Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৪

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৪

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৪
লিজা মনি

নিক রুমে প্রবেশ করে। চোখ খুঁজে চলছে ব্যক্তিগত নারীকে। দেখতে পায় একদম গুটিশুটি মেরে বিছানার এক পাশে শুয়ে আছে। নিক অনেকক্ষন তাকিয়ে দেখলো অভিমানী রমণীটাকে। এনির মুখে ভালোবাসি শব্দটা শুনে তার ভেতরে কেমন তান্ডব চলেছে সেটা একমাত্র নিজেই বলতে পারবে।
নিক এনির ছোট্ট শরীরটা নরম বালিশের উপর রেখে উদ্ভীগ্ন গলায় বলে,
” এইভাবে বাঁকা হয়ে কেনো ঘুমিয়েছো ব্লাডরোজ। দেখি, সোজা হয়ে ঘুমাও। নয়ত শরীর ব্যাথা করবে।
এনির কোনো নড়াচড়া নেই। নিক সোজা করে দিলেও সেই আগের মতই বেঁকে যায়। নিকের ভ্রুঁ দুইটা কুচকে আসে। এনির মুখের দিকে গভীর দৃষ্টি রাখে। চোখের পাতা ভিজে আছে, নড়ছে হালকা – পাতলা। জামার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর শ্বাস ফেলে। মেয়েটা আজ সারাদিনে শাওয়ার ও নেই নি। যেমন কাপড় পড়া অবস্থায় রেখে গিয়েছিলো ঠিক তেমন এই আছে। নিক ব্লেজার খুলতে খুলতে এনির উদ্দেশ্যে বলে,

” আর কতবার বলব সোজা হয়ে শোয়ার জন্য?
এনি তবুও শুনলো না। নিক কিছুটা রাগ দেখিয়ে এনিকে আবার সোজা করতে যায়। এনি নিকের হাতটা ছিটকে দুরে সরিয়ে বলে,
” বালের কেয়ারের প্রয়োজন নেই। নিজের কাজ করুন গিয়ে।
নিকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। অনেকটা জোরে ধমক মেরে বলে,
” থাপ্পর মেরে কান বন্ধ করে দিব ফাজিল! এই পবিত্র মুখে যদি আর কোনোদিন গালি আসে ঠোঁট দুইটা সেলাই করে দিব। এইভাবে মটকা মেরে শুয়ে আছো কেনো? সোজা হও, বেবির সমস্যা হবে নয়ত!
অজান্তেই বলে ফেলেছে নিক এই কথাটা। কথাটা বলে গ্যাংস্টার বস নিজেও বিচলিত হয়ে যায়।
নিকের কণ্ঠলব্ধ সেই অনতিস্ফুট বাক্যটি এই মুহূর্তে তপ্ত মরুর বুকে আকস্মিক বারিবর্ষণের ন্যায় ঝঙ্কৃত হলো। সুকঠিন কাঠিন্যের অন্তরালে লুক্কায়িত এই অতর্কিত ভাবোচ্ছ্বাস খোদ সেই দুর্ধর্ষ নেতার চিত্তেও এক প্রকার অভূতপূর্ব বিড়ম্বনার উদ্ভব ঘটিয়েছে। এতকাল যে গাম্ভীর্য ছিল তার অলঙ্ঘনীয় বর্ম, আজ এক মুহূর্তের অসতর্কতায় সেই সুসংবদ্ধ আবরণে এক সুগভীর ফাটল পরিলক্ষিত হলো।

কথাটা শুনে এনি চট করে চোখ খুলে। নিকের ধমক ভুলে যায়। ঠোঁটের কোণে খেলে যায় মৃদু মুচকি হাসি। এইতো ধীরে ধীরে হিংস্রতার প্রলেপ সরে গিয়ে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটছে। এই একটু একটু করে সৃষ্টি হওয়া ভালোবাসা একদিন বিশাল সমুদ্রে পরিনত হবে। এত ভালোবাসা সৃষ্টি হবে যে তার পরিমাপ কেউ করতে পারবে না। নিজের সন্তানকে কাছে টেনে নিবে, আর পাঁচজন বাবার মত কোলে নিয়ে আদর করবে, চুমু খাবে, ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাবে। এনি কথাগুলো ভেবে গভীর চিন্তায় ডুব দেয়। আচ্ছা উনি যদি কখনো বাচ্চা কোলে নেয় তবে কেমন দেখাবে? দৃশ্যটা পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর দৃশ্যকে হারা মানাবে। কিন্তু উনি বাচ্চা কোলে নিতে পারে তো? এনি কথা গুলো ভেবে নিজেই হেসে উঠে। তবে হাসিতে কোনো শব্দ ছিলো না। এই মুহূর্তে নিকের সাথে একটা ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে তার। আর এই যুদ্ধে সে এত সহজে সদয় হবে না। সে ভালোবাসা প্রকাশ করতেও জানে আবার সেটা নিমিষেই ধ্বংস করতেও জানে। এনি সামান্য নড়েচড়ে বলে,

” বাচ্চার সমস্যা হলে আপনার কি? আপনি তো নিজেই চাইছেন বাচ্চাটাকে সরিয়ে দিতে। ভাগ্যিস বাচ্চাটার শরীর বড় হয়ে গিয়েছে।
নিকের হাত থেমে যায়। চোখ – মুখে কঠিনভাবে শক্ত হয়ে আসে। নিকের প্রশস্ত কপাল কুঁচকে একাকার হয়ে যায় । চোখের মণি দুটো স্থির ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠে। এই কথার ভার সহ্য হলো না গ্যাংস্টার বসের। কেনো হলো না জানা নেই। শুধু মনে হচ্ছে সামনের মেয়েটাকে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিতে পারলে শান্তি পেত। রমণীকে শান্তনা না দিয়ে কঠিন বাক্য ছুঁড়ে দেয়,
” বাচ্চার কিছু হলে আমার সমস্যা নেই। কিন্তু তোমার কিছু হলে আমার অনেক সমস্যা।
গভীর আর কর্কশ কন্ঠস্বর। এনির বুক ভেঙ্গে কান্না আসছে। এতটা পাষাণ কেনো এই লোক?

এনির মনে হুট করে আগমন ঘটে অন্য চিন্তা। কোনোভাবে কি লোকটা অন্যকারনে বাচ্চাটাকে মেনে নিচ্ছে না! গ্যাংস্টার বস তাকে নিয়ে সব কিছুর সাথে জেলাসি করে। চন্দ্র, সূর্য, জড়- জীব সব কিছুর সাথে জেলাসি। প্রথমে এইগুলো এনির কাছে ছিলো মানসিক যন্ত্রনা। বের হয়ে আসার জন্য ছটফট করেছে দিন রাত। এরপর, এরপর লোকটা যখন অনেক মাসের জন্য হারিয়ে গেলো। তখন অনুভব করলো এই জেলাসিগুলো ছাড়া সে অসহায়। প্রয়োজনে এক বদ্ধ রুমে আজীবব কাটিয়ে দিবে। তবুও এই উন্মাদ পুরুষটাকে তার চাই। কত কেঁদেছে, কত নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। লোকটার স্মৃতি মনে করে একা একা কথা বলত। আর সবাই বলত তার মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। ডাক্তার বলেছে এইসব রোগীদের হুট করে মৃত্যু ঘটে। এই কথাটা তার ভেতর তুলপাড় করেছিলো সেদিন। সে বাঁচতে চেয়েছিলো অনেকদিন পর্যন্ত। যতদিন না পর্যন্ত নিক জেভরান তার সন্তানের অস্তিত্ব অনুভব করে। চোখ ভরে দেখতে চেয়েছিলো গ্যাংস্টার বসের উন্মাদনা। বাচ্চা আসবে শুনে হয়ত খুশিতে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাবে, আদর করবে, কাছে টেনে নিবে। কিন্তু ঘটনা পাল্টে গেলো। উনি বাচ্চা আসার খবর শুনলেন। অথচ উনার চোখে – মুখে অন্যরকম অস্থিরতা, জেলাসি! পুরো পৃথিবী এক দিকে থাকে আর সন্তান অন্যদিকে। তবে কিসের এত জেলাসি, রাগ, ক্ষোভ! শুধুই কি আমাকে হারানোর ভয় নাকি অন্যকিছু?

এনি কথাগুলো ভেবে অস্থির নিশ্বাস ফেলে। লোকটা এমন কিছু ভেবে থাকলে আজ এই মিনার ছেড়ে চলে যাবে সে। তার রাগ, হিংসা, অপরাধ, ছন্নছাড়া রুপটাকে গ্রহন করে সংসার করবে বলেছে কিন্তু অবিশ্বাস নিয়ে এক সেকেন্ড ও নয়। এনি নিজের মধ্যে সাহস সঞ্চয় করে প্রশটা জিজ্ঞাসা করার জন্য। মুহূর্তের মধ্যে চোখ বন্ধ করে বলে ফেলে,
” আপনি কি অবিশ্বাস করছেন আমাকে, সন্দেহ করছেন?
নিকের কপাল কুচকে আসে। এনির ভেজা নীল আখির দিকে তাকিয়ে বলে,
” মানে? কিসের অবিশ্বাস?
এনি পর পর শ্বাস টানে। কিছুটা শক্ত গলায় বলে,
” সন্দেহ হচ্ছে এই বাচ্চা আপনার নয়।
নিকের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে উঠে। ক্রোধে চোখ – মুখ ভিবৎস্য রুপ ধারন করে। চিবিয়ে চিবিয়ে হুশিয়ারি দেয়,
” লাগাম টানো মুখের। নয়ত খুব খারাপ হয়ে যাবে।
এনির চোখ ভিজে আসে। কথাগুলো আর মনের ভেতরে গোপন রাখে। ফাঁশ করে দেওয়ার জন্য উঠে- পড়ে লাগে।
” কিসের লাগাম টানব আমি? আপনার সন্দেহ টা মুখে বলে দিচ্ছি আমি।আপনি ভাবছেন আপনি তো ছিলেন না কাছে তবে বাচ্চাটা যে আপনার তার গ্যারান্টি কি? এমনও হতে পারে আপনার আগোচরে…..
এনি কথাগুলো বলে শেষ করতে পারলো না। নরম গালে শক্ত হাতের থাপ্পর পড়ে। এনি কিছুটা ছিটকে পড়ে যেতে নেয়। কিন্তু তার আগেই দুইটা শক্ত হাত তাকে ধরে গর্জে উঠে,

” মানুষ মনে হয় না আমাকে তর? পেটে আমার বাচ্চা নিয়ে ঘুরে অন্যের বলে চালিয়ে দিচ্ছিস। তর কি মনে হয় আমার ভেতরটা দয়ার সাগর? এই কথা অনুমান করলে তুই এতক্ষণ বেঁচে থাকতি? গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান যাকে সন্দেহ করে একবার তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়। প্রতারনা আমার সব থেকে বড় শত্রু। আরে শালী নিজের মাকেই তো বাঁচতে দেয় নি। সেখানে তো তুই নিজের কথা বলছিস। কি মনে হয় তর, আমার এমন মনে হলে বেঁচে থাকতি তুই? এই পবিত্র শরীরে ছোঁয়ার অধিকার একমাত্র আমার। আর আমার অধিকারের উপরে যদি কেউ আঙ্গুলের স্পর্শ ও লাগায় তবে তছনছ করে দিব সব কিছু। আর সেখানে তর পেটে বাচ্চা দেওয়া তো বিলাসিতা। এতটা জঘন্য চিন্তা ভাবনা আসলো কিভাবে মাথার মধ্যে? এমন কিছু হলে অনেক আগেই তকে খুন করে কুত্তা দিয়ে শরীর খাওয়াতাম।আর বাচ্চাটাকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলতাম। কিন্তু সে আমার অংশ, আমার বৈধতার দলিল, আমার অস্তিত্ব। ভুলেও যদি আর এইসব বলতে দেখি বাজে কিছু করে বসব।
আমার দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছ ভেবে যদি আনন্দ পাও তবে সেটা হবে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ব্লাডরোজ। মনে রেখো বনের বাঘ যখন শান্ত থাকে তার মানে এই নয় যে সে শিকার করতে ভুলে গেছে।
কান্না, ব্যাথা ভুলে গিয়ে এনি ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে। লাস্ট লাইনগুলো কর্ণে বাজছে খুব। আমার অস্তিত্ব, আমার বৈধতার দলিল!
এনির ভাবনার মধ্যে ভেসে আসে নিকের শক্ত কন্ঠস্বর,

” নিজেকে অবিশ্বাস করব তবুও তোমাকে না। তোমাকে অবিশ্বাস করার আগে আমার মৃত্যু হোক।
নিক থেমে নিশ্বাস নেয় আরও। এনিকে পাজা কোলে তুলে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়। এনির গালের দিকে তাকায়। পাঁচ আঙ্গুলের দাগ বসে একদম ফুলে উঠেছে। এতদিন পর মেয়েটাকে কাছে পেলো। আদর করেই তো তৃষ্ণা মিটাতে পারছে না। কিভাবে আঘাত করে বসলো! ড্যাম ইট। এনির লালচে গালে ঠোঁট ছুইয়ে বলে,
” আমি খারাপ, উন্মাদ হতে পারি কিন্তু তোমাকে অবিশ্বাস কখনো করব না। পাঁচ মাস পর ফিরে এসে তোমার উন্মাদনার খবর শুনে যে প্রশান্তি লাভ করেছি তা জীবনেও অনুভব করি নি। এইসব কথা নেক্সট টাইম উচ্চারন করো না। নিজেকে সামলাতে পারি না,আঘাত করে বসি।
এনি নিশ্চুপ হয়ে শুনে সেসব কথা। ওয়াশরুমে এসেছে এতক্ষণ খেয়াল করে নি সে। নিজের অবস্থান অনুভব করে কপাল কুচকে ফেলে,

” আপনি আমাকে ওয়াশরুম নিয়ে এসেছেন কেনো?
নিক গম্ভীর গলায় বলে,
” শাওয়ার নিবে তাই।
এনির চোখ আকারে বড় হয়ে যায়। এই গভীর রাতে শাওয়ার নেয় কোন পাগলে? এনি অধৈর্য গলায় বলে,
” এত রাতে শাওয়ার নিতে পারব না। ঠান্ডা লাগছে খুব।
নিক বাথটপের দিকে তাকিয়ে বলে,
” হট শাওয়ার নিবে।
এনি জেদি গলায় বলে,
” একদম জোর দেখাবেন না। কাল সকালে নিয়ে নিব। এত রাতে শাওয়ার নেয় কোন পাগলে?
নিক ভ্রুঁ কুচকে বলে,
‘ কেনো, গভীর রাতে কখনো শাওয়ার নাও নি?
নিকের ইঙ্গিত আর ইশারা বুঝতেই এনি থতমত খেয়ে যায়। লজ্জায় গাল লাল হয়ে যায় তার। মিনমিন গলায় বলে,
” তখন নেওয়াটা বাধ্যতামূলক ছিলো।
” এখন নেওয়াটাও বাধ্যতামূলক। একজন মানুষ সারাদিন শাওয়ার না নিয়ে কিভাবে থেকেছে? শাওয়ার না নিলে আমার সাথে জায়গা দিব না।
এনির চোখ ছোট ছোট হয়ে আসে,

” জায়গা দিবেন কেনো? কে আমি, যে জায়গা দিবেন।
” বউ আমার। একমাত্র আদুরে, অভিমানী বউ।
এনি মাথা নিচু করে মুচকি হাসে। নিক এনির চুলগুলো বেঁধে দিয়ে শার্টের বোতামগুলো এক এক করে খুলতে থাকে। এনি ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের।নিকের হাতের ঠান্ডা স্পর্শ শরীরে লাগতেই পা দিয়ে আঙ্গুলের সাহায্য শক্ত করে চেপে ধরে মেঝে। এই বুঝি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবে সে। উফফ এত কেনো হালকা লাগছে নিজেকে। শার্ট খুলার জন্য কাঁধ থেকে নামাতেই এনি বাঁধা দেয়,

” আ.. আপনি বাহিরে যান। আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি।
এনির এই বাঁধা দেওয়াটা নিকের রাগটাকে বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিলো। বাঁধা মানলো না সে। শক্ত ভাবে শার্টটা খুলে ফেলে। এনি হকচকিয়ে উঠে কিছুটা। নিকের রাগটা অনুভব করতেই সিটিয়ে যায়। মনে পড়ে কথাগুলো, তুমি সম্পূর্ণ আমার। আমার থেকে কোনো কিছু আড়াল করবে না। এমনকি নিজেকেও না। তুমি নিজেকে আড়াল করলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। মনে হয় তুমি আমার না। আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।
এনি কিছু বলতে চাইলো। কিন্তু নিকের গম্ভীর মুখ দেখে কথা আটকে যায়।
বাথরুমের কাঁচের দেয়ালে তখন উষ্ণ বাষ্পের খেলা। শাওয়ারের ঝিরঝিরে শব্দ ছাপিয়ে এনির হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। গ্যাংস্টার বসের গম্ভীর মুখাবয়বে কোনো ভাবান্তর নেই। এনির শুভ্র কাঁধে তখন শীতল বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছে বার বার। যতই নিক তাকে বস্ত্রহীনভাবে দেখুক এরপরও এমন অর্ধনগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা কেমন অস্বস্তি লাগছে। কিন্তু এই কথা বললে এই মুহূর্তে তান্ডব বয়ে যাবে।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির তীক্ষ্ণ দৃষ্টির দহন ভয়ানক। কেমন করে তাকাচ্ছে তার দিকে বার বার। পাশ থেকে শ্যাম্পুর ছিপি খোলার মৃদু শব্দ হলো। এনি তাকানোর ও সুযোগ পেলো না সেদিকে। তার সেই রেশমের মতো লম্বা সোনালী চুলে শ্যাম্পুর ধারা নেমে আসে।

অবাকে এনির মুখ হা হয়ে যায়। এনির খুব ইচ্ছে করছিলো দৃশ্যটা ভিডিও করে রাখতে।
যার এক হুংকারে শহর স্তব্ধ হয়ে যায়, সেই রুক্ষ হাত দুটো এখন কত সাবধানে এনির চুলে বিলি কাটছে! এনি অপলক চোখে সামনের আয়নায় দেখছিল মানুষটাকে। মনে হচ্ছিল, এই দৃশ্য যদি ভিডিও করে পুরো শহরকে দেখানো যেত! সবাই দেখত—যাকে তারা যমদূত মনে করে, সে তার মাথায় শ্যাম্পু করে দিচ্ছে।
হঠাৎ করেই এনির ঘোর কেটে যায়। বাম হাতে শাওয়ারের নব ঘুরিয়ে পানির ধারা ছেড়ে দিল মাফিয়া বস। সাথে সাথেই এক হ্যাঁচকা টানে এনির ধনুকের মতো বাঁকানো কোমরটা জড়িয়ে ধরল সে। শক্ত তপ্ত বুকের সাথে মিশিয়ে নিল এনির কম্পমান শরীরটাকে। পানির ঝাপটা এনির মুখে পড়তেই এনি চোখ বুজে ফেলল। নিকের গম্ভীর নিঃশ্বাস এনির ঘাড়ে আছড়ে পড়ছে। এনির সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। এক অজানা নেশা আর তীব্র অনুভূতির আবেশে দিশেহারা রমনী। নিকের হাতটা এনির উন্মুক্ত হালকা ফুলা পেটে যেতে চায়। কিন্তু দাঁত পিষে নিজেকে আটকে নেয় গ্যাংস্টার বস। এনির গলায় চুমুর বর্ষণ এঁকে দিয়ে বলে,

” এই চুলের মাদকতা আমার কাছে আফিমের থেকেও তীব্র নেশা। তোমার উচিত ছিলো আমার অনুপস্থিতিতে সেগুলোর যত্ন করা। এই দেহটা আমার একমাত্র প্রশান্তি। অথচ তুমি তারও যত্ন নাও নি। হাড্ডি ছাড়া শরীরে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না আমি। শরীরের সাথে মিশিয়েও শান্তি পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে কেউ যেন নেই।
এনি নিকের পেট গলিয়ে হাত দিয়ে আকড়ে ধরে। বক্ষে মুখ লুকিয়ে বলে,
” আপনি ছিলেন না পাশে, সৌন্দর্যের যত্ন করে কি হবে? কাকে দেখাব? যে দেখে মুগ্ধ হবে সেই তো ছিলো না।
নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে এনির গলার খুব নিচ বরারবর ঝুঁকে পড়ে। সেখানে ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু খেতেই এনি ভয়ানকভাবে কেঁপে উঠে। খামছে ধরে নিকের উন্মুক্ত পিঠ। অস্ফূর্ত গলায়,

” ক.. কি করছেন?
নিক সোজা হয়ে এনির নীলাভ চোখে চোখ রাখে। বাঁকা হেসে বলে,
” যার হাসিতে আমি শতবার কন্ট্রল্যাস হয়ে পড়ি সে আমার সামনে বিবস্ত্র, ভেজা অবস্থায় আছে। বুঝতে পারছো আমার ভেতরের অবস্থা? কোনোরকম বিপদ না হলে এই মুহূর্তে ভয়ানক অঘটন ঘটিয়ে ফেলতাম। আবার ও গ্যাংস্টার বসের শক্ত শরীরের নিচে তোমার নরম শরীরটা পিষে যেত। আই কান্ট কন্ট্রোল মাই সেল্ফ বেবিগার্ল !
নিক কথাটা বলে শাওয়ার অফ করে দেয়। এনি ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে। নিকের বক্ষে মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জায় মুখ উঠানোর সাহস নেই তার। ঠোঁট কামড়ে হাসে মাফিয়া বস। ট্রায়াল রুমে প্রবেশ করে এনির সামনে জামা রাখে। এনি সেদিকে তাকিয়ে লজ্জায় আরও সিটিয়ে যায়। কাপড়ের ভাঁজ থেকে সরিয়ে বলে,
” এইটা পড়ি না আমি। আপনি দাড়ান আমি নিয়ে আসছি।
নিক ভ্রুঁ কুচকে তাকালো। খুবই সিরিয়াস ভঙ্গিমায় বলে,

” কেনো? এই ইনারে কি সমস্যা।
এনি লজ্জায় হাঁশ- ফাঁশ করে উঠে। মিনমিন সুরে বলে,
” বড় হয় অনেক। আগে ঠিক ছিলো কিন্ত এখন….
থেমে যায় এনি। আর কথা বলে না। নিক এনির হাত থেকে নিয়ে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে যায়। পিছন ফিরে এনির দিকে তাকিয়ে ভ্রুঁ কুচকে বলে,
” সমস্যা নেই আমি এসে পড়েছি, এখন সব কিছুই ফিটফাট হয়ে উঠবে। তখন এইটাও বড় হবে না।
এনির আচমকা তাকায় নিকের দিকে। চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে বিরবির করে উঠে,
” নির্লজ্জ!
নিক হাসলো। এনির জন্য নিয়ে আসা বস্ত্রটা নিজ হাতে পড়িয়ে দেয়। গলায় চুমু খেয়ে চুলগুলো হ্যান্ড ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে দেয়। এনি শুধু স্তব্দ হয়ে তাকিয়ে আছে। এই গ্যাংস্টার বসের সাথে আগের গ্যাংস্টার বসের কোনো মিল নেই।

এনিকে আরাম করে বসিয়ে দিয়ে নিজের ফোনটি বের করে মাফিয়া বস । স্ক্রিনে একটি তালিকার দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে থাকে সে। তালিকাটির শিরোনাম—গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য করণীয়। প্রথম নির্দেশনায় ছিল পরিচ্ছন্নতার কথা।নিক মনে মনে হিসেব করল—এই দিকটা সে এখনই ঠিকভাবে সম্পন্ন করেছে। দ্বিতীয় নির্দেশনায় ছিল নিয়ম মেনে সুষম খাবার গ্রহণ।
নিক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে উঠে,
” অহহ গড, আর কি কি করতে হবে!
এনিকে শুয়ে পড়তে দেখে আদেশ ছুঁড়ে দেয়,
” বাঁকা হয়ে একদম শুবে না। খাবার খেয়ে এরপর ঘুমাও।
এনি হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” কেনো, বাঁকা হয়ে শুয়ে পড়লে আপনার বাচ্চার সমস্যা হবে?
নিক গম্ভীর চোখে তাকায় এনির দিকে। এনি চাঁদর দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে নিজের।
নিক কথাটা শেষ করেই রুম থেকে বেরিয়ে যায়। তার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যায় মুহূর্তেই। উদ্দেশ্য একটাই খাবার নিয়ে ফেরা। রুমে নীরবতা নেমে আসে।

এনি নিকের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। । ঠোঁটের কোণে একফোঁটা মৃদু হাসি জমে উঠে আচমকা । সে খুব ভালোভাবেই লক্ষ করছিল—আজকের নিকটা অন্য দিনের চেয়ে আলাদা। খুবই অস্থির ছিলেন মাফিয়া বস । অস্বাভাবিকভাবে সচেতন। মনে হচ্ছিলো নিজের ভেতরের কোনো অনুভূতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে।
এনি অনেকবার খেয়াল করেছে আড়চোখে। গ্যাংস্টার বস বারবার তার হাত অজান্তেই এনির পেটের দিকে এগোতে চাইছিল আবার ঠিক পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিচ্ছিল। চোখে ভেসে উঠছিল একধরনের অদৃশ্য হিংস্রতা ও অভ্যাসজাত কঠোরতা।
এনি মনে মনে হাসল। একদিনেই যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে সামনে দিনগুলোতে কী হবে?
সবেমাত্র শুরু, গ্যাংস্টার বস। দেখি আর কতদিন মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারেন। একদিন নিজেই বাচ্চাদের জন্য উন্মাদ হয়ে উঠবেন। কলিজা হয়ে উঠনে তারা আপনার। তাদের নিয়ে জেলাসি ও করবেন না। সেদিনের অপেক্ষায় আমি।

চারদিকে ছড়িয়ে থাকা সমুদ্র তখনো শান্ত। জলের বুকে সূর্যের আলো পড়ে ঝিলমিল করে উঠছে।
সকালের নির্মল সূর্যালোকে ধরণী ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। রাতের দীর্ঘ নিস্তব্ধতা ভেঙে পূর্ব দিগন্তে আলো ছড়িয়ে পড়তেই আকাশের বুক জুড়ে জন্ম নিচ্ছে সোনালি আভা। হালকা কুয়াশা তখনো বাতাসে ভাসমান। আইল্যান্ডের ঠিক মধ্যখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল মিনার। সেই মিনারের এক নিরাপদ রুমে শুয়ে আছে রমণী। সূর্যের আলো চোখের পড়ার কারনে অনেক আগেই জেগে উঠেছে। পাশে ঘুমিয়ে থাকা বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী আরিশের দিকে তাকায়। এলোমেলো চুল, গোলাপি ঠোঁট, ফর্সা গায়ের ত্বক। এই রুপ অন্যরকম মাতাল করে তুলছে তাকে। ইচ্ছে করছিলো ঠোঁটে গভীর চুমু এঁকে দিতে।।কিন্তু কিছুতেই সে এই কাজ করবে না।।রাতের কথাগুলো মনে হতেই চাদরে মুখ ঢেকে ফেলে নিজের। লজ্জায় লাল হয়ে উঠে রমণী। কে বলবে লোকটা অনেক লাগামহীন! সারাক্ষণ গম্ভীরতা আর রাগ নিয়ে ঘুরা লোকগুলো হয়ত অতিরিক্ত অশ্লীল থাকে। নাজলী ভাবনার মধ্যেই শেষ রাতের কথা মনে করে। নাজলী ঘুমে একদম বুদ হয়ে উঠেছিলো। আরিশ নাজলীর কপালে এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে ঠোঁটে চুমু খায়। নাজলী নড়ে-চড়ে উঠতেই আরিশ গলা পরিষ্কার করে। নাজলীকে শাওয়ার নেওয়ার নাম করে ঘুম থেকে টেনে তুলে। নাজলী ঘুম ঘুম চোখে আরিশের দিকে তাকায়। তাকানোর ও সুযোগ হয় নি। রাতের মত আবার ও ঠোঁট দুইটা দখল করে নেয়। নাজলীর ঘুম একদম ছুঁটে যায়। আরিশে উন্মুক্ত বুকে ধ্বাক্কা দেয়। আরিশ ঠোঁট ছেড়ে নাজলীর চোখে চোখ রাখে। দুষ্টু হেসে বলে,

” আরেকবার হয়ে যাক।
নাজলীর চোখ-মুখে আতঙ্ক জমে উঠে। আরিশের বুকে ধ্বাক্কা দিয়ে বলে উঠে,
” এক সেকেন্ডের জন্য ও না। সরুন আমার উপর থেকে।
আরিশ শুনলো না। সেই আগের মত বেপরোয়া উন্মাদ হয়ে উঠে। হাতের অবাধ্য বিচরন আর ঠোঁটের স্পর্শ সর্বাঙ্গে চালাতে থাকে।পরে আর কি যা হওয়ার তাই হলো। নাজলী কথাগুলো ভেবে ওপাশ ফেরার চেষ্টা করে। শরীর ব্যাথায় টনটন করছে। নাজলীর নড়াচড়ায় আরিশের ঘুম ছুটে যায়।।ঘুম ঘুম কন্ঠে বলে,
” এইভাবে নড়াচড়া করছো কেনো??
নাজলী থমকে যায়। এই মাতাল করা ঘুম ঘুম কন্ঠে এত কিসের টান? নাজলী অনুভুতি প্রকাশ না করে রাগ দেখিয়ে বলে,
” মনে রং লেগেছে। তাই এইভাবে নড়ছি।
আরিশ চট করে চোখ মেলে তাকায়। বিছানা থেকে হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে। নাজলীর দিকে ফিরে বলে,
” রাতে জামাইর আদর পাওয়ার পর সকালে উঠে সব বউদের এই রং লাগে। এইটা নতুন কিছু নয়। তোমার কি হয়েছে সেটা বলো?

” হুঁশ থাকে না সামনে কিছু পেলে? উফফ, যখম বানিয়ে দিয়েছে আমাকে।
আরিশ আপেলে কামড় বসিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলে,
” দাঁত যেহেতু আছে যখম হবে স্বাভাবিক। এইভাবে চেঁচানোর কি আছে? সারাক্ষণ চুমু দিতে কষ্ট হয়, ঠোঁট ব্যাথা হয়ে যায়। তাই দাঁত দিয়ে কামড়েছি।
নাজলীর মুখ অটোমেটিক হা হয়ে যায়।
” এইটা তাহলে কামড়ানোর রিজন? আমি ভাবতাম…
নাজলী কথা থামিয়ে দেয়। আরিশ ঠোঁট কামড়ে হালকা হাসে। নাজলীর থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরতা নিয়ে বলে,
” তুমি কি ভাবতে?
নাজলী বালিশ গুছিয়ে উত্তর দেয়,
” কিছু নয়। সামনে থেকে সরুন আমার, অসহ্য লাগছে আপনাকে।
আরিশ ঘড়ির দিকে তাকায়। সময় অনেকটা পেরিয়ে গিয়েছে। কাবার্ডের দিকে গিয়ে গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে ঠাট্টার সুরে বলে,
” সারারাত আদর করলাম, সোহাগে ডুবিয়ে রাখলাম, নিজেকে কষ্ট দিয়ে তোমাকে আগলে রাখলাম আর সকাল হতেই জুতা মারছো?
নাজলী বালিশ ছুঁড়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠে,
” অসভ্য, নোংরা লোক। শালা তর মুখে ঠাডা পড়ুক।
আরিশ বালিশ ক্যাচ করে ঠকই কিন্ত নাজলীকে ধমকে উঠে,
” চুপ, বিয়াদব! আই অ্যাম ইওর হাজবেন্ড! শালা কি ধরনের ভাষা? রাতেও বিশ্রি শব্দ উচ্চারন করেছো কিছু বলিনি। শুয়রের বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা এইসব কি ধরনের শব্দ? আরেকবার এইসব উচ্চারন করলে থাপড়ে মুখের নকশা বদলে দিব।

ধমক শুনে নাজলী মাথা নিচু করে ফেলে। শরীরে অসহ্য ব্যাথা অনুভব করছে। মেডিসিন নিয়েছে অনেক্ষণ হলো তবুও ব্যাথা কমছে না। বসে থাকার মত শক্তি পাচ্ছে না।।শরীরটা কেমন দুর্বল অনুভব হচ্ছে। পায়ের কাছ থেকে ব্ল্যাঙ্কেট টেনে নিয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ে। নাজলীকে এইভাবে শুয়ে পড়তে দেখে আরিশের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। মেয়েটার অনেক ধৈর্য, সেটা আরিশ খুব ভালোভাবেই বুঝেছে। শেষ বারে জ্ঞান হারিয়ে পড়ছিলো। কিন্তু নিজেকে শক্তভাবে ধরে রেখে সবটা সামলে নিয়েছে। কিন্তু অবস্থা খুবই নাজুক। আরিশের ভেতরে অপরাধ বাসা বাঁধে। আরেকটু সতর্ক হওয়া উচিত ছিলো তার। সে এগিয়ে গিয়ে নাজলীর শিউরে বসে। কপালে চুমু খেয়ে মাথায় হাত রেখে শীতল গলায় জিজ্ঞাসা করে,
” খারাপ লাগছে বেশি, ডাক্তার ডাকব?
নাজলী ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকে। কি নির্লজ্জ কথা এইটা? এইসব নিয়ে কেউ ডাক্তার ডাকে, ছিহহহ! নাজলী কঠিন গলায় শুধায়,

” লাগবে না। সময় হলে ঠিক হয়ে যাব।
আরিশ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নাজলীর মাথাটা নিজের বাহুর উপরে রেখে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে শুষে মেয় প্রিয়তমা স্ত্রীর শরীরের ঘ্রাণ। সেখানে মুখ রেখেই ফিসফিস গলায় বলে,
” ধন্যবাদ সবটা সামলে নেওয়ার জন্য।আমার মত এমন উন্মাদকে নিজের মত করে সামাল দেওয়ার জন্য। আর স্যরি তোমাকে এতটা ব্যাথা দিয়েছি বলে। পরেরবার থেকে সতর্ক থাকব।
নাজলী থমকে যায়। আরিশের মুখে স্যরি শুনে ভেতর মুচড়াচ্ছে। লোকটা সত্যি তাকে স্যরি বললো। নাকি সে অসুস্থতায় ভুল শুনেছে? নাজলীর বিশ্বাস হচ্ছে না। তার বেহায়া, স্বৈরাচারী মন আবার ও উৎসুক হয়ে উঠে এই শব্দটা শুনার জন্য। আরিশের বক্ষে মুখ লুকিয়ে জিজ্ঞাসা করে,

” আপনি সরি বললেন আমাকে? ক্রিমিনাল লিডার আরিশ ইলহাম সরি বলল আমাকে? বিশ্বাস হচ্ছে না। আজকাল কি কানে কম শুনতে পায়?
আরিশ ফিঁচেল হেসে নাজলীর শরীরটা শরীরের সাথে মিশিয়ে নিতে চাইলো। কিন্তু তার আগেই নাজলী চেঁচিয়ে উঠে। ব্যাথা চোখ-মুখ নীল বর্ণ ধারন করে তার। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
” মাথায় জ্ঞান -বুদ্ধি নেই বর্বর লোক। পুরো শরীর যখম হয়ে আছে আর এসেছেন চেপে ধরতে। মেরে ফেলার ধান্দা করছেন নাকি?
আরিশ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। কিছু মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে থাকে নাজলীর দিকে। রোমান্টিক মোমেন্টকে এইভাবে পানি ঢেলে দেওয়ার জন্য এই মেয়ে সেরা। হুট হাট সুইং হয়। আরিশ চুল ঠিক করতে করতে বলে,
” এক রাতেই প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলে? এইভাবে মুড সুইং হচ্ছে কেনো তোমার?
নাজলী হতাশ চোখে তাকায়,
” এত বাজে কথা বলতে ঠোঁটে আটকায় না? আরেকটা কথা, সুস্থ হলে বিকেলে আমি বাহিরে যাব।
আরিশের চোখ-মুখ গম্ভীর হয়ে উঠে,

” কেনো?
” জামা -কাপড় কিনতে হবে। অনেক জিনিস আনা বাকি।
” কি – কি আনতে হবে আমাকে বলো।
” আপনাকে কেনো বলব? আমি গিয়ে আনলে কি সমস্যা?
আরিশ দাঁত পিষে বলে,
” নাজলী এইসব নিয়ে একদম ত্যারামি করবে না। জোর করবে না আমার সাথে। বাহিরে প্রচুর শত্রু উৎ পেতে আছে। এদেরকে আগে ধ্বংস করি এরপর সারাদিন রাস্তায় থালা নিয়ে বসে থেকো কিছু বলব না।
আরিশের বলা লাস্ট লাইন শুনে নাজলী কপাল কুচকে ফেলে।।ফের প্রশ্ন করে,
” থালা নিয়ে বসে থাকব মানে?
আরিশ গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,

” বাহিরে যাওয়ার যখন এত ইচ্ছে তখন দুই -পাঁচ টাকা ভিক্ষে করে নিয়ে আসো। কাজে দিবে।
নাজলী রাগে – দুঃখে ফুঁসে উঠে। আরিশের দিকে আবার ও বালিশ ঢিল ছুঁড়ে চেঁচিয়ে উঠে,
” অসভ্য, অভদ্র লোক। এই মুহূর্তে বের হয়ে যান আমার রুম থেকে।
আরিশ হেসে দরজা লাগিয়ে বের হয়ে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখতে পায় ড, মোনালিসা আর নিক মুখোমুখি হয়ে বসে আছে। আরিশের মুখ অটোমেটিক হা হয়ে যায়। স্বয়ং মাফিয়া বস আর তার সামনে কোনো মেয়ে! অসম্ভব দৃশ্য এইটা! আরিশ দুই একবার নিজের চোখ কচলে নেয়। মাথা হ্যাং হয়ে আসছে তার। দুনিয়ার সব থেকে আশ্চর্য দৃশ্য এই মুহূর্তে দেখতে পাচ্ছে সে। কেনো এসেছেন মিসেস মোনালিসা? কার জন্য? এনি নয়ত আবার!
আরিশের চোখ -মুখ খুশিতে চিকচিক করে উঠে। বিরবির করে নামতে নামতে বলে,
” শালা বউ -বাচ্চার জন্য নিজের এত বছরের তিক্ততা ভুলে একজন মহিলার সাথে কথা বলছে। আশ্চর্য!
আরিশ সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে।
নিকের সামনেই ডাক্তার বসে আছে। নিকের এমন অস্থিরতা দেখে ডাক্তার নিজেও অনেক অবাক হয়। একদিন সে এই নারীর চিকিৎসার জন্য এসেছিলো। তখন সে মেয়েটাকে স্ত্রী বলাতে এই পুরুষটি’ই গম্ভীরতা নিয়ে ধমকে বলেছিলো,
” রক্ষিতা আমার।
অথচ আজ নাকি সে’ই রক্ষিতার জন্য এত ছটফটানি? তাদের কি বিয়ে হয়েছে, নাকি বাচ্চাটা অবৈধ! অবৈধ হলেও হতে পারে। রক্ষিতাকে তো আর শপিছ করে সাজিয়ে রাখি নি। নিশ্চই মনোরঞ্জনের জন্য এই রাখা হয়েছে। সৃষ্টিকর্তার লীলায় মেয়েটার পেটে বাচ্চা চলে আসে। এখন রক্ষিতা যত হোক, বাচ্চাটা তো নিজের। এই বাচ্চার জন্য হয়ত এত ছটফটানি! কথাগুলো উনি নিজের ভেতরেই চেপে রাখে। এইসব প্রশ্ন করার সাহস তার নেই। কারন প্রশ্ন যাকে করবে তার সামনে দুইটা বাক্য বেশি বললেই শরীর কাঁপে। তার তীক্ষ্ণ ভয়ানক চাহনী শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ডাক্তার দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিকের উদ্দেশ্যে বলে,

” ম্যামের শরীর প্রচুর দুর্বল। এতটা দুর্বল যে বাচ্চা জন্ম দিতে রিস্কের সম্মুখীন হবে। উনার বর্তমান অবস্থা দেখে বুঝলাম উনি দীর্ঘ দিন যাবৎ অসুস্থ। বিষন্নতা আর হাহাকার চোখে- মুখে স্পষ্ট। স্বাভাবিক মানুষের শরীরের কন্ডিশন এত খারাপ হতে পারে না।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। আরিশ নিককে কিছু বলতে না দিয়ে বলে,
” একদম ঠিক ডাক্তার মোনালিসা। এনি বহু দিন যাবৎ তীব্র মানসিক যন্ত্রনায় ভুগেছে। খাওয়া – দাওয়া ঘুম সব বিসর্জন দিয়ে অন্ধকার রুমে পড়ে থাকত। অনেক বার শরীরে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। সারাক্ষন ডাক্তার ছিলো চারপাশে। তবুও তাকে সুস্থ রাখতে পারিনি। এই রিস্ক থেকে বের হওয়ার উপায়?
ডাক্তার মোনালিসা গম্ভীর নিশ্বাস ফেলে বলে,
‘ উনার এমন মানসিক যন্ত্রনার কারন কি ছিলো?
আরিশ বলতেই যাচ্ছিলো কিন্তু নিক মাঝপথে ধমকে উঠে,
” সেটা জেনে আপনার কাজ নেই। আমার স্ত্রী কিভাবে সুস্থ থাকবে সেটা বলুন। অযথা প্রশ্ন করে মেজাজ গরম করবেন না।

ড, মোনালিসা ভয়ে সিটিয়ে যায়। নিকের মুখে স্ত্রী সম্মোধন শুনে অবাক হয়। তাহলে রক্ষিতা থেকে স্ত্রী হয়ে উঠেছে!
” উনাকে আলো – বাতাসের সান্নিধ্যে রাখবেন বেশি করে। উনার কথাকে এমনভানে গুরুত্ব দিবেন যাতে সে নিজেকে একা ফিল না করে। এই সময়টা মেয়ের কাছে অনেক অন্যরকম। মুড সুইং হবে প্রচুর। রাগ দেখাবে, কান্না করে দিবে অল্পতেই, জেদ ধরবে, বাচ্চামো করবে। সব গুলো থাকবে অনেক বেশি। আর এই সব কিছু আপনাকে সামলাতে হবে। একটা মেয়ের সব থেকে কাছে মানুষ তার হাজবেন্ড। যার কাছে কোনো ভণিতা নেই। উনার প্রেগন্যান্সি স্বাভাবিক নয়। টুইন বেবি অথবা তিনটা বেবিও হতে পারে। একটা বাচ্চা জন্ম দেওয়া উনার জন্য রিস্ক। সেখানে টুইন বাচ্চা জন্ম দিতে গেলে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে। বাকিটা সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে!
কথাগুলোর প্রতিটি শব্দ ভেতরে ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়ে মাফিয়া বসের হৃদয়ে। মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখ–মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায়। চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠে। চোখের দৃষ্টি কেমন খিঁচে যায়।।
“স্বাভাবিক নয়”—এই বাক্যটাই তার মাথার ভেতর অনবরত প্রতিধ্বনিত হতে লাগল । টুইন বেবি, কিংবা তিনটা বেবি ভাবনাগুলো একটার পর একটা এসে তার বুকের ভেতর ভার চাপাতে থাকে। যে মানুষটা জীবনে অগণিত বিপদের মুখোমুখি হয়েছে, যে মৃত্যুকে চোখে চোখ রেখে দেখেছে, সে আজ অদ্ভুত এক আতঙ্কে স্থির হয়ে যায়।
নিকের শ্বাসপ্রশ্বাস অজান্তেই ভারী হয়ে উঠে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা লাগছিল অথচ সে কিছুই প্রকাশ করছিল না। মাফিয়া বসের হাত দুটো শক্ত করে মুঠো পাকানো। কপাল- গলা দিয়ে ঘাম ঝরছে।
একটা বাচ্চাই যেখানে ঝুঁকির কারণ, সেখানে একাধিক বাচ্চা তো….. প্রথমবারের মতো মাফিয়া বসের হৃদয়ে অসহায়তার অনুভূতি ঢুকে যায়। বুকের গভীরে জমে উঠল এক চাপা ভয়। যা সে কাউকে দেখাতে পারে না। উচ্চারণ করতেও জানে না।
আরিশ নিকের এমন ভিবৎস্য অবস্থা দেখে ঠোঁট ভেজায় নিজের। ডাক্তারকে বলে,

” আপনি এখুন আসুন, মিসেস মোনালিসা।
ড, মোনালিসা এক মুহূর্তে দেরী না করে চলে যায়। আরিশ নিকের কাধে হাত রেখে শান্তনা দিয়ে বলে,
” ভাই শন্ত হ একটু।
নিক ছন্নছাড়া ভাবে শ্বাস ফেলে। হাত শক্ত হয়ে আসে গ্যাংস্টার বসের। গলায় বিষন্নতা নেমে আসে,
” ঠিক এই কারনেই সন্তান চাই নি। কি প্রয়োজন আছে এইসব বাচ্চার? সারাক্ষণ ভয়ে থাকতে হয় মেয়েটাকে নিয়ে। হ্যা, আমার ও ভয় কাজ করে। ইভেন আ মনস্টার ফিলস ফিয়ার। মেয়েটাকে হারিয়ে ফেলার ভয় ভেতর থেকে শ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছে আমার। ভয় আরও দ্বিগুন হয়ে উঠেছে। ঘুমাতে পারছি না, শান্তিতে কোথাও বসতে পারছি না। যন্ত্রনায় ছিঁড়ে যাচ্ছে মাথা। চারদিকে এত শত্রু! কতক্ষণ আগলে রাখব জানা নেই। আমার নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত টাচ করতে পারবে না কেউ। কিন্তু এই ঘটনা কিভাবে সামাল দিব? প্রথম থেকে কাছে থাকলে এই জটিলতা কোনো কালেই সৃষ্টি হত না।
নিক টেনে ধরে নিজের চুল। আঙুলগুলো নিজের চুলের ভেতর দিশেহারাভাবে আটকে যেতে দেখে আরিশ শান্ত গলায় বলে,

” তুই এনিকে নিয়ে অধৈর্য সেটা আমরা সবাই জানি। শালা তুই এই মুহূর্ত মেয়েটার সাথে একটু নরমাল আচরন করিস। বাহিরের শত্রুদের ধমধমকি আর রাগ – হিংস্রতা দেখাতে দেখাতে এই রুপ তর রক্তে মিশে গিয়েছে। এখন তর ভালোবাসা মাখা কথাগুলোও আমার কাছে মনে হয় ধমকে ধমকে বলছিস। একটু স্বাভাবিক হ!
নিক ভ্রুঁ কুচকে বলে,
” আর কিভাবে স্বাভাবিক হব?
” স্বাভাবিক মানুষ যেমন কথা বলে তেমন
” স্বাভাবিক মানুষ কিভাবে কথা বলে আমি জানব কি করে?
আরিশ পানি খেতে যাচ্ছিলো। নিকের কথায় পানি খাওয়া ও বন্ধ করে দেয়। কথা সত্যি, জানবে কিভাবে? বুঝ হওয়ার পর থেকেই তো বেড়ে উঠা হিংস্রতা আর অসামাজিকতায়। আরিশ কাঁধ নাড়িয়ে বলে,
” গুগলে সার্চ দিয়ে শিখে নিবি। কিভাবে বউয়ের সাথে নরম হয়ে কথা বলতে হয়। আর যদি এতেও ঠিক না হস তবে এক টানা সাত দিন মধু দিয়ে গোসল করবি। দেখবি তুই একদম মধুময় হয়ে উঠেছিস।
আরিশের ফালতু লজিকে নিক দাঁতে দাঁত পিষে। আরিশ সেসবে পাত্তা না দিয়ে গলা কেঁশে প্রশ্ন করে,
” অনেকদিন পর তো মেয়েটাকে কাছে পেয়েছিস। তৃষ্ণার্ত যৌবন নিশ্চই উতলে উঠেছিলো। বলছিলাম যে মেয়েটাকে কি আজও অজ্ঞান করে ফেলেছিস? নাহলে মোনালিসা কেনো আসলো মিনারে?
নিক দাঁত পিঁষে আরিশের দিকে তেঁরে যায়। আরিশ উঠে সামান্য দৌঁড় দিয়ে নিকের থেকে দুরত্ব বজায় রাখে। ডিভানে বসে পড়ে মাফিয়া বস। আরিশ হেসে নিকের দিকে ইশারা করে,
” মামা সত্যি এমন কাজ করেছিস? হারবাল খেয়েও লোকের এত শক্তি নেই। তর না খেয়েও এত শক্তি কেনো? সত্যি করে বল তুই কি লুকিয়ে হারবাল-টারবাল জাতীয় কিছু সেবন করিস? আরে লজ্জা না পেয়ে বলে দে, কাউকে বলব না কিছু।
নিক কটমট চোখে তাকাতেই আরিশ ভ্রুঁ নাচিয়ে হেসে উঠে। নিক পায়ের জুতা খুলে আরিশের দিকে ঢিল মেরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

” যৌবন কাল অনেক আগেই পার করে এসেছি বাস্ট্রাড! কন্ট্রোলল্যাস হওয়ার জন্য হারবালের প্রয়োজন নেই। সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে-চোখ রাখলেই আমি হাজার বার কন্ট্রোলল্যাস হয়ে পড়ি। কিন্তু সময় এখন অন্য। অবস্থা ভালো না। আমি এতটা বর্বর নয় যে এই অবস্থায় ওর কাছে যাব। দুনিয়ার মধ্যে এই এক পিছ নারী যার জন্য গ্যাংস্টার বস প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে।
আরিশ দমে যায়। নিকের কথায় মুচকি হাসে। কিছু বলতে গিয়েও আর বলে না। মৌঁমাছির বাসায় অতিরিক্ত ঢিল ছুঁড়লে আবার হিতে বিপরীত হয়ে উঠবে। দুনিয়ার মধ্যে একমাত্র সে একজন যে গ্যাংস্টার বসের সাথে ঠাট্টা করার ক্ষমতা রাখে। আরিশ সিরিয়াস ভঙ্গিমায় কাছে এসে হেসে বলে,
” শুনলাম, মিসেস মোনালিসা বললো টুইন অথবা ট্রিপলেট বেবি হবে। ছয় মাস এর মত হবে এনির প্র‍্যাগনেন্সির টাইম। এক কাজ কর নিশ্চিত হওয়ার জন্য আল্ট্রাসাউন্ড করিয়ে নিয়ে আয়।
নিক শক্ত গলায় জবাব দেয়,
” প্রয়োজন নেই। একটা হোক বা দশটা! আমার স্ত্রী ঠিক থাকলেই হবে।
আরিশ আহাম্মকের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিক ফোন বের করে আরিশের উদ্দেশ্যে বলে,
” মিষ্টি বিতরন করেছিস?
” এই মাত্র না বললি বাচ্চার প্রয়োজন নেই বউ ঠিক থাকলেই চলবে।।যাকে তর প্রয়োজন নেই তার খুশিতে মিষ্টি বিতরন করে কি করব?
নিক চোখ রাঙ্গিয়ে তাকাতেই আরিশ অসহায় মুখ বানিয়ে বলে,
” ক্ষমা কর ভাই। মিষ্টি বিতরন করার জন্য সময় তো দিবি। রাতে বললি মাত্র। এখন ওখানে যাব এরপর দিয়ে আসব।
নিক গম্ভীরতা নিয়ে উঠে যায়। আরিশ স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে নিকের ছটফটে চোখ।

গ্যাংস্টার বস সিসিটিভি কন্ট্রোল রুমে স্থির হয়ে বসে আছেন। তার পাশেই অবস্থান করছে অধিরাজ। এই কক্ষটি অত্যন্ত সংরক্ষিত।নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া এখানে প্রবেশের কোনো অনুমতি নেই। মিনারের অভ্যন্তর থেকে শুরু করে চারপাশের প্রতিটি কার্যকলাপ এই মনিটরিং সিস্টেমে ধারাবাহিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। সমগ্র এলাকা এক অদৃশ্য চোখের নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ। নিক নিরব আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রতিটি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করছেন। তার উদ্দেশ্য একটিই সেই বিশ্বাসঘাতক গার্ডকে শনাক্ত করা। যে তার অগোচরে পেছন থেকে ছুরি চালিয়েছে এবং শত্রুদের সঙ্গে আঁতাত করে তাকে বোমা হামলার মাধ্যমে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। প্রতিটি সেকেন্ড তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি দৃশ্য সে বিশ্লেষণ করছে গভীর মনোযোগে যাতে সামান্যতম সূত্রও তার দৃষ্টি এড়াতে না পারে।

রুমের পরিবেশ নিস্তব্ধ ও ভারী হয়ে আছে
মনিটরের আলোয় নিকের মুখে প্রতিফলিত হচ্ছিল কঠোরতা আর প্রতিশোধের ছায়া। অধিরাজ নীরবে তার পাশে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল। এই মুহূর্তে সামান্য ভুলও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
বিশাল মনিটর ওয়ালে মিনারের প্রতিটি অংশ লাইভ ফুটেজে ভেসে উঠছিলো। প্রবেশপথ, করিডর, নিরাপত্তা চেকপোস্ট, এমনকি বাইরের আঙিনার প্রতিটি কোণ পর্যন্ত। নিক একের পর এক ক্যামেরা চ্যানেল পরিবর্তন করছিলেন। কখনো গেট নম্বর–১, কখনো সার্ভিস করিডর, আবার কখনো স্টোরেজ ইউনিট—সব জায়গার ফুটেজ সময় ধরে পিছিয়ে পিছিয়ে (rewind করে) খুঁটিয়ে দেখছিলেন । যেখানে সামান্য সন্দেহ হচ্ছিল সেখানে ভিডিও স্লো করে ফ্রেম ধরে ধরে বিশ্লেষণ করছিলেন। মাফিয়া বসের আঙুল দ্রুত কন্ট্রোল প্যানেলের বোতাম টিপে ফুটেজ জুম ইন–আউট করছিলো।
আরিশ পাশে দাঁড়িয়ে মনিটরের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে কয়েকটি নির্দিষ্ট সিকিউরিটি পয়েন্ট চিহ্নিত করে বলল,

“এই জায়গাগুলোর ফুটেজ আগে চেক কর। এই সময়ের মধ্যে কেউ অস্বাভাবিকভাবে প্রবেশ বা বের হয়েছিল কি না খুঁজতে হবে।”
ফুটেজ এগোতে এগোতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের ক্লিপে নিক থেমে যায় । সেখানে একজন গার্ডের চলাফেরা অস্বাভাবিক লাগছিল।বারবার দিক পরিবর্তন, নিরাপত্তা চেক এড়িয়ে যাওয়া, এবং নিষিদ্ধ করিডরের দিকে অপ্রয়োজনীয় প্রবেশ। গ্যাংস্টার বসের চোখে হিংস্রতার ছায়া স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠে। আরিশ অবাক হয়ে বলে,
” নিক এ – তো হেনরি! রাস্তা থেকে তুলে এনে রাজপ্রাসাদে স্থান দেওয়ার এইটা! শালা মাদা*র্চুদের বাচ্চা এতবড় ষড়যন্ত্রের সাথে হাত মিলিয়েছে অথচ জানতেই পারলাম না।
নিকের চোখ-মুখ কঠোরতায় ঢেকে যায়। মনিটরের আলো নিভিয়ে দিয়ে আরিশের উদ্দেশ্যে হুংকার ছেড়ে বলে,
” ওকে টর্চার সেলে নিয়ে আয়। আসল কালপ্রিট বের হয়ে আসবে। সিউর এর মাষ্টার মাইন্ড কায়াত ছিলো।
আরিশ সম্মতি জানিয়ে বলে,

” এখন কোথায় যাচ্ছিস?
নিক ব্লেজার ঠিক করে বলে,
” রক্তের সন্ধানে?
আরিশ সামান্য হেসে বলে,
” তর বোনকে কি মিনারে নিয়ে আসবি?
নিক কিছু বলে না। গম্ভীরতা নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিলো সিক্রেট রুম থেকে। মুহূর্তেই ঘাড় ঘুরিয়ে আদেশ করে,
” বিয়ের আয়োজন পুনরায় শুরু কর।
আরিশ হতভম্ভ হয়ে বলে,
” কার বিয়ে? কিসের বিয়ে?
নিক অধিরাজের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে,
” সারাজীবন চির কুমার নিশ্চইই থাকতে চাস না?
অধিরাজের চোখ-মুখ খুশিতে চিকচিক করে উঠে। খুশিতে চেয়েছিলো নিককে জড়িয়ে ধরতে কিন্তু তার আগেই নিক বের হয়ে যায়।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৩ (২)

আরিশ গালে হাত দিয়ে অস্থির অধিরাজের দিকে তাকায়। অধিরাজ আরিশের দিকে খুশি মনে বলে,
” স্যার আমার বিয়েটা তবে হচ্ছে ?
আরিশ ঠোঁট চেপে হেসে বলে,
” চিন্তা করছিস কেনো? অবশ্যই হবে বিয়ে। অপেক্ষা কর ভালো কিছু পাবি।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৫