লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩৪
অহনা রহমান
সময় ও স্রোত কারো জন্য বসে থাকে না। চলতে থাকে আপন গতিতে। কেটে গেছে বেশ কিছুদিন। নাফি আর হিয়ার দিন যাচ্ছে হাসি খুনসুটিতে। হিয়াকে নাফি রেখেছে রাজকুমারীর মতো। আর নাসিমা তো আছেনই। হিয়ার ব্যবহার অত্যাধিক সুন্দর হওয়ায় নাসিমা তাকে মেয়ের মতোই ভালো বাসেন। হিয়া সুখী আছে নাফির কাছে। ভীষন সুখী। হিয়া জীবনে এমন একটা মানুষ পেয়েছে, যে তার জীবনে দুঃখের আঁচ পর্যন্ত লাগতে দেয়নি৷ হিয়ার যে এতো বড় একটা অতীত ছিলো, তা ঘুনাক্ষরেও মনে করতে দেয়নি৷ এমনকি, সবার থেকে আগলে রেখেছে তাকে। একজন স্বামী হিসেবে কম বন্ধু হিসেবে বেশি চলেছে হিয়ার সাথে৷
ওদিকে, রাজ ও রুহি জ্বলে মরছে অশান্তির অনলে। রাজ কম রুহি বেশি। আজকাল রুহির সাথে কেউ কথা বলে না। কেউ না মানে কেউ না। না বাপেরবাড়ির লোকজন না শশুরবাড়ির লোকজন। সবাই তো পর, রাজ নিজেই অতিরিক্ত দরকার ছাড়া কথা বলে না রুহির সাথে। রুহির বাবা-মা ও কথা বলে না রুহির সাথে। রুহির দিনকাল কাটছে এভাবেই। সব জায়গায় সে আজ অবহেলিত। রুহি না পাচ্ছে বাবার বাড়িতে স্থান আর না পাচ্ছে রাজের কাছে স্থান। তবে যদি সে অনুশোচনা বোধ করতো, তাহলেও না-হয় হতো। কিন্তু তা তো নয়! ও বাড়িতে যে এতো বড় একটা কান্ড ঘটিয়ে এলো, একটাবার সরি পর্যন্ত বলেনি। কারো সাথে কথা বলেনি আগে। মুখিয়ে বসে আছে কবে তার মা কল দেয়। মোট কথা তার এখনো অহংকার’ই কমেনি। কিন্তু এদিকে জীবনটা কিভাবে লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে। যদিও তাতে ওর কোনো হেলদোল নেই। ও ব্যস্ত নিত্যদিনে নতুন করে গুটি সাজাতে। তাতে অবশ্য কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কেননা হিয়ার কাছে আস্ত একটা নাফি আছে।
রাজ যতটা পারছে রুহির সাথে দুরত্ব বৃদ্ধি করছে। ও যে একটা দুমুখো সা প, তা বুঝতে বাকি নেই রাজের৷ যে মেয়ে নিজের বাবাকে অমন কথা বলতে পারে, সে তো যে কোনো মুহুর্তেই একটা কিছু ঘটিয়ে ফেলবে। কোনো বিশ্বাস নেই৷ তাছাড়া রাজ এখন ভালোভাবেই বুঝতে পারছে, আর যাইহোক এই মেয়ের সাথে কখনো তার সংসার হয়ে উঠবে না। সংসার করা মেয়েরা থাকে আলাদা। সেসব মেয়েকে দেখলেও চোখের শান্তি লাগে। যেমনটা লাগে হিয়াকে দেখলে। নাফির সাথে হিয়াকে খুশি থাকতে দেখে রাজের ভালো লাগে না। তবে এমন না যে সে ওদের মাঝে ঢুকে পড়বে। রাজ জানে হিয়াকে পাওয়া আর সম্ভব না। থাকতে মুল্য দিতে হয়! রাজ জানে সে খাটি সোনা ফেলে দিয়ে প্লাস্টিক ঘরে তুলেছে। যা না মানে না গুনে! রাজের আজকাল আফসোস হয় নিজের জন্য। ও কেন এমন করলো, নিজেকে এ প্রশ্ন করতে করতে ও বড়ো ক্লান্ত। এখন রাজ আর কোনো ঝামেলা চায় না। এখন চায় শুধুমাত্র খুশিতে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে। আর খুব দ্রুত কালনাগিনী রুহিকে নিজের জীবন থেকে তাড়াতে। রুহির মতো মানুষগুলো ভিষণ স্বার্থপর হয়৷ এরা স্বার্থ ফুরালে মানুষ ভুলে যায়। রাজ সেই কবেই রুহিকে ডি ভো র্স দিতো! কিন্তু উপযুক্ত কোনো প্রমানসহ কারন নেই, যা দেখিয়ে সে কোনো স্টেপ নেবে। দেখা গেল ডিভোর্স দিতে গিয়ে উল্টো সে নিজেই তো ধরা খেয়ে বসে আছে!
যাক গে! এভাবেই কাটছে দিনকাল৷ কেউ সুখে আছে, কেউ আছে অশান্তিতে। তবু সময় থেমে থাকছে না। রাজ ও রুহির মাঝে কিছু একটা অশান্তি চলছে তা বাইরের কেউ জানে না। ওরা রুম থেকে বেরুলেই গিরগিটির মতো রং বদলে বের হয়। দুজনেই নিজেদেরকে ভাবে বিশ্ব চালাক। ওদের মতো পন্ডিত এই দুনিয়ায় আর কেউ নেই। যদিও এটা ডাহা মিথ্যা! ওরা সবার চোখে ধুলা দিতে পারলেও কেউ একজন আছে, যে ওদের হাবভাব আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে।
বাড়িতে সম্ভবত কেউ নেই, সহিয়া ছাড়া। কোনো সাড়াশব্দ নেই কোথাও। পুরো বাড়ি একদম নিস্তব্ধ হয়ে আছে। সকাল এগারোটা বাজে। হিয়া নিজের রুমটা গোছাচ্ছে। এমনিতেই ওদের রুমটা সবসময়ই পরিপাটি করে গোছানো থাকে। তবুও হিয়া আজ ইচ্ছে করেই সকল কিছু আলুথালু করলো৷ খেয়ে দেয়ে কাজ না থাকলে যা হয়! হিয়া বিছানায় বসে কাপড় ভাজ করছিলো। সেগুলো শেষ হতেই মেয়েটা উঠে দাঁড়ালো। আলমিরা তে রাখবে তাই৷ কিন্তু তাতেই যেন বাঁধলো বিপত্তি। হঠাৎ উঠে দাঁড়ানোতে হিয়ার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। গা গুলিয়ে বমি এলো। হিয়া নিজের দুহাত মুখে চেপে ওয়াশরুমের দিকে গেল।
হিয়ার আজকাল কিছুই ভালো লাগে না। সারাদিন মাথা ঘুরায়। মাঝেমধ্যে ঘুরে ঘুরে আছাড় খেতে নেয়। মনে হয় শরীরে কোনো শক্তিই নেই। সারাক্ষণ উদাস থাকে, এখানে সেখানে ঘুমিয়ে পড়ে৷ ওর যে এতো সমস্যা হচ্ছে, তা কাউকে বলেও না মুখ ফুটে। এমনকি নাফিকেও না৷ নাফিকে বললে, সে নিজের কাজকাম ফেলে রেখে হিয়ার পিছনেই ঘুরবে সারাদিন। মুলত এইজন্যই নাফিকে বলা হয়না। আর এমনিতেও হিয়া ভেবেছে, লো প্রেসারের জন্য এমন হচ্ছে। দুএকদিন পরই কমে যাবে৷ কিন্তু কমার কোনো সম্ভাবনা’ই দেখতে পাচ্ছে না বেচারি। এতো পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছে মোটেও কমছে না মাথা ঘুরানো টা। আবার আজ থেকে নতুন সমস্যার উৎপত্তি।
অনেকক্ষণ যাবত বমি করলো হিয়া। এরপর মাথায় বেশি করে পানি দিয়ে ক্লান্ত হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো সে৷ একদম ক্লান্ত হয়ে গেছে মেয়েটা। রুমে এসেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো মেয়েটা। শরীরটা ভিষণ খারাপ লাগছে তার। বেশ কিছুটা সময় হিয়া বিছানায় শুয়ে থাকলো। এবং কাকতালীয় ভাবে তখনই গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো তার৷ দুঃখের বিষয় হলো, রুমে পানি নেই। হিয়া শোয়া থেকে আস্তেধীরে উঠে বসলো। বিয়ের পর থেকে সবসময় শাড়ি পড়ে সে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। হিয়া আজ লাল পাড়ের কালো শাড়ি পড়েছে৷ পটু গিন্নিদের মতো চুলগুলো খোঁপা করে আঁচলটা কোমরে গোঁজা।
হিয়া বিছানা ছেড়ে নামলো। নামতেই ফের মাথাটা ঘুরে উঠলো মেয়েটার। তবে সেসবে পাত্তা না দিয়ে হিয়া টেবিলের উপর থেকে পানির জগটা হাতে নিলো। ধীরেসুস্থে এগিয়ে গেল ড্রয়িংরুমের উদ্দেশ্যে। তবে হিয়া খেয়াল করলো আগের থেকে আজকে শরীরটা যেন বেশিই খারাপ লাগছে মানে ও হাঁটতেও পারছে না। ভেবেছিলো নাফিকে আজই জানাবে৷ কিন্তু এই অবস্থায় ও ভিষণ ভয় লাগছে। হিয়া নিচে যেতে যেতে ভাবলো, রুমে এসেই কল করবে নাফিকে। একটা ডক্টর না দেখালে আর চলা যাচ্ছে না!
গৃহকর্মী রাবেয়ার এখন সাত মাস চলছে। এজন্য কাজের চাপ আগের থেকেও কমিয়ে দিয়েছেন নাসিমা। সকালে আসে থালাবাসন গুলো ধুয়ে দেয়। আর যদি পারে রান্নার জন্য কুটা’কাটা করে দেয়। সেই মোতাবেক আজও এসেছে রাবেয়া৷ কাজ ও মুটামুটি অর্ধেক শেষ। রাবেয়া এখন বাড়ির দিকেই যেতে চেয়েছিলো। হঠাৎ ড্রয়িংরুমের থেকে কারও একটা চাপা আর্তনাদ শুনতে পেল সে। রাবেয়া হকচকিয়ে উঠলো এতে। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল শব্দের উৎস খুঁজতে। মূল স্থানে গিয়ে যা দেখলো তাতে রাবেয়ার চক্ষু ছানাবড়া। ও চিৎকার করে উঠলো,
“ছোড ভাবি কি হয়ছে আপনের? পড়লেন ক্যামনে?”
রাজ ও রুহি দু’জনেই ভার্সিটিতে। রাজের সাথে বিয়ের আগে রুহির জিহাদের সাথে ভালো একটা সম্পর্ক ছিলো। এজন্য রাজের সাথে রুহির কথা না হলেও জিহাদের সাথে ভালোই কথাবার্তা হয়। রাজ কোনো মেয়ের সাথে লাইন-টাইন মারে কি-না তা তা সব জিহাদের থেকেই খবর নেই রুহি। সেই সাথে অর্থের লোভ দেখিয়ে জিহাদের সাথে প্লান করতে থাকে হিয়াকে কীভাবে কি করলে ধ্বংস করা যায়। সেই সাথে হিয়ার দুই ফ্রেন্ড মারজিয়া এবং নাফিজ তো আছেই ওদের সাথে। প্রতিদিন ভার্সিটিতে চারজন গোল মিটিং করে। আজও সেরকম হলো। গোল হয়ে বসে আছে রুহিরা। তাছাড়া রাজ আজকাল জিহাদের সাথেও খুব একটা কথা বলে না৷ ও নিজের মতো আসে, কিছু বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা দেয় (যারা জানে না ওর সম্পর্কে) তারপর বাড়ি চলে যায়। এজন্য জিহাদও রাজের সাথে মেশে না। যতটুকু মেশে তা হলো রাজের খোঁজ খবর রুহিক দিতে৷ ওর যেখানে লাভ ও সেখানেই যাবে৷ অর্থাৎ রুহির কাছে। রুহির সাথে হাত মিলিয়েছে এখন রুহিও ওকে টাকা-পয়সা দিয়ে হেল্প করে৷ ভাঙন শুরু হয়েছে অলরেডি! এই ভাঙনের শেষ কোথায় কে জানে!
প্রতিদিনের ন্যায় আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিয়া।
“বুঝলে! হিয়াকে আমি আর সহ্য করতে পারছি না। ওর জন্য আমার সব শেষ হয়েছে। তোমরা কিছু করবে না? আর ওই নাফির বাচ্চা আমাকে সেদিন অনেক কথা শুনিয়েছে। এইজন্য আমি কিছুদিন চুপচাপ আছি৷ কিন্তু তোমরা কিছু করছো না কেন? ও বাসায় পড়েও তো তোমাদেরকে হারিয়ে দেবে৷ বুঝতে পারছো!”
রুহির কথা শুনে ওরা তিনজন ভাবুক হয়ে বসে রইলো। ওরা করবে তো করবে, করবে টা কি! এই কয়েকদিনে ওরা কতকিছু করলো। কিন্তু পারলো কই আর! রুহি ও তো চেষ্টা করেছে হিয়ার সংসারে ভাঙন ধরাতে। এই তো কয়েকদিন আগের কথা,
নাফি অফিসে গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিংয়ে ব্যস্ত আছে৷ বিদেশি একটা ব্র্যাঞ্চের সাথে ওদের কোম্পানির কোলাবোরেশান করবে৷ দেশের সনামধন্য কোম্পানির সিইউও রা সেখানে উপস্থিত রয়েছে। নাফি সেদিন বাসায় থাকতে বলেছিলো, এই কথা। রুহিও সেকথা শুনেছিলো। ও জানতো আজ নাফি ব্যস্ত থাকবে সেই সাথে মন মেজাজও খারাপ থাকবে৷ রুহি সেই সুযোগটা নিয়ে, এগারোটার দিকে কল করে নাফিকে। তবে সে কল করলেও কথা বলিয়েছিলো নাফিজকে দিয়ে।
নাফি তখন ব্যস্ত মিটিংয়ে। হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠে। এতে সে বেশ খানিকটা অবাক হয়। নাফি ফোনের দিকে নজর না দিয়ে কাজ করতে লাগলো। সে ভেবেছিলো একবার কল দিয়ে না পেলে, যে-ই কল দিচ্ছে না কেন আর দিবে না। কিন্তু নাফির ধারণা ভুল প্রমানিত করে ফোনে লাগাতার কল আসতে থাকে৷ এতে নাফির বেশ মেজাজ খারাপ হয়৷ সে বিব্রতবোধ করে সবার সামনে৷ ফোনে তখনও কল আসছে৷ নাফি এবার অধৈর্য হয়ে সবার থেকে একটু টাইম নেয়৷ ফোনে আননোন নম্বর দেখে সে মিটিংরুম থেকে বেরিয়ে এলো। বিরক্ততে ভ্রু কুঁচকে এলো তার। ওই অবস্থায় ফোন রিসিভ করলো সে। ওপাশ থেকে তখনই ভেসে আসে কারো উদ্বিগ্ন গলার স্বর,
“নাফি ভাই বলছেন?”
নাফির বিরক্ত ভাব তখনও কাটেনি৷ সে ওই অবস্থায় বলল,
“হ্যাঁ বলছি। আপনি কে বলছেন?”
ওপাশ থেকে একই কন্ঠে নাফিজ আবারও বলল,
“আপনি আমাকে চিনবেন না। বলতে পারেন আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী।”
নাফি অবাক হলো। তার চেয়ে বেশি হলো তার রাগ। নাফি দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“জ্বি? শুভাকাঙ্ক্ষী? তো কি ভালো চেয়েছেন আমার? কি জন্য কল করেছেন শুভাকাঙ্ক্ষী মশাই!”
নাফিজ থতমত খেয়ে বলল,
“আমি আপনার ভালো চাই, এইজন্য বলছি ভাই। আপনি আবার কিছু মনে করবেন না। আপনার স্ত্রী হিয়া?”
হিয়ার কথা শুনে নাফি বিচলিত হলো। তার হাতে সময়ও নেই৷ কিন্তু হিয়ার কথা শুনে সে ফোনটা কানে দিয়ে মনোযোগী হলো৷
“হ্যাঁ। হিয়া আমার ওয়াইফ৷ কিন্তু কেন বলুন তো!”
নাফির সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলা কথা শুনে নাফিজের বুকের ভেতরে ড্রিম ড্রিম বাজতে লাগলো। তবুও ও বলল,
“হিয়া তো ভালো না ভাই। শুনলাম ওর নাকি আপনার ছোট ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিলো। ভার্সিটিতে এমনও শোনা যায়, হিয়া নাকি রাজের সাথে বিছানায় ও গিয়েছে। এমন একটা মেয়ের সাথে আপনি সংসার করছেন ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না। তাছাড়া ওর আগেও কত জায়গায় রিলেশন ছিলো।”
ওপাশের ব্যক্তির কথা শুনে নাফির শরীরে যেন আগুন ধরে গেল। শুধু আগুন বলতে ভুল হবে, একেবারে ক্রোধের দাবানল যাকে বলে! নাফি পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলল,
“ধন্যবাদ এতো সুন্দর একটা খবর দেওয়ার জন্য। আসেন একদিন চা খাই একসাথে। আমার বউয়ের ব্যাপারে এতো খোঁজ নিয়েছেন, বলতেই হয় আপনি আমার শুভাকাঙ্ক্ষী। এই ঋন কিভাবে শোধ করি বলুন তো। কবর কি মা রা র পর দেবো নাকি জ্যা ন্ত পু তে দেবো? কোনটা করলে ভালো হয় বলুন। আপনার এই ঋন আমি রাখবো না।”
“আপনি বোধহয় রেগে গেছেন ভাই৷ কিন্তু আমি আপনার ভালোর জন্যই বললাম।”
“শু য়ো রের বাচ্চা আর একটা কথা বললে তোর জিভ আমি ছিঁড়ে ফেলবো। তুই কে কোথায় থাকিস সবই আমি বের করবো খুব শীঘ্রই। তারপর তোকে ২০ টুকরো করবো। তোর লা শে র হদিশ ও পাওয়া যাবে না প্রমিস করছি।”
নাফির আগের কথাতে নাফিজ শান্ত থাকলেও এবারে আর তা পারলো না। দ্রুত সে কল কাটলো। সাথে সাথে সিমটা খুলে ভেঙেচুরে ফেললো। কল কাটার পর নাফিজ বেজায় খ্যাপে গেল রুহির উপর,
“আপু আপনি জেনেশুনে আমাকে কেন আজরাইলের হাতে পাঠালেন? আপনার মনে হয় নাফি বিশ্বাস করবে ওসব কথা?”
নাফিজের কথা শুনে রুহিও একটু ঘাবড়ে গেল৷ আসলেই তো নাফিকে কি এতটা কাঁচা খেলোয়াড় মনে হয়! কখনো না৷ নাফি হলো একটা গভীর জলের মাস। ওকে বোকা বানানো এতোটা সোজা নয়৷
এবং সত্যিই ওদের ভাবনা ঠিক হলো৷ নাফি গায়ে লাগালো না অজ্ঞাত ব্যক্তির কথা৷ উল্টো সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হিয়ার জন্য নিয়ে এলো বিশাল এক ফুলের বুকে। নাসিমা,রুহি সহ হিয়া বসেছিলো ড্রয়িংরুমে। রাজও ছিলো তখন। নাফি কলিংবেল বাজাতেই হিয়া গিয়ে দরজা খুললো। ক্লান্ত নাফি চোখের সামনে স্নিগ্ধ হিয়াকে দেখে বরাবরের মতোই মুগ্ধ হলো। টের পেল তার ক্লান্তি সব চলে গেছে। হিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিলো ফুলের তোড়াটা। হিয়া হালকা হেঁসে হাত বাড়িয়ে নিলো সেটা। দরজা ছেড়ে দাঁড়ালো। নাফি ভেতরে ড্রয়িংরুমে এলে সে নরমালি সবার সামনে বলল,
“এটা কিসের জন্য?”
নাফি ততক্ষণে বুঝে গেছে তাকে কল দেওয়ার পেছনে, রাজ রুহির হাত আছে৷ তাই ও ওদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
“আমার জীবনে আসার জন্য ধন্যবাদ রোদ্দুরী।”
নাসিমার দিকে তাকিয়ে হেঁসে বলল,
“কি বলো আম্মু? ওকে একটা থ্যাঙ্কিউ তো দেওয়ায় দরকার। তোমার ঘোর প্রেম বিরোধী ছেলেকেও প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছে।”
নাসিমা হেঁসে উঠলেন। বললেন,
“এটা কিন্তু নাফি ঠিক বলেছে মামনী। তোমাকে এত্তোগুলা ভালোবাসা। আমার বড় ছেলের বউ দেখার ইচ্ছে তুমি পূরন করেছো।”
হিয়া লাজুক হাসলো কেবল৷ কিন্তু ওদের এই সুন্দর মুহুর্ত সহ্য হলো না রুহির। ও মুখ ভেংচি কেটে অন্য দিকে ফিরলো৷ বিরবির করে বলল,
“ঢং দেখলে বাঁচি না!”
রাজ তখন বিস্ময় নিয়ে দেখছে নাফি ও হিয়াকে৷ প্রকৃতি কি সুন্দর মিলিয়ে দেয়। কখনো শুন্যস্থান রাখে না।
সেদিন রাতে নাফি ছাঁদে ডাকলো ডাকে রুহি ও রাজকে। ওদের মাঝে কিছু একটা চলছে তা কেউ না বুঝলেও নাফি ঠিক বুঝেছিলো। তাই ওদেরকে কিছু বলতে না দিয়ে বলল,
“দেখ তোদের মধ্যে কি আছে না আছে সেটা আমি দেখতে যাবো না৷ কিন্তু আমার আর আমার স্ত্রীর মধ্যে তোরা যদি আসছিস, কসম খোদার আমি কিন্তু ছাড়বো না কাউকে৷
ভাবিস না প্রতিবার ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দিই বলে কিছু করবো না। এই-বার যেটা করেছে রুহি, ও যদি আমার নিজের কেউ হতো, সত্যি বলছি আমি ওর গায়ে হাত তুলতে দুইবার ভাবতাম না৷”
রাজ অবাক হলো। কেননা ও তো কিছুই জানে না৷ ও একবার রুহির দিকে তাকালো একবার তাকালো ভাইয়ের দিকে। সেদিন মার খাওয়ার পর ও আর কিছুই করেনি। নিজের ভালো তো পাগলেও বোঝে। ও শুধু শুধু কেন নাফির হাতে মার খাবে! সে যাইহোক! নাফির দিকে ভাবুক হয়ে তাকালে নাফি আবারও বলতে শুরু করলো,
“আমি আগেও বলেছি আর এখনোও বলছি হিয়ার সাথে আগে কি হয়েছে সেটা আমি ভালো ভাবেই জানি৷ আর তোর সাথে হিয়ার কেমন সম্পর্ক ছিলো সেটাও জানি৷ আমার হিয়া আর যাই হোক, বোনের বয়ফ্রেন্ডকে কেড়ে নেয়নি। ধোকা দিয়ে বিয়ে করেনি বোনের বয়ফ্রেন্ডকে। নিজেদের সাথে হিয়াকে মেলাতে যাবি না তোরা৷ আর হিয়া আমাকে বিয়ে করতে বলেনি। আমিই ওকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। এমনকি ও কবুল বলার আগ পর্যন্ত জানতো না কার সাথে বিয়ে হচ্ছে।
শোন, আমি জানি আমার হিয়া পবিত্র। আর আমার চোখে ও সবসময়ই এরকম থাকবে। ওকে খারাপ করতে গিয়ে তোরা আর নিজেদের ছোট করিস না প্লিজ।
আর রাজ আমি জানি এটা তুই করিসনি৷ এসব কথা রুহিকে বললাম আমি। তোর বউ তুই কিভাবে শাসন করবি সেটা তোর ব্যাপার। কিন্তু নেক্সট টাইম যদি এরকম দেখি, আমি কিন্তু সম্পর্কের বাঁধ মানবো না বলে দিলাম।”
নাফি কথাটা বলে রুহির দিকে চোখ গরম করে তাকালো একবার। তারপর গটগট করে নিচে চলে গেল যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই।
সেদিন রুহি বেজায় অপমানিত হয়েছে৷
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩৩
সেদিনের কথা ভাবতেই রুহির মুখটা একটুখানি হয়ে গেল। এরপর ওদের তিনজনের উদ্দেশ্যে বলল,
“আচ্ছা, আপাতত কিছুদিন ঠান্ডা থাক সবাই৷ দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়াই।”
রুহির কথাতে সম্মতি জানালো সকলে।
