Home শান্তি সমাবেশ শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩+৪

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩+৪

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩+৪
সাইয়্যারা খান

ভয়ে এক কোণা’য় গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্তিকা। ওর আত্মাটা ভয়ে যে যেকোনো সময় বেরিয়ে যেতে পারে সেটা খুবই ভালোই উপলব্ধি করতে পারলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুঠাম দেহের মানব। অথচ সে আছে পুরো শান্ত মেজাজে। উপভোগ করছে সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর এরূপ ভীতু রুপ দেখতে। নিজের উপর মাঝেমধ্য ভীষণ অবাক হয় পূর্ণ। সে এমন ছিলো না। ভীতু, কাপুরষ, অল্প কথায় কান্না করা মানুষ তার ভীষণ অপছন্দের। মানুষ হবে সোচ্চার। উদ্যমী। ভয় পেয়ে দমে থাকা মানুষ তার রুচির বাইরে। অথচ পরিস্থিতি আজ ভীষণ উল্টো। অবশ্য এভাবে বলাটা ভুল। শুধুমাত্র তার মৃত্ত’র ক্ষেত্রে পরিস্থিতিটা ভিন্ন।

এমন ভয় ভয় তার পছন্দের। ভীষণ পছন্দের এই নারীর শ্যামারঙা মূর্তি যেটা বর্তমানে গুটিয়ে আছে বেঞ্চের কোণায়। ভয় পেয়েছে সে। কাকে? এই পূর্ণ’কে। ঠোঁটের কিণায় লেগে থাকা অদৃশ্য হাসিটা মুহূর্তেই উবিয়ে দিলো পূর্ণ। এটা সে কাউকে দেখাতে চায় না। বিশেষ করে মৃত্তিকা’কে।
পূর্ণ হাতে থাকা হকিটা সাইডে ফেললো। সেটা পড়েই শব্দ করলো ভীষণ ভাবে। ভীতু মৃত্তিকা চিৎকার করে উঠতেই পূর্ণ পা বাড়ালো ওর দিকে। পূর্ণ’কে আসতে দেখেই জানে থাকা পানিটুকু ও যেন শুকিয়ে কাঠ হলো মৃত্তিকা’র। চৌচির হলো তার হাহাকার করা বুক। এ কার চক্করে পরলো মৃত্তিকা? কোন জালে আটকা পড়লো সে? এত জঞ্জাল থেকে নিজেকে কিভাবে বের করে আনবে মৃত্তিকা? সবেই তো তার অন্তরের অন্তস্তলে কিছু ভালোবাসা’র বীজ বুনেছিলো সে। সেগুলো কি তাহলে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে?
মৃত্তিকা’কে এত ভাবনার মাঝে ডুবে থাকতে দেখে গা ঝাঁকালো পূর্ণ। বলিষ্ঠ হাতের লম্বা লম্বা আঙুলগুলো একেকটার ভাজে আটকালো। পরপরই মৃদু মৃদু শব্দ তুলে সেগুলো ফুটালো। ও জানে এটা বাজে অভ্যাস তবুও ছাড়তে পারে না। ঘাড় এদিক ওদিক নাড়িয়ে বিরসতার সুর তুলে বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— এভাবে ভয় পাওয়ার মানে কি মৃত্ত? আমি কি আপনাকে কিছু করেছি? মেরে’ছি নাকি বকেছি?
মৃত্তিকা যেন হতভম্ব হয়ে গেলো। আজ শ্যামলা বলে হয়তো এই চেহারাতে তার কান্নার দাগ দেখা যাচ্ছে না। ফর্সা হলে হয়তো পূর্ণ বুঝতে পারতো যখন কান্নার ফলে তার নাক লাল হতো। গাল ফুলতো। ওর তো হিচকি বাদে কিছুই শুনা যাচ্ছে না তাই হয়তো পূর্ণ বুঝতে পারছে না।
গম্ভীর স্বরে আদেশ শুনা গেলো,
— উঠুন ওখান থেকে। নোংরা জায়গা সেটা।
মৃত্তিকা শুনলো। উঠতে চাইলো। পারলো না। আবারও চেষ্টা করলো। পূর্ণ তো উল্টো ঘুরে আছে নাহলে বুঝতো যে মৃত্তিকা চেষ্টা করছে উঠার কিন্তু পারছে না। মৃত্তিকা’র সাড়া শব্দ না পেয়ে এবার ধমকে উঠলো পূর্ণ,

— উঠতে বলেছি না?
কথাটা বলেই ঘুরে তাকাতেই কিছুটা আন্দাজ করতে পারলো। ভয়ংকর ভাবে বিক্ষোভে ভরা মেজাজ শান্ত হলো কিছুটা। এই নারী হবে মৃত্যু’র কারণ। ওকে ধ্বংস করে শান্ত হবে এই বিধ্বংসী নারী। শ্যামরঙা চেহারাটার কি হাল করেছে সে? কেঁদে লেপ্টে ফেলেছে সারাটা মুখ। আজ পূর্ণ’র হঠাৎ মনে হচ্ছে এমনকি বিশ্বাস হচ্ছে কান্না সুন্দর। এতটাই সুন্দর! মন চাইছে তার মৃত্ত কাঁদুক। আরো কাঁদুক। ওর এই কান্নার ফলে ফুটন্ত চেহারা দেখুক পূর্ণ। এই সৌন্দর্য যে শুধুমাত্র পূর্ণ’র হক। ওর একার হক। জন্মজন্মান্তরের হক। এগিয়ে এসে হাত বাড়ালো পূর্ণ কিন্তু তা ধরলো না মৃত্তিকা। বেঞ্জে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। পা মোচকেছে হয়তো। মচকাবেই তো যেই ভয়টা পেয়েছে আজ বেঁচে যে আছে এই ঢের।

সকালে~
ভার্সিটিতে এসেই মৃত্তিকা জানতে পারে আজ কোন ক্লাস হবে না। ক্যাম্পাস ভরা। মৃত্তিকা’কে নিজের ক্লাসমেট দের কাছে চলে এলো। তারাও জানালো কিছু জানে না এই বিষয়ে। অবশেষে পাতটা চিকন গড়নের একজন ছেলে দৌড়ে এসে ওদের সামনে হাঁপাতে লাগলো। এটা হলো ওদের ক্লাসের ছেলে সিআর। ছেলেটা প্রচন্ড মেধাবী কিন্তু শারীরিক গড়নের কারণে হেনস্তা হয় সবার কাছে। ছেলেটাকে দেখতেই মায়া হলো মৃত্তিকা’র। দৌড়ে আসার দরুন তার পরণের ঢোলা শার্টা ঘামে লেপ্টে আছে চিকন দেহে। এতসবের মধ্যে ওকে আরো উত্ত্যক্ত করে ওর নামের জন্য। “হিমু” অথচ হুমায়ুন আহমেদ এর এই হিমু চরিত্রের সাথে কোন মিলই নেই এই ছেলেটার। এ নিয়েই যতসব হাসি-হাসি সবার। মৃত্তিকা পানি সাধতেই ছেলেটা সোজা হয়ে দাড়ালো। পরণের হাই পাওয়ারের চশমাটা ঢেলে ঠিক করে ভাব নেয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু লাভ হলো না। ওর এই ভাব নেয়া দেখেই সবাই আরেকদফা হাসলো। উজ্জ্বল নামের ছেলেটা হিমুর কাঁধে হাত রেখে মশকরা’র স্বরে বলে উঠলো,

— কিরে হিমু তোর রুপা কই?
হিমু মুখটা কালো করে ছোট্ট করে বললো,
— আসে নি আজ।
সবাই হাসলো আরেকদফা। হিমু পছন্দ করে একজনকে। তাও কি না সিনিয়র। মানা যায় এসব? সবচেয়ে বড় সড় আশ্চর্য হলো ঐ সিনিয়র আপুর নাম রুপালী যাকে সংক্ষিপ্ত করে ডাকে তার ফ্রেন্ডটা রুপা। হিমুর মনটা কেন জানি বারবার বলে এটাই তার রুপা। হিমুর রুপা। বয়স তো একটা সংখ্যা তাই না। তাহলে হিমু কেন ভয় পাবে? ভালো সে পড়াশোনায়। একদিন ভালো চাকরি করবে। সবাই যেখানে ওকে নিয়ে এত মজা করে সেখানে রুপা ওর এই চিকন হাত ধরে হাটবে। অনেক বড় হবে তাদের পথ চলা। কথা গুলো ভাবতেই মনে মনে হাসলো হিমু। হিসেব কষেছে সে তার ভবিষ্যতের। তার রুপা’র সাথে। ওর এতশত চিন্তার মাঝেই উজ্জ্বল ছেলেটা বলে উঠলো,
— কিরে দুই ছটাক মাংসে গড়া সিআর আজকে ক্লাস নেই আগে জানাবি না?
হিমু হঠাৎ কিছু মনে করার মতো চমকালো যেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে এসে ভুলে গিয়েছিলো। সহাস্যে বুলি ছড়ালো সে,

— ক্লাস আজ সব ডিপার্টমেন্টেই অফ। আর এই মৃত্তিকা, তুই সোজা বাসায় যা এখন। ভার্সিটিতে থাকা নিষিদ্ধ আপাতত তোর জন্য। আর আশে পাশে ও থাকা ও নিষেধ।
মৃত্তিকা সহ বাকি সবাই ওর দিকে তাকালো। সবার চোখে মুখে অসংখ্য প্রশ্ন সেটা বুঝেই হিমু কিছুটা আতঙ্কের স্বরে বললো,
— ঐদিকে হাতাহাতি লেগেছে। মানে মারামারি লেগেছে। দুই দল একসাথে। আমাদের ভার্সিটির সাথে অন্যটার। চারজনের মাথা ফেটেছে। একজনের অবস্থা অনেক খারাপ। সে আমাদের ভার্সিটির। তাই আবার লাগালাগি’র সম্ভবণা আছে। এবার বড় কিছু হতে পারে তাই সব বন্ধ। আর এই মৃত্তিকা বইন তুই বাড়ি যা তো। পূ…..
বলতে গিয়ে জিহবায় কামড় কাটলো হিমু। নাম বলা যাবে না। এই চিকন শরীরে যদি একটা হকির বাড়ি লাগে তাহলে মেরুদণ্ড আর সোজা হবে না। ওরা যেহেতু প্রথম বর্ষের তাই কেউ ই রাজনৈতিক কাজে জড়িত না। কয়েকজন আবার হাতা গুটিয়ে ঐদিকেই যেতে লাগলো। প্রথম প্রথম থেকেই এসবে চামচামি করলেই পরে বড় নেতা হওয়া যাবে। ওদের যেতে দেখেই হিমু টিপকুনি কেটে বললো,

— দোস্ত ফ্যাকাল্টি বাদে যারে পাবি তারেই পিটাবি তাহলেই নেতা হতে পারবি।
উজ্জ্বল গা কাঁপিয়ে হাসলো। হিমুর উপর একহাতের ভর দিয়ে বললো,
— আগে চারবছর প্যাঁদানী খেতে হবে তারপর প্যাঁদাইতে পারবে।
ওর কথায় হাসির রোল পরলো। কেউ কেউ ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করে ফেললো। কেউ বাড়ী যাওয়ার জন্য ফিরে যাচ্ছে। মৃত্তিকা তখনও দাঁড়িয়ে রইলো। সবাই যেতেই হিমুর সামনে এসে দাঁড়ালো মৃত্তিকা। কঁপালে চিন্তার ভাঁচ ফেলে বললো,

— এই হিমু সত্যি করে বল তোকে কে বলেছে এসব?
— কে বলবে? শুনলাম।
— রুপালি আপুর সাথে এফবিতে অড আছে আমার। তোর নামে গুণগান গাইব তাই কাছে।
হিমুর মনের বাগানে পুষ্প ফুটলো। দাঁড়িহীন গালে হাত বুলালো নিজেই। মনে মনে ভাবলো অনেককিছু। খুশি যে হয়েছে তা তার চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। মৃত্তিকা সুযোগের সৎ ব্যাবহার করলো। হিমু ও মনে মনে রুপার নামের লাড্ডু খেলো একা একা। একনাগাড়ে বলে উঠলো,
— পূর্ণ ভাই বলেছে। তিনি ই তো আমাকে জানালো নাহলে এত পেটের খবর কি আমি জানি? এবার বল কখন জানাবি রুপাকে?
— আগে বল উনি ও ওখানে?
— হ রে বইন। নেতা মানুষ তো। সবার আগে থাকে। দেখলাম হাতে হকি স্টিল নিয়ে চেয়ারে বসা। ভাই যে স্টাইল ওনার। মেয়ে হলে আমি প্রোপোস৷ করতাম।

মৃত্তিকা তখন তত কিছু ভাবলো না। তখনই শুনা গেলো গেঙ্জাম লেগেছে। সবাই দৌড়ে ডুকে যাচ্ছে ডিপার্টমেন্টের ভেতর। হিমু ও ছুটলো। ডাকলেও নড়লো না মৃত্তিকা। ও ছুটলো উল্টো পথে। পূর্ণ ভাইয়ের যদি কিছু হয়? বোকা নারী বুঝলো না তখন পরিস্থিতি। দেখলো না আশেপাশের অবস্থা। ছুটলো উন্মাদ হয়ে। দিকশূন্য দুর্বোধ্যতাতেই তার পথ চলা। কখন যে রাস্তায় এলো নিজেও বুঝে নি। পরিস্থিতি তখন অনেক খারাপ। দেখেই বুঝা যাচ্ছে এখানে কেউ কাউকে দেখছে না। আঘাত পাল্টাঘাত চলছে। মৃত্তিকা যেন হুসে ফিরলো। কোথায় এলো এটা? পূর্ণ’কেই বা কোথায় পাবে? এখন তো মনে হচ্ছে নিজেই বাঁচবে না। মাঝ পথে যখন ও হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো তখনই কেউ একজন ওকে পেছন থেকে ঝাপ্টে নিলো। সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলো আরো দুইজন ছেলে। একপ্রকার শূন্যো তুলে ব্যারিকেট এর ভেতর নিয়ে এলো ওকে। মৃত্তিকা’র তখন ভয়ে আত্মায় কাঁপন ধরেছিলো।

সেই কাঁপন বেড়ছিলো যখন দেখেছিলো পেছন থেকে ওকে শূন্যো তুলা মানবটা আর কেউ নয় স্বয়ং পূর্ণ ভাই। পূর্ণ’র কপাল বেয়ে ঝরছিলো র*ক্তের স্রোত। বিচলিত হলো মৃত্তিকা। নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরলো পূর্ণ’র কপাল। রঞ্জিত হলো ওর শ্যামলা হাত কিন্তু থামলো না র*ক্ত ঝরা। পূর্ণ তখন ও ঠান্ডা মেজাজে দাঁড়িয়ে ছিলো যখনই মৃত্তিকা মুখ খুলে কিছু বলবে তখনই নজর যায় পূর্ণ’র চোখে। লাল হয়ে ছিলো সেই চোখ। মনে হচ্ছিলো র*ক্ত ছিটকে বেরিয়ে আসবে যেকোন সময়। ভয়ে ভয়ে হাত নামিয়ে নিলো মৃত্তিকা কিন্তু তার আগেই শক্ত হাতের চাপ পরলো ওর দূর্বল হাতে। পেছন থেকেই একহাতে হকি আর একহাতে মৃত্তিকা’কে ধরে টেনে নিয়ে একটা ক্লাসে ডুকে পড়লো পূর্ণ। তখনই হোচট খেয়েছে কয়েকটা। পূর্ণ’র বড় বড় পায়ের ধাপ মিলাতে পারে নাকি মৃত্তিকা? ক্লাসে ডুকেই কিছুটা ছুড়ে মারে ওকে পূর্ণ। ছিটকে গিয়ে পরেলো মৃত্তিকা বেঞ্চের কোণায়। গর্জন করেছিলো পূর্ণ। মৃত্তিকা’র দিকে ভয়ংকর চাহনি দিয়ে বলেছিলো,

— আপনার কলিজা’র পাটা অনেক বড় হয়ে গিয়েছে মৃত্ত। এই পূর্ণ’র হাত অনেক বড়। আপনার কলিজা খাঁমচে ছিড়ার সাধ্য এই পূর্ণ’র আছে।
সেই একটা কথাই মৃত্তিকা’র জান ঘায়েল করার জন্য যথেষ্ট ছিলো। সেই থেকেই মেয়েটা ভয়ে আছে। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে নি আর। আসলে কি বলবে তা ই বুঝে উঠতে পারে নি ও।

বর্তমানে~
মৃত্তিকা উঠে দাঁড়িয়ে আছে। পূর্ণ শান্ত স্বরে শুধালো,
— কলেজ থেকে রাজনীতি করি আমি। আমার দেহে আঘাত খুব কমই লেগেছে মৃত্ত। আপনার জন্য আজ কেউ সাহস করলো আমাকে আঘাত করার। আমি না থাকলে এই আঘাতটা আপনার লাগলো। আমি খবর পাঠিয়েছিলাম তবুও অবাধ্য হলেন। বড্ড আবাধ্য আপনি মৃত্ত। আমার একদম অপছন্দ এই গুন। আগেই সতর্ক করেছিলাম কিন্তু কথা শুনলেন আপনি? উল্টো হাজির হলেন সেখানে?
মৃত্তিকা নিজের বোকামিতে নিজেকে গালি দিলো। নতুন নতুন প্রেম তার। আবেগে সামলে উঠতে পারে নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো সামনের জন হলো পূর্ণ ভাই যে কিনা হকি হাতে ঘুরে। আর মৃত্তিকা কিনা তাকে বাঁচাতে এই শরীর নিয়ে গিয়েছিলো? ভাবা যায়? এত কেন বোঁকা সে? মৃত্তিকা’কে চুপ থাকতে দেখে পূর্ণ এগিয়ে এলো ওর কাছে। অনেকটা কাছে। কানের সামনে মুখ নিলো। কান ছুঁই ছুঁই পূর্ণ’র ঠোঁট। মৃত্তিকা’র শরীর দুলে উঠলো। পূর্ণ রাশভারি গলায় বললো,

— আমার পূর্ণময়ী,আগে নিজেকে ঠিক করুন তারপর এই পূর্ণ’কে বাঁচাতে এগিয়ে যাবেন।
বলেই সরে গেল অথচ জমে গেলো মৃত্তিকা। পূর্ণ’র সাথে কোনমতে বের হলো সেখান থেকে। মারামারি থেমেছে। পূর্ণ আজ প্রথম মৃত্তিকা’কে ওর বাড়িতে নামিয়ে দিলো নিজের গাড়িতে। মাঝ রাস্তায় ফার্মেসি থেকে কাঁপলে ব্যান্ডেজ লাগিয়েছে মৃত্তিকা’র ছোট্ট আবদারে। মেয়েটা যে এত ভয় পায় আল্লাহ মালুম সংসার কিভাবে করবে ওর সাথে? মৃত্তিকা’র বাসার সামনে আসতেই পূর্ণ গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
— আল্লাহ হাফেজ।
মৃত্তিকা’র ধ্যান ভাঙলো। গাড়ি থেকে নেমে সালাম জানিয়ে সোজা বাড়িতে ডুকে পড়লো। পেছনে রয়ে গেল পূর্ণ। তুষের আগুন জ্বলে উঠলো তার হৃদয়ে। থেমে থেমে জ্বলতেই থাকে। এই নারীর শ্যামারঙা দেহ। ভীতু মন। শান্ত রুপ। সবই তাকে মহিত করে। কাছে টানে। চলে গেল তার পূর্ণময়ী অথচ রেখে গেলো অনলে পুড়া এক প্রেমিক’কে।

নিজের উন্মুক্ত কোমড়ে পুরুষালী হাতের বাজে স্পর্শ অনুভব করলো মৃত্তিকা। মুহূর্তেই যেন সর্বাঙ্গ ঘিনঘিন করে উঠলো। শরীরের র*ক্ত সঞ্চালন বাড়লো চক্রবৃদ্ধি হারে। চারপাশে মানুষ গিজগিজ করছে। এত ভীরের মাঝে যে কেউ ই এই আচরণ করতে পারে। কোন মতে পেছনে ঘুরলেও তেমন কাউকে সন্দেহ করে উঠতে পারলো না। সবাই সবার মতে এখানে। ভয়ে বড়সড় ঢোক গিললো মৃত্তিকা। এটা যে ইচ্ছাকৃত ছিল সেটা ওর নারী মন জানে। ভালো ভাবেই বুঝে এটা ভুলবশত ছিলো না। আবারও সামনে মনোযোগ দিলো ও। আজকে ফাংশন ভার্সিটিতে। ফাংশন বলতে “শাপা ডে”। “শাপা” ডে মানে হলো শাড়ী- পাঞ্জাবি দিবস। ভার্সিটিতে না উঠলে কোনদিন ও মৃত্তিকা জানতে পারতো না যে এমনও দিবস থাকে। সবার মতো মৃত্তিকা ও শাড়ী পড়েছে আজ। যথেষ্ট ভদ্রভাবে শরীর ঢেকে পরেছে সে তবুও হয়তো এত ধাক্কা ধাক্কাতি কোন দিক দিয়ে একটু স্থানচ্যুত হয়েছে। লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে সেখানে কোন এক বাজে পুরুষের। সামনেই স্টেজে গান চলছে। অনুষ্ঠান উপলক্ষে জনপ্রিয় একজন শিল্পী এসেছে। মৃত্তিকা’র ও তাকে অনেক পছন্দ। মনোযোগ দিয়ে যখন সে গান শুনছিলো তখনই এমন স্পর্শ পেলো। মৃত্তিকা টেনেটুনে ঠিক করলো শাড়ী।

ওর ভাবনার মাঝেই কেউ আবারও একই কাজ করলো। এবার ছাড়লো না বরং বিচরণ ঘটালো ওর কোমড় থেকে পেটে। মৃত্তিকা হাত ছিটকে সরিয়ে তারাতাড়ি ঘুরলো। হাত-পা রীতিমতো কাঁপছে ওর। কাজল ভরা চোখদুটো তখন পানিতে ডুবা। বুকের ভিতর হচ্ছে ধ্রীম ধ্রীম শব্দ। ওর পেছনে কোন ছেলেই নেই। সবই মেয়ে। ছেলে যারা তারা ওর সাইডে অথচ হাতটা ছিলো পেছন থেকে। তাহলে কে? আর এক মুহুর্ত ও সেখানে দাঁড়ালো না মৃত্তিকা। ভীর ঠেলে বেরিয়ে গেল ও। পেছনে ভেসে আসা প্রিয় শিল্পী’র কন্ঠে নিজের প্রিয় গানটাও ওকে টানে ওখানে দাঁড় করিয়ে রাখতে অক্ষম হলো। সব সুরই যেন তেঁতো লাগলো ওর কর্ণধারে। অস্থির হয়ে ছুঁটলো মৃত্তিকা। হাত চেপে রাখা কোমড়ে। জ্বলছে সেখানটায়। নখ ডেবেছে । একসময় ভীর ঠেলে বেরিয়ে নিজের ডিপার্টমেন্টের ভেতরে চলে গেল সে। পেছনে তখনও শিল্পী সুর তুলে গেয়ে যাচ্ছেন,
” স্বপ্নের বালুকায় কেউ কি পা লুকায়,
যদি না থাকে ভেজা মন”

ওয়াসরুমে ঢুকেই দরজা লক করলো মৃত্তিকা। কোমড় থেকে শাড়ী সরালো। লাল দাগ পড়েছে সেখানটায়। ট্যাব ছেড়ে রুমাল ভিজিয়ে তা চিপড়ে কোমড়ের দিকটা ডলতে লাগলো। এতে সেই বাজে স্পর্শ মুছলো কি না বুঝা গেলো না কিন্তু জ্বলুনি বাড়লো কয়েকগুণ। নিমিষেই নিজের সাজ লেপ্টে ফেললো সে। কেঁদে উঠলো শব্দ করে। দরজায় তখন লাগাতার উজ্জ্বল বাড়ি মারছে। বারবার বলছে,
— মৃত্তিকা? মৃত্তিকা, ভেতরে আছিস? এই মৃত্তিকা? কথা বল?
মৃত্তিকা কেঁদেই যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আজ প্রথম পরলো সে। বাবা কোনদিন ওকে ফুলের আঁচড় ও লাগতে দেন নি। সবসময় সামলে রেখেছেন তার বুকে। এতটাই প্রিসিয়াস তার বাবা’র রাজকন্যা। সবার কাছে কালো নামধারী কন্যা বাবা’র কাছে ছিলো রাজকন্যা। এখনও আছে। সেই রাজকন্যা’র গায়েই কি না লেগেছে বাজে স্পর্শ? মুখ দিয়ে অস্পষ্ট স্বরে মৃত্তিকা বললো, “বাবা”।

ডেকেই কেঁদে ফেললো। কখনো এমন পরিস্থিতিতে পরে নি সে। সেখানে পরপর দু দুবার এমন হওয়াতে মেয়েটা এখন ভরসার স্বরে কাউকে ডাকতে বা বলতেও পারছে না।
এদিকে উজ্জ্বল ডেকেই যাচ্ছে। মৃত্তিকা ও সাড়া দিচ্ছে না। অবশেষে সে বেরিয়ে এলো। বাইরে হিমু সহ দুই তিনজন দাঁড়ানো। উজ্জ্বল ওদের দিকে তাকিয়ে বললো,
— আজকে খবর আছে শালা’র।
— মৃত্তিকা বের হয় নি?
হিমুর এহেন প্রশ্নে মেজাজ চটে গেল উজ্জ্বলের। হিমুর দেহের ঢোলা পাঞ্জাবি’র কলারটা আলতো করে চেপে বললো,
— হিমুর বাচ্চা জীবনে প্রথম লেডিস ওয়াসরুমে ডুকসি এই মৃত্তিকার জন্য। শালী বের হোক একবার। দেখ কি করি?
পাশ থেকে একজন বললো,
— আজকে খবর করে ছাড়বে ওদের। কোথায় হাত দিসে তা হাড়ে হাড়ে টের পাবে।
হিমু নিজের কলার ছাড়িয়ে বললো,
— হাড্ডি দিয়ে ডুগডুগি বাজাবে আজ।

ভরা মাঠের মধ্যে একজনকে হকি স্টিল নিয়ে অনবরত আঘাত করে যাচ্ছে পূর্ণ। কেউ চেয়েও থামাতে পারল না তাকে। ওখানে যাওয়া মানে নিজের কপালে মঙ্গলবার বাদে শনি রবি সব ডাকা। সেচ্ছায় মাইর কে ই বা খেতে চাইবে? পূর্ণ নিজেও থামছে না। শরীরে যেন তার অসুর ভর করেছে। চোখ দিয়ে ঝরছে আগুন। পারলে সে যে সামনের জনকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিলো তা সবাই টের পাচ্ছে। ছেলেটা পূর্ণ’র কাছে বারবার ছাড় চাইছে। পাষাণ পূর্ণ থামলো না। থামালো না তার হাত। ছেলেটার চিৎকার যেন সবার কান ভেদ করে মস্তিষ্কে আঘাত হানছে। ছেলেটা বারবার ছাড় চাইছে। মাফ চাইছে। পূর্ণ বুঝি থামে?
পূর্ণ ভয়ংকর ভাবে গর্জে উঠে বিশ্রী ভাষায় কয়েকটা গালি দিলো। কান থেকে র*ক্ত ঝরার মতো গালি। কে বলবে এত সুন্দর সুশ্রী সুদর্শন ছেলের মাধুর্যময় মুখ দিয়ে এমন বিশ্রী গালি ও বের হয়?
ছেলেটা পূর্ণ’র পা ধরে কেঁদে উঠলো,

— পূর্ণ ভাই, ভাই ছেড়ে দেন। কসম আর করব না। ভাই…..
— কু*ত্তার বাচ্চা কোথায় হাত দিয়েছিস তুই? তোর হাত ভেঙে ফেলব আমি।
বলেই সজোরে আঘাত করলো ছেলেটার হাতে। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো ছেলেটা। হঠাৎ দৌড়ে এসে কেউ একজন পূর্ণ’র বাহু আঁকড়ে ধরে আঁকুতি করে বললো,
— ও..ওনাকে ছেড়ে দিন।
মাফা ঘুরিয়ে একদফা দেখলো পূর্ণ। মৃত্তিকা এসেছে। তার মৃত্ত। কত সুন্দর চেহারাটা কেমন হয়ে আছে। কেঁদেছে তার মৃত্ত। এই ছেলের জন্য। ভয় পেয়েছে তার মৃত্ত। পূর্ণ বাদে অন্য কাউকে তার মৃত্ত ভয় পাবে এটা কিভাবে মেনে নিবে সে? বিশ্রী এক গালি দিয়ে ছেলেটার পেটে আঘাত করে বললো,

— নেক্সট জানে মে’রে দিব। তোর বাপ’দের বলিস আমার নাম।
কথাটা বলেই মৃত্তিকা’র হাত চেপে ধরলো। হাটা দিলো সামনের দিকে। মৃত্তিকা পূর্ণ’র মুখে গালি শুনেই ওর কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। এখনও যেন কানকে বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না যে এমন বিশ্রী গালি পূর্ণ ভাই দিতে পারে। পরক্ষণেই ওর মন বলে উঠলো, কেন পারে না? অবশ্যই পারে? যারা রাজনৈতি করে তারা তো গালি পারবেই? এক লাইন কথা বলায় তারা তিনটা গালি দিবে এটাই স্বাভাবিক তাই না? একা একাই কথাগুলো ভেবে কুল পাচ্ছে না মৃত্তিকা। ধ্যান ভাঙলো যখন দেখলো পূর্ণ ওর হাত ছেড়েছে। মাঝেমধ্যে অবাক হয় মৃত্তিকা পূর্ণ’র উপর। কখনো প্রয়োজনহীনা স্পর্শ করে নি সে মৃত্তিকা’কে। যখনই স্পর্শ করে তখনই মাফ চেয়ে নেয়। এই যে মৃত্তিকা’র অচেতন মন বলছে পূর্ণ ভাই এখন মাফ চাইবে ওর হাত ধরার জন্য। হলো ও তাই। শুনা গেলো তার পুরুষনালী কথা,
— আমি দুঃখীত মৃত্ত। ইচ্ছে করে হাত ধরি নি। আপনি কি রেগে আছেন?

মৃত্তিকা’কে চুপ থাকতে দেখে কিছুটা ঘাবড়ালো পূর্ণ। অল্পতে ঘাবড়ে যাওয়া পূর্ণ’র চরিত্রে নেই অথচ আজ ঘাবড়েছে সে। আতঙ্ক ভরা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
— মৃত্ত আমার, কথা বলুন। অনেক ব্যাথা লেগেছে?
মৃত্তিকা কোন কথা বলছে না। হঠাৎ এমন কান্ড করলো সে চোখ ফাটা হলো পূর্ণ’র। মৃত্তিকা নিজের কোমড়ের দিক থেকে শাড়ীর আঁচল সরিয়ে দিলো। দৃশ্যমান হলো তার চিকন কোমড়। মোটা নখ গেঁধেছে সেখানে। শ্যামলা চামড়া’য় র*ক্ত জমাট বুঝা যাচ্ছে। মৃত্তিকা যে এহেন আচরণ করে বসবে তা বুঝতে পারে নি পূর্ণ। যা দেখার সে দেখেছে নিয়েছে। সেকেন্ডের ব্যবধানে সরিয়ে নিলো চোখ। নিজের একান্ত করে চাওড়া নারীর দেহে আঘাত। তা ও কি না পূর্ণ বাদে অন্য পুরুষের দেয়া আঘাত! এটা মানবে পূর্ণ? সেটা কি সম্ভব? অধর কামড়ে কিছু চিন্তা করে নিলো সে। অতঃপর শান্ত কন্ঠে আদর মিশালো। শুনা গেলো এই প্রথম পূর্ণ’র এত আদুরে গলা,

— আমার পূর্ণময়ী, নিজেকে আবৃত্ত করে নিন। আপনাকে দেয়া আঘাতের কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে তাকে দিয়েছি আমি। কথা বলুন আপনি। আমার জন্য এই কষ্ট পেলেন আপনি। মাফ করবেন না মৃত্ত?
— রাগ করে নেই আমি।
— অনেক কষ্ট হচ্ছে?
— না।
— নিজেকে শক্ত রাখা শিখুন মৃত্ত। আমি বাদে অন্য কারো জন্য ভয় আপনার মনে থাকুক সেটা পছন্দ না।
মৃত্তিকা চমকালো। ভরকালো। একটু আগেই কে আদর লাগিয়ে কথা বললো? নরম গলায় কে তার হালহকিকত জিজ্ঞেস করলো? এখন ধমকাচ্ছে। কড়া চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মৃত্তিকা ভেবে কুল পায় না। দিশা হারায় বারবার। এই সিনিয়র ভাই এমন কেন? এই বরফ তো এই পানি। অদ্ভুত মানুষ।

এক ক্লান্ত বিকেলের শারদী’য় বাতাস বয়ে চলছে। পরিশ্রান্ত সকল মানুষ এক টুকরো সুখ খুঁজতে হাজির হয়েছে ব্যাস্ত শহরের প্রাণকেন্দ্রে। অবশ্য এটা ছত্র-ছাত্রীদের জন্য বলা বাহুল্য। ক্লাস টাইম শেষ হতেই বন্ধু আর প্রিয় জনের সাথে আড্ডায় মেতে উঠে তারা। কেউ আবার ব্যাগ কাঁধে ছুটে লাইব্রেরিতে। হিমু আবার এই দলের লোক৷ সে ছুটলো লাইব্রেরি’র দিকে। নোট সব আজই টুকেছে সে এখন রিভাইস দিবে। পকেট থেকে রুমালটা বের করে ক্লান্তিতে ভরা কপালটা মুছে নিলো৷ বুকে বই হাতে কলম তুলে কোণায় একটা সিটে গিয়ে মুখ গুজলো বইতে। সময় গড়ালো। ঘন্টা পার হলো। হিমু খেয়াল করলো কেউ ওর দিকে গভীর দৃষ্টি’তে তাকিয়ে। এতক্ষণ খেয়াল করে নি সে। হঠাৎ চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো রুপা। হিমু’র রুপা? মনে মনেই হাসল হিমু। চোখে চোখ পড়তেই হিমু সালাম দিলো। রুপালী পায়ের উপর পা তুলে আঙুলের ইশারায় কাছে ডাকতেই হিমু উঠে গেলো। ঢোক গিললো। ওর হাজার জল্পনা কল্পনা যাই থাকুক না কেন শত কথার এক কথা হলো সিনিয়র আপু রুপা। না জানি এখন কি করে। তার মধ্যে শুনা গিয়েছে রুপা ও রাজনীতি’তে জড়িত। সবাই বলে এমন মেয়ে ভালো না কিন্তু হিমু’র মন মানে না। মানুষ পাত্র ভেদে খারাপ ভালো হয় না। যে খারাপ সে সব পেশাতেই খারাপ। যে ভালো সে সব জায়গাতেই ভালো।
রুপার সামনে দাঁড়াতেই রুপা বিরক্ত হওয়া কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

— কি এমন হাবার মতো তাকিয়ে আছো কেন?
থতমত খেলো হিমু। কোনমতে বললো,
— সরি।
— কি সরি?
— সরি আ..আপু।
— হু গুড। নাম?
— হিমু।
হঠাৎ হেসে উঠলো রুপা। গমগমে গলায় বললো,
— আমার নাম জানো?
— জ্বি। রুপা।
— ভুল। রুপালী হবে। নেক্সট থেকে জানি মনে থাকে। অনেক পড়েছে এখন আউট হও। আর হ্যাঁ এই সিট আমার। আর জানি না দেখি। যাও।
প্রথম দিকে ভালোভাবে বললেও পরেরগুলো বললো ধমকের সুরে। হিমু’র চিকন শরীরে’র ভিতরে ছোট্ট বুকটা তখন ধুকপুক করছিলো। কোনমতে বইখাতা হাতে তুলে সালাম জানিয়ে বেরিয়ে গেল। এই সিনিয়র আপুর সাথে কিভাবে কৃষ্ণলীলা চালাবে সে? শুরুতেই তো পারলে ওকে থাপ্পড়িয়ে দিতো৷ ইশ! কি বেইজ্জতি টা ই না হলো।

হাত খোঁপা করা কোঁকড়ানো চুলগুলো উড়ে যাচ্ছে অনবরত। খোঁপা’টা ঢোলা হয়ে গিয়েছে। পূর্ণ’র সামনে চুল খুলে ঠিকও করতে পারছে না। কি একটা অবস্থা। মানলো মৃত্তিকা যে সে শ্যামা। ততটা সুন্দর না৷ তাই বলে কি পাগল হয়ে থাকবে এত সুন্দর পূর্ণ ভাই’য়ের সামনে? একটু গুছিয়ে থাকা তো মন্দ না। কিন্তু এখন নিজেকে কিভাবে গুছাবে সে? পূর্ণ ভাই তাকে ওভাবেই নিয়ে এসেছে। আপাতত তারা একটা বাগানের মতো জায়গায় বসে আছে। আশে পাশে মানুষ আছে। নির্জন জায়গায় পূর্ণ ওকে কখনো নিয়ে যায় না৷
পূর্ণ মৃত্তিকার হাবভাব খেয়াল করলো। নিজ থেকেই বললো,

— চুলগুলো ভালো ভাবে বেঁধে নিন মৃত্ত। এখন তেমন কিছু বলছি না। বিয়েটা হোক। তখন অধিকার থাকবে আমার। হিজাব পড়িয়ে রাখব।
অনুমতি পেয়ে চুল বাঁধতে গিয়ে পূর্ণ’র অধিকার আর বিয়ে’র কথা শুনে হাত ফস্কে চুল ছড়িয়ে গেলো। শরৎ এর আগমনী বাতাসে দুলিয়ে নিলো তার চুলগুলো। কে বলে সোজা সিল্কি চুলেই পুরুষ গলে৷ পূর্ণ তো তার পূর্ণময়ীর এই কোঁকড়া অগোছালো অবাধ্য চুলের প্রেমে পড়ে। একবার না বরং বারবার পড়ে। এই তো এখনই মন চাইছে তার মৃত্ত’র চুলে নাক ডুবাতে। নিশ্চিত কোন এক আবেশিত ঘ্রাণ আছে তাতে। মৃত্তিকা চুল বেঁধে ই দেখলো পূর্ণ তার দিকেই ঘায়েল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মৃদু শব্দে মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করলো,

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১+২

— কিছু বলবেন?
— আমার পাপ করতে মন চাইছে মৃত্ত। একটু পাপ করি? পাপের বিনাশের শাস্তিটা কি খুব কঠিন হবে?
পূর্ণ’র এহেন আবদারে শরীর শিউরে উঠলো মৃত্তিকা’র। কিসের পাপ করতে চায় পূর্ণ? তবে কি পূর্ণ বাকিদের মতো? মৃত্তিকা’র নারী দেহেই কি তার সুখ নিহিত? মৃত্তিকা’র চোখ জুড়ে তখন ভয়। তাহলে কি সব রাজনীতি’র সাথে জড়িত পুরুষই নারী লোভী? নিজের আসল রুপ কি আজ পূর্ণ দেখিয়ে দিবে?

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৫+৬