লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৮
নুসাইবা আরা নুরি
সময় পানির স্রোতের ন্যায় বহমান।দেখতে দেখতে কেটে গেছে দুইদিন।তবে বদলাইনি কিছু।শুধু বদলে গেছে ফাহিমের প্রতি ইরুর তৈরি হওয়া ভালোবাসা টুকু।ইরু এই দুইদিন নিজেকে সামলিয়ে নিয়েছে।তার সৎ মা তাকে খুব ভালো করেই বুজিয়ে দিয়েছে সে যদি ফাহিমের সাথে কথা বলে কিংবা বিয়ে করতে চাই তাহলে তার ভাইয়ের কপাল পুড়বে।ইরু প্রথমে কথাটাতে পাত্তা দেই নি।কারন তার ভাই তো এতিম খানায় আছে কিভাবে আর কপাল পুড়বে।কিন্তু কাল যখন তার সৎ মা ভিডিও কলে দেখালো তার ভাই কাদছে শুধুমাত্র তার একটা ভুলের জন্য সৎ মায়ের কথা সেখানে থাকা হুজুর তাকে পিটিয়েছে।তখন ইরু নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।সে জানেনা তার সৎ মা তার উপর এতো ক্ষিপ্ত কেন। কি দোষ তার।আর যে সম্পত্তির জন্য তার উপর নির্মম অত্যাচার করছে তা তো ইরু দিয়ে দিতো।কিন্তু আইন অনুযায়ী আঠারো বছর না হলে সেটাও দিতে পারবে না।ইরু ভাবে হয়তো আঠারো বছর পর জমি দিয়ে দিলে তার মুক্তি কিন্তু ইমা আপু তাকে বলেছে তার মা ফাহিম নামের ছেলেটাকে পছন্দ করেনা।কারন সে উকিল।
ইমা এটাও বলেছে ফাহিম হয়তো তাকে ভালোবাসে না।ভালোবাসলে অন্তত সেদিন মুখ ফুটে কিছু বলতে পারতো বা তাকে জোর করে হলেও বিয়ে করতে চাইতো।কিন্তু সে কিছুই করেনি বরং সবাইকে নিয়ে চলে গেছে।আর এখন তো তার মা রেগে আছে যেহেতু ইরু বড় হয়েছে তাই সব বুজে শুনে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে ইমা।যেনো পরে পস্তাতে না হয়।
তারপর থেকেই ইরু নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।সেতো ওই লোকটাকে ভালোবাসেনি কখোনো শুধুমাত্র ক্ষনিকের ভালো লাগা ছিলো।হয়তো লোকটার ও আবেগ কাজ করেছিলো।তাই আর তাকে জোর করে বিয়ে করতে চাইনি।ইরু নিজের মন কে শক্ত করেছে।সে জানে তার সৎ মা কতটা খারাপ হতে পারে।ইরু নিজেকে কোনোদিন মাফ করতে পারবে না যদি তার ভুলের জন্য তার আদরের ছোট ভাইয়ের কোনো ক্ষতি হয়।মাঝে মাঝে ইরুর ভিষণ দোম বন্ধ লাগে মরে যেতে ইচ্ছা হয়।তবে পারেনা।সিলিং এ ঝুলে যেতে মন চাই।তবে পারেনা হয়তো তার ভাইটা একেবারেই এতিম হয়ে যাবে তখন।এখন তো তাও জানে তার আপা বেচে আছে।আর তখন তো কেও থাকবে না।ইরু ওর ভাইকে নিয়ে জমিটা সৎ মাকে দিয়ে অনেক অনেক দূরে চলে যাবে।যেখানে শুধু তারা দুই ভাই বোন থাকবে।কেও মারবে না বকবে না।এতোদুরে চলে যাবে।
দুপুরের পর পরই ইরুদের বাড়িতে শ্রেয়সী এসে হাজির হয়।রোকেয়া কখোনো শ্রেয়সীর সাথে খারাপ ব্যবহার করেনা বরং সব সময় হাসি মুখেই কথা বলে।এতে ইমার একটু অবাক লাগ্লেও তাতে পাত্তা দেই না।জোমের মতো ভয় পায় মাকে।শ্রেয়সী ইরুকে নিয়ে কোচিং এর জন্য বেরিয়ে পড়ে।সপ্তাহে ৩ দিন ফিজিক্স আর বাকি ৩ দিন আই সি টি পড়তে যায় ওরা।আজকে ফিজিক্স স্যার এর কাছে পড়া শ্রেয়সী রিক্সায় যেতে চাইলেও ইরু বলে,
-এখোনো পঁয়ত্রিশ মিনিট বাকি ধীরে হেটে চল।সমস্যা হবে না।
ইরুর কথার উপরে শ্রেয়সী আর কথা বাড়ায় না।এই দুদিন সেও পড়তে যায়নি।কাল এসে ইরুর থেকে সব ঘটনা শুনেছে তবে ইরু নিজের মারের কথাটা লুকাতে গিয়েও লুকাতে পারেনি।কিভাবে লুকাবে বেস্ট ফ্রেন্ড এর চোখ ফাকি দেওয়া যায়।রাস্তায় হাটতে হাটতে বেশ কিছুদুর যাওয়ার পর বড় রাস্তার সামনে এসে দাঁড়ায় ইরু আর শ্রেয়সী। রাস্তা টা পার হলে আবার ফুটপত ধরে সোজা চলে গিয়ে দুটো গলির পরেই স্যারের বাড়ি।রাস্তার কাছে এসে দাড়াতেই ইরুর চোখ যায়।দূরে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফাহিমের দিকে দূর থেকেই চিনে যায় লোকটাকে।
ইরুর মনের ক্ষত আবারো যেগে উঠে।সৎ মায়ের মার খাওয়া।আর তাকে রেখে লোকটার চলে যাওয়া।ইমা আপুর কথা সব মিলিয়ে ইরুর মনে রাগ জন্মে গেছে ফাহিমের প্রতি।ভালোবাসলে তো এই দুদিন এর একদিন হলেও বাড়ির আশে পাশে দেখতো।কয় পাই নি তো।ইরু তো সারাদিন ই বাড়ির সাদে থেকেছে কিছুক্ষন পর পরই সাদে গিয়েছে।ইরু শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে বলে,
-শ্রেয়সী আজ আমরা ওই পাশের রাস্তা দিয়ে যাবো।এই রাস্তা দিয়ে যাবো না।
-কেন??
শ্রেয়সী ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে।সে সব জানা সত্তেও জিজ্ঞাসা করে।কারন কাল ইরুর থেকে সব শোনার পর রাতে সব মেহেরাজের কাছে জিজ্ঞাসা করে।তারপর মেহেরাজের কথা শুনে বুজতে পারে।এখানে ইরুর সৎ মা বাদে কারোর দোষ নেই।সেটা ইরুকে বোজাতে হবে তাই তো আজ মেহেরাজ ফাহিমকে নিয়ে সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে চায়ের দোকানের সামনে।শ্রেয়সীর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ইরু শ্রেয়সীর হাত ধরে রাস্তা পার হয়ে সোজা না গিয়ে বাম দিকের ফাকা রাস্তা দিয়ে ঢুকলো।এই রাস্তা দিয়ে দেরি হলেও সে আর ফাহিমের মুখোমুখি হতে চায় না।শ্রেয়সী ইরুর হাত টেনে ধরে বলে,
-আরে কি হলো এই রাস্তা দিয়ে গেলে দেরি হিয়ে যাবে। ওই রাস্তায় কি হলো??
শ্রেয়সীর কথায় ইরু দাড়ালো।তারপর শ্রেয়সীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-সব জেনেও যদি তোর না জানার ঢং করতে ইচ্ছা হয় তাহলে তুই যা ওই রাস্তা দিয়ে আমি আসি।
কথাটা বলেই ইরু পিছু ঘুরে হাটতে শুরু করে।এদিকে শ্রেয়সী বুজতে পারে ইরু রেগে আছে।তাই ইরুর হাত টেনে ধরে বলে,
-দোস্ত তুই ভুল বুজছিস।আমি সেটা বুজাইনি।কিন্তু ফাহিম ভাইয়ের কথা গুলো তোর শোনা দরকার।তুই তো আমাকে বুজিয়েছিলি। আমি না হয় সে সময় ভুল বুজেছিলাম।কিন্তু আজ অন্তত আমাকে ভুল না বুঝে আমার কথাটা শোন।যা হবে ভালোর জন্যই হবে।
শ্রেয়সীর কথায় ইরু তাচ্ছিল্যর হাসি হাসলো তারপর বলল,
-সেদিন আমার যতটা কষ্ট হয়েছিলো সেই কষ্ট টা আমি তোকে দিতে চাই না।তাই তোর কথা গুলো তোকে ফিরিয়ে দিলাম না।আর তোর ঘটনা আমার বাস্তবতা সম্পুর্ন ভিন্ন।তাই এসব নিয়ে না ঘাটায় ভালো।তুই গেলে যেতে পারিস আমার সাথে।নয়তো আমি গেলাম।
বলে ইরু হাটা শুরু করলো।বুকের ভিতর ভার হয়ে আসছে তার।চোখ জোড়ায় অশ্রু জমে উঠেছে।ভীত মেয়েটাকে আজ কত বড় পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হচ্ছে।কি হতো যদি ফাহিম নামের লোকটার সাথে তার দেখা না হতো।ইরু শ্রেয়সী কে কষ্ট দিতে চাইনা।তাই আর কিছু বললো না।নয়তো বলতো তুই কি কখোনো মার খেয়েছিস কারোর কাছে।আমি খেয়েছি ভুল করলেই কু*ত্তার মতো মারে আমাকে।ইরুর চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।পিছনে ফিরে তাকায় না।
শ্রেয়সী বুজতে পারে একই ঘটনার সুত্রপাত আবারো হচ্ছে।আর ঘটনা ঘুরে যাচ্ছে তাই আর কিছু না ভেবে দৌড়ে ইরুর পাশাপাশি গিয়ে হাটতে শুরু করলো।ঠান্ডা মাথায় বোজানো যাবে তবে এখন না।এদিকে হটাৎ শ্রেয়সী অন্য দিকে ঘুরে যেতে দেখে মেহেরাজ আর ফাহিম বাইক নিয়ে এগিয়ে আসে সে রাস্তায়।শ্রেয়সী সেদিন বলার পর থেকে মেহেরাজ আর তেমন গাড়ি চালায় না।এখন বেশির ভাগ সময় বাইক চালায়।
গলির রাস্তায় প্রবেশ করতেই মেহেরাজ দেখতে পায় ইরু আর শ্রেয়সী পা দ্রুত চালিয়ে হাটছে।ফাহিম তা লক্ষ করে।মেহেরাজ ফাহিমের উদ্দেশ্যে বলে,
-মেয়ে জাতির রাগ অভিমান বেশি।দুইদিন কেটে গেছে আজ যখন দেখা পেয়েছিস।আজ অন্তত সময় টাকে কাজে লাগাবি।হয়তো তুই এসেছিস দেখতে পেয়ে ভিন্ন রাস্তা ধরেছে।বলেছিলাম না রাগ করবে দেখেছিস??
ফাহিম চুপ করে শুনে যায়।যেভাবেই হোক মেয়েটাকে আজ রুলে নিয়ে গিয়ে হলেও বিয়ে করবে।দুটো দিন অপেক্ষা করেছে সে দেখা পায়নি।ইরুর বাড়ির সামনে যায়নি যদি তার কারনে ইরুকে অত্যাচার করে ওই মহিলা।একবার ইরুকে বিয়ে ক্ক্রতে পারলে সমস্ত অত্যাচার এর প্রতিশোধ গুনে গুনে তুলতে পারবে ফাহিম।কিন্তু সবার আগে ইরুকে তার নিজের করে নিতে হবে।
মেহেরাজ বাইক এর স্পীড বাড়িয়ে টান দিয়ে বাইক থামায় শ্রেয়সীদের সামনে।রাস্তা বেশ শুনশান।নিরবতা ছেয়ে আছে সর্বত্র।পাখির কিচিরমিচির করছে গাছের ডালে ডালে।ক্ষনে ক্ষনে গাড়ি যাওয়ার শব্দ ভেসে আসছে বাতাসে।
হটাৎ সামনে বাইক থামায় থমকে দাঁড়ায় ইরু আর শ্রেয়সী। ইরু চোখ তুলে সামনের দিকে তাকানোর সাথে সাথেই চোখাচোখি হয়ে যায় ফাহিমের সাথে।ফাহিম দ্রুত বাইক থেকে নেমে দাঁড়ায়।মেহেরাজ ও বাইক স্টান্ড করে নেমে ফাহিমের পাশে এসে দাঁড়ায়।চোখ যায় শ্রেয়সীর চোখের দিকে।বার বার শ্রেয়সীর চোখের দিকে তাকালেই মেহেরাজের ঘোর লেগে যায় প্রতিবার।
মেহেরাজের ঘোর লাগা দৃষ্টির মাঝেই শ্রেয়সী ফাহিমের দিকে তাকায় ফলে মেহেরাজের ঘোর কেটে যায়।ইরু ফাহিম কে দেখে কিছুটা রেগে গিয়ে শ্রেয়সীর হাত টা শক্ত করে চেপে ধরে বলে,
-রাস্তা থেকে সরুন।
ইরুর তেজে ভরা কন্ঠ।ফাহিম অবাক হয়। ভীত মেয়েটার কন্ঠে আজ এতো আগুন কিভাবে।তবে ফাহিম হাল ছাড়ে না।হাত মেলিয়ে ইরুর পথ আটকে বলে,
-রাস্তা কি তোমার বাবার ইরাবতী। যে আমি সরে যাবো।সরকারি রাস্তা আর আমি ও সরকারের অধীনে কর্মরত একজন মানুষ সেহেতু রাস্তাটা আমার এখন।আমি যেখানে ইচ্ছা দাড়াবো তোমার কি??
-কিছু না।
কথাটা বলে ইরু শ্রেয়সীর দিকে তাকালো।শ্রেয়সী ও তার দিকে তাকিয়ে আছে।ইরু শান্ত কন্ঠে বলল,
-তুই আমার সাথে যাবি নাকি এখানে থাকবি শ্রেয়সী??
ইরুর কথায় শ্রেয়সী মেহেরাজের দিকে তাকায়।তা দেখে ইরু এতক্ষন শক্ত করে চেপে রাখা শ্রেয়সীর হাত খানা ছেড়ে দেয়।শ্রেয়সী চমকায়।ইরু শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে বলে,
-সমস্যা নেই পাখি।এমন তাকাতাকি না করে মুখে না বললেই বেশি খুশি হতাম আমি।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৭
কথাটা বলে ইরু ভাঙা হৃদয় নিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে রাগে দুঃখে নিজের কাধের ব্যাগ টা শক্ত করে চেপে ধরে পিছন ঘুরে হাটতে শুরু করতেই হটাৎ পিছন থেকে একটা শক্ত হাত এসে ইরুর হাত টেনে ধরে।ইরুর চোখ ভিজে উঠে।সাথে সাথে মায়ের বলা কথা গুলো মনে হতেই ইরুর রাগে চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে।ইরু রাগে আড়চোখে হাতের দিকে তাকায়।উজ্জল শ্যমলা বর্নের একটা হাত তার হাত চেপে ধরে আছে।ইরুর রাগ বেড়ে যায়।হাত টা ঝাড়া মেরে পিছনে ঘুরে তাকায় লোকটার গভীর চোখের দিকে।
