শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩৫+৩৬
সাইয়্যারা খান
নির্বাচন অতি নিকট। শোয়েব মির্জা যথাযথ চেষ্টা চালালেও লাভের লাভ কিছুই হলো না। জনগণ সহ বড় বড় নেতারা পূর্ণ’র উপর। শোয়েব মির্জা যোগাযোগ বৃদ্ধি করলেন। টাকা ঢাললেন। সবকিছু যখন বিফলে যাচ্ছে তখন তার মস্তিষ্ক চিড়বিড় করে উঠলো। ভেবেছিলেন সাফারাত হয় তো তার ডানহাত হবে কিন্তু লাভ হচ্ছে না এতেও। সেই ঘুরে ফিরে একই কাঠগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। দিকবিদিকশুন্য মানুষ যা করে তিনিও তাই করলেন। ফোন করে বেফাঁস যা পারলেন পূর্ণ’কে বললেন। অবাক করা বিষয় পূর্ণ চুপ ছিলো। কিছু বলে নি। শোয়েব মির্জা রাগ ঝেড়ে ধপ করে বসে পরেন। আজ বাদে পরসু নির্বাচন। অথচ চোখে তিনি অন্ধকার ব্যাতিত কিছুই দেখতে পারছেন না।
মৃত্তিকা পূর্ণ’র বুক থেকে মুখটা তুলে প্রশ্ন করলো,
— কে কল করেছিলো?
পূর্ণ হাত চালালো মৃত্তিকা’র ভেজা চুলের ভাজে। কপালে চুমু খেয়ে ঠান্ডা গলায় বললো,
— শোয়েব মির্জা।
— আল্লাহ! ঐ এমপি না?
— হু।
— আপনি চিনেন তাকে?
চোখে হাসে পূর্ণ। নাদান মৃত্ত তার। কত কত মন্ত্রী’র সাথে পূর্ণ উঠা বসা করেছে অথচ তার ভোলাভালা বউটা এই অল্প শুনেই আশ্চর্য হলো। পূর্ণ আদুরে হাত বুলালো মৃত্তিকা’র গালে। কপালে। শিউড়ে উঠে মৃত্তিকা। পূর্ণ তাকে নিয়েই উঠে বসলো। মৃত্তিকা দেনামনা করে বললো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
— উঠলেন যে?
— কেন আরো আদর চাই?
— চুপ থাকুন। খারাপ লোক।
— হাহ। বউয়ের কাছে অবশ্যই কেউ সাধু থাকে না মৃত্ত। এমনকি সাধুরা ও না৷
— ঘুমাব আমি।
–আপাতত সেটা সম্ভব না।
— কেন?
উত্তর করে না পূর্ণ। উঠে দাঁড়িয়ে একটা পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে ভেজা চুল গুলো বেঁধে দেয় মৃত্তিকা’র। নিজে একটা জ্যাকেট পড়ে মৃত্তিকা’কে একটা শাল পেঁচিয়ে কান টুপি পড়ালো৷ তার উপর একটা ওভার কোর্ট। মাথায় একটা উড়না পেঁচিয়ে দিয়ে বললো,
— একদম। আমার বউ লাগছে। চলুন।
বলেই হাতটা মুঠোয় নিলো। মৃত্তিকা গোঁ ধরে বললো,
— না বললে চলব না। কোথায় যাচ্ছি? রাত ২ টা বাজে তো।
— প্রেম করতে।
মৃত্তিকা থমকে যায়। পূর্ণ তাকে ধরে ধরে নিয়ে বাইরে আসে। মৃত্তটা তার নাজুক৷ তাকে সেঁতে সেঁতে রাখতে হয়। আদরের পরবর্তী সময়টা দূর্বল থাকে কিছুটা। তাই তো এখন এমন ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
বাইকে পূর্ণ’কে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে মৃত্তিকা। ভালোই হয়েছে চুলে ক্লিপ’টা মারায় না হলে এতক্ষণে নাকে মুখে চলে যেত।
সড়কটা খোলা। মাঝে মধ্যে শাঁ শাঁ করে দুই একটা গাড়ি যাচ্ছে। বাইকই বেশি। টুংটাং শব্দ করে রিক্সা চলছে তবে তুলনা মূলক কম। কেই বা প্রয়োজন ছাড়া এই সময় বউ নিয়ে প্রেম করতে বের হবে?
একটা জোড়া ব্রিজের ঠিক মাঝখানে এসে থামলো পূর্ণ। রাতের আলোয় ঝলমল করছে ব্রিজের নীচের পানিগুলো। ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। এই দিকটাতে লাইটিং করা তাই হয়তো সৌন্দর্য বেড়েছে বহুগুণ। অবাক নয়নে সবটা অবলোকন করে মৃত্তিকা। ঠান্ডা বাতাসে যখন তার মাথার ওরণা টা পড়ে গেলো পূর্ণ সুন্দর করে তা আবারও মাথায় টেনে নিলো। পেছন থেকে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ দিয়ে বললো,
— বলেছিলাম না বিয়ের পর প্রেম করব। সেই ওয়াদাগুলো এখন থেকেই পূরণ করে যাব মৃত্ত।
— আমার কেমন জেনো লাগছে পূর্ণ।
— ঠিক কেমন?
— এলোমেলো সবটা। এত সুখ কোথায় রাখব আমি?
— আপনার বুকে রেখে দিন আমাকে মৃত্ত। সেখানেই আমার সমাধি দিবেন।
রাগ হয় মৃত্তিকা’র। এগুলো প্রেমের কথা? সরে যেতে নিলেই পূর্ণ আটকালো৷ গভীর চাহনি দিয়ে ঘায়েল করলো মৃত্তিকা’কে। দু’জনের ঠান্ডা র*ক্তহীন ওষ্ঠাধর মিলিত হলো অতি শিঘ্রই।
এই ঠান্ডার মাঝে মাঝ ব্রিজে তাদের এহেন আলিঙ্গনের সাক্ষী রইলো রাতের কুয়াশা সাথে ঝিলের রঙহীন পানি।
ফোনে নারী কন্ঠে এই নিশুতি রাতে মগ্ন সাফারাত। এত ঠান্ডার মাঝেও সে ফ্লোরে খালি গায়ে শুয়ে আছে। অপর পাশ থেকে কিছু বলা হলো। সাফারাত হাসলো তবে শব্দহীন। ফিচেল গলায় বললো,
— কিভাবে চিনো এতটা আমায়?
অপরপাশ থেকে পুণরায় কথা বললো। সাফারাত কথা বাড়ালো না। তবে নারীটিও দমলো না। না পেরে ফ্লোর থেকে বিছানায় শায়িত করলো তার বড়সড় দেহটাকে। ফোনের স্ক্রিনে চুমু খেয়ে বললো,
— এবার ঘুমাই তাহলে?
হয়তো সম্মতি এলো তাই কলটা কেটে তা পাশে ছুঁড়লো সাফারাত। চক্ষু মুদন করে ঘুমাতে চাইলো।খোলা জানালা দিয়ে শীতের বাতাস ফুড়ফুড় করে ভেতরে এলো। সেদিকে হুস নেই সাফারাতের। সে মেতে আছে মিষ্ট জগৎ এ। এই জগৎ এ তার, একান্ত তার সঙ্গী মাশরুহা।
~ বাবা’কে বরাবর সমীহ করে চলে সাফারাত। এই যে কানাডার মাটিতে পরে আছে সে। মোটেও ইচ্ছা ছিলো না মা’কে ছেড়ে এখানে আসার। বাবা রাজনৈতিক নেতা। শত্রুর অভাব নেই। না চাইতেও মা পাগল ছেলেটা পারি জমায় এই ভিন দেশে। তবে পিছিয়ে যায় পড়াশোনায়। ইয়ার গ্যাপ পড়ে কয়েকটা। বড়লোক বাপের নিকট তা নিছক ব্যাপার। যদিও তিনি চাইতেন পড়াশোনা শেষে ছেলেকে রাজনৈতিক দায়িত্ব দিবেন তবে তার খেলাপ ছিলো সাফারাতের মা। কোন ভাবেই ছেলেকে এ পথগামি হতে দিতে নারাজ তিনি। সাফারাতের ও ততটা ঘনিষ্ঠতা ছিলো না রাজনীতি’র সাথে। মা ছেড়ে এই ভিনদেশে তার সঙ্গী হয় পূর্ণ। একই কলেজের তাদের পড়াশোনা। তবে দূর্ত পূর্ণ ঐ দেশেই রাজনীতি নিয়ে বেশ চর্চা করতো। বিভিন্ন ছোট খাট কাজে তাকে দেখা যেত। বড়দের সাথে সাথে থাকা চলা তার নিকট স্বাভাবিক ই বটে। সাফারাত তার সিনিয়র হলেও একসময় বন্ধুত্বটা এতটাই গাঢ় হলো যে ব্যাপারটা দুদভাতে পরিণত হলো। পূর্ণ’র বাসায় যাতায়াত বাড়লো। সাফারাত থাকত হোস্টেলে সেখান থেকে পূর্ণ’র বাবা-মা এর জোড় করাতে সিফ্ট হলো তার বাসায় পেন গেস্ট হিসেবে। এতসব বাংলাদেশে কেউ জানত না। মাশরুহা’র সাথে সম্পর্ক টাও তখনই গড়ায়। হতে হতে বছর গড়ায়। রঙ পাকা হয়। বাসায় পূর্ণ’র বাবা-মা ও ব্যাপারটা জানতে পারে। তবে পুরোটাই আন্দজ। মাশরুহা হলো বাচ্চা বাচ্চা আচরণ করার মেয়ে। এক মেয়ে হলে যতটা জেদী হয় ঠিক ততটা। সেই জেদী মেয়েটাকে শুধু মাত্র হটাতে পারত সাফারাত। মাশরুহা’র রাত।প্রণয়ের প্রায় বছর দুই-এক পর তাদের লুকিয়ে বিয়েটা হয়। ততদিনে প্রায় রমরমা প্রেম তাদের।
তাদের লুকিয়ে বিয়ের খবরটা বাসায় কেউ ই জানত না। হয়তো সম্পূর্ণ নতুন ভাবে বিয়ের আগে কখনো কেউ জানতো ও না যদিও না একটা কালোরাত তাদের দাঁড়গোড়ায় এসে হানা দিতো।
বিয়ে হয়েছে প্রায় তখন ছয়মাস চলে গিয়েছে। তাদের চলাচলটা ঠিক আগের মতোই যেন কিছুই হয় নি কিন্তু মাশরুহা’র সৌন্দর্যে রোজ করে হারাতো সাফারাত। না চাইতেও আগের ভালোবাসাটা শুধু আসত না বরং তা সময়ের সাথে বৃদ্ধি পেয়েছিলো। এই যে আগে যেখানে একদম ই কদাচিৎ মাশরুহা’র ঠোঁটে চুমুটা খাওয়া হতো তা এখন হয় না বরং প্রায় সময়ই এটা হয়ে উঠে। সাফারাত যেন পাগল পাগল হয়ে যায়। মজা লুটে মাশরুহা। সাফারাতকে হেনস্তা করে সে বড্ড মজা লুটতো।
রোজকার ন্যায় সেদিন ও রাত নামলো। আঁধারে ঘনঘটা তখন কানাডার শহর। পূর্ণ বাবা-মা সমেত গিয়েছিলো কোন এক ফাংশনে। মাশরুহা যায় নি। তার শরীর ভালো না। মেয়েটার অল্প সল্প জ্বর। পাশের বাড়ীর প্রতিবেশী প্লাস পূর্ণ’র বাবা’র কলিগ না হলে বোধহয় মেয়েকে রেখে তারা যেতেন ও না।
তবুও সাফারাত থাকায় সস্তি।
ডিনার শেষে সারারাতের কল আসে। মা কল দিয়েছে। রিসিভ করে ভিডিও কলে কথা হয়। মাশরুহা’কে ওর মা চিনে। সাফারাত দেখিয়েছে। মায়ের অনেক ক্লোজ কি না। মাশরুহা যাওয়ার পরও প্রায় ঘন্টা খানিক মায়ের সাথে কথা বলে সাফারাত। কল রেখে একবার খোঁজ নিতে যায় মাশরুহা’র। না জানি জ্বর বাড়লো কি না। সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বারদুয়েক ডাক দিলো সাফারাত,
— রুহা? জান? একা রুমে চলে এলে?
জবাব এলো না। সাফারাত দরজা ধাক্কা দিয়ে আনমনে বলতে থাকে,
— বার্ড কতবার ডাকছি….
বাকিকথাগুলো গিলে নেয় সাফারাত। স্লিভলেস একটা ব্লাউজের সাথে শাড়ী পড়ে আছে মাশরুহা। সাজ বলতে গাঢ় লিপস্টিক। পাগল করা ব্রাউন, কালো চুলগুলো ছড়িয়ে রাখা। সাফারাতের দম বন্ধ হয়। এমনিতেই ইদানীং বিয়ের পর থেকে মাশরুহা’র প্রতি ভিন্ন টান আসে। হালাল একটা ভাইব আসে। কাছে টানতে মন চায়। কিন্তু এই রুপ দেখে সামলাবে কিভাবে। ওর ধৈর্যের যেন ভয়ংকর পরিক্ষা হলো সেদিন। মাশরুহা আবেদনময়ী রুপে তাকে নিকটে ডাকলো। দিকভ্রান্ত সাফারাত এগিয়ে যায়। যথাযথ ধুকপুকানি তার বুকে। বহু কষ্টে আওড়ায়,
— রুহা.. কলিজা! আমার জান এটা ঠিক হচ্ছে না। বার্ড না আমার। ট্রাই টু…
বলতে দেয় নি সাফারাতকে। নিজের ওষ্ঠের সাহায্যে আটকে দেয়। কিছুক্ষণ তাদের গভীর থেকেও গভীর ভালোবাসা আদান প্রদান হতেই হুসে ফিরে সাফারাত। ছিটকে সরে যেতেই মাশরুহা আটকায়। ছলছল তার চোখ জোড়া। সাফারাত জাপ্টে তাকে বুকে চেপে ধরে মিনতির সুরে বলে,
— বার্ড, ডোন্ট ডু দিস। আই কান্ট কনট্রোল।
— ডোন্ট নিড।
— ইউ উইল রিগর্রেট জান।
— আই উইল নট রাত।
মোহনীয় স্বর সাথে একাকীত্ব। সবচেয়ে বড় তকমা হালাল। এসবেও যখন সাফারাত নিজেকে গুটাতে ব্যার্থ তখনই ওর সবচেয়ে দূর্বল জায়গায় আঘাত হানলো রুহা,
— তোমার বাবা মানবে না তাই না? নিশ্চিত বাংলাদেশে কেউ আছে রাত? আমার সাথে চিট করছো? টাইম পাস করছো তাই না।
ব্যাস সাফারাত এই কথাটাই শুনতে পারে না। বাইরে তখন তুষাড় ঝর উঠেছে।পূর্ণ’র পরিবার আটকা পড়ে তাতে। এদিকে বেসামাল সাফারাত মাশরুহা’কে বেসামাল করে তুললো। পাগলের ন্যায় মেতে উঠলো ওষ্ঠাধরে। গাঢ় রঙের লিপস্টিকটা ছড়িয়ে গেলো চারদিকে। আঁচল গড়িয়ে ফ্লোরে ছুঁয়ে দিলো। এই ঠান্ডা বৈরী আবহাওয়ায় দুইজন হলো দু’জনের উষ্ণতার চাদর। মাখামাখি হলো দুটি দেহ। হুষ্ঠপুষ্ঠ সাফারাতের বক্ষতলে পেষণ হলো মাশরুহা’র নারী দেহ। বাইরে ঝড় থামলো না তবে একটা সময় থামলো দুই জনের উন্মাদনা। দুই বাহুতে মাশরুহাকে বেঁধে নিয়ে কপালে, সারামুখে চুমু খেল সাফারাত। নিভু নিভু চোখে মাশরুহা তখন তাকে দেখে হাসছে। জড়ানো, ব্যাথিত গলায় শুধায়,
— রাত পেইন হচ্ছে।
ঝট করে চোখ মেলে সাফারাত। এই ঠান্ডায় ঘামছে সে। এমন স্বপ্ন নতুন নয়। প্রায় সময়ই আসে। যখনই আসে তখন নিজেকে পাগল পাগল লাগে সাফারাতের। ঘড়িতে ভোর চারটা। আচমকা বাতাসে শরীর শীতলতায় ছেঁয়ে গেলো তার। তার কলিজা টা নেই তার পাশে। অতীত গুলো স্বপ্নে আসে তার। একদম বাস্তব। যা ঘটেছিলো সবটা আসে। আসে না শুধু তার রুহা। দুই হাতে চুল খাঁমচে ধরলো সাফারাত। ফোনটা হাতে নিয়ে কল দিলো পূর্ণ’কে।
ভার্সিটিতে আপাতত উইনটার ভ্যাকেশন চলছে। ক্লাস নেই কারো। শুধু ফ্যাকাল্টি ম্যামবার’রা তাদের কাজ গোছাতে আসেন। উজ্জ্বল,হিমু আর সোহানা’র সাথে মৃত্তিকা’র দেখা হচ্ছে না অনেকদিন। পূর্ণ’কে এখন নাগাল পাওয়া দুষ্কর। ঐ যে সেদিন রাতে তাকে নিয়ে প্রেম রচনা করলো এরপর ভোর রাতে বাসায় ফিরে আরেকদফা তাকে ঘায়েল করলো। এরপর আর পাত্তা নেই তার৷ ভোরে বের হয় আসে গভীর রাতে। সরাসরি দেখা মিলে না আজ পাক্কা তিন দিন। কোথায়, কিকরে তা ও জানে না। রোজ একবার তার গলার স্বরটা শুনা যায় তাও ফোনে। মিনিট ও গড়ায় না। তার কথা শেষ। যদিও মৃত্তিকা বাবা’র কাছে থাকতে চেয়েছিলো কিন্তু তা সম্ভব নয়। পূর্ণ অনুমতি দেয় নি। রাতে বউ তাকে না দেখুক সে তো দেখে। এতেই তার ক্লান্তি দূর হয়। রোজ করে শশুরের সাথে বাবা’র কাছে যাওয়া হয় তার। আজকে বাবা’র সাথে ব্রেকফাস্ট করে বের হয়েছে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে। বার্তমান অবস্থান তার রিক্সায়। আনমনে এদিক ওদিক তাকায় মৃত্তিকা। রাস্তায় মানুষ জন শীতের চাদর মুড়িয়ে আছে। ঢাকা শহরটা যেন ঠান্ডা। অথচ গরমের দিনে টিকা দায়।
মিনিট দশ এক গড়াতেই রিক্সা থামলো। ভারা মিটাতে নিলেই বৃদ্ধ লোকটা হাসলেন। পান খাওয়া দাঁত বের করে বললেন,
— লাগবে না আম্মা। পূর্ণ বাবা দিয়েছে।
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মৃত্তিকা। পূর্ণ কি এখন তার পেছন জাসুস লাগালো? আচাণক উজ্জ্বলের গলায় ভরকে যায় মৃত্তিকা। নজর পরে হাসোজ্জল বন্ধুদের দিকে। পথ ধরে এগিয়ে গেলো ওদের সাথে। দুপুর তখনও হয়নি। উজ্জ্বল হিমু’র লেগ পুল করতে বললো,
— কিরে শালা আজকে সোনা রুপা তোকে ছাড়লো?
লজ্জা পাওয়ার মতো হাসলো হিমু। সোহানা ও দাঁত কেলিয়ে হেসে বললো,
— আহাম আহাম পূর্ণ ভাই যদি মৃত্তিকা’কে ছাড়তে পারে সেখনে রুপালি আপু আর কোন ক্ষেতের মুলা?
সোহানার কথায় মৃত্তিকা’র ভ্রু কুচকে আসে। অল্প সল্প রাগ নিয়ে বলে,
— বাজে বলা বন্ধ রাখ। তোর পূর্ণ ভাই লাপাত্তা আজ তিন দিন।
উজ্জ্বল সান্ত্বনা দিয়ে আফসোস করে বললো,
— আহারে বান্ধবী আমার স্বামী ছাড়া কষ্টে আছে। থাক বইন কান্দে না।
মৃত্তিকা রাগ দেখিয়ে সামনে হাটা দিলো ওদের রেখেই। হিমু পেছনে দৌড়ে এসে বললো,
— আরে শুন দাঁড়া। মৃত্তিকা!
মৃত্তিকা শুনে না। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ট্রাক একদম কাছ ঘেঁষে চলে গেল ওর। ভয়ে লাফিয়ে দুই কদম সরে গেলো মৃত্তিকা। শরীর কাঁপছে তখনও। উজ্জ্বল আর সোহানা ও দৌড়ে আসে। জোরে জোরে শ্বাস টেনে নেয় মৃত্তিকা। আজ অনেকদিন পর এমন হলো।
সোহানা পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে বললো,
— লেগেছে তোর কোথাও?
মাথা নাড়ে মৃত্তিকা। লাগে নি তার। হিমু জানায়,
— ভাইয়ের উপর রেগে থাকিস না মৃত্তি। নির্বাচন আজ বাদে কাল। ব্যাস্ত তো থাকবেন৷ তোর যাতে মন খারাপ কেটে যায় তাই আমাদের পাঠালো। আমি তো গ্রামে যেতাম কিন্তু ভাইয়ের কল পেয়ে রয়ে গেলাম।
মৃত্তিকা যেন জানপ্রাণ অবাক ই হলো। কে বলেছে এই সিনিয়র ভাই পূর্ণ’কে তার জন্য এত ভাবতে? এখন খুশিতে কান্নাটা কার আসছে?
প্রায় দুপুর হয়ে এসেছে তখন। জোহরের নামাজের জন্য পাশের মসজিদে ঢুকেছে উজ্জ্বল আর হিমু। সোহানা আর মৃত্তিকা বসা রবিন্দ্র সরোবরে। আশে পাশে দুই একজন আছে। উজ্জ্বল আর হিমু আসতেই দুইজন উঠে আসে৷ আজ ঘুরবে অনেক পথ। মৃত্তিকা ঘাড় ঘুরাতেই চমকালো। পূর্ণ টুপি হাতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নেড়ে দলের কিছু ছেলে পেলের সাথে কথা বলে যাচ্ছে। মৃত্তিকা যেতে নিলেই উজ্জ্বল আটকালো। বললো,
— ঐ দিকে যাস না। ভাই ব্যাস্ত।
— খাবে না দুপুরে?
— আর খাওয়া দাওয়া।
হিমু কথাটা বলতেই মৃত্তিকা’র মনটা ভেঙে গেলো। লোকটা ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া ও করে না। চোখের পলকেই বাইরে চলে চলে গেল। পরণের সাদা পাঞ্জাবিটা কিভাবে গায়ে লেপ্টে ছিলো। মনটা বিষিয়ে উঠে মৃত্তিকা’র। খারাপ লাগা কাজ করে।
বাসায় ফিরলো মৃত্তিকা বিকাল নাগাদ৷ উজ্জ্বল, হিমু আর সোহানা ও এসেছে। বাবা তার এখনও বাসায় নেই। মৃত্তিকা ওদের নিয়ে বসেছে ড্রয়িং রুমে। মিঠি’র মা মিঠি হাতে হাতে এটা ওটা এনে পুরো টেবিল ভরলো৷ মৃত্তিকা ধরে মিঠি’কেও নিজেদের মাঝে নিয়ে নিলো। ব্যাস্ত হলো কথাতে। কেউ হয়তো খেয়ালই করে নি এখানে রচনা হচ্ছে কারো চোখে চোখে কথা। কিছুটা ভিন্ন অনুভূতি।
বন্ধুরা সব চলে গেল রাত আটটা নাগাদ। মৃত্তিকা ক্লান্ত থাকায় গা এলিয়ে পড়ে থাকে সোফাতে। পাশেই মিঠি বসে আলাপ করছে। আপাকে চোখ বন্ধ করা দেখে আর কথা আগায় না। উঠে চলে যায় মায়ের কাছে।
মৃন্ময় হাওলাদার বাসায় ফিরেন রাত নয়টায়। হাতে তার হালিমের বক্স। দেখেই কিনেছেন কন্যার জন্য। তার রাজকন্যার জন্য।
ড্রয়িং রুমে ঘুমন্ত মেয়েকে দেখেই তার ঠোঁট জুড়ে হাসি দেখা যায়। ধীর পায়ে হেঁটে এসে বক্সটা রাখেন টেবিলে। ফ্রেশ হতে চলে যান রুমে। ফিরে আসেন হাতে পাতলা একটা কম্বল নিয়ে। মৃত্তিকা’র গায়ে জড়িয়ে দিয়ে একদম শিয়রে বসেন। মিঠি কফি এনে দিতেই গম্ভীর কণ্ঠে শুনা যায়,
— সোজা সামনে বস।
মিঠি মাথা নিচু করে তাই করলো। কফিতে চুমুক দিয়ে মৃত্তিকা’র মাথাটা কোলে তুলে আরাম করে বসেন। প্রশ্ন ছুঁরেন মিঠি’র দিকে,
— রাতে বাসায় লেট হওয়া, কলেজ শেষে প্রাইভেট ফাঁকি, খাওয়া দাওয়া ঠিকঠাক না, শেষ কথা ঐদিন কে ছিলো তোর সাথ?
এত এত প্রশ্নে ঘাবড়ে যায় মিঠি। মুখ খুলে কিছু বলা হয়ে উঠে না। অথচ মৃন্ময় হাওলাদার ধমকান নি। বেশ ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন গুলো করেছেন। মিঠি থেকে উত্তর না পেয়ে আবারও তাড়া দিতেই ছলছল চোখে তাকায় ও। মৃন্ময় হাওলাদার চোখে ভরসা দেন। মিঠি মাথা নিচু রাখে। মৃন্ময় হাওলাদার বুঝেন। জিজ্ঞেস করেন,
— কতদূর?
— বেশি না। দেখা হয়।
— কোথায় থাকে?
— আপার সাথে পড়ে। বন্ধু।
— হিমু না উজ্জ্বল?
কথা বলে না মিঠি। মৃন্ময় হাওলাদার দম নিয়ে শুধু বলেন,
— যাও পড়তে বসো।
মিঠি এক প্রকার পালিয়ে চলে যায়। মৃন্ময় হাওলাদার কফিতে চুমুক দিতে দিতে স্বভাব সুলভ অন্য হাতটার বিচরণ ঘটায় মৃত্তিকা’র চুলের ভাজে। তদ্রা ভাবটা কেটে যায় মৃত্তিকা’র। নিজেকে বাবা’র কোলে পেয়ে ঘুম জড়ানো মুখটা গুজে দেয় বাবা’র কোলে। ওভাবে থেকেই ডাকলো,
— আব্বু।
— জ্বি আব্বু।
আর কথা নেই। মৃন্ময় হাওলাদার সময় দিলেন। ঘুমন্ত তার মেয়ে। একটু একটু করে উঠুক। ঠিক দশ মিনিট পর নড়াচড়া দেখা গেলো। বাবা’র কোলেই মোচড়ামুচড়ি করে নজর দিলো বাবা’র দিকে। একে একে তার বুলি ছুটলো। সারাদিন কি কি করেছে না করেছে সবটা তার বলতেই হয় নাহলে শান্তি নেই। মৃন্ময় হাওলাদার আবার মনোযোগী শ্রোতা। মেয়ের কথা হলফে হলফে শুনেন। মৃত্তিকা’র কথার ঝুলি শেষ হতেই উঠে বসলো। এবার কোল থেকে বুকে ঢুকে পরলো। ঠান্ডা লাগছে তার। মৃন্ময় হাওলাদার কম্বলটা দিয়ে একদম মেয়েকে ছোট্ট বাচ্চার ন্যায় পেঁচিয়ে বুকে তুলে নেন। মেয়ে’র কপালে চুমু খেয়ে বলেন,
— ঘুম হলো?
— আমি তো ঘুমালামই না।
— তাই?
হাসলেন মৃন্ময় হাওলাদার। শশুর বাড়ী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। পূর্ণ’র কথা উঠতেই মৃত্তিকা মুখটা গোমড়া করে বাবা’র বুকে চোখ লুকালো। মৃন্ময় হাওলাদার ডাকলেন,
— আম্মা?
— হু।
— আপনি পূর্ণ থেকে কেমনটা আশা রাখেন?
মৃত্তিকা তাকালো। অবুঝ চোখ টা দেখেই মৃন্ময় হাওলাদার বলা শুরু করেন,
— আপনি যেমন তাকে চান ঠিক ততটাই তার ক্ষেত্রে ও। এই যে আপনার অভিযোগ যে পূর্ণ সময় দেয় না। আপনি কি অপেক্ষা করেন তার জন্য আম্মা? তার কি কি এক্সপেকটেশন আপনার থেকে আছে তা কি পূরণ হচ্ছে? অন্তত রাতের খাবারে তার জন্য অপেক্ষা করুন। ক্লাস তো নেই একটু জেগে নাহয় তার জন্য অপেক্ষা করলেন। যে কোন সম্পর্ক একজন টানতে পারে না আম্মা। দুই দিক থেকে সমান সমান এফোর্ট লাগে। শুধু পূর্ণ কেন এফোর্ট দিবে?কিছুটা নাহয় আপনিও দিলেন।
মৃত্তিকা’র চোখ মুখ তখন কাঁদো কাঁদো। আসলেই তো সে চাইলেই পূর্ণ’র দেখা সম্ভব। রাতে জেগে থাকলেই তো হলো। মৃন্ময় হাওলাদার মেয়েকে বুঝেন। চোখ মুছিয়ে দিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলেন,
— হালিম এনেছি। আমার রুমের ওয়াসরুমে গরম পানি রাখা আছে। ওটা দিয়ে মুখ ধুয়ে আসুন।
মৃত্তিকা মাথা নেড়ে উঠেই আবার ফিরলো। ডাকলো,
— বাবা?
মৃন্ময় হাওলাদার তাকাতেই মৃত্তিকা বলে উঠলো,
— আই লাভ ইউ আব্বু।
রাত তখন বারোটা। গাড়ির ডিকির উপর শুয়ে আছে পূর্ণ। সাফারাত এসেই ওর পাশে শুয়ে পরলো। পূর্ণ এসেছে হবে পাঁচ মিনিট। জায়গাটা কিছুটা ঘন। জঙ্গল জঙ্গল দেখতে। রাত হওয়াতে কেমন ভয়ংকর লাগছে। দিনের আলোয় একদম স্বাভাবিক একটা জায়গা অথচ ভয়ংকর সত্যি বহন করে চলছে সে। সাক্ষী কারো আত্নচিৎকারের। কারো গুঙানির। কারো দুনিয়ার সমাপ্তির। কারো জীবন উলোট পালোট হওয়ার। সাফারাত ঢোক গিললো। একবার না পরপর কয়েকবার। পূর্ণ যে তা দেখছে না তেমনটা না। সে দেখছে। সাফারাতের কথা বিশ্বাস করতে চাইছে কিন্তু পারছে না। সাফারাত স্বাভাবিক হতে চাইলো। পারলো না। পূর্ণ’র বাহু খাঁমচে ধরেছে সে। এই কনকনা শীতে সে ঘামছে। পূর্ণ কিছু বলছে না দেখে সাফারাত ই বললো,
— পূ..পূর্ণ চল এখান থেকে।
পূর্ণ দেখলো। শুনলো কম্পমান সাফারাতের গলা৷ স্বাভাবিক গলায় বললো,
— শান্ত হওয়ার চেষ্টা কর।
— আমার দম বন্ধ লা..লাগছে পূর্ণ।
সাফারাত দম নিলো পারলো না। তার মস্তিষ্কে চাপ পড়ে। চঞ্চল তার শ্বাসপ্রশ্বাস। পূর্ণ উঠে বসে। সাফারাতকে ধরে স্বাভাবিক করতে চায় অথচ সাফারাতের ব্যাবহার অস্বাভাবিক। পূর্ণ ওকে ধরার আগেই সাফারাত গড়িয়ে পরলো ডিকি থেকে। পূর্ণ চটজলদি নামলো। সাফারাতকে ধরার আগেই যা ঘটার ঘটলো। দৌড়ে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকছে সে। পূর্ণ ভরকে গেলো। নিজেও দৌড় দিলো সাফারাতের পেছনে। চেঁচিয়ে ডাকতে লাগলো,
— রাত! রাত দাঁড়া। রাত! স্টপ।
সাফারাত তখন পাগল প্রায়। গলা ফাটিয়ে ডেকে যাচ্ছে,
— জান! আমার জান! রুহা। বেরিয়ে এসো। কলিজা আমার। এমন করে না। রু..হি। বার্ড প্লিজ আম আউট।
সাফারাত হঠাৎ বেকায়দা হয়ে পড়ে গেলো৷ পূর্ণ হাঁপিয়ে উঠে পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে। সাফারাত তখন ছটফট করে যাচ্ছে। বারবার ডেকে যাচ্ছে সমান তালে,
— বার্ড! আমার কলিজা। জান!
পূর্ণ অনেক কষ্টে টেনে সাফারাতকে ধরে বের করলো জঙ্গল থেকে। সাফারাত শান্ত নেই। সড়কে উঠতেই পূর্ণ শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে হিট করলো সাফারাতের গালে। মুখ থুবড়ে রাস্তায় পড়লো সাফারাত। ঠোঁটের কোণা বয়ে তখন চিকন ধারায় র*ক্ত বয়ে গেলো। উঠে দাঁড়ায় সাফারাত। পূর্ণ ঠাই দাঁড়িয়ে। সাফারাত এগিয়ে আসতেই তাচ্ছিল্য হাসে পূর্ণ। সাফারাত দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে ওকে। পূর্ণ ছাড়ে না বরং হাতের বন্ধনী দৃঢ় হয়। শান্ত স্বরে বলে,
— ছাড় গাড়িতে উঠ। বাসায় একা যেতে পারবি না।
সাফারাত অপরাধীর ন্যায় তাকাতেই পূর্ণ আবারও তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
— ইউ লায়ার। তুই আবারও আমায় মিথ্যা বলেছিস রাত।
বাসায় ফিরতে আজ পূর্ণ’র বেজে গেলো রাত ২ টা। ক্লান্ত দেহটা টানতেও মন চায় না কিন্তু রুম পর্যন্ত যেতে হবে। তার পূর্ণ্যময়ীর দেখা মিলবে সেখানে। খাটে পূর্ণ’র বালিশে শুয়ে আছে নিশ্চিত। পূর্ণ দেখবে। লোভ জাগবে মনে। কিছুটা সময় তাকে অবলোকন করে শ্বাস টেনে নিবে তার৷
লোভী পূর্ণ রুমে ঢুকে আজ আর লাইট জ্বালালো না। অল্প আলোয় পাঞ্জাবির দুটো বোতাম খুলে ওয়াসরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এলো। লাইটটা অন করতেই দেখলো বিছানা খালি। হায় আল্লাহ! পূর্ণ’র বউ কই? মাথা খারাপ হলো পূর্ণ’র। বউ তার অনুমতি ব্যাতিত বাবা’র কাছে থাকবে না। নিশ্চিত ওর বাবা-মা র রুমে। রাগে দপদপ করতে করতে জোড়ে জোড়ে বাবা-মা র দরজায় নক করতেই ঘুমু ঘুমু চোখে ওর বাবা চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুলেন। ছেলেকে কপাল কুচকে বলেন,
— কি চাই?
— বউ।
–অনেক হয়েছে তোমার। আর না। রাত নেই দিন নেই বউ দাও, বউ দাও। কি পেয়েছো তুমি? যাও ঘুমাও।
ওনার ধমক কাজে দিলো না। পূর্ণ দ্বিগুণ তেঁতে উঠে উল্টো ঠেলে বললো,
— নিজে বউ নিয়ে আছো আমার কষ্ট কিভাবে বুঝবে? ভালোয় ভালোয় বউ দাও আমার আব্বু।
— কি করবি তুই? কি করবি না দিলে?
দু’জনের ঝগড়ায় পূর্ণ’র মা ও উঠে এলো। মা ওকে দেখেই জিজ্ঞেস করলো,
— কি হয়েছে আব্বু?
— বউ লাগবে আম্মু।
পূর্ব বাবা এবার বেশ জোড়েই ধমকে উঠলেন,
— দুইদিন পর পর ঢং করো তুমি? ঢং! দুই দিন পরপর বলবা আর বিয়ে করাব? যাও এখান থেকে ভদ্র মতো। বেয়াদপ ছেলে!
ততক্ষণে ওদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে মৃত্তিকা দৌড়ে এলো কিচেন থেকে। প্রথমে তারা ধীরে কথা বললেও শেষে তেঁতেছিলো বাবা। মৃত্তিকা’কে দেখেই পূর্ণ নিজের কাছে টেনে নিলো। অবুঝ চোখে তাকায় মৃত্তিকা। পূর্ণ মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু বললো,
— গুড নাইট আম্মু। তোমার জামাই ক্ষেপেছে সামলাও একে।
বউ নিয়ে কেটে যায় পূর্ণ। ওর বাবা ও রাগে গজগজ করতে করতে দরজা লাগায় বউ নিয়ে। মনে মনে গালি দেয় ছেলেকে শখানেক।
পূর্ণ রুমে এসেই চেপে ধরে মৃত্তিকা’কে,
— কোথায় ছিলেন?
— কিচেনে।
— এত রাতে কেন?
— খাবার গরম করতে?
পূর্ণ নরম হলো। মৃত্তিকা’কে বুকে জড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— ক্ষুধা লেগেছে মৃত্ত?বসুন আমি নিয়ে আসি। ভালো মতো ডিনার করেন নি? ক্ষুধায় ঘুম ভেঙে গেলো যে।
— উহু। ডিনার ই করি নি। আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম৷ বারান্দায় ছিলাম তো। আপনার গাড়ি দেখেই কিচেনে গেলাম। শুধু শুধু বাবা’র সাথে লেগেছেন।
পূর্ণ ব্যাস্ত হলো। কন্ঠে কিছুটা রাগ,
— রাতে কেন খান নি মৃত্ত? আমি এসব একদম সহ্য করব না।
মৃত্তিকা দুই হাতে পূর্ণ’র গলায় ঝুললো। আদুরে গলায় বললো,
— আই মিসড ইউ ইন লাস্ট থ্রি ডেইস।
শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩৩+৩৪
পূর্ণ থমকালো। অনুভূতিটা আজ ভিন্ন। ঠিক একজন গৃহিণী’র ন্যায় মৃত্তিকা খাবার গুছিয়ে আনলো। আজকে পূর্ণ’কে নিজে মুখে তুলে খায়িয়েও দিলো। পূর্ণ অবাক হয়। যাকে সে বুকে বুকে রেখে মুখে তুলে খাওয়ায় সে কি না আজকে তাকে মুখে তুলে খাওয়ায়? পূর্ণ’র হঠাৎ মনে হলো সে সুখী। ভীষণ সুখী। মনে মনে আওড়ালো,”আপনার নিকট আসা সকল বিপদ আগে আমার হোক মৃত্ত। আপনিটা ভালো থাকুন তাহলেই হলো।”
