Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৮

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৮

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৮
লিজা মনি

আমার ছোট পাখি,
ভয় পাবে না একটুও। তুমি ভয় পাও সেটা আমি চাচ্ছি না। আমার এনি সাহসী। আমি আর নাজলী তোমার পাশে আছি, দিন-রাত, শ্বাস-প্রশ্বাসে। নাবিদের রক্ত যদি একটি প্রতিশ্রুতি হয়, তবে জানো যতদিন সে বেঁচে আছে, তার এনিকে কেউ আঘাত দিতে পারবে না। আমার কোলখানি যদি তোমার কাছে দিতে হয়, আমি হাসিমুখে দেব। আর যদি কেউ তার এনিকে চায় তাহলে তাদের জন্য আমি যুদ্ধের সর্বোচ্চ সীমায় যেতে প্রস্তুত।

তুমি আমার ভালোবাসা।আমার শান্তির একমাত্র প্রতীক। তোমাকে আমি নরকের আগুন থেকে টেনে আনব। আর এই শপথ আমার। যদি কোন কারণে আমি তোমাকে সে অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হই, তাহলে নিজের অস্তিত্বই আমি নিজের হাতে শেষ করে দিব। আমার এই অশেষ ব্যথা আর অদম্য আশা—দুইটিই তোমার জন্যই।
তুমি শুনে রাখো, পাখি তুমি একা নও। আকাশ যতই অন্ধকার হোক, শেষে সূর্য ওঠে।তোমার জন্যও সেই আলো আরো কাছাকাছি। তোমার কাঁধে হাত রাখার মতো কেউ না পেলে আমার নাম বলবে। তোমার সবচেয়ে পরম বন্ধু নিজের বোন নাজলীকে স্মরন করবে। কারোর ভয়ে কেঁদে বুক ভেঙে ফেলবে না। সাহস গেঁথে রাখবে।
তবু যদি তুমি কোনো ক্ষুদ্র সুযোগ পাও, মনে রেখো নীরবে, দৃঢ়ভাবে, নিজের জীবনের মান যে কোথায় সেই মুগ্ধতাই তোমাকে ফিরিয়ে আনবে। আমি চাই না তোমাকে ঝুঁকিতে ফেলতে। তাই আমি পথের প্রতিটি কাঁটা আগে বেছে নেব। তুমি চুপচাপ থাকো, শক্ত হও, আর আমি পথ খুলে নিয়ে আসব।

তুমি ফিরে এলে আমি তোমার পাশে বসে তোমার হাত ধরে বলব। সমস্ত অন্ধকারকে আমরা একসঙ্গে পেরিয়ে এসেছি। ততক্ষণ পর্যন্ত ভরসা রেখো, জীবনের সব ক্ষুদ্র আলো সংগ্রহ করো, আর জানো। তুমি আমার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমার। পাঁচ বছর বয়সী সেই ছোট এনিকে আমি যেভাবে আগলে রেখেছি। ঠিক সেই ভাবে সারাজীবন আগলে রাখব। কোনো ক্ষতি হতে দিব না পাখি।
এই লেখাটা পড়ার পর তুমি অনেক অবাক হবে। তবে অবাক হওয়াটা স্বাভাবিক। আগামী এক সপ্তাহ পর নিক জেভরান নিজের মাফিয়া সম্রাজ্যে থাকবে। মাফিয়া মিটিং এ। আর এইটা অনেক বড় একটা সুযোগ। কারন এই মিটিং পুরো মাফিয়া রাজ্যের মধ্যে হয়ে থাকে। অনেক সময় – স্বাপেক্ষে। চাইলেও সেখান থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা নেই। বা কেউ তোমার পালানোর সংবাদ পাঠাতে পারবে না। সেদিন রাতে তোমাকে যে কোনো মূল্যে ভাইপার মেনশন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর আসার সাথে সাথে তুমি আমাদের দেখতে পাবে। এখন কিভাবে বের হবে সেটা সম্পূর্ন তোমার দায়িত্ব। অনেক বুদ্ধিমতি তুমি। গার্ডদের কিভাবে সামলে আসবে সেটা একান্ত তোমার দায়িত্ব। এই সপ্তাহের মধ্যে সব ভাবনা ভেবে নাও। আর সুসময়ে সবকিছুর কাজে লাগাবে। পাল্টা জবাবের প্রয়োজন নেই। যা বলা হয়েছে সেটাই করব। আর দুরত্বে, অসহায় অবস্থায় দেখতে চাই না আমরা। তোমার বোন অপেক্ষা করছে।
ইতি,,
তোমার নাবিদ ভাই।
নাজলী পুরোটা লেখা পড়ে মলিন হাসি দিয়ে বলে,

” অনেক সুন্দর লিখেছো। একদম মনের মত হয়েছে। কিন্তু এইটা পৌঁছে দিব কিভাবে?
নাবিদ চেয়ারে বসে নখ কামড়ে গম্ভীর হয়ে বলে,
” ভেবেছিলাম যন্ত্র ব্যবহার করব। বাট এইটা করা একদম ঠিক হবে না। সিসিক্যামেরায় সব স্পষ্ট হয়ে উঠবে।আর নিক প্রতিদিন মেনশনের ক্যামেরা চেক করে। যদি কোনোভাবে সন্দেহ জনক কিছু দেখে ফেলে তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এনিকে আর ও শক্ত নজরে বেঁধে ফেলবে। ওর জন্য সেখান থেকে বেরিয়ে আসা অনেক কষ্টকর হয়ে উঠবে।তাই অন্য আশ্রয় নিতে হয়েছে।
— কোন আশ্রয়?
— ছদ্দবেশ!
— হুয়াট! তুমি ছদ্দবেশ ধরে যাবে? চিনে ফেলবে। তাই এমন বোকামি করো না। এলার্ট দিচ্ছি আমি তোমাকে।
নিক ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

” আমি নয়। আমি চলে গেলে পরবর্তী চাল চালবে কে? আমার গার্ড যাবে ফকির বেশে।
নাজলী কপাল কুচকে বলে,
” বুদ্ধি কি প্রতিনিয়ত লোপ পাচ্ছে? এত বড় বাড়িতে কোনো ভিক্ষুক কেনো ডুকতে দিবে? আর যদি ডুকেও গার্ডরা তো আঘাত করতে করতে মেরে ফেলবে।
— ভুল নাজলী। ভিক্ষুক মেনশনে ডুকবে না। বরং বাহিরে থেকেই সব কাজ করবে।
— কিভাবে?
— এনিকে দেখা শুনা করার জন্য একজন অর্ধবয়স্ক মেইড রাখা হয়েছে। আর নিক এই মহিলাটাকে অনেক বিশ্বাস করে। মহিলাটা হিন্দু সম্প্রাদয়ের। নাম মেবি চিত্রা রানী। এনিকে নিজের মেয়ের মত করে আগলে রেখেছে, ভালোবাসে। কাল সেই মহিলার সাথে আমার দেখা হয়েছে।
নাজলী অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করে,

” ক.. কেমন আছে এনি? কিছু বলেছে উনি?
নবিদ চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
” সিংহের গোহায় খরগোশকে সুখে থাকবে ভাবাটা বোকামি নাজলী। উনি সাহায্য করবে এই চিঠি দেওয়াতে। আজ বিকেল চারটার দিকে উনি দক্ষিনের সেই ছোট বাড়িটার মধ্যে আসবে। আর আমি গিয়ে এই চিঠিটা দিয়ে আসব। উনি নিজ দায়িত্বে এনির কাছে চিঠি খানা পৌঁছে দিবে।
নাজলীর চোখ চিকচিক করে উঠে খুশিতে,
” উনি এত সহজে রাজী হয়ে গেলো সাহায্য করতে?
— উনি নিজেও চান এনি যাতে এখান থেকে মুক্তি পায়। আর সে কারনেই সাহায্য করা। বাট প্রথমে রাজি হয় নি। বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাইছিলো না নিজের বসের সাথে। পরে এক প্রকার ইমোশনাল ব্লেকমেইল করে রাজি করিয়ে নিলাম। তবে যা করতে হবে একদম সাবধানে। কারন উনি আমাদের সাহায্য করেছে, তাই ভুলেও উনাকে বিপদে ফেলা যাবে না। কারন নিক একবার জানতে পারলে উনার গলা টিপে ধরবে তার সন্দেহ নেই।
নাজলী মাথা নাড়িয়ে কপাল কুচকে বলে,

” আচ্ছা তুমি নিক জেভরান কে কিভাবে এত চিনো?
নাবিদ কথা বলা থামিয়ে দেয়। সামান্য জিহ্বা নাড়িয়ে বলে,
” কে না চিনে? তুমি নিজেও তো চিনো।
— আমি আগে উনাকে চিনতাম না তেমনভাবে। শুধু নাম শুনেছি। এনির ঘটনা থেকে উনাকে আমার চিনা। বাট তুমি তো একদম গভীরভাবে চিনো। উনার গোপন শত্রু কে? উনার ঠিক কতটা প্যালেসে আছে, বাগান বাড়ি, কবে মাফিয়া মিটিং বসে সব জানো। তুমি কিভাবে এতকিছু জেনেছো নাবিদ?
নাবিদ নিচের ঠোঁট কামড়ে গম্ভীর হয়ে বলে,
” জেনেছি কোনো এক উপায়ে। ব্যবসার ক্ষেত্রে অনেকবার এখানে আসতে হয়েছে। আর একবার, দুইবার করে অনেকটা জানা হয়ে গিয়েছে মাফিয়াদের সম্পর্কে। আর নিক জেভরানকে তো সবাই চিনে।
— পুলিশ কি উনাকে দেখে না নাবিদ?
— প্রমান!
— মানে?
— মানে প্রমানের অভাব নাজলী। পুলিশ অনেকবার প্রমান জোগার করতে চেয়েছিলো বাট নিকের চতুরতায় প্রতবার এই ব্যার্থ। প্রতিটা খুন খুব নৃশ্যংস ভাবে করে। বাট খুন করা শেষে একটা প্রমানও থাকে না।
— যদি কোনোভাবে আমরা প্রমান জোগার করতে পারি তাহলে?
নাবিদ বাঁকা হেসে বলে,
” আইডিয়াটা মন্দ নয়।
— তাহলে প্রমান জোগার করা যাক।
— আপাযত এনিকে বাহির করতে হবে। এই কাজটা সফল হলেই পরবর্তী কাজে লেগে যাব।
নাজলী মুচকি হাসে। নাবিদ নিচের ঠোঁট কামড়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বাহিরের সমুদ্রের দিকে তাকায়। সমুদ্রে ঢেউ গুলো বার বার পাড়ের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে।

সকালের নির্মল পরিবেশ এক মহৎ সৌন্দর্যের অনিন্দ্যসুন্দর রূপকল্প।যার আবির্ভাব প্রভাতের প্রথম আলোয় অর্চিত দেবদূতের মতো ধরা দেয়। আকাশের পূর্বদিগন্তে রক্তাভ সূর্যের জ্যোতিষ্মান কিরণ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র নীলাভ গগনকে প্রজ্জ্বলিত করে তোলে এক মায়াময় আলোকচ্ছটায়। শিশিরভেজা তৃণমঞ্জরীর উপর সেই আলো পড়তেই অগণন ক্ষুদ্র বিন্দু হীরকের ন্যায় ঝলমল করতে থাকে।আর প্রতিটি ফোঁটায় প্রকৃতির অনির্বচনীয় পরিস্কারত্বের প্রতিফলন দেখা যায়।

দূর মাঠ থেকে ভেসে আসে পাখিদের মধুর কাকলি। কখনো শালিকের কর্কশ সুর, কখনো দোয়েলের মায়াবী ডাক।আবার কখনো কাকের অদ্ভুত রূঢ় আর্তনাদ।সব মিলিয়ে যেন সৃষ্টি হয় এক প্রভাতী সংগীত। হাওয়ার মৃদুমন্দ বেগে গাছের শাখাপ্রশাখা কাঁপতে কাঁপতে নিস্তব্ধ আকাশের বুক জুড়ে এক অদৃশ্য ছন্দ রচনা করে। গন্ধরাজ ও শেফালিকার সুবাস মিশে যায় শিশিরমাখা বাতাসে, যা প্রাণে প্রাণে জাগিয়ে তোলে এক অকারণ স্নিগ্ধতা ও সতেজতা।
সেই মুহূর্তে মানবমনের গহন অন্ধকারও যেন উন্মোচিত হয়ে যায়।চিন্তাধারা পবিত্র আলোর আবেশে দীপ্ত হয়ে ওঠে। আর সমগ্র অস্তিত্বে নেমে আসে এক অজানা শান্তি।যা কেবলমাত্র প্রভাতের নির্মল পরিবেশেই অনুভূত হয়। রুমের চারপাশে পর্দাগুলো নড়াচড়া করছে। রুমের চারপাশে টানা পর্দাগুলো হালকা বাতাসের দমকে ধীরে ধীরে নড়াচড়া করছে। বাইরে থেকে ভেসে আসা নির্মল শীতল হাওয়া এনির মুখে এসে লাগতেই সে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। শ্বাসকষ্টে ভেজা দেহটা সামান্য নড়েচড়ে উঠতেই ভেতরের আতঙ্ক জেগে ওঠে। বেঁচে থাকার প্রবল তাগিদে সে ছুটে বেরোনোর জন্য ছটফট করতে শুরু করে। শরীরের প্রতিটি কোষ তখনও কাঁপছে। কারণ চাবুকের আঘাতগুলো এখনো কাঁচা ক্ষতের মতো জ্বলজ্বল করছে তার গায়ে। প্রতিটি ঘায়ে যেন আগুনের দাহ লুকিয়ে আছে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই এনি টের পায় তার শরীরের উপর কিছু ভারী, দমবন্ধ করা চাপ। শ্বাসরুদ্ধকর সেই ভার বুঝতে পেরে এনি তড়িঘড়ি ধাক্কা দেয়। ঠিক তখনই, অর্ধ-ঘুমন্ত এক কণ্ঠস্বর শোনা যায় কোমল অথচ ভয়ানক অচেনা মিষ্টতা মাখানো স্বর,

“উফফ… ওয়াইফি, ডিস্টার্ব করো না।”
‘ওয়াইফি’ শব্দটা এনির কানে ঢুকতেই যেন বজ্রাঘাত ঘটে। তার শরীর কেঁপে ওঠে প্রবল আতঙ্কে। বিস্ময়ের চরম সীমায় গিয়ে সে তাকায় ঘুমন্ত নিকের মুখের দিকে। সেই মুখ, যে মুখ তার জীবনকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। এখন নিঃশ্বাসের নেশায় ঢেকে আছে শান্তির মুখোশে।
এক মুহূর্তের জন্য এনি যেন বাস্তবতা হারিয়ে ফেলে। কে নিক, তার সাথে কী করেছে সব ভুলে যায়। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই অদ্ভুত সুন্দর চেহারার দিকে। মনে হয় ছেলে হয়ে এতটা নিখুঁত, এতটা আকর্ষণীয় হওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন ছিলো?
কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই শব্দ—‘ওয়াইফি’—এনির মস্তিষ্কে ভীষণ ঝড় তোলে। নিকের প্রতিটি হিংস্রতা, প্রতিটি পশুত্ব, প্রতিটি নির্যাতনের স্মৃতি ক্রমে একে একে মস্তিষ্কে ঝলসে ওঠে। তীব্র বিতৃষ্ণায় এনি নিজের চোয়াল শক্ত করে ফেলে। শিরায় শিরায় জমে থাকা আতঙ্ককে বিদ্রোহে রূপান্তরিত করে।
এনি সমস্ত শক্তি একত্রিত করে নিকের বুকে প্রচণ্ড ধাক্কা মারে। ঘুমের ঘোরে নিক সেই ধাক্কায় টাল সামলাতে না পেরে সামান্য হেলে যায়। তার দেহের চাপ সামান্য সরে যেতেই এনি সুযোগটা লুফে নেয়। দ্রুত উঠে বসে পড়ে, কাঁপতে থাকা শরীরটা মুক্তির প্রথম নিঃশ্বাস টেনে নেয়।
নিক কপাল কুঁচকে ধীর দৃষ্টিতে তাকায় এনির দিকে। ঘুমের ভারে আধো-বোজা চোখে সেই দৃষ্টি যেন আরও ভীতিকর হয়ে ওঠে।
এনি শ্বাসরুদ্ধকর আতঙ্কে ভিজে থাকা কণ্ঠে বলে,

“আমার উপরে শুয়েছেন কেনো?”
নিক বিরক্তি ভরা নিঃশ্বাস ছেড়ে ঠাণ্ডা অথচ হিংস্র কণ্ঠে উত্তর করে,
“আমার ইচ্ছে।”
এনির চোখে জমে ওঠা প্রতিবাদী আগুন ঝলসে ওঠে। কণ্ঠে কঠোর তিরস্কারের ছায়া নিয়ে বলে,
“আপনার ইচ্ছে হলেই শুতে হবে? রাতে যেসব আঘাত করেছেন, তার হিংস্রতা তো কমেনি। এখন সারারাত নিজের পাহাড় সমান শরীরটা আমার উপর চাপিয়ে শ্বাসরোধ করে মারতে চান?”
নিক ঠোঁট বাঁকিয়ে শীতল স্বরে প্রতিউত্তর করে বলে,
“প্রতিনিয়ত এই শরীরের ওজন বহন করতে হবে তোমাকে। শ্বাসরোধ হয়ে মারা গেলে তো চলবে না, বেবিগার্ল।”
এনির চোখ রক্তাক্ত ক্রোধে দীপ্ত হয়ে ওঠে। দম বন্ধ হওয়া গলায় ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলে,
“দুই সেকেন্ড সহ্য করতে পারি না আপনাকে আমি। সেখানে সারাজীবন সহ্য করা তো অসম্ভব।”
নিকের ঠোঁটে জমে ওঠে বিদ্রুপমাখা প্রশ্ন,

“তোমার ওই অসম্ভব দিয়ে আমি কী করব?”
এরপর ধীরপদে সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। এক টুকরো কাপড়ও শরীরে নেই। একটা কালো প্যান্ট পড়া। খোলা নগ্ন দেহ, শাসনের নগ্ন প্রতীক। এনি অস্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েই দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নেয়। বুকের ভেতর অস্বস্তির দমকা হাওয়ায় কেঁপে ওঠে। সে সামান্য ঠোঁট ভিজিয়ে অনিশ্চিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
“ওয়াইফি কাকে বলেছেন?”
নিক অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে তাকায়, চোখ ছোট করে নির্লিপ্তভাবে উত্তর ছুঁড়ে দেয়,
“কাকে বলেছি?”
এনি চোয়াল শক্ত করে, কণ্ঠে আক্রোশের গর্জন ভরে ওঠে,

“আমাকে ওয়াইফি সম্বোধন কেন করেছেন?”
নিক কাবার্ড খুলে কিছু বের করতে বের করতে অবহেলার সুরে বলে,
“রাতে স্বপ্ন দেখেছিলে? তোমাকে ওয়াইফি বলার মতো দুর্দশা আমার হয়নি।”
এনি রুদ্ধশ্বাস প্রতিবাদ জানায়,
“স্বপ্ন নয়, বাস্তব ছিলো। আপনি ঘুমের মধ্যে আমাকে ওয়াইফি বলেছেন। কিন্তু এই সম্বোধনের অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? আমি তো দিইনি।”
হঠাৎ নিকের দৃষ্টি রক্তাভ হয়ে ওঠে। চোখে জ্বলে ওঠে অগ্নিশিখার দাহ। মুখের শিরাগুলো যেন ক্ষুব্ধ স্রোতের মতো ফুটে উঠে। কাঠিন্য ভরা স্বরে দাঁত চেপে সে উচ্চারণ করে,
“আর একটা কথা বললে বাকি চাবুকের আঘাত শেষ করে দেব। নিক জেভরান যাকে-তাকে ওয়াইফি বলে না।”
এনির বুক ওঠানামা করে হাহাকারময় ছন্দে। নিশ্বাস দীর্ঘ হয়ে যায়। প্রতিটি নিঃশ্বাস তার ভাঙা শরীরের ক্ষত ছিঁড়ে ফেলে। অথচ স্পষ্ট সে শুনেছিলো নিক তাকে ওয়াইফি বলেছে। অথচ এখন সে অস্বীকার করছে। মিথ্যা যেন নিকের রক্তে দ্রবীভূত, প্রতিটি শিরা-উপশিরায় ছলনার স্রোত বহমান।
এনি যন্ত্রণায় পা নড়াতে চায়।কিন্তু চাবুকের দগদগে ক্ষত সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। উন্মুক্ত ফর্সা পা এখন লালচে-কালো আকারে দগ্ধ স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আছে। ব্যথায় ছটফট করতে করতে এনি অবশেষে হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ে। চোখ বুঁজে রাখলেও অশ্রুর অনবরত স্রোত থামে না।বুক ভিজিয়ে দেয় অনুশোচনার অগ্নিদাহ।
নিক প্রস্তুত হয়ে আসে তার সামনে। দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে এসে এনির কাছে দাঁড়ায়। সে তখন অসহায় ভঙ্গিতে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।তবুও চোখ থেকে অবিরত গড়িয়ে পড়ছে লবণাক্ত যন্ত্রণার স্রোত। নিকের মুখের গম্ভীর ছায়া তার চোখে ভেসে ওঠে। আর বিনা অনুমতিতে শক্ত হাতে এনির হাতটি আঁকড়ে ধরে।
এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব, শাসনের শীতলতা আর আকাঙ্ক্ষার উষ্ণতার মাঝখানে জড়িয়ে পড়ে তাদের অস্তিত্ব।

” সামনে এসো।
এনি ধীরে ধীরে চোখ মেলে। অবচেতন ভঙ্গিতে নিজের হাতের উপর নিকের রুক্ষ হাতটিকে অনুভব করতেই বিরক্তি ও অস্বস্তির রেখা ভ্রূকুটিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার স্থবির দেহ, যন্ত্রণায় জড়সড় হয়ে বসে থাকা অবয়ব নিকের ক্রোধকে আরও উসকে দেয়। চোয়াল শক্ত করে নিক হঠাৎ এক হেচকা টানে এনিকে টেনে আনে নিজের সামনে। আচমকা টানের অভিঘাতে এনি ভারসাম্য হারিয়ে সরাসরি নিকের সম্মুখে এসে পড়ে। ব্যথার ঝাঁজকাটা আর্তনাদ গলার গভীর থেকে বেরিয়ে আসে।মুহূর্তের জন্য মনে হয় যেন তার জীবনটিই ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবে।
কিন্তু নিক সেই যন্ত্রণার আর্তি উপেক্ষা করে নিস্পৃহ অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বলে ওঠে,
“শার্টের বোতাম খুলো। ক্ষতস্থান দেখব।”
এই নির্দেশে এনি আতঙ্কে এক ধাপ পিছিয়ে যায়। শুকনো ঠোঁট গিলে নিতে নিতে কাঁপা গলায় বলে,
“দ… দেখবেন মানে? ক…কি দেখবেন?”
নিকের চোখে তখন বিদ্যুতের ঝলকানি, কথায় তিরিক্ষি কঠোরতা,
“তোমার অন্য কিছু দেখার ইচ্ছে নেই আমার। শুধু ক্ষতস্থান দেখার কথা বলেছি।”
এনি ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে পাল্টা দেয়,

“ক্ষতস্থান দেখে কি করবেন? আবার ক্ষত করবেন? করতে চাইলে করতে পারেন, বাঁধা দিব না। তবে একটাই সমস্যা আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।”
নিক গভীর নিঃশ্বাস টেনে ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার দৃষ্টি আরও অগ্নিদীপ্ত হয়ে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই সে এনির ক্ষুদ্রকায় শরীরটিকে শক্ত বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নেয়। এনি ছটফট করতে শুরু করলে নিক হঠাৎ তার চুলে মুঠি চেপে ধরে, গর্জনমিশ্রিত স্বরে বলে ওঠে,
“খারাপ ফিল দিবে না। তোমার এই অস্থিরতা অন্য কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমি যদি সেই ইঙ্গিতকে সত্যি ভেবে এগিয়ে যাই তাহলে তুমি সহ্য করতে পারবে না।”
এনি মরিয়া হয়ে পালানোর জন্য ছটফট করতে করতে কাঁপা গলায় প্রতিবাদ করে ওঠে,
“অশ্লীল পুরুষ! আমাকে এভাবে চেপে ধরেছেন কেন?”
কিন্তু নিক তার কথাগুলোতে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে হঠাৎই তার আঙুল বাড়িয়ে শার্টের বোতামগুলো খুলতে শুরু করে। এনি লজ্জায়, ঘৃণায়, আর ভয়ের আতঙ্কে কেঁপে কেঁপে ওঠে। তার কণ্ঠে প্রতিবাদ ঝরে পড়ে,
“লজ্জা করছে না? একজন নারীর শরীর জোর করে উন্মোচন করতে চাইছেন!”
নিকের দমবন্ধ করা উপস্থিতি আর এনির লাঞ্ছিত আতঙ্ক একই সঙ্গে ঘন কুয়াশার মতো পরিবেশকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
নিকের চোয়াল তখন পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। হিংস্র দৃঢ়তায় সে এনিকে আরও বুকে চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে গর্জে ওঠে,

“এইসব ফাকিং লজ্জা দিয়ে কি হবে, বেবিগার্ল? গ্যাংস্টারদের আসলেই কোনো লজ্জা নেই। আর তোমাকে একবার নয় অনেকবার দেখেছি আমি।”
এই অকথ্য নির্লজ্জ উচ্চারণে এনির চোখ ভিজে ওঠে। লজ্জা আর অসহায়তায় তার বুক কেঁপে কেঁপে উঠে। অঝোর ধারায় কান্না গড়িয়ে নামে। কিন্তু নিক সেই কান্নাকে করুণা না দেখিয়ে বরং নির্মম শক্তি প্রয়োগ করে তার শার্টটা ছিঁড়ে খুলে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
মুহূর্তে পুরো পৃথিবী যেন জমাট হয়ে যায়। নিস্তব্ধ বাতাসে শুধু এনির হাহাকার-ভেজা শ্বাস প্রতিধ্বনিত হয়। নিক চোখ বন্ধ করে ভারী নিঃশ্বাস টেনে নেয়। তারপর হঠাৎ দৃষ্টি স্থির করে তার উদরে থাকা ক্ষতস্থানের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই চোখের দৃষ্টি যেন হাড় পর্যন্ত ভেদ করে প্রবেশ করে যায়।
এনির ঠোঁট উত্তেজনায়, অপমানে, আতঙ্কে ক্রমাগত কেঁপে ওঠে। সে বিছানার চাদর শক্ত করে মুঠি করে ধরে ফুঁপিয়ে বলে ওঠে,
“আল্লাহর দোহাই লাগে… এইভাবে তাকিয়ে থাকবেন না। দয়া করে… আমার জামাটা ফিরিয়ে দিন।”
কিন্তু নিক নির্বাক। শুধু নিচের ঠোঁট দাঁতে চেপে ধরে ক্ষতের দিকে চোখ গেঁথে রাখে। কিছুক্ষণ এভাবে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর ঘন নিশ্বাস টেনে বলে,

” তোমার উন্মুক্ত শরীর দেখা একদম উচিত হয় নি।
এনি ঠোঁট চেপে কান্না আটকিয়ে বলে,
” প্লিজ আমার জামা ফিরিয়ে দিন। দেখতে হবে না আপনাকে।
নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে এনির গলার ঠিক নিচ বরাবর শক্ত করে চুমু বসিয়ে বলে,
” অনেক বড় ক্ষতি করেছো তুমি আমার। আর এই মাশুল তোমাকেই গননা করতে হবে।
নিকের ঠোঁটের স্পর্শ পেতেই এনি ফুঁশে উঠে। চট করে চোখ খোলে রক্ত লাল চোখে তাকায়। নিকের দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলে,
” ছাড়ুন আমাকে। নির্লজ্জ, বেহায়া পুরুষ। চরিত্রহীন আপনি।
— যাস্ট সেট আপ! মুচড়া- মুচড়ি করলে সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে জ্যাঁন্ত পুঁতে দিয়ে আসব।
— হ্যা এইটা ছাড়া আর কি পারেন। কাপুরুষের মত আঘাত করে রক্তাক্ত করে যখম বানানো ছাড়া।
নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে বলে,
” সুপুরুষ সাজতে বলছো বেবিগার্ল!
এনি শক্ত কন্ঠে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

” রক্ষিতাদের সামনে সুপুরুষ সাজতে নেই নিক জেভরান। তাদেরকে শুধু চাবুক পিটা করা উচিত। আপনার মত চরিত্রহীন পুরুষদের কাছে এইটা ছাড়া আর কি আশা করা যায়।
এনির কথা শেষ হতেই নিক ভ্রুঁ নাচিয়ে তাকায়। ধূসর মনিগুলো জ্বলতে থাকে। রাগে দাঁত ঘর্ষন করে উঠে। দাঁতের ঘর্ষনের শব্দ এনির কানে ও ভেসে আসে। নিক এচমকা এনিকে ধাক্কা মেরে বিছানায় ফেলে দেয়। এনি হকচকিয়ে উঠে এমন ব্যবহার। নিজের শরীর ঢাকার ব্যার্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু হাত দুইটা হিংস্র হায়েনের মত নিক বিছানার সাথে চেপে ধরে। নিকের এমন ব্যবহারে এনি আতঙ্কে জমে যায়। ভুল চিন্তা- ভাবনা মস্তিষ্কে আসতে থাকে। কি হবে এখন তার সাথে? এনির নিশ্বাস ঘন হতে থাকে ভয়ে। চোখ বন্ধ করে আতঙ্কে খিঁচে রেখেছে। নিক হিংস্রতা নিয়ে এনির ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট এগিয়ে নেয়। কিন্তু আচমকা থেমে যায়। এনির ঠোঁটের সাথে একদম ছুইঁ ছুঁই। চোখ বন্ধ করে বড় করে শ্বাস টানে। চোয়াল শক্ত করে এনির চিবুক চেপে ধরে বলে,

” চরিত্রহীন কাকে বলে আজ তোমাকে বুঝাতাম বেবিগার্ল। কিন্তু জানা নেই বার বার কেনো এত বাঁধা। কেনো থেমে যায় আমি। নিক জেভরান কখনো কারোর ইচ্ছের প্রাধান্য দেয় নি। যাস্ট চুমুর পরিমান সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলো। যেদিন আমার হিংস্রতা তোমার এই নরম শরীরের উপর যাবে সেদিন কি হবে ভেবে দেখেছো?
নিক এক ঝটকায় এনিকে সরিয়ে দেয়। এরপর একটিও শব্দ উচ্চারণ না করে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায়। ভারী পদক্ষেপে দরজা ঠেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
নিক বেরিয়ে যেতেই এনি যেন হাওয়া টেনে নেয় বেঁচে থাকার তাগিদে। কাঁপতে কাঁপতে ছুটে গিয়ে শার্টটা আবার নিজের গায়ে জড়িয়ে নেয়। তবুও মনে হয় নগ্ন দগদগে ক্ষত পুরো শরীরকে লাঞ্ছিত করে রেখেছে। ঘৃণায়, বিতৃষ্ণায় তার দেহটা রি… রি করে ওঠে। মনে হয় যেন চামড়ার নিচে বিষাক্ত পোকামাকড় হেঁটে বেড়াচ্ছে।আর সেই অস্বস্তি তাকে ভেতর থেকে ছিঁড়ে খাচ্ছে।
একটা জানোয়ার তার শরীরকে বারবার দৃষ্টির খেলা বানিয়েছে।শুধু এই চিন্তাটুকুই তাকে ভেঙে দেয়। বুকের ভেতর থেকে দমবন্ধ চিৎকার উঠে আসে।কিন্তু বের হতে চায় না। সে হাঁটুতে মুখ ডুবিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সেই কান্না হয়ে ওঠে নিস্তব্ধ রাতের অদৃশ্য আর্তনাদ। এনি রাগে বিরবির করে উঠে,
‘ লুচ্চামি করবে, আবার লুচ্চা বললেই গায়ে লাগে। নির্লজ্জ লোক। তর ভবিষ্যতের উপর ঠাডা পড়ুক। যাতে জীবনে কোনোদিন মেয়েদের কাছে যাওয়ার সাহস করতে না পারিস।

দমবন্ধ করা অন্ধকার ঘরের দেয়ালজুড়ে এক অশুভ নৈঃশব্দ্য গড়াগড়ি খাচ্ছে। বাতাস যেন রক্তের গন্ধে ভারী হয়ে নড়ে উঠতে চাইছে না। চারপাশে মৃদু কাঁপুনি, নিঃশ্বাসের কর্কশ শব্দে বন্দি মানুষগুলোর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে অদৃশ্য ঝড়ে। কালো কাপড়ে আচ্ছাদিত তাদের দেহগুলি মাটিতে জমাট বাঁধা ছায়ার মতো কাঁপছে।অথচ চোখে মুখে মৃত্যুর অগ্রিম ছায়া নেমে এসেছে।
এই মৃত্যুঘরে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর প্রেতসদৃশ মানুষ—গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান। তার দু’চোখ জ্বলজ্বল করছে নিছক হিংস্রতার দীপ্তিতেমশিরাগুলো ফুলে উঠেছে ক্রোধের উন্মত্ত টানে। হাতে ধরা রিভলভার থেকে প্রতিফলিত হচ্ছে এক শীতল ঝিলিক—মৃত্যু নিজেই ধাতব রূপ ধরে আলো ছড়াচ্ছে।
নিকের ঠোঁটের কোণে শীতল এক হিংস্র বাঁক, গলার গভীর থেকে বেরোচ্ছে বজ্রের মতো গর্জন বেরিয়ে আসে,
“চিৎকার করবি না… কারণ তদের শেষ সুর হবে গুলির প্রতিধ্বনি।”

এক নিমেষে ঘরের ভেতর জমে ওঠে ভয়ের কণ্ঠরুদ্ধ আর্তনাদ। কালো কাপড়ের নিচে কাঁপতে থাকা বন্দিরা দম আটকে কান্না চেপে রাখে। কেউ মাটিতে হাঁটু গেড়ে পড়ে যায় কেউ নিঃশব্দে আকাশের দিকে তাকায়। আর কারো ঠোঁটে নীরব প্রার্থনা করছে।
নিক ধীরে ধীরে তাদের চারপাশে হায়েনার মতো চক্কর দিতে থাকে। প্রতিটি পদক্ষেপে তার বুটের ভারী শব্দ দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়। মৃত্যুর ঘন্টা বাজছে। সে প্রতিবার রিভলভার তুলে ঠান্ডা নলটা কারো কপালে ঠেকিয়ে আবার টেনে নেয় এই ভয়ঙ্কর খেলা। শুধু তাদের বুকের ভেতর চাপা চিৎকার বাড়িয়ে তোলে।
তার গুলি ছোঁড়ার স্টাইলও নৃশংসতার এক শিল্প। হঠাৎ করেই সে চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস টেনে নেয়, তারপর চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে নিখুঁত নিশানায় ট্রিগার চেপে ধরে। মুহূর্তেই বাতাস চিরে বেরিয়ে আসে বিস্ফোরিত আওয়াজ।সাথে বন্দির শরীর ভেদ করে রক্তের ছিটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। চাদরের সাদা অংশে লাল দাগ যেন মৃত্যুর সিলমোহর হয়ে লেগে যায়। চারপাশে চাপা আর্তনাদের সাথে সাথে ঘরের পরিবেশ হয়ে ওঠে ভয়ানক দমবন্ধ। নিক থামে। রক্তে রাঙ্গা হতে থাকে মেঝেগুলো। সবাই এক এক করে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকে। নিকের চোখ দুইটা লাল হয়ে আছে। আরিশ ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিকের দিকে তাকিয়ে আছে। নিক শ্বাস নিয়ে ডার্ক সটিলের চেয়ারটায় শব্দ করে বসে। ঘেমে তার অবস্থা কাহিল। নিকের ছন্নছাড়া অবস্থা দেখে আরিশ ভ্রুঁ কিঞ্চিত ভাঁজ করে বলে,

” টেল মি হোয়াট হ্যাপেন্ড টু ইউ। এমন অধৈর্য হচ্ছিস কেনো?
নিক চোখ খুলে এক চুমুকে পুরোটা ওয়াইন গিলে ফেলে। এনির কাতর মুখটা বার বার চোখে ভাসছে। বিরক্তি আর ক্ষোভে চট করে দাঁড়িয়ে যায়। রাগটাকে কন্ট্রোল করতে না পেরে হাতে থাকা ওয়াইনের বোতলটাকে আছাড় মারে। আরিশ কপাল কুচকে শুধু নিককে দেখে যাচ্ছে। অধিরাজ এতটা অবাক মেবি আর কোনোদিন হয় নি। নিজের বসের এমন ছন্নছাড়া রুপ সে আজ প্রথম দেখছে। হাজারটা খুন করে এসেও একদম ঠান্ডা মেজাজে বসে থাকার নাম এই হচ্ছে গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান। চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন মৃত্যুর পূর্বাভাস হয়ে নেমে এসেছে। টর্চার সেলের কংক্রিট দেওয়ালে জমাটবাঁধা রক্তের দাগ এখনও শুকোয়নি। বাতাসে ভাসছে গা কাঁপানো এক বিভীষিকাময় গন্ধ। বারুদ, ঘাম, আর মৃত্যুর অদৃশ্য ছায়া। সেই অন্ধকার রাজ্যের কেন্দ্রে বসে আছে নিক জেভরান। আগুনের মত জ্বলন্ত চোখ, দাঁতে দাঁত ঘষে ওঠা হিংস্র আওয়াজে কক্ষের নিস্তব্ধতা চূর্ণ করছে। তার চারপাশে কালো কাপড়ে মোড়া সাতটি নিথর দেহ ছড়িয়ে আছে।অচেনা যন্ত্রণার আর্তনাদ এখনো যেন দেয়ালের ফাঁক গলে প্রতিধ্বনি তুলছে। অধিরাজ নিথর রক্তাক্ত দেহগুলোর দিকে এক পলক তাকায়। এরপর আরিশের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে নিম্নস্বরের কাঁপা কণ্ঠে বলে,

“স্যার, কি হয়েছে? বস এমন করছে কেনো?”
অধিরাজের কণ্ঠে স্পষ্ট আতঙ্ক। আরিশ নিম্ন সুরে বলে,
” সেটা তো আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। এমন ব্যাকুল আর রেগে আছে কেনো?
— রাগটা তো মনে হচ্ছে নিজের সাথে করছে। টর্চার সেলে এসেই কোনো কারন ছাড়া সাতজনকে একসাথে মেরেছে।
— মারার কারনটাও বুঝতে পারছি না।
— বস যখন নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পারে তখন ঠিক এমনটা হয়। নিশ্চই কোনো বিষয় নিয়ে প্রচন্ড ক্ষোভে আছেন।
আরিশ কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। নিক নিজেকে কিছুটা শান্ত করে পুনরায় চেয়ারে বসে পড়ে। অধিরাজ নিককে দেখে নিজের জায়গায় বসে পড়ে।
নিক গভীর গম্ভীর স্বরে নিক ধীরে ধীরে বলে,

“মেয়েদের সবচেয়ে দুর্বল জিনিস কোনটা? যেখানে আঘাত করলে তারা সমস্ত সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য হয়?”
অধিরাজের চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। আরিশ হতবাক হয়ে নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে থাকে নিকের দিকে। যেন বাস্তবের মাটি সরে গিয়ে দুজনই এক অচিন্তনীয় স্বপ্নে ঢুকে পড়েছে। নিক জেভরান— যে নারীদের ঘৃণায় শ্বাস নেয়, যে নিজের জন্মদাত্রীকেও অবজ্ঞা করে। সেই কি না নারীর দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন করছে? অসম্ভব! যেন মৃত্যুঘরে বেজে ওঠা অসম্ভব সঙ্গীত।
কিন্তু পরমুহূর্তে নিক দাঁত কটমট করে বজ্রকণ্ঠে ধমক দিয়ে ওঠে,
“প্রশ্ন করেছি, তাকিয়ে থাকতে বলিনি।”
নিকের গর্জনে বাতাস ফেটে যায়। আরিশ আর অধিরাজ হুঁশ ফিরে পেয়ে তড়িঘড়ি করে সোজা হয়ে বসে। আরিশ সামান্য খাকারি দিয়ে বলে,

“মেয়েদের নিয়ে হঠাৎ এমন প্রশ্ন করার কারণ?”
নিক চোখ রক্তাভ করে থমথমে স্বরে জবাব দেয়,
“উত্তর চেয়েছি, প্রশ্ন নয়।”
আরিশ নিজের দম সামলে বলে,
“তুই যেই নদীর মাছ, আমি ও সেই নদীর মাছ। হয়তো তোর মত মেয়েদের ঘৃণা করি না, কিন্তু কোনোদিন তাদের সঙ্গও পাইনি। তাই আপাতত কোনো ধারনা নেই।
নিকের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। পেশিগুলো টানটান হয়ে ওঠে। রক্তাভ চোখে দপদপ করতে থাকে দমিত ক্রোধ।
নিক দাঁত কটমট করে যেন শিকল ভাঙা বাঘের মতো গর্জে ওঠে বলে,
“ধারণা রাখা উচিত ছিল।”

অধিরাজ এক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে।তারপর সশব্দে গলা ভিজিয়ে সাহস সঞ্চয় করে উত্তর দেয়,
“ধারণা রেখে কি করব, বল? আমি কি জানতাম তুই এমন প্রশ্ন করবি? যদি জানতাম, তাহলে অনেক আগে থেকেই ধারণা তৈরি করে রাখতাম। তবে চিন্তা করিস না, লোকদের কাছ থেকে জেনে নেব।”
নিকের চোখ রক্তাভ হয়ে ওঠে। তার ক্রোধের তাপে যেন পুরো টর্চার সেল কেঁপে ওঠে। হঠাৎই সে ক্ষোভে ফেটে পড়ে দাঁড়িয়ে যায়। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে যেন বজ্রপাতের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়।
অধিরাজ কাঁপা ঠোঁট ভিজিয়ে ধীরে গলায় বলে,
“একটা নারীর প্রধান দুর্বলতা তার বাবা-মা, বস।”
কথাটা যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছুঁড়ে দেয় ক্রোধের অগ্নিগর্ভে। নিক চোয়াল শক্ত করে, দাঁত কিঁচিয়ে রক্তচক্ষুতে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে,

“ফা*ক অফ অধিরাজ! নারীর দুর্বল জায়গা বাবা-মা সেটা আমি-ও জানি।”
সেই মুহূর্তে বাতাস জমাটবাঁধা তুষারের মতো জমে যায়। নিস্তব্ধতা আরও ভারী হয়ে পড়ে। ঠিক তখনই আরিশ, গম্ভীর অথচ কাঁপা কণ্ঠে ছুরির মত ধারালো প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“তাহলে তোর মা কেনো তোর দুর্বলতা নয়, নিক?”
কথাগুলো যেন তীরবিদ্ধ হয়ে প্রবেশ করে নিকের হৃদপিণ্ডে। নিক হঠাৎ চোখ বন্ধ করে ফেলে। বুক ভরে বাতাস টেনে নেয়। এক মুহূর্তের জন্য তার সমস্ত হিংস্রতা থেমে গিয়ে ভেতরে জমে ওঠা ঝড়ের ইঙ্গিত দেয়।
তারপর কর্কশ অথচ স্তম্ভিত কণ্ঠে বলে,
“শান্ত আছি, শান্ত থাকতে দে আরিশ। অহেতুক কথা বলে লাইন খরচ করে অশান্ত করে তুলিস না। আমার প্রশ্নের উত্তর দে। নারীর দুর্বলতা আসলে কোথায়?”
অধিরাজের ঠোঁটে এক অদ্ভুত সঙ্কোচ ভেসে ওঠে। খানিকক্ষণ দ্বিধা করে কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করে,
“হয়তো স্বামী!”
কথা শুনেই নিক ভ্রু কুঁচকে, চোখে হিংস্র কৌতূহল নিয়ে বলে,
“মানে?”
অধিরাজ এবার সরল আর দৃঢ় স্বরে বলে,

“স্বামী! মানে বাবা-মায়ের পর একজন মেয়ের জীবনে তার স্বামীই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।”
ঘর জুড়ে মুহূর্তেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসে। নিক আর আরিশ দুজনেই অধিরাজের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তাদের চোখের সেই নিস্তব্ধ আগ্রাসী দৃষ্টি যেন অধিরাজের শিরায়-উপশিরায় কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়। থতমত খেয়ে অধিরাজ তাড়াহুড়ো করে আবার বলতে শুরু করে,
“আমার জানা মতে সেটাই। কারণ বাবা-মায়ের পর একজন মেয়েকে তার স্বামী আগলে রাখে। সব দুঃখ-কষ্ট নিজের কাঁধে নিয়ে স্ত্রীর পাশে দাঁড়ায়। নিজের থেকেও নিজের স্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তাই একটা মেয়ের কাছে সবচেয়ে দুর্বলতা তার স্বামীই হয়ে থাকে, বস।”
কথাগুলো শুনে নিকের চোখে যেন জটিল এক ঝড় খেলে যায়। নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। কিছুক্ষণ অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে। যেন নিজের ভেতরে অচেনা এক শব্দ খুঁজছে। তারপর কর্কশ গলায় উচ্চারণ করে বলে,
“স্বামী অর্থ কী?”
নিকের এমন প্রশ্নে আরিশের মুখে ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটে ওঠে। ঠোঁট বাঁকিয়ে ঠাট্টার সুরে বলে ওঠে,
“নিজে স্বামী হতে চাইছিস নাকি?”

— বউ কে?
নিকের কথায় বাতাসে এক মুহূর্তের জন্য ব্যঙ্গের শীতলতা ছড়িয়ে পড়ে। নিকের ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যের রেখা ফুটে ওঠে।
আরিশ ফুঁশ করে নিশ্বাস ছাড়ে, তারপর ব্যঙ্গ মিশ্রিত গাম্ভীর্যে বলে,
“যাকে দিনে দেওয়া হয় নরমাল মেডিসিন, আর রাতে হাই ডোজের মেডিসিন তাকেই মূলত বউ বলা হয়।”
নিক ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি টেনে নাক ছিটকিয়ে উত্তর দেয়
“হাই ডোজের মেডিসিন সহ্য করতে পারবে না। মেয়ে নিয়ে হাসপাতালে দৌঁড়াদৌঁড়ি করার মতো এনার্জি নেই আমার।”
আরিশের চোয়াল ঝুলে পড়ে। চোখে বিস্ময় আর সন্দেহের মিশ্র প্রতিফলন ঘটিয়ে বলে,
“কে সহ্য করতে পারবে না? তুই আবার… এনির কথা ভাবছিস না তো?”
শব্দ শেষ হতেই বাতাসে হিমশীতল স্রোত বয়ে যায়। নিক হঠাৎ দাঁত কটমট করে বজ্রকণ্ঠে ধমকে ওঠে,
“জাস্ট সেট আপ।”
নিকের স্বর এতটাই হিংস্র ছিল যে চারপাশের দেয়াল যেন কেঁপে ওঠে।
অধিরাজ ঠোঁটে এক জোরপূর্বক হাসির রেখা টেনে সামান্য মাথা নুইয়ে বলে,
“আরিশ স্যারের কথাতেও যুক্তি আছে। তবে… ধর্মীয় নিয়মে যার সাথে বিয়ে হয় তাকেই স্বামী বলা হয়।”
নিকের চোখে তখন গাঢ় অন্ধকার জমে আছে। ঠোঁট বাঁকিয়ে কর্কশ অথচ গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,

“ব্যাস, এইটুকুই?
“হ… হ্যাঁ।”
নিক হঠাৎ সামনে ঝুঁকে দাঁত কামড়ে আরও তীব্র প্রশ্ন করে বলে,
“আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা? যেখানে আঘাত করলে সে ধ্বংসের সর্বসীমা পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে?”
অধিরাজের কণ্ঠ থেমে যায়। কিছুক্ষণের নীরবতা ভেঙে আরিশ গম্ভীরভাবে বলে ওঠে,
“সন্তান!”
কথাটা উচ্চারিত হতেই নিকের ধূসর চোখে এক অদ্ভুত আলো জ্বলে ওঠে। সে ভ্রু নাচিয়ে আরিশের দিকে তাকায়, সন্দিহান বাক্যে ধীরে জিজ্ঞাসা করে,
“মানে?”
আরিশ নিঃশ্বাস ফেলে ব্যাখ্যা করে বলে,
“মানে, একটা মেয়ের কাছে তার সন্তানের ঊর্ধ্বে কিছু নেই। সন্তানের জন্য সে ভালোবাসাকেও হাজারবার স্যাক্রিফাইস করতে পারে। তাকে বাঁচাতে ধ্বংসের শেষ সীমায় যেতেও দ্বিধা করে না।”
নিক ধীরে ধীরে পুনরাবৃত্তি করে বলে,

“সন্তান!”
আরিশ মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়,
“ জি বস ”
নিকের চোখে শীতল কৌতূহল ভেসে ওঠে। সে আবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“নিজের সন্তানকে রেখে কোথাও যায় না?”
আরিশ দ্বিধাহীন গলায় বলে,
“জীবন চলে যাবে, তবুও নিজের সন্তানকে আলাদা করবে না। সন্তানের জন্য সে সবকিছু করতে পারে।”

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৭

নিশ্চুপ হয়ে যায় পরিবেশ। নিকের ঠোঁট চেপে রাখা দমিত রাগে ফেটে যাওয়ার উপক্রম। দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত সে ঠোঁট কামড়ে থাকে। তারপর হঠাৎই তার মুখে এক বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে।
সেই হাসি ছিল না আনন্দের, ছিল না প্রশান্তির। বরং গভীর অন্ধকারের গর্ভ থেকে উঠে আসা এক পৈশাচিক সংকেত।
আরিশ আর অধিরাজ ভ্রুঁ ভাঁজ করে তাকায়। তারা দুইজনেই চোখে চোখ রেখে হতবাক হয়ে পড়ে। কেউ বুঝতে পারছে না এইসব প্রশ্নের আসল অর্থ কী। কারো জানা নেই নিকের মাথার কি ঘুরছে।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৯