Home শান্তি সমাবেশ শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩৭+৩৮

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩৭+৩৮

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩৭+৩৮
সাইয়্যারা খান

নির্বাচন। রাজনীতি। এই ধারাবাহিকতা বহমান প্রতিটি দেশে। যা চলে আসছে তা চলবেই। ঠেকানোর সাধ্য নেই। তাই বলে যে ক্ষমতা ও একজনের হাতে থাকবে তা ও না। বদলাবেনা রাজনীতি কিন্তু বদল হবে প্রতিনিধি’র। একের পর এক আসবে। গণতান্ত্রিক দেশ রাজতান্ত্রিক নয়। শোয়েব মির্জা হয়তো কথাটা ভুলে গিয়েছিলেন৷ নিজ বাবা’র পর থেকে ক্ষমতা ধরেছিলেন নিজ হাতে। আয়ত্তে ছিলো তা বছরের পর বছর। এবার ও তাই হওয়াতে চাইছিলেন পরবর্তীতে হয়তো সাফারাত’কে ক্ষমতা টা তুলে দিতেন। পরিস্থিতি এবার তার অনুকূলে নয় ব্যাপারটা ঢেড় বুঝেন তিনি তবে হার মানার পাত্র ও নন। এই রাজনীতিতে সব ঢেলেছেন তিনি।

হারিয়েছেন বহু কিছু যা কোনদিন পোষাবার নয়। তাহলে কেন ছাড়বেন তিনি সব? অতীত তার চোখের সামনে ভাসে। তার এবং ক্ষমতার মাঝে আসা সকল কাটা তিনি নিজ হাতে উপড়ে দিয়েছিলেন। প্রয়োজনে এবারেও তা হবে। হাত তার সেবেলায় ও কাঁপে নি এবারেও কাঁপবে না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

~সাফারাত যে কানাডায় কাউকে ভালোবেসে ফেলেছিলো তা টের পেয়ে যান শোয়েব মির্জা। স্ত্রী’কে বলেন কড়া ভাবে যাতে ঐ সব থেকে বেরিয়ে আসে। এখানে তার জন্য মেয়ে দেখা আছে। আর কেউ নন বরং নেতা শাজাহান খানের কন্যার জন্য প্রস্তাব টা দেয়া হয়েছিলো। শোয়েব মির্জা তা হাতছাড়া করতে নারাজ। ক্ষমতা কে না চায়? সেই ক্ষমতা বৃদ্ধি পাক এটাই বা কে না চায়? তার চাওয়াটা নিশ্চিত মন্দ ছিলো না। কথা দিয়ে ফেলেন শাজাহান খান’কে। মেয়ে যথেষ্ট সুন্দরী। সাফারাতের সাথে মানাবে। ওর মা নিষেধ করার সত্ত্বেও তিনি ডালা সহ আংটি পড়িয়ে আসেন মেয়েকে। দিন তারিখ যেন মুখে মুখে ঠিক। সাফারাত’কে জানাতেই ও রেগে যায়। ততদিনে ও নিজেকে শপেছে তার বার্ডে’র নিকট। পূর্ণ অতকিছু জানত না। শুধু জানত সাফারাত চিন্তিত কারণ ওর বাবা কোন এক নেতার মেয়ের সাথে ওর বিয়ে ঠিক করেছে। ব্যাপারটা সিরিয়াস ছিলো না ততটা। পূর্ণ’র ভরসা ছিলো তার রাতে’র প্রতি ঠিক ততটাই মাশরুহা’র প্রতিও।
শোয়েব মির্জা যখন ছেলেকে রেগে রেগে দেশে আসতে বলেন তখন সাফারাত ও রেগে যায়। জানিয়ে দেয় বাবা’কে রেষারেষি করে,

— কয়বার বিয়ে করব?রুহা’কে বিয়ে করেছি আমি। ওর সাথেই সংসার করব।
ঐ প্রথম বাবা’র উপর দিয়ে সাফারাত কথা বলে। অবাক শোয়েব মির্জা রাজনীতি করতে করতে চাল চালা শিখেছেন বহু আগে। তার ভাব বদলায়। ছেলেকে মাথা ঠান্ডা করায়। বলে,
— আচ্ছা ঠিক আছে। দেশে আসো। পারিবারিক ভাবে সবটা করি। আমার ছেলে হয়ে লুকিয়ে বিয়ে তা মেনে নিব আমি? সামনে নির্বাচন তার আগেই বউমা ঘড়ে তুলব।
সাফারাত সেদিন খুশিতে মাশরুহা’কে জড়িয়ে ধরে। দুইজনই আবেগি হয়ে পরে। শুধু মাত্র সাফারাত ওর বাবা’কে ভয় পেতো বলেই রুহা এমনটা করেছিলো। বিয়ে করেই ক্ষ্যান্ত হয় নি বরং সবটা উসুল ও করেছিলো। বাবা-মায়ের সামনে যখন মাথা নিচু করে সাফাই গায় তখন পূর্ণ ও বড় বোন আর বন্ধুকে সাপোর্ট করে। পূর্ণ’র বাবা-মা মেনে নেন। সরল সহজ মানুষ ততটা প্যাঁচ মনের ভেতর ছিলো না। তার ঠিক দিন দুই পর দেশের উদ্দেশ্যে সাফারাত রওনা হয়। সেই রাতে পুণরায় সাফারাতের কাছে আসে মাশরুহা। এবার যেন সাফারাতই পাগল হয়ে উঠে। না জানি সব গুছিয়ে কবে ফেরা হয়। পাগল সাফারাত পাগলামি করে। ভয়ংকর পাগলামি। সেই পাগলের পাগলামিতে পাগল হয়ে উঠে মাশরুহা। কানে ভাসে সাফারাতের নেশাগ্রস্ত কন্ঠ,

— কলিজা। জান, আমার জান। ভালোবাসি আমার বার্ড’কে।
— আমিও ভালোবাসি রাত।
— আমার বউ। এর পরেরবার আর লুকিয়ে না বরং সবার সামনে থেকে তুলে নিয়ে আদর করব।
— অসভ্য রাত।
— দুষ্ট রুহা।

পর দিন দেশে ফিরে সাফারাত। সরল মনটা তখনও বুঝে না বাবা’র ভয়ংকর ষড়যন্ত্র। এয়ারপোর্টে শুধু নজরে আসে হাসোজ্জ্যল সাথে টলমলে রুহা’কে। পূর্ণ ওকে জড়িয়ে ধরেই কানে কানে বলে,
— কাম ফাস্ট ইয়ার।
— আই উইল।
— তোদের মাঝে কিছু হয় নি তো রাত?
হকচকিয়ে গিয়ে সাফারাত অস্বীকার করে বসে। পূর্ণ সরু চোখে তাকাতেই সাফারাত বলে,
— ঐ বাইট পর্যন্তই।
পূর্ণ বিশ্বাস করে। সাফারাত যায় তবে তার আর ফেরা হয় না। রুহা দিন গুনে, মাস গুনে। সাফারাত যেন হারিয়ে যায় সবার থেকে। তার আর ফেরা হয় নি স্বপ্ন বুনা সেই ভিনদেশে।
ততদিনে পাগল মাশরুহা। এক রোখা, জেদী স্বভাবটা দেখে দিলো তার মধ্যে। সাফারাত’কে কল দেয়া শুরু করে সবটা করা হলেও যখন কাজ হলো না তখন মাশরুহা পাগল হয় দেশে ফিরতে। সেই জেদের বশবতী হয়েই স্বপরিবারে বাংলাদেশে আসে মাশরুহা, পূর্ণ। ওর মা এক প্রকার মেয়ের জেদে হার মানেন।
এই তো আসা তারও আর ফেরা হলো না।

মৃত্তিকা’র বাসার বাইরে পা রাখা নিষিদ্ধ। এমনকি ওর বাবা এসে দেখা করে যায়। পূর্ণ কিভাবে যেন টের পেয়েছিলো মৃত্তিকা’র ঐ দিন এক্সিডেন্ট হতে নিয়েছিলো। এটা শোয়েব মির্জা’র কাজ তা ও ওর জানা। আগামী কাল নির্বাচন। আজ রাতে বাসায় ফিরা হবে না তার। এমনকি আশ্চর্যের বিষয় হলো মৃন্ময় হাওলাদার ও জামাতার সাথে আছে। পূর্ণ যেন তাকে নিজের আইডল মানে। অক্ষরে অক্ষরে পালন করে শাশুড়ের কথা। মাত্র ই একটু খেয়ে কল দিলো মৃত্তিকা’কে। চাতকের ন্যায় ফোনটা হাতেই বসে ছিলো মৃত্তিকা। রিসিভ করে সালাম জানাতেই অপর পাশ থেকে ভেসে আসে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত এক কন্ঠ,

— মৃত্ত!
ব্যাস সকল চিন্তা, চেতনা হারায় মৃত্তিকা। দম আটকে কান্না থামায়। লোকটা কেন এতটা দূরে? কি হয় মৃত্তিকা’কে বুকে নিয়ে বসে থাকলে? আহ্লাদী মৃত্তিকা’র তো এখন পূর্ণ ছাড়া চলে না। পূর্ণ পুনরায় ডাকতেই মৃত্তিকা সাড়া দেয়,
— হুম।
— খেয়েছে আমার পূর্ণ্যময়ী?
— উহু।
— মৃত্ত! কেন এমন করেছেন? আমি আসব তো। আপনি দোয়া করুন শুধু। আপনার পূর্ণ’কে সহি সালামত আপনার হাতে তুলে দিব।
— খেয়েছেন?
— মাত্র খেলাম৷ আব্বু আছে সাথে।
— আমার আব্বু?
— আমার শশুর আব্বু।
মৃত্তিকা হেসে ফেলে। পূর্ণ আরো কিছুক্ষণ আদুরে গলায় কথা বলে। কে বলছে এই ছেলে একটু আগেও গম্ভীর কণ্ঠে ধমকাচ্ছিলো কাউকে? বউয়ের নিকট একদম পেঁজা তুলোর ন্যায় তুলতুলে পূর্ণ অথচ বাইরের জগৎ এ ঠাট ফাট ই অন্য রকম।

কল কাটতেই সোফার দিকে তাকালো মৃত্তিকা। পূর্ণ’র মা হাজার বিরোধিতা করুক রাজনৈতিক কাজে অথচ এখন সারাদিন দোয়া পড়ে ছেলের নামে বকশায়। নামাজে তার ছেলের জয় চাই। মৃত্তিকা উঠে রুমে এলো। আসরের নামাজটা পড়তে দাঁড়িয়ে না চাইতে কেঁদে উঠলো। পূর্ণ’টা হার মানতে পারবে না। সইতে পারবে না। লোকটা পাগলের মতো ভালোবাসে রাজনীতি’কে। তার জয়ই এখন মৃত্তিকা’র দোয়ার স্থান জুড়ে।
রাত পোহানোর পালা এখন। ভোট কেন্দ্রে অবস্থান সকলের। সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ভোট চলবে। সেরাতে আর পূর্ণ’র কল এলো না। সারাটা রাত ফোন হাতে বসে রইলো মৃত্তিকা। পূর্ণ’র মা এসে জোর করে নিজের কাছে নিয়ে যায়। মেয়েটা যে তার ছেলেকে কতটা ভালেবাসে তা বুঝা হয়েছে সকলের। শ্যামলা মুখটা কালো হয়ে আছে যেন। চিন্তায় চিন্তায় ফ্যাকাশে তার মুখখানা। পূর্ণ’র বাবা বাসায় ফেরেন নি। হঠাৎ রাত সাড়ে তিনটা নাগাদ একটা কল আসে ওর মায়ের ফোনে। মৃত্তিকা তখন মাত্র চোখ বুজেছিলো। ফোনের শব্দে তাও ভেঙে যায়। মা দেখে বাবা কল করেছে। রিসিভ করতেই তিনি জিজ্ঞেস করলো,

— মৃত্তিকা কোথায়?
— আমার পাশেই। কন্ঠ এমন লাগে কেন?
— কিছু না। শুনো রুম থেকে বের হও তো।
ওর মায়ের কলিজা তখন কাঁপছে। না চাইতেও খারাপ চিন্তা ভর করছে মাথায়। মৃত্তিকা পিছু আসতে নিলেই তিনি বলেন,
— এক পা যেনো কম্বলের নীচে না আসে।
মৃত্তিকা আর নড়ে না। ওর মা রুমের বাইরে আসতে ওর বাবা জানায়,
— পূর্ণ’র উপর ছোট্ট একটা হামলা হয়েছে।
— আমার ছেলে…
— আহা। চুপ। মেয়েটা শুনলে কাঁদবে। ঠিক আছে এখন। ততটাও লাগে নি। বেয়াই বাঁচিয়ে নিয়েছে। আল্লাহর রহমতে ঠিক আছে এখন।
— কোথায় তোমরা?
— হসপিটালে। বের হব ভোর ছয়টা নাগাদ৷ তুমি চিন্তা করো না পাখি। মেয়েটাকে দেখো।
কল কেটে দেন তিনি। একপলক তাকান তার তাগড়া বাঘের দিকে। কতটা স্ট্রং হলে এখনও সে চোখ মুখে রাগ নিয়ে হেলান দিয়ে থাকে? তার কি উচিত না এমন ছেলের বাপ হয়ে আজ গর্ব করা?

কেন্দ্রে তখন ভোট চলছে। পূর্ণ ও বসে নেই। এদিক ওদিক তদারকি করে যাচ্ছে। মন্ত্রী শাজাহান খান নিজে তাকে কল করে খোঁজ নিয়েছেন। সাফারাত প্রথম প্রথম ভেবেছিলো প্রতিবারের ন্যায় এবারেও হয়তো পূর্ণ নিজেকে নিজে আঘাত করে ক্ষমতা ছিনাতে চেয়েছে কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হয় এর কি আদৌ দরকার আছে? পূর্ণ’র জনগন আছে আর শোয়েব মির্জা’র আছে পাওয়ার। শোয়েব মির্জা’র রাগী চেহারা দেখেই এক নিমিষেই সাফারাত বুঝে যায় পূর্ণ’র উপর হামলা আর কেউ না বরং তিনি ই করিয়েছেন। পূর্ণ’কে দেখে বুঝার জোঁ নেই কতটা আহত সে। শক্ত মানবটাকে কেউ হটাতে পারে নি। নিজ উদ্দ্যমে সে সবটা সামাল দিচ্ছে। মৃন্ময় হাওলাদারকে এই মুহূর্তে এতটা কাছে পেয়ে পূর্ণ’র বেশ আসান হয়। ওর বাবা আবার এতসব বুঝে না কিন্তু ছেলের সাথে কেন্দ্রেই আছেন। সকাল সকাল পূর্ণ’র নির্দেশ অনুযায়ী ওর মা আর মৃত্তিকা পাশের কেন্দ্রে ভোট দিয়ে আসে। মৃত্তিকা’র আফসোস হলো, ইশ যদি হাত পা মিলিয়ে টোটাল বিশটা আঙুল দিয়ে ভোট দেয়া যেত কতই না ভালো হতো। কথাটা ভাবতে ভাবতে নিজ পরিবারের লোকজনের আঙুল গগনা করে নিলো সে। টোটাল একশত বিশটা ভোট তো মৃত্তিকা আর পূর্ণ’র ঘরের লোক মিলেই দিতে পারত। অযাচিত চিন্তা বাদ দিয়ে ও যেন শান্তি নেই। একদমই নেই। মৃত্তিকা’র এখন মন চাইছে আশে পাশে সবাই কে বলতে, ভাই আমার জামাই’কে একটা ভোট দিন।

পূর্ণ’র মা ভোট দিয়েই এক প্রকার তারাহুরো করে মৃত্তিকা’কে নিয়ে চলে গেল। গাড়িতে উঠেই মৃত্তিকা একে একে বাবা, মিঠি’র মা এমনকি ড্রাইভারকেও কল দিয়ে বললো যাতে পূর্ণ’কে ভোট দিয়ে আসে। পূর্ণ’র মা অপলক ওর দিকে তাকিয়ে আছে। উজ্জ্বলকে কল দিতেই ও কলটা খট করে কেটে ভিডিও কল দিলো। শুরুতেই চোখের পর্দায় ভেসে উঠলো কালো দাগ দেয়া দুটো নখ। উজ্জ্বল আর হিমু ভোট দিয়ে এসেছে। পাশেই গ্রুপে জয়েন করলো সোহানা। কাঁদো কাঁদো গলায় জানালো,
— দোস্ত আমি ভোট দিতে পারলাম না।
মৃত্তিকা যেন নড়েচড়ে উঠলো,
— কেন? কি সমস্যা? গাড়ি পাঠাব?
— না। ওখানে নাকি গেঞ্জাম হয়। তাই বাসা থেকে বের হওয়া নিষেধ।
— এটা কেমন কথা? তুই এখনই আসবি। ভোট দিতেই হবে। যদি একটা টান পড়ে?এখনই গাড়ি পাঠাচ্ছি দাঁড়া।
পাশ থেকেই হিমু বলে উঠলো,
— থাম যা মৃত্তি। আমি আর উজ্জ্বল কেন্দ্রেই আছি। একজন গিয়ে মগাটাকে তুলে এনে ভোট দিয়েই আনি।
কল কাটা হলো। শান্ত সব অথচ অশান্ত মৃত্তিকা। তার যে একটুও শান্তি লাগছে না। অশান্ত মনটা বারবার বলছে,”এই আমিটা ভালো থাকার জন্য আপনি ভালো থাকুন পূর্ণ তাহলেই হলো”।

“বিপুল ভোটে এই বার এমপি পদে আসন্ন হয়েছেন রওনাফ ওয়াহাজ পূর্ণ।”
হ্যাঁ টিভির পর্দায় এই শিরোনামটাই দেখা যাচ্ছে। একে একে ব্যাস্ত আঙুল চালিয়ে চ্যানেল পাল্টায় মৃত্তিকা। সব জায়গায় একই খবর। খুশিতে হঠাৎ শ্যামা কন্যাটা কেঁদে ফেললো। পাশ থেকে একজন গর্বিত মা জড়িয়ে ধরে ওকে। মৃত্তিকা তার কাঁধে মাথা রাখে। খুশি হলেও তার ভেতর ছটফট করে যাচ্ছে। পূর্ণ’টার বুকে ঢুকতে পারলে হয়তো উল্লাসটা আরেকটু বৃদ্ধি পেত। টিভির পর্দায় তখন দলের মধ্যে থেকে দেখা যাচ্ছে পূর্ণ’কে। মাথা উঁচু করে ঠাই দাঁড়িয়ে সদ্য হওয়া এমপি মহাশয়। তাকে ডাকা হলো জনসমাগমে ভাষন দিতে। পূর্ণ আস্তে ধীরে হেটে এলো মাইকের সামনে। শুরুতেই সালাম জানিয়ে বলা গা ঝাড়া দিয়ে গম্ভীর অথচ বলিষ্ঠ গলায় বলা শুরু করলো,

–” আমার উপর আপনারা ভরসা করে যেই পদটায় আজ আমাকে দাঁড় করালেন সেই পদটার মর্যাদা এবং আপনাদের বিশ্বাস ধরে রাখার আমৃত্যু চেষ্টা করে যাবে।”
জনগন হৈ হুল্লোড় করে উঠলো। কড়া তালির শব্দ শুনা গেলো। এমন একটা ভাষন শুনা যায় না আজ কাল। কেউ জনগনকে স্মরণে রাখে না। সবাই এই তাগড়া যুবকের কন্ঠে সন্তুষ্ট। পূর্ণ পুণরায় বলা শুরু করলো,
–” আজ রাত সাড়ে তিনটা নাগাদ আমার উপর হামলা হয়। পেছন থেকে কাপুরুষের মতো গুলি ছুঁড়া হয়েছিলো যা আল্লাহর রহমতে আমার অতি নিকট একজন মানুষের দায় আমাকে ততটা ক্ষতি করতে পারি নি। তবে আমি আহত। আমার কাঁধ ছুঁয়ে গিয়েছে সেটা আর বাহুতে লেগেছে যে আমাকে বাঁচালো। এর দোষীর শাস্তি ও আমি জনসম্মুখে দিব। কাপুরুষের ন্যায় সে হয়তো আমাকে পেছন থেকে আক্রমণ করেছে তবে তার শাস্তি আমি লুকিয়ে না বরং আইনের সাহায্য সকলের সামনে দিব।”

অতঃপর সালাম জানিয়ে স্টেজ ত্যাগ করে পূর্ণ। জনগন প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কেউ কেউ গালি ছুঁড়ছেন কে আক্রমণটা করলো। শাজাহান খান ততক্ষণে পুলিশ অফিসারদের ঠাঁটের উপর রেখেছেন। তদন্ত চলছে।
এদিকে মৃত্তিকা’কে আটকে রাখা যাচ্ছে না। পূর্ণ’র মা একা ধরে রাখতেও পারলো না। মেয়েটা দেখলো ছেলেটা ততটা আহত নয় তবে গুলি লেগেছে এটা শুনেই সে পাগলপ্রায়। ওর মা কোনমতে ড্রাইভার ডেকে গাড়ি নিয়ে বের হলেন। পথিমধ্যে স্বামী’কে কল দিয়ে জানলেন পূর্ণ’কে ড্রেসিং করতে তারা আবার হসপিটালে গিয়েছেন। গাড়িটা হসপিটালের উদ্দ্যেশেই বের হলো।

পৌঁছাতেই মৃত্তিকা দৌড়ে বের হলো। রিসিপশনের সামনেই পূর্ণ’র বাবা দাঁড়িয়ে। পাগলের মতো মেয়েটাকে ছুটে আসতে দেখেই নিজে আগলে নিলেন। হাপড়ের ন্যায় কাপা কন্ঠনালী ভেদ করে আর মৃত্তিকা’র শব্দ বের হলো না। উনার বলার অবশ্য প্রয়োজন ও পড়লো না। উনি ধরে ওকে পূর্ণ’র ড্রেসিং করা কেবিনে নিয়ে এলেন। মাত্র ই ড্রেসিং শেষ হওয়াতে গায়ে পাঞ্জাবি জড়ানোর সময় পেলো না পূর্ণ। দমকা হাওয়ার ন্যায় একটা শীতল স্পর্শ তাকে ছুঁয়ে গেলো যখনই দেখলো শুধু মাত্র তার জন্য কেউ এমন পাগল হয়ে ছুটে এসেছে। পূর্ণ’র কাঁধে সাদা ব্যান্ডেজটা দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠে মৃত্তিকা। ওর এহেন কান্না আজ পর্যন্ত হয়তো পূর্ণ দেখেনি। পূর্ণ তো দূর মৃন্ময় হাওলাদার নিজেই হয়তো বড় হওয়ার পর মেয়ের এমন কান্না দেখেন নি। রেখেছেন যাকে বুকে ভরে তার এরুপ কান্না আসবেই বা কোথা থেকে?

পূর্ণ আশ্চর্য হয়ে শুধু তাকিয়েই রইলো। হঠাৎ খেয়াল হলো ওর বুকের বা পাশটায় ছুড়িঘাতের ন্যায় ব্যাথা হচ্ছে। কেন কাঁদে তার পূর্ণ্যময়ী এভাবে? পূর্ণ’র জন্য? এই এতটুকু আঘাতের জন্য একজন তার জন্য এভাবে কাঁদে?
মৃত্তিকা’র কান্না শুনে পাশের কেবিন থেকে মৃন্ময় হাওলাদার বেরিয়ে এলেন। পূর্ণ থেকে গুরুতর অবস্থা তার। আঘাত হওয়ার সময় তিনিই পূর্ণ’কে টেনে সরাতে যান যার দরুন বু*লে*টটা পূর্ণ’র কাঁধ ঘেঁষে লাগে একদম তার বাহুতে লাগে। জখম ততটা না আবার কমও না।
দূর্বল শরীরে ই মেয়ের এইরুপ কান্না শুনে টিকতে পারেননি। এসেই যেই না উনি মৃত্তিকা ধরেন ওমনিই ও খেয়াল করলো বাবা’র হাতে ব্যান্ডেজ। অশান্ত ভাবে বাবা’র দিকে তাকিয়ে রইলো কিয়ংকাল। কান্না থেমেছে। অস্পষ্ট স্বরে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস ডাকলো,

— বাবা।
— হ্যাঁ আব্বু। কাঁদে না। পূর্ণ ঠিক হয়ে যাবে।
— হাতে? তোমার…
লুকাতে চান মৃন্ময় হাওলাদার। অল্প হেসে বলেন,
— কিছু না আম্মা। একটু লেগেছে…
আর বলা হয় না। ঢলে পড়ে মৃত্তিকা বাবা’র বুকে। অস্থির হয়ে উঠেন তিনি। ভালো হাতটা দিয়ে বুকে চেপে ধরেন মেয়েকে। ছটফট করা তার হৃদয় অথচ নিজেকে বাইরে রেখেছেন শান্ত। এদিকে ততক্ষণে বেড থেকে পূর্ণ নামে। অস্থির হয়ে ডাকে,

— মৃত্ত? মৃত্ত!!
সাড়া আসে না। পূর্ণ’র বেডেই ওকে শুয়ানো হলো। ডক্টর চেক করে জানায়, অতিরিক্ত চিন্তায় বা শক পেয়ে এমনটা হয়েছে। মৃন্ময় হাওলাদার বা পূর্ণ কারোই বুঝতে বাকি নেই কি হয়েছে। বাবা’কে দেখেই মেয়েটা সহ্য করতে পারে নি। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। জ্ঞান ফিরতে প্রায় মিনিট বিশ এক সময় লাগাতে পূর্ণ যেন পাগল হয়ে উঠে। এত সময় কেন লাগবে ওর মৃত্ত’র জাগতে? মৃন্ময় হাওলাদার মেয়েকে এক হাতে বুকে চেপে ধরে বসে আছে। মেয়েটা তো তার এতটুকু কষ্ট ই সহ্য করতে পারে না যখন ভয়াবহ সেই সত্যিটা জানবে তখন কি হবে? কিভাবে সামাল দিবে মৃন্ময় হাওলাদার?

রাস্তায় যেমন মাঝেমধ্যে পাগল কুকুর দেখা মিলে আজ ঠিক তেমনই দেখাচ্ছে শোয়েব মির্জা’কে। কাকে কামড়ে উঠে বলা মুশকিল। এই প্রথম তার সকল চাল বৃথা গেলো। মাহিন মিয়া চুপচাপ তার স্যার’কে দেখে যাচ্ছে। তার বাবা ছিলেন শোয়েব মির্জা’র বাবা’র সেবায়, তিনি আছেন শোয়েব মির্জা’র। মিয়া বাড়ীর সকলেই মির্জা বাড়ীর লোক হিসেবে খেটে গিয়েছে। শোয়েব মির্জা’র বউ থাকতে এই মির্জা বাড়ী ছিলো রমরমা। বেশ হাসিখুশি একজন নেতার বউ এক সুঠাম পুরুষের মা ছিলেন তিনি। এই পুরোটা সংসার একহাতে সামলেছেন। শোয়েব মির্জা’র মা মারা যান তার বিয়ের বছর গড়াতেই। কে সামলালো এউ সংসার? সাফারাতের মা ই তো। নারীটা ছেলের শোক মানতে না পেরে দুনিয়া ত্যাগ করেছিলেন। প্রায় বছর খানিক সদর দরজাটা ধরে বসে ছিলেন কবে আসবে তার রাত। সেই অপেক্ষা তার ফুড়ালো কবরে গিয়ে। বেঁচে থাকতে আর নিজের সোনার টুকরো ছেলেকে দেখা হয় নি তার। যখন মারা যান সেদিন শোয়েব মির্জা কেঁদেছিলেন। একাকৃত্ব কাকে বলে তা টের পেয়েছিলেন। চেয়েও তখন সাফারাত’কে মায়ের কাছে আনা যায় নি। সম্ভব ই হয় নি। কিভাবে হবে? একজন মানুষিক রুগী কি বুঝে তার সবচেয়ে কাছের মানুষটা, তার মা যে ঐ দিন রাতে দুনিয়া ত্যাগ করেছিলো তারই অপেক্ষায়।

দোতলা থেকে হাসি হাসি মুখে বাবা’র পাগলামি দেখে সাফারাত। এখানেই শেষ নয় বরং খেলা মাত্র শুরু। কিভাবে রাগ ঝাড়ছে। এই বুঝি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেই ফেলেন। সন্তান হিসেবে মায়া হয় না সাফারাতের। একটুও না। বরং পৌচাশিক আনন্দ আজ তার অন্দরমহলে। একটা বার যদি তার বার্ড’কে ব্যাপারটা জানানো যেত। কতই না খুশি হতো তার রুহা। হ্যাঁ, হতোই তো। সাফারাত হঠাৎ ভাবনায় ডুবে,

~ বাবা তাকে ডাকিয়ে দেশে আনার পরপরই সাফারাতের ফোনটা সবার আগে কেঁড়ে নেয়া হয়। জানানো হয় শাজাহান খান এর বড় মেয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক। যেই সেই ঠিক না একদম মুখে মুখে ডেট ও ফিক্সড। সাফারাত ছুট লাগায় মায়ের কাছে। জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে ছেলেটা। মা ভরসা দেন কথা বলবে বাবা’র সাথে। শোয়েব মির্জা’কে হাজার বলে কয়েও লাভ হলো না। ক্ষমতার নেশায় বুদ তখন তার মন মস্তিষ্ক। সেই মন ভালোবাসা চিনে না। বুঝে না বিয়ের মতো পবিত্র বন্ধন। শেষ উপায় হয় না কিছুই। সাফারাত খাওয়া ত্যাগ করে। শরীর যখন তার অসুস্থ সারাদিন তখন ঘড়ের মেঝেতে তার স্থান। ছেলের এহেন অবস্থান ওর মা সহ্য করতে পারে নি। স্বামী’র পায়ে পরে যান। হাজার হোক শোয়েব মির্জা ভালোবাসেন তার স্ত্রী’কে। এই স্ত্রী, সন্তান দুইজন মানুষ একান্ত তার। মন মানলেও মানে না তার মস্তিষ্ক। সেদিন যখন সাফারাতের র*ক্ত বমি হলো তখন ওর মা নিজের কসম দিয়ে ওর চিকিৎসা করান। কিছুটা খাওয়ান। লাভ হয় না। সাফারাত কেঁদে কেঁদে মায়ের বুকে অভিযোগ জানায়,

— আম্মু আমাকে রুহা এনে দাও। ও আমার স্ত্রী আম্মু। বিয়ে করে ফেলেছি আমি। আমার কলিজাটা জ্বলছে আম্মু। ওর ভেতর আমার জানটা আছে। ওকে এনে দাও। আমাকে যেতে দাও। ও নিশ্চিত এতদিন না পেয়ে কাঁদছে। ও পারবে না আমাকে ছাড়া থাকতে।
ছেলের ব্যাথায় ওর মা দিশেহারা। কিন্তু এদিকে তার স্বামী ও নাছোরবান্দা। সাফারাত’কে আগলে নিয়ে শুধু বলেন,

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩৫+৩৬

— পালাতে পারবি রাত?
— আগামী কাল বিয়ে আম্মু। আব্বু’র লোক চারদিকে।
— আমি ব্যাবস্থা করব। তুই পালাবি শুধু। পারবি না?
— পারব।
ওর মায়ের বুক তখন ভয়ে কুঁকড়ে। না জানি কোন বিধ্বংস রচনার রাত ছিলো সেটা।

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩৯+৪০