Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪২

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪২

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪২
Fatima Fariyal

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের ডান পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুইটা কালো গাড়ি। প্রথম গাড়ির সাথে হেলে দাঁড়িয়ে আছে শাহীন। চোখে চকচকে কালো সানগ্লাস। গায়ে হালকা ব্রাউন ব্লেজার, ব্যাপারটা এমন যেন সে কোনো ছবির শ্যুটিং বাদ দিয়ে এখানে চলে এসেছে। দ্বিতীয় গাড়িতে নাদিম আর শাওন। শাহীন ঘড়ির দিকে তাকাল, প্রায় এক ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছে আনিকার জন্য। কিন্তু আনিকার এখনো আসার নাম গন্ধ নেই। শাহীন কিছুটা বিরক্ত হলো আর বিরক্তির উৎস আনিকা আর তার মা। প্রতিদিন সকাল সন্ধা তার মায়ের একই ঘেন ঘেনানি, আমি আর একা একা কত থাকবো। এখন আর সংসার করার মত রত নেই আমার। তোর নিজের জন্য না হলেও আমার জন্য একটা সঙ্গী দরকার। আজকে তো তার মা একদম জেদ ধরেই বসে ছিলেন। বিয়ে করতেই হবে। তার মায়ের জন্য কাজ কাম ফেলে এখন বউ খুঁজতে হচ্ছে। তাছাড়া শাহীনের নিজেরও তো বয়স হয়েছে। এখন যদি একটা বিয়ে টিয়ে না করে জীবন যৌবন তো সব বুড়িগঙ্গার পানির মত গোলা হয়ে যাবে।

শেষমেশ নাদিম আর শাওনের কথায় আনিকার কথা মাথায় আসলো। গতকাল সে একটা চাল চাললো। ফোন করে সেই ঋণ শোধ করার নাম করে রান্না করে নিয়ে আসতে বলেছে। অথচ এই মেয়ে এখনো এলো না। বিরক্তিতে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। তার কি সময়ের কোন মূল্য নেই, আজব! এমন সময় দেখা গেলো গেট পেরিয়ে আসছে আনিকা। সাথে নীলা আর মিতু নামের মেয়েটাও আছে। আনিকা এগিয়ে আসলেও নিলা আর মিতু একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে আসতেই শাহীন গলা খাঁকড়ি দিয়ে একটু ঠাট্টার সুরে বলল,
“আপনার তো দেখি ঋণ শোধ করার কোনো তাড়া নাই। এক ঘন্টা বসিয়ে রেখেছেন। এবার এই ঋণ শোধ করবেন কি দিয়ে?”
আনিকা মনেমনে কপাল কুঁচকাল। একবার জান বাঁচিয়েছে বলে একদম পেয়ে বসেছে। যতসব! তবে মুখ ফুটিয়ে সেসব কিছুই বলল না। সামান্য হাসি টেনে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আনিকা তাহসীন কখনো কারোর ঋণ রাখে না। আর আপনি কথায় কথায় ঋণের কথা তোলেন কেন? আপনি আবার সুদখোর নন তো!”
শাহীন ঠোঁটে একদিকে টেনে হাসল,
“হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। আজকাল সুদ ছাড়া জীবন চলে নাকি? সময় যত গড়াবে সুদের পরিমান তত বাড়বে।”
আনিকা ভেতরে ভেতরে রাগে ফুটছিল। তবে ঠোঁট চেপে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করলো। ব্যাগ থেকে একটা টিপিন বক্স বের করে শাহীনের হাতে তুলে দিয়ে বলল,
“এই নিন, আপনার সুদ।”
“এটা আসল। সুদ তো এখনো বাকি আছে।”
“মানে?”

আনিকা হতবাক। শাহীন বাঁকা হাসলো। টিপিন বক্সটা খুলতেই পাস্তার সুন্দর একটা ঘ্রান এসে নাকে ঠেকল। ক্রিমি চিকেন পাস্তা! সে দু আঙুল দিয়ে সামান্য তুলতেই শাওন বজ্রপাতের গতিতে এসে বক্সটা ছিনিয়ে নিল। শাহীন রাগি চোখে তাকালো ওদের দুজনের দিকে। নাদিম বলে উঠল,
“এভাবে তাকায়া লাভ নাই। এটার ভাগ আমাদেরও আছে। না রে শাওন?”
“অবশ্যই। কোন সন্দহ আছে?”
শাহীন চোখ বড় করে বলল,
“তোরা দ্যাখছিস না? মেয়ে মানুষ সামনে দাঁড়ানো! একটু ভদ্র হতে শিখ।”
শাওন চোখ সঙ্কুচিত করে বলল,
“খাইতে দে আগে। পরে ভদ্রতা দেখামু।”
আনিকা একটা শুকনো ঢোক গিলে নিলে। শাওন আর নাদিমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এটা আপনারা খাবেন না প্লিজ! এটা স্পেশালি উনার জন্য এনেছি। আসলে উনার তো আমার হাতের রান্না খাওয়ার অনেক ইচ্ছা তাই!”

“ওর বন্ধুরা খেলেই, ওর খাওয়া হয়ে যাবে।”
এই বলেই দুজনে আঙুল দিয়েই তুলো খাওয়া শুরু করে দিল। আনিকা কয়েকবার বারণ করেছে, কারন সে তো জানে এটার স্পেশালিটি কি? অবশ্য এখন তারাও টের পাবে। শাহীন নিতে চাইলে শাওন বাটি সরিয়ে নিল।
শাহীন আঙুলে লেগে থাকা সামান্য পাস্তা মুখে তুলে চেখে দেখল। অতঃপর মাথা নিচু করে আনিকার শ্যামবর্নের আকর্ষণীয় মুখটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এরপর হুট করেই একরকম নির্দিধায় বলল,
“আপনার রান্না পছন্দ হয়েছে। চলেন বিয়ে করি।”
“হ্যাঁহহ!?”

মুহূর্তেই আনিকা সহ নাদিম আর শাওন একসাথে চেঁচিয়ে উঠল। আনিকার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে আছে। সে কি ঠিক শুনল? শাহীন তাকে বিয়ের কথা বলছে? এমন হুট করে, কথা নেই বার্তা নেই কে বিয়ের জন্য প্রোপজ করে? তাও এভাবে? শাহীন আরো কিছু বলবে এমন সময় নাদিম মোচড় দিয়ে উঠল। এক সেকেন্ডের ব্যাবদানে শাওনও মোচড়-পাতড় শুরু করে দিল। শাহীন একটু রেগে বিরক্ত হয়ে বলল,
“সমস্যা কি তোদের? দ্যাখছিস না? একটা গুরুতর কথা বলতেছি! মেয়ে মানুষের সামনে দাঁড়ায়া মোচড়া মুচড়ি করছিস কেন?”

নাদিম পেট চেপে বলল, “ভাই, দুই নাম্বার।”
শাহীন রেগে মেগে গর্জে উঠল,
“কি!? আমি দুই নাম্বার? দুই নাম্বারি কি করেছি আমি?”
শাওন পাশ থেকে বলে উঠল,
“তুই না! খাবারের দুই নাম্বার.. সবসময় এক ডিগ্রী বেশি বুঝিস কেন?”
আনিকা ঠোঁট চেপে হাসল। সে বুঝে গেছে তার ডোজে কাজ হয়ে গেছে। সে নিচু গলায় আঙুল দিয়ে ইশার করে দেখিয়ে বলল,
“ওয়াশরুম ওই দিকে।”

দুজনে মার্টিন লুথার কিং-এর বক্তব্যের থেকেও দ্রুতগতিতে ছুটে গেল। শাহীন ততক্ষণে সন্দহের চোখে তাকাল আনিকার দিকে। আনিকা কৃত্তিম একটা হাসি দিল। শাহীন বুঝে গেলো আনিকার চালাকি। সে চোখ সরু করে বলল,
“খাবারে কি মিশাইছেন? আমাকে খাওয়াইয়া ঋণ শোধ করতে চান নাকি? বাহ বাহ! ক্যায়া চাল হে!”
আনিকা এক ছুট লাগিয়ে সেখান থেকে দৌঁড়ে চলে গেলো নীলা আর মিতুর কাছে। তারা দুজন দূর থেকে এসব দেখে তো হাসতে হাসতে প্রায় নুইয়ে পরেছে। আনিকা দূর থেকে একবার তাকাল শাহীনের দিকে, বিড়বিড় করে বলল,
“এবারের মতো বেঁচে গেছেন শাহীন সাহেব। কিন্ত এরপর আবার আমার রান্না খেতে চাইলে সত্যি সত্যি কোমায় পাঠিয়ে দেব। আনিকা তাহসীন এত সোজা না!”

আনিকা, নীলা আর মিতু আবারও ক্লাসের উদ্দেশ্য চলে গেলো। শাহীন তখনও রাগে কটমট করছে। গাড়ির ভিতর উঠে বসল। হালকা হেসে বলল,
“মিস হক্কুন মহিলা… এবার তো আমি তোমাকেই বিয়ে করবো। তারপর বুঝবা শাহীনের সাথে পাঙ্খা নাইরা পাঙ্গা নেয়ার মজা কত প্রকার আর কি কি!”
এমন সময়ই তার ফোনটা বেজে উঠল। হাতে নিতেই দেখে আহাদ রাজার কল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বজ্রপাতের মতো গর্জে উঠল,
“শাহীন! দুই মিনিট, জাস্ট দুই মিনিটের মধ্যে মিরপুরে চলে আয়। ইমিডিয়েটলি। কুইক!”
“ভাই! আমি যেখানে আছি সেখান থেকে মিরপুর যেতে কমপক্ষে দুই ঘন্টা লাগব।”
“শাহীইইইনন!”

“আসতেছি ভাই! এখনি আসতেছি! দুই মিনিট না, দুই সেকেন্ডের মধ্যে আসতেছি!”
আহাদ রাজা কল কেটে দিল। শাহীন ঘাম জমা কপাল মুছল। নাদিম আর শাওনকে ফেলেই শাহীন গাড়ি স্টার্ড দিল। ঢাকার হুলস্থুল ট্রাফিককে পাত্তা না দিয়ে, নিয়ম-নীতির ধুলো উড়িয়ে আইনকে সাইডে ফেলে, মন্ত্রী মশাইয়ের নামের ইমিউনিটি ঢাল করে সে গাড়ি ছুটিয়ে দিল বেপরোয়া গতিতে। যতই হোক মন্ত্রী মশাইয়ের আদেশ অমান্য করা মানে ডেমো আর বরফ থেরাপি!

শাহীনের মিরপুর পৌঁছাতে হাতে গুনে ১:২২ মিনিট সময় লাগে। ঢাকার রাস্তা তখন জমজমাট থাকে, যার কারনে সময় একটু বেশিই লাগল। মিরপুর এগারোর সেই গলির মোড়ে এসে গাড়ি থেকে নামতেই, আহাদ রাজার গাড়িগুলো এসে পরপর থামলো। আদিলও নিজের গাড়ি থেকে নেমে আসলো। শাহীন বুঝতে পারল না আসলে ঘটনা কী? হুট করে রিদিতার বোনের বাসায় আসার কারন কি হতে পারে? তবে এটা বুঝতে পারল, ঘটনা বড় কিছু। খুবই বড় কিছু। আহাদ রাজা চোখ থেকে কালো চশমা খুলে শার্টের কলারে গুঁজে রাখল। চোয়ালটাকে এমনভাবে শক্ত করল যেন পাথর দিয়ে গড়া। তার চোখ ছয় তলার দিকে তুলে নিল। চোখের ভিতর কেমন এক অদ্ভুত ঝড়, ঠোঁট নড়ল ফিসফিস করে কিন্তু রাগের আগুনে উত্তপ্ত,

“আই সুয়্যার জানু… তুই আজ সত্যি সত্যি বুকের পিষে মরবি। তোকে ছাড়া আমি বাঁচবো এইটা ঠিক। কিন্তু তুই কি করে পারলি আমাকে রেখে চলে আসতে? তোর একটুও বুক কাঁপল না?!”
শাহীন কাছাকাছি ছিল না, তাই পুরোটা ঠিক বুঝল না।
সে কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে এসে বলল,
“ভাই? কি বললেন? শুনতে পাই নাই।”
“তোকে শুনায়া বলতে হবে?”
“হ্যাঁ ভা.. না ভাই।”
“শাহীন!”
“সরি ভাই।”
শাহীন আবারও সাহস করে জিজ্ঞেস করল,

“ভাই আপনি হুট করে এখানে এলেন কেন? ভাবি কি রাগ টাগ করে চলে এসেছে নাকি?”
আদিল চোখের চশমটা ঠিক করে বলল,
“ঠিকই ধরেছো শাহীন ভাই। ভাবি রাগ করি বাপের বাড়ি চলে এসেছে! মেয়েদের এই একটা প্লাস পয়েন্ট বুঝলে? রাগ করলে বাপের বাড়ি আবার বাপের বাড়ি থেকে শশুড়বাড়ি! ফ্রি যাতায়াত।”
“ঠিক আছে, বুঝলাম। কিন্তু ভাবি এভাবে কাউকে না জানিয়ে চলে আসল কি করে?”
আহাদ রাজার কন্ঠ বজ্রধ্বনির গর্জে উঠল,

“এটাই তো ওর জীবনের চরম ভুল! আহাদ রাজার জীবনে যে একবার ঢোকে.. মৃত্যু ছাড়া তার নিস্তার নাই। কিন্তু এই আল্লাহর বান্দি সেই দুঃসাহস দেখিয়েছে। এবার ওর একদিন আর আমার যতদিন লাগে।”
শাহীন আর আদিল একে অপরের দিকে তাকাল, না হাসতে পারছে আর না পারছে হাসি চেপে ধরে রাখতে। আহাদ রাজা এদের সন্দেহজনক অভিব্যক্তি লক্ষ্য করেই কটমট করে তাকাল। দুইজনই তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল। এরপর ঝড়ের মতো ওঠানামা করা শ্বাস নিয়ে আহাদ রাজা সোজা ভবনের দিকে হাঁটল। শাহীন আর আদিলও তার পিছনে আসলো। কয়েকজন গার্ড তাদের সাথে আর কয়েকজন নিচে দাঁড়িয়ে রইল। ছয় তলায় আসতেই লিফট থেকে নেমে আহাদ রাজা এক নাগাড়ে ডোর বেল বাজাতে লাগলো। সাথে ধপ ধপ করে দরজায় হাত দিয়ে পা দিয়ে ধাক্কা দিতে লাগল। এবার যেনো প্রস্তুত দরজা ভেঙ্গেই ফেলবে। ততক্ষণে দরজা খুলে দিল ঈশানী। এই অসময়ে আহাদ রাজাকে দেখে একটু ভরকে গেলো। ভয় আর কৌতুহল মিশ্রত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“আপনারা এই সময়, এখানে? কি হয়েছে?”
আহাদ রাজার চোখ লাল টকটকে আগ্নি শিখার মতো জ্বলছে। সে গর্জে উঠল,
“হোয়ার ইজ রিদি?”
ততক্ষণাত ঈশানীর ভ্রু কুঁচকে গেলো। সে পাল্টা প্রশ্ন করল, “রিদি কোথায় মানে? কি বলতে চাইছেন?”
আহাদের হাত মুঠো হয়ে এলো। চোখ বন্ধ করে রাগটা ধমানোর চেষ্টা করল। ঠাণ্ডা শীতল কন্ঠে বলল,
“রিদিকে ডাকুন। ওকে বলুন ওর মন্ত্রী মশাই ওকে নিতে এসেছে।”
ঈশানী বাকারুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। আহাদ রাজা এসব কি বলছে সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। ঈশানীর কোন নড়চড় না দেখে বলল,

“ওকে ফাইন! আমি নিজেই ডাকছি!”
সে ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। গলার স্বর খানিকটা উঁচু করে ডাকল,
“রিদি! রিদি… সামনে আসো। রিদিইই!”
কিন্তু কোন সাড়া নেই। আহাদ রাজা এ ঘর থেকে অন্য ঘর, বারান্দা, ওয়াশরুম কিছুই বাকি রাখেনি খুঁজতে। এক মিনিটে সব তছনছ করে ফেলেছে। কোথাও রিদির নামগন্ধ নেই। সে কপাল কুচঁকে তাকালো ঈশানীর দিকে। আবারও জিজ্ঞেস করল,
“আমি আবারও জিজ্ঞেস করছি, রিদি কোথায়?”

ঈশানীর এবার আর চুপ থাকতে পারল না। তার কণ্ঠে ভয় আর ক্ষোভের মিশেল,
“রিদি কোথায় সেটা তো আপনারা ভালো জানবেন? আমার বোন আপনার দায়িত্বে ছিল! এখন আপনি এসে জিজ্ঞেস করছেন আমার বোন কোথায়? তার মানে রিদি ও বাড়িতে নেই। আর যদি তাই হয় তাহলে আমার বোন কোথায়? সেটার জবাব আপনি দিবেন!”
আহাদ রাজা বৃদ্ধাআঙুল দিয়ে কপাল চুলকে নিল। ঈশানীর কথা শুনে স্পষ্ট বুঝতে পারলো রিদি এখানে আসেনি। সে ঘুরে পা বাড়াতেই ঈশানী আবার বলে উঠলে,
“আমার প্রশ্নের জবাব দিয়ে যান। আমার বোন কোথায়? দেখুন আমার বোনের যদি কিছু হয় তাহলে কিন্তু আপ..”
ঈশানীর কথা কেটে দিল আহাদ রাজা। সে নিজের তর্জনী আঙু্ল নিজের বুকে ঠেকিয়ে বলল,

“আপনার বোন আমার আরেকটা সত্তা! আর আহাদ রাজা নিজের সত্তার তীল পরিমান ক্ষতি হতে দিবে না। নিশ্চিত থাকতে পারেন।”
ঈশানী আরো কিছু বলতে চাইল। কিন্তু ততক্ষণে আহাদ রাজা গটগট শব্দ করে বেরিয়ে গেলো। ঈশানীর মনটা বড্ড খচখচ করছে। কোথায় যেতে পারে রিদি! এই সংবাদ যদি তাদের বাবা জানতে পারে না জানি আবার কোন ঝড় শুরু হয়!

সবাই নিচে নেমে এলো। পরিস্থিতি এখন আর মজার নয়। আদিল আর শাহীন দুজনের মুখের হাসি পুরো উধাও।
তাদের মুখেও চিন্তার ছাঁপ। শাহীন কিছুটা কাঁপা গলায় বলল,
“ভাই! ভাবি যদি এখানে না এসে থাকে, তাহলে কোথায় যেতে পারে?”
আদিল শাহীনের কথায় বলল, “আচ্ছা! ভার্সিটি যায়নি তো!”
“না, না আদিল! আমি মাত্রই ওখান থেকে এলাম। সেখানে উনি ছিল না!”
আদিল সামান্য ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে, “তোমার সেখানে কি কাজ?”
শাহীন থতমত খেয়ে যায়। এখন কি করে বলবে বউ খুঁজতে গিয়েছিল। সে কথা ঘুরিয়ে বলল,
“সেটা পরের বিষয়! আগে এটা ভাব, ভাইয়ের প্রেয়সী কোথায়?”
দু’জনেরচোখ গিয়ে পড়ল আহাদ রাজার দিকে। সে গাড়ির বডিতে দু’হাত দিয়ে ভর দিয়ে চোখ বন্ধ করে ভাবছে।শাহীনের কণ্ঠ শুকিয়ে গেল,

“ভাই.. আমার মনে হয় ভাবিকে কেউ কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে। তা না হলে উনি এখানে না এসে আর কোথায় যাবে। এই ঢাকার শহরে তো আর উনির কেউ নেই।”
আহাদের চোখ বজ্রপাতের মতো খুলে গেল। তার গাঢ়ো বাদামি চোখ রক্তলাভা হয়ে আছে। সে আর এক মূহুর্তও দেরি না করে গাড়িতে উঠে বসল। আর সেকেন্ডের ভগ্নাংশে গাড়ি গর্জন তুলে ছুটে গেল। শাহীন আর আদিলও তৎক্ষণাৎ তাদের গাড়িতে উঠে পিছু নিল।

নিচের পরিস্থিতি এখনো তেমন একটা শান্ত হয়নি। আহিয়া নিজের রুমে একটা কুশন কোলে নিয়ে হাটুতে চিবুক ঠেকিয়ে বসে আছে। আজ আর গতকালের ঘটনাগুলো মাথায় যেনো দোলাচলে ঘুরছে। সবচেয়ে বেশি ঘুরছে, রিদির হুট করে কাউকে কিছু না বলেই চলে যাওয়া। রিদি ওর বোনের মতো, বন্ধুরও চেয়ে বেশি। সে অত্যন্ত তাকে তো বলে যেতে পারতো! সেই ভাবনার মাঝেই হঠাৎ তার ভাইয়ের কথাগুলো মনে পড়ে গেলো। সেই গলায় ব্যথা মেশানো দুঃখ, যেটা সে আজ প্রথম দেখেছে।

“সবাই আহাদ রাজার রাগটাই দেখল কিন্তু আজ অব্ধি কেউ এটার কারন জানতে চাইল না।”
আহিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল। সত্যিই তো… সবাই শুধু ভাইয়ের দৌরাত্ম্যটাই দেখেছে কিন্তু ভাইয়ের রাগের পেছনে কি আছে, কেউ কি জানে? তার ভাইয়ের আরো একটা কথা গোল হয়ে মাথায় আঘাত করল,
“তোর যা লাগে নির্দিধায় বলবি। তোর ভাই কিডনি বিক্রি করে হলেও এনে দিবে।”
আহিয়া এই কথাটা তার ভাইকে ছোট বেলা থেকেই বলতে শুনেছে। কিন্তু আজ অব্ধি সে সাহস করে ভাইয়ের কাছে কিছুই চায়নি। তবুও তার ভাই তার অভাব, চাওয়া সব আগে থেকে বুঝে নিয়েছে। কিন্তু সে? সে কি কখনো ভাইয়ের কষ্ট বুঝেছে? তার রাগের ভেতরের ব্যথা বোঝার চেষ্টা করেছে? না! আজ আহিয়ার মনে হলো, তার ভাই না বরং সে বোন হিসেবে ব্যার্থ!

আহিয়া একটা ঢোক গিলতে নিয়েও পারছে না। গলায় কিছু একটা দলা পাকিয়ে আসছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। গলা শুকিয়ে কাঠের মতো। এমন সময় দরজায় দুই বার টোকা পরল। তাকিয়ে দেখে দরজার ফাঁক দিয়ে আদনান উঁকি দিচ্ছে। আহিয়ার ছোট্ট হৃদপিন্ডটা লাফিয়ে উঠল। আদনান অদ্ভুত কোমল কন্ঠে বলল,
“আসবো?”
আহিয়া কথা বলতে পারল। শুধু মাথা নাড়িয়ে অনুমতি দিল। আদনান ভিতরে এসে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল আহিয়ার দিকে। আহিয়ার মায়াবী শ্যাম-গোলাপি মুখটা লজ্জা, ভয় আর অস্বস্তিতে গাঢ় হয়ে আছে। তার চোখদুটো ঝলমল করছে দুঃখ নাকি লজ্জায়, বোঝা মুশকিল।
আদনান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। আহিয়ার হাত দুটো নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় নিতেই আহিয়া সামান্য কেঁপে উঠল। নিশ্বাষ জড়িয়ে গেলো। আদনান আহিয়ার চোখে চোখ রেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কোন কথা বলছে না। আহিয়ার অস্বস্তি হলো। সে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“কিছু বলবেন আদনান ভাই?”
আদনান মাথা নেড়ে বলল, “হুম।”
“কি? বলেন।”
আদনান একটু ঝুঁকে এলো তার দিকে। হাতের মুঠো শক্ত হলো, “যদি বলি.. ফিরিয়ে দিবি না তো?”
আহিয়া ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। এক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“উহুম।”
আদনান একদম তার চোখের গভীরে তাকিয়ে, গলার স্বর নিচু করে একটা ভারী আবেগ নিয়ে বলল,
“বিয়ে করবি আমায়?”
আহিয়া স্তব্ধ। তার মুখ লালচে হয়ে গেলো। মুহূর্তেই চোখ ছলছল করে উঠল। আদনান আবারও কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,

“কথা দিচ্ছি তোকে কখনো নিরাশ করবো না। ভালোবাসায় কখনো কমতি রাখবো না। জীবনে যতই কঠিন মূহুর্ত আসুক না কেন, এই হাত দুটো ছাড়ব না। এই অনিশ্চিত জীবনটা, তোকে নিয়ে নিশ্চিত করতে চাই। বিয়ে করবি আমাকে?”
আহিয়ার বুকের ভিতর যেনো ঝড় উঠল। শব্দ হারিয়ে ফেলল সে। অবশেষে আদনান নিজের মুখে তার সামনে হাটুমুড়ে বসে বিয়ে জন্য প্রোপজ করছে। এমন সুন্দর একটা মূহুর্ত যে তার জীবনে আসবে সে তো কল্পনায়ও রাখেনি। আদনান হালকা বিরক্ত হলো তার চুপ থাকা দেখে,
“কি হলো? চুপ করে আছিস যে? বিয়ে করবি আমায়? আহি আমি সবার থেকে তোকে চেয়ে নিলেও তোর থেকে তোর মতামত জানতে চাই। তোর মতামত ছাড়া তো কোন কিছুই সম্ভব না। আমি আবারও জিজ্ঞেস করছি, বিয়ে করবি আমায়?”

আহিয়ার নিশ্বাষ দ্রুত হয়ে এলো, নিজেকে সামলে নিয়ে উপর নিচ মাথা নাড়ালো। অর্থাৎ হ্যাঁ সে বিয়ে করবে। কিন্তু আদনানের সে উত্তর পছন্দ হলো না। সে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“মুখে বল। হ্যাঁ অথবা না।”
আহিয়া থরথর গলায় বলল, “হ্যাঁ… করবো।”
আদনানের ভিতরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বয়ে গেলো। তার ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসির ঝলক। সে পকেট থেকে একটা ছোট্ট বক্স বের করল। আহিয়া শ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল।
বক্স খুলতেই ডায়মন্ডের রিং চকচক করে উঠল। আদনান তার নরম হাতটা তুলে নিয়ে আঙুলে রিং পরিয়ে বলল,
“আজ থেকে এটা তোর। আর তুই আমার। এই কথাটা যেনো কখনো ভুলে যাস না।”
আহিয়ার গলা কেঁপে গেলো। সে নরম স্বরে বলল,

“থ্যাঙ্ক ইউ আদনান ভাই।”
আদনানের মুখ ঘন অন্ধকারের মতো কালো হয়ে গেলো,
“কতবার বলেছি তোকে, এই শব্দটা আমি ঘৃর্না করি। তবুও ভুলে যাস কেন বারবার?”
“স… সরি। মনে ছিল না। আর বলবো না।”
আদনান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, বাহির থেকে বজ্রের মতো গর্জে উঠল আহাদ রাজার কণ্ঠ,
“আদনান! আদনান সামনে আয়!”

আদনান-আহিয়া দুজনেই ভড়কে যায়। তার উঠে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে আসে। বেড় হতে না হতেই আহাদ রাজা তার উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। শার্টের কলার মুঠো করে দেয়ালে চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠল,
“রিদি কোথায়? আমার রিদি কোথায়?”
আহিয়া ভয়ে জমে গেলো দরজার পাশে। আদিল আর শাহীন পিছন থেকে টানতে লাগল আহাদকে, কিন্তু আহাদ তাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। রাগে তার বুক ওঠানামা করছে। আদনান কাশতে কাশতে বলল,
“আ… আমি কি করে জানবো রিদি কোথায়!?”
আহাদ চেঁচিয়ে উঠল,
“তুই সব জানিস, সব! ভালো মানুষ সাজার চেষ্টা করবি না। তোর এই ভালো মানুষির মুখোশের আড়ালের রুপ আমার জানা আছে। আমি দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করব না। ভালোয় ভালোয় বলে দে, আমার রিদি কোথায়? ওকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস?”
আদনান ঝটকা মেরে আহাদের হাত সরিয়ে দিল। শার্টের কলার ঠিক করে নিল। আহাদ রাজার মুখের সামনে তর্জনী আঙুল তুলে বলল,

“সব কিছুতে আমাকে দোষারোপ করা বন্ধ কর আহাদ! আমি বলছি তো, এবার আমি রিদিতার সাথে কিছু করেনি। ও কোথায় আছে আমি জানিনা।”
“তোকে আমি কি করে বিশ্বাস করবো। তুই নিজের সার্থের জন্য কি কি করতে পারিস সেটা আহাদ রাজা ভালো করেই জানে। শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি, রিদি কোথায়?”
“এক কথা আমি কতবার বলবো, আমি জানিনা রিদিতা কোথায়! একটা ভুলের জন্য, বারবার আমার দিকে আঙুল তোলা বন্ধ কর। সেদিন যেটা হয়েছে সেটার জন্য আমি অনুতপ্ত! আমি আমার করা ভুলের ক্ষমা চেয়েছি!”
আহাদ রাজা তেড়ে গেলো তার দিকে। ততক্ষণে বাড়ির সবাই এসে হাজির। আসফাক মীর, আদিল, শাহীন তিন জন মিলে আহাদকে ধরে রেখেছে। আহাদ আদনানের দিকে তাকিয়ে ফুঁসতে লাগল। দাঁত কিড়মিড় করে হুংকার ছাড়ল,
“ওটা ভুল ছিল না! ওটা তোর প্রি-প্ল্যান ছিল! আর আহাদ রাজার কাছে ভুলের কোন ক্ষমা নেই। শুধু মাত্র আহির কারনে আমি চুপ আছি। কিন্তু আই সুয়্যার আদনান! এবার যদি রিদির হারিয়ে যাওয়ার পিছনে তোর হাত থাকে, তাহলে আমি তোকে মে’রে সত্যি সত্যি চালের ড্রামে ঢুকায়া রাখবো!”

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল আহাদ। এরপর যেভাবে গটগট করে এসেছিল ঠিক সেভাবেই বাসা বেরিয়ে যায়। আদিল আর শাহীনও তার পিছনে যায়। আসফাক মীর সন্দহের চোখে একবার আদনানের দিকে তাকায়। আদনান কি করেছিল? কোন ভু্লের কথা বলছে? আদনান আর আহিয়ার সম্পর্ক মেনে না নেওয়ার কারন কি তবে এটাই ছিল! আসফাক মীরও এবার ভাবনা চিন্তা ফেলে দিয়ে আহাদের পিছনে গেলো। রিদিকে না পেলে ঢাকার আকাশে এবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নেমে আসবে। আহিয়াও বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আদনানের দিকে। আদনান নিজের বাহু টান টান করে দাঁড়াল। এক ধাপ এগিয়ে আসতেই আহিয়া বলে উঠল,

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪১

“আপনি রিদির সাথে কি করেছিলেন আদনান ভাই? সেদিন ভুল করেছেন মানে? কি করেছেন?”
আদনানের পা থেমে গেলো। সে এখন কি করে বোঝাবে আহিয়াকে। সে যা করেছে তাকে পাওয়ার জন্য করেছে!আহিয়া কি মেনে নিবে তার এই চরম ভুলটা!

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৩