Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪
নুসাইবা আরা নুরি

রাত একটা বেজে পচিশ। মির্জা বাড়ির মেন গেট এর সামনে এসে দাড়িয়েছে একটা কালো রঙের প্রাইভেট।দারোয়ান গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই মেহেরাজ জানালার কাচ নামিয়ে দেয়।দারোয়ান মেহেরাজ কে চিনতে পেরে সালাম দেয়।তারপর গিয়ে বিশাল গেট টা টেনে খুলে দেয়।
মেহেরাজ গাড়ি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে।বিশাল এরিয়া নিয়ে মির্জা বাড়ি।হাসান সাহেবের অনেক শখের বাড়ি।নিজের কর্মজীবনে তীল তীল করে গড়ে তুলেছে বাড়িটি।দুতলা বিশিষ্ট বাড়িটা অসম্ভব সুন্দর। সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেই বিশাল ডাইনিং।এক পাশে রান্না ঘর।রান্নাঘরের পাশ ঘেঁষে পর পর দুটো বেড রুম।তারপর একটা লাইব্রেরি।লাইব্রেরি রুমের পাশ দিয়ে দোতলা উঠার সিড়ি।দোতলায় উঠতেই পর পর তিনটা ঘর।তিন নম্বর ঘরের পাশ দিয়ে সাদে উঠার সিড়ি।

নিলয় সাহেবের দুই ছেলে বড় ছেলে মেহেরাজ মির্জা ও ছোট ছেলে ইভান মির্জা।ইভান কানাডাতে ডাক্তারি পড়ছে।দেশে আসতে বললে একটা কথাই বলে ডিগ্রি নিয়েই ফিরবে তার আগে না।নাহিদা খাতুন খুব কাদেন নিজের দুই ছেলে দুজনেই হাতের বাইরে।একজনের তো সমুদ্রে গেলে মাসের পর মাস আর খোজ থাকে না।আর একজনকে কল দিলেও মাঝে মাঝে পাওয়া যায় না।
মেহেরাজ বাড়ির সদর দরজায় এসে কলিং বেল চাপে বেশ কয়েকবার।গম্ভীর মুখ খানা শান্ত সমুদ্রের ন্যায়।মনের ভেতরের কথা কারোর পড়ার সাধ্য নেই।বেশ কিছুক্ষন কলিং বেল চাপার পর বাড়ির কাজের মহিলা রহিমা খালা চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুলে দিয়ে বলে,
-কে??
কথাটা বলে সামনে লম্বা চওড়া সুপুরুষ মেহেরাজ কে দেখে চিনতে একটুও অসুবিধা হয় না রহিমার।সাথে সাথে চিল্লিয়ে বাড়ি মাথা তুলে,

-কই সবাই বড় ভাইজান বাড়িতে আইছে।খালাম্মা ঘুমাইছেন কই আপনে।
কথাগুলো চিল্লিয়ে বলতে বলতে ভেতরে চলে যান।মেহেরাজ ও বাড়ির ভিতরে ঢুকে হাতে থাকা ল্যাগেজটা নিয়ে।রহিমার এই মাঝ রাতে বাড়ি মাথায় তুলে চিল্লানো দেখে নিলয় মির্জা,, নাহিদা খাতুন।শারমিন খাতুন,,হাসান সাহেব সবাই নিজেদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।হাসান সাহেব রহিমাকে কিছু বলে ধমক দিতে যাবে তার আগেই শারমিন খাতুন ছুটে গিয়ে মেহেরাজের সামনে গিয়ে বলতে শুরু করে,
-দাদু ভাই তুই বাড়িতে ফিরছোস।কতদিন তোরে দেখি নাই।একবারো কি মনে পড়ে আমারে।
কথাটা বলে চুমু দিতে থাকে মেহেরাজের মুখে।মেহেরাজ সবার সাথে গুরুগম্ভীর হলেও তার দাদীর কাছে সে বেশ হাসি খুশি।নাহিদা নিজের ছেলেকে দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে কেদে ফেলেন।সেদিন মেহেরাজ চলে যাওয়ার পর কতবার মেহেরাজ কে কল করেছে তবে মেহেরাজ ধরেনি।আর আজ কত দিন পর ছেলেটাকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে গেছেন তিনি।
বেশ খানিক্ষন পর মেহেরাজ নাহিদা খাতুন কে ছাড়িয়ে নিজের বাবা আর দাদার পায়ে সালাম করে।যদিও নিলয় মির্জার নিজের ছেলের উপরে রাগ তবে তা এখন প্রকাশ করলেন না।কারন ছেলেটা সবে মাত্র বাড়িতে ফিরেছে।

প্রতিদিনের মতো আজকেও ফজরের আজানের পরপরই মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙে শ্রেয়সীর।ওয়াশরুম থেকে ওযু করে এসে নামাজ পড়ে নেয় মায়ের সাথে।নামাজ শেষে শ্রেয়সী পড়তে বসে আর খাদিজা খাতুন চলে যান রান্না ঘরে।
নিত্যদিনের মক্তো আজ ও রান্না ঘরে এসে দেখেন তোহা মাথায় উড়না দিয়ে বেশ পরিপাটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।খাদিজা খাতুন কত বার তোহাকে নিষেধ করেছে এতো সকালে রান্না ঘরে না আসতে তবে কে শোনে কার কথা।তোহা খাদিজা খাতুন আসার আগেই রান্না ভহরে এসে হাজির হয়।খাদিজা খাতুন বেশ খুশি এমন বউমা পেয়ে।বউমা তো না পুরো মেয়ের মতো।

আলতাফ শেখ ভোর বেলা নামাজ পড়ে হাটতে বের হন প্রতিদিন ডায়াবেটিস আছে তার।তার প্রতিদিন সকালে হেটে নিয়ন্ত্রণে রাখে।তারপর বাড়ি এসে খেয়ে দেয়ে বাজারে চলে যান।বাজারে বিশাল মুদিখানার ব্যাবসা আছে আলতাফ শেখের।প্রায় পনেরো জন কর্মচারী কাজ করে সেখানে।তারপর৷ সিয়াম ও গিয়ে বসে দোকানে।দুই বাপ ছেলের আয়ত্তে বাজারের নাম করা দোকান হয়ে উঠেছে তাদের।
গহড়িতে আটটা বাজতেই শ্রেয়সী পড়ার টেবিল থেকে উঠে পড়ে।ওয়াশরুমে কলেজ ড্রেস পরে বের হয়।কালো বোরকার সাথে সাদা হিজাব।বোরকার হাতে কলেজের ব্যাজ।গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে নেয়।মুখে কালো অনটাইম মাস্ক।শুধু টানা চোখ জোড়ায় দেখা যাচ্ছে শ্রেয়সী। যদিও আজ ক্লাস নেই তবে ম্যাম যেতে বলেছে কালকের অনুষ্ঠানে তাদের উপর খুশি হয়ে প্রিন্সিপাল কিছু উপহার দিবে আজ।
শ্রেয়সী ঘর থেকে রেডি হয়ে বের হয়।কহাবার টেবিলে বসে আছে সিয়াম,, তোহা,,সায়ন,, ও আলতাফ শেখ। শ্রেয়সী এগিয়ে সবার উদ্দেশ্যে সালাম দেয়।শ্রেয়সীর সালামের প্রতি উত্তর করে আলতাফ শেখ মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে পাশের চেয়ারে। শ্রেয়সী খেতে চাইনা তবে বাবা আর ভাইয়ের কারনে চুপচাপ সকালের নাস্তা করে উঠে।
তারপর সিয়াম সবার থেকে বিদায় নিয়ে শ্রেয়সীকে নিয়ে চলে ইরুদের বাড়ি পর্যন্ত সেখান থেকেই দুজনকে রিকশায় তুলে দিয়ে সিয়াম বাজারে যাবে এটা সিয়ামের এখন রুটিন হয়ে দাড়িয়েছে।অনেক আদরের বোন তার।

মির্জা বাড়ির সকলে খাবার টেবিলে বসে আছে।হাসান সাহেবের পাশে শারমিন খাতুন তার সামনা সামনি বসেছে নিলয় মির্জা।নাহিদা খাতুন নাস্তা এনে রাখছেন টেবিলের উপর।তখনই সিড়ি বেয়ে নেমে এলো মেহেরাজ।পরনে ব্লাক কার্গো প্যান্ট এর সাথে ইয়াশ কালারের টিশার্ট। চোখ মুখ বরাবরের মতো গম্ভীর।
মেহেরাজ নিচে এসে তীক্ষ্ণ চোখে চারিপাশ একবার পরখ করলো তবে কাঙ্খিত জিনিস চোখে পড়লো না।মেহেরাজ তেমন মাথা না ঘামিয়ে বাবার পাশে চেয়ার টেনে বসে পড়লো।নিলয় মির্জা গম্ভীর ভাবে বসে খেয়ে যাচ্ছেন।মেহেরাজ সেদিকে খেয়াল করেনি।নাহিদা খাতুন সবার প্লেটে ডিম ভাজি আর কলিজা ভুনা তুলে দিলেন।তারপর রুটির প্লেট এগিয়ে দিলেন।সবাই খাচ্ছে।খেতে খেতে শারমিন খাতুন মেহেরাজকে উদ্দেশ্যে করে বলল,

-দাদুভাই এবার কি কদিন থাকবি। নাকি হুট করে যাবি?
দাদির কথায় মেহেরাজ গালে থাকা খাবার টুকু চিবিয়ে দাদির দিকে তাকিয়ে স্মীত হাসি ঠোঁটে টেনে বলে,
-হুট করে ডিউটি না পড়লে যাবো না দাদি।এবার তিন মাসের ছুটি দিয়েছে।
-তুই তো প্রতিবার ই বলিস কিন্তু সএই তো চলে যাস।
-না দাদি এবার থাকবো।অনেক তো সমুদ্রে কাটালাম এবার তোমাদের সাথে কিছুদিন কাটায়।
মেহেরাজের কথায় খাদিজা খাতুন খুব খুশি হন।ছেলেটাকে এবার পছন্দের সব খাবার গুলো নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াবেন পেট পুরে।সমুদ্রে কি খাই না খাই।মায়ের হাতের রান্নার কি স্বাদ পাই।
মেহেরাজ খাওয়া শেষ করে উঠে বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে নেয়।তারপর আবারো তীক্ষ্ণ চোখে চারিপাশ দেখে।না রান্নাঘরেও নেই।মেয়েটা কোথায় তাহলে।কাল রাতে তো মনে করেছিলো ঘুমাচ্ছে। কিন্তু আজ কোথায়।মেয়েটা কি এখানে নেই।

মেহেরাজের মাথায় কথাটা আসলেও জিজ্ঞাসা করতে পারেনা সরাসরি।তাই বুদ্ধি করে বাড়ির সকলের জন্য আনা উপহার গুলো দ্রুত পায়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজের ঘর থেকে নিয়ে চলে আসে।এতক্ষনে সবার খাওয়া শেষ। সোফায় বসে আছে। খাদিজা খাতুন ও রান্না ঘরে সব গুছিয়ে বাইরে আসলেন।
মেহেরাজ সোফায় বসে।দাদার জন্য আনা পাঞ্জাবি।দাদির জন্য আনা জামদানি শাড়ি।মায়ের জন্য শাড়ি।আর বাবার জন্যও দামি পাঞ্জাবি।সব শেষ এ তার বউ এর জন্য আনা শাড়ি গুলো বের করলো।মেহেরাজের কেমন একটা লাগছিলো বউ এর কথা উঠাতে।মেহেরাজের ভাবনার মাঝেই খাদিজা খাতুন বলে,
-আব্বা শাড়ি গুলো কার ভারি সুন্দর তো?
মায়ের কথার পিঠে মেহেরাজের কথাটা বলতে কেমন লাগছিলো।তাও শান্ত কন্ঠেই জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,

-তোমাদের বউমার।মেয়েটা তো বাচ্চাদের মতো এই রঙ গুলো মানাবে।
মেগেরাজের কথা শুনে যেনো মির্জা বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ হলো।সবাই অবাক চোখে একে অন্যকে দেখছে।খাদিজা খাতুন বার বার শুকনো ঢোক গিলছে।মেহেরাজের কথার পিঠে নিলয় মির্জা কিছু রাগী কন্ঠে বলেন,

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩

-বউ মানে?
-আমার বিয়ে করা বউ।
মেহেরাজের সোজা কথা।মেহেরাজের সাভাবিক কন্ঠ শুনে নিলয় মির্জা এবার নিজের রাগ সংবরন করতে না পেরে বলেন,
-কিসের বউ তোমার।ফেলে রেখে চলে যাওয়ার সময় মনে ছিলনা বউ এর কথা।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here