Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪১

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪১

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪১
Fatima Fariyal

মীর হাউজের হলঘরটা সকাল সকাল একরকম অদ্ভুত চাপা নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। আহাদ রাজার এই বিস্ফারণের কারনে সবার মনেই কিছুটা অস্বস্তিকর শূন্যতা। হালিমা বেগমের কাছ থেকে সবকিছু শোনার পর সবাই একরকম বাকারুদ্ধ হয়ে গেছে। কেউ তো কখনো ভাবেই নাই এমনও কিছু হতে পারে। আফরোজা শেখ নিজের নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে আছেন একরকম নিস্তব্ধ হয়ে। পাশেই আমজাদ মীর আর আসফাক মীর। হালিমা বেগম তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। রিদিতা সিঁড়ির রেলিং ধরে শেষ সিঁড়ির ধাপে বসে তাকিয়ে আছেন সামনের শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যপটের দিকে। আদনান মেঝেতে আফরোজা শেখের পায়ের কাছে বসে আছে। সামান্য নাক টেনে ফুপিয়ে উঠল। আফরোজা শেখ কতবার করে বললেন উঠতে। কিন্তু আদনান যেন আজ জেদ ধরে বসে আছে জেদি বাচ্চাদের মতো। তার চোখ জোড়া লাল রক্তিমাভা হয়ে আছে। কন্ঠ ভঙ্গুরতা,

“আমায় আহিকে দিয়ে দেন না ছোট আম্মা! আমি কথা দিচ্ছি, আর কখনো কোন কিছুর আবদার করবো না। কখনো না! আমার শুধু ওকে চাই। আপনি বলতেন না, আমার যদি কাউকে পছন্দ থাকে তাহলে যেন বলি, আজ আমি বলছি ছোট আম্মা। আহিকে আমি শুধুু পছন্দ করি না আমি ওকে ভালোবাসি বরং পছন্দের মাত্রা তো পেরিয়ে গেছে বহু আগেই। আমি আপনার মেয়ে আহিয়া রোজা মীরকে চাই। আমাকে দিয়ে দেন না!”
আদনানের বলা প্রতেকটা কথায় উপস্থিতি সবাই হতবাক, হতভম্ব। যে আদনান মুখ ফুটিয়ে এক কাপ কফি চাইতেও দু’বার ভাবতো সে কিনা আজ নির্দ্বিধায় আহিয়াকে চাইছে?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আফরোজা শেখ আজ স্পষ্ট বুঝতে পারলেন আদনান সবসময় বিয়ে নিয়ে এমন হেয়ালি কেন করত। কেন কোন মেয়েকে পছন্দ করত না! আদনান তাকে ইনিয়ে বিনিয়ে বহুবার এটাই বোঝাতে চেয়েছে। অথচ বিচক্ষণ আফরোজা শেখ এটা বুঝলেন না! যে আফরোজা শেখ চোখের পলকে অপরাধীদের নাড়ি-নক্ষত্র ধরে ফেলেন সে কিনা আজ নিজেদের দুই ছেলেকেই বুঝতে পারলেন না! আসফাক মীর এসে আদনান কে টেনে উঠাতে চাইলেন,
“তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে আদনান। উঠে আয়। এতোদিন তো মুখে ঠুলি পরে ছিলি। আর এখন পায়ে পরছিস কেন?”

আদনান মাথা নাড়লো, “না না। যতক্ষণ পর্যন্ত ছোট আম্মা রাজি না হবে আমি উঠবো না চাচু।”
আফরোজা শেখের শিরা-উপশিরা শক্ত হয়ে উঠল। সে শুধু চুপচাপ শুনছেন তার কিছু বলার মত আপাতত ভাষা নেই। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এটাই আদনানকে আরো মরিয়া করে তুলল। সে একরকম হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল আমজাদ মীরের কাছে। দুই হাত ধরে আর্তি জানাল,
“ছোট আব্বু, আপনি কিছু বলেন না! বলেন না আমায় আহিকে দিয়ে দিবেন। আপনারা সবাই এমন বোবার মত বসে আছেন কেন? আমার ভিতরটা যে পুড়ে যাচ্ছে সেটার মর্মর শব্দ কি পাচ্ছেন না? আপনারা যদি এবার কিছু না বলেন, আমি সত্যিই শেষ হয়ে যাবো।”

আমজাদ মীরের চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে এলো। নিজের ভাইয়ের একমাত্র আদরের সন্তান তার পা ধরে তার মেয়েকে চাইছে। এই দৃশ্য যদি তার ভাই দেখতো তাহলে কিভাবে সহ্য করতো। আজাদম মীর ভাবেন এটা কি এমন বড় চাওয়া! অথচ আদনানের চাওয়ার মধ্যে যে ব্যাকুলতা তা সবাইকে রিতিমত স্থম্ভিত করেছে। আদনানকে টেনে তুললেন আমজাদ মীর। নিজের পাশে বসিয়ে গম্ভীর কন্ঠে একটাই প্রশ্ন করলেন,
“তুমি এতদিন ধরে আহিয়াকে ভালোবাসো বলোনি কেন?”
আদনান মাথা নিচু করে আবারও সামান্য নাক টানলো। ফিসফিস করে বলল,
“ভয়ে… হারিয়ে ফেলার ভয়ে। যদি আপনারা মেনে না নেন। যদি আহিকে…”
“আহিয়া!”

রিদিতার বিস্ময়কর কন্ঠস্বরে আদনানের কথা বন্ধ হয়ে গেলো। সবাই একসাথে ঘুরে তাকালো রিদিতার দিকে অতঃপর তার দৃষ্টি অনুসরন করতেই দেখল আহিয়া উপরের করিডোরে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নিচের এই শ্বাসরুদ্ধ কর দৃশ্য দেখে তার বুকের পাঁজর টনটন করে উঠল। দৃষ্টি মিলল আদনানের রক্তবর্ণ চোখের সাথে। কয়েক সেকেন্ড আটকে রইল তাদের দৃষ্টি। অতঃপর আহিয়া তাকালো বাকি সবার দিকে। এখানে সবাই তার আপনজন অথচ এই মূহুর্তে সবাইকে অচেনা লাগছে, সবাইকে! তার শীতল অশ্রু টপটপ করে পড়ছে। ঠোঁট চেপে ধরে এক দৌঁড়ে সেখান থেকে চলে গেলো। আদনানও পা বাড়ালা কিন্তু তার আগেই রিদিতা ছুটে গেলো আহিয়ার পিছু। তাই আদনান নিজেকে সংযত করল। কারন এই মূহুর্তে আহিয়াকে একমাত্র রিদিতাই সামলতে পারবে। আর তাদের একটু একা থাকতে দেয়া প্রয়োজন।

আহিয়া এক দৌড়ে নিজের রুমে এসে বিছানায় ধপ করে পরলো। বালিশে মুখগুজে জর্জিত হয়ে কাঁদতে লাগল। তার ভীষন কষ্ট হচ্ছে ভীষন! আদনানের এমন রুপ সে কখনো দেখেনি। আদনান তাকে এতটা ভালোবাসে, এতটা তীব্র ভাবে চাইতে পারে আহিয়ার কল্পনায় ছিল না। আদনানের বলা প্রতেকটা হুটহাট কথাগুলোর মানে এখন আহিয়া বুঝতে পারছে। বেশ বুঝতে পারছে!

রিদিতা এসে এক মূহুর্তের জন্য নিস্তেজ হয়ে গেলো। সে কি বলে আহিয়াকে শান্তনা দেবে। সে যে নিজেই এখন পর্যন্ত শান্ত হতে পারেনি। আহিয়ার কান্নার রেশ শুনে রিদির চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। একবার পলক ফেললেই টুপ করে পরবে তার অবাধ্য অশ্রুর দ্বারা। সে কোনভাবে সামলে আহিয়ার পাশে গিয়ে বসল। কাঁধে হাত রাখতেই আহিয়া হুট করে রিদিতাকে শক্তকরে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল। তার কান্নর তোড়ে রিদির শরীরও কেঁপে কেঁপে উঠছে। সে আহিয়াকে শান্ত করতে চাইল।

“আহিয়া প্লিজ শান্ত হ। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। তুই এভাবে কেন কাঁদছিস? হু!”
কিন্তু আহিয়ার কান্নার তোড় আরও তীব্র হয়ে উঠল। সে কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা স্বরে বলতে লাগল,
“আদনান ভাই আমায় এতদিন কেন বলল না রিদি! কেন বলল না উনি আমাকে ভালোবাসে? কেন বলল না, আমার তোকেই লাগবে আহি! আমি কি উনিকে ফিরিয়ে দিতাম? না তো! তাহলে কেন শুধু শুধু আমায় কষ্ট দিল। আর কেনই বা নিজে এতটা কষ্ট বহন করল।”

রিদিতা একটু নরবতার পর বলল, “এখন তো সবাই সবটা জেনেই গেছে তাইনা? এখন তো আর তোদের কষ্ট পেতে হবে না। ভিতরে ভিতরে ভারী বোঝা বহন করতে হবে না। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে দেখবি।”
আহিয়াকে শান্তনা দিলেও রিদির নিজের ভিতরে ঝর বইছে। অনেক বড় ঝড়। আহাদ রাজার এমন আচরন তাকে ভীতু করেছে। সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এমন প্রতিক্রিয়া, সে কখনো আশাই করেনি! বিশেষ করে তার সাথে এমনটা কি করে করতে পারল? রিদিতা চোখ মুছে নিলো। নিজেকে কোনরকম সামলে আহিয়াকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দিল। আহিয়া ঢকঢক করে এক নিশ্বাষে পানিটা খেয়ে নিল। রিদিতা তার হাত দুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে কিছুটা নরম সুরে বলল,

“তুইও আদনান ভাইকে ভালোবাসিস তাইনা? কিন্তু তোর ধারনা নেই আহি! আদনান ভাই তোকে কতটা তীব্রভাব ভালোবাসে। তোকে ভিক্ষুকের মত করে চাইছে। তুই যদি সেই আর্তি শুনতি তাহলে তুই ঠিক থাকতে পারতি না। কিছুতেই ঠিক থাকতে পারতি না!”
আহিয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হলো, হৃৎপিণ্ডের সবটুকু ব্যথা উঠে এসে গলায় আটকে গেছে। কতকিছু, কত ঘটনা তার মাথার মধ্যে শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ তার বোধদয় হলো, সে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে হাসফাস করে বলল,

“তুই.. তুই ভাইয়াকে এসব বলছিস? আদনান ভাইকে নিয়ে, আমাদের সম্পর্কে নিয়ে কথা বলেছিস?”
রিদিতা মৃদু মাথা দোলাল। আহিয়া একটু অসহায়ের মতো করে বলে উঠল,
“কেন বলতে গেলি? কেন আমাদের জন্য নিজেদের সম্পর্ক ঝুঁকিতে ফেলতে গেলি? তোর ভাইয়ার রাগ সম্পর্কে ধারনা নেই রিদি। শুধুু শুধু কতকিছু ঘটে গেলো!”
“শুধুু শুধু না আহিয়া। এসব বলার প্রয়োজন ছিল। তোর ভাইয়ের জেদ, রাগের জন্য তোদের জীবন কেন নষ্ট হবে! সবকিছু তো আর উনির মন মতো চলতে পারে না তাই না?

যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। এখন অত্যন্ত সবাই জেনে গেছে।”
আহিয়া কিছুক্ষণ চুপ রইল। একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। রিদির চোখ দেখলে বোঝা যায় রিদি কতটা দুঃখ পেয়েছে!সে নাক টেনে জানালার দিকে তাকাল। নিজের বুকের মধ্যে চাপা প্রশ্নটা বেরিয়ে এলো নিঃশব্দে,
“ভালোবাসার যন্ত্রণা এতটা তীব্র কেন হয়?”

পুরো দিনটা রিদিতার কেটেছে অন্তহীন অস্থিরতায়। তার ভেতরটা যেন উল্টোপাল্টা ঢেউ খেলছে। পরিবারের সবাই আদনান আর আহিয়ার সম্পর্কটা মেনে নিয়েছে। শুধু মাত্র আহাদ রাজা ছাড়া। আজকে সারাদিনে একটিবারের জন্যও আহাদ রাজার দেখা মেলেনি। তার কোমল হৃদয়টা বড্ড বেশি বেসামাল হয়ে যাচ্ছে। সামালানো দুষ্কর!
সে কয়েকবার ঘর থেকে বারান্দা, বারান্দা থেকে ঘর পায়চারি করতে করতে অবশেষে সোফায় এসে বসল। পিছনে মাথাটা হেলিয়ে দিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকাতেই অজান্তে একটা ভাবনা মাথায় আসলো। সে যখন আহাদ রাজাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আহিয়ার ভালোবাসা মেনে নিবে কিনা? তখন সে সরাসরি উত্তর দিয়েছে, আদনান না হলে অবশ্যই মেনে নিব!

তবে কি আহাদ রাজা আগে থেকেই জানতো। আহিয়া আর আদনান গোপনে গোপনে একে অপরের জন্য অনূভতি বহন করছে! আর যদি জেনেই থাকে তাহলে এতদিন কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না কেন? এমনই হাজার হাজার প্রশ্ন ঘুড়ছে রিদিতার মন আর দিমাগে। একসময় এই চিন্তার ঢেউ তার চোখ ভারী করে দিল। ভাবতে ভাবতে তার চোখ লেগে আসে। নিশ্বাষ ভারী।
রাত গভীর। অর্ধপ্রহরের নিরবতা নেমেছে। মীর হাউজের মূল ফটক পেরিয়ে আহাদ রাজা বাড়িতে পা রেখেছে। ভিতরে একরাশ অনুতাপ! নিজের প্রেয়সীর সাথে রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কি কি বলেছে সে নিজেও জানেনা। এই রাগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সে কতো কিছু করল!সাইকিয়াট্রিস্ট পর্যন্ত দেখিয়েছে, থেরাপি নিয়েছে। অথচ কিছুই তাকে পুরোপুরি বদলাতে পারেনি। ফলাফল শূন্য!

সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসে। হঠাৎ করে মনে পড়ল আহিয়ার কথা। তাই দিক বদলে সে বোনের ঘরের দিকে পা বাড়াল। দরজা আধখোলা। আধো আলোর ভেতর তার চোখে পড়ল ঘুমন্ত আহিয়ার মুখ। এগিয়ে এসে তার মাথার পাশে বসল। কপালের চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে দিয়ে ভঙুর কন্ঠে বলে উঠে,
“তোর ভাই খুব খারাপ আহি… খুব খারাপ! তোকে ভালোবাসে বেশি প্রকাশ করে কম। আসলে কি বলতো? আহাদ রাজা নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করতে শিখেনি। নিজের অনূভতি কিভাবে প্রকাশ করতে হয় সেটার সঠিক নিয়ম জানেনা! এই জন্য সবাই ভাবে আহাদ রাজার হৃদয় কংক্রিটের হৃদয়, অনূভতিহীন, আবেগ তাকে ছোঁয়া না! কিন্তু সবাই এটা বুঝলো না আহাদ রাজাও একটা রক্তে মাংসে গরা মানুষ।”
সে চোখের কোনে ঝমে থাকা কিন্চিৎ অশ্রুকনা বৃদ্ধাঙ্গুলে মুছে নিল। চাদরটা তুলে দিল আহিয়ার শরীরে। মাথাটা আলতো করে বালিশে ঠিক করে শুইয়ে দিল। এতে একটু নড়ে চড়ে উঠল আহিয়া। কিন্তু তখনও আহিয়ার চোখ বন্ধ। আহাদ আবার বলতে লাগল,

“আমি একজন ব্যার্থ ভাই, ব্যার্থ সন্তান, ব্যার্থ জীবনসঙ্গী! কারোর মনের মতো হতে পারলাম না। কিন্তু বিশ্বাস কর ইচ্ছে করে করছি না! সবাই আহাদ রাজার রাগটাই দেখল কিন্তু আজ অব্ধি কেউ এটার কারন জানতে চাইল না।”
হালকা হেসে উঠল, “যাকগে সেই সব কথা! তোকে একটা কথা সবসময় বলছি আজও বলছি, তোর যা লাগবে নির্দিধায় বলবি! তোর ভাই কিডনি বিক্রি করে হলেও তোকে এনে দিবে।”
আহাদ আর বসে থাকতে পারলো না। উঠে ড্রিম লাইটটাও বন্ধ করে দিলো। দরজটা আস্তে শব্দ করে খুলে বেরিয়ে যেতেই আহিয়া ফুপিয়ে উঠল। চোখের জলে বালিশ ভিজে একাকার। এতক্ষণ ধরে সে তার ভাইয়ের সব কথাই শুনেছে কিন্তু সাহস হলো না উল্টে কিছু বলার। সে তো বলতে পারতো,

“আমার ভাই যেমনই হোক সে আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাই!”
কিন্তু পারল না এই সামান্য কথাটা বলতে।
আহাদ রাজা নিজের ঘরের সামনে এসে কিছুক্ষণ নিরব দাঁড়িয়ে রইল। অতঃপর ধীরে ভিতরে ঢুকে চারদিকে একবার চোখ বুলাতেই ম্লান আলোয় দেখতে পেলো তার প্রেয়সী সোফায় ঘুমিয়ে আছে। একটু এলোমেলো, হয়তো অনিচ্ছায় চোখ লেগে এসেছে! সে বেশ বুঝতে পারলো তার অপেক্ষায়ই ছিল। সে ধীরে পায়ে এসে তার সামনে হাটুমুড়ে বসল। পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই মাধূর্যতার আবিরে মাখা মুখটার দিকে। একটা ভারী নিশ্বাস ফেলে নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল প্রেয়সীর কোমল হাত দুটো। নিঃশব্দে দুটো চুমো খেল সেই উষ্ণ হাতের তালুতে। এরপর তার কানের পাশের চুলগুলো গুজে দিল। যেহেতু আকাশ মেঘলা, একটু ঠাণ্ডা বাতাসও আছে তাই রিদি ঠাণ্ডায় সামান্য কুঁকড়ে গেলো। সে দ্রুত বিছানা থেকে চাদর এনে গায় জড়িয়ে দিল। এরপর ঝুঁকে আরও একবার তার চওড়া ঠোঁট ছোঁয়ালো প্রেয়সীর কপালে। রিদিতা গভীর ঘুমে বিভোর, বুঝতেই পারল না তার ছোঁয়ার তীব্রতা!

আহাদ রাজা উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এক ঝাপটা হাওয়া এসে তার চুলগুলো আরো এলেমেলো করে দিল। অথচ সেই শীতল বাতাস তার ভিতরের দাহটাকে ঠাণ্ডা করতে পারল না। সে পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করল। হাতে নিয়ে ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে কয়েকবার দেখল। যেনো ভাবছে জ্বালাবে কি না! রিদিকে পাওয়ার পর থেকে এতদিনে সে একটা সিগারেটও ছুঁয়ে দেখেনি। অ্যা’ল’কো’হ’লে’র বোতলে চুমুক বসায়নি। তার জীবনে যখন এত বড়, এত নিষ্পাপ একটা হালাল নেশা আছে।
তখন হারাম নেশা তার কাছে কোনো মূল্যই রাখে না!
সে ঘার বাঁকিয়ে ভিতরে একবার তাকাল ঘুমন্ত রিদিতার দিকে। কিন্চিৎ হেসে প্যাকেটটা ছুড়ে ফেলে দিলো।প্রয়োজন নেই তার এটার! সে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
“যতদিন তার প্রেয়সী তার কাছে থাকবে। আহাদ রাজা কোনো নেশাই ছুঁবে না!”

সকালের সূর্যের রশ্মি এসে চোখে লাগতেই আহাদ কিন্চিৎ বিরক্ত হয়ে চোখ কুচঁকে নিলো। রাতভর বারান্দার ঠাণ্ডা বাতাসে শরীর জমে গেছে। আড়মোড়া ভেঙ্গে সোজা হয়ে বসল। সোফায় শোয়ার অভ্যাস নেই বিধায় ঘাড় ব্যাথা হয়ে গেছে। ঘাড়টাকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে একটু আড়াম নেয়ার চেষ্টা করল। তারপর উঠে রুমে আসতেই একটা দীর্ঘ শ্বাসা বেরিয়ে আসল কারন রিদিকে কোথাও দেখতে পেলো না। রিদির সকাল সকাল ওঠার অভ্যাস আছে। এখন হয়তো নিচে কিংবা আহিয়ার কাছে তাই সে আর মাথা ঘামালো না। তার এখন লম্বা একটা শাওয়ার নেয়া প্রয়োজন। সে তাই করল। দীর্ঘ এক ঘন্টা সময় নিয়ে বরফঠাণ্ডা পানিতে শাওয়ার নিয়ে বেরোলো। কিন্তু এর মধ্যেও রিদি একবারের জন্য আসলো না। আহাদের কপালে ভাঁজ পরলো। সে কোনমতে রেডি হয়ে শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে নিচে নামতে লাগল। তখনই চোখে পরল, হলঘরের রমরমা পরিবেশ। সালমান মীর আর শারমিন জার্মানি থেকে ফিরেছে। পুরো মীর হাউজ যেন সরগরম হয়ে গেছে তাদের আগমনে।

আহাদ রাজা বুঝতে পারলো তার বড় আব্বু-আম্মুর হুটহাট আসার কারন আদনান-আহিয়া। সে একবার তাকাল আদনানের দিকে। আদনান শিরদাঁড়া সোজা করে বসে আছে, চোখেমুখে স্থিরতা। আহাদ রাজা নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়ন্ত্রণ করল জমে থাকা রাগের আগুনটা। এখানে মোটামুটি সবাই খুশি, শুধু আহিয়া এক কোনায় থম মেরে বসে আছে। আহাদকে দেখতেই সালমান মীর এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন,
“হ্যালো মাই মিডল সান! কেমন আছো?”
আহাদ রাজা নিচু স্বরে বলে,
“আসসালামু আলাইকুম বড় আব্বু, বড় আম্মু।”
শারমিন মুচকি হসে বললেন,

“ওয়াআলাইকুম আসসালাম। আমার রাজা তো দেখছি আগের চেয়েও হ্যান্ডসাম হয়ে গেছে হ্যাঁহ!”
এই বলে শারমিন এগিয়ে এসে আহাদের কপালে মমতার মৃদু ঠোঁট ছোঁয়াল। আহাদ সামান্য নিচু হয়ে তাকে সুবিধা করে দিলো। সালমান মীর মৃদু হেসে রসিকতা করে বললেন,
“হতেই হবে! বউয়ের আদর-যত্ন সেবা যে পাচ্ছে এখন।”
সবাই হালকা হাসলো। আহাদ রাজার ঠোঁটের কোনেও হাসির রেখা। এরপর আরো কিছুক্ষণ গল্প আড্ডায় মেতে রইল হলঘরটা। কিন্তু আহাদ রাজার চোখ জোড়া তার প্রেয়সীকে খুঁজছে। নিচে আসার পর একবারও চোখে পরল না রিদি! মায়ের ডাকে আহাদ রাজার মনোযোগ ঘুরে যায়। আফরোজা শেখ তার দৃঢ় স্বরে বললেন,

“তুমি হয়তো সব বুঝতে পেরেছো এতক্ষণে। আমি আর তোমার বাবা সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছি। তোমার বড় আব্বু বড় আম্মুকেও সে জন্য আসতে বলা। আশা করি এবার তুমি তোমার মতামতটা জানাবে। আর আমি ‘না’ শব্দটা শুনতে চাইনা।”
আহাদের চোখে ক্রোধের ঝলকানি উঠল। সে একবার তাকাল আহিয়ার দিকে, আহিয়া চাতক পাখির মত চেয়ে আছে তার উত্তরের অপেক্ষায়। এই মূহুর্তে তার কাছে তার বোনের খুশি গুরুতপূর্ন। আহাদ তার বা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে নাকটা ঘঁষে নিল। নিজের রাগ, নিজের হার গিলে নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

“সাবাই যখন মতামত দিয়েই দিয়োছো তাহলে আর আমার মতামত জেনে কি হবে? আর তাছাড়া আহিও যখন এটাই চাইছে তাতে আমার কোন আপত্তি নেই। ওর খুশি আমার খুশি। ইনজয় দিস মোমেন্ট!”
এই বলে সে উঠে চলে যায়। প্রথম সিঁড়ির ধাপে পা বাড়াতেই শারমিন বলে উঠলেন,
“রিদিতা কোথায়? একবারও তো দেখলাম না! ও কি এখনো ঘুমাচ্ছে?”
আহাদ রাজার পা আটকে গেলো সিঁড়ির ধাপে। বুকের ভিতরটায় কেমন ধপ করে নিচে নেমে গেলো। আদিল বলে উঠল,

“আরে না না বড় আম্মু! ভাবি তো সকাল সকালই উঠে যায়। আজকে হয়তো একটু বেশিই ধকল গেছে তাই উঠতে পারেনি।”
আদিল রসিকতার ভঙ্গিতে চোখ টিপ দিল আহাদকে।
আহাদ স্পষ্ট বুঝতে পারল আদিলের কথার টোন। কিন্তু এই মূহুর্তে তার রাগ হচ্ছে না বরং ভয় তার বুক দখল করে নিল। সে হালিমা বেগমকে জিজ্ঞেস করল,

“রিদি নিচে আসেনি?”
“কই না তো! আমরা তো আরো ভাবছি ও হয়তো উপরেই আছে। শরীর টরীর খারাপ তাই হয়তো নিচে আসেনি। এমনিতে তো সকাল সকাল ফজরের নামাজ পড়তেই উঠে যায়।”
আহাদ তৎক্ষণাৎ আহিয়ার দিকে ঘুরে বলল,
“আহি, রিদি কোথায়?”
আহিয়া ভড়কে গেলো। সে তো নিজেও জানেনা। গতরাতের পর আর দেখা হয়নি। সে মাথা নেড়ে বলল,
“আমি তো জানি না। আমিও তো ভাবছি ও উপরে আছে। একবার ডাকতে চেয়েছিলাম কিন্তু ওর মন খারাপ ছিল তাই আর ডাকিনি!”

“সিট সিট!”
আহাদ রাজা দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠলে। পাশে থাকা সোফাটা সজোরে লাথি দিয়ে উল্টে ফেলে দিল। মূহুর্তেই পুরো হলঘর থমথমে নিরবতা রুপ নিল। আদিল এগিয়ে এসে বলল,
“ভাই কি হয়েছে? ভাবি কোথায় গেছে? তুমি কি সত্যিই কিছু জানো না?”
আহাদ রাজা কটমট করে তাকালো আদনানের দিকে।
চোখের দৃষ্টিতে আগুন। আদনান অস্বস্তিতে নড়ে বসল। এমন সময় আফরোজা শেখ চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
“আমার মনে হয় রিদিতা রাগ করে ওর বোনের বাড়ি চলে গেছে। গতকাল মেয়েটা অনেক ভেঙে পরেছিল। কান্নাও করেছে খুব।”

আসফাক মীর আহিয়াকে বললেন, “এই আহিয়া তুই ওর বোন, কি যেনো নাম? ওহ, ঈশানী! ঈশানীকে একটা কল কর। তাহলেই তো নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
“আচ্ছা। এখনি করছি।”
আহিয়া ফোন হাতে নিতেই আহাদ বজ্রকন্ঠে গর্জে উঠল,

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪০

“কোন প্রয়োজন নেই কল কারার। আমি এখনই যাচ্ছি। থাপ্পড়ায়া চেহারার নকশা পাল্টায়া দিব। কত বড় সাহস! আহাদ রাজার অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাইরে যায়। বজ্জাত বেডি!”
আহাদ রাজা গটগট করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো। পিছুপিছু আদিলও ছুটলো। সবাই একরকম আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে আছে তাদের চলে যাওয়ার দিকে। না জানি আবার কোন ঝড় আসতে চলেছে!

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪২