Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৫ (২)

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৫ (২)

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৫ (২)
লিজা মনি

এক নিবিড় অরণ্যের কোল ঘেঁষে অতলান্ত জলরাশির বুকে জেগে থাকা এই নির্জন দ্বীপ।প্রকৃতির রুক্ষতা আর মানুষের তৈরি কৃত্রিম শৃঙ্খলার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ এই দ্বীপটি। চারদিকে গহীন অরণ্য, যার অন্ধকার শাখা-প্রশাখা। সেই অরণ্যের প্রান্তঘেঁষে উন্মুক্ত আকাশের নিচে সজ্জিত হয়েছে এক আভিজাত্যমণ্ডিত বিবাহ আসর। চারদিকে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে ধবধবে সাদা লিলি (Lily) এবং পাসিফ্লোরা (Passiflora) ফুল। যে কেউ দেখলেই চোখ ধাঁধিয়ে যাবে।

এই নির্জন আইল্যান্ডকে বেছে নেওয়ার পেছনে একটাই প্রধান কারণ। নিরাপত্তা নয় বরং অজেয়তা। বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই স্থানটি গ্যাংস্টার বসের পার্সোনাল ডোমেইন। এখানে অনুপ্রবেশ মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। দ্বীপের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে মোতায়েন হাজার দেহরক্ষী। তারা কালো পোশাকে আবৃত। কানে ইয়ারপিস লাগানো। নিঃশব্দ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারদিক স্ক্যান করছে। তাদের চোখে কোনো আবেগ নেই। বর্বরতা আর হিংস্রতার প্রতীক তারা। চোখে আছে শুধু আদেশ পালনের যান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা।
তাদের এই চারপাশে আছে প্রশিক্ষিত জংলি পশু ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নেকড়ে, হায়েনা, আর অচেনা হিংস্র প্রাণী। যাদের উপস্থিতি ও গর্জনকে ডিঙ্গিয়ে মিনারের প্রবেশদ্বারে ডুকা অসম্ভব!

রাতের অন্ধকার ধীরে ধীরে কমে আসছে। সূর্যদয় হয়েছে অনেক্ষণ আগেই। সবার পড়নে আজ সাদা কাপড়।
নিক ডিভানে বসে আছে। তার সামনে একটা বড় সাইজের ল্যাপটপ। দৃষ্টি তার ল্যাপটপের দিকে। যেখানে তার অবর্তমানে এনির সকল কাজ কর্ম ক্যামেরা বন্ধী হয়ে আছে। এনির পাগলামো , একা একা কথা বলা, চিৎকার করে কাঁদা, এক দৃষ্টিতে তকিয়ে বিরবির করা। প্রতিটা ঘটনা সূক্ষ্ণ ভাবে পরখ করছে। এক জায়গায় প্রায় সাত ঘন্টা ধরে বসে নিক । সময় কোন দিক দিয়ে যাচ্ছে গ্যাংস্টার বসের খেয়াল নেই। সে বাম হাতে পর পর সিগারেট টানছে অন্য হাতে ওয়াইনের গ্লাস ধরে রাখা। দৃষ্টি সম্পূর্ণ মনিটরের দিকে। অন্য সব প্রেমিক পুরুষ হলে প্রেমিকার এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে হয়ত কিছুটা কষ্ট পেত, মায়া কাজ করত। কিন্তু নিকের ঠোঁটের কোণে ছিলো তৃপ্তি আর রহস্যের হাসি। নিক ল্যাপটপ অফ করে উঠে দাঁড়ায়। চুল গুলো ঠিক করে ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে,
” মাই ফা*কিং বেবিগার্ল! এতটা উন্মাদ, বেপোরোয়া হবে জানলে অনেক আগেই দুরত্ব বাড়িয়ে দিতাম। বলেছিলাম না, আমার প্রতি এমনভাবে আসক্ত হবে যে আমার অনুপস্থিতে আমার থেকে বড় সাইকোতে পরিনত হবে। আই নেভার এক্সপেক্টেড মাই ওয়ার্ডস টু কাম ট্রু সো কুইকলি।
আর কিছু দিন চোখের আড়ালে থাকলে তো তোমাকে খুঁজেই পেতাম না। ডিড ইউ অলসো ফল ইন্টু অল দিস ফা*কিং অ্যাডিকশন?

নিক কথাগুলো বিরবির করে ওয়াশরুমে ডুকে পড়ে। প্রায় চল্লিশ মিনিট ব্যয় করে ফ্রেশ হয়ে বের হয়। প্রশস্ত বুক আর কাঁধ বেয়ে গড়িয়ে পড়া প্রতিটি স্বচ্ছ জলকণা। যেন ফর্সা ত্বকের ওপর হিরের কুচির মতো জ্বলছে। ত্বকের মসৃণতার সাথে বুকের ঘন রোমরাজির যে বৈপরীত্য।তা তাকে এক আদিম পুরুষালি আভিজাত্য দান করেছে। প্রতিটি পেশীর খাঁজে আটকে থাকা পানি চুইয়ে পড়ছে মেঝেতে।ভেজা শরীরে হাতে খোদাই করা ড্রাগনটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পানির নিচে নীলচে-কালো কালিতে আঁকা আঁশগুলো চকচক করছে।পিঠের বিস্তৃত সাপগুলো পেশীর প্রতিটি সঞ্চালনের সাথে সাথে কিলবিল করে উঠছে। নিক টাওয়াল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আয়নার দিকে তাকায়। আয়নার মধ্যে এক নারীর বিষ্ময়কর নীলাভ দৃষ্টি চিকচিক করছে।
নিক আয়নার দিকে তাকিয়েই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে বলে,
” একজন জানোয়ারকে এইভাবে দেখা বাজে দেখায় বেবিগার্ল। এমনিতেই অস্বাস্থ্যকর আসক্তিতে পরিনত হয়েছো। এইভাবে তাকিয়ে থাকলে এর থেকেও বেশি কিছু হয়ে যেতে পারো। তবুও যদি দেখার ইচ্ছে হয় তবে আমি টাওয়াল ছাড়া এই আসতে রাজি।

এনির চোখ দুইটা বন্ধ হয়ে যায়। লজ্জায় আবার ও ব্ল্যাঙ্কেটের নিচে ডুকে পড়ে। নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে এনির পাশে এসে দাঁড়ায়। গম্ভীর গলায় বলে,
” উঠে পড়ো দ্রুত। স্বামীর বাড়িতে এত দেরী করে ঘুমানো উচিত নয়।
“স্বামী” শব্দটা এনির কানে ঝংকার তুলে। যতবার এই শব্দটা সে শ্রবণ করে ঠিক ততবার সে অদ্ভুত অনুভুতির সাথে পরিচিত হয়। অস্বাভাবিকভাবে কেঁপে উঠে তার নারী সত্তা। এনি আস্তে করে ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে। মনমিন সুরে বলে,
” কখন আপনাকে দেখছিলাম? একদম মিথ্যে বলবেন না।
নিক টাওয়াল ডিভানের উপরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলে,

” গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান কখনো মিথ্যে বলে না বেবিগার্ল। তার চোখ- কান সব সময় এই সজাগ থাকে। ডানে -বামে, উপরে – নিচে যেদিকে লোকে তাকিয়ে থাকবে সেটা খুব সহজেই অনুভব করতে পারি। আর অনুভব করাটা যদি হয় তোমার অস্তিত্ব নিয়ে তবে সেটা হাজার মাইল দুরত্বে থেকেও অনুভব করতে পারব।
এনি ভ্রুঁ কুচকালো। নিজের কথায় নিজে ফেঁশে গিয়ে এদিক-সেদিক তাকায়। হঠাৎ করে মনে হয় আজ অধিরাজ আর তানভীর পার্টি। মনটা খুশিতে ভরে উঠে। যদিও সে তানভীকে চিনে না তেমন। তবে অধিরাজ কে খুব ভালো করেই চিনে। কিছু একটা মনে হতেই মনটা বিষিয়ে উঠে। এত খুশি হয়ে লাভ কি? সে তো পার্টিতে যেতে পারবে না। যেখানে এই লোক একজন পুরুষের সামনে যেতে দেয় না সেখানে তো অনেক পুরুষ থাকবে। এখন তো পরিস্থিতিও আলাদা। অসুস্থতা, প্র‍্যাগনেন্সি নিয়ে যাওয়াটা কষ্টকর। কিন্তু এনি তবুও যেতে চাচ্ছে। যেখানে এমন ছন্নছাড়া পুরুষটাকে সামলাচ্ছে। সেখানে সামান্য কষ্ট করে পার্টিতে ও অংশ নিতে পারবে। এনি মাথা নিচু করে মন খারাপ করে ভাবনায় ডুবে আছে। কানের কাছে ভেসে আসে আবার ও পুরুষনালী কন্ঠস্বর,

” সমস্যা কি? এইভাবে মুখ ভাড় করে বসে আছো কেনো? প্রতিদিনের মত ফ্রুটস গুলো শেষ করো। কুইক!
এনি মাথা তুলে পাশে তাকায়। প্রতি দিনের মত অনেক ফ্রুটস কেটে রাখা হয়েছে। এই এক মাস ধরে এইসব খেতে খেতে – তার মুখ তেঁতো হয়ে উঠেছে যেন। একটা মানুষ একটানা কত খেতে পারবে একই জিনিস? তবুও নিকের ভয়ে একটা আপেলের কুচি মুখে নিতে যাবে তার আগেই নিকের ধমকে থেমে যায়।
” ফ্রেশ হবে কে?
এনির মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে। ফ্রেশ না হয়ে খাওয়া শুরু করে দিচ্ছিলো। ভাবতেই শরীর ঘিন ঘিন করে উঠে। এনি বিনা বাক্যে বিছানা থেকে নেমে দাড়াতেই নিক পাজা কোলে তুলে মেয়। এনি একটুর জন্য ও অবাক হয় না। কারন প্রতিদিন এই এমন কোলে উঠার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে তার। নিক বেসিনের সামনে এনিকে দাড়া করিয়ে দেয়। পাঁচ মিনিটের ভেতরে ফ্রেশ করিয়ে আবার ও বিছানায় বসিয়ে দেয়। আদেশ করে বলে,
” দশ মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করবে।
এনি এক পলক পেয়ালার দিকে তাকায় তো আরেকবার নিকের দিকে। সামান্য হেসে বলে,
” আজ না খেলে হবে না?
নিকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। দাঁত পিষে বলে,

” যদি একটা ফ্রুটস ও বাকি থাকে তবে ট্রাস্ট মি ব্লাডরোজ সোজা সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে আসব। হাতে আর মাত্র দুই মাস সময় আছে। এমনকি তার থেকেও কম হতে পারে। কি মনে হয়, এই দুর্বলতা নিয়ে পারবে বাচ্চা জন্ম দিতে? তার থেকেও বড় কথা এই দুর্বল শরীর নিয়ে আমাকে সামলাবে কিভাবে? এখন শান্ত আছি তার মানে এইটা না যে আমি একদম জ্যান্টাল। তোমার শারীরিক অসুস্থতার কথা ভেবে দুরে আছি। কিন্তু ভেবো না আজীবনের জন্য ছাড় দিয়ে ফেলেছি। আমি সেই ছন্নছাড়া, পাষাণ গ্যাংস্টার বস এই আছি। যাকে সামলাতে তোমার হিমশিম খেতে হয়। এমনিতেই তো বাচ্চা মানুষ। তার উপরে আবার আরেক বাচ্চা নিয়ে ঘুরছো। পরিস্থিতির কথা ভেবে ছাড় দিয়েছি কিন্তু ছেড়ে দেয় নি।

এনি থতমত মুখে তাকায় নিকের দিকে। এমন ঠান্ডা আর ভয়ানক হুমকি কিভাবে দিয়ে দিলো লোকটা? পাঁচ মাসে একদম কঙ্কাল হয়ে গিয়েছিলো। এখন এই এক মাসে যথেষ্ট স্বাস্থ্য হয়েছে তার। এনি রাগে -জেদে পুরো পেয়ালা নিয়ে বসে। নিকের দিকে তাকিয়ে একটা একটা করে মুখের ভেতরে ডুকাতে থাকে। এনির এমন জেদ দেখে নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। কোনো বাক্য ব্যয় না করে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে যায়। কালো ব্লেজার আর শার্ট নিয়ে ট্রায়াল রুমে ডুকে পড়ে। বের হয়ে আসে প্রায় দশ মিনিট পড়। নিক বের হয়ে প্রথম এনির দিকে তাকায়। পেয়ালা খালি দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। নিককে এমন কালো কাপড়ে আবৃত দেখে এনি অবাক হয়ে বলে,
” আপনি ব্ল্যাক পড়েছেন কেনো?
নিক ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। হাতে ঘড়ি লাগাতে লাগাতে গম্ভীর কন্ঠে বলে,
” হ্যাভ ইউ এভার সিন মি ইন এনি কালার আদার দ্যান ব্ল্যাক?
এনি ঠোঁট উল্টিয়ে বলে,

” অন্যদিন আর আজ তো এক নয়। আজ অন্তত সবার সাথে ম্যাচিং করে হুয়াইট পড়ুন।
নিক চুলে হাত বুলালো নিজের। ঘাড়ে আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করে বলে,
” তোমার কি মনে হয় নিক জেভরান এইসব দুই একটা ফা*কিং অনুষ্ঠানে নিজের কালার পরিবর্তন করবে। আমি অন্ধকার, যার উপরে বাহিরে সব কালো। আর কালো ছাড়া আমার জীবনে কোনো রং নেই। যেদিন এই অন্ধকার দুনিয়ায় পা রেখেছি ঠিক সেদিন থেকে কালো ছাড়া জীবনে কিছু পড়িনি। আর এখন পড়ব ভাবলে মাথা থেকে সরিয়ে ফেলো।

” আমি আছি আপনার জীবনে। আর কোন রং প্রয়োজন?
নিক শীতল দৃষ্টিতে তাকায়। এনি শুকনো ঢোক গিলে। এতটা ঠান্ডা আর শীতল দৃষ্টি তো উনার নয়।
এনি চোখের পাতা নাড়ায়। কোনোরকম তর্ক করতে ইচ্ছে করছে না তার। এই মুহূর্তে নিককে খুশি করতে পারলেই সে বাহিরে যেতে পারবে। বিয়েটা অংশ নিতে পারবে। এনি ভেবেছিলো নিক কিছু একটা বলবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় নিক একটা শব্দ ও উচ্চারন করলো না। তাকে বেরিয়ে যেতে দেখে এনি খুব শান্ত গলায় বলে,
” নিক শুনো আমার কথা। আমাকে একা রেখে চলে যাবে?
নিকের পা থেমে যায়। এনির মুখে তুমি উচ্চারন শুনে গ্যাংস্টার বসের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠে। এই প্রথম এনির মুখে নিজের নামের সাথে তুমি শুনে কেমন যেন আপন লাগছে।।এতটা আপন যে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আলাদা হওয়ার ইয়াত্তা নেই। কি সাধারন একটা উচ্চারন। অথচ গ্যাংস্টার বসের শক্ত দেহটাকে কম্পিত করে ফেলেছে। নিক ঘাড় ঘুরিয়ে এনির নীল চোখ দৃষ্টি রাখে। এলোমেলো সোনালী চুল, ফোলা ফোলা গাল। এই রুপের সঙ্গা কি নিকের জানা নেই। তবে সামনে বসে থাকা মেয়েটা তাকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিচ্ছে এই মুহূর্তে। কন্ঠে খাদ নামিয়ে বলে,

” রিপিট দ্য সেনটেন্স এগেইন। আবার বলো। ফার্স্ট!
এনি পিটপিট করে তাকায়। অবুঝের মত করে বলে,
” কোন বাক্য?
নিক ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে। ঠোঁট ভিজিয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস টেনে বলে,
” একটু আগে কি বলছিলে? আবার বলো সেটা।
এনি অবুঝের মত করে ঠোঁট উল্টায়,
” কি বলছিলাম?
এনির এমন হেয়ালীতে নিকের ক্রোধ বৃদ্ধি পায়। সামনে এগিয়ে এসে গর্জে উঠে,
” শুয়রের বাচ্চা, কি বলছিলি বল। রিপিট কর আবার সেই বাক্য!
এনি আতঙ্কে জমে যায়। মজা করতে গিয়ে ঘুমন্ত সিংহকে রাগিয়ে দিলো না তো? কোনোরকম থতমত খেয়ে বলে,
” শান্ত হও। এতটা রেগে গেলে কিভাবে সামলাব বলোতো?
নিক চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টানে। কেমন উন্মাদের মত এনির কপালে -ঠোঁটে চুমু খায়। গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস টেনে বলে,

” আবার বলো বেবিগার্ল। অশান্ত মনকে শান্ত করো।
এনি কম্পমান সুরে বলে,
” আপনি সোজা হয়ে বসুন। এমন করছেন কেনো?
নিক কামড়ে দেয় এনির গলার উপরের ছোট্ট তিলটাকে। রাগ মিশিয়ে বলে,
” আপনি নয় তুমি বলতে বলেছি তোমাকে।
এনি ব্যাথায় চোখ খিঁচে ফেলে। অস্ফুর্ত আওয়াজে বলে,
” তুমি।
” আবার!
এনি নিকের গলায় হাত রেখে কানে ফিসফিস করে বলে,
” তোমাকে ছাড়া আমি সম্পূর্ণ! তুমিহীন আমি মৃতপ্রায়।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে হাসলো। এনির এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে মাতাল গলায় বলে,
” এই মুহূর্ত কতটা কন্ট্রোল্যাস হয়ে আছি যদি একবার অনুমান করতে পারতে তবে লজ্জায় মিশে যেতে বেবিগার্ল। ভাগ্য ভালো আমার সন্তান তোমার গর্ভে। নয়ত এই মুহূর্তে মারাত্নক কিছু একটা ঘটে যেত।
এনি লজ্জা ভুলে গিয়ে অবাক হয়ে বলে,

” আপনার সন্তান? সন্তান মেনে নিয়েছেন? কাছে টেনে নিবেন?
এনি ইচ্ছে করেই প্রশ্নটা করেছে। নিকের চোখ-মুখ গম্ভীর হয়ে উঠে। মুহূর্তে এমন পরিবর্তন দেখে এনি তপ্ত শ্বাস ফেলে। গিরগিটিও এত দ্রুত রং বদলায় না। নিক কঠিন গলায় আদেশ দিয়ে বলে,
” ঘুমিয়ে পড়ো। একটু পর ফিরে আসছি আমি।
এনি নিকের হাত ধরে মিনমিন গলায় বলে,
” আমিও যাব আপনার সাথে।
নিকের ভ্রুঁ কুচকে আসে,
” কোথায় যাবে তুমি?
” অধিরাজ ভাইয়ার বিয়েতে।
নিকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। এনির হাত ছাড়িয়ে দাঁত পিষে বলে,
” কমনসেন্স কেমন তোমার? এই অসুস্থ অবস্থায় তোমাকে নিয়ে লোকের ভীরে নিয়ে যাব?
এনি নিকের দুই হাত ধরে বাচ্চাদের মত করে ঠোঁট উল্টায়,

” এত ভালোবেসে তুমি করে ডাকলাম। আর সামান্য আবদার পুরন করতে পারছেন না। আপনি তো বলেন , যা চাইব তা পদতলে এনে দিবেন। আমি তো আর পর পুরুষের সাথে যেতে চাচ্ছি না। আপনার সাথে যাব, আপনার পিছন পিছন থাকব। ওদের আনন্দের মুহূর্তের সাক্ষী হতে চাই যাস্ট। প্লিজ নিয়ে চলুন না।
এনি কেমন আবেগী হয়ে উঠে। কিন্তু এই আবেগ নিকের হৃদয় ছুঁতে পারে না। বিরক্ত হয়ে বলে,
” আর কত জ্বালাবে আমাকে? এমনিতেই তো জ্বালিয়ে -পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দিচ্ছো। সাদা গাউন রাখা আছে ট্রায়াল রুমে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আসবে। ভুলেও মুখের মধ্যে কিছুর আস্তরন লাগাবে না।
এনির কান দুইটা যেন তব্দা লেগে যায়। এমন আশ্চর্য জনক, অবিশ্বাসী কথায় সে আহাম্মকের মত তাকিয়ে থাকে নিকের দিকে। নিকের কথাগুলো এনির কানে পৌঁছানোর পর তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু একসাথে বিদ্রোহ করে বসে। তবুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডের স্পন্দন একদম থেমে গেছে। এক অসহ্য ভালো লাগা তার ফুসফুস চেপে ধরল। শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাসটুকুও এই ঘর থেকে যেন উধাও হয়ে গেছে।
এনিকে এমন মূর্তির মত দাড়িয়ে থাকতে দেখে নিক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,

” পাঁচ মিনিট শেষ হয়ে গেলে আমি চলে যাব। এইভাবে তাকিয়ে থাকবে নাকি রেডি হয়ে আসবে।
এনি খুশিতে পারছে না নিককে জড়িয়ে ধরতে।।প্রথমবারের মত গ্যাংস্টার বস তাকে বাহিরে নিয়ে যাচ্ছে। যে লোক সামান্য বাতাসকে নিজেও জেলাসিতে ফেটে পড়ে সে একটা বিয়ের পার্টিতে নিয়ে যাচ্ছে। এনির বিশ্বাস হচ্ছে না কিছু। কেমন যেন সব কিছু সপ্নের মত লাগছে।।অতিরিক্ত খুশিতে কিছু বলতে পারছে না সে। বিছানা থেকে নেমে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে দৌঁড় দেয়। এনির এমন দৌঁড় দেখে নিক কিছুক্ষনের মত আৎকে উঠে। এনি কোনোরকম গাউন-হিজাব পড়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। মাথায় একটা সাদা হিজাব। নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে তাকিয়ে থাকে। নিশ্বাস থমকে যায় তার। গাউনটি ছিল ধবধবে সাদা। মনে হচ্ছে ভোরের কুয়াশায় মোড়া কোনো স্বপ্ন। এর উপরিভাগ ছিল সূক্ষ্ম লিনেন আর নেট-এর কারুকাজে ঠাসা।যেখানে রুপোলি সুতোর ছোট ছোট ফুলগুলো তারার মতো জ্বলজ্বল করছিল। কোমরের নিচ থেকে গাউনটি এক বিশাল ঘের নিয়ে মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে।হাতে মুক্তার কারুকাজ করা। নিকের অন্ধকার ছায়ার পাশে এনি যেন এক পশলা উজ্জ্বল রোদ্র।বর্তমানটা ছিল এক হৃদয়হীন দানবের সামনে তার ব্যাক্তিগত নারীর এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত। এনি যেন সাদা মেঘের ভেলায় চড়ে নিকের পাথুরে হৃদয়ে প্রেমের বৃষ্টি নামাতে এসেছে।
এনি নিকের কাছে এসে হাসি দিয়ে বলে,

” কবে এনেছেন এইটা? কখনো দেখে নিতো।
নিক চোখ বন্ধ করে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে। এসির মধ্যে দাড়িয়ে থেকেও ঘেমে যাচ্ছে। এনির দিকে না তাকিয়েই বলে,
” একটু দাঁড়াও। আমি আসছি।
কথাটা বলে আর দাড়ালো না। সোজা বারান্দার ভেতরে চলে যায়। নিক চুল খামছে ধরে নিজের। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে ইঞ্জেকশনটা নিজের হাতের নরম মাংশে পুশ করে দেয়। নিক হাতের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে আবার ও ভেতরে চলে যায়। নিককে আসতে এনি ঘাবড়ে গিয়ে বলে,
” আপনাকে কেমন যেন অসুস্থ লাগছে। শরীর খারাপ লাগছে।
নিক এনির হাতে ধরে বলে,
” বুকের ভেতরে ছুঁরি ডুকিয়ে জিজ্ঞাসা করছো ব্যাথা পেয়েছি কি-না!
এনি নিকের সাথে পা মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। অবাক হয়ে বলে,
” আমি কখন ছুঁরি ডুকালাম?

নিক কোনো উত্তর দিলো না। মেইন করিডর পেরিয়ে বাহিরের আঙ্গিনায় প্রবেশ করে। অনেক মাস পরে বাহিরের জগতে এসে এনির শরীর শিরশির করে উঠে। চোখ- বন্ধ করে মিষ্টি বাতাস গ্রহন করে। ইশশ! কতদিন পর সে দুনিয়ার আলো দেখতে পাচ্ছে। সামনে তাকাতেই এনির চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠে। এত সুন্দর করে সাজিয়েছে যেন কোনো রুপকথার জগতে চলে এসেছে সে। চারপাশে সাদা। ফুল থেকে শুরু করে প্রতিটা লোকের ড্রেস। এনি নাক ছিটকে বলে,
” আপনি বাদে সবাই সাদা।।
নিক গম্ভীর গলায় বলে,
” কারন আমি সবার থেকে আলাদা।
এনি খুশির কারনে এত কিছু ভাবছে না। তবে একটা জিনিস লক্ষ্য করছে, তার দিকে কেউ তাকাচ্ছে না। গার্ডদের দৃষ্টি নত হয়ে আছে। আর আশে -পাশের লোকেরা ও নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে আছে। এনি কিছুটা অবাক হয়ে বলে,
” আমাকে কি বেশি বিশ্রি লাগছে? আমার দিকে কেউ তাকাচ্ছে না কেনো?
নিকের চোখ দুইটা আগ্নেয়গিরি মত জ্বলে উঠে। নিকের চোখের দিকে তাকাতেই এনি আতকে উঠে আবার ও। খুশির কারনে মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে। ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” আ.. আমি সেভাবে বলিনি। আপনি ছাড়া আর কে তাকাবে আমার দিকে বলুন। আমি পুরোটা এইতো আপনার। সবাই এমন মুখ ফিরিয়ে রেখেছে তাই জিজ্ঞাসা করেছি।
নিক এনির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। তার পাশেই বসে বলে,
” কারন তারা জানে তোমার দিকে তাকালে তাদের চোখ থাকবে না, কলিজা থাকবে না, শরীরের মাংস পিন্ড থাকবে না।

এনি শুকনো ঢোক গিলে। খশিতে ভুলে গিয়েছিলো লোকটার আসল রুপ। বর্তমানে যতটা শান্ত দেখাচ্ছে লোকটা ততটা শান্ত নয়। পুরনো কথা মনে হতেই শরীরে কাটা দিয়ে উঠে তার।
এনি সামনে তাকাতেই দেখতে নাজলী আর আরিশ এগিয়ে আসছে। দুইজনেই সাদা রং এ আবৃত। বোনের চোখের সাথে চোখ পড়তেই মুচকি হাসে এনি। নাজলী হেসে চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করে।
বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে অধিরাজ। পরনে তার হুয়াইট ফিটেড ট্যাক্সিডো।চুলে কিছুটা অগোছালো ভাব। তার দৃষ্টি দরজার দিকে স্থির। অস্থিরতায় ভেঙ্গে যাচ্ছে তার পরুষনালী শক্ত মন। কিন্তু ঠোঁটে আছে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। যেন এক দীর্ঘ যুদ্ধের পর সে আজ নিজের সবচেয়ে বড় পুরস্কারটা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। কত অপেক্ষা করিয়েছে মেয়েটাকে। তবুও মেয়েটা শান্তভাবে সব কিছু মুখ বুঝে সহ্য করে নিয়েছে। সামান্য অভিযোগ করলেও সেটা তার বুকে এসে করেছে। এই বুঝদার মেয়েটার সাথে তার জীবন আজীবনের জন্য জুড়ে যাবে। যেখানে কোনো বাঁধা -বিপদ কিছু থাকবে না।

অধিরাজের ভাবনার মাঝেই হঠাৎ চার্চের অর্গানে ‘ওয়েডিং মার্চ’ বেজে ওঠে। চার্চের বিশাল ভারী দরজা দুটো ধীরে ধীরে দুই দিকে খুলে যায়। বাইরের উজ্জ্বল আলো চার্চের ভেতরের অন্ধকারকে চিরে দেয়। আর সেই আলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে তানভী।
নিক একইভাবে ফোনের দিকে তাকিয়ে মোবাইল স্ক্রল করছে। এই চারপাশের কোনো খবর নেই তার কিছে। কিন্তু এনির চঞ্চল মন খুশিতে আত্নহারা। এই প্রথম সে খ্রিষ্টান রিতীর বিয়ে দেখছে। আর এত সুন্দর বিয়ের অনুষ্ঠান আগে কখনো দেখে নি। সাদা গাউনে তানভীকে যেন কোনো অপ্সরী লাগছে। ইচ্ছে করছিলো উঠে তানভী-র কাছে যেতে। কিন্তু পাশে জল্লাদ বসিয়ে রেখে যাওয়া বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়।

সাদা সিল্ক আর লেসের তৈরি একটি লং ট্রেইল গাউনে তানভীকে দেখাচ্ছে ঠিক কোনো রহস্যময়ী জগতের পরীর মতো। তার হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ।যেটি এই শুভ্রতার মাঝে তার তীব্র ভালোবাসার প্রতীক। তার মুখ ঘোমটায় ঢাকা থাকলেও তার চোখের উজ্জ্বলতা কাপড় ভেদ করে ঠিকই ধরা পড়ছে।
​তানভীর বাবা বেঁচে নেই। নিজের পালিত মামার হাত ধরে ধীর পায়ে কার্পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে আসতে শুরু করে। উপস্থিত সবার চোখে খুশির ঝিলিক। কিন্তু তানবীর পুরো পৃথিবী তখন ওই বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। যত এগিয়ে যাচ্ছে তত তার হৃদস্পন্দন দ্রুত গতিতে লাফাচ্ছে। লজ্জা আর ভয়ে আষ্টেপৃষ্টে ধরেছে মেয়েটাকে। এমনিতেই মেয়েটা প্রয়োজনের বেশি লজ্জা পায়। তার উপর অধিরাজ তার স্বামী হবে ভাবতেই লজ্জায় কুকড়ে যাচ্ছে। সবাই নিশ্চই তার দিকে তাকিয়ে আছে। তানভী এইটা ভাবতে গেলে আরও অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

তানবী এগোচ্ছে ধীরে ধীরে । সাদা শুভ্র গাউনের দীর্ঘ ট্রেইলটা কার্পেটের ওপর দিয়ে ঘেষে যাচ্ছে। তানবীর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল এক একটি দীর্ঘশ্বাসের সমাপ্তি। তার হাতের লাল গোলাপগুলো শুভ্রতার মাঝে এক ফোঁটা তাজা রক্তের মতো তীব্র দেখাচ্ছিল। দাঁড়িয়ে থাকা অধিরাজ ঠোঁট চেপে ধরলো নিজের। প্রথা অনুযায়ী তার স্থির থাকার কথা থাকলেও, তার ভেতরের সেই আদিম ও উন্মাদ প্রেমিক আজ শৃঙ্খল ভাঙতে মরিয়া। মাঝামাঝি আসতেই সে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে দুই ধাপ এগিয়ে যায় তানভীর দিকে। অধিরাজের এমন তাড়াহুড়া দেখে ফাদার অবাক হলেও সবাই ঠোঁট টিপে হাসছে। তানভী আরও লজ্জায় নুইয়ে পড়ে। তানভীর মামা হেসে অধিরাজের হাতের উপর তানভীর হাতটা রাখে।।অধিরাজ মুচকি হেসে আকড়ে ধরে প্রিয়তমার হাত। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
” কেমন অনুভুতি হচ্ছে তানভী এলেনা? আজ রাতটা যে খুব ভয়ানক হবে তোমার জন্য। ​আজকের পর পালানোর সব রাস্তা আমি সিলগালা করে দিয়েছি তানভী। ঈশ্বরও আজ আমাদের সাক্ষী, তুমি এখন থেকে আমার, একান্তই আমার।
তানভী শক্ত করে খামছে ধরলো নিজের সাদা গাউন। তানভীর কাঁপা অস্তিত্ব অনুভব করতেই অধিরাজ মৃদু হাসে। অধিরাজকে এমন ফিসফিস করতে দেখে আরিশ পিছন থেকে মৃদু আওয়াজে বলে,

” পুরো রাত সময় পাবি। এখন অন্তত বিয়েটা করে নে ধৈর্য ধরে। আর কত বসে থাকব একই জায়গায়।
অধিরাজ তানভীর দিকে তাকিয়েই বলে,
” কি করব স্যার। আর তো সহ্য হচ্ছে না। আমাকে রেখে তো অনেক কিছুই করে ফেলেছেন। বাকি রয়ে গেলাম শুধু আমি।
তানভীর হয়ত আজ লজ্জা পাওয়ার দিন। তানভী খুঁচা মারে অধিরাজের বুকে। অধিরাজ হালকা হেসে তানভীর হাতটা ধরে ফাদারের সামনে যায়। পাদ্রি সাহেব পবিত্র বাইবেল থেকে প্রেম এবং বিয়ের গুরুত্ব নিয়ে কিছু অংশ পাঠ করেন। এখানে তিনি নবদম্পতির উদ্দেশে ছোট একটি বক্তব্য রাখেন। যেখানে একে অপরের প্রতি উৎসর্গীকৃত থাকার কথা বলা হয়।
বিয়ের সব থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এইটা। এ উন্মাদ প্রেমিকের মতো অধিরাজ তানবীর চোখের দিকে তাকায়। তার দু হাত নিজের হাতের ভেতরে আবদ্ধ করে বলে,
​”আমি, অধিরাজ, তোমাকে (তানবী) আমার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করছি। আজ থেকে সুখে-দুঃখে, সম্পদে-বিপদে, অসুস্থতায় কিংবা সুস্থতায়, যতদিন মৃত্যু আমাদের আলাদা না করছে, আমি তোমাকে ভালোবাসব এবং সম্মান করব।
তানভীর গলায় কথা আটকে আসছে। শরীর কাঁপছে রমণীর। হয়ত রমণী কেঁদে ভাসাচ্ছে। অধিরাজের হাতটা শক্ত করে ধরে নিশ্বাস টেনে বলে,

” আমি তানভী এলেনা তোমাকে আমার স্বামী হিসেবে গ্রহণ করছি। আজ থেকে সুখে-দুঃখে, সম্পদে-বিপদে, অসুস্থতায় কিংবা সুস্থতায়,যতদিন মৃত্যু আমাদের আলাদা না করছে, আমি তোমাকে ভালোবাসব এবং সম্মান করব।
প্রতিশ্রুতি শেষ হতেই চারদিকে তালি বেজে উঠে। পাদ্রী আংটি পবিত্র করলে নাজলী হেসে আংটি এগিয়ে দেয়। অপেক্ষা না করে দুইজন দুইজনকে পড়িয়ে দেয় শান্তভাবে। এইটা এক অনন্ত ভালোবাসার প্রতীক। কারণ বৃত্তের কোনো শুরু বা শেষ নেই।
এনি গালে হাত দিয়ে বলে,
” ফার্স্ট টাইম খ্রিষ্টান রিতীর বিয়ে দেখছি। আমাদের বিয়েটা ও যদি এমন হত! ঠিক যেমন চারপাশে ফুলের সুভাস, লোকজন, আনন্দ।।পুরো দেশ আমাদের বিয়ে দেখতে পারত! দেখুন কত সুন্দর মানিয়েছে দুজনকে।
নিক এইবার ফোন থেকে মুখ তুলে তাকায়। এনির মুখের দিকে তাকিয়ে কপাল কুচকায়,

” এইভাবে বিয়ে করার ইচ্ছে?
এনি মাথা নাড়িয়ে বলে,
” বিয়ে নিয়ে ইচ্ছে কার থাকে না বলুন।
” পুরো শহরকে জানাতে চাও?
এনি চোখ বড় বড় করে নিকের দিকে তাকায়। নিক সামনের দিকে তাকিয়ে বলে,
” আন্সার মি!
কথার মধ্যে মৃদু ধমক ছিলো। এনি ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” এইসব ইচ্ছে পূষণ করি না। জানি এমন কোনো কালে এই সম্ভব নয়।
নিক কিছু বললো না। শুধু ঠোঁট কামড়ে হাসে।
সামনের পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে সতর্কতা দিয়ে বলে,
” এখন তারা চুম্বন করবে। যদি তাকিয়ে থাকতে চাও তবে তাকিয়ে থাকতে পারো।
এনি হা করে তাকায় নিকের দিকে। এতগুলো মানুষের সামনে চুমু খাবে মানে? এনি ভাবনার মধ্যে আবার ও সামনে তাকায়।
পাদ্রি সাহেব দুইজনের উদ্দেশ্যে বলে,
“সৃষ্টিকর্তা যাদের একত্রিত করেছেন, মানুষ যেন তাদের আলাদা না করে। আমি তোমাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করছি।”
কথাটা শেষ করার সাথে সাথে এলো সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। বলা হয়েছে বর তার কনেকে চুম্বন করতে পারেন।
অধিরাজ এক মুহূর্ত দেরী করলো না। তানভী-র ঘোমটা তুলে কোমরে হাত রেখে নিজের কাছে নিয়ে আসে। সে ভালো করে জানে তানভী লজ্জাবতী। সবার সামনে এমনটা করলে মেয়েট লজ্জায় মরে যাবে। তার পরও অধিরাজ অপেক্ষা করলো না। গোলাপী অধরে নিজের অধর ডুবিয়ে দেয়।
নাজলী চোখ ঘুরিয়ে অন্য পাশে তাকিয়ে যায়। এনি এখনও হা করে তাকিয়ে আছে। অস্ফুর্ত স্বরে উচ্চারন করে,

” নাউযুবিল্লাহ!
নিক ঠোঁট কামড়ালো নিজের। কেমন অদ্ভুত গলায় বলে,
” ওরা স্বামী- স্ত্রী। সম্পূর্ণ অধিকার আছে।
এনি থমকে যায় এই গলা সুর শুনে। লোকটার স্বর এমন শুনাচ্ছে কেনো? এই স্বর এনি খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারে। ভয়ে ভয়ে পাশে তাকাতেই গলা শুকিয়ে আসে। নিকের ধূসর চোখ দুইটার মধ্যে এক উন্মাদ মাদকতা। এনি কিছু বলার জন্য মুখ খুলার ও সময় পেলো না। তার আগেই নিক তার ঘাড় চেপে ধরে নিজের সম্মুখে এনি অধরে অধর মিলিয়ে দেয়। নিকের চোখ বন্ধ থাকলে ও এনির চোখ বড় বড় হয়ে যায়। এই কোন বেহায়া জায়গায় এসে পড়লো সে। চারদিকে এত এত মানুষের ভীরে কিসব কাজ! নাজলীর কথা মনে হতেই এনি ছটফটিয়ে উঠে। নিক চেপে ধরে এনির দুই হাত। নিকের স্পর্শ কোনো কালেই কোমল ছিলো না। সব সময় স্পর্শে একটা হিংস্রতা ভাব থাকে। এনি লজ্জায় কেঁদে দিবে ভাব। ঠোঁট সামান্য আলগা হয়ে আসতেই এনি কোনোরকম বলে,

” কি করছেন অসভ্যের মত? সবাই দেখছে।
নিক এনির গালে নাক ঘেষে বলে,
” দেখলে দেখুক। পর নারীকে চুমু খায় নি। নিজের বউকে খেয়েছি।
নাজলী পড়েছে মহা বিপদে। এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছোট বোনের কাহিনী ও দেখতে হচ্ছে। চোখ নামিয়ে উল্টো পথে হাটা ধরে। আরিশ ডেকে বলে,
” চলে যাচ্ছো কেনো?
নাজলী চোয়াল চেপে ধরে বলে,
” থাকুন আপনারা। এইসব জায়গা আমার জন্য নয়।
আরিশ কপাল কুচকে বলে,
” আশ্চর্য মিসেস আরিশ ইলহাম। ওদের যেমন স্বামী আছে ঠিক তেমন আপনার ও আছে। তবে নিজেকে এমন অসহায় ফিল করছেন কেনো? একবার কাছে আসুন ওদের থেকে ডাবল দিব।
নাজলী লজ্জায় শিরশির করে উঠে। পশ্চিমা কালচারে সব গুলো এমন নির্লজ্জ হয়ে উঠেছে। ঠোঁট ভিজিয়ে চোখ রাঙ্গিয়ে বলে,

” খবরদার এতগুলো মানুষের সামনে যদি সামান্য বেহায়া আচরন করেছেন তবে আপনার ঠোঁট কেঁটে ডাস্টবিনে ফেলে আসব। নির্লজ্জ লোক!
আরিশ ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” তোমার লজ্জা করে নি ছোট বোনের রোমান্স দেখতে? আর স্বামী কাছে এলেই হুমকি দিচ্ছো? রানী এলিজাবেথ এর থেকেও বেশি নির্ধয় তুমি নাজলী।
নাজলীর চোয়াল ঝুলে আসে। পর পর দাঁত পিষে বলে,
” এমন মিথ্যে অপবাদ কেনো দিচ্ছেন? কখন ওদের দিকে তাকিয়েছি আমি? চোখ গেলেও সরিয়ে ফেলেছি সাথে সাথে।
” একটু তো দেখেছো, এতেই চলবে। কিন্তু আমি অধিরাজ আর নিকের পুরো সিনারি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছি। এখন আমার ও খুব প্রেম – প্রেম পাচ্ছে। চলো না জঙ্গলের ওইপাশ থেকে একটু ঘুরে আসি।
নাজলীর কান দুইটা গরম হয়ে উঠে। মাথা ভঁন -ভঁন করে উঠে এমন লাগামহীন কথায়। জঙ্গল, লাইক সিরিয়াসলি! নাজলী লজ্জা আর অস্বস্তিতে কোনো উত্তর দিলো না। আরিশের দিকে চোখ রাঙ্গিয়ে তাকায়। এরপর বড় বড় পা ফেলে অন্য দিকে চলে যায়। আরিশ নাজলীক শুনিয়ে শুনিয়ে বলে,

” জঙ্গল মে আজ মঙ্গল করুঙ্গি
ভূখে শেরোঁ সে খেলুঙ্গি মেঁই
মাখন জাইসি হাতেলি পে
জলতে অঙ্গারে লে লুঙ্গি মেঁই
হায়, গেহরে পানি কি মাছলি হুঁ রাজা।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৫

নাজলী না পেরে কান চেপে ধরে নিজের। এমন রাগী- গম্ভীর লোকটা এতটা বেশরম হয়ে গেলো কিভাবে?
নাজলী দ্রুত পা চাওয়ায়। এখান থেকে চলে যাওয়া উত্তম এই মুহূর্তে। বলা যায় কখনো তার উপর আক্রমন শুরু হয়ে যায়। নাজলীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আরিশ শব্দ করে হাসে। তবে পর মুহূর্তেই মুখে গম্ভীরতা ফুটিয়ে তুলা। তার হাসা বারন!

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৬