্ক, ঠাট্টা—পুরো পরিবেশ জমে উঠেছে।
আরমান এক কোণে দাঁড়িয়ে, কারো দিকে তাকাচ্ছে না। তার চোখ শুধু জারা’র দিকে।
জারা মাঝে মাঝে তার দিকে তাকাচ্ছে, আবার লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে।
জোহান আরমান কে দেখা মাএ ওর দিকে ছুটে যায়। আরমান হাসে জোহান কে দেখে।
__“ কাজ ঠিক মতো করেছিস শালাবাবু? ”
জোহান গর্ব করে বলে
__“ আমি কাজে গাফিলতি করি না। কাউকে পাশে ঘেঁষতে দেই নি। রাতে আমি বোনুর সঙ্গে ছিলাম। এমন কি দিনের বেলাও। ”
আরমান জোহানকে বাহবা দিয়ে বলে
__“ সাব্বাশ শালাবাবু! ”
এদিকে গেটের তর্কাতর্কি বেরে চলেছে।রোহান জারাকে বলে,
— “তোমাদের দাবি কত?”
জারা গম্ভীর মুখে বলে,
— “এক লাখ।”
ছেলেরা সবাই একসাথে চিৎকার দেয়,
— “কি!! এক লাখ?!”
জাহেদ বলে,
— “এই দামে তো পুরো গেটটাই কিনে ফেলব!”
ফিহা বলে,
— “চেষ্টা করে দেখুন!”
হাসির রোল পড়ে চারদিকে।জারা এবার সিরিয়াস মুডে বলে
__“ ভাইয়া কিপ্টামি না করে আমাদের দাবি পুরন করে দিন। আর আমরাও আপনাদের ছেড়েই দেই।”
ফিহা, রিম আর অন্য সবাই জারার সাথে তাল মিলায়।
এর মধ্যে হঠাৎ আরমান এগিয়ে আসে। সবাই অবাক হয়ে তাকায়। সে কোনো কথা না বলে গাড়ির কাছে যায়। গাড়ির দরজা খুলে ভিতর থেকে চারটা বান্ডেল পাঁচশ টাকার নোট বের করে আনে। সবাই অবাক।
আরমান সোজা গিয়ে জারা’র সামনে দাঁড়ায়।
জারা হতভম্ব—এতজনের সামনে ওর দিকে আসছে আরমান!
আরমান হালকা হাসি দিয়ে জারা’র হাতে টাকাগুলো ধরিয়ে দেয়,
— “গেট ছাড়ো। আজ আর কারো মুখ ভারী দেখতে চাই না। এখানে পুরো দুই লাখ আছে।”
জারা থমকে যায়। মুহূর্তে পুরো ভিড় চুপ।
রিমের মুখ লাল হয়ে যায় রাগে।আরমান তাকে না দেখে জারা’র হাতে টাকাগুলো দিলো?
কিন্তু আরমানের চোখে এমন এক দৃঢ়তা যে কেউ কিছু বলতে পারে না।
জারা হালকা কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— “এতো টাকা কেন দিচ্ছেন?”
আরমান নিচু গলায় বলে,
— “তোমার মুখে হাসিটা থাকলে, দাম যাই হোক, দিতেই পারি বেয়াইন।”
জারা চুপ করে যায়। তার গাল লাল হয়ে ওঠে।
পাশের মেয়েরা ফিসফিস করে, কেউ কেউ হেসে দেয়।
রিম দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— “আজ তো দেখি জারা’র ভাগ্য খোলেই গেছে।”
ফিহা হেসে বলে,
— “জ্বলে রিম আপু?”
রিম ফুঁসতে থাকে, কিন্তু কিছুই করতে পারে না।
কারণ আরমান যা দিয়েছে, সেটা তাদের দাবির থেকেও বেশি—এক লাখ টাকা!
শেষ পর্যন্ত মেয়েরা হাসিমুখে গেট ছেড়ে দেয়।
রোহান বলে,
— “এই প্রথম দেখলাম গেট খুলতে দুই লাখ লাগে!”
জাহেদ বলে,
— “এই গেট খুলেছে ভালোবাসায়, টাকায় না।”
সবাই হেসে ওঠে। জারা লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি করে পেন্ডেলের ভিতরে চলে যায়। টাকা গুলো একটা সেব জায়গায় রাখতে হবে।
আরমান জারা’র পিছনেই পেন্ডেলের দিকে হাঁটে।
রাশেদ ভেতরে চলে গেছে, এখন সবাই ব্যস্ত বিয়ের সাজে।
আরমানের চোখ এখনো জারা’র দিকেই।
ওর হাঁটার ভঙ্গি, চুলের উড়ন, গাউনের দোল—সব কিছুই যেন মন কেড়ে নিচ্ছে।
জারা মাঝে মাঝে ঘুরে তাকায়, আরমানকে দেখে চোখ নামিয়ে নেয়। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসি খেলে যায়।
পেন্ডেলের এক কোণে আরমানের বাবা বসে সব দেখছেন। তার পাশে আসিফ খান। আরমানের ছোট আব্বু। তাদের মুখে মৃদু হাসি। তিনি নিচু গলায় বলেন,
— “এটা তো সেই মেয়ে? সেদিন আরমান ছবি দেখিয়ে ছিলো যে। তার মানে?”
ঠিক তখন আরমানের ফুপা এসে বসে আরিফ খানের পাশে।
__“ তার মানে, এটা আরমানে বউ। ”
আরিফ খান আর আসিফ খান দুই জনে বিস্তারিত দৃষ্টিতে তাকায় ওনার দিকে।
__“ বউ মানে?”
আসিফ খান বলেন
__“ আরমান তাহলে সেদিন মজা করে নি।সব সত্যি বলেছে? ”
আরমান ওর ফুপাকে জারা এবং তার বিষয়ে সব বলেছে। তাই তিনি সব কথা খুলে বলেন তাদের। সব শুনার পর তাদের মুখের দৃশ্য পাল্টে গেছে। কিন্তু তারা অখুশি না। বরং ছেলের পছন্দ দেখে তাদের গর্ব হচ্ছে। কি সুন্দর পুতুলের মতো একটা মিষ্টি মেয়েকে পছন্দ করেছে।
আনিসুর রহমান এসে আরিফ খানের পাশে বসেন। জোহান অনেক চঞ্চল। তাই এদিকে সেদিকে ছুটাছুটি করছে। আর ওর মা জোহানকে দেখে রাখছে। ঠিক সেই সময় জারা আসে ওর বাবার কাছে। গেটের টাকাগুলো রাখার জন্য।
__“ আব্বু এই টাকা গুলো একটু ভাগ করে দিবে? আমরা ছুট,বড় ৩১ জন। সবাই যেনো সমান টাকা পায়। ”
আরিফ খান জারা’র মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। কি নিস্পাপ মেয়ে। মুখে এক আলাদা মায়া লেগে আছে। আর কি সুন্দর বিচার।
আনিসুর রহমান হেসে বলেন
__“ আচ্ছা আমার মা! সমান করে ভাগ করে দিবো।”
জারা এবার আরিফ খানের দিকে তাকায়। জারা জানে না এটা আরমানের বাবা। জারা সরল হাসি দিয়ে বলে
__“ আঙ্কেল! আপনি একটু আব্বুকে হেল্প করবেন প্লিজ। তাহলে তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। ”
আরিফ খান জারা’র কথায় সায় দেন। তিনি ওর বাবাকে হেল্প করবেন। জারা ধন্যবাদ যানি য়ে সেখান থেকে চলে আসে।
__“ আপনার মেয়ে ভাই সাহেব?” বললেন আরিফ খান।
আনিছুর রহমান টাকা গুলো আলাদা করতে করতে বলেন
__“ হ্যাঁ আমার মেয়ে!”
__“ আপনার মেয়ে খুব লক্ষী কিন্তু! ”
আনিছুর রহমান বলেন
__“ আল্লাহর রহমতে আমার তিন সন্তানই লক্ষী?”
আরিফ খান অবাক হয়ে বলেন
__“ আপনার তিন সন্তান?”
__“ হ্যাঁ ভাই সাহেব। দুই ছেলে আর এক মেয়ে। ”
আস্তে আস্তে তাদের কথা আরও ভারতে থাকে।
বিয়ের বাড়ির পুরো উঠোন ভরে গেছে মেহমানে। কারো হাতে চা, কারো হাতে শরবত, কেউ বা প্লেটে রোস্ট-পোলাও নিয়ে বসে আছেন বারান্দায়। গেট থেকে মঞ্চ পর্যন্ত রঙিন ফেস্টুনে ঢাকা। শানাইয়ের সুরে চারদিক মুখর, আর তার মধ্যেই চলছে এক মিষ্টি বিশৃঙ্খলা।
এই বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রে কে? অবশ্যই আরমান।
আরমানের চোখে আজ একটাই টার্গেট — একটা চুমু। এখানে আসার পর থেকে বউ তাকে পাওা দিচ্ছে না। যেনো তাকে চিনে না এমন ভাব।
সে সন্ধ্যা থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে জারা’র চারপাশে, আর জারা পালাচ্ছে তাকে দেখে। যেখানেই জারা যায়, কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা যায় পিছন থেকে হাঁটতে হাঁটতে আরমান হাজির।
__“ও বউ, একবার খালি একটা চুমু খেতে দাও, তারপর তার বিরক্ত করব না।”গলায় শিশুসুলভ অনুনয় নিয়ে বলে আরমান।
জারা মুখ ফিরিয়ে বলে,
— “চুপ করেন, কেউ শুনে ফেলবে।”
আরমান হেসে বলে,
— “শুনলে শুনুক, আমার চুমু লাগবে।”
জারা বিরক্ত হয়ে বলে,
— “আপনি বিয়ে বাড়িতে এসে এমন করছেন কেনো?”
আরমানের চোখে দুষ্টুমি,
— “এইসব না করলে বিয়ের আনন্দ থাকে নাকি বেয়াইন।”
জারা চোখ পাকিয়ে সরে যায়।কিন্তু পালানো যায় কোথায়?পেছনেই তো ওর “মিষ্টি ঝামেলা” লেগে আছে।
বাড়ির এক কোণে খাবারের টেবিল সাজানো।
মেহমানেরা লাইনে দাঁড়িয়ে পোলাও, মুরগির রোস্ট, কাবাব নিচ্ছে। জারা ওদিকে চলে যায় যেন ভিড়ের আড়ালে একটু স্বস্তি পায়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর কানে ভেসে আসে পরিচিত কণ্ঠ—
__“ও বউ, তুমি কোথায়?”
জারা বিরক্ত মুখে ঘুরে তাকায়। দেখে আরমান মুখে হাসি, চোখে দুষ্টামি নিয়ে দাড়িয়ে আছে । জারা’র ভয়ে প্রাণ বের হয়ে আসার উপক্রম। এখন যদি তার মা-বাবা কেউ দেখে ফেলে তাহলে তো বিপদ হয়ে যাবে।
জারা ঠোঁট কামড়ে বলে,
— “ মাছ খান, পোলাও খান, মুরগির রান খান! এতো খাবার রেখে…চুমু খাওয়ার জন্য কেন বিরক্ত করছেন ।”
আরমান হাসতে হাসতে বলে,
— “এসবে পেট ভরে, কিন্তু মন ভরে না বউ।”
জারা এবার পুরো রেগে গিয়ে বলে,
— “আপনার মনও না পেটের মতো বড় হয়ে গেছে।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোহান, জিনিয়া, জাহেদ আর ছায়মা হাসি চাপতে না পেরে মুখে হাত দেয়। জারা চুপচাপ ঘুরে চলে যায় অন্য দিকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ওর মুখেও হালকা হাসি। এই মানুষটার বেয়াদপি যেন কখনো শেষ হয় না।
ওদের এই ছোটখাটো তর্ক, হাসি, পালানো—সবই চোখ এড়িয়ে যায়নি আরিফ খানের। তিনি কিছুক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছেন, আরমান কারো পেছনে পেছনে ঘুরছে, আর সেই মেয়েটা মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে পালাচ্ছে। চেনা মুখ, তবুও একটু দূর থেকে দেখায় বোঝা যাচ্ছে না কে।
অবশেষে তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,
— “আরমান, দিকে আয়।”
আরমান একটু চমকে ওঠে।জারা’র দিকে তাকিয়ে বলে,
— “বাঁচলে বউ, এখন বাপের ডাক এসেছে বলে।”
জারা হাসি চেপে ফিসফিস করে বলে,
— “গিয়ে শুনুন, কি বলে।”
আরমান মুখে একটু গম্ভীর ভাব এনে ধীরে ধীরে বাবার কাছে যায়। চলতে চলতে গলায় হালকা বিড়বিড়—“এখন আবার বকুনি খেতে হবে…
আরিফ খান চেয়ারে বসে আছেন, পাশে কয়েকজন সিনিয়র অতিথি। তিনি আরমানকে পাশে ডাকেন, সবাই চলে গেলে নিচু স্বরে বলেন,
— “ও মেয়ে টা কে?”
আরমান একটু ভ্যাবাচ্যাকা খায়,তারপর শান্ত গলায় বলে,
— “আমার বউ।”
আরিফ খান কপাল কুঁচকে তাকান।বোঝে যান আরমান জারা’র পিছু করছে। এই বিষয় টা উনার খুব ভালো লাগে কিন্তু প্রকাশ করে না। বরং গম্ভীর মুখে বলে
__“ ওই মেয়ে তোর বউ এটা সত্যি? ”
__“ ১০০% সত্যি! ”
তিনি কপাল কুঁচকে বলেন
__“ এই বিয়ের ভিড়ে তুই ওর পেছনে পেছনে ঘুরছিস কেন?”
আরমান নির্দোষ মুখে বলে,
— “ আরে ভাই,আমার বউ আমি ঘুরবো না?”
আরিফ খান গম্ভীর হয়ে বলেন,
— “ভাই?আমি ভাই হই তোর হতচ্ছাড়া?”
আরমান জ্বি কাটে।কি বলে ফেলেছে সে এটা
__“ সরি আব্বু! মিস্টেক হয়ে গেছে। ”
আরিফ খান আরমানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলেন
__“ এখন তোকে কেউ থামাচ্ছে না, কিন্তু সমাজ আছে, লোক আছে। সবাই দেখছে তোর চলাফেরা। একটু সামলে চল।”
আরমান এবার হালকা হাসে,
— “আব্বু, তুমি তো এমন বলছো যেন আমি অপরাধ করছি।”
আরিফ খান গলা শক্ত করে বলেন,
— “লোকজনের মাঝে এইসব ঢং ঠিক না। আর ওই মেয়ের থেকে দূরে থাকবি।”
আরমান হেসে বলে,
— “আব্বু, আমি তো শুধু একটা চুমু চেয়ে ছিলাম।”
আরিফ খান এবার চোখ বড় করে তাকান,
— “কি বললি?”
আরমান দ্রুত বলে,
— “না না, মানে… শুভেচ্ছার চুমু!”
চারপাশের বাতাস হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
আরিফ খান গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর চোখ ঘুরিয়ে হালকা নিঃশ্বাস ছাড়েন,
— “তুই কখনো বদলাবি না।”
আরমান হেসে বলে,
— “বদলালে আমি আমি থাকব না বাবা।”
আরিফ খান এবার মুখে সামান্য হাসি টেনে বলেন,
— “যা, আর ওই মেয়েকে আমার পছন্দ না। ওর কাছ থেকে একটু দূরে থাক।”
আরমান মুখ বাঁকা করে বলে,
— “বউ আমার! সংসার করব আমি! তোমার পছন্দ দিয়ে আমি কি করব?”
আরিফ খান মাথা নাড়েন,
— “বেয়াদব ছেলে। যা এখানে থেকে। মেয়ের বাবা তোকে দেখছে কিন্তু সাবধান। এমন কিছু করিস না যাতে মান খোয়া যায়। ”
__“ ওকে আব্বু!”
দুজনেই হাসে। একটা ছোট্ট, উষ্ণ মুহূর্ত তৈরি হয় বাবা-ছেলের মাঝে।
ওদিকে জারা দূর থেকে সব দেখছিল। আরিফ খান আর আরমানের কথা বলতে দেখে বোঝে যায় এটা আরমানে বাবা। সে ছোট্টে মিমের কাছে যায়। মিম লাল টুকটুক বউ সেজে বিছানায় বসে আছে। মিমের কাছে শুধু ফিহা একা বসে আছে। ফিহার হাতে এক টুকরো মিষ্টি, সে তা জারাকে খাইয়ে বলে,
— “দেখ জানু, তোর বেয়াই সাহেব আজ একদম পাগল হয়ে গেছে তোর জন্য ।”
মিম খিলখিলিয়ে হাসে ফিহার কথা। সে বলে,
— “জারার বেয়াই সাহেব কিন্তু স্পেশাল।
স্বামী +বেয়াই ?”
জারা লজ্জা পায় দুই বান্ধবীর কথা শুনে। ওদের হাসির আওয়াজ মিশে যায় চারপাশের হৈচৈয়ের ভেতর।
আরিফ খানের সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে আরমান আবার ভিতের দিকে আসে। তার চোখ সোজা জারা’র দিকে যায়—যেন রাডার টার্গেট লক করেছে।
কিন্তু এবার জারা ওকে আগে দেখে নেয়।
চোখে ঠাট্টার দৃষ্টি, ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি।
সে মিমের দিকে ঝুঁকে বলে,
— “দেখ, আবার আসছে।”
আরমান একটু দূর থেকে হাত তুলে বলে,
— “বউ, দূরে থাকলেও চোখে তো রাখবই।”
জারা চোখ উল্টে হেসে ফেলে। মিম হেসে বলে,
— “ভাইয়াকে কি পাগল করলি রে জানু?তোকে ছাড়া কিছু বোঝে না?”
জারা মৃদু হাসে,
— “ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, হয়তো পাগল করেছি।”
রাত গাঢ় হয়েছে। চারিদিকে আলোর ঝলকানি, ফুলের গন্ধ আর মানুষের কোলাহলে পুরো পেন্ডেল জমজমাট। চারদিকে শুধু হাসি, আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরে গেছে পুরো পরিবেশ।
স্টেজের মাঝখানে বসেছে বর–রাশেদ। গায়ে খয়েরী পাঞ্জাবি, মুখে মিষ্টি হাসি। পাশে বসা আরমান, রোহান, জাহেদ, জিনিয়া,জেরিন আর ছায়মা । সবাই আজ উৎসবের সাজে। মিমের বান্ধবীরা ব্যস্ত ফুল ছিটাতে, কেউ গিফট সাজাচ্ছে, কেউ আবার সেলফিতে ব্যস্ত।
ফিহা আর জারা যখন মিমকে নিয়ে পেন্ডেলে ঢোকে, তখন পুরো পেন্ডেল মুহূর্তেই চুপ। মিমের মাথায় লাল ওড়না, গলায় ফুলের মালা, চোখে হালকা কাজল আর ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। একেবারে সিনেমার মতো লাগছে। জিনিয়া আর ছায়মা চিৎকার করে ওঠে
—“বউ আসছে! বউ আসছে!”
সবাই উঠে দাঁড়ায়। রাশেদের চোখে থমকে থাকা এক রকম অবাক মুগ্ধতা। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, এই মেয়েটিই আজ তার বউ হতে যাচ্ছে। আরমান পাশে বসে রোহান কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলে,
___“দোস্ত আগে বিয়ে করেও লাভ হয় নি তোর। কারণ তোর পরে বিয়ে করে রাশেদ আগে বাসর করবে। ছিঃ কি কপাল তোর!”
আরমান কটমট দৃষ্টিতে তাকায় রোহামের দিকে। রাশেদ লজ্জায় কিছু বলে না, শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে হাসে। জাহেদ, রোহান আর জিনিয়া সবাই মিলে রাশেদকে নিয়ে মজা শুরু করে দেয়।
রোহান বলে,
__ “দেখে তো মনে হচ্ছে, এখনই বর নয়, বরফ হয়ে গেছিস!”
জাহেন যোগ করে,
__ “এইভাবে তাকালে মেয়েটা পালাবে ভাই, চোখ নামাও!”
মিম স্টেজে আসে, তার পাশে মিমের বান্ধবী , ফিহা আর জারা এবং মিমের কাজিন রা। ফুলের ঝুড়ি থেকে একমুঠো গোলাপ ছিটিয়ে দেয় রাশেদের দিকে। আরমান হাততালি দিয়ে ওঠে,
__“আমার আবার বিয়ে করতে মন চাচ্ছে রে রোহান। শুধু ভালো একটা মেয়ে পাচ্ছি না !”
জারা সঙ্গে সঙ্গে তাকায় কড়া চোখে। আরমান মুখে হাসি চেপে পাশ ফিরিয়ে নেয়।
ক্যামেরাম্যান প্রতিটা মুহূর্ত ধরে রাখছে। বরের হাতে আংটি, কনের হাতে মেহেদি রাঙা আঙুল। দুজনের হাত এক হয়ে যায় আলোর ঝলকে। চারপাশে কেউ “ওই হে হে হে” করে উল্লাস করছে, কেউ আবার হালকা বাঁশি বাজাচ্ছে।
এই হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই আরিফ খান এগিয়ে আসে। তিনি শান্তভাবে সবাইকে দেখে বলেন,
__“সবাই আনন্দ করো, কিন্তু একটু পর হুজুর আসবেন। সবাই যেন সময় মতো বসে।”
সবাই মাথা নাড়ে। রাশেদ উঠে দাঁড়িয়ে বাবার মতো করে সালাম করে।
নিকা শুরু হয়। হুজুরের কণ্ঠে গম্ভীর অথচ মিষ্টি সুর—“রাশেদ রাজ, আপনি কি মিম আক্তারকে মোহরানা হিসেবে দশ লাখ টাকায় কবুল করলেন?”
রাশেদ গলা শক্ত করে বলে,
__ “কবুল।”
চারপাশে করতালিতে ভরে ওঠে পুরো পরিবেশ। মিমের চোখে তখন হালকা জল।
হুজুর এবার মিমকে বলে,“ মা আপনি কি এই বিয়েতে কবুল করছেন?”
মিমের ভয়ে গলা শুকিয়ে যায়। মিমের বাবা এসে মেয়ের পাশে বসেব। মেয়েকে সাহস দেন। মিম বাবার দিকে তাকিয়ে কান্না করে দেয়।
আরিফ খান এবং আসিফ খান এসে মিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন
__“ ভয় পেও না মা! তুমি আমাদের আরেক টা মেয়ে হয়ে আমাদের ঘরে যাবে! সেখানে তোমার কোনো কষ্ট হতে দিব না আমরা। ”
রাশেদের চোখ ছলছল করছে। এই মানুষ গুলো তাকে কতো ভালোবাসে। অবশেষে মিম কবুল বলেই ফেলে
__“ আমি এই বিয়ে কবুল করছি!”
নিকার পরানো শেষ হয় রাত দশটায়।
রোহান জিনিয়ার হাত ধরে ধীরে বলে,
__ “এমন ভাবে আমাদের বিয়ে কবে হবে চাঁদ সুন্দরী?”
জিনিয়া চুপচাপ হাসে, পাশে দাড়িয়ে থাকা আসিফ খান রোহানের কথা শুনে ফেলে
__“ বিয়ে তোর কপালে জুটবে না হতচ্ছাড়া। ”
রোহান মুখ বাঁকিয়ে বলে
__“ কুটনা শশুড়!”
রাশেদ আর মিম আয়নায় একে অপরের মুখ দেখে। এটা একটা ট্রেডিশনাল নিয়ম। তাদের মুখে হাসি লেপ্টে আছে। ফ্ল্যাশলাইটে জমে ওঠে সেই দৃশ্য। আরমান দূর থেকে তাকিয়ে বলে,“আল্লাহ ওদের মতো করে আমাদেরও সুখ দিও।” জারা পাশে দাঁড়িয়ে তাকায়, কিছু বলে না—শুধু মুচকি হাসে।
রাত গভীর। পেন্ডেলের আলো একে একে নিভে যাচ্ছে, শুধু গেটের পাশের দিকের লাইটগুলো এখনো জ্বলছে ক্ষীণ আলোয়। বিদায়ের সময় এসে গেছে। চারদিকে কান্নার রোল, এক অজানা বেদনায় ভরে উঠেছে পরিবেশ। মুহূর্ত আগেও যেখানে হাসি, গান আর আনন্দে ভরে ছিল জায়গাটা, এখন সেখানে শুধু চোখের জল আর সান্ত্বনার শব্দ।
মিমের মা জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন মেয়েকে,
“একটা সময় কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতাম, আজ পরের ঘরে দিয়ে দিলাম…”বাবা চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, মুখে কোনো শব্দ নেই—শুধু চোখের কোণ বেয়ে নামছে অশ্রু। মিমের গলা বসে গেছে কান্নায়, কথাও ঠিক করে বলতে পারছে না। ওর বুকের ভেতর ধকধক করছে—নিজের বাড়ি, নিজের মানুষ, নিজের কোণ—সব আজ ফেলে যেতে হচ্ছে।
ফিহা আর জারা দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। দুজনের চোখ লাল, কান্না চেপেও বারবার চোখ মুছছে। তারা জানে, এখন থেকে মিমের সাথে তাদের আগের মতো প্রতিদিন দেখা দেবে না, একসাথে গল্প হবে না, হাসাহাসি হবে না। একসাথে কলেজ যাওয়া হবে না।
জারা ফিসফিস করে বলে,
__“ভাবতেই পারছি না, মিম আজ আমাদের
থেকে বহু দূরে চলে যাচ্ছে…”
ফিহা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, চোখ নামিয়ে। হঠাৎ পাশে থাকা জাহেদ হাত বাড়িয়ে ফিহার কাঁধে রাখে, নিচু গলায় বলে,
__“ তোমরা কান্না করো না প্লিজ। ও তাহলে আরও ভেঙ্গে পরবে।”ফিহা চোখ মুছে মাথা নাড়ে।
আরিফ খান, আসিফ খান এগিয়ে আসেন মিমের বাবা–মায়ের দিকে।আরিফ খান শান্ত কণ্ঠে বলেন,__“আপনার মেয়েকে আমাদের ঘরে সম্মান দিয়ে রাখব। রাশেদ ভালো ছেলে। ইনশাআল্লাহ আপনার মেয়ে সুখে থাকবে।”
মিমের বাবা শুধু হাত ধরে বলেন, “আমি জানি ভাই, আমার মেয়ে আপনাদের কাছে ভালো থাকবে।”
ওদিকে গাড়িগুলো প্রস্তুত। ফুলে সাজানো গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে রাশেদ। মিমের চোখে জল, ঠোঁটে কাঁপুনি। রাশেদ ধীরে বলে,
___“এটা তোমার শেষ কান্না মিম। এর পর থেকে আর কোনো দিন তোমার চোখে জল আসতে দিব না। আমরা নতুন ঘর সাজাব।সেখানে শুধু সুখ বিরাজ করবে।”
মিম কিছু বলে না, শুধু মাথা নিচু করে গাড়িতে উঠে বসে। সঙ্গে সঙ্গে আবার কান্নার স্রোত ছুটে যায় চারদিকে।
এই সময় আরমান জারার পাশে এসে দাঁড়ায়। জারা চোখ মুছে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ।
আরমান নিচু গলায় বলে,
__“কান্না করো না বউ, কয়দিন পর আমিও তোমাকে নিয়ে যাব নিজের ঘরে।”
জারা চমকে তাকায় তার দিকে। চোখে একফোঁটা জল চকচক করছে। আরমান হাসতে হাসতে বলে,
__“তখন কিন্তু কেউ কাঁদবে না, তখন হাসবে সবাই। আমাদের নতুন সংসার হবে, বুঝলে?”
জারা ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে, চোখ নামায় নিচের দিকে। নিজের মনেই ভাবে—“সত্যিই তো, কিছু বিদায় হয় নতুন শুরু করার জন্য।”
এক এক করে সবাই বিদায় নিচ্ছে। গাড়িগুলোতে উঠছে ছেলে পক্ষের লোকজন। ফ্ল্যাশ লাইটে শেষ কিছু ছবি তোলা হচ্ছে—শেষ মুহূর্তের স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা।
সবাই যখন গাড়িতে উঠে পড়েছে, হঠাৎ পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠে ভেসে আসে—
__“এই মেয়ে এদিকে এসো।”
জারা থমকে যায়।এই গলাটা সে শুনেছে। তাই গলা চিনতে দেরি হয় না—আরিফ খান। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যায়। ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়, দেখে আরিফ খান পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আলোয় মুখটা কঠিন, কিন্তু চোখে একরকম মায়া।
আরিফ খান বলেন,
__“আর একটু কাছে আসো।”
জারা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, মাথা নিচু করে। চারপাশ নিঃস্তব্ধ, শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের হালকা শব্দ।
আরিফ খান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন,
__“ নাম কী? ”
__“ জ্বী..! মা.. মানজারা!”
__“ আরমানকে চিনো তুমি? ”
জারার গলা কেঁপে ওঠে, শুধু বলে,
__“জী আঙ্কেল…”
আরিফ খান মাথা নাড়ে, মৃদু হাসে। মেয়ে টা ভয়ে কাপছে।
__“ বিয়ে হয়েছে তোমাদের? ”
এই কথা শুনার পর জারার রুহু অব্দি কেঁপে। ভয় আরো বেরে যায়। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
__“ কি হলো বলছো না কেন?”
জারা এবার ভয় পেয়ে কান্না করে দেয়। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে
__“ হ্যাঁ.. হয়েছে! ”
__“ তোমার পরিবার যানে এসব?”
__“ ন…না! ”
আরিফ খান ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখেন জারা’র অবস্থা দেখে।
__“ আমার ছেলেকে কীভাবে বস করলে মেয়ে?যে আমাদের না যানি বিয়ে করে নিলো? ”
জারা কোনো কথা বলে না। শুধু মাথা নিচু করে কান্না করে। আরিফ খান আরো কড়া গলায় বলেন
__“ আমার ছেলের থেকে দূরে থাকবে তুমি! ”
জারা এবার আরও জোরে কান্না করে দেয়। হঠাৎ করে আরিফ খানের পায়ে পরে যায় জারা।
__“ প্লিজ আঙ্কেল! এমন বলবেন না। আমি ওনাকে ছাড়া বাঁচবো না!আমি ওনাকে সত্যি অনেক ভলোবাসি। ” বলতে বলতে হেঁচকি উঠে যায় জারা’র। চোখের পানির বাদ মানে না তার।
___“ ভালোবাসো আমার ছেলেকে?”
জারা হেঁচকি তুলে বলে
___“ অ…অ.অনেক ভালোবাসি। প্লিজ ওনাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরাবেন না। ”
আরিফ খান আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। উচ্চ সুরে হেসেই ফেলেন। জারা ওনার হাসি দেখে বোকা বনে যায়। আরিফ খান জারাকে মাটি থেকে তুলে দাঁড় করান। পকেট থেকে মোবাইল বের করে বলেন
__“ শুনলে ফারিয়া? তোমার বউ মার কথা। এই মেয়ে তোমার ছেলে পাগলের মতো ভালোবাসে। তাই তো আমার পায়ে পরেছে তোমার ছেলের জন্য। ”
জারা শুধু বোকার মতো তাকিয়ে আছে। সে কিছুই বোঝতে পারছে না। তার সাথে কি হচ্ছে এসব। আরিফ খান ভিডিও কল করেন ফারিয়া বেগম কে।
__“ এই মেয়ে! নাও তোমার শাশুড়ী আম্মার সাথে কথা বলো!”
জারা একবার মোবাইলের দিকে তাকায় তো আরেক বার আরিফ খানের দিকে। আরিফ ইশারা করে কথা বলতে।জারা কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইল টা নিয়ে মুখেের সামনে ধরে।
__“ ওমা কি সুন্দর দেখতে আমার বউ মাকে! আমার ছেলের পছন্দ আছে বলতে হবে। ”
ফারিয়া বেগম এর পাশে জেসমিন বেগম ও বসে ছিলেন। তিনিও মহা আনন্দে বাড়ি বড় ছেলের বউ দেখেন। তারা দুই জা হা করে জারার মুখে দিকে তাকিয়ে থাকে। জারা ভদ্রতা দেখিয়ে সালাম দেয়।
__“ কে..কেমন আছেন আন্টি?”
ফারিয়া বেগম জারা কে ধমক দিয়ে বলেন
__“ এই মেয়ে আন্টি কী? আম্মু বলবি। আমি তোর শাশুড়ী হই না।”
জারা অবিশ্বাস ভাবে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলতে পারে না। আরিফ খান জারা’র কাছ থেকে মোবাইল টা নিয়ে নেন। জারা’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন
__“ ভয় পেয়েছিস মা? আমার তোর আর আরমানের বিষয়ে সব জানি। আমি তো শুধু তোর সাথে মজা করছিলাম। ”
জারা’র খুশিতে চোখে পানি এসে যায়।
__“ শুন আমার কোনো মেয়ে নেই। আজ থেকে তুই আমার মেয়ে + ছেলের বউ! মনে থাকবে?”
জারা উপর নিচে মাথা নেড়ে বোঝায়, মনে থাকবে। আরিফ খান জারাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন
__“ লক্ষী মেয়ে! এই নে এটা রাখ! ”এই বলে জারা’র হাতে একটা কার্ড গুঁজে দেয়।
জারা হাতের মুঠো খুলে দেখে ব্যাংক কার্ড।জারা তাকায় আরিফ খানের দিকে।
__“ এটা তোর। আজ প্রথম ছেলের বউয়ের মুখ দেখলাম, কিছু না দিলে কেমন দেখায় বল? তাই এটা রাখ। এটাতে সাত লাখ আছে আরও লাগলে আমাকে বলবি মা, আমি
সাথে সাথে পাঠয়ে দিব! ”
কিন্তু জারা এটা নিতে রাজি না। সে বলে
__“ আ..আমি এটা নিতে পারব না আঙ্কেল? ”
এই মেয়ে, পাকামো আমি পছন্দ করি না। তাই যা দিলাম চুপচাপ রাখ। আর তোদের বাড়িতে খুব তাড়াতাড়ি আসবো বিয়ের কথা পাকা করতে।
এই বলে তিনি ধীরে গাড়ির দিকে হাঁটে। জারা কার্ডটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। ঠিক তখনই রিম এসে দাঁড়ায় জারা’র কাছে। দৌড়ে এসেছে মনে হচ্ছে।
__“ জারা তোমাদের খুজছিলাম। তোমাকে কে যেনো খুঁজছে। ওই রাস্তায় দাড়িয়ে আছে। ”
জারা একমুহূর্ত স্থির হয়ে যায়। সে মনে করে আরমান ওর জন্য অপেক্ষা করছে। তাই আর সময় ব্যয় করে না। দৌড়ে চলে যায় রাস্তার দিকে।
এদিকে আরমান জারাকে সারাবাড়ি খুঁজে ফেলেছে কোথাও পায় নি। রাত অনেক, চেলে যাবে। বর পক্ষের লোক সবাই চলে গেছে, শুধু সে একা রয়ে গেছে। তাই বলার জন্য খুঁজছে। ফোন করেছে অনেক বার কিন্তু মোবাইল বন্ধ বলছে। আরমান জারাকে খুঁজতে খুঁজতে গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়। ঠিক তখন রিম গেট দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে। আরমানের ইচ্ছে না থাকা শর্তেও রিম কে বলে
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৯
__“ মানজারা কে দেখেছেন কোথায়ও?”
রিম একটু বনিতা করে বলে
__“ ওই হ্যাঁ দেখেছিলাম। কিন্তু? ”
আরমান চিন্তিত কন্ঠে বলে
__“ কিন্তু কী?”
__“ আমি জারা’কে দেখেছি ওই রাস্তার মুড়ে দাঁড়িয়ে একটা ছেলের সাথে কথা বলতে। ”
ব্যাস আর কিছু শুনার প্রয়োজন মনে করলো না আরমান। পাগলের মতো দৌড়ে চলে আসে রাস্তার দিকে। একটু সামনে এগিয়ে যেতেই ওর চোখে যা পরলো তা দেখে ওর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
