Home লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৪

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৪

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৪
অহনা রহমান

নাফির থেকে রিজেক্ট হওয়ার পর এমনিতেই হিয়ার লজ্জা লাগছে ওর সামনে যেতে। আর এখন নাকি মুখোমুখি বসে খেতে হবে। হিয়ার আসলে কপালটাই খারাপ। বেচারি চায় একরকম, আর সবসময় হয় আরেক রকম। ওখানে আবার রাজ আর রুহিও আছে। যাদের দুচোখে দেখতেই পারে না হিয়া। মানে ভাবা যায় এগুলো? হিয়া ভিষন কনফিউজড। আসলে হচ্ছে টা কি তার সাথে। হিয়া ধীরেসুস্থে গিয়ে বসলো টেবিলে। চোরাচোখে কয়েকবার তাকালো নাফির দিকে।

কিন্তু… কিন্তু নাফি কি হিয়াকে ইগনোর করলো? এই যে একবারও তাকালো না হিয়ার দিকে। একটা মানুষ এখানে এসে বসেছে তা মোটে গ্রাহ্যই করলো না? সে মাথা নিচু করে খাচ্ছে। শুধু তাই নয়, মাথাটা এতো নিচু করে আছে মনে হচ্ছে, প্লেটের ভেতরে ঢুকে যাবে। এমন ভাব করছে যেন চারপাশে তাকালে পাপ হবে। হিয়া মুখ বাঁকালো ওসব দেখে। এতো ভাব নেওয়ার কি আছে এখানে? প্রপোজ তো মানুষ মানুষকে করতেই পারে। নীরাবতা পালন করে হিয়াকে তো বুঝিয়েই দিয়েছে সে রিজেক্ট করেছে। এখন আবার এতো ঢং করার কোনো মানে হয়? আশ্চর্য! এমনিতেই বেচারি নিজের জ্বালায় বাঁচে না। তার উপর আবার এসব। হিয়া আর তাকালো না নাফির দিকে। এবার সে খাওয়াতে মন দিলো। ঠিক এটাই যেন সহ্য হলো না রাজের । নাসিমা ও তখন ছিলেন। ও সবার সামনে হিয়াকে খোঁচা মেরে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“শ্যালিকা শুনলাম ভার্সিটির এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে তোমার রিলেশন ছিলো? ভাই তো নাকি বিয়ে করেছে। তা তোমার কি খবর এখন? ওই ভাইয়ের শোকে আবার দেবদাস-টাস হয়ে যাওনি তো? তোমার আম্মু বললো রুম থেকে বের হওনা। ঘরকুনো হয়ে রুমের মধ্যে পরে থাকো সবসময়। এমন করলে হবে বলো?”

এই মুহুর্তে এমন একটা অপ্রয়োজনীয় কথা না বললেই হতো। নেহাৎই হিয়াকে ছোট করতে বলেছে রাজ। রাজের কথা শুনে হিয়ার খাওয়া থেমে গেল। অপমানে মুখখানা এইটুকুন হয়ে গেল। এটা কি রাজের না বললেই হতো না? কি মনে করলেন নাসিমা? সেই সাথে গৃহকর্মী রাবেয়া ও আছে। হিয়ার কান্না পেল। টের পেল গলা দিয়ে আর খাবার নামছে না। সে রুহির দিকে একবার আড়চোখে চাইলো। রুহি বাঁকা হাসছে। হাসিতে মিশে আছে শয়তানি। কোন কিছু পাওয়ার খুশি। হিয়ার ভিষন খারাপ লাগলো। এখানে বসে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু উঠে যাওয়ারও উপায় নেই।
নাফির হাত মুঠ হয়ে গেছে আপনা-আপনি। ভাইয়ের উপর দারুণ উন্মত্ততায় ফেটে পড়লো সে। কিন্তু তার হাত-পা অদৃশ্য কোন কিছুতে বাঁধা যার কারনে সে কিছুই করতে পারছে না। কোন অধিকারে বলবে সে? আগে সে অধিকার অর্জন করতে চায়। তারপর নাহয় উপযুক্ত জবাব দেবে।

ওদিকে নাসিমা বেগমও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এই সময়ে এমন একটা কথা কেন বললো রাজ। তিনি গৃহকর্মীর দিকে একবার তাকালেন। হিয়া যে ছোট হলো সবার কাছে এটা কি রাজ বুঝলো না? তিনি কিছু বলবেন তার আগে রুহি বলল,

“হ্যাঁ হিয়া আমিও শুনলাম সারাদিন নাকি কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাস? এখন এসব প্রেম-ট্রেম বাদ দিয়ে লেখাপড়াতে মনোযোগ দে। নাহলে কিভাবে কি করবি বলতো? ছোটমা তোকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখে। এইভাবে প্রেম করে, ছ্যাকা খেয়ে যদি সবই গুলিয়ে ফেলিস কি করবি তাহলে?”
হিয়ার চোখের পানি টপ করে পড়লো প্লেটে। আর নেওয়া যাচ্ছে না। এরা দুজন এইজন্যই ডেকেছে হিয়াকে।
রুহির কথা শেষ হতেই নাফি বলে উঠলো,
“রাজ ও রুহি? তোমাদের এই কথাগুলো কি ঘরে বসে বলা যেত না? কাকে শোনাচ্ছো এগুলো? কেউ জিজ্ঞেস করেছে তোমাদের কাছে?”

নাফির সঙ্গে তাল মেলালেন নাসিমা ও। তিনি বললেন,
“হ্যা ঠিকই তো। কেউ শুনতে চেয়েছে রাজ? এখানে এসব কেন বলছিস? হিয়ার ব্যাপারে এসব কথা কে জানতে চাইছে তোদের কাছে? রুহি? মা আমার ও তো তোমার বোন। তুমি ওকে ঘরে নিয়েও বোঝাতে পারতে, বলতে পারতে।”
হিয়াকে অপমান করতে এসে নিজেরা অপমানিত হলো। ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগলো না রাজদের। রুহি আমতাআমতা করে বলল,

“আমি তো জাস্ট এমনিই বললাম। হিয়া তুই মাইন্ড করেছিস?”
হিয়া কান্নাটা দ্রুত গিলে নিলো। চোখের পানিটুকু মুছে নিয়ে সে কৃত্রিম হাসি নিয়ে বলল,
“কিছু মনে করিনি।”
নাফি এবারে চোখ তুলে তাকালো। দেখলো হিয়ার মুখখানা। সেদিন যখন প্রথম দেখেছিলো হিয়াকে, পুরুষালী মনে কি ভিষণ ধাক্কাটাই না খেয়েছিলো। পুতুলের মতো সুন্দর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ছিলো সারাক্ষণ। বিয়ে করবে না বলে পন করা ছেলেটাও সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলো রমনীকে দেখে।
যা আছে মনেমনে৷ নাফি নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে জানে। সে একবার তাকিয়ে আঁখিদয় সরিয়ে নিলো।

“তাছাড়া সব বিচ্ছেদ ব্যর্থতা নয়। কিছু বিচ্ছেদ আত্মরক্ষার নাম।”
নাফি কেন কথাটি বলল নিজেও জানে না। কথাটা বলেই সে আবারও প্লেটের দিকে তাকিয়ে খেতে লাগলো। নাসিমাও আর কিছু বললেন না। লেগে পরলেন নিজের কাজে। রাজ আর রুহিও এইবার খাওয়াতে মন দিলো। শুধু হিয়া-ই পারলো না স্বাভাবিক হতে। সে কোন মতে নাকেমুখে কয়টা খেয়ে যেমন নীরবে এসেছিল তেমন ভাবেই চলে গেল।

হিয়া নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমে গিয়ে দরজা আটকালো। এই-বার শুরু করলো আধ-পাগলের পাগলামি। সে ঘরজুড়ে পায়চারি করতে লাগলো।
হিয়া হঠাৎই কেঁদে ফেললো।
রাজ আর রুহিকে একসাথে ভালো থাকতে দেখে হিয়ার খারাপ লাগে না। থাকুক না ওরা ওদের মতো। কেন বারবার হিয়াকে নিয়ে পড়ছে ওরা? আর কি চায় হিয়ার কাছ থেকে? ওরা হিয়াকে ভাঙতে চায়। ওরা কি বোঝে না হিয়া ভিষন আঘাত পেয়েছে ওদের দিয়ে? যার কারনেই সে শক্ত হয়েছে। হিয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। কালই সে চলে যাবে এখান থেকে। আর কখনোই আসবে না এখানে। কক্ষনো না!

কিছুতেই হিয়ার ঘুম আসছে না। সারা সন্ধ্যা ঘুমিয়ে রাতে কি আর ঘুম আসে? নিজের বাড়ির মতো বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে লাগলো সে। ধুর ভাল্লাগেনা! আর মনটাও ভালো নেই। হিয়ার খুব হাশফাশ লাগছে। দমবন্ধ লাগছে। একটু বাহিরের হাওয়া খেতে পারলে ভালো লাগতো। হিয়া বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। এখন ছাঁদে যাবে সে। একটু কফি পাওয়া গেলে মন্দ হতো না। হিয়া রান্নাঘরে গেল আগে। সেখানে সবকিছু গোছানো আছে। কিন্তু এখন কফি বানাবে কে? হিয়া তো কিছুতেই পারবে না। কফি বানানোর ভয়ে হিয়া কফি খাওয়ার চিন্তা বাদ দিলো। বিরস মুখে যেতে লাগলো ছাঁদের দিকে। রাত তখন কত আর হবে বারোটা? হয়তো তাই। হিয়া ছাঁদের এককোনে গিয়ে দাঁড়ালো। মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিলো কিছুক্ষণ। এখন তার ভয় লাগছে। চারপাশে কেমন অদ্ভুত নীরাবতা। এমন একটা পরিবেশকে ছাঁপিয়ে, হিয়ার কানে এলো পরিচিত এক কন্ঠস্বর।

“যে মানুষটা তোমার অনুভূতির মূল্য বোঝেনি, সে তোমার ভালোবাসার যোগ্য ছিল না। তুমি হারাওনি, বরং তুমি বেঁচে গেছ।”
হিয়া ফিরে তাকালো পেছনের দিকে। দেখলো নাফি দাঁড়িয়ে আছে। হাতে দুই কাপ কফি। হিয়া হতভম্ব চাহনিতে তাকালো নাফির দিকে। এই সময় এই লোককে মোটেও আশা করেনি হিয়া। তাও ভালো হয়েছে। এখনই হিয়া সেই কথাটা বলতে পারবে। নাফি এগিয়ে এসে হিয়ার সামনে কাপটা এগিয়ে দিলো। বলল,
“আমি কফি একটু বেশিই পছন্দ করি। একসাথে দুই কাপ খাই। আজ তুমিই খাও এটা।”

হিয়ার অবাকের রেশ তখনো কাটেনি। কিছুক্ষণ আগেই তো তার কফি খেতে মন চাইলো। রান্নাঘরেও গিয়েছিলো সে। কিন্তু বানানোর ভয়ে আর খেলো না। কি অদ্ভুত এই লোক নাকি দুই কাপ কফি খায়। এটা আদৌও সম্ভব? হিয়া হাত বাড়িয়ে কফিটা নিলো। নাফি তখন অন্যদিকে সরে গিয়েছে। হিয়া ভাবলো, খাওয়ার সময় রাজের কথার জের ধরেই নাফি এখন এই কথাটি বললো। তাই হিয়া এসব নিয়ে আর কথা বললো না। এখন তার কাজের কথাটি বলতে হবে।
হিয়া নাফির পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। শুকনো ঢোক গিললো সে। ভয় লাগছে তার। মানসম্মান তো এমনিই খেয়ে বসে আছে। এখন আর কি! হিয়া খুশখুশ করে কেশে উঠলো। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,

“একটা কথা ছিলো।”
নাফি জানতো এমন কিছুই হবে। সে ভাবলেশহীন হয়ে বলল,
“কি কথা বলো?”
হিয়া নড়েচড়ে দাঁড়ালো। এদিক ওদিক তাকিয়ে স্থির করতে চাইলো চঞ্চল মনটাকে। কিন্তু তা আর পারলো কই? তবুও সে ব্যর্থ হলো না। বলল,
“আপনাকে ওইদিন যা বলেছিলাম, ওটা একটা গেম ছিলো। কিছু ফ্রেন্ডদের সাথে ট্রুথ ডেয়ার খেলতে গিয়ে এমন হয়েছিলো। আপনি উল্টোপাল্টা আবার কিছু ভাববেন না যেন।”
নাফি আগের মতোই বলল,

“কোনদিনের কথা বলছো?”
হিয়ার চোয়াল ঝুলে এলো। এই লোকের মনে নেই?
“আরে ওই দিন ক্যাফেতে বসে বলেছিলাম না?”
“ওহ হ্যাঁ। কি বলেছিলে যেন?”
হিয়া খেই হারালো এবার। মানে কি? যেখানে হিয়া উত্তেজনায় ঘুমাতে পারেনি। সেখানে এনার মনেই নেই? কি আশ্চর্য ব্যাপার! হিয়া তবুও নিজেকে শান্ত রেখে বলল,

“ওই যে একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলেছিলাম না? ওটা।”
“কোনটা?”
“ওই যে ওইটা। আপনাকে আমি…..।”
“আমাকে কি?”
হিয়া রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো নাফির দিকে। নাফিও ওর দিকেই তাকানো ছিলো। হিয়ার রাগ দেখে বোকা হাসলো নাফি। বলল,
“আরে আমি কি করবো? আমার তো মনেই নেই। কোন কথার কথা বলছো আমি তো বুঝতেই পারছি না।”
হিয়া দাঁতে দাঁত পিষে রাগ সংবরনের চেষ্টা করলো। নাফির একহাত টেনে কফির মগটা ওর হাতে দিলো। রাগী স্বরে বলল,

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৩

“আপনার মাথা আর মুন্ডু। আপাতত এটাই বোঝেন। ফাউল যত্তসব!”
হিয়া আর দাঁড়ালোই না সেখানে। দ্রুত চলে গেল ছাঁদ থেকে। হিয়া চলে যাওয়ার পর নাফি হাসলো শুধু। আর তো কিছুদিনের অপেক্ষা। আর তারপর? তারপরেই তো খেলা জমবে।

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৫