লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৩৯
লিজা মনি
তানভী আশ্চর্য হয়ে বলে,
” কিন্তু মেহের স্যার তো মেয়েদের সহ্য এই করতে পারে না। গ্লাস মিনারে মেয়ে আসলো কিভাবে?
মেহের তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,
” এইটা গ্লাস মিনার হলেও সেটা অন্ধকার এক জগৎ। হয়ত তাদের কোনো প্রয়োজনীয় কাজের জিনিস এই মেয়ে। তাই এইভাবে লুকিয়ে রেখেছে।
তানভী আনমনেই বলে,
” হয়ত। কিন্তু কেনো জানি অদ্ভুত সন্দেহ হচ্ছে।
অধিরাজ ততক্ষণে চলে আসে তানভীর সামনে। তানভী মেহেরের উদ্দেশ্যে বলে,
” তর সাথে পরে কথা বলছি। আর বিষয় নিয়ে আলোচনা করে দেখি, রাজি করাতে পারি কি -না।
তানভী ফোন কেটে অধিরাজের দিকে একবারের জন্য ও তাকায় নি। সামনে পড়া থাকা চুলগুলোকে হাত দিয়ে ডান পাশে সরিয়ে এড়িয়ে চলে যায়। তানভীর মৌনতায় অধিরাজ কপাল কুচকে ফেলে। প্রেয়সী অভিমানে ফুলে আছে বুঝতে বাকি নেই। যে মেয়ে এক পলক দেখার জন্য, খোঁজ করতে করতে বাগান বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছে সে এখন এড়িয়ে যাচ্ছে! অধিরাজ ঠোঁট বাঁকিয়ে সামান্য হাসলো। গলা ছেড়ে শান্ত গলায় ডাক দেয়,
” তান-ভী! জান আমার।
তানভী শুনলো না। এক মনে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন ভাবে হাটছে যেন পিছনে কেউ নেই। সামনে কোনো গুরুত্বপূর্ন কাজ রেখে এসেছে। এই মুহূর্তে যেতে না পারলে মুশকিল হয়ে যাবে। অধিরাজ লম্বা নিশ্বাস নিয়ে গার্ডদের দিকে তাকায়। এরপর ইশারা করে বলে,
” এইগুলো নিয়ে এগিয়ে যাও। কিছুক্ষণ পর আসছি আমি।
অধিরাজ ইশারা দিয়ে আর দাড়ালো না। বড় বড় পা ফেলে ছুটে গেলো প্রেয়সীর নিকটে। অধিরাজের উপস্থিতি পেয়ে তানভী – হাটার গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। অধিরাজ শক্ত করে তানভীর ডান হাত ধরে ফেলে। তানভী দাঁড়িয়ে যায় কিছু সেকেন্ডের জন্য। পিছনে ফিরে নিজের হাতটার দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে ফেলে। ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করে উঠে,
” ছাড়ুন আমার হাত।
অধিরাজ ছেড়ে দেওয়ার বদলে আরও শক্তভাবে ধরে। অন্য হাত দিয়ে প্রেয়সী কোমড়টা জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে। তানভী রাগে ফুঁশ-ফুঁশ করছে। অধিরাজ রাগ দেখে সামান্য হাসলো। কপালে গভীর চুম্বন দিয়ে হিসিহিসিয়ে বলে,
” ছেড়ে দেওয়ার জন্য তো হাতটা ধরি নি। এই হাত ধরার অধিকার অনেক আগেই অর্জন করে নিয়েছি। কারোর কথায় ছেড়ে দিব ভাবলে কিভাবে?
তানভী শক্ত গলায় বলে,
” কিসের অধিকার? আমি আপনাকে কোনো অধিকার দেয় নি।
” ওকে।
” তাহলে ছাড়ুন আমাকে। মেয়ে দেখলেই স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে তাই না? ছাড়ুন আমাকে, অসভ্য!
অধিরাজ আলিঙ্গন আর ও গভীর করে বলে,
” খুব রেগে আছো তাই না?
” রাগ করব কেনো আমি? আর অপরিচিতদের উপরে রাগ করা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়।
অধিরাজ কপাল কুচকে বলে,
” আমি অপরিচিত?
‘” কে আপনি?
অধিরাজ তানভীর গালটা সামান্য চেপে ধরে নিজের মুখের দিকে ফেরায়। তানভী তবুও তাকায় না। অধিরাজ সামান্য হেসে রমণীর ঠোঁটে শক্ত করে চুমু খায়। তানভী ছটফটিয়ে উঠে। অধিরাজ একই অবস্থায় বলে,
” এখন বলো আমি কে? যদি এরপরও বলো আমাকে চিনো না, তাহলে বাকি পদক্ষেপ ও নিব।
তানভী তেজী গলায় বলে,
” চুমু কেনো খেয়েছেন?
” আমার ইচ্ছে। কেনো বললে আমাকে চিনো না।
” মিথ্যে তো বলি নি। যদি পরিচিত হতাম তাহলে অবশ্যই একটা ফোন কল যেত আমার মোবাইলে। অন্তত খবর নিত বেঁচে আছি নাকি মরে গিয়েছি। এখন তো দেখা যাচ্ছে মরে পঁচে থাকব তবুও জানতে পারবে না।
তানভী কথা গুলো বলতে বলতে হুট করেই থেমে যায়। থেমে যেতে সে বাধ্য হয়। বেশি কথা বলে ফেললে আবেগের বশে চোখ দিয়ে পানি ঝরে পড়বে। যেটা সে এই মুহূর্তে চাচ্ছে না। অধিরাজ ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে আচমকা তানভীর মাথাটা নিজের বক্ষের সাথে চেপে ধরে। মাথায় চুমু খেয়ে অস্থির গলায় বলে,
” সরি জান। কাজের মধ্যে ডুবে ছিলাম। এদিক -সেদিক কাজের ঢিল ছিলো প্রচুর। আরিশ স্যার এখানে নেই। তিনি ইতালি আছে। কাজের চাপটা একটু বেশি বেড়ে গিয়েছে। আমি ইচ্ছে করেই ফোন দেয় নি। সামান্য কথা বলে নিজের মনকে অস্থির করে তুলতে চায় নি। লম্বা সময় খুঁজছিলাম।
তানভী ভাঙ্গা গলায় বলে,
” সেই লম্বা সময় বুঝি এক সপ্তাহের ভেতরেও হয় নি?
” তুমি আমার সম্পর্কে সব জানো তানভী। আমার পরিচয় জানো তুমি। আমি সাধারন জীবনযাপন করি না। আমি আর পাঁচজন সাধারন প্রেমিক পুরুষের মত প্রেমিকাকে নিয়ে হাঁটতে বের হতে পারব না। তাকে নিয়ে কোথাও শান্তিতে ঘুরতে যেতে পারব না। সময় দিতে পারব না। সব জেনেইতো আমাকে ভালোবেসেছো। তাহলে আজ এত অভিযোগ কেনো? কেনো এইসব বলে আমাকে ভেঙ্গে দিচ্ছো?
তানভী নাক টেনে বলে,
” আমি তো বলি নি আমাকে নিয়ে হাটতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি তো একবারের জন্য ও বলিনি আর পাঁচজন প্রেমিক পুরুষের মত ট্রিট করতে। তোমার অস্তিত্ব, পরিচয় সব জেনেই ভালোবেসেছি। সব জেনেই তোমার প্রতি এতটা উন্মাদ হয়েছি। ভালোবেসেছি আমি তোমাকে রাজ । একদিন না দেখলে অস্থির লাগে নিজেকে। এক ঘন্টা চায় নি তোমার থেকে। যাস্ট একটা মিনিট চাই। এক পলক দেখে না হয় চোখ বন্ধ করে ফেলব। কিন্তু সেই একটা মিনিট দেখার সুযোগ ও তুমি আমাকে দাও না। খুব পাষাণ তুমি রাজ। প্রচন্ড পাষাণ।
অধিরাজ নিশ্চুপ হয়ে প্রেয়সীর অভিযোগগুলো শুনে। অধিরাজকে কথা বলতে না দেখে তানভী পুনরায় বলে,
” আজ যদি আমি এখানে না আসতাম তাহলে হয়ত তুমি মাসেও খবর নিতে না আমার। হয়ত ভুলেই যেতে তানভী নামক একটা মেয়ে আছে। নিতে হবে না তোমাকে কোনো খবর। ভালো তো আমি বেসেছি। দহনটাও আমি একাই সহ্য করব।
” আমি ভালোবাসি না?
” সত্যি তুমি আমাকে ভালোবাসো?
” প্রেমিক হতে হলে কি করতে হয়?
তানভী মলিন হেসে বলে,
” প্রেমিক হতে হলে কিছুই করতে হয় না। ভালোবাসা যদি দুজনের মনে বিদ্যামান থাকে। তবে প্রেমিকের সামান্য উপস্থিতিই প্রেমিকার হাসির কারণ। প্রেমিকার একটা ফোন কল প্রেমিকার সব থেকে তৃপ্তির কারণ। হোক কথা বলার সময় দশ সেকেন্ড, কি যায় আসে তাতে?
অধিরাজ তানভীর মুখটা দুই হাতের মধ্যে আগলে নেয়। ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” আমার প্রেমের প্রতিটা লাইন তোমাকে বুঝাব তানভী এলেনা। সময় আমার আসতে দাও। আপাযত সমস্ত অভিযোগ আমি মাথা মেতে নিলাম। কিন্তু সেটা বেশি দিনের নয়। হয়ত আর কয়েকটা দিন। বিয়ে করব তোমাকে। বউ বানাব আমার। আমার বউ হবে তুমি মিসেস অধিরাজ। প্রতিটা সময় বুঝবে আমার প্রেম কি জিনিস। আমার প্রেমের অর্থ অন্যরকম। আর পাঁচজন প্রেমিক পুরুষের মত কখনো ট্রিট করব না। আগেও বলেছি এখনও বলছি। এখন কথা বলি না সেজন্য অভিযোগ করো। কিন্তু তখন প্রতিটা পদক্ষেপ নিয়ে অভিযোগ করবে। এখনের অভিযোগ যেমন মাথা পেতে নিয়েছি তখনেরটাও নিব। এখনের কান্না আমার কলিজা নাড়িয়ে তুলছে। কিন্তু তখনকার কান্না আমার তৃপ্তির কারন হবে। শুধু সময়, পরিস্থিতিত, অর্থ ভিন্ন হবে। তোমার মুখের অভিমান মারাত্নক মেয়ে। একজন শক্ত -পোক্ত দেহের ব্যক্তিকে নাড়িয়ে তুলার ক্ষমতা রাখে।
তানভী লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। বিরবির করে বলে,
” কিসব বলছো তুমি?
” মিথ্যে বলেছি?
তানভী চোখ পাকিয়ে বলে,
” সেটা তখনকার ব্যাপার। এখন কেনো লজ্জা দিচ্ছো আমাকে।
অধিরাজ হালকা হেসে বলে,
” সার্টিফিকেট থাকলে এখনই লজ্জা ভাঙ্গার কাজে লেগে পড়তাম। কিন্তু আফসোস সেই সার্টিফিকেট আমার হাতে এখনও আসে নি। তবে চিন্তা করো না খুব দ্রুতই চলে আসবে।
তানভী চোয়াল শক্ত করে বলে,
” রাজ!
” আশ্চর্য তুমি রেগে যাচ্ছো কেনো? তুমি চাও না আমি যাতে সার্টিফিকেট হাতে পেয়ে যায়?
তানভী চোখ পাকিয়ে বলে,
” তুমি কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছো, আমি বুঝি না ভেবেছো?
” কিসের ইঙ্গিত দিয়েছি?
অধিরাজের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি। তানভী অসহায় চোখে তাকায়। এসেছিলো রেগে কয়েকটা কথা শুনাবে অথচ এই লোকে তাকে পদে -পদে লজ্জায় ফেলছে। তানভী রাগ দেখিয়ে বলে,
” আরেকবার এমন নির্লজ্জ কথা বললে কিন্তু আমি চলে যাব।
অধিরাজ হেসে বলে,
” ছোট ছোট কথা দ্বারা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি বেইবি। যাতে ফিউচারে বড় কথার ওজন সহ্য করতে পারো। এখন থেকে প্রশিক্ষণ নাও পরে সহজ হয়ে যাবে। আমি শুদ্ধ পুরুষ নয় জান। তোমার সামনে পৃথিবীর সব থেকে অশুদ্ধ পুরুষ হতে চাই। আর সেটা হবও। জাস্ট ওয়েট ফর দ্য টাইম টু কাম, বেইবি এভরি বোন উইল রেকগনাইজ অধিরাজ’স প্রেজেন্স।
তানভী অধিরাজের বুকে ঘুষি মেরে বলে,
” সত্যি অনেক অসভ্য তুমি। যদি সময় হয় তাহলে নিজের বসের থেকে একটু প্রশিক্ষণ নিও। কিভাবে একটু লজ্জাশীল হতে হয়। এতটা গম্ভীর ব্যক্তির ভাই হয়ে এমন নির্লজ্জ হলে কিভাবে? অবশ্য এই নির্লজ্জ রুপ তো আমি ছাড়া কেউ জানে না।
অধিরাজ অবাক হয়ে বলে,
” কার থেকে প্রশিক্ষণ নিতে বলছো?
” নিক স্যার থেকে। এইভাবে অবাক হচ্ছো কেনো? ভুল কিছু বলেছি আমি?
অধিরাজ আশ্চর্য হয়ে বলে,
” বস লজ্জাশীল?
” হ্যা।
অধিরাজ হুট করেই কেঁশে উঠে শব্দ করে। কাঁশিটা বন্ধ করে বিরবির করে উঠে,
” যে লোক বাসর করবে বলে সারারাত রুমের সামনে ড. দাড়া করিয়ে রাখে, জানে কিছু একটা হয়ে যাবে। বাসর করে বউরে অজ্ঞান করে ফেলে এই লোকের নাকি এত গুণ! সে নাকি আবার লজ্জাশীল। উনার ফার্স্ট বাসরের কথা ইহজনমেও ভুলব না। সারারাত সজাগ থাকতে হয়েছে আমাদের। তার উপর বেচারী ড. কে পুরো রাত ভয় দেখিয়ে রাখতে হয়েছে।
যে লোকের মুখ দিয়ে ঘন্টায় হাজারটা নির্লজ্জ বাণী বের হয় সে – নাকি বলে লজ্জাশীল। হে বিধাতা এমন কথা শুনার আগে আমার মৃত্যু হলো না কেনো?
অধিরাজকে বিরবির করতে দেখে তানভী কপাল কুচকে বলে,
” কি বিরবির করছো?
” তোমার নিষ্পাপ স্যারের অতীত ঘাটাঘাটি করছি। যদি অতীতটা বলতে পারতাম তাহলে মুখোশটা ও উন্মোচন করতে পারতাম। আমি যে তাদের থেকে কত শুদ্ধ তাহলে অন্তত বুঝতে।
তানভী অবাক চোখে তাকিয়ে বলে,
” মুখোশ মানে!
অধিরাজ থতমত খেয়ে বলে,
” এইসব কথা বাদ দাও। বসকে টানছো কেনো আমাদের মধ্যে? চলো ভিতরে যায়।
তানভী অস্থির গলায় বলে,
” কিন্তু রাজ তুমি কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলে। কিসের মুখোশ?
অধিরাজ কথাটা এড়িয়ে যায়। উত্তর করলো না তানভী কে। তানভী তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,
” শুনো।
” বলো জান।
” মেহের মিনারে যেতে চাচ্ছে।
অধিরাজ চমকে উঠে,
” হুয়াট! কিন্তু কেনো? ও মিনারে গিয়ে কি করবে এখন?
তানভী ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” একজন মেয়েকে নাকি সে স্যারের রুমে দেখেছে। তার সাথেই দেখা করতে যাচ্ছে।
অধিরাজ অবাক হলো না তেমন। মেহের যখন মিনারে গিয়েছিলো তখন সমস্ত কিছুই সে, নিক, আরিশ সিসি টিভি ফুটেজে দেখেছে। তাদের মধ্যে কি কথা হয়েছে সবই জানা। অধিরাজ শান্ত গলায় বলে,
” ওকে বলে দিও, মেয়েটা চলে গিয়েছে।
” কে ছিলো মেয়েটা?
অধিরাজ স্বাভাবিক গলায় বলে,
” ছিলো একজন।
” সেটা আমিও জানি। কিন্তু নিক স্যারের রুমে ছিলো এইটা শুনে আশ্চর্য হয়েছি। উনার রুমে তো কারোর যাওয়ার অনুমতি নেই। সেখানে একজন মেয়ে ছিলো! উনি তো মেয়েদের ছায়া ও সহ্য করতে পারে না। তাহলে?
” কাজ, যুদ্ধ বিশেষ করে ক্ষমতা ধরে রাখতে গেলে জীবনে অনেক কিছুই করতে হয় তানভী। আজ যে জিনিসটাকে মানুষ তীব্রভাবে ঘৃনা করে সেটা পরবর্তীতে এক তীব্র আসক্তি ও হতে পারে।
” কি বলতে চাইছো? নিক স্যার এখন আর মেয়েদের ঘৃনা করেন না?
“এর উত্তর বস দিতে পারবে। তবে আপাযত মেহেরকে জানিয়ে দাও সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।।
” কিন্তু রাজ ও আমাকে বার বার মিনতি করছিলো, যাতে তুমি রাজি হও।
অধিরাজ ঘন নিশ্বাস নিয়ে বলে,
” তানভী , মেহের ওখানে গেলে অনেক কিছু ঘটে যাবে। ওর মাথার অপারেশনটা আগে হয়ে যাক এরপর অনেক কিছুর সম্মুখীন হবে সে।বর্তমানে আমরা কেউ চাই না মেহের মিনারে পা রাখুক। ওর জন্য সেটা ভালো হবে না।
তানভী অবাক হয়ে বলে,
” তোমার সব কথা কেমন ধোঁয়াশা। কোনো বাক্যের সঠিক অর্থ বুঝতে পারছি না। কিসের সত্য?
অধিরাজ তানভীর হাতটা ধরে বলে,
” তোমাকে বলার অনুমতি আমার কাছে নেই। সময় হলে তুমি ও জানতে পারবে। সময়ের অপেক্ষা করো।
তানভী মুচকি হেসে বলে,
” অপেক্ষায় থাকব। তবে আশা রাখব খারাপ কিছু নয়।
অধিরাজ ক্রমে আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে। এই অনাবৃত সত্যটি তিনটি জীবনের গতিপথ আমূল পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এ উপলব্ধি তাকে অস্থির করে তোলে মুহূর্তেই । মেহের যদি জানতে পারে নিক ইতিমধ্যেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছে তাহলে পরিণাম কী হবে? কোন সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকবে ? মেহের আর আরিশ দু’জনেরই জীবন তখন অনিশ্চয়তার আবর্তে পড়ে যাবে। মেহের যদি ভুলেও কোনো অমঙ্গল ডেকে আনে, তবে আরিশের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাবে। যে ভাই বোনের গায়ে মাছিও বসতে দেয় না, সে কীভাবে চোখের সামনে বোনের ভাঙন প্রত্যক্ষ করবে? আর এই বন্ধুত্বের বুকে যদি সামান্য ফাটলও ধরে।তার অভিঘাতই বা কত গভীর হবে? এসব ভাবনায় অধিরাজের অন্তর দোলাচলে ভেঙে পড়ে আরও ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
ইতালির রোম নগরীর এক অচেনা প্রান্তে ইতিহাসের স্তব্ধ ইট-পাথরের আড়ালে গোপনে সক্রিয় এক মাফিয়া কেন্দ্রে আজ এক অশুভ বৈঠকের আয়োজন হয়েছে। আবছা আলোয় মোড়া সেই গোপন কক্ষে ধোঁয়ায় ভারী বাতাস আর নিঃশব্দ আতঙ্কের মাঝে সমবেত হয়েছে সাতাশ জন মাফিয়া। প্রত্যেকেই অপরাধজগতের এক একটি অন্ধকার অধ্যায়। তাদের দৃষ্টিতে রয়েছে শীতল হিসাব আর কণ্ঠে নীরব হুমকি বিদ্যামান। তাদের প্রতিটা উপস্থিতিতে জমে ওঠে ক্ষমতার দম্ভ। বাইরে রোমের সভ্যতা নিশ্চিন্তে নিঃশ্বাস নিলেও ভেতরে ভেতরে রচিত হচ্ছে ষড়যন্ত্রের নকশা যার প্রতিটি অংশ অন্ধকার জগতকে ঘিরে।
আরিশ উড়ুর উপর হাত ঠেকিয়ে গম্ভীর হয়ে বসে। আড়চোখ শিকারীর দৃষ্টিতে সামনে থাকা ছয় জন মাফিয়ার দিকে তাকায়। তাদের সবার দৃষ্টি এতক্ষণ আরিশের দিকেই ছিলো। সবার মুখে হিংস্রতা থাকলেও কোথাও যেন এক প্রকার ভয়। কাঠের তৈরিকৃত চেয়ারে গোল হয়ে বসে আছে সবাই। সামনেই আছে একজন অর্ধ বয়স্ক সিনিয়র মাফিয়া। তার কাছেই সব দলিল পত্র। আরিশ গম্ভীর হয়ে এক হাতের সাহায্যে নিককে কিছু একটা মেসেজ করে। বাঁকা হেসে পুনরায় হেলান দিয়ে বসে।
সবার উপস্থিতিতে ঘুপচি ঘরটার বাতাস পর্যন্ত ভারী হয়ে আছে।আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে সাতাশটা ছায়া বসে আছে । প্রত্যেকের চোখে আলাদা আগুন, কিন্তু লক্ষ্য একটাই। আরিশ চেয়ারে হেলান দিয়ে ঠোঁটে আধখানা সিগারেট চেপে ধরে।
একজন মাফিয়া দাঁত চেপে বলে ওঠে,
” পুরাতন অস্ত্র মানেই আবর্জনা না। ইতিহাসের রক্ত লেগে আছে ওগুলোর গায়ে। পুরো দাম দিব আপনাকে লর্ড। তার পরও এই দলিল আমার চাই।
আরেকজন তেড়ে ওঠে,
“ইতিহাস দিয়ে পেট ভরে না! দাম কম হলে এক রাউন্ডও চলবে না। আমি নিব সব। আমি বাদে মনে হয় না কেউ আর এই অস্ত্রগুলোর উপযোগ্য।
একজন তরুণ মাফিয়া টেবিলে ঘুষি মেরে গর্জে উঠে,
“ঢিল হবে এখানেই। আজ যার দম আছে, সে-ই টিকে থাকবে।
তার কথায় হাসি ফোটে কয়েকজনের মুখে।হাসিটা মানুষের না যেন হিংস্রপ্রাণীর। আরিশ ঠোঁট কামড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
দলিল নিয়ে বসে থাকা অর্ধবয়স্ক লোকটার দিকে এগিয়ে যায়। অধরে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে হিসহিসিয়ে বলে,
” চেক ইওর ফোন, বস। এ মেসেজ হ্যাজ কাম ফ্রম দ্য গ্যাংস্টার বস।
অর্ধ বয়স্ক মাফিয়াটা ক্ষুন্ন চোখে তাকিয়ে মুহূর্তেই মোবাইল অন করে। সাথে সাথে ভেসে উঠে কয়েকটা লাইন,
” এই পুরাতন অস্ত্র আমাদের হাতে যদি তুলে না দিন তবে নিজের সর্বস্ব হারাবেন। ভুলে ও যদি একটা অস্ত্র অন্যের নামে লিখিত হয় তাহলে অনেক কিছুর সম্মুখীন হবেন। এমন ও হতে পারে প্যালেস থেকে বের হওয়ার পর ব্যাংক একাউন্ট শূন্য দেখতে পাবেন। আর গ্যাংস্টার বস কাজ হাতে নিয়ে হুংকার দেয় না সেটা খুব ভালো করেই জানেন।
লোকটা ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে। আরিশ এতক্ষণে নিজের চেয়ারে এসে বসে পড়ে। অর্ধ বয়স্ক ব্যক্তিটা কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে থাকে। লোকটার অস্বাভাবিক আচরন দেখে সবাই কপাল কুচকে ফেলে। একজন পিঠ সোজা করে বলে,
” মি, লর্ড আর ইউ ওকে?
লর্ড পাশে থাকা গ্লাস থেকে পানি পান করে গলা ভিজিয়ে নেয়। আরিশের দিকে এক পলক তাকিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলে,
” আমি অস্ত্র বিক্রি করব না।
মি, লর্ডের একটা বাক্যে সবাই বাজ পাখির মত ক্ষেপে যায়।
” কিন্তু আপনি বিগত এক বছর ধরে বলে যাচ্ছেন এইগুলো বিক্রি করবেন। তাই আজকের দিনটা বেছে নিয়েছেন। যদি বিক্রি না করেন তাহলে এক বছর ধরে হয়রানি কেনো করছেন।
মি, লর্ড শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলে,
” আমি বলেছি আর আপনারা লাফিয়েছেন। এতে আমার কোনো অপরাধ নেই। এখন আসতে পারেন। যদি কোনোদিন বিক্রি করি তাহলে জানাব।
একজন হুংকার ছেড়ে বলে,
” হুট করে পাল্টি খাওয়ার মানে কি? কিন্তু আমার এইগুলো চাই। এইগুলো সব পুরনো জিনিস। যার মূল্য কল্পনার ও বাহিরে। আপনাকে তো আমায় দিতেই হবে।
মি, লর্ড রক্তাক্ত চোখে তাকিয়ে বলে,
” গলার আওয়াজ যদি উপরে উঠে তাহলে রক্তাক্ত দেহ নিয়ে বাড়িতে ফিরবেন। আমার ক্ষমতা নিয়ে ধারনা আছে নিশ্চই। আপাযত বিদায় হন সবাই।
অপমানে সবাই এক এক করে বের হয়ে যেতে থাকে। একজন চিবিয়ে চিবিয়ে হুশিয়ারি দিয়ে বলে,
” এর হিসেবে তুলা রইলো। এইভাবে হেনস্তা আর অপমান করার হিসেব আমি তুলব।
লর্ড তাকালো না। পুরো রুম খালি হয়ে যায়। বাকি থাকে আরিশ আর মি, লর্ড।
মি, লর্ড আরিশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” তুমি কে?
আরিশ সভ্যতা বজায় রেখে বলে,
” আফ্রিকা সম্রাজ্যের ক্রিমিনাল লিডার আরিশ। গ্যাংস্টার বসের ডান হাত, ভাই, বন্ধু। কোন পরিচয়ে পরিচিত হতে চান?
মি, লর্ড গম্ভীর গলায় বলে,
” আমি অস্ত্রগুলো বিক্রি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মি, নিক জেভরান আমার ব্যাংক একাউন্ট তদারকি করেছেন কেনো? আমি আমার ন্যায্য মুল্য চাই।
আরিশ শান্ত গলায় বলে,
” কত?
” পঞ্চাশ কোটি টাকা।
আরিশ ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে,
” একাউন্ট চেক করুন। টাকা ট্রান্সফার হয়ে গয়েছে।
লর্ড অবাক হয়ে বলে,
” দাম তো আমি মাত্র জানিয়েছি। এত দ্রুত ট্রান্সফার হলো কিভাবে?
আরিশ সিল্কি চুলগুলো পিছনে ঠেলে বলে,
” সেটা আপনার না জানলেও চলবে। আত্না হয়ত সৃষ্টিকর্তা আলাদা করে বানিয়েছে। কিন্তু ক্রিমিনাল লিডার আর গ্যাংস্টার বসের আত্না প্রযুক্তি এক করে রেখেছে।
দুই দিন কেটে যায়। এই মাত্র আরিশ আফ্রিকার মাটিতে পা রেখেছে। জেট থেকে নেমে’ ই গাড়ি নিয়ে সোজা গ্লাস মিনারে চলে যায়। ইতিমধ্যে নিক আর অধিরাজ সেখানে উপস্থিত ছিলো। আরিশ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে। চোখ দুইটা বন্ধ করে গম্ভীর নিশ্বাস ছাড়ে। ঘাড় সোজা করে ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে যাবে এমন সময় চোখ যায় নিকের দিকে। নিক তার দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সেইম অবস্থা অধিরাজের ও। আরিশ থমথমে খেয়ে বলে,
” এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? মাত্র চারদিন বাহিরে ছিলাম ভাই। এইভাবে তাকানোর কোনো রিজন নেই।
অধিরাজ ধপ করে বসে পড়ে পাশের চেয়ারে। অসহায় গলায় বলে,
” আপনি এইটা করতে পারলেন স্যার?
আরিশ কপাল কুচকে বলে,
” কি করেছি আমি?
অধিরাজ ওয়াইন গিলে সেকেন্ড বিরতি নিয়ে বলে,
” আপনার থেকে এইটা আশা করি নি। আরে ভাই যদি কিছু করার ইচ্ছেই ছিলো তাহলে পদক্ষেপ নিতে পারতেন। প্রযুক্তি অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে।
আরিশ অবাক হয়ে যায়। চোয়াল শক্ত করে ধমকে উঠে,
” শালা ত্যারা কথা না বলে সোজা করে বল। তর বালমার্কা কথা আমার মস্তিষ্কে ডুকছে না।
” মধু খাওয়ার পর সবাই বলে আমি মধু খায় নি।
” আশ্চর্য মধু আসছে কোথা থেকে?
নিক রক্তাক্ত চোখে তাকিয়ে বলে,
” নাজলী প্রেগন্যান্ট হয়েছে কেনো.? তর কাছে কি প্রেগন্যান্ট বানিয়ে দেওয়ার জন্য দিয়েছিলাম রাস্কেল ?
নিকের কথা কানে যেতেই আরিশ চোখ বড় বড় করে ফেলে। এতক্ষণে মাথায় ডুকে সব কথা। এই দুইদিন কাজের চাপে বিষয়টা ভুলে গিয়েছিলো। এই কথা এদের কান অব্দি পৌছালো কিভাবে?
আরিশ গলা কেঁশে বলে,
” তরা জানলি কিভাবে?
নিক ক্ষেঁপে উঠে,
” ট্রাস্ট মি আরিশ ইচ্ছে করছে থাপরিয়ে কান বন্ধ করে দিতে। জানলাম কিভাবে এই প্রশ্ন করছিস কোন সাহসে? তুই আগে বল নিজের জিনিস অন্যের কাছে ট্রান্সফার করেছিস কেনো? তকে কি ট্রান্সফার করার কাজে দিয়েছিলাম, রাবিশ!
আরিশ ভোঁতা মুখে বলে,
” ভাই গজব মার্কা মিথ্যে কথা এইটা। এই মেয়ে নাটক করছে এইসব। আমি যায় নি ওর কাছে।
নিক দাঁত পিষে বলে,
” কাছে না গেলে বাচ্চা এসেছে কোথা থেকে?
অধিরাজ কাঁশি দিয়ে বলে,
” যেতে তো মানা করে নি। তাই বলে ট্রান্সফার করে দিবেন? প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারতেন।
আরিশ চোয়াল শক্ত করে বলে,
” ফা**ক অফ অধিরাজ! প্রথমত আমি এমন কিছুই করি নি। যদি করে ও থাকি তবে মিথ্যে বলার প্রয়োজন নেই আমার। যেখানে কিছু করিনি সেখানে এই মেয়ে প্রেগন্যান্ট হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।
অধিরাজ অবাক হয়ে বলে,
” কিন্ত হয়ে গিয়েছে স্যার।
আরিশ শক্ত গলায় বলে,
” আমার সন্তান নয় সে।
নিক কর্কশ মেজাজে বলে,
” তুই ছাড়া কেউ যায় নি রুমে। সিসি ক্যামেরা তো প্রতিদিন এই চেক করিস। দেখেছিস কাউকে যেতে?
আরিশ নিচু গলায় বলে,
” নাহহহ।
” তাহলে?
আরিশ গম্ভীর শ্বাস ফেলে বলে,
” এই মেয়ে নাটক করছে। ট্রাস্ট না করলে ড. দেখা। আমার বিশ্বাস ও প্র্যাগনেন্ট নয়। আমাকে ফাঁসাচ্ছে।এই মেয়ে পুরোটাই এটম বোমা। কলিজাটা যেন হাতে নিয়ে ঘুরে। সামান্য ভয় অব্দি পায় না আমাকে।
নিক কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,
” কারন জানে তুই ওকে প্রানে মারবি না।
আরিশ দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে,
” ও যদি এনির বোন না হত তবে এতদিনে মেরেই ফেলতাম। তর বাঁধাও মানতাম না। জ্বালিয়ে মারছে আমাকে। দ্রুত বিদায় কর আমার থেকে। আর সহ্য করতে পারছি না।
নিক শান্ত গলায় বলে,
” এই মাসের ভেতরেই ইরানে পাঠিয়ে দিব। রাতে পাঠাতে হবে। যাতে ইগর আর কায়াতের কানে না যায়। আর সেখানে গার্ড রাখতে হবে। নাহলে আ্যটাক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
আরিশ থমথমে গলায় বলে,
” পাঠানোর দরকার নেই তাহলে এখন।
অধিরাজ আহাম্মকের মত তাকায়। নিক কপাল কুচকে দেলে,
” তুই তো এই মাত্র বললি যাতে পাঠিয়ে দেয়।
আরিশ চেয়ারে হেলান দিয়ে বলে,
” ইরানে পাঠালে ওর জীবন রিস্কে থাকবে নিক । ওরা আ্যটাক করতে পারে।
নিক গভীর চোখে তাকিয়ে বলে,
” তাতে তর সমস্যা কোথায়? মরে যাক অথবা বেঁচে থাকুক তুই অস্থির হচ্ছিস কেনো এইভাবে? এতদিন বিপদ সম্মুখে ছিলো তাই বাঁচিয়েছিলাম। সে এনির বোন। যদি নাজলীর কিছু হয়ে যেত তবে এনি আমাকে দোষ দিত। সে দোষ থেকে মুক্তি পেতে বাঁচিয়েছি। কারন শত্রুরা আমার ছিলো। আমার সাথে শত্রুতা করে, আমাকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য নাজলীকে মারার নকশা বানিয়েছে। হয়ত সেদিন তুই বাগান বাড়িতে নিয়ে না গেলে সেই রাতেই মেরে ফেলত। তারা নাজলীর জায়গায় অন্য একজন মেয়েকে মেরেছে। এখন তো নাজলী মুটামুটি বিপদমুক্ত। সবাই জানে নাজলী বেঁচে নেই। ইরান পাঠিয়ে দিব। আ্যটাক হলেও এখন গার্ডরা সামলে নিবে।
আরিশ হাঁশ-ফাঁশ করে উঠে,
” সম্পূর্ন বিপদ মুক্ত হোক এরপর পাঠিয়ে দিব। এখন আপাযত থাক।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে,
” যার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমার কানের কাছে সারাক্ষন ভঁন ভঁন করেছিস তাকে বাঁচাচ্ছিস? কাউকে তো এই পর্যন্ত বাঁচাতে দেখি নি। আমার স্বর্থে বাঁচিয়েছি আমি। তুই কিসের স্বার্থে বাঁচাতে চাইছিস? ভালোবেসে ফেলেছিস নাকি? সত্যি নিজের বউ ভেবে নিয়েছিস!
আরিশ অস্থির হয়ে শার্টের বোতামগুলো দুইটা খুলে ফেলে। নিকের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
” এমন কিছুই নয়। আরিশ ইলহাম কারোর প্রেমে কোনোদিন পরে নি, আজও পড়বে না। কোনোদিন কাউকে বাঁচায় নি আজও বাঁচাব না। চাইলে কালকেই পাঠিয়ে দিস। আই ডোন্ট কেয়ার। অন্তত এইসব ভেজাল থেকে মুক্তি পাব।
থেমে…..
” আপাযত ফ্রেশ হতে হব। ফ্রেশ হয়ে আসছি আমি।
নিক সামান্য হাসলো। তবে সেটা অধরে দৃশ্যমান হয় নি। অধিরাজ দাঁড়িয়ে বলে,
” স্যার খোলাসা করলেন না। নাজলী ম্যাম সত্যি প্র্যাগনেন্ট নন?
আরিশ শক্ত গলায় বলে,
” আরে বাল না। আর যদি হয়ে থাকে তাহলে এই সন্তান আমার না। নিজের উপর আমার নিয়ন্ত্রন আছে। খুনি হতে পারি কিন্তু রে**পিস্ট নয়।
অধিরাজ খুশি হয়ে বলে,
” তাহলে নাটক এই করেছে।
আরিশ দাঁত পিষে বলে,
” এর নাটক আমি বের করছি। সব গুলো কথার জবাব দিব। যাচ্ছি আমি।
” কোথায় যাচ্ছেন স্যার ? প্র্যাগনেন্ট বানাতে?
আরিশ রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বলে,
” ইউরিন বিসর্জন দিব, আর শরীর ঘষামাঝা করব। যাবি আমার সাথে? আয় যায় তাহলে। একসাথে গল্প করতে করতে মুত্র বিসর্জন দেওয়া ও হয়ে যাবে। তর প্যান্টের চেইনটা আমি খুলে দিয়ে সাহায্য করব, চিন্তা করিস না। কষ্ট কম হবে তর।
অধিরাজ থমথমে মুখে তাকায়। কি সাঙ্ঘাতিক কথাবার্তা। এদের থেকে নাকি তানভী লজ্জার কোর্স করতে বলেছে। আশ্চর্য!
আরিশ আর এক মুহূর্তের জন্য ও দাড়ালো না। রাগে শরীর কাঁপছে তার। এই মিথ্যাবাদী মেয়ের জন্য কতগুলো হেনস্তার স্বীকার হতে হয়েছে। সব কথার জবাব চাই তার। প্র্যাগনেন্ট হওয়ার অভিনয় করেছে তাই -তো? এখন এই অভিনয়টাকে’ই সে সত্যি করবে। বিয়াদব মেয়ে!
রাত বারোটার কাছা-কাছি। এনি কিছুক্ষন আগে মাত্র শাওয়ার নিয়েছে। শরীর কেমন ছমছম করছিলো। তাই কোনো কিছু না ভেবেই শাওয়ার নিয়ে নেয়। দশ মিনিট ধরে চুল গুলো ছেড়ে বসে আছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষন করেছে অনেকক্ষন পর্যন্ত। শরীরের ক্ষত গুলো এত দ্রুত নিভে যাচ্ছে কিভাবে? আগের মত ঝলঝল করছে না। পেট উন্মুক্ত করে পর্যবেক্ষণ করে। সিগারেটের পোড়া দাগ, চাবুকের আঘাত সব মুছে গিয়েছে। হালকা দৃশ্যমান। তবে মনে হচ্ছে কিছুদিন গেলে সেগুলোও মুছে যাবে। এত দ্রুত বিনা মেডিসিনে দাগ কিভাবে মুছে যাচ্ছে এইটাই এনির মাথায় ডুকছে না। মলম লাগিয়ে দেওয়ার মানুষ তো গ্যাংস্টার বস নন। আর যদি দিয়ে ও থাকে তবে সেটা আমি দেখতে পেতাম। কিন্তু একদিনও দেখি নি। এনি কথাগুলো ভেবে বিছানায় বসে। এমন সময় গ্যাংস্টার বসের আগমন ঘটে। নিক এনির দিকে তাকায় নি। হাতের ঘড়ি, ব্রেসলেট খুলে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। এনি আড়চোখে তাকায় নিকের দিকে। নিকের রক্তাক্ত হাত এনির চোখ এড়িয়ে যায় না। এই রক্ত জিনিসটাকে সে প্রচুর ভয় পায়। কিন্তু ভাগ্য তাকে রক্তের সাগরে এনে ফেলে দিয়েছে। অদ্ভুতভাবে সে সাঁতার জানে না। তাই তো কিনারা খোঁজে পাচ্ছে না।
একদম চল্লিশ মিনিট পর নিক ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে। গায়ে কালো টি-শার্ট, কালো প্যান্ট। সাদা টাওয়াল দিয়ে চুলগুলো মুছতে মুছতে এনির দিকে এগিয়ে আসে। এনির ভেজা চুল দেখে কপাল কুচকে বলে,
” তুমি শাওয়ার নিয়েছো কেনো?
এনি কাটকাট গলায় বলে,
” ইচ্ছে হয়েছে তাই।
” আমিও শাওয়ার নিলাম তুমিও নিলে। অথচ একসাথে শাওয়ার নেওয়ার মত কিছুই হয় নি। তাহলে শাওয়ার নিলাম কিসের জন্য?
এনি রাগ দেখিয়ে বলে,
” একদম অসভ্য কথা বলবেন না। শরীর হাঁশ-ফাঁশ করছিলো তাই নিয়েছি। আপনার মত রক্ত মুছার জন্য নেয় নি।
নিক ঠোঁট চেপে ধরে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে যায়। এনি গলা পরিষ্কার করে বলে,
” মেহেরকে ঠকিয়েছেন কেনো?
নিল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। এনির চোখ চোখ রেখে বলে,
” ইচ্ছে হয়েছে তাই।
” মেয়েটা আপনাকে প্রচুর ভালোবাসে।
” তো?
” আপনার উচিত এমন ভালোবাসা গ্রহন করা। আপনি চাইলে ওকে বিয়ে করতে পারেন। আমি কিছু বলব না।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে শক্তভাবে। কাবার্ড থেকে বের করা রিভলভারটা নিয়ে এনির দিকে এগিয়ে যায়। রিভলভার দেখে এনি শুকনো ঢোক গিলে। নিক রিভলভারটা এনির থুতনিতে শক্তভাবে ঠেকিয়ে বলে,
” আবার বল শুনছি।
এনি ভয়ে ঠোঁট ভেজায়। কাঁপা গলায় বলে,
” মেহের আপনাকে প্রচন্ড ভালোবাসে।
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” ভালোবেসেছে এখন আমি কি করব?
” আপনার উচিত পূর্নতা দেওয়া।
” তার জন্য কি করতে হবে?
” ব… বিয়ে করে নিন।
এনির কথা শেষ হতেই নিক চোয়াল শক্ত করে গর্জন করে উঠে,
” তাহলে তকে কি করেছি?
এনি চোখ-খিঁচে ফেলে। নিক রিভলভারটা গলার নিচে চেপে ধরে। এক হাত দিয়ে এনির কোমর ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। প্রগাঢ় ক্ষুব্দতায় এনির কানের কাছে ঠোঁট নাড়িয়ে বলে,
” এই জবান দিয়ে যদি অন্যকে বিয়ে করার কথা বের করো ব্লাড রোজ তাহকে ঠোঁট দুইটা কেটে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসব।
থেমে। নিজেকে শান্ত করে বলে,
” মেহের আমাকে ভালোবাসে। আই ডোন্ট কেয়ার। মেহেরকে নিজের বোন ছাড়া কিছুই ভাবি নি।
এনি শক্ত গলায় বলে,
” যে ভালোবাসে তাকে আগলে রাখছেন না। আর যে ঘৃনা করে তাকে বউ বানিয়েছেন। তাও ক্ষমতা দিয়ে।
নিক অদ্ভুত ভাবে হেসে বলে,
” আসক্তি মারাত্নক জিনিস বেবিগার্ল। ড্রাগস ও আমাকে ততটা কন্ট্রলল্যাস করতে পারে না, যতটা কন্ট্রোলল্যাস তোমার উপস্থিতিতে হয়। সারাক্ষণ মুডে থাকি আমি।
এনি শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“কিসের মুড?
“বাসরের।
এনি নাক-মুখ খিঁচে ফেলে।
” ভালোবাসেন আমাকে?
নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে এনির দিকে ঝুঁকে বলে,
” বুঝলে ব্লাড রোজ, বউকে ভালোবাসতে নেই। ভালোবাসলেই গর্ভবতী। তুমি যদি হতে চাও তাহলে আমি সেকেন্ড বিরতি না দিয়ে হাজার বার ভালোবাসতে রাজি।
এনি ছটফটিয়ে উঠে। ভয়ের মধ্যে থেকেও লজ্জায় হাঁশ-ফাঁশ করে উঠে রমনী।
” ভালোবাসার অর্থ এইটা নয় গ্যাংস্টার বস। ভালোবাসা মানে দুইজনের মনের মল। অস্তিত্বের মিল। এমন এক জিনিস যেটা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। আত্নার মিল এই জিনিসটা। অনুভব করা যায় কিন্তু প্রকাশ করা যায় না প্রেমিক পুরুষ নিজের প্রমিকাকে আগলে রাখবে। ভালোবাসবে। সর্বপ্রথম তার কথাকে প্রাধান্য দিবে।
নিক কপাল কুচকে বলে,
” কথা প্রাধান্য দেয় কিভাবে?
এনি হাসি দিয়ে বলে,
” আমি যা বলব তাই শুনবেন। আমাকে গুরুত্ব দিবেন।অবহেলা করা যাবে না।
নিক এনির দিকে ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে,
” সবই করব যদি রাতটা আমার নামে হয়। পুরো রাত আমার নামে উৎস্বর্গ করতে হবে বেবিগার্ল।
এনির অন্তর আত্না কেঁপে উঠার উপক্রম। বিছানার অন্য পাশে গিয়ে অধৈর্য হয়ে বলে,
” মাফ চাই আমি। আমার কথার গুরুত্বের প্রয়োজন নেই। দুনিয়ার সব অবহেলা আমাকে করেন। তবুও কিছু বলব না।
এনিকে এমন অধৈর্য হতে দেখে নিক কপাল ভাঁজ ফেলে তাকায়। গম্ভীর হয়ে বলে,
” প্রয়োজন যখন হবে তখন নিজেই আদায় করে নিব তখন। ধরলাম না, ছুঁলাম না, কাছে গেলাম না এইভাবে ছটফট করছো কেনো?
নিকের কথা শেষ হতেই এনি থম মেরে বসে যায়। কিসব নির্লজ্জ কথাবার্তা। বিরবির করে বলে,
” বদ্ধ রুমে বন্ধী রেখেছেন কি, এইসব শুনানোর জন্য।
” উহুম স্বামীর সোহাগ পাইয়ে দেওয়ার জন্য।
এনি শান্ত চোখে তাকিয়ে বলে,
” হুট করে আমাকে বউ মনে করার কারন। আগে তো রক্ষিতা বলতেন।
নিক গম্ভীর হয়ে উঠে,
” অতীত ঘাটবে না।
” বর্তমান এতটাও সুন্দর নয় যে অতীত ভুলে যাব।পুরো দেশে রক্ষিতার পরিচয় দিয়ে বদ্ধ রুমে বউ বউ করেন কেনো?
নিক নিশ্বাস নিয়ে বলে,
” অতীত টানবে না। প্রয়োজন ছাড়া গ্যাংস্টার বস কাজ করে না। এই নিয়ে কথা তুলবে না। কারোর প্রশ্নের কৈফিয়ত দেয় না আমি। তাছাড়া বিয়ে করা বউকে বউ ছাড়া আর কি ডাকব।
এনি অন্যদিকে তাকিয়ে বলে,
” জোর করে বিয়ে করেছেন। এই বিয়ে শুদ্ধ নয়। বউ হলাম কিভাবে?
” আস্তাগফিরুল্লাহ! তিন -চার বার বাসর করেছি আর এতদিনে বিয়ে করা বউ বলছে বিয়ে শুদ্ধ নয়।
নিকের মুখের রঙ পাল্টাতে থাকে। এগিয়ে যায় এনির দিকে। এনির থুতনিটা ধরে উঁচু করে নিজেও ঝুঁকে যায়। পুরো মুখে তাকিয়ে বলে,
” তোমার পুরো শরীরে সতেরোটা তিল স্বাক্ষী ব্লাড রোজ গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান তোমার স্বামী। তারা গ্যাংস্টার বসের ঠোঁটের স্পর্শ পেয়েছে। তারা বুঝে কোনটা হালাল স্পর্শ আর কোনটা হারাম।
নির্লজ্জ বলবে না। কারন তোমাকে কিছু বলি নি। তিল গুলোকে বলেছি।
এনি দাঁত পিষে বলে,
” নির্লজ্জ, চিতাবাঘ।
নিক অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে বলে,
” ভদ্র চিতাবাঘ বেবিগার্ল। শিকার চারপাশ ঘুরঘুর করে অথচ বাঘ শান্ত হয়ে বসে আছে।
এনি থমথমে মুখে তাকায় নিকের দিকে। লোকটা অদ্ভুত সুন্দর। নিচের ঠোঁটের মাঝামাঝি স্থানে একটা ছোট্ট তিল। যেটা তাকে চুম্বকের মত টানে। ইচ্ছে করে সামান্য হাত ছুঁয়ে দিতে। শান্ত গলায় বলে,
” ভদ্র ভাবেই থাকুন।
” ভদ্রভাবে থাকলে আমার বাচ্চা আর দুনিয়ার আলো দেখতে হবে না।
এনি ছোট ছোট চোখে বলে,
” মানেহহ?
” বাবা হতে চাই আমি ব্লাড রোজ। সন্তান চাই আমার।
এনির চোখ দুইটা পানিতে টুইটুম্বুর করে উঠে। ঠোঁট ভিজিয়ে কাঁপা গলায় বলে,
” আমি আপনার সন্তান চাই না। রাখতে চাই না আমার গর্ভে।
নিক গম্ভীর গলায় বলে,
” তোমার উত্তর চাই নি আমি।
এনি ভাঙ্গা গলায় বলে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৩৮
” এমন করবেন না প্লিজ । যদি বাবা হয়েও যান তাহলে পরিচয় কি দিবেন সন্তানের সামনে। বাচ্চা বড় হলে জানবে বাবা একজন ক্রিমিনাল, খুনী। যার নিজের জীবনের নিশ্চয়তা নেই সে নিজের বাচ্চার জীবনের নিশ্চয়তা কিভাবে দিবে।এই নরকে আমি আমার সন্তান বড় করব না। আমাকে যেভাবে চার দেয়ালে বন্ধী রেখেছেন তাকেও সেইমভাবে বন্ধী রাখবেন? সন্তান জন্ম দিয়ে, আপনার শত্রুদের কারনে নিজের সন্তানকে হারাতে পারব না। তার থেকে বরং নিশ্বন্তান থাকা ভালো। কোনো পিছুটান থাকবে না আমার। আমি বাচ্চা চাই না নিক জেভরান। এই অন্ধকার দুনিয়ার সাথে আমি আমার সন্তানকে সাক্ষ্যাত করাতে চায় না।
