Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬১
সোহানা ইসলাম

রাতের অন্ধকারে সব কিছু নিস্তব্ধ।আকাশে একটাও তারা নেই। কনে বিদায়ের পর বাড়ির আসেপাশের সব আত্মীয়রা তাদের বাড়িতে চলে যায়। বাড়িটা এখন শান্ত হয়ে আছে। ঝিঝি পোকার ডাক ছাড়া কিছু শুনা যাচ্ছে না। জারা’র মা বাবাও জোহানকে নিয়ে বাড়ি চলে গেছে।ফিহা আর জারাও চলে যেতে, কিন্তু ওরা চলে গেলে মিমের মা বাবা একা হয়ে যাবে। তাই মিমের নানুর বাড়ির কাজিনদের সঙ্গে আজকের রাত টা ওরা দুজনও থাকবে।
জারা রাস্তার মুড়ে এসে দেখে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ টা কে দেখে খুব চেনে মনে হচ্ছে তার। এটা আরমান না জারা বোঝে গেছে।
রাস্তার বাতিগুলো নিস্তেজ আলো ছড়িয়ে যেনো কাঁদছে। ছায়াটা জারার দিকে এগিয়ে আসে ধীরে। লোকটা মুখ স্পস্ট হতেই জারা থমকে যায়। সে এটা কাকে দেখছে। বিস্বাশ হচ্ছে না। অবাক হয়ে মুখে হাত চলে যায় জারা। চোখ ছলছল করছে। এক দৌড়ে গিয়ে লোকটাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়। জারার কণ্ঠে কাঁপন নিয়ে বলে

__“ তু…তুমি কখন এসেছো ভাইয়া? ”
এতো দিন পর তার ছোট্টো বোনটা কে সামনে দেখে জাহিরেরও চোখে পানি চলে আসে।
__“ এক ঘন্টা হবে এসেছি। তুই বাড়িতে নেই শুনে দেখা করতে চলে এলাম বুড়ি!”
জারা জাহিরকে জড়িয়ে ধরে বলে
__“আমি তোমাকে অনেক মিস করেছি… প্লিজ, আর যেও না…”
জাহির বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে
__“ এই তো এখন আমি চলে এসেছি আর কোথাও যান না। ”
জারা হাসি মুখে বলে
__“ প্রমিজ! ”
জাহির জারা’র নাক টান দিয়ে বলে
__“ পাক্কা প্রমিজ! আমার পাখি!”

তাদের কথা আরমানের কানে কথাগুলো ঢোকে, কিন্তু হৃদয়টা যেনো পাথর হয়ে যায়।দূর থেকে সে দেখে, জারা এক ছেলেকে জড়িয়ে আছে। আরমান রাস্তার মুড়ে এসে দেখে জারা ওই ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে বলছে ‘ আমি তোমাকে অনেক মিস করেছি, প্লিজ আর যেও না।এই কথা গুলো ওর হৃদয় কে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়।এক মুহূর্তে তার শরীরের রক্ত ফুটে ওঠে। চোখ লাল, মুখ শক্ত। পা কাঁপতে থাকে কিন্তু মুখে কোনো কথা আসে না।শুধু রাগে, অপমানে বুকটা ভারী হয়ে ওঠে। আরমান রাগে ওর হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। লাল চোখে জারা’র দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ জারার চোখ যায় দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরমানের দিকে। জারা তাকাতেই থমকে যায়।আরমান ওর দিকে কেমন চোখে তাকিয়ে আছে। জারা ভয় শুকনো ঢোক গিলে। তাড়াতাড়ি জহিরকে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আরমান আর সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। চলে যায় সে যেদিকে ওর গাড়ি রাখা আছে।জারা আন্দাজ করতে পারে আরমান কোনো কারণে রাগ করেছে।
জারা জোর করে মুখে হাসি টেনে আনে। কিন্তু ঠোঁট কাঁপে—

__ “ভাইয়া তুমি তাহলে এখন বাড়ি চলে যাও। ”
জাহির জারাকে বলে
__“ কেন বুড়ি তুই যাবি না? আমি তো তোকে নিতে আসলাম। তোর জন্য অনেক গিফট এসেছি আমি দেখবি না? ”
জারা হাসে বড় ভাইয়ের কথা শুনে। মন চাচ্ছে ভাইয়ের হাত ধরে ছোট্টে চলে যেতে। কিন্তু এখন তা সম্ভব না। ওর স্বামীজান রাগ করেছে মনে হয়। তাই আগে স্বামীজানের রাগ ভাঙ্গাবে সে।
__“ ভাইয়া তুমি চলে যাও আমি কাল সকালে যাব।এখন যদি চলে যাই আমরা তাহলে মিমের বাবা মা একে হয়ে যাবে। তাদের কষ্ট আরও বেরে যাবে। ”
জাহির বোঝলো বোনের কথা। সে ঠিকই বলেছে।
তারপর ও চিন্তা থেকেই যায়।
__“ তুই একা থাকবি বুড়ি? নাকি তোর সাথে কেউ আছে? ”
__“ ফিহা আছে আমার সাথে। এখন তুমি যাও আর কাল সকালে আমার গিফট গুলো যেনো সব পাই?”
জাহির জারা’র হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে
__“ আচ্ছা বুড়ি! এখন তাহলে বাড়ির ভিতরে যাহ। অনেক রাত হয়ে গেছে, প্রায় মধ্য রাত। আর কাল সকাল সকাল বাড়ি চলে আসবি? ”
জারা ‘আচ্ছা ভাইয়া’ বলে দৌড়ে চলে যায় আরমান যেদিকে যায়। জারা দেখে আরমান গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। জারা তাড়াতাড়ি করে গিয়ে আরমানকে বাদা দেয়।
__“ আ..আপনি আমাকে না বলে চলে যাচ্ছেন কেন? ” মুখ ফুলিয়ে বলে জারা। গলায় অভিমান মিশে আছে।

আরমান ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামে, চোখে আগুন জ্বলছে। বুক পুড়ছে তার। এতো কষ্ট সে আজ-অব্দি পায় নি। কোনো কথা না বলে জারাকে “ ঠাসসসসসস ”করে চড় বসিয়ে দেয়। পর পর আরও কয়েকটা দেয়।
জারা হঠাৎ আরমানের আক্রমণ বোঝতে পারে না। তাল সামলাতে না পেড়ে মাটিতে পড়ে যায়। জারা গালে হাত দিয়ে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে আরমানের দিকে। তাকে বিনা কারণে মারছে।
আরমান জারাকে মাটি থেকে টেনেহিঁচড়ে তুলে। আরমান জারা’র বাহু্ খুব শক্ত করে ধরার ফলে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে। কিন্তু কিছু বলে না শুধু আরমানের দিকে তাকিয়ে থাকে।
__“ আমাকে কেন ঠকালি বউ। আমি তো তোর কাছে একটু শান্তি খুঁজেছিলা আর তুই আমাকে জেন্ত করব দিয়ে দিলি।” আরমানের চোখে রাগ কিন্তু জল চিকচিক করছে। কিন্তু হিংস্রতা মিশে তার কন্ঠে।
জারা আরমানের কথায় থমকে যায়। কি বলছে এসব? সে কখন ঠকালো তাকে? সে তো এমন কিছু করেনি যাতে আরমান ওকে ভুল বোঝতে পারে। তাহলে? জারা’র খটকা লাগে। তাহলে আরমান ওকে জাহিরের সাথে দেখে এমন টা বলছে।আরমানের ভুল ভাঙতে জারা তাড়াতাড়ি করে বলে

__“ না…না আপনি যা বোঝছে তা না? ”
আরমানের কন্ঠ শক্ত। জারা’র দুই বাহু ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে বলে
__“ কি বোঝছি আমি? বল.. বল জানোয়ারের বাচ্চা! বল?”
আরমানের চিৎকারে জারা ভয় পেয়ে যায়। পুরো শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে। আরমান ওর এমন খারাপ ব্যবহার এর আগে কখনো করে নি। আরমনের কথা গুলো জারার বুকে বিষের মতো লাগছে। জারা ফুপিয়ে কেঁদে উঠে।
__“ আ..আপনি আমাকে ভুল বোঝছেন?”
__“ভুল বুঝছি?” গলায় তাচ্ছিল্যের হাসি।
__“ আমার বউ হয়ে অন্য ছেলের গলায় হাত দিয়েছিস,জড়িয়ে ধরেছিস,মিস কেরেছিস বলেছিস তুই..আর.. আর বলছিস আমি ভুল বুঝছি তোকে ?”
জারার চোখে পানি। জারা কাঁপা কণ্ঠে বলে,
__ “ও তো আ..আমার—”
আরমান থামিয়ে দেয়, গর্জে ওঠে—

__“চুপ! মুখ বন্ধ রাখ! তোর মতো মেয়ে শুধু নাটক জানে। ভালোবাসতে না, ছলনাময়ী!”
জারার চোখে পানি জমে আরও। সে বোঝাতে চায়, কিন্তু আরমান একটুও শুনতে চায় না।
__“তুই আমার বউ হয়েও অন্য পুরুষের কাছে গিয়েছিস ! তোর লজ্জা হয় না, হ্যাঁ?” বলে জারাকে ধাক্কা দিয়ে নিজের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দেয়।
আরমানের এমন তীক্ষ্ণ কথায় জারা’র বুক জ্বলে উঠে। চোখ দিয়ে অনবরত পানি পরছে ওর।
__“ সা…স্বামীজান আমার কথা শুনোন!”
আরমান ক্রুদে ফেটে যাচ্ছে। মন চাচ্ছে সব ধ্বংস করে দিতে।
__“ এই..এই তোর ওই নোংরা মুখে আমাকে এই নামে ডাকবি না! ”
জারা এগিয়ে আসে। আরমানের হাত ধরে বলতে চায়
__“আমি কসম খা..”

আরমান আবার জারা’কে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়।যেনো নোংরা লাগছে ওর গায়ে।
__“কসম!” আরমান হেসে ওঠে বিকটভাবে।
__“তোর এই নোংরা মুখ দিয়ে মিথ্যা কসম খাস না। মিথ্যা ভালোবাসার গল্প ভালো, কিন্তু সেই মুখেই কসম! ছিঃ! ”এই বলে আরমান জারা’র দিকে থু থু ফেলে।
থুঁ থুঁ র ক্ষুদ্র কণা জারার মুখে ছিটে যায়। এসবের তোয়াক্কা করে না জারা। আরমানের পায়ে ধরে জারা কেঁদে বলে,
___ “আমি আপনাকে ঠকাইনি…”
আরমানের গলা কেঁপে ওঠে,
__“ঠকাস’নি? তাহলে এই চোখে যা দেখলাম সেটা কী, হ্যাঁ?তুই আমার চোখের সামনে থেকে যা জারা। তোকে আর আমার সহ্য হচ্ছে না !”
আজ প্রথম আরমানের মুখে জারা ডাক শুনে, যা ওর কাছে বিষের মতো ঠেকছে এখন। জারা আর কিছু বলতে পারে না। বুক চেপে কাঁদতে থাকে। আরমান জারা কে ওর পা থেকে ছাড়ানোর জন্য ঝারা মারে এতে জারা আবার মাটিতে লুটিয়ে পরে। আরমান এক ধাপ এগিয়ে এসে জারার চোয়াল শক্ত করে ধরে বলে,
__“আমি ভেবেছিলাম, তুই আমার শান্তি হবি।
কিন্তু না— তুই আমার জীবনের অভিশাপ। তোর মুখ দেখলেও ঘৃণা লাগছে এখন আমার।”
জারা চিৎকার করে বলে,

__ “আমি নির্দোষ, স্বামীজান!”
আরমান ঠান্ডা গলায় বলে,
__“তোকে ভালোবাসা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।”
তারপর এক ঝটকায় জারার চোয়াল ছাড়িয়ে দেয়।
__“তুই মিথ্যাবাদী , তুই বেইমান, তুই এমন একটা মেয়ে যাকে ভালোবেসে আমি নিজের ভাগ্য পোড়াইছি।ছিঃ! শালার কপাল আমার !”
জারা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
__“একবার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করুন, আমি কি সত্যিই ভুল করেছি? আমি আপনাকে ঠকিয়েছি?”
আরমান গর্জে ওঠে,
__“তোর চোখে মিথ্যার ছায়া দেখি এখন আমি! যেই চোখে এখন অন্যকে খুঁজে বেড়ায়! ”
এখন জারা’র নিজের উপর তাচ্ছিল্যতা অনুভব করছে। কী অসহায় লাগছে এখন নিজেকে।আরমানের ধারণাকে ভুল প্রমান করতে পারছে না বলে। আর সব থেকে বড় ওর স্বামীজান ওকে নোংরা বলেছে। জারা আরমানের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে।সেই হাসিতে কোনো প্রান নেই।
__“ হারানোর আগে একবার ভেবে দেখবেন। আমার মতো নোংরা মেয়েকে দ্বিতীয় বার যেনো খুঁজতে না হয় আপনাকে। ”
জারা’র কথায় আবারও আরমান তাচ্ছিল্য হাসে

__“ কি ভয়ংকর অভিনয় করিস তুই। ”
সে এক ঝটকায় জারাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। জারা পড়ে যায় শক্ত মাটিতে। মাটিতে ইটের বড় কণা ছিলো তাই ওর মাথায় আঘাত লাগে। মাথা দিয়ে গলগল করে রক্ত পরছে ওর। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। শুধু কাঁদতে কাঁদতে জারা বলে ওঠে—
__“আমি আপনাকে ঠকাইনি, স্বামীজান… আমি কসম খাই, ঠকাইনি…”
আরমান কোনো কথা না বলে পেছন ফিরে হাঁটতে থাকে।তার চোখে রাগ, অপমান, আর একফোঁটা দুঃখও মিশে আছে। পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায় অন্ধকারে।
জারা মাটিতে বসে কাঁদে। তার কান্নার শব্দ রাতের নীরবতা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। আরমানের চলে যাওয়ার দিকে নিবু নিবু চোখে তাকিয়ে বলে
__“ আপনি তো আমার জীবনের অচেনা একজন মানুষ ছিলেন। তাহলে কেন সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আমার জীবনের সব থেকে প্রিয় মানুষটা হলেন “স্বামীজান”?
মাথা থেকে বেশি রক্ত পরার ফেলে জারা এখানেই জ্ঞান হারিয়ে পরে থাকে। দূরে কুকুর ডাকছে।সে অবহেলায় পড়ে আছে, দেখার মতো কেউ নেই আসেপাশে।

রাতের নীরবতা ভেদ করে গর্জে ওঠে আরমানের মার্সিডিজের ইঞ্জিন। রাস্তার বাতিগুলো একে একে পিছনে মিলিয়ে যায়। আরমানের চোখ লাল, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই—শুধু একরাশ যন্ত্রণা, রাগ, আর হতাশা। তার মাথায় শুধু একটা দৃশ্য ঘুরছে—জারা অন্য ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
স্টিয়ারিং ধরার সময় তার হাত কাঁপছে। তবু গতি কমায় না। গাড়ি ছুটে চলেছে পাগলের মতো। রাস্তার মোড়ে এক ট্রাক হঠাৎ সামনে এসে পড়লে ব্রেক চাপতে হয় জোরে। টায়ারের শব্দে ধোঁয়া উড়তে থাকে। গাড়ি থেমে যায় একচুল দূরে।
আরমান বুক ধরে নিঃশ্বাস নেয়। তারপর হাসে—একটা পাগলামির হাসি।
__“এখনও মরলাম না… কেন মরলাম না?”
সে আবার অ্যাকসিলারেটরে চাপ দেয়। গতি আরও বাড়ে।চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু বাতাসের হু হু শব্দ।অবশেষে সে গাড়িটা থামায় একটা পুরোনো ব্রিজের ওপর। নিচে নদীর কালো পানি ঝিকিমিকি করছে মৃদু আলোয়।
আরমান দরজা খুলে বাইরে নামে। ঠান্ডা বাতাস তার মুখে লাগে, কিন্তু সে কিছুই অনুভব করে না।
পা কাঁপতে কাঁপতে ব্রিজের মাঝ বরাবর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। চোখ বেয়ে পানি ঝরে, মুখ বিকৃত হয়ে যায় যন্ত্রণায়।

__“কেন ঠকালি বউ… কেন!”
তার গলা ফেটে যায় চিৎকারে।
__“আমি কী কম ভালোবাসছিলাম তোরে? মন থেকে একটু ভালোবাসলে কী হতো?”
বুকে হাত রেখে আরমান হাউমাউ করে কাঁদে।
__“আমি তো তোরে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসছিলাম… তুই কেন পারলি না?”
তার চোখের পানি থামছে না। হঠাৎ রাগে উঠে দাঁড়ায়। গাড়ির দিকে ফিরে যায়, সামনে গিয়ে এক ঝটকায় মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়ে কাচে ঘুষি মারে।একটা, দুটো, তিনটে… কাচ ফেটে যায়, হাতের তালু কেটে রক্ত ঝরে পড়ে মাটিতে।
কিন্তু আরমান থামে না।আরও জোরে আঘাত করে।
__“এই কাচটার মতোই আমার বিশ্বাস ভেঙে গেলো আজ!” তার চিৎকার প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে ব্রিজের দেয়ালে।
রক্তে ভিজে গেছে কালো শার্ট। কিন্তু সে খেয়ালই করে না।
__“এই ক্ষত কিছুই না… আমার মনের ক্ষত এর চেয়ে হাজার গুণ বেশি জ্বলে!”
সে চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়।
__“হে খোদা, আমি তো শুধু ভালোবাসা চেয়েছিলাম… ও কেন আমায় একটু ভালোবাসলো না? আমার কপালে কি ওর ভালোবাসা লেখা ছিলো না খোদা?”
চোখে অশ্রু জমে থাকে, ঠোঁট কাঁপে।তার কণ্ঠ ভেঙে যায়—

___“আমি ওকে ছাড়া কিছু ভাবিনি… আমার ভালোবাসায় কি কমতি ছিলো রে বউ? যে তোর অন্য কাউকে প্রয়োজন হলো? ”
আরমান আবার হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।চারপাশের হাওয়া থমকে যায় যেনো।নদীর ঢেউয়ের শব্দ মিশে যায় তার কান্নার সঙ্গে।তার শ্বাস ভারী হয়ে আসে।মাথা নিচু করে থাকে অনেকক্ষণ।
একটা সময় সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।চোখে আর পানি নেই, আছে শুধু শূন্যতা। রক্তে ভেজা হাত স্টিয়ারিংয়ে রাখে।
___“হয়তো আমার কপালেই ভালোবাসা নেই।”
গাড়ির ইঞ্জিন আবার গর্জে ওঠে।হেডলাইটে নদীর ধারে ঝলমলে আলো পড়ে। বৃষ্টি নেই, কিন্তু বাতাসে কেমন একটা দুঃখের গন্ধ ভাসে।আরমান গাড়ি চালু করে। রাস্তা জুড়ে ছুটে চলে এক ভাঙা মানুষ—যার ভালোবাসা হারিয়েছে,যে আজ নিজেরই হৃদয়ের কবরের ওপর দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে…

রাতের নিস্তব্ধতা ধীরে ধীরে ভোরের আলোয় মিশে যাচ্ছে। কিন্তু সেই আলোয় যেন অন্ধকারই ছড়িয়ে আছে সবার মুখে—কারণ, ঘরে নিথর হয়ে শুয়ে আছে জারা।
একটু আগের ঘটনা।
ফিহা তখনও কাঁপছে ভয়ে। সেই কখন থেকে জারাকে খুঁজছে, কোথায় গেলো, কার সঙ্গে গেলো—কিছুই বুঝতে পারছিল না। মিমের বিয়ের পর সবাই যখন বিদায়ের কান্নায় ভাসছে, তখনই ও বুঝেছিল জারা পাশে নেই। প্রথমে ভেবেছিল হয়তো জারা একটু দূরে কোথাও গেছে, হয়তো মন খারাপ করে চুপচাপ বসে আছে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, চিন্তা তত বেড়েছে।
__“জারা কোথায় গেলো?” ফিহার গলা কেঁপে উঠেছিল। সে ঘরের এক কোণে থাকা মিমের বাবার কাছে গিয়ে বলেছিল, “আঙ্কেল, জারা কোথাও নেই। অনেকক্ষণ খুঁজেও পাচ্ছি না।”
বিয়ের বাড়িতে হৈচৈ থেমে গিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মিমের বাবা, ফিহা, আর কয়েকজন আত্মীয় মিলে চারপাশ খুঁজতে শুরু করে। রাস্তার পাশে, বাগানের ভেতর, পেছনের উঠোন—সব জায়গায় খোঁজ চলে।কিন্তু কোথাও নেই জারা।
হঠাৎ রাস্তার উল্টো দিকে আলো পড়ে কিছু একটা নড়ছে বলে চোখে পড়ে ফিহার।তার বুক ধক করে ওঠে। “ওটা কে?” ফিসফিস করে বলে সে, তারপর ছুটে যায় ওদিকেই।
গিয়ে দেখে—জারা রক্তে ভেজা মাটিতে পরে আছে।তার মাথার এক পাশে রক্ত ঝরছে ধীরে ধীরে, চোখ বন্ধ, মুখ সাদা। ফিহা চিৎকার করে উঠে—

____“জানু! এই জানু !” তার গলা ফেটে যায় কান্নায়।
সে জারাকে কোলে তুলে নেয়, মাথা বুকে রাখে, ___“জারা চোখ খোল, প্লিজ… কিছু বল…”
কোনো সাড়া নেই।
ফিহার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন দৌড়ে আসে।কেউ বলে, “দ্রুত পানি আনো!”
কেউ বলে, “বাড়ির ভিতরে নিয়ে যাও!”
কিন্তু সময় নষ্ট না করে ফিহা আর দুইজন মিলে জারাকে কোলে তুলে মিমদের বাড়ির দিকে দৌড়ায়। রক্তে ভেজা জারাকে দেখে পুরো বাড়ি স্তব্ধ হয়ে যায়। মিমের মা চমকে উঠে বলে,
___ “হায় আল্লাহ! এ কী হলো?”
তিনি ছুটে এসে নিজের ওড়না ছিঁড়ে জারার মাথায় পট্টি বাঁধেন, রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
ফিহা জারার হাত ধরে কান্না করতে থাকে,
___“তুই চোখ খোল না জারা, প্লিজ…”
রাত তখন দুইটা।চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু জারা’র শ্বাসের শব্দ কেমন যেন ভারী হয়ে আছে।ফিহা ফোন করে জারা’র বাবা-মাকে খবর দেয়।
এক ঘণ্টার মধ্যে জারা’র পুরো পরিবার মিমদের বাড়িতে এসে পৌঁছে যায়। দরজা খুলতেই দৃশ্যটা দেখে মারজিয়া বেগমের চোখে অন্ধকার নেমে আসে।

__“হায় আল্লাহ আমার মেয়ে !” বলে তিনি দৌড়ে গিয়ে মেয়ের মাথা কোলে তুলে নেন। রক্তে ভেজা চুল, সাদা মুখ—দেখে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন।
জোহান ছোট্ট পায়ে দৌড়ে আসে, বোনের পাশে বসে বলে,
__“ বোনু, তুমি কি হইছে তোমার? ওঠো না প্লিজ…” তার কণ্ঠে ভয়, চোখে অশ্রু।
জাহিরের বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে।
__“কে করলো এটা আমার বোনের সাথে?”
সে ঘর কাঁপিয়ে বলে,
___ “আমার বোনের কিছু হলে কাউকে ছাড়ব না!”
আনিছুর রহমান ছেলেকে ধরে থামানোর চেষ্টা করেন।
___“চুপ করো জাহির, এখন চিৎকার করার সময় না। মেয়েকে আগে ঠিক করতে দে।”
কিন্তু জাহিরের চোখ লাল হয়ে আছে, মুখে রাগের রেখা—
__“বাবা, আমি জানি… কেউ ওরে আঘাত করছে। আমার বুড়ির গালে চড়ের দাগ! এটা কোনো দুর্ঘটনা না!”
ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। সবার চোখ যায় জারার গালের দিকে—সেখানে চড়ের দাগ স্পষ্ট।
সাদা গালটায় নীলচে দাগ হয়ে আছে।
ফিহা চুপ করে কাঁদছে, নিজের অপরাধবোধে পুড়ছে যেনো।

___“আমি যদি একটু আগে খুঁজতাম, হয়তো এই অবস্থা হতো না।”
মিমের মা মৃদু গলায় বলে,
__ “মাইয়ারে হাসপাতালে নিতে হবে, রক্ত বন্ধ হচ্ছে না।” কিন্তু তখন রাত অনেক—গাড়িও নেই হাতে। তাই ঘরোয়া ভাবে ওষুধ লাগিয়ে, মাথায় কাপড় বেঁধে, ঠান্ডা পানি দিয়ে জারার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করে সবাই।
মারজিয়া বেগম কাঁপা কণ্ঠে বলে,
___“ও আল্লাহ, আমার মেয়ে’রে বাঁচাইয়া দে…”
জোহান আবার বলে,
__ “আপু চোখ খোলো না, আমি ভয় পাইতেছি…”
আনিছুর রহমান চুপচাপ বসে আছেন দেয়ালের পাশে। চোখ বন্ধ করে দোয়া পড়ছেন বারবার।তার চোখের কোণে অশ্রু জমে আছে।
বাইরে তখন আজানের ধ্বনি ভেসে আসে—“আল্লাহু আকবার…”ভোর হয়ে গেছে।
নতুন সূর্যের আলো জানালা দিয়ে ঢুকছে, কিন্তু সেই আলো কারো মুখে নেই।সবাই তাকিয়ে আছে জারা’র দিকে—তার নিঃশ্বাস ধীর, ঠোঁট কাঁপছে সামান্য, কিন্তু জ্ঞান ফেরে না।
এই নরম মেয়ে, যে সবার মুখে হাসি আনত,
আজ নিজেই নিথর হয়ে শুয়ে আছে। ভয়, কান্না আর প্রার্থনায় ভরে গেছে চারদিক।
জাহির মুঠি চেপে বলে—

___“যে করেছে… আমি ওকে খুঁজে বের করব।
আমার বোনের চোখের এই পানির হিসাব দিতে হবে তাকে।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে থাকে। ভোরের আলোয় রক্তের দাগটা আরও স্পষ্ট দেখা যায়—আর সবাই বোঝে, এই রাত শুধু জারার না, তাদের সবার জন্যই এক দুঃস্বপ্ন হয়ে রইল।

সকালের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। নরম রোদ জানালার কাচ ছুঁয়ে ঘরে ঢুকছে। মৃদু হাওয়া বইছে আঙিনায়, পাখিরা ডাকছে গাছে গাছে—কিন্তু সেই শান্ত সকাল যেন কোনো অজানা অস্থিরতায় কেঁপে উঠছে আজ।
কাল রাত পর্যন্ত হাসি–আনন্দে ভরা ছিলো আরিফ খানের বাড়ি। রাশেদদের বিয়ের বারাত ফিরেছে রাত অনেকটা পেরিয়ে। সবাই ক্লান্ত হয়ে যে যার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু বাড়ির দুই গৃহিণী, ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম, সকাল সকাল জেগে উঠেছেন অভ্যাস মতো।
ফারিয়া বেগম রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছেন চা বানাতে, আর জেসমিন বেগম মেঝেতে ফুলের পাপড়ি গুলো ঝাড়ছেন।
হঠাৎই সামনের গেটের দিক থেকে দরজার বিকট শব্দ—আরমান ফিরেছে।
চুল এলোমেলো, চোখ লাল, জামা–কাপড় কাদামাখা, হাতে শুকনো রক্ত।মুখে কোনো কথা নেই।সে যেন এক অচেনা মানুষ—নীরব,ফ্যাকাসে, ভেতরটা ফেটে যাওয়া এক আগ্নেয়গিরি।
ফারিয়া বেগম থমকে দাঁড়ান।

__“আরমান! এই অবস্থা কেন তোর বাবা?”
কিন্তু আরমান কোনো উত্তর দেয় না। সোজা মাথা নিচু করে নিজের রুমের দিকে চলে যায়।
ফারিয়া বেগম কাঁপা গলায় বলে,
__ “বাবা! শুনছিস? হাতটাা এভাবে রক্ত লাগছে আছে কেন ?” আরমান থামে না। দরজার দিকে গিয়ে এক টানেই সেটা বন্ধ করে দেয়—ধাপ্প করে!
বিকট শব্দে গোটা বাড়ি কেঁপে ওঠে। জেসমিন বেগম কিচেন থেকে দৌড়ে এসে বলে,
__“ওর কি হইছে ভাবি? মুখটা এমন কালো ক্যান?”
ফারিয়া বেগম নির্বাক। ঠোঁট কাঁপছে, চোখ ছলছল করছে।
__“মনে হয় কোনো খারাপ কিছু হইছে।”
এরপর যা ঘটল, তা যেন দুঃস্বপ্ন। ভেতর থেকে ভাঙচুরের শব্দ! গ্লাস ভাঙছে, কাঠের ড্রয়ার ছিটকে মেঝেতে পড়ছে, কাচের বোতল ভেঙে টুকরো টুকরো হচ্ছে।এক সময় চিৎকার
—“কেন ঠকালি আমায় বউ? কেন?”
সেই আরমান, যে সব সময় হাসিখুশি, আজ যেন পাগল হয়ে গেছে।ফারিয়া বেগম দরজার পাশে এসে দাঁড়ান, ঠকঠক করে দরজায় ধাক্কা দেন

—“আরমান, দরজা খোল বাবা! কী হইছে তোর?”
কোনো উত্তর নেই।ভেতর থেকে শুধু কাচ ভাঙার শব্দ, ভারি শ্বাস, আর রাগে ভরা গর্জন।
এক সময় পুরো বাড়ি জেগে ওঠে।আরিফ খান,আসিফ খান, রোহান, রাশেদ, জাহেদ—সবাই ছুটে আসে। জেসমিন বেগম ভয় পেয়ে বলে,
__ “কিছু একটা হইছে। ও পাগল হয়ে গেছে মনে হয়।”
ফারিয়া বেগম কাঁদছেন,
__“আমার ছেলেটারে দেখ না কেউ? ও হাত রক্তে ভিজে ছিলো!”
ভেতর থেকে আর কোনো শব্দ আসে না।একটা নিস্তব্ধতা নেমে আসে পুরো করিডরে। সবাই আতঙ্কে একে অপরের দিকে তাকায়।
আরিফ খান গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,

__“দরজা ভাঙো। কিছু একটা বিপদ হইছে।”
রাশেদ এগিয়ে যায়, কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দেয়।
প্রথমে দরজা নড়ে না। দ্বিতীয়বার ধাক্কা—একটা বিকট আওয়াজে দরজাটা ভেঙে খুলে পড়ে।
আরমানের রুমের দৃশ্য দেখে সবাই থমকে যায়।
পুরো ঘর এলোমেলো—ড্রেসিং টেবিলের কাচ ভাঙা, মেঝেতে গ্লাসের টুকরো, বিছানায় রক্তের দাগ, দেয়ালে সিগারেটের পোড়া ছাপ। এক কোণে বসে আছে আরমান—হাঁটু গেড়ে, মাথা নিচু করে, হাতে সিগারেট। চোখে অন্ধকার, ঠোঁট কাঁপছে, বুক উঠানামা করছে ভারীভাবে।
তার দু’হাত রক্তে ভেজা, কেটে গেছে কাচে।
কিন্তু সে যেন ব্যথা টেরই পাচ্ছে না।
আরমান ফিসফিস করে বলছে,

__“কেন করলি এটা বউ… আমি তো শুধু তোরই ছিলাম… তুই কেন ঠকালি?”
তার চোখ থেকে টলটল করে পানি ঝরছে।
রোহান, রাশেদ, জাহেদ কিছু বলতে পারছে না।
তিনজন স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মিম মাএ আরমানের রুমে আসে জিনিয়ার সাথে। জেরিন রক্ত দেখে ভয় পায় তাই জেসমিন বেগম জেরিন কে না করেন এই রুমে আসতে।
রাশেদ ধীরে ধীরে বলে,
__ “ভাইয়া… আপনি ঠিক আছেন?”
আরমান চেয়ে থাকে একদৃষ্টিতে, তারপর হঠাৎ হেসে ওঠে—একটা কষ্টভরা হাসি।
__“দেখ? আমি শেষ… আমার সবকিছু শেষ… ওর জন্য।”
রোহান এগিয়ে এসে বলে,
__“আরমান, তোর হাত দিয়ে রক্ত পরতেছে।”
আরমান মৃদু কণ্ঠে বলে,
__“এই রক্ত… এই যন্ত্রণা… এটাই ওর দেওয়া উপহার।”
তারপর হঠাৎ সিগারেটের ধোঁয়া ফুঁকে দিয়ে বলে,
___“মন থেকে ভালোবাসা মানে বোকামি রে রোহান। ভালোবাসলে তুই কষ্ট পাবি। আমি পেলাম, তুইও পাবি।”

বড় ভাইয়ার এই অবস্থা দেখে জিনিয়ার চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। কাল পর্যন্ত সব ঠিক ছিলো।তাহলে হঠাৎ করে কি হয়ে গেছে। যে আরমান এমন টা বলছে?
রোহান চুপ, জাহেদ চোখ মুছছে।রাশেদ বলে, __“ভাইয়া, চলো ডাক্তার দেখাই।”
আরমান এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায়—
___“ডাক্তার লাগবে না! মরে গেলেই সব শেষ!”
তার কণ্ঠে এমন যন্ত্রণা যে ঘরের সবাই কেঁপে ওঠে।
ফারিয়া বেগম চিৎকার করে ওঠেন,
__ “বাবা, এসব বলছিস কেন?”
তিনি দৌড়ে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন,
__ “তুই এমন করিস না বাবা…বল কি হয়েছে আমাদের?”
আরমান মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে হুহু করে কেঁদে ফেলে।
__“মা, আমি আর পারতেছি না। ও আমারে ভালোবাসলো না।”
ফারিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলে,

__“বাবা, সব ঠিক হয়ে যাবে। শান্ত হ।”
কিন্তু আরমানের চোখে শুধু ঘৃণা, দুঃখ আর ভালোবাসার লড়াই।
এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে যায় মেঝেতে। রোহান ও রাশেদ দৌড়ে গিয়ে ওকে ধরে বিছানায় তোলে।
জাহেদ পানি আনে, রক্ত মুছে দেয় ওর হাতের।
আরিফ খান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব দেখছেন—চোখের কোণে পানি। তিনি ধীরে বলেন,
__“ডাক্তারকে খবর দে কেউ! আমার ছেলে? ”
আসিফ খান তাড়াতাড়ি ডাক্তার কে খবর দেয়।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আছে। ফারিয়া বেগম ছেলের কপালে হাত রাখেন, ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেন।আরমান আধো ঘুমে, আধো জাগরণে ফিসফিস করে বলে,
___“ওরে আমি ভালোবাসতাম মা… ও ক্যান এমন করলো…”
সকালের আলো তখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে, কিন্তু সেই আলোর নিচে আরমানের রুমটা যেন অন্ধকারে ঢেকে গেছে।বাইরে পাখিরা ডাকছে, কিন্তু ভেতরে শুধু ভাঙা কাচের টুকরো, রক্তের দাগ, আর এক ভালোবাসা–বিধ্বস্ত মানুষের নিঃশব্দ কান্না।

অন্ধকার আর নীরব রাতের পর ভোরবেলা যখন আলো ধীরে ধীরে জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকছে, তখনই জারার চোখ খুলল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাথার যন্ত্রণা যেন আবার বয়ে এলো ঝড়ের মতো। চারপাশে অপরিচিত গন্ধ—ঔষধ, রক্ত আর আতঙ্কের। হালকা আলোয় মারজিয়া বেগমকে দেখতে পেয়ে জারার চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। কাঁপা কণ্ঠে সে শুধু বলল
—“আম্মু, আমি বাড়ি যাবো… আম্মু, আমি বাড়ি যাবো…”
মারজিয়া বেগমের বুকটা হু হু করে কেঁপে উঠল। তিনি মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন,
___“যাবো মা, যাবো… নিয়ে যাচ্ছি। শান্ত হ মা, কিছু হবে না।”
কিন্তু জারার কান্না থামল না। ঠোঁট কাঁপছে, শরীর ঘামছে। এত দুর্বল যে কাঁদতেও কষ্ট হচ্ছে। চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো, মাথা ঝিমঝিম করে উঠল—তারপর আবার অজ্ঞান হয়ে গেল জারা।
জাহির ছুটে এসে ডাক দিল,
__“বুড়ি! চোখ খোল! বুড়ি!চোখ খোলো না!”
কোনো সাড়া নেই। ঘরের ভেতর হইচই পড়ে গেল। জাহির কোনো কিছু না ভেবেই বোনকে কোলে তুলে নিল। বলল,

__“আম্মু, কিছু না বলে চলো, আমি নিয়ে যাচ্ছি বুড়িকে বাড়ি।”
মিমদের বাড়িতে তখন সবার চোখে পানি। ফিহাও কান্না চেপে রাখতে পারছে না। ও বলে,
__“আমি যাবো, আমি জারার সাথে যাবো। ও একা থাকবে না।”
জাহির, মারজিয়া বেগম, ফিহা—সবাই মিলে জারাকে নিয়ে চলে আসে নিজেদের বাড়িতে।
বাড়িতে পৌঁছে মেয়েকে দেখে আবার বুকের ভেতরটা ভেঙে পড়ল মারজিয়া বেগমের। আনিছুর রহমান মেয়ের অবস্থা আর দেখতে পারছেন না।তার হাসি খুশি মেয়েটার এক রাতের অন্ধকার হয়ে গেছে। জোহান সেই যে বাবার সাথে আটার মতো লেগেছে আর ছাড়ে নি। বাচ্চা মানুষ এসব দেখে ভয় পেয়ে গেছে।
জারা যেন একেবারে অন্য কেউ হয়ে গেছে—মলিন, নিঃশব্দ, ভাঙা চোখের দৃষ্টি। তিনি মেয়েকে গরম পানি দিয়ে নিজ হাতে গোসল করিয়ে দেন, চুল মুছে দেন, নতুন কাপড় পরিয়ে দেন। কিন্তু মেয়েটা কিছুই বলছে না।কোনো কথা নেই মুখে, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই চোখে।
মারজিয়া বেগম ধীরে বলেন,

__“একটু ভাত খা মা, সারাদিন কিছু খাস নি।”
জারা শুধু মাথা নাড়ে, তারপর ফিসফিস করে বলে,
__“আমার খিদে নেই আম্মু… আমি মরতে চাই।”
এই কথা শুনে ঘরে থাকা সবাই অবাক। এত শান্ত, মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে, সে এমন কথা বলবে—কে ভাবতে পারত?মারজিয়া বেগম চোখের পানি চেপে ধরে বলেন,
__“কেন এমন কথা বলছিস মা? আমি কি তোকে এমন কষ্টের জন্য জন্ম দিয়েছি?”
জাহির এগিয়ে এসে বোনের পাশে বসে। হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে বলে,
__“চল খা, আমার জন্য খা বুড়ি, প্লিজ। আর তোর সব গিফট আমি গুছিয়ে রেখেছি। দেখবি না?”
জারা আচমকা চিৎকার করে উঠে,
__“না! আমি খাবো না! আমাকে একা থাকতে দাও! আমার কিছু লাগবে না কারোর!আমার কাউকে চাই না।”
তার চোখ লাল, গাল ভিজে গেছে। হঠাৎ এমন আচরণে সবাই ভীত হয়ে পড়ে। জাহির এক পা পিছিয়ে যায়, ফিহা দৌড়ে এসে জারার কাঁধে হাত রাখে,

__“জানু, শান্ত হ, কেউ তোকে কষ্ট দিবে না।”
কিন্তু জারা কোনো উত্তর দেয় না। শুধু বলে,
__“আমাকে একা থাকতে দে। কেউ আমার কাছে আসবে না।”
মারজিয়া বেগম এক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আনিছুর রহমান আর সহ্য করতে না পেরে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে চলে যান সেখান থেকে। মারজিয়া বেগম এর বুকের ভেতরটা জ্বলে যায়—এই যে মেয়েটা এখন নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে, একদিন কত হাসত, মিষ্টি করে সবার মন ভরিয়ে রাখত।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। সারাদিন কিছু খায়নি জারা। রুমের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। জানালা খোলা, বাতাস ঢুকছে, কিন্তু ঘরটা ভারী নিঃশব্দ।
ফিহা এখনো ওদের বাড়িতেই আছে। সারাদিন চুপচাপ বসে থেকেও একবার ভাবল—শেষবার চেষ্টা করবে।আস্তে করে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে।দেখে দরজাটা খোলা।
জারা বিছানায় বসে আছে, চোখে শূন্য দৃষ্টি। ফিহা এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখে—

__“জানু…”
জারা আচমকা ঘুরে তাকায়, তারপর এক ঝটকায় ফিহাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে—“আমি ওনাকে ঠকাইনি জানিস ফিহা! আমি ওনাকে ঠকাইনি! আমি তাকে অনেক ভালোবাসি… কিন্তু ও ভুল বুঝেছে।”
ফিহা হতবাক হয়ে বলে,
__“কি হইছে জারা? সব বল আমাকে।”
জারা কাঁপতে কাঁপতে বলে,
__“আমি শুধু ভাইয়াকে দেখে আলিঙ্গন করেছিলাম… অনেকদিন পর চোখের সামনে ভাইয়াকে দেখেছি। ও তো আমার ভাই, কিন্তু আরমান… সে এসব দেখেছে আর কিছু না জেনে… আমাকে বেইমান, ছলনাময়ী বলেছে। বিশ্বাস কর ফিহা, আমি ওকে ঠকাইনি।”
ফিহা চোখ মুছে বলে,
__“তুই শান্ত হ, তুই ওকে বুঝাতে পারবি।”
জারা মাথা নাড়ে, চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে—“ও আমার কথা শুনবে না… আমি অনেকবার কল দিয়েছি… ফোন ধরে না…”

জারা উঠে দাঁড়ায়, টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটা খুঁজে।মোবাইলটা হাতে পেতেই মনে হলো যেন প্রাণ ফিরে পেল।আতঙ্ক, কান্না, ভালোবাসা—সব একসাথে জমে আছে ওর ভেতর। ও আরমানের নাম্বারে কল করে। একবার… দু’বার… তিনবার…“দয়া করে ধরোন না স্বামীজান… একবার শুধু আমার কথা শুনোন…”
কিন্তু ওপাশে কোনো সাড়া নেই।
“দুঃখিত, দ্য নাম্বার ইউ আর কলিং ইজ সুইচড অফ।”
শব্দটা যেন বিষ হয়ে কানে বাজে।জারা আবার কল করে, আবার, আবার… যতবারই করে, ফল একটাই—মোবাইল বন্ধ।
সে চুপ হয়ে যায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
তারপর ধীরে বসে পড়ে মেঝেতে, ফোনটা বুকে চেপে ধরে।
__“ফিহা… আমি জানি না ও এখন কেমন আছে… আমার জন্য কষ্ট পাচ্ছে হয়তো…”
ফিহা কিছু বলতে পারে না। শুধু মেয়েটার কষ্ট দেখে নিঃশব্দে চোখের পানি মুছে।

এর পরের দুই দিন যেন এক অভিশাপের মতো কেটে যায়।এদিকে আরমান কারও সাথে কথা বলে না, খায় না, হাসে না।ঘরটা নিস্তব্ধ। পর্দা টানা, আলো ঢুকতে পারে না। একটা অন্ধকার, দমবন্ধ করা ভার ছড়িয়ে আছে চারদিকে। কোণের ছোট টেবিলের ওপর ছাইভর্তি অ্যাশট্রে, পাশে আধখাওয়া পানির গ্লাস, তাতে সিগারেটের টুকরো ভাসছে। দেয়ালে ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, কিন্তু সময় যেন থেমে আছে শুধু আরমানের জন্য।
আরমান বিছানার পাশে মেঝেতে বসে। চুল এলোমেলো, দাড়ি না কাটা দিনের পর দিন। চোখের নিচে কালো দাগ, নিদ্রাহীন রাতের সাক্ষী। হাতে জ্বলছে সিগারেট, ধোঁয়াটা উঠছে ধীরে ধীরে—একটা নিঃশব্দ হাহাকারের মতো। বুকের ভেতর চাপ ধরা কষ্টে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় মাঝে মাঝে। ওই রাতের পর ওর শরীরটা বদলে গেছে। শ্বাস বেড়ে গেলে এখন ইনহেলারই একমাত্র ভরসা। ডাক্তার বলেছিল সিগারেট ছেড়ে দিতে, কিন্তু এই ধোঁয়া ছাড়া যেন কিছুই টিকে না তার ভিতরে।
হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। ক্ষত শুকিয়েছে কিছুটা, কিন্তু ত্বকের টান ধরেছে। মাঝে মাঝে হালকা রক্ত বের হয়, আরমান তা পাত্তা দেয় না। কারণ ব্যথা এখন ওর জন্য খুব সাধারণ কিছু—শরীরের ব্যথা কিছুই না, মনেরটা হাজারগুণ বেশি গভীর।

একটু পর হঠাৎ চোখ যায় ঘরের এক কোণে—ধুলোমাখা গিটারটা পড়ে আছে, অবহেলায়, নিঃশব্দে। একসময় এই গিটারই ছিল তার সঙ্গী, তার নিশ্বাস। কিন্তু ব্যবসা, ব্যস্ততা, আর শেষমেশ ভাঙা সম্পর্ক—সবকিছু ছিনিয়ে নিয়েছে ওর সেই সুরের ভালোবাসা।
ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় আরমান। হাত বাড়িয়ে গিটারটা তুলে নেয়। ধুলোমাখা কাঠের গায়ে আঙুল ছোঁয়ায় একটুখানি কাঁপুনি লাগে—মনে পড়ে যায় পুরনো দিনের সুর।
আরমান চুপচাপ বসে গিটারটা পরিষ্কার করতে থাকে। কাপড় খুঁজে না, তাই হাত দিয়েই ধুলো মুছে। যেন নিজের ভেতরের ময়লা মুছছে প্রতীকীভাবে। আঙুলের কাটা জায়গাগুলোতে আবার টান পড়ে, সামান্য রক্ত বের হয়, কিন্তু ওর চোখে সেই রক্তের কোনো মূল্য নেই।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে গিটারটা কোলে তোলে। আঙুল রাখে স্ট্রিংয়ের ওপর। নরম করে টুং করে একটা তারে টান দেয়। শব্দটা কেঁপে ওঠে, নিঃসঙ্গ, নিস্তব্ধতার ভেতর হারিয়ে যায়।
আরেকবার বাজায়, এবার একটু জোরে। গিটার যেন উত্তর দেয় ওর ব্যথায়। একটার পর একটা নোট ছুঁয়ে যায় ঘরের নিস্তব্ধতা। বাইরে পাখির ডাক, ভোরের আলো, বা কোনো শব্দই ঢোকে না এই ঘরে। শুধু গিটারের মৃদু সুর, মাঝে মাঝে সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ, আর এক ছেলেটার গভীর শ্বাসের শব্দ—এই ঘরেই এখন পুরো পৃথিবী আটকে আছে।
আরমানের চোখের কোণে পানি জমে। কিন্তু সে তা মুছে না, ঝরতে দেয় ধীরে ধীরে। গিটার বাজাতে বাজাতে এক সময় থেমে যায়। তারের ওপর আঙুল স্থির হয়ে থাকে।
গিটারটা আবার নিচে রেখে দেয়। ধীরে ধীরে পেছনে হেলে দেয় মাথা। চোখ বন্ধ করে একটানা শ্বাস নেয়, যেন এখনো কোথাও, দূরে, সেই কণ্ঠটা শুনতে পাচ্ছে। হঠাৎ করে গিটারে টুংটাং শব্দ তুলে আরমান গেয়ে উঠে….

~~~ভেতর কান্দে সখি আমার,
তোমার লাগি দেখলা না
আর কতকাল রাখবা
তোমার মন বিবাগী বুঝলাম না~~~
গানের তালের সাথে যেনো ওর চোখের ও বাদ মানে না। জারা’র মুখ বার বার চোখের সামনে বেসে উঠে। আর ওর চোখ দিয়ে পানি পরে।
~~তোমার মনের মণিকোঠায়
দাওনা আমায় একটু ঠাই
তোমার মনের মণিকোঠায়
দাওনা আমায় একটু ঠাই~~~
~~~মন আর মানে না
ভেতর কান্দে সখি আমার,
তোমার লাগি দেখলা না
আর কতকাল রাখবা
তোমার মন বিবাগী বুঝলাম না ~~~~

রাত তিনটা। পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু জারার চোখে ঘুম নেই। ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে গেছে, শুধু সময়টা থেমে নেই ওর বুকে—প্রতি সেকেন্ডে একটা করে ব্যথা টুপ করে পড়ে যাচ্ছে মনের ভিতর। ঘরে মৃদু আলো জ্বলছে, জানালার পর্দা হালকা দুলছে বাতাসে। চারদিকে নিস্তব্ধতা, শুধু জারার শ্বাস আর কাঁদার শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত বিষণ্ণ সুর তৈরি করছে।
জারা বিছানায় বসে ফোন হাতে নেয়। স্ক্রিনের আলো তার মুখে পড়ে—ফ্যাকাশে, ক্লান্ত, চোখের নিচে কালচে দাগ। আঙুল কাঁপছে, কিন্তু তবুও নাম্বারটা আবার ডায়াল করে। একই নাম্বার, যেটায় সে দিনের পর দিন কথা বলেছে, হাসি দিয়েছে, রাগ করেছে। এখন শুধু ঠাণ্ডা এক ভয়েস—“The number you are trying to reach is currently switched off.”
জারার বুক কেঁপে ওঠে। মোবাইলটা বুকের কাছে চেপে ধরে, যেন একটু উষ্ণতা পাবে। চোখের পানি থামে না, চুপচাপ গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। আরমানের নামটা ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে, অথচ ওর পৃথিবীতে যেন সেই নামটা নিভে গেছে চিরতরে।
সে আবার মেসেজ লেখে—

“আমি আপনাকে ঠকাইনি, স্বামীজান… বিশ্বাস করুন, আমি পারব না আপনার ছাড়া।”
মেসেজ পাঠিয়ে অপেক্ষা করে, মিনিট যায়, ঘণ্টা যায়, কিন্তু কোনো রিপ্লাই আসে না।
জারা মোবাইলটা নামিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে রাতের হাওয়া বইছে, দূরে রাস্তার আলো জ্বলছে, কিন্তু সব কিছুই নিস্তেজ লাগে ওর কাছে। তার মনেও অন্ধকার।
ধীরে ধীরে মোবাইলের গ্যালারি খুলে। একটার পর একটা ছবি—আরমানের হাসি, ওর চোখের সেই গভীর দৃষ্টি, ওর তোলা সেলফি। প্রতিটি ছবির সঙ্গে জোড়া আছে একটা একটা স্মৃতি। জারা আঙুল দিয়ে স্ক্রিন ছোঁয়, তারপর হঠাৎ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে—
__“আপনি জানেন, আমি এখনো আপনাকেই ভালোবাসি স্বামীজান…”
কণ্ঠটা কেঁপে ওঠে, গলায় আটকে যায় শব্দগুলো। তারপর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, চুপচাপ, আরমানের ছবি বুকে জড়িয়ে অচেনা এক সুরে গেয়ে ওঠে—

~~~~জানি তুমি,আসবে না ফিরে
বাসবেনা ভালো আমাকে
জানি তুমি,ভেঙেছ হৃদয়
সেই আশাতে,দুঃখ চেপে রয়~~~~
~~~এ হৃদয়ের এতো কাছে
ছিলে তুমি মনে কি পরে?
এ হৃদয়ের এতো কাছে
ছিলে তুমি মনে কি পরে?
মনে কি পরে?~~~
~~~জানি তুমি,আসবেনা ফিরে
বাসবেনা ভালো আমাকে
জানি তুমি,ভেঙেছ হৃদয়
সেই আশাতে,দুঃখ চেপে রয়
এ হৃদয়ের এতো কাছে
ছিলে তুমি মনে কি পরে?
এ হৃদয়ের এতো কাছে
ছিলে তুমি
মনে কি পরে?
মনে কি পরে?~~~~

গলার স্বর ভারী হয়ে আসে, কিন্তু গানটা শেষ করে। তারপর চুপচাপ জানালার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু, নিচে জানালার ধারে পড়ে ভিজিয়ে দেয় পর্দা।
বাইরে ভোরের আভা ফোটে একটু একটু করে, কিন্তু জারার জীবনে এখনো গভীর রাত।
মোবাইলটা বুকে চেপে ধরে, চোখ বন্ধ করে বলে ফিসফিস করে—“আপনি ফিরবেন না জানি, তবু আমি অপেক্ষায় আছি, স্বামীজান।”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬০

একটা নিঃশব্দ ভালোবাসা ভেসে থাকে বাতাসে,
যার কোনো উত্তর নেই, কোনো শেষও নেই—
শুধু আছে জারা নামের এক মেয়ে,আর ওর নির্ঘুম ভালোবাসা।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬১ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here