লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৮
Fatima Fariyal
কাজি অফিসের সামনে এসে আদনান তার গাড়িটার তীব্র ব্রেক কষল। আচমকা থামায় আহিয়া সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়তেই, আদনান ঝট করে হাত বাড়িয়ে তাকে ঠেকিয়ে দিল। তার শক্ত হাত আহিয়ার কাঁধ আর বাহু ঘিরে ধরল। আহিয়ার বুক এমনিতেই ধুকপুক করছিল। তার ওপর আবার আদনানের স্পর্শ! সব মিলিয়ে ভেতরে যেন এক অদ্ভুত ঝটলা পাকিয়ে উঠল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মাথা হালকা ঘুরছে। আদনান তার সিট বেল্ট খুলতে খুলতে অদ্ভুত এক শান্ত অথচ দমবন্ধ করা কণ্ঠে বলল,
“আহি, নিজেকে সামলাতে শিখ। এখন তো কেবল শুরু। এখনই যদি তুই এমন বেশামাল হয়ে পড়িস, তাহলে আমাকে সামলাবি কিভাবে?”
আহিয়া শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। এটা কোন আদনানকে দেখছে সে? তার কন্ঠে সংকোচ নেই, সামান্য লজ্জাবোধ টুকুও নেই! আছে শুধু একরোখা আত্মবিশ্বাস। আদনান এবার আদেশের সুরে বলল,
“চল, আমার সাথে।”
আহিয়ার গলা কেঁপে উঠল, “কোথায়? কেন?”
আদনান ঠোঁটের কোণে হালকা একচিলতে হাসি টেনে বলল, “মানুষ কাজি অফিসে কেন আসে?”
আহিয়া চোখ নামিয়ে মিনমিন করে বলল, “ব… বিয়ে করতে।”
আদনান এবার তার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। দৃষ্টিটা এত গভীর যে আহিয়া চোখ সরাতে পারল না। তার কণ্ঠ এবার নরম, কিন্তু প্রতিটা শব্দ দৃঢ়,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“তুই আমাকে বিয়ে করবি, আহি? এখনই, এই মুহূর্তে। কথা দিচ্ছি, খুব যত্নে রাখব। খুব ভালোবাসব। আগলে রাখব। তুই যেমন চাস, আমি তেমন হয়ে যাব। সামান্যতম অভিযোগের সুযোগ দেব না। আমার কাছে তোর প্রায়োরিটি সবার আগে থাকবে।আমি কোনো ছলনা করছি না আহি। কসম, ছলনা করছি না। আমি সব সত্যি বলছি। করবি বিয়ে?”
আহিয়া হতভম্ব হয়ে গেল। চোখ ঝাপসা। বুকের ভেতর চিন্তার ঝড়। কী বলা উচিত তার? কী করা উচিত? সে একটা ঢোক গলাধঃকরণ করে বলল,
“আপনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো দুঃসাহস আমার নেই। তবে… ভাইয়া আর বাকি সবাই যদি জানতে পারে? তাহলে কী হবে?”
আদনান ধীরে ধীরে আহিয়ার কোমল হাত দুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে নিল। তার স্পর্শে আশ্বাস, আবার অদ্ভুত এক দখলদারিত্ব।
“সবার কাছ থেকেই তোকে চেয়ে নিয়েছি। সবাই রাজি। শুধু তাদের অগোচরে আমি কিছুদিন আগে কাজটা সেরে নিচ্ছি।”
একটু থেমে আবার বলল,
“আশা করি এতে কারোই সমস্যা থাকবে না, শুধু তোর ভাই ছাড়া। আর শোন, এখন এই বিয়ের কথা আমরা কাউকে জানাব না। কেউ জানবে না। কেউই না।”
এক মূহুর্ত নীরবতার পর আদনান আবার বলল,
“তোর ভরসা আছে আমার ওপর?”
আহিয়া নীরব মাথা দোলাল। কয়েকদিন পর তো এমনিতেই তাদের বিয়ে হবে। তাহলে আদনানের ইচ্ছেমতো এখনই হলে ক্ষতি কোথায়? সব ভয়, সব দ্বিধা বুকের ভেতর চেপে রেখে সে সম্মতি দিল। আদনানের হাতে হাত রেখে এগিয়ে গেল কাজি অফিসের দিকে। নতুন কিছুর সূচনা হতে চলেছে তাদের অনিশ্চিত জীবনে।
আদনান আর আহিয়া যখন ভিতরে গেল। তাদের পিছনের গাড়ি থেকে নেমে এলো নাদিম আর শাওন। আহাদের আদেশ অনুযায়ী ওরা আদনানকে নজরে রেখেছিল। কিন্তু এই দৃশ্য দেখে দুজনেই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ। নাদিম ফিসফিস করে বলল,
“শাওন… আমি কি স্বপ্ন দেখছি? এটা কি ধলা ডাক্তার ছিল?”
শাওন মাথা নেড়ে বলল, “ভাই, তুই আর আমি মনে হয় একই স্বপ্ন দেখতেছি।”
নাদিম সন্দেহভরে ভ্রু কুঁচকে শাওনের হাতে একটা চিমটি কাটল।
“আউচচ! এইটা কী করলি?”
“দেখলাম স্বপ্ন না সত্যি। এখন তো পরিষ্কার, আদনান আহিয়াকে বিয়ে করতে এখানে নিয়ে এসেছে। ভাইকে এখনই কল করছি!”
নাদিম ফোন বের করতেই শাওন ঝট করে তার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল।
“তোর কি একটুও দয়ামায়া নাই? একটা ভালোবাসা পূর্ণতা পেতে চলেছে, তার মাঝখানে ভিলেন ডেকে আনছিস কেন?”
“ভাই আগে থেকেই এই ধলা বিলাইটাকে সন্দেহ করছিল। তাই তো আমাদের নজর রাখতে বলেছে। আর তুই ভাইকে ভিলেন বললি? ভাই জানতে পারলে তোর চেহারার নকশা পাল্টে দেবে।”
“আমার একার না, তোরও।”
“না ভাই! আমার চেহারা পাল্টাতে চাই না। এমনিতেই কোনো মেয়ে পটে না। চেহারা পাল্টালে তো কপালে কাকপক্ষীও জুটবে না। আমি এখনই ভাইকে কল দিচ্ছি।”
নাদিম ফোন নিতে গেলে শাওন গম্ভীর হয়ে বলল,
“এবার কিন্তু আমি থাপ্পড়ায়া তোর চেহারার নকশা পাল্টে দেব, নাদিম। বাড়াবাড়ি করিস না। ওদের একটু শান্তিতে বিয়াটা করতে দে।”
“ভাই জানতে পারলে ডেমো একটাও বাদ যাবে না।”
“যখনেরটা তখন দেখা যাবে। এখন আমরা কিছুই দেখি নাই।”
শাওন নাদিমের গলায় ঝোলানো কালো চশমাটা তুলে তার চোখে পরিয়ে দিল। তারপর নিজেও একটা কালো চশমা পরে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এমন ভান করল, যেন তারা সত্যিই কিছুই দেখেনি।
আহাদ রাজা চেয়ারে বসে পা দুটো অনবরত নাচাচ্ছে একটানা, অস্থিরভাবে। যেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার তীব্র প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ওপর প্রান্তে, ঠিক তার মুখোমুখি হয়ে বসে আছে সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ সুভাষ চন্দ্র। লোকটার কপালে হালকা ঘাম, চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। আতঙ্কিত হওয়ার কারণও খুব স্বাভাবিক। গত তিন মাস আগে আহাদ রাজা তার চেম্বারে এসেছিল। তার সমস্যার কথা শুনে তিনি পেশাদারিত্ব বজায় রেখে শুধু বলেছিলেন,
“এটা একটি মানসিক সমস্যা।”
এই এক লাইনের পরই যা ঘটেছিল, তা আজও তার স্পষ্ট মনে আছে। আহাদ রাজা ভেবেছিল, তাকে ‘পাগল’ বলা হয়েছে। রেগেমেগে সেদিন তো চলে গিয়েছিল। আজ আবার তাকে এখানে দেখেবেন ডাঃ সুভাষ চন্দ্র সত্যিই প্রস্তুত ছিলেন না। পাশে দাঁড়িয়ে আছে শাহীন। একবার আহাদের দিকে তাকাচ্ছে, একবার ডাক্তারের দিকে। মনে মনে হিসাব করছে, আজ তার গালে কয়টা থাপ্পড় পড়বে। চেম্বারের ভেতরে কয়েক সেকেন্ডের দমবন্ধ করা নীরবতা শেষে সেই নীরবতা ভাঙলেন ডাঃ সুভাষ চন্দ্র। গলা যতটা সম্ভব স্থির রেখে বললেন,
“দেখুন স্যার… আমি আপনাকে সেদিনও বলেছিলাম, আজও বলছি। আপনার এই অতিমাত্রার রাগ স্বাভাবিক নয়। এটা এক ধরনের নিউরোলজিক্যাল ও মানসিক শর্ট সার্কিট। যেখানে মস্তিষ্ক মুহূর্তের জন্য নিজের নিয়ন্ত্রণ হারায়। এক কথায় বলতে গেলে, এটা Impulse Control সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। যার একটি ধরন হলো Intermittent Explosive Disorder(IED)।”
আহাদের চোখে তীক্ষ্ণ আগুনের ঝিলিক। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ডাক্তার তাড়াতাড়ি যোগ করলেন,
“এর মানে এই নয় যে আপনি খারাপ মানুষ, স্যার। এটা আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘটে। আপনি যদি নিয়মিত চিকিৎসা নেন, তাহলে একদম স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব।”
আহাদ উঠে দাঁড়িয়ে কাঁচের টেবিলে সজোরে একটা চাপড় মারল। ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে। দাঁত কিঁচকিঁচ করে
গর্জে উঠল,
“আপনার কী মনে হয়, আমি অস্বাভাবিক? পাগল?”
ডাঃ সুভাষ চন্দ্রের গলা কেঁপে উঠল,
“আমি… আমি সেটা বলিনি স্যার। আমি শুধু বলেছি, আপনার রাগের সময় মস্তিষ্কের ইমপাল্স কন্ট্রোল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন আপনার নিজের ওপরই নিয়ন্ত্রণ থাকে না।”
ভয়ে ভয়ে যোগ করলেন,
“আপনি চাইলে… আমি ধাপে ধাপে আপনাকে সাহায্য করতে পারি।”
আহাদের মুখের ভাবমূর্তি ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল।
চোখের আগুন কিছুটা নিভে এলো। সে মনে মনে ভাবল,
তার তো এই রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্যই এখানে আসা। এই বেয়াদপ রাগের জন্যই তো তার প্রেয়সী তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সে আর এমনটা চায়না, সে চায়না তার রিদি তাকে ছেড়ে যাক! সে আবার বসে পড়ল। পায়ের ওপর পা তুলে, সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“ফাইন। কী করতে হবে বলেন। কুইক।”
এই পরিবর্তন দেখে ডাঃ সুভাষ চন্দ্র যেন একটু প্রাণ ফিরে পেলেন। শাহীনও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ডাক্তার বললেন,
“আপনাকে মেডিসিনের পাশাপাশি থেরাপিও নিতে হবে। একটা ব্রেক-প্ল্যান তৈরি করতে হবে। নিয়মিত কাউন্সেলিং জরুরি।”
আহাদ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। এবার শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এখন কী করতে হবে?”
“এই মুহূর্তে আপনাকে ব্ল্যাকআউট টাইপ রাগ থামানোর অনুশীলন করাতে চাই। আপনি এক থেকে দশ পর্যন্ত উল্টো করে গুনুন তো, দেখি পারেন কিনা!”
এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল। মুহূর্তের মধ্যে আহাদের রাগ আবার তরতর করে উপচে পড়ল। সে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডাঃ সুভাষ চন্দ্রের শার্টের কলার চেপে ধরল। গর্জন করে উঠল,
“এই চন্দ্রবিন্দুর বাচ্চা! আমাকে তোর মূর্খ মনে হয়? তোর কী মনে হয়, আমি এক-দুই গুনতে পারি না? আমি অশিক্ষিত?”
শাহীন তড়িঘড়ি এগিয়ে এসে বলল,
“ভাই! ডাক্তার সেটা বলেনি। আপনি ভুল বুঝছেন..”
কথা শেষ হওয়ার আগেই, একটা সজোরে থাপ্পড় এসে পড়ল শাহীনের গালে। শাহীন গালে হাত দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। আহাদ হাত মুঠিবদ্ধ করে নিল। তখনই তার ফোনটা বেজে উঠে। এতে তার ধ্যান ভঙ্গ হয়। তা না হলে এখনই সাইকিয়াট্রিস্টের নাক বারাবার একটা ঘুষি পড়ত। আহাদ ডাক্তারের কলার ছেড়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখে দুন্দারের কল। দুন্দার তার গুপ্ত সহযোগী। আহাদ ফোন রিসিভ করল। ওপাশে দুন্দার কি বলল সেটা শাহীন শুনল না, কিন্তু আহাদ রাজার মুখের অভিব্যক্তি ভয়ংকরভাবে বদলে গেল। চোখে লেলিহান আগুন। সে ফোনটা রেখেই শাহীনের গালে আবারও ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। শাহীন এবার দুই গালে হাত দিয়ে অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল। আহাদ রাজার বুক উঠানামা করছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৭
“আদ… নান! আই স্যুয়ার, আজকে আমি তোকে মেরে সত্যি সত্যি চালের ড্রামে ঢুকায়া রাখব।”
এই বলে টেবিল থেকে একটা ফুলদানি তুলে ছুড়ে মারল কাঁচের দেয়ালের দিকে। ঝাঁঙ করে কাঁচের দেয়াল জরজর করে ভেঙে পড়ল। হায়েনার মতো দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে একবার শাহীন, একবার সাইকিয়াট্রিস্টের দিকে তাকাল। অতঃপর গটগট শব্দ তুলে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল। শাহীন দুই গালে হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল,
“যত দোষ… শাহীন ঘোষ।”
