Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫
নুসাইবা আরা নুরি

বাবার কথায় মেহেরাজ চুপ হয়ে যায়।হ্যা সে নিজেও মানছে তার ভুল ছিলো।তাই বলে বউ এর কথা জিজ্ঞাসা করতেও পারবে না।মেহেরাজ দমে যায়না।গম্ভীর তেজি কন্ঠেই বলে,
-হ্যা ফেলে রেখে গেছিলাম তবে নিজের ঘরে।আর হ্যা মানছি বলেছিলাম আমার কাছ থেকে আশা করো না আর কিছু।আমি বলেছিলাম বিয়ে মানিনা।বলিনি।আর আমার কাজের প্রায়োরিটি আমার কাছে ফাস্ট।আম্মু যখন বাধা দিয়েছিলো তখন মাথায় কাজ করছিলো না।
মেহেরাজের কথা সবাই শুনে।নিলয় মির্জা এখোনো রাগে ফুশছে।নাহিদা বেগম কেমন ভয়ে ভয়ে বাপ ছেলের দিকে বার বার তাকাচ্ছেন।মেহেরাজ আবারো বলে উঠে,

-মেয়েটা কোথায়।
মেহেরাজের মুখ থেকে কথাটা বের হতে দেরি হয় তবে হাসান সাহেবের মেহেরাজের গালে ঠাশ করে চড় মারতে দেরি হয়না।দাদার হাতে চড় খেয়ে হতভম্ব হয়ে যায় মেহেরাজ।বাড়ির সকলেই অবাক হয়ে গেছে।মেহেরাজ দাদার মুখের দিকে তাকাতেই হাসান সাহেব রাগী কন্ঠে বলে,
-লজ্জা করছে না তোমার।বিয়ের দিন যে মেয়ের মুখ না দেখে ফেলে রেখে চলে গেলে তখন মনে হয়নি মেয়েটার কেমন লেগেছে।যখন আলতাফ ওর মেয়েরে নিয়ে গেলো দুদিন পরে ডিভোর্স পাঠিয়ে দিতে তোমার বাধে নি।মনে হয়নি মেয়েটার উপর দিয়ে কি যাবে।এখন কিসের বউ তোমার।যার সাথে ডিভোর্স হয়েছে সে কিভাবে তোমার বউ হয়।আর তার খোজ জেনে তোমার কি।বলো আমাকে।
হাসান সাহেব রাগী কন্ঠে কথা গুলো বলে থামতেই মেহেরাজ বলে,

-হোয়াট।ডিভোর্স মানে।
-ডিভোর্স মানে তালাক।তালাক দিয়েছো ওই বাচ্চা মেয়েটাকে।
-তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে দাদু।কি আবোল তাবোল বলছো।আমি কবে ডিভোর্স দিয়েছি।আমি তো যেদিন বাড়ি থেকে গেছি সেদিন রাতেই মিশনে চলে গেছিলাম।আর এক সপ্তাহ আগে এসেছি।
-তোমার বাবা তো দেখালো তোমার সিগনেচার ডিভোর্স পেপারে।এখন মজা করছো আমার সাথে।
হাসান সাহেবের এই কথায় মেহেরাজ থমকে যাই।সে জানেও না তার ডিভোর্স হয়ে গেছে।আবার ডিভোর্স পেপারে তার সিগনেচার ও আছে।মেহেরাজ নিলয় মির্জার দিকে তাকাতেই তিনি মাথা কিছুটা নামিয়ে নেন।তারপর নিজের স্ত্রী দিকে তাকান।নাহিদা খাতুন ও তার দিকে তাকিয়ে আছে।
মেহেরাজ বাবার সামনে এসে শান্ত ভাবে জিজ্ঞাসা করে,

-দাদু কি বলছে আব্বু।আমার ডিভোর্স হয়েছে মানে।আর আমার সিগনেচার কিভাবে ডিভোর্স পেপারে এলো।যেখানে আমি জানিই না এসব।
মেহেরাজ শান্ত কন্ঠ শুনে নাহিদা খাতুন কেপে উঠে।ঝড়ের পুর্বাভাস যেনো সেই কন্ঠে।নিলয় মির্জা কোনো উত্তর দেই না।মেহেরাজ আবারো বলে,
-কি হলো আব্বু বলো।আমি ডিভোর্স কবে দিলাম।
নিলয় সাহেব তাও কিছু বললেন না।মেহেরাজ জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস নিলো।মাথার রগ গুলো ফুলে উঠেছে।চোখের শিরা গুলো লাল হয়ে গেছে রাগে।মেহেরাজ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে।কিন্তু পারে না।লাথি মারে সামনে থাকা টি টেবিলে।সাথে টি টেবিল টা উলটে গিয়ে উপরে থাকা কাচ গুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
মেহেরাজ চিৎকার করে বলে,

-কি হলো আব্বু আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।দাদু কি বললো এগুলো।
মেহেরাজের রাগমিশ্রিত কথা গুলো আর সহ্য করতে না পেরে নিলয় মির্জা মেহেরাজের গালে চড় মারে।তারপর রাগী কন্ঠেই চিল্লিয়ে বলে,
-হ্যা আমি করিয়েছি ডিভোর্স। কি করআর আছে তোমার।কেন করাবো না তোমাকে বলে বলে বন্ধুর মেয়ের সাথে বিয়েতে রাজি করালাম।আলতাফ তো বিয়ে দিবে না।তাও আমি জোর করে রাজি করালাম।আর তুমি কি করলে।আমার মুখে চুন কালি মাখিয়ে বিয়ের পরেই নতুন বউয়ের মুখ না দেখে বাড়ি থেকে চলে গেলে।কি এমন কাজ তোমার।প্রতিবেশিরা আত্মীয়রা সব আড়ালে ছি ছি করছিলো।অপমানিত হয়েছি আমি।আলতাফ এসে মেয়েকে নিয়ে গেলো। আর যাওয়ার আগে বলে গেলো তার সাথে আমার পচিশ বছরের সব বিশ্বাস বন্ধুত্ব সব সম্পর্ক শেষ। আর ডিভোর্স টা পাঠিয়ে দিতে।তোমার মতো ছেলের সাথে ওরা ওদের মেয়ের সম্পর্ক রাখবে না।নয়তো মামলা করবে।হ্যা মামলা খেলে কিছু হবে না তবে আমার সম্মান যাবে।
কথা টুকু বলে দোম ছাড়লেন নিলয় মির্জা।তারপর আবার বললেন,

– তুমি তোমার বড় খালার মেয়ে নাবিলা কে পছন্দ করো এটাও রটিয়ে গেছে চারিদিকে।আমাকে লোক আড়ালে ছিহ ছিহ করছে।তাই শেষ পর্যন্ত তোমার মায়ের কাছে থাকা তোমার ব্যাংকের চেক এর সিগনেচার কম্পিউটার দিয়ে কপি করে ডিভোর্স পেপারে বসিয়ে ওদের দিয়ে দিয়েছি।আর ছোট হতে পারছিলাম না আমি।তোমার মতো ছেলের দরকার নেই আমার।যে ছেলে বাবার সম্মান এর দিকে তাকায় না।বেরিয়ে যাও বাড়ি থেকে।
রাগে হিতাহিত জ্ঞান শুন্য হয়েই শেষ কথা টুকু বললেন নিলয় মির্জা।বাবার কথা শুনে মেহেরাজ হাতে তালি দিতে দিতে ঘৃনা ভরা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
-আমার পিছনে আমাকে জড়িয়ে এত বড় ষড়যন্ত্র।বাংলা সিনেমাকেও হার মানাবে আব্বু।আমি ভাবতেও পারছি না একজন আর্মি অফিসার এতো টা নিচু মন মানষিকতার হয়।যে নিজের সম্মানের জন্য তার ছেলের সম্মান টাকেই নষ্ট করে দেয় এমনকি তার সিগনেচার নকল করিয়ে ডিভোর্স করিয়ে দেয়।বাহ আব্বু বাহ।সিনেমার ডিরেক্টর বলে আপনি বেশ মানাতো।আর চলে যাচ্ছি আপনার বাড়ি থেকে কিছুক্ষন অপেক্ষা করুন।

-মেহের।
-থাক আব্বু আর কিছু বলা লাগবে না।বউজে গেছি সব আমি।
মেহেরাজ এবার নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
-আমি কোনোদিন বলেছি আমি নাবিলাকে ভালোবাসি।তোমরাই বলেছো নাবিলা মেয়েটা কেমন আমি শুধু বলেছি তোমাদের যা পছন্দ। তোমরাই রটিয়েছো সব।আর আমার দোষারোপ করলে।আর কিভাবে পারলে আম্মু মা হয়ে ছেলের সাথে প্রতারণা করতে।তুমি আমার বিশ্বাস টুকু নষ্ট করে দিলে আম্মু।
মেহেরাজ আর এক মুহুর্ত দাঁড়ায় না।ছুটে উপরে চলে যায়।নিজের ঘরে গিয়ে পাঁচ মিনিটের ভিতরে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো কাধ ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে এলো।নিচে আসতেই হাসান সাহেব বলে উঠলো,
-দাদুভাই মাফ করে দে আমি না বুজে রাগে তোর গায়ে হাত তুলেছি।পলিজ রাগ করিস না দাদুভাই।
মেহেরাজ স্মীত তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

-কিছু মনে করিনি দাদু।
মেহেরাজের পিঠে ব্যাগ দেখে নাহিদা খাতুন আতকে উঠেন।ছেলের দিকে এগিয়ে এসে বলেন,
-কোথায় যাচ্ছিস তুই বাপ।
-কোথায় যাচ্ছি না।একেবারে চলে যাচ্ছি।তোমাদের বাড়ি থেকে আর ফিরবো না।আমাকে নিয়ে আমার বাড়িতেই ষড়যন্ত্র।আমাকেই আবার বেরিয়ে যেতে বলছো।বেরিয়ে যেতে বললে না তাই চলে যাচ্ছি।আল্লাহ হাফেজ।
মেহেরাজ নিজের কাধে থাকা মায়ের হাত টা ছাড়িয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।নাহিদা খাতুন ছুটে আসেন কাদতে কাদতে।শারমিন খাতুন ও ছুটছেন।তার আদুরে নাতি মেহেরাজ।ছোট থেকে তার সাথে বেশ ঘনিষ্ঠতা।এখোনো তা বজায় আছে।যা ইভানের সাথে নেই।
মেহেরাজ কোনোদিকে না তাকিয়ে গাড়িতে উঠে ব্যাক সিটে ব্যাগ টা ছুড়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।পিছনে ফেলে যায় হাউমাউ করে কাদতে থাকা তার মা আর দাদিকে।

কলেজের কাজ মিটে গেছে।ইরু আর শ্রেয়সী দুটো মেডেল দিয়েছে প্রিন্সিপাল। যত জন পার্টিসিপেন্ট ছিলো সবাইকেই দিয়েছে।তারপর ম্যাম এর থেকে বিদায় নিয়ে কলেজ থেকে বেরিয়েছে ইরু আর শ্রেয়সী।আজ একটু ঘুরবে।কলেজ এ ভর্তি হওয়ার পর থেকে এমন অফ টাইম একবারো পাইনি।তার উপর আজ আবহাওয়া বেশ ভালো।
আকাশে রোদ নেই মৃদু মেঘ।শান্ত পরিবেশ।ইরু আর শ্রেয়সী কলেজের পাশের রাস্তার ফুটপত ধরে হাটতে শুরু করে।সামনে ভেলপুরির দোকান।ওখান থেকে ভেলপুরি খেয়ে তাই আশে পাশে ঘুরবে।হটাৎ হাটতে হাটতে ইরু বলে,

-শেয়সী একটা কথা বলি।
-হুম বল।
-রাগ করবি নাতো?
-তোর কোনো কথায় কি কোনোদিন রাগ করেছি আমি?
-তোর পাস্ট নিয়ে একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।থাক বাদ দে তোকে ওসব মনে করাতে চাইনা।
-আরে ধুর বল।
শ্রেয়সীর কথায় কিছুটা ভরসা পেয়ে ইরু বলে,
-তোর ঘৃনা করে না ওই লোকটাকে।যে তোকে বিয়ের দুদিন পরেই এমন একটা খারাপ কলঙ্ক দিয়ে দিলো।নাকি ভুলে গেছিস??

ইরুর কথায় শ্রেয়সীর পুরোনো ক্ষত আবারো জেগে উঠে।শ্রেয়সীর লোকটার কথা মনে পড়তেই শান্ত করে,
-কাপুরুষ দের কখোনো ভুলা যায় না।ওদের শুধু ঘৃনা করা যায়।ওদের পুরুষ বলা যায় না ওরা কাপুরুষ নয়তো কিভাবে পারে বিয়ের দুই দিনের মাথায় একটা মেয়েকে ডিভোর্সের কলঙ্ক মাখিয়ে দিতে।যে কলঙ্ক মেয়েটাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪

শ্রেয়সীর রাগে কষ্টে চোখ দিয়ে টপ করে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে।ইরু শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে দেখে শ্রেয়সীর চোখে পানি।ইরুর খারাপ লাগে। ইরু হাত বাড়িয়ে শ্রেয়সীর ঘাড়ে রেখে বলে,
-হুম ওসব কাপুরুষ দের ঘৃনার নিচে রেখেই ধুলো চাপা দিয়ে ভুলে যা।চেষ্টা কর পারবি।কারন আমি জানি তুই অনেক শক্ত।মাফ করে দে আমাকে পুরোনো কথা মনে করিয়ে তোকে কষ্ট দিলাম পাখি।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here