লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৯
নুসাইবা আরা নুরি
ইরু ফাহিমের দিকে ঘুরলেও ফাহিম ইরুর হাত ছাড়ে না।চেপে শক্ত করে ধরে রাখে।ইরু হাত ঝাড়া মেরেও ফাহিমের হাত ছাড়াতে না পেরে রাগী কন্ঠে বলে,
-আমার হাত ছাড়ুন।
-সমস্যা কি তোমার।ইগনোর করছো কেন আমাকে।
-হাত ছাড়ুন।
ইরুর নিজেকে সামলিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে।তবে ইরুর কন্ঠে ফাহিম কিছুটা রেগে যায়।তারপর রাগী গলায় বলে,
-আমার কথার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমি হাত ছাড়বো না।
ফাহিম আরো জোরে সিরুর হাত চেপে ধরে।শ্রেয়সী হাত করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।তা দেখে মেহেরাজ শ্রেয়সীর মুখের সামনে তুড়ি মেরে বলে,
-ওদের দিকে না তাকিয়ে আমার দিকে তাকালেও পারতেন মিসেস প্রেম হয়ে যেতো।
মেহেরাজের কথায় শ্রেয়সী মেহেরাজের দিকে টেরা চোখে তাকিয়ে বলে,
-চুপ করুন অশুদ্ধ লোক।
-চুপ করলে কি কিচ দিবা লিটল বার্ড।
শ্রেয়সী এবার ফুসে উঠে তাকায় মেহেরাজের দিকে।কিছু বলতে যাবে তখনই দেখতে পায় ইরু ফাহিমের কলার চেপে ধরে কঠিন গলায় বলে,
-কে ভাই আপনি।কিসের ভালোবাসেন আমাকে।ভালোবাসা কি বুজেন আপনি।আর বিয়ে মানে।হাও জোকস।
ইরু রাগী কন্ঠে কথা গুলো বলে।শান্ত নদীর মতো মেয়েটা হটাৎ বাঘিনীর রুপ নিয়েছে।ফাহিম যখনি হাত ধরে তার ভালোবাসা প্রকাশ করে বিয়ের কথা বলেছে তখনই ইরুর তার সৎ মায়ের বলা কথা গুলো মনে পড়েছে।অন্য সময় হলে ইরু হয়তো খুশি হতো কিন্তু বাস্তবতার কাছে সে হেরে গেছে।নিজের ভাইয়ের জীবন বাচাতে নিজের আবেগ কে ব*লি দিতেও প্রস্তুত ইরু।
ফাহিম শান্ত ভাবে ইরু হাত নিজের কলার থেকে ছাড়ায়।তারপর ইরুর দিকে তাকিয়ে বলে,
-মাথা ঠিক আছে তোমার।কি বলছো এসব। আমি তোমাকে ভালোবাসি না।আর বিয়ে মানে বুজো না তোমাকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে নিতে চাই আমি।
ফাহিমের কথায় মনের কষ্ট গুলো লুকিয়ে হেসে ফেললো ইরু।ইরুর হাসি দেখে সবাই অবাক।ইরু এবার ফাহিমের থেকে কিছুটা সরে এসে বলল,
-সেই বিয়ের আশা দুইদিন আগেই মৃত্যুবরন করেছে যখন আপনি চলে গিয়েছিলেন আমার দিকে রাগী দৃষ্টি ফেলে।তখন বুজেছি আপনি আমায় কখোনো ভালোবাসেন নাই।ভালোবাসলে অন্তত সেদিন আমার সৎ মায়ের মুখের উপরে একটা কিছু হলেও বলতেন।।
ইরুর কথায় ফাহিম চুপ করে যায়।মেহেরাজ ও চুপ মেরে যায়।আসলেই সেদিন দাহিম কিছুই বলেনি।ফাহিমের উচিত ছিলো সেদিন নিজের ভালোবাসাকে আদায় করে নেওয়া।তবে ফাহিম তা করেনি।ফাহিম মাথা নিচু করে নেয়।ইরু আবার কিছু বলতে যাবে।তার আগে ফাহিম বলে,
-সেদিনের জন্য সরি।আসলে আমি হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।আর সেদিন আমার মা ছিলো সাথে তোমার বয়স এখন আঠারো ও হয়নি।যে তোমাকে জোর করে হলেও বিয়ে করবো।বোজার চেষ্টা করো।কিন্তু আমি এখন তো বলছি চলো বিয়েটা করি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ইরাবতী!!
ইরু ফাহিমের কথায় হাহা করে হেসে উঠলো তারপর আবার বলল,
-সরি বললেই সব সমাধান হয়ে যায় না।আর আমি আপবাকে বিয়ে তো দূর ভালো ও বাসিনা।যাস্ট আওনি আমায় জোর করতেন বলেই সব মেনে নিয়েছি তবে আর না।
-আমি তোমাকে ফোর্স করেছি??আমি তো বলতাম তুমি কি আমায় ভালোবাসবে।তুমি তো চুপ থেকেছো।নিরবতার উত্তর সব সময় হ্যা হয় তুমি তো সেটাও জানো।তাহলে এসব কি ইরাবতী।
-অবশ্যই আপনি আমাকে ফোর্স করেছেন।আর সব সময় চুপ থাকার উত্তর হ্যা হয় না।আমি এতকাল চুপ ছিলাম বোকা ছিলাম এখন আর নেই।মাফ করবেন আসি।
ইরুর বুক ভরে শাস নেয়।তারপর শ্রেয়সীর দিকে তাকায়।শ্রেয়সীর দিকে চোখাচোখি হতেই ইরু চোখ নামিয়ে নিয়ে পিছু ঘুরে কয়েক কদম এগোতেই ফাহিম আবারো ইরুর হাত চেপে ধরে। তারপর বলে,
-কিন্তু তুমি তো আগে কখোনো না বলোনি।আর আমি তোমাকে ভালোবাসি।বিয়ে করতে সমস্যা কি তোমার।আর ফোর্স করলেও তুমি সায় দিয়েছো এখন আমি তোমাকে বিয়ে করবো মানেই করবো।তোমার লজ্জা করেনা একজনকে ভালোবাসার আশা দিয়ে ছেড়ে যেতে।বেয়াদবের মতো কাজ করছো।চরিত্রহীন মেয়েদের মতো।
ফাহিম রাগের কারনে শেষ কথাগুলো মুখ ফসকে বলে ফেলে।তার ভীষন খারাপ লাগছে ইরুর কথা শুনে।সে ভেবেছিলো আজ বিয়ে হয়ে যাবে।ভালোভাবে।কিন্তু আজ যে অন্য ইরু কে আবিষ্কার করবে ভাবে নাই।ফাহিমের কথায় ইরুর খারাপ লাগলেও এতক্ষন শেষ কথা গুলো শুনে ভীষণ রাগ হয়।ঘৃনা জন্মে যায় ফাহিমের উপর।রাগ সামলাতে না পেরে ইরু ঘুরে ঠাশ করে চড় বসিয়ে দেয় ফাহিমের গালে।সাথে সাথে ফাহিমের চোখের চশমা টা নড়ে উঠে এক পাশে হেলে পড়ে।।
ফাহিম কিছু বুজে উঠার আগেই ইরু রাগে ফাহিমের হাত নিজের থেকে ছাড়িয়ে কলার চেপে ধরে বলে,
-চরিত্রহীন আপনার মতো মানুষ আমরা না।রাস্তায় মেয়ে দেখলেই পথ আটকে দাড়াতে তার হাত ধরতে লজ্জা লাগে না আপনার।আর কিসের ভালোবাসা আমি আপনাকে কোনোদিন বলেছি আমি আপনাকে ভালোবাসি।বলিনি কারন আমি আপনার মতো মানুষদের সব সময় ঘৃনা করি।ফারদার আজকের পর আমার সামনে যদি আসেন তো মনে রাখবেন আপনার তো কোনো কিছু করতে পারবো না তাই আমি নিজেই দুনিয়া থেকে বিদায় নেবো।মাথায় রাখবেন ফাহিম আহমেদ আমি আপনাকে যাস্ট ঘৃনা করি এখন।যাস্ট ঘৃনা।
কথাটা বলে ফাহিমের কলার ছেড়ে দেয়।আর কোনোদিকে না তাকিয়ে বাড়ির রাস্তায় হাটা শুরু করে।পিছনে ফেলে রেখে যাওয়া তিনটে মানুষ এখন একদম নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার চলে যাওয়ার দিকে।শ্রেয়সীর ধ্যান ভাংতেই মেহেরাজের থেকে কোনো রকমে ইরুর পিছনে ছুটতে শুরু করে।
মেয়েটা যেনো আবার তাকে ভুল না বুজে ফেলে।সে তো যাস্ট বোজাতে চেয়েছে।কিন্তু হলোটা কি ইরুর।এমন রাগী রুপ আগে কখোনো দেখেনি শ্রেয়সী। ভীতু মেয়েটা এতটা রেগে গেলো কেন।ইরু তো নিজ মুখেই তাকে বলেছিলো সে ফাহিম কে পছন্দ করে তাহলে আজ এগুলো কি বললো।শ্রেয়সী ভাবতেই ইরুর পাশে এসে দাঁড়িয়ে হাটতে থাকে।তবে ইরু রাগের কারনে সেসব এ পাত্তা দেই না।তাকায় ও না।বুক ভেঙে কান্না আসে ইরুর।চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে শুরু করে।তবে শ্রেয়সী হাল ছাড়ে না।বকবক করে রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করে ইরুর।
প্রায় সাতাশ ঘন্টা পর অনলাইন এ ঢুকেছে আজ তোহা।সিয়ামের বাড়িতে আস্তে আজ দেরি হবে তাই ঘরে এসে বসেছে।ম্যাসেন্জারে ঢুকতেই অবাক হয় তোহা ভ্রু জোড়া কুচকে যায়।তার গ্রুপ টা খুজে পাচ্ছে না তার যায়গায় নতুন নামের একটা গ্রুপ।যেখানে তার গ্রুপের নাম ছিলো “ফ্রেন্ড’স জোন” কিন্তু তার কোনো হদিশ নেই সেখানে নতুন নামের গ্রুপ।স্টাইলিশ ভাবে নাম দেওয়া “শ্যাডো সেক্টর সেভেন”
তোহা ভ্রু কুচকে গ্রুপে ঢুকতেই দেখে গ্রুপের সকল মেম্বার দের নিকনেম ও চেঞ্জ করে দিয়েছে।এমন কাজ কে করেছে দেখতে এভ ম্রিয়ন মেনশন দিতেই মিলি এসে সিন করে।তারপর টাইপিং করে,
-হাই??
-হ্যালো??
-কেমন আছিস??
-আলহামদুলিল্লাহ তুই।আচ্ছা গ্রুপের নাম আর সবার নাম চেঞ্জ করলো কে??
তোহার ম্যাসেজ এ মিলি একটা হাহা রিয়েক্ট দিয়ে বলে,
-কেন ভালো লাগছে না??
-তাতো বলিনি কে চেঞ্জ করছে তাই বলছি।আর নামটার মানে কি??
তোহার কথায় মিলি বেশ কিছুক্ষন সময় নিয়ে টাইপিং করে,
-আমাদের গ্রুপের নাম আর সবার নাম আমি চেঞ্জ করেছি।নামটা আমাদের সাত জনের টিম এর জন্য পারফেক্ট আর সবার নিকনেম এ নিজের ডাকনাম লিখে দিয়েছি।
-ওহ।
তোহা আর মিলির কথার মাঝে গ্রুপে জয়েন হয় EM। মিলি আর্মির একজন ডাক্তার। খুব বেশি তাকে গ্রুপে পাওয়া যায়না আজ এসে যখন দেখছে কেও নেই তাই সব চেঞ্জ করে ফেলেছে।তোহা ঘরের দরজা লাগিয়ে কানে ব্লুতুথ গুজে গ্রুপে কল দেয়।মিলি রিসিভ করে।তারপর EM ও জয়েন হয়।তোহা ওকে গ্রুপে জয়েন হতে দেখে হেসে বলে,
-কি ব্যাপার হ্যাকার বাবাজি তুই আজ গ্রুপে।
তোহার কথায় পাত্তা না দিয়ে EM মিলির উদ্দেশ্যে বলল,
-মিলি ওকে বলে দে ও আর ওর ভাই আমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করছে।তাই ওর সাথে কথা নেই।
Em এর কথা শেষ হতে না হতেই গ্রুপে জয়েন হয় নিশাদ আর তুহিন।গ্রুপে জয়েন হয়ে EM এর কথা শুনে তুহিন বলে,
-এহহ তুই ডাক্তার হলেও আমার বোনকে দিতাম।তুই তো ডাক্তার এর ড ও হতে পারলি না।আমার বোনকে তোর কেন দিতাম??
তুহিনের কথায় এবার Em বলে,
-দেখ শালা আমি চুপ আছি থাকতে দে রাগাবি না। নয়তো তুই কেন বিয়ে করছিস না সবাইকে বলে দিবো কিন্তু??
-চুপ কর।
তুহিনের কথায় গ্রুপের সবাই হেসে উঠে।মিলি তাড়াতাড়ি বলে,
-ইভান বলে দে।তুহিন রে একটু পচানোর সুজোগ করে দে।
-না না মিল্লু বিল্লু তুহিন আমার একমাত্র না হওয়া শালা ওকে পচাতে পারবো না।(Em)
-এ তুই আমামে বিল্লু বলবি না কুত্তা।(মিলি)
মিলির কথায় আর এক দফায় সবাই হেসে উঠে।যখন সবাই ফ্রী থাকে তখন গ্রুপে এসে একটু আড্ডা দেই।তবে আজ ফাহিম আর মেহেরাজ নেই।যদিও মেহেরাজ সব সময় থাকে না।তবে ফাহিম কে না দেখে ইভান বলে,
-কিরে আজ আমার প্রেজেন্ট শালা নেই কেন গ্রুপে।খুব মিচ করছি।
-সবাই কি তোর শালা রে কুত্তা??
মিলির কথায় তোহা হেসে ফেলে।তারপর ইভাবের উদ্দেশ্যে বলে,
-মেহেরাজ আর ফাহিম আজ একটা কাজে গিয়েছে।
-কি কাজ??
তুহিনের কথায় তোহা বলে,
-সফল হোক তারপর সারপ্রাইজ দিবো। এখন সিক্রেট থাক।
-উকে না হওয়া বউ।
-ইভানের বাচ্চা মেরে নাক ফাটিয়ে দিবো কিন্তু।
তোহার কথায় গ্রুপের আবারো সবার হাসির রোল পড়ে।যখন তারা আড্ডা দেয় তখন তাদের ভিতরে লুকোনো বাচ্চা রুপ টা প্রকাশ পায়।গম্ভীর রুপ টা হারিয়ে যায়।বাকি সবার কাছে গুরু গম্ভীর হলেও গ্রুপে সবাই সবার কাছে পুরো খোলা বইয়ের মতো।কারোর ইগো নেই সবাই সবার জন্য ফ্রী।গ্রুপে সবার মাঝে নিশাদ এক মাত্র চুপ চাপ সভাবের।আর তার থেকেও চুপ চাপ মেহেরাজ।এরা যেনো গ্রুপে শুধু ম্যাসেজ সিন করতেই প্রবেশ করে।তবে আজ আর মেহেরাজ আর ফাহিম নেই।বাকি পাঁচ জন আড্ডা দিতে দিতে অনলাইনে লুডু খেলতে শুরু করে।কাজের মাঝেও এক রাশ প্রশান্তি খেলে যায় তাদের মাঝে যখন তারা একে অপরের সাথে কথা বলে।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৮
পশ্চিম দিগন্তে মেঘ জমেছে হয়তো বৃষ্টি হবে।ফাহিম নিশ্চুপ হয়ে গেছে।মুখ দিয়ে কোনো কথা আসছে না ওর।মেহেরাজ ফাহিম কে নিয়ে একটা কফি শপে এসে বসেছে।তবুও ফাহিমের মুখে কোনো কথা নেই।
ওয়েটার কফি দিয়ে যাওয়ার পর মেহেরাজ ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলে,
-কি ভাবছিস এতো।টেনশন বাদ দে।যা হবার হয়েছে।এখন ভাব কি করবি এখন??
মেহেরাজের কথায় এতক্ষন পর ফাহিম মুখ তুলে তাকায় মেহেরাজের দিকে।কফির কাপটা হাতে ধরে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো ধোয়া উঠা কফির দিকে।তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
