শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩৯+৪০
সাইয়্যারা খান
আজকে আর বাড়ী আনা গেলো না মৃত্তিকা’কে। বাবা’র হাতে গুলি লেগেছে শুনেই যার অবস্থা করুন তাকে আর পূর্ণ ও জোর করে নি। মৃত্তিকা যখন বাবা-স্বামীর মধ্যে কার সাথে যাবে সেই অস্থিরতায় ছিলো তখন পূর্ণ ওর মাথায় হাত রাখে। শান্ত স্বরে জানায়, বাবা’র সাথে থাকতে। পূর্ণ’র কাছে মা-বাবা আছে কিন্তু শশুড় বাবা তার একা।
নিজের ভেতরই অস্থিরতায় ভরপুর মৃত্তিকা কিছুটা সস্তি নিয়ে বাবা’কে নিয়ে বাসায় ফিরে। পূর্ণ’র শান্তি নেই। যেন নিজের জয়ী হওয়ার পর তার চাই তার পূর্ণ্যময়ীর সঙ্গ। একটু গভীর ভাবে চাই। রাত বেড়েছে। পূর্ণ বাসায় ফিরে বাবা-মায়ের সাথে। ওর মা বরাবরই ধৈর্যশীল নারী। ছেলে যখন তার রাজনীতিতে নিজেকে জড়িয়েছে এর ফলাফল সরুপ এরকম কিছু হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবুও তার মাতৃহৃদয় কেঁদে উঠে। ছেলের সম্মুখে বরাবরই স্থির তিনি। নিজ হাতে খাবার বেড়ে মুখে তুলে খাওয়াতে নিলেই পূর্ণ আগে মায়ের হাতে চুমু খায়। এতেই যেন মা গলে গেলেন। ছেলেকে খাওয়াতে খাওয়াতে কাঁদলেন বেশ কিছু সময়৷ একটা মাত্র ছেলে এর কিছু হলে বাঁচার কি আদৌ কিছু থাকবে তার?
পূর্ণ’র বাবা সামাল দেন স্ত্রী’কে। খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই পূর্ণ রুমে যায়। পাঞ্জাবিটা বাবা’র সাহায্যে গা থেকে খুলেই ফ্রেশ হতে চলে যায়। এক হাতে সবটা করা কষ্টদায়ক। চড়ম মাত্রায় মৃত্তিকা’কে স্মরণ হয় ওর। বউ থাকতে কি না পাঞ্জাবি খুলাতে হয় বাবা’কে দিয়ে? এসব কি সহ্য করার মতো? পূর্ণ ও মোটেই সহ্য করত না যদি না ব্যাপারটা শশুড় বাবা’কে ঘিরে হতো। এতসব ভাবতেই ওয়াসরুমের দরজায় নক হলো। পূর্ণ গায়ে টাওয়াল পেঁচিয়ে নিয়ে বললো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
— কে?
— আমি।
বাবা’র গলা শুনে আস্তে ধীরে দরজা খুলে পূর্ণ। বাবা ওকে দেখেই বেশ সুন্দর ভাবে বললেন,
— আব্বু, দেখি হাত দাও। আমাকে ধরে বের হও। টাওয়াল একা পেঁচাতে গেলা কেন? আমাকে ডাকতা।
পূর্ণ ভ্রু কুচকে তাকালো। বেশ থমথমে সেই চাহনি। ওর বাবা সেই চাহনি দেখে কিছুটা থতমত খান৷ পূর্ণ একাই বের হতে হতে বললো,
— নতুন এমপি দেখেই লোভ সামলাতে পারো নি না? তেল লাগাতে এসেছো? এসবে আমি গলব না আব্বু। যাও নিজের বউয়ের উপর ট্রাই কর এসব।
ওর বাবা বিরক্ত হয়ে মুখে চ উচ্চারণ করলেন৷ ছেলের কথা গায়ে না মেখে আলমারি থেকে একটা বক্সার বের করতেই চাপা স্বরে চেঁচায় পূর্ণ। ওর বাবা ভরকে উঠেন৷ না বুঝতে পেরে তারাতাড়ি এসে জিজ্ঞেস করেন,
— কি হয়েছে? ব্যাথা পেলি?
— তুমি আমার আন্ডার গার্মেন্টস এ হাত দিচ্ছো কেন? রাখো।
কথাটা বলতে বলতে যেই না বাবা’র হাত থেকে বক্সারটা ছিনিয়ে নিলো ওমনি খোঁসে পরে কোনমতে পেঁচিয়ে রাখা পূর্ণ’র কোমড়ের টাওয়াল। আকস্মিক ঘটনায় কিংকর্তব্য বিমূঢ় উভয়ই। বাবা তারাতাড়ি ছেলের টাওয়ালটা কোমড়ে পেঁচিয়ে দিলেন ভালোমতো। লজ্জায় নাক, কান ততক্ষণে পূর্ণ’র লাল হয়ে উঠেছে। এই প্রথম কি পূর্ণ লজ্জা পেলো? হয়তো। সবসময়ের বেলাজা, ঠোঁট কাটা পূর্ণ মিনিট দুই এক চুপ রইলো। বাবা’র সাহায্য বক্সার ও পরলো। বিছানায় যখন বাবা ওকে আধ শুয়া করে বসালেন তখনই মৌনব্রত ভাঙে পূর্ণ,
— কি কপাল আমার দেখো তো আব্বু। বউ থাকতে কি না বাবা আমার পার্সোনাল কাজ করছে। এই দিন ও দেখার ছিলো আমার? দুই দিন পর বাবা হব আমি তখন কি আমার ছানাপোনা’কে এই কাহিনি শুনাব যে ওদের দাদা ওদের বাবা’কে বক্সার পড়িয়ে দেয়?
— চুপ থাকো বেয়াদব ছেলে। ছেলে মেয়েকে মানুষ নীতি নৈতিকতার কাহিনি শুনায় আর তুমি কি না এসব ফালতু কাহিনি শুনাবে তাদের?
পূর্ণ বাকা চোখে তাকালো বাবা’র দিকে। মুখ যথাযথ তার গম্ভীর। ওভাবেই কটুক্তি করে বললো,
— বাহ আব্বু বাহ! নিজেরটাই বুঝলা, ছেলেরটা না? নিজে নাতি নাতনি চাও আর আমার বেলায় যত নীতি বাক্য। আমার ছেলে’কে রোম্যান্টিক ব্যাপার স্যাপার তো আমিই শিক্ষা দিব নাহলে আমার ঘরে নাতি নাতনি কোথা থেকে উদয় হবে? তুমি উদয় করবে?
এবার আর কিছু বলার মতো রইলো না তার। রাগে গজগজ করতে করতে রুম ত্যাগ করলেন। পূর্ণ’র কানে এলো বাবা’র কথা,
— এই ছেলে নাকি এমপি? এমন মুখ, ঠোঁট কাটা এমপি হলে জনগন হবে লুচু। কথার কোন মা বাপ নেই। যখন যা মন চায়…
আর শুনা গেলো না। পূর্ণ পাত্তা দিলো না। বাবা এখন বউ নিয়ে ঘুমাবে। ঠান্ডায় গরম গরম বউ। কিন্তু পূর্ণ? সে কি করবে? গরম বিড়াল বিড়াল বউটা কোথায়? তার বুকে কেন নেই মৃন্ময় হাওলাদারের ছানা?
বাবা’র বুকে মাথা ঠেকিয়ে কপালে হাত ছুঁয়ায় মৃত্তিকা। অল্প গরম। আস্তে করে মাথাটা তুলে পাশে থাকা বাটি থেকে পুণরায় জল পট্টি বাবা’র কপালে রাখলো৷ গালে হাত ছুঁয়ে দিয়ে নাক টেনে নিলো। মৃন্ময় হাওলাদার অল্প স্বরে ডাকলেন,
— আম্মা?
— হ্যাঁ হ্যাঁ আব্বু। বলো। খারাপ লাগছে?
— উহু। বুক থেকে সরলেন কেন? আর ঠান্ডা পানিতে হাত দিবেন না আম্মা। শীতের দিন ঠান্ডা লেগে যাবে।
পুণরায় মাথাটা বাবা’র বুকে রাখতেই মৃন্ময় হাওলাদার ভালো হাতটা দিয়ে মেয়েকে বুকে চেপে রাখেন। মৃত্তিকা বাবা’র জখম হওয়া হাতে চুমু খায়। কেঁদে ফেলে পুণরায়। দীর্ঘ শ্বাস টানেন মৃন্ময় হাওলাদার। কিভাবে থামাবেন তার প্রাণভোমরা’কে? আসছে থেকে কেঁদেই যাচ্ছেন। অপরিপক্ক হাতে বাবা’র সেবা করছে। এতটা সৌভাগ্য কিভাবে হলো তার? এতটা সুখ না থাকলেই বা কি হতো? ভালো হাতটা দিয়ে মেয়ের চুলে হাত বুলাচ্ছেন তিনি। এটাই স্বভাব। হয়ে যায় আপনাআপনি ভাবেই।
মৃত্তিকা এই প্রথম বললো,
— লাগবে না বাবা৷ তুমি ভালো হও।
কথাটা বলে আবারও কেঁদে ফেলে সে। মৃন্ময় হাওলাদারের চোখ ভর্তি পানি অথচ বুকে তার প্রশান্তি। বুকের ঠিক ওপর তার প্রশান্তির কারণটার অস্তিত্ব। অসুস্থ বাবা থেকে আদর খেতে খেতে থামলো মৃত্তিকা। ঐ থামাতে অবশ্য লাভ নেই। একটু পরপরই নিজ সুরে কেঁদে উঠে তার মেয়ে। চোখ মুখ মুছিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে মৃন্ময় হাওলাদার বললেন,
— আজ আমার বুকে আছেন আগামী কাল পূর্ণ’র বুকে থাকবেন আম্মা। ছেলেটা অসুস্থ। তার অধিকার বেশি। আমি ততটা আঘাত পাই নি আম্মা। এই যে আমার বুকে আপনি। আমার সকল ব্যাথা কমে গেলো।
বাবা’র বুকে নাক, মুখ ঘঁষ মুছে নিলো মৃত্তিকা। মেয়ের তার দ্বিধায় আটকানো উচিত ছিলো কিন্তু ততটা কিছু দেখা মিলে নি৷ ক্ষণিকের জন্য পূর্ণ’র আঘাতের কথা শুনে হয়তো পাগলের মতো কেঁদেছে কিন্তু বাবা’র আঘাত দেখে সহ্য করতে পারে নি। আসক্তিটা কেন তার প্রতি? মৃন্ময় হাওলাদার চান এই আসক্তিটা পূর্ণ’র প্রতি তৈরী হোক। খুব করে তৈরী হোক। এতটাই হোক যাতে মৃত্তিকা বাবা থেকে স্বামী’কে প্রাধান্য দিক। মিঠি দরজায় নক করতেই মৃত্তিকা মুখ তুলে বললো,
— কিছু বলবি?
— আপা খাবে না?
— না। তুই খেয়ে নে।
— চলো না আপা। আমি রুমে নিয়ে আসি?
মৃত্তিকা সাফসাফ জানালো তার ইচ্ছে করছে না খেতে। মৃন্ময় হাওলাদার মৃদু স্বরে মিঠি’কে বললেন,
— মিঠি যা রুমে নিয়ে আয় খাবার। দেখি আমি কে খাবে না।
মিঠি চলে যেতেই মৃত্তিকা বাবা’র দিকে তাকিয়ে বললো,
— খেতে মন চাইছে না আব্বু।
— খেতে হবে।
— উনি কি খেয়েছে? ডান কাঁধে ব্যাথা পেয়েছে। একা একা কিভাবে সব করছে?
মৃন্ময় হাওলাদার এই প্রথম মেয়ের ছলছল করা চোখ দেখে তৃপ্ত। এই যে পূর্ণ’র চিন্তায় তার চোখ টলমলে। এটাই তিনি চান। তার আম্মার জীবনটা পূর্ণময় হোক।
মিঠি খাবার দিয়ে যেতেই তিনি জিজ্ঞেস করেন,
— তুই খেয়েছিস?
— খাব মামা। মা অপেক্ষা করছে।
— আচ্ছা যা।
মিঠি যেতেই মৃন্ময় হাওলাদার ডাকেন,
— আমার ছানা খেয়ে নিন।
— খেতে মন চায় না হুলো বিড়াল।
ব্যাথার মধ্যে হেসে ফেলেন মৃন্ময় হাওলাদার। ডান হাতে ভর দিয়ে উঠে নিজে প্লেটে হাত দেন। লোকমা তুলে মেয়ের মুখের সামনে ধরতেই দ্বিরুক্তি করে না মৃত্তিকা। চুপচাপ খেয়ে নেয়।
কে বলবে সে এসেছে অসুস্থ বাবা’র সেবা করতে। রীতিমতো অসুস্থ বাবা থেকে আদর নিচ্ছে সে। এই যে আহ্লাদ করে করে তাকে খাওয়াতে হচ্ছে তারমধ্য সে খেতে খেতে একটু একটু কাঁদছেও। মৃন্ময় হাওলাদারের বুক কাঁদে যখন তার সামনে তার রাজকন্যা কাঁদে।
খালি রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ বাদ বাদ গাড়ি যাচ্ছে। সেখানেই ছোট্ট একটা চায়ের দোকান। পূর্ণ ডান হাত দিয়ে কষ্ট করে কাপটা ধরলেও পরে বা হাতে নিয়ে নিলো। কাঁধে চাপ অনুভব হয় তার। কাঁচা ব্যাথা হওয়ার দরুন এমন লাগছে। এই শীতের রাতে বউহীনা বিছানায় ঝটফট করেই বেরিয়ে এসেছে। এসেছে অবশ্য কারো ডাকে। মানুষটা তার জীবনে অনেকটা অবদান রেখেছে।
ঠিক পূর্ণ’র বরাবর বসা সাফারাত। হাতে তারও একটা চায়ের কাপ। পূর্ণ চুমুক বসিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— তোর বাপের খবর কি?
— পাগল কুকুর হয়ে গিয়েছে।
— কি ভাবলি এবার?
— কিছু কি ভাবার আছে?
— না৷
কিছুক্ষণ নীরবতার পর সাফারতই অতীতের কিছু কথা তুললো। পূর্ণ নীরবতাকেই বেছে নিলো।
~না চাইতেও হলুদের অনুষ্ঠানে বসতে হলো সাফারত’কে। মায়ের উপর বিশ্বাস রেখেই সবটা করেছে সে। কষ্ট করে নাম্বার জোগাড় করিয়েছে কোন এক কাজিন থেকে। কিন্তু আফসোস মাশরুহা, পূর্ণ এমনকি ওদের বাবা-মায়ের নাম্বারও অফ। হবেই তো? তারা তো সাফারাতে’র খোঁজে কানাডা ছেড়ে দেশে এসেছে। ওর মা যখন খেয়াল করলো শোয়েব মির্জা কাজে ব্যাস্ত। মেহমান নিয়ে কথাবার্তা বলছে তখনই সারা রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজে সাফারাতের ফোন পান তিনি। ছেলেকে এনে দিতেই সাফারাত দেখলো অগণিত কল করা হয়েছে। ম্যাসেজের ইয়াত্তা নেই। চটজলদি সাফারাত লাস্ট ডায়াল করা নাম্বারে কল দিলো। যদিও এটা বাংলাদেশী নাম্বার। চির পরিচিত কন্ঠটা তখনই তার কানে এলো,
— হ্যালো হ্যালো রাত? আর ইউ দেয়্যার? রাত! কথা বলো না।
কান্না পায় সাফারাতের। এই মানবীর কন্ঠ এমন কেন শুনায়? বহু কষ্টে সে ডাকলো,
— বার্ড?
অতঃপর সব চুপ। ভারী ভারী নিঃশ্বাস ব্যাতিত কিছুই শুনা গেলো না। বেশ সময় পর শুনা গেলো কান্না। কান্না নয় বরং আর্তনাদ। রুহা গলা ফাটিয়ে কেঁদেই চলেছে। এদিকে দরজা লাগিয়ে ওয়াসরুমে কাঁদছে সাফারাত। হয়তো পাশে তখন পূর্ণ ছিলো। ফোনটা কানে ধরে সবটা ক্লিয়ার হলো। গত মাসে তারা বাংলাদেশে এসেছে। মাশরুহা পাগলের মতো রাস্তাঘাটে অলিগলি তাকে খুঁজে চলছে। পুলিশে জানানোর পরও লাভ হয় নি। বাংলাদেশ পুলিশ ততটা তৎপর ছিলো না। সব ভাবেই যখন ব্যার্থ তখনই আশার আলোর মতো সাফারতের কলটা এসেছিলো। চাপা কন্ঠে পূর্ণ’কে একটা ঠিকানা বলে সাফারাত। সেখানেই দেখা করতে বলে মাশরুহা’কে নিয়ে ঐ দিন রাতে।
হলুদের অনুষ্ঠান শেষ করেই শোয়েব মির্জা বসেছিলেন শাজাহান খানের সাথে। এই সময় সে ছেলের খোঁজ নেন নি। মায়ের সাহায্য সাফারাত ছুঁটে যায়। সেই রাতটাও ছিলো এমনি এক শীতের রাত। চারিদিকে কুয়াশায় আচ্ছন্ন। সাফারাত যখন পূর্ণ’র বাহুতে মাশরুহাকে দেখলো। চিৎকার করে ডেকে উঠে সাফারাত,
— জান! রুহা! এদিকে আমি।
বলেই দৌড়ে আসে। এদিক থেকে রুহা দৌড়ে আসে। দুইজন যখন দুইজনকে ঝাপ্টে ধরলো তখন বাঁধ ভাঙা কান্নায় শুনশান রাস্তাটা থমথমে হয়ে গেল। সেই ভাবটা কেটে গেলো যখন মাশরুহা সাফারাতের কানে কানে বললো,
–আ’ম প্রেগন্যান্ট রাত। আমরা প্যারেন্স হব।
কথাটা বলেই সাফারাতের একটা হাত টেনে নিজের পেটে রাখলো৷ পাগল সাফারাত হাটু গেড়ে বসে মুখ গুজে দিলো পেটে। ফেটে পড়লো অবাধ কান্নায়। এত সুখ রেখে কোথায় যাবে সে?
পূর্ণ বেশ খানিক পর এগিয়ে আসতেই সাফারাত মাশরুহা’কে বুকে নিয়ে মাথা নিচু করে রাখে। পূর্ণ শুধু বলে,
— মিথ্যা কেন বলেছিলি রাত?
— আ’ম সরি পূর্ণ। মাফ করে দে।
— শুধু মাত্র মামা হব বলে মাফ করলাম। এতটা ক্লোজ হওয়া উচিত হয় নি।
— হালাল ছিলো সবটা।
পূর্ণ চুপ রইলো। সাফারাত সবটা খুলে বলে তাদের। হাতে পাসপোর্ট আর কিছু জরুরী কাগজ ব্যাতিত ক্যাশ কিছু টাকা আছে। সাফারাত জানায়,
— উই নিড টু গো ব্যাক পূর্ণ। এখানে বাবা কিছুতেই মানবে না।
মাশরুহা তখনও সাফারাতের বুকে। যখন পূর্ণ তাদের গাড়িতে তুললো তখনই কল এসে সাফারাতের ফোনে। মায়ের কল রিসিভ করতেই কানে বাজলো বাবা’র গলা। হুংকার ছেড়ে তিনি বলে উঠলেন,
— এই মুহূর্তে যদি বাসায় না ফিরো খোদার কসম তোমার মা’য়ের লাশ দেখার জন্য চোখ থাকবে না তোমার।
কথাটা কানে যাওয়ার সাথে সাথেই কান্নারত মায়ের গলা ও কানে বাজলো সাফারাতের,
— রাত বাবা তুই ফিরবি না। একদমই না। মা ঠিক আছি রাত। তুই পালিয়ে যা।
ঠিক পরপর এক চড়ের আওয়াজ। অতঃপর? সবটা শান্ত। কল কেটে গিয়েছে। মায়ের ন্যাওটা সাফারাত কি আর পারে এসব সহ্য করতে? সে শুধু অস্থির কন্ঠে বলে,
— গাড়ি থামা পূর্ণ। গাড়ি থামা। মা’কে মে’রে ফেলবে। আমার মা পূর্ণ। গাড়ি থামা।
মাশরুহা’কে বুক থেকে তুলে পূর্ণ’র হাতে দিয়ে সাফারাত শুধু বললো,
— আগামী কাল এখানেই থাকবি ওকে নিয়ে। আমি আসব।
মাশরুহা’র মাথায় একটা চুমু খেয়ে সাফারাত অন্ধকারে হারিয়ে যায়। পূর্ণ রুহা’কে নিয়ে হোটেলে ফিরে যায়। অন্তত ভরসাটা আছে সাফারাত তো আছে।
বাসায় ফিরতেই দেখা মিলে আহত মা’কে। সাফারাত দুই হাতে মা’কে জড়িয়ে ধরে। চিৎকার করে বাবা’কে ডেকে ওই প্রথম গালি দিয়ে ফেলে। কেন তার মা’কে আঘাত করা হলো জানতে চায়। মায়ের মুখে চুমু খেয়ে বুকে জড়িয়ে বসেই কাঁদতে থাকে সাফারাত। কিভাবে মা সহ দেশ ছাড়বে এটাই ছিলো চিন্তায়।
কপালে কাটা অংশে ব্যান্ডেজ করে মায়ে ঘুম পারিয়ে রুম থেকে বের হয় সাফারাত৷ তখনই বাবা’র মুখোমুখি হয়। শোয়েব মির্জা গম্ভীর কণ্ঠে জানান,
— ঐ মেয়ে ছাড়ো। বাবা সব দিব৷ শাজাহান খানের বড় মেয়ে। রুপসি সে৷ একবার বিয়ে করলেই দেখবে রুহা টুহা সব ভুলে যাবে। পালাতে চেষ্টা করো না রাত।
— মরে গেলেও আমার রুহাকেই চাই।
কথাটা বলেই নিজের রুমে চলে যায় সাফারাত। খুশিতে তার কান্না পায় অথচ সুচিন্তায় মাথা ফাটার জোগাড়।
শোয়েব মির্জা রুমে ঢুকে নজর দেন ভালেবাসার মানুষটার দিকে। জোয়ান কালে এই নারীর রুপে ঝলসে গিয়েছিলেন আজও তাই হয়৷ এই যে এক সন্তান হওয়ার পরও যখন আর হচ্ছিলো না তখন তিনি কত বললেন আরেকটা বিবাহ করতে। শোয়েব মির্জা করেন নি৷ কেন করবেন? ভালোবাসার মানুষ কিভাবে ছাড়বেন তিনি?
এগিয়ে এসে স্ত্রী’র পাশে বসে মাথায় হাত বুলান। ফর্সা গালে দানবীয় হাতের চড়টা ফুটে আছে। কিভাবে যে আঘাত গুলো করলেন? কেন রাগটাকে সামাল দিতে পারলেন না? কলিজাটা কার পুড়ছে? শাড়ীর আঁচলটা সরিয়ে স্ত্রী’র বুকে মাথা রাখেন তিনি। নরম গলায় বলেন,
— আর কখনো এই ভুল হবে না সোনাপাখি। মাফ করে দাও। রাগটা সামাল দিতে পারি নি। উঠো। উঠো না। আমি রাতে খাই নি তো। সোনাপাখি আমার প্লিজ চোখটা খুলো।
গভীর ঘুমে মত্ত তার স্ত্রী চোখ খুলতে পারলেন না। জীবন দশায় এহেন বয়সে এসে হয়তো ভালোবাসার মানুষটার থেকে আঘাতটাও সহ্য করতে পারেন নি। সেই রাগে জ্বরে পুড়লেন। সারাটা রাত স্ত্রী’র সেবা করেছেন শোয়েব মির্জা। অপরাধবোধ তার জেগেছিলো সারাটা মস্তিষ্কে।
রাত তখন তিনটা হবে। বাইরে ঘন কুয়াশাতে আচ্ছন্ন। ঠান্ডায় বাবা’র বুকে বিড়াল সেজে বসেছে মৃত্তিকা। দুইজনই ঘুম। হাতের অল্প ব্যাথায় মৃন্ময় হাওলাদারে ঘুম কিছুটা আলগা হয়ে আসে। এই ঘনঘটা রাতে কলিং বেলের শব্দটা বেশ জোড়ালো শুনালো। কপালে ভাজ পরলেও তা চটজলদিই মিলে গেলো তার। এই সময়ে কলিং বেল বেজেছে। কে এসেছে তা আর বুঝতে বাকি নেই৷ ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো তা সাইলেন্ট করা তাই হয়তো কল এলেও শব্দ শুনা যায় নি৷ পুণরায় তিনি ব্যাক করলেন। ওমনিই মিঠি’র মা জানালো,
— পূর্ণ আব্বু এসেছে।
— আমার রুমে পাঠিয়ে দাও। ঠিক আছে তো?
— মনে হচ্ছে না। এক হাতে হয়তো বোঁধ পাচ্ছে না। ড্রয়িং রুমে বসা।
— আচ্ছা পাঠাও রুমে।
ফোনটা কাটার ঠিক মিনিট দুই এক পরই নক না করে পূর্ণ ঢুকলো। অগোছালো সদ্য হওয়া এমপি’র এহেন দশায় করুনা হয় মৃন্ময় হাওলাদারের। উঠে বসতে চাইলেই পূর্ণ’র কাতর কন্ঠ শুনায়,
— আব্বু আমি কাউচে শুই?
কি নিদারুণ আকুলতার মিশ্রণ ঘটিত আবদার। মৃন্ময় হাওলাদার কি তা ফেলতে পারেন? মোটেও না। একবার বলতে চাইলেই, ‘আমি অন্য রুমে যাই তুমি থাকো এখানে’ কিন্তু মেয়ের লোভটা ও ছাড়তে পারলেন না। এখন নড়লেই মৃত্তিকা’র ঘুমটা ভাঙবে। কোনমতেই সেটা মৃন্ময় হাওলাদার হতে দিবেন না৷ তার রাজকন্যা’র ঘুম আজ এমনিতেই দেড়ীতে হয়েছে, এখন উঠলেই মাথা ব্যাথা হবে। অল্প হেসে মৃন্ময় হাওলাদার সম্মতি দিতেই পূর্ণ ধপ করে কাউচে শুয়ে পরে। ছেলেটা নিশ্চিত এত ধকল সামলে আজ ক্লান্ত তাই তো গা এলিয়ে দিতেই ঘুমের দেশে তলালো।
মেয়ে বুকে খাটে বাবা স্বামী তার কাউচে। বড্ড আদুরে এই দৃশ্যটা। কোথায় ই বা দেখা যায় এমন উন্মুক্ত চিন্তাধার ঘেরা দৃশ্য? হোকটা সেটা কৃত্রিম তবুও সুন্দর।
সাফারাত আজ ঘুমাতে পারলো না। পূর্ণ’র সাথে আজ প্রায় তিন ঘন্টা ছিলো। ছেলেটা আগের পূর্ণ নেই। সেই নরম মনটা ও নেই। কঠিনতার খোলসে নিজেকে আবৃত করে রাখে এখন অথচ আগে সাফারাত আর পূর্ণ দু’জনই ছিলো দু’জনের নিকট খোলা পুস্তক যাতে আজকাল ধুলা জমেছে। সাফারাতের জানা নেই কিভাবে পরিষ্কার করবে সেই ধুলো।
বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস ও আজকাল আসে না তার। হাহাকার করে উঠে ওর বুকের ভেতর। যদিও সস্তি সে কিছুটা সময় পায়। ফোনটা বাজতেই সেটা কানে ধরে সাফারাত। ভেসে আসে নারী কন্ঠ। সাফারাত ক্লান্ত স্বরে জানায়,
— আই ওয়ান্ট টু ডাই এঞ্জেল।
অপর পাশ থেকে কিছু শুনা যায় এতেই হাসে সাফারাত। ফোনটা কেটে ডুব দেয় অতীতে।
~হাজার চেয়েও যেতে পারে নি সাফারাত পরদিন তার রুহা’র নিকট। তার সন্তানের নিকট। কিন্তু তার মা’র কাছে থেকে জানতে পেরেছিলো রুহা’র সাথে কথা বলেছে ওর বাবা৷
রুহা’কে ফোনে দেখা করতে বলে শোয়েব মির্জা এবং সতর্ক করে যাতে কাউকে না বলা বিষয়টা। সেদিন রাতেই রুহা রাতে হোটেল থেকে বের হয়ে লুকিয়ে একাই দেখা করতে যায় শোয়েব মির্জা’র সাথে। শোয়েব মির্জা প্রথমেই ঠান্ডা মাথায় কথা বলেন,
— দেখো মেয়ে, সরি মাশরুহা ওয়াহাজ। রাইট?
মাথা নিচু করেই রুহা বলে,
— জ্বি স্যার।
— আমার ছেলেকে ভুলে যাও। তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যত আছে। কি পাবে আমার ছেলে থেকে। নতুন ভাবে সবটা শুরু করো। আমি হয়তো মেনে নিতাম কিন্তু আমি শাজাহান খান’কে ওয়াদা দিয়েছি তার বড় মেয়ের সাথে সাফারাতে’র বিয়ে আগামী কাল। গতকাল হলুদ হয়েছে। নিশ্চিত আর কিছু বুঝাতে হবে না তোমায়। যথেষ্ট বুদ্ধিমতী তুমি।
মাশরুহা অবাক হয়ে বলে উঠলো,
— আমি সাফারাত বিবাহিত।
— সেটা কোন বিয়ে নয়।
— কেন নয়। আমরা মসজিদে গিয়ে বিয়ে করেছি। হালল সম্পর্ক আমাদের। আমার মাঝে সাফারাতের…
ওকে সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই ধমকে উঠে শোয়েব মির্জা,
— চুপ থাকো মেয়ে। টাকা দিয়ে তোমাকে সরানো যাবে না জানি সেটা। কি চাও বলো? আচ্ছা লেটস মেইক এ কনট্যাক্ট। তুমি সাফারাতের বউ রইলে। প্রথম বউ। বছরে এক মাস তোমার কাছে থাকবে ও। বাকি এগারো মাস দেশে। আমার পদটা পরবর্তীতে ও ই সামলাবে। তোমার ভরণ পোষণ দায়িত্ব আমার। কথা হলো ঝামেলা বাধিয়ো না এখন। মাথা গরম আছে। শুধু মাত্র আমার স্ত্রী’র জন্য এইটুকু অধিকার দিলাম তোমায়।
— আপনার ছেলের রক্ষিতা হতে বলছেন? বছরে এক মাস তার সাথে থাকব?
— যেটা ভাব তাই। ওয়ার্ডটা কিন্তু তুমিই উচ্চারণ করলে প্রথম। রক্ষিতাই তো নাহলে কিভাবে অচেনা এক ছেলের সাথে রাত কাটাও বেয়াদব মেয়ে!
হুংকার ছেড়ে কথাগুলো বলেন শোয়েব মির্জা। মাশরুহা থরথর করে কেঁপে যাচ্ছে। এত ভয়ংকর কারো গর্জন হয়? তবে দৃঢ়তার সাথে জানাতে চায় সে সন্তান সম্ভবা কিন্তু সুযোগ মিলে না। গর্জে উঠে শোয়েব মির্জা,
— হয় মানো নাহয় রাস্তা মাপো। তোমার মতো কিট আসবে যাবে। নেতাদের কাছে এসব কোন ব্যাপার ই না।
— যদি না মানি কেনটাই?
— শেষ পরিণতির জন্য দায়ী তুমি নিজে হবে মাশরুহা ওয়াহাজ।
এবারে বেশ ঠান্ডা গলার স্বর শোয়েব মির্জা’র। মাশরুহা এবার তেঁজী গলায় প্রতিবাদ করে,
— আমি একা কিছু করি নি। রাত লাভস মি। হি ইজ নট এ হাসব্যান্ড নাও। আ’ম প…
এবারেও ওকে বাক্য সম্পূর্ণ করতে দেয় না শোয়েব মির্জা। হিতাহিত জ্ঞান শূন্য মস্তিষ্ক সাথে জেঁকে ধরা ক্ষমতার লোভ। নেশা চাড়া দেয় তার মাথায়। এমনিতেও আসার আগে শাজাহান খানের সাথে কয়েক প্যাগ গিলা হয়েছিলো। তাতে অবশ্য নেশা হয় নি তার। রাগে চোয়াল চেপে ধরে সে মাশরুহা’র। দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
— লাস্ট চান্স মাশরুহা। গো ব্যাক। আ’ম প্রমিসিং ইউ, সব ধরনের সাহায্য পাবে। রাত ও যাবে তোমার কাছে। এখন দূরে থাক।
— থাকব না। রাত আমার হাসব্যান্ড।
কথাটা বলতে দেড়ী গালে থাপ্পড় পরতে দেড়ী হয় না। সব সময়ের এক রোখা, জেদী মেয়েটা যে কিনা সবাই’কে নিজ কথায় রাজি করাতো আজ তার জেদ পাত্তা দেয়া হলো না। মাঝ রাতে খালি রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সে। পেটে চাপ লাগতেই এক হাতে পেট চেপে ধরে। সাড়ে তিনমাস চলে তার। বাচ্চাটা ব্যাথা পেলো বুঝি? শোয়েব মির্জা হুংকার ছেড়ে ডাকে,
— মাহিন!
মাহিন মিয়া দৌড়ে আসেন। শোয়েব মির্জা ঠান্ডা মাথায় বলে,
— এর এমন ব্যাবস্থা করো যাতে ভুলে যায় রাত নামে কেউ ছিলো তার জীবনে।
কথাটা বলতেই দশ এগারো জনের মতো যুবকের আগমন হয়। তাদের দৃষ্টি দেখেই ঘাবড়ে যায় মাশরুহা। তারা যখন রুহা’র দিকে আগাচ্ছিলো ভয়ে শোয়েব মির্জা’র পা ঝাপ্টে ধরে কেঁদে ফেলে মাশরুহা। আকুল আবেদন জানায়,
— আঙ্কেল এমন করবেন না। আমি রাত’কে অনেক ভালোবাসি। ও…ও আমাকে ভালোবাসে। বাঁচবে না আমাকে ছাড়া। প্লিজ!
শোয়েব মির্জা নিজের পা ছাড়াতে লাথি বসায় রুহা’র পেটে। অসহ্য ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠে বাবা-মা, ভাইয়ের আদরের বোনটা। শোয়েব মির্জা চলে যান। পেছনে কয়েকজন মিলে ঘন জঙ্গলটাতে টেনে নেয় মাশরুহা’কে। মাহিন মিয়া’র কানে ভেসে আসে বিভৎস চিৎকার। রীতিমতো তার হাতে,পায়ে কাঁপন ধরে যায়। বুঝতে বাকি রয় না কি করা হচ্ছে মেয়েটার সাথে। ঘনঘটা রাতে নিশাচর পাখিগুলো ও যেন ভয় পেলো। এক ঝাপ্টা বাদুর উড়ে গেলো বড় হিজল গাছের উপরে। সেই হিজল গাছটা শুধু রয়ে গেলো সাক্ষী। একজন ভালোবাসার কাঙালীর ভালোবাসা নামক পাপ করার শাস্তি সরুপ পেলো এগারো জন পুরুষের অপবিত্র ছোঁয়া। নিস্তেজ দেহটাকেই একসময় মাটি চাপা দেয়া হলো অথচ স্পষ্ট গোঙ্গানির শব্দ শুনা যাচ্ছিলো। জীবিত দেহটাকে মাটি চাপা দিয়ে নেশায় বুদ ছেলেগুলো একে একে বেরিয়ে এলো জঙ্গল থেকে। কতটা বিকৃত মস্তিক! কতটা ভয়ানক এদের চাহিদা। মাহিন মিয়া ওদের সামনে টাকার পাঁচটি বান্ডেল ছুঁড়ে দিয়ে এক দলা থুতু ফেলে চলে যায় গাড়ির নিকট। একসময় জায়গাটা সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে গেলো। একদম শান্ত। অথচ কিছুক্ষণ আগেই এখানে দুটি প্রাণের স্পন্দন বন্ধ করা হয়েছিলো।
রোজকার ন্যায় সূর্য উদয় হলো তবে তেজ নেই বললেই হলো। পূর্ণ খাবার হাতে মাশরুহা’র দরজায় নক করতেই দেখলো তা খোলা। ভেতরে কেউ নেই। এদিক ওদিক খুঁজে ও লাভ হলো না। কোন গতিই পাওয়া গেলো না। ওর মা-বাবা ততক্ষণে ভেঙে পড়েছিলো। সাফারাতের দেয়া লোকশনে পৌঁছানোর প্রায় মিনিট বাদ চাদরে মুড়ে গায়ে শেরওয়ানি পড়া সাফারাত আসে। পূর্ণ’র দিকে তাকিয়েই বলে,
— বার্ড কোথায়? গাড়িতে? চল তারাতাড়ি। পালিয়ে এসেছি আমি।
— আপি’কে পাচ্ছি না রাত।
সাফারাতের কপালে ভাজ দেখা গেলো। পূর্ণ সিরিয়াস মুহুর্তেও রুহা’কে আপি ডাকে না। আজ কি হলো? পূর্ণ ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না রুহা’কে অথচ তাদের রাস্তার পাশে জঙ্গলের ভেতর হিজল গাছটার নিচেই চাপা আছে মাশরুহা। এতটা নিকট হয়েও আজ সে বহুদূর।
কেটে যায় দুই দিন। পাগল সবাই। এমনকি শোয়েব মির্জা নিজেও। সাফারাত পাগল হয়ে গিয়েছে দুই দিনে। বিয়ে সে করে নি বরং বিয়ের আসরে বাবা’র উপর ঝাপিয়ে পড়েছিলো। পায়ে ধরে কেঁদেছিলো। লাভ হয় নি। বিয়েটাও হয় নি। টানা দুই দিন পর মাশরুহা’র লোকেশন ট্রেস করা হয়৷ তার পকেটেই তার ফোনটা ছিলো৷ রাত তখন নয়টা হবে। একদিকে ছুটে পূর্ণ অন্যদিকে সাফারাত। সাফারাত পৌছালো আগেই। লোকেশন কাছে অথচ নেই তার রুহা’র অস্তিত্ব। একসময় হিজল গাছটার নিচে ফোনটা পাওয়া গেলো। সাফারাত গলা ফাটিয়ে ডাকে,
— জান! রুহা! কলিজা বেরিয়ে এসো। আমি এসেছি। বার্ড!!
কোন রেসপন্স নেই। মাটিতে বসে পরে সাফারাত। হাত থাবড়ায় মাটিতে। তখনই একটা কাপড়ের টুকরো হাতে উঠে। অন্ধকারে হাতরায় সাফারাত। ফ্লাস অন করতেই দেখে কাপড়ের কিছুটা মাটির নীচে। সাফারাত চিনে এই কাপড়ের টুকরোটাকে। তার অচল মস্তিষ্ক জানান দেয় ভয়ংকর কিছুর। পাগলের মতো খুঁড়ে সাফারাত। এই তো একহাত ও খুঁড়তে হয় না। বেরিয়ে আসে তার রুহার হাত। সাফারাত উন্মাদ হয়ে উঠে৷ পাগলের ন্যায় খুঁড়ে যাচ্ছে তখনই পূর্ণ আসে। ধপ করে পাশের গাছটার গুড়িতে বসে পরে। অর্ধ গলিত কিছুটা পঁচা দেহটাকে বুকে চেপে আত্নচিৎকার করে উঠে পুরুষটা। তার স্ত্রী সেটা। পূর্ণ অবাক চোখে তাকিয়ে। কি হয়েছে বা হচ্ছে তা তার মস্তিষ্ক তখমও ধরতেই পারে নি অথচ চোখ দুটো দেখছে সবটা।
সাফারাত সেই লা*শটাকে আঁকড়ে ধরে। কাঁদে পাগল হয়ে,
— এই জান উঠো। পালাব আমরা। কলিজা আমার।
চুলগুলোতে হাত বুলায় সে যেন গুছিয়ে দিচ্ছে। পরক্ষণেই মনে পরে কিছু। জোরে চিৎকার করে রুহা’র পেট হাতরায়,
— হায় আল্লাহ! আমার বাচ্চা। বার্ড আমাদের বাচ্চা। তুমি উঠো না। জেদী মেয়ে উঠো। পালাব আমরা। কানাডা চলে যাব। এই দেশ ছাড়তেই হবে। জান!!
উঠে না কেউ। পুলিশ হাজির হয় সেখানে। দূর থেকেই মুখে রুমাল চেপেছে সবাই অথচ কি সুন্দর দুটো পুরুষ নারীটার শিওরে বসে আছে।
সময় নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঔষধ। যত সময় যাবে যত গভীর ঘা ই হোক না কেন তা শুকিয়ে যাবে।কিন্তু সাফারাতের ক্ষেত্রে তা হলো উল্টো। ছেলেটা মানুষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো। রাত বিরাতে সেই বিভৎস স্বপ্নটা দেখতো। যেখানে দেখা যেত হিজল গাছটার নিচে তার রুহা শুয়ে আছে। পাগল সাফারাত রাত হলেই পালিয়ে যেত বাসা থেকে। ওর মা ছেলেকে দেখতে রুমে যেতেই দেখেন সাফারাত নেই। বারকয়েক রাত বলে ডাকলেও সাড়া পাওয়া যায় না। বিচলিত হয়ে যখন চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেন তখনই রুম থেকে শোয়েব মির্জা ও বেরিয়ে এলো। না সাফারাত নেই। সারা বাড়ীতে তার অস্তিত্ব নেই। ভয় পেয়ে যান শোয়েব মির্জা। ছেলেটা তার ঠিক নেই। বড্ড অনুশোচনায় ভুগেন তিনি। সেদিন যখন সাফারাত’কে বাসায় আনা হলো তখন সে পাগলের মতো বাবা’র পা ধরে কাঁদে,
— আব্বু আব্বু আমার বার্ড একা ছিলো না। আমার বাচ্চা ছিলো ওর পেটে। আব্বু আমার সন্তান ছিলো। আমার আর রুহা’র সন্তান ছিলো ওর পেটে। ও কোথায় আব্বু? ওকে এনে দাও।আর কোনদিন কিছু চাইব না। সত্যি বলছি। আমার কলিজাটা’র পেটে আমার বাচ্চা আব্বু। ও আম্মু বলো না আব্বু’কে।
শোয়েব মির্জা থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কি বলে এটা তার ছেলে? ঐ মেয়ের পেটে কি না তার বংশের র*ক্ত? ঢোক গিলেন তিনি। ঐ পেটে লাথি মে’রেই তো তিনি মেয়েটাকে ফেলেছিলেন রাস্তায়। দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না শোয়েব মির্জা। ধপ করে বসে পরেন ছেলের পাশে৷ তার বুকেও খুবই সুক্ষ্ম কিছু একটা বিঁধেছিলো যা ছিলো লোকচক্ষু আড়াল।
সেই থেকে শোয়েব মির্জা কিছুটা বিচলিত ছেলে নিয়ে। ইদানীং পাগলামি বেশি করে। ছেলেকে না পেয়ে তার স্ত্রী জ্ঞান হারায়। শোয়েব মির্জা শক্ত করে তাকে বুকে চেপে ধরে। চোখ তার ও জ্বালা করছে। চিন্তায় ঘাম তার ও ছুটেছে। বুয়াদের কাছে প্রিয়তমা’কে রেখে ছেলের খোঁজে ছুটেন শোয়েব মির্জা।
মানুষ লাগিয়েও যখন কাজ হলো না তখন কিছু একটা ভেবে তিনি যান ঐ জঙ্গলটায়। তার ধারণা ঠিক। ওখানেই মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে সাফারাত ডাকছে,
— রুহা? জান আমার? বের হও। পালাতে হবে না কলিজা? উঠো। আমার বাবু খাবে। জান না তুমি পালাতে হবে। আব্বু’র লোক এলে আমাকে ধরে ফেলবে তো। বের হও।
শোয়েব মির্জা’র বা চোখ গলিয়ে এক ফোঁটা অনুতাপ পরলো। তার ছেলেটা যে আর সুস্থ নেই তা তিনি বুঝেন। মাটি খুঁড়ে গর্তের ভেতর মুখ দিয়ে ডেকেই চলছে সে।
পা চালিয়ে এসে ছেলেকে ঝাপ্টে ধরেন তিনি। এক পলক বাবা’কে দেখেই জ্ঞান হারায় সাফারাত।
অতঃপর কিছু ঠিক হলো না। সাফারাত হয়ে উঠলো বদ্ধ পাগল। একরাতে মায়ের কাছে এসে চুপ করে ডাকতে লাগলো। ওর মা ধরফরিয়ে উঠতেই সাফারাত বলে,
— আম্মু। আমি পালাচ্ছি তুমি ভয় পেও না তোমাকেও নিয়ে যাব। চলো দরজাটা খুলে দাও।
ফ্যালফ্যাল করে ছেলেকে দেখেন তিনি। আজকাল তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। সুঠাম দেহের লম্বাটে, সাস্থবান পুরুষটা তখন পাগল। রাত বিরাতে পালায় সে। সবাই জন্য দিন বদলে ভিন্ন দিনের সূচনা হলেও সাফারাত আটকে ছিলো সেই কালো রাতে।
শিকল পড়ানো অবস্থায়ও শুধু কাঁদতো আর বলতে থাকতো,
— আমাকে ছাড়ো। আম্মু? আম্মু আমি রুহা অপেক্ষা করছে। পালাতে হবে আমাদের।
একপ্রকার বাধ্য হয়েই ছেলেকে পুণরায় কানাডা পাঠায় শোয়েব মির্জা। দেশে শুধু তাকে শিকল পড়িয়ে রাখা হতো। ওখানেই পরবর্তীতে তার চিকিৎসা চলে। আদৌ সে সম্পূর্ণ সুস্থ কি না জানা নেই কারো।
ছেলের শোকে শোকাহত ওর মা অসুস্থ হয়ে পরেন। শোয়েব মির্জা চেয়েও কিছু করতে পারেন না। তার ভালোবাসার মানুষটা অভিমান করে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো। কত রাত অসুস্থ স্ত্রী’র পা ধরে শুয়ে থাকতেন তিনি তার ইয়াত্তা নেই। ভালোবাসা তার ছেলের ছিনিয়ে নিলেও নিজ ভালোবাসা, এত বছর যার সাথে সংসার করলেন তার নিকট হতে এহেন আচরণ যখন কুঁড়ে খাচ্ছিলো শোয়েব মির্জা’কে তখনই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তিটা তিনি পেয়েছিলেন। সাফারাতের মা ছেলের অপেক্ষায় সদর দরজায় বসে থাকতেন। কি মনে করে বারবার ছেলের রুমে যেতেন। গেছানো রুমটা আবার গুছাতেন। কাঁদতেন। বছর গড়াতেই কান্নাটা ও থেমে যায় তার। পাথরে পরিণত হন তিনি।
এমপির বউ যে কিনা স্বামী’র অসুবিধা হবে বলে বাবা’র বাড়ী যেতেন না সেই তখন সংসার নিয়ে উদাসীন। বুয়াদের দখলে তার সখের রান্নাঘর অথচ শোয়েব মির্জা কখনো বউয়ের রান্না খেতে পারেন না। আভিজাত্য তার সর্বাঙ্গে সেই সখের নারীটাই একদিন ছেড়ে চলে গেল শোয়েব মির্জা’কে। মৃত্যুর রাতটায় স্বামী’র বুকেই ছিলেন। সকালে তো শোয়েব মির্জা বুঝলোই না তার প্রিয়তমা যে তাকে ছেড়ে গিয়েছেন। যখন আদর করে ডাকলেন,
— সোনাপাখি উঠবে না? রাতকে আজ ভিডিও কলে দেখা যাবে। পাখি?
তখনই যখন হাতটা গালে রাখেন শোয়েব মির্জা খেয়াল করেন গালটা ঠান্ডা। না শুধু ঠান্ডা না বরং বরফের খন্ড। যা বুঝার তিনি বুঝেন তবে মন মানে না। বুকে চেপে ধরেন প্রাণহীন দেহটাকে। কাঁদেন না। অধিক শোকে তখন পাথর তিনি। সারামুখে চুমু খেয়ে ডাকেন,
— বউ?
সাড়া আসে না। তিনি আদর মিশ্রিত কন্ঠে পুনরায় ডাকেন,
— সোনাপাখি আমি ভয় পাচ্ছি। দেখো তোমার শোয়েব কিন্তু ভয় পাচ্ছে। উঠো না। প্লিজ এমনটা করো না। আমার ভয় হচ্ছে।
তার ভয়টা কমাতে তার প্রিয়তমা তার উষ্ণ বুকে মুখ লাগালো না। না সাড়া দিলো। একসময় যখন তিনি লা*শটা কোলে নিয়ে বের হন তিনি। বুয়ারা সহ সবাই আঁতকে উঠে। শোয়েব মির্জা ধীর কন্ঠে শুধায়,
— ও চলে গিয়েছে। মাহিন?
মাহিন মিয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে বলেন,
— জ..জ্বি স্যার।
— ওকে কি করব? কোথায় রাখব? ও চলে গিয়েছে আমাকে একা রেখে। দেখো কতটা রাগ তার আমার প্রতি। কথা হয়েছিলো গতরাতে। আমি বললাম সব ঠিক করে দিব। সুযোগটাই দিলো না।
তার কাছ থেকে ছাড়ানো গেলো না তার প্রিয়তমা’কে। ডাক্তার আনা হলো। হসপিটালের রিপোর্ট হতে জানা গেলো দীর্ঘ বছর পর পুণরায় সন্তান সম্ভবা ছিলেন শোয়েব মির্জা’র স্ত্রী। এই তো আড়াই মাসের একটা ভ্রুণ ছিলো তার মাঝে। খবরটা যখন শোয়েব মির্জা জানলেন ভাঙলেন ঠিক তখন। প্রকৃতি কি বদলা নিলো? নিলোই তো। ভয়ংকর রকমের প্রতিশোধ নিলো এই প্রকৃতি।
শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩৭+৩৮
বৃষ্টি ভেজা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে খালি পায়ে হেঁটে বাড়ীর পেছন আসেন শোয়েব মির্জা। কবরটার কাছে গিয়ে বসে মাথা এলিয়ে দেন পায়ের দিকে। এরপর মাঝখানে। তার কানে বাজে, কেউ তাকে আদো আদো বলুতে ডাকছে,”আব্বু”। হ্যাঁ তার এবং স্ত্রী’র দ্বিতীয় সন্তান ডাকতো থাকে। কানে শুনেন শোয়েব মির্জা। আচ্ছা তার প্রিয়তমা কি জানতো এই খবর?জানলে না খুশিতে পাগল হয়ে কাঁদতেন? ভেবে পান না শোয়েব মির্জা, দ্বিতীয় বাবা বাবা সুখটা এই মধ্যে বয়সে কেমনটা অনুভূতির জোয়ার আনত।
শাস্তির কি কিছু বাকি ছিলো নাকি সবটা প্রকৃতি ফেরত দিলো?
