Home শান্তি সমাবেশ শান্তি সমাবেশ পর্ব ৭+৮

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৭+৮

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৭+৮
সাইয়্যারা খান

হাত থেকে টাপাটপ র*ক্ত ঝরছে। চোখ দিয়ে বের হচ্ছে আগুনের স্ফুরণ। আশে পাশে কয়েকজন কাতরাচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই এই লৌহ মানবের। সে যেন হৃদয়হীন। তার হৃদয়হরণী’র গায়ে আঁচড় লাগবে তার প্রতি নিশ্চিত সে হৃদয়বান হবে না। সব সময় তার হাতে হকি স্টিক থাকলেও এবার ছিলো রড। যার ফলে যেখানেই একবার আঘাত লেগেছে সেখান থেকে ফেটে র*ক্ত ঝরছে। পূর্ণ নিজেও ব্যাথা পেয়েছে কিন্তু সেটা তার শরীরে লাগছে না। র*ক্ত তার গরম এখন। টগবগ করছে। তান্ডব সে ঘটিয়েছে তবুও বক্ষে শান্তি নেই। আসল হোতা’কে এখন সে সায়েস্তা করতে পারে নি। এগুলো সব চ্যালাপেলা। পুলিশ এসে তারাতাড়ি পূর্ণ’কে ধরে। নিচু কন্ঠে বলে,

— পূর্ণ ভাই ছেড়ে দিন। খু*নাখু*নি হলে সমস্যা। মামলা হয়ে যাবে।
পূর্ণ গা ঝাড়া দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। বিশ্রী এক গালি দিয়ে পুলিশের দিকে তাকিয়ে বললো,
— ঐ কু*ত্তার বাচ্চাকে ধরুন নাহয় এবার খু*ন আমার হাতেই হবে।
কথাটা বলেই রড’টা পাশের ঝোঁপে মারলো। পুলিশ তখন আহতদের ধরছে। এদের এখন জেলে নেয়া যাবে না আগে হসপিটালে নিতে হবে। পুলিশ অফিসার মায়ান কপালের ঘাম মুছলেন। এখন এর জবাবদিহি তো তাকেই করতে হবে। পূর্ণ’র হাতে একজন পানি ঢালতেই লাল রং ধারণ করে পানিগুলো গড়িয়ে পরলো। মুখে পানি ছিটিয়ে অফিসার মায়ানে’র হাতে পঁচিশ হাজার টাকা দিলো। তাচ্ছিল্য করে বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— আশা করি এই টাকা দিয়ে কপালের ঘাম মুছে যাবে।
— জ্..জ্বি ভাই।
বলেই মায়ান এগিয়ে গেলো। পেছন থেকে পূর্ণ বলে উঠলো,
— সবগুলোই টাকা’র পা চাটা।
মায়ান কথাটা শুনলো কিন্তু কিছু বললো না। এইসব কথা গায়ে মাখতে নেই। নেতাদের মুখ খারাপ হবেই। ভেবে নিজেকে স্বান্তনা দিলো।

একটা গাড়ি এসে থামলো সোজা মৃত্তিকার বাসায়। দারোয়ান গেট খুলে দিতেই পূর্ণ বেরিয়ে এলো। এদিক ওদিক না তাকিয়ে একেবারে দরজায় নক করলো। একজন মধ্যেবয়স্ক মহিলা দরজা খুলে বললো,
— কাকে চাই?
বিনিময়ে পূর্ণ তাকে সালাম জানালো। মহিলাটা হেসে বললেন,
— ভেতরে আসুন।
পূর্ণ ভিতরে ঢুকেই বললো,
— মৃত্ত কোথায়?
— মৃত্ত?
— এ বাড়ীর মেয়ে?
— ওহ আম্মাজান ঘুমায় হয়তো।
— ডেকে আনুন। বলুন পূর্ণ দেখবে তাকে একবার।
পূর্ণ’র কথাগুলো ছিলো নেতাশীল৷ কথা বলার ভঙ্গিমাই যথেষ্ট তার ব্যাক্তিত্ব ফুটাতে।
মহিলা যেন আদেশ শুনেই ছুটলেন। মৃত্তিকা তখন একটা বিড়াল ছাপার টিশার্ট আর প্লাজু পড়া। কিছুটা বিরক্ত হয়েই সে রুম থেকে বের হতেই যেন চক্ষু চরকগাছ। পূর্ণ ভাই ওর সামনে। ওর বাসায়। তার থেকেও বেশি চমকায় পূর্ণ’র সাদা পাঞ্জাবি’তে র*ক্তের ছোপ দেখে। দৌড়ে এসে বললো,

— লাল দাগ কিসের? ব্যাথা পেয়েছেন?
মৃত্তিকা’র বিচলিত ভাব পূর্ণ’কে নরম করলে পারলো না। পূর্ণ দাঁত খামটি মে’রে বললো,
— দেখতে এসেছিলাম এক পলক। চোখের ক্ষুধা লেগেছিলো।
মৃত্তিকা কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই পূর্ণ বলে উঠলো,
— আমার সামনে না জেনে এই হালে এসেছেন। এরমানে সবার সামনেই যান। আপনাকে দেখে নিব মৃত্ত। এর ভয়াবহ শাস্তি পাবেন আপনি। তৈরি থাকুন।
কথাগুলো বলেই চলে গেল সদর দরজা পেরিয়ে। পেছনে রয়ে গেল কিংকর্ত্যবিমূঢ় মৃত্তিকা।

সারারাত ঘুমায় নি হিমু। চোখ দুটি যেন টেনেও খুলা দায়। লাল এই চোখ সাথে পাতলা একটা দেহ। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ক্যানটিনে ছুটছে। এক কাপ চা ই পারবে ওকে এই দশা থেকে মুক্তি দিতে। হিমু যেতে নিলেই বোয়ালখালীতে ধাক্কা লাগে কারো সাথে। পাশের জন না পরলেও হিমু পরে যায়। সামনে তাকাতেই দেখলো রুপা। হিমু সরি বলে উঠে দাঁড়াতেই রুপা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,
— চোখের মাথা খেয়েছো?
হিমু একটু হেসে আবারও সরি বলতেই রুপা ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে বললো,
— হিরোঞ্চি’দের মতো চোখ মুখ। নিশ্চিত হোস্টেলের বাইরে রাতে গা*জা টানো?
কথাটা যেন হিমুর বুকে গিয়ে লাগলো। মধ্যবিত্তদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খারাপ না হয়েও যদি শুনতে হয় সেটা বেশ গায়ে লাগার মতোই। হিমু শুধু একবার তাকিয়ে বললো,

— সারারাত আপনার নতুন নোট গুলো তুলেছি। ঘুমাতে পারি নাই। ফজরের নামাজ পড়েই বাসা থেকে বের হয়েছি। তাই চোখ এমন হয়ে আছে।
বলে আর অপেক্ষা করলো না। সোজা ক্যান্টিনে ঢুকে চা আর পরটা ভাজি নিয়ে বসে পরলো। এভাবে বলাটা উচিত হয় নি রুপার। মনে মনে ভাবলো হিমু৷ উজ্জ্বল কোথা থেকে উড়ে এসে জুরে বসলো। হিমুর প্লেট থেকে পরটা নিয়ে ভাজি ভরে মুখে পুরে নিলো। হিমু মুখ কুঁচকে তাকিয়ে বললো,

— দেখ উল্টা পাল্টা কথা বলবি না। আমি কিন্তু রেগে আছি।
কথাটা বলতে গিয়েও সারা মুখে রাগ ফুটাতে চাইলো কিন্তু আফসোস হলো না। কিছু মানুষ ই থাকে এমন। এরা হাজার রাগলেও মনে হয় এরা ফাইজলামি করছে। ওদের কথার মাঝেই দশ কি এগারো বছর বয়সী একটা ছেলে পরটা, ভাজি আর চা এনে দিলো। উজ্জ্বল খেতে খেতে হিমু’তে ক্ষেপাতে বললো,
— এই রুপা’কে ছাড় তোকে সুশমিতা সেন এনে দিব।
উজ্জ্বলের বাজে কথায় হিমু’র রাগ হলো। চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বললো,

— আমার প্রেম তোর সহ্য হয় না কেন? নিজে কাউকে পায় না তাই আসছে আমার রুপা’কে নিয়ে টানাটানি করতে।
উজ্জ্বল হেয়ালি করে বললো,
— ঐ ছেড়ী রুপা’কে দেখলেই আমার গা জ্বলে আর আমি কি না ওর মতো কাউকে চাইব?
হিমু আর দাঁড়ালো না। এই অহেতুক কথা শুনার মানে হয় না। ও যেতেই উজ্জ্বল মনে মনে বললো,
— এই রুপাই তোর জীবন নষ্ট করবে। রঙিন চশমা খুললেই দেখতে পাবি। শ্যা*লা উপন্যাস ভাবসে জীবনকে।

মৃত্তিকা আজ ভার্সিটি যাবে না। কাল পূর্ণ ভাই যেই হুমকি দিয়ে গেলো। ওনার মুখের কথা যে হেরফের হবে না তা ঠিক জানে মৃত্তিকা। তাই তো মন চাইছে না যেতে। যদি মাইর টাইর দেয়? ওই হকি স্টিকের এক বারি ও মৃত্তিকা’র এই দেহ সহ্য করতে পারবে না। এই বয়সেই যদি প্রাণটা হারায়? এমন হাজার ও অযাচিত জল্পনা কল্পনা করতে লাগলো। তখনই হাতে খাবার নিয়ে ওর বাবা রুমে ঢুকে বললো,
— কি করছে আমার মা?
— আব্বু?
ওর বাবা খাবারের ট্রে টা সাইড টেবিলে রাখলেন। মেয়ে’র পাশে বসে মাথায় হাত রেখে দোয়া পড়ে সারা শরীর ঝেরে দিয়ে বললেন,
— কি মা। বলুন আব্বু’কে?
মৃত্তিকা কিছু বললো না। আব্বু নিশ্চিত টেনশন করবে? তাই মাথাটা বাবা’র বুকে রাখলো। ওর বাবা মেয়ে’কে আরেকটু টেনে বুকে নিয়ে বললেন,

— কি হয়েছে আব্বুর জান’টার?
— আজকে ভার্সিটি না যাই?
— বোকা মা আমার। আপনি চাইলেও আব্বু যেতে দিতো না আজ। দেখি হাতটা।
মৃত্তিকা হাত দেখালো। হালকা ছিঁলেছিলো। শুকিয়েও গিয়েছে। ওর বাবা মেয়ে’র হাতে চুমু খেয়ে বললেন,
— আব্বু আজকে ব্রেকফাস্ট বানিয়েছি। এখন খাওয়াবো। চুপ করে খাবেন। দুপুরে বিরিয়ানি রান্না করব একসাথে।
— অফিস যাবে না?
— উহু। আমার জান তো অসুস্থ তাকে রেখে গিয়ে কি কাজ করতে পারব?
কথা বলতে বলতে মেয়েকে খাওয়ালেন ভদ্রলোক। মৃত্তিকা’কে মেডিসিন দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— গত রাতে ঐ ছেলেটা কেন এসেছিলো?
— আমাকে দেখতে। তোমাকে বলতেই মনে নেই। কে বললো মিঠি’র মা?
— হ্যাঁ। ছেলেটাকে ধন্যবাদ ভালো ভাবে দেয়া হলো না। একদিন দাওয়াত করব।
— আচ্ছা।

বাবা মৃত্তিকা’কে নিয়ে রুম থেকে বের হলেন। বাপ বেটি মিলে আজ রান্না করবে। অনেকদিন হলো একসাথে রান্না করা হয় না। সকালটা বেশ আনন্দে কাটলো মৃত্তিকা’র। বাবা’র সাথে অনেক মজা করেছে। ওদের দেখে মিঠি’র মায়ের চোখ ভরে উঠলো। এই বাপ বেটি একজন আরেকজনের জান। মা মরা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক আর সংসার পাতেন নি। এই মেয়ে নিয়ে দিব্যি ভালো আছেন। বাসায় থাকলেই দুজন মিলে পুরো মাতিয়ে রাখে। মৃত্তিকা’র মাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন উনি। সেই ভালোবাসা হারিয়ে গেলেও তার চিহ্ন’কে আগলে ভালো থাকার চেষ্টা করছেন।
দুপুরেও বাবা’র হাতে বেশ মজা করে খেলো মৃত্তিকা। বাবা’র কোলে মাথা রেখে মায়ের গল্প করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে ও গেলো সেই শ্যামকন্যা। বাবা’র রাজ্যের রাণী।
মৃত্তিকা’র চুলে হাত বুলিয়ে মনে মনে ভাবলেন, ছেলেটার সাথে দেখা করতে হবে। কিছু তো আছে। বাবা-মা দুইজনের দায়িত্ব পালন করে এসেছেন তিনি। মেয়ে তার থেকে কিছু লুকায় না। যথাসম্ভব ভালো বন্ধু সে তার মেয়ের। কিছুটা আন্দাজ করেছেন তিনি। ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার মা টা কত বড় হয়ে গেলো। বাবা থেকে কথা লুকায়। কার জন্য এই লুকোচুরি সেটা সে দেখে নিবে।

মৃত্তিকা ভার্সিটি আসে নি গতদিন। পূর্ণ বলেছিলো তবুও না। পূর্ণ’কে অবহেলা? এতটা তেজ? প্রশংসনীয় তার এই তেঁজ। পূর্ণ’র পূর্ণময়ী অবশ্যই তার মতোই তেঁজ থাকবে। তার মতোই থাকবে কথার ধাঁচ। সেটাই স্বাভাবিক। এটা তো হওয়ারই কথা কিন্তু ভুল তার মৃত্ত’র একটা জায়গায়ই। পূর্ণ তাকে আগেও বলেছিলো এই সব তেঁজ, অভিযোগ, অভিমান সবার সাথে হলেও পূর্ণ’র সাথে চলবে না। পূর্ণ আবেগ দিয়ে চলে না। ফুল হাতে প্রেমিকার বাড়ীর সামনে কুকুরের মতো ঘুরা পূর্ণ’র ব্যাক্তিত্বে নেই। না থাকবে। কারণ পূর্ণ আগেও বলেছে। সে প্রেমিক পুরুষ না। কখনো মৃত্তিকা’কে সেরকম ফিল ও করায় নি। তার পরও এতটা ভেঙে বুঝানোর পরও মৃত্তিকা গত কাল না এসে যে অভিমান বা ভয় প্রকাশ করেছে সেটা মানতে সায় দিচ্ছে না পূর্ণ’র মন। আগেও ও মৃত্তিকা’কে সতর্ক করেছিলো কিন্তু সেটা হেঁয়ালি করছে মৃত্ত। সাহসের তারিফ করতে হয়। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই হাতে থাকা কোকাকোলার বোতলে চুমুক দিলো পূর্ণ। আজও মৃত্তিকা’র দেখা পাচ্ছে না সে। সামনে পেলে এই মেয়ে’র সকল হুমরিতামরি ছুটিয়ে দিত পূর্ণ। তেঁজ দেখায় পূর্ণ’কে। অবশ্য যেই সময়ে রোজ দেখা করে সেই সময় এখনও হয় নি। একটু বাকি আছে। এদিকে পূর্ণ’র কাজ আছে। সমাবেশ এ যেতে হবে কিন্তু এই মেয়ে কোথায়? পাশ থেকে মিনমিন গলা শুনা গেলো সোহানের,
–ভাই যাবেন না?

পূর্ণ হাত ঘড়িতে সময়টা দেখে মিলো। বিরক্ত হলো। মুখে তা স্পষ্ট। এই মেয়ে আসছে না। নাকি আজও আসবে না। না এসে যাবে কোথায়? তিনশত ষাট ডিগ্রি ঘুরে হলেও আসতে হবে এই পূর্ণ’র কাছেই।
সময় কিছুটা গড়ালো। দূর থেকে কেউ একজন মাথা নিচু করে নিজেকে আড়াল করে বট গাছটার দিকে আসছে। নিজের ভঙ্গিতে হাসলো পূর্ণ। মুহূর্তে তা মিলিয়েও গেলো। সহসা হাসা হয় না। কারণ টা নিজের ও জানা নেই। বাইকে হেলান দেয়া থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গা ঝাড়া দিলো। ম্যাচম্যাচ করছে কেমন। এই প্রথম এতটা অপেক্ষা করছে পূর্ণ। এই মৃত্ত ওকে দিয়ে যে আর কি কি করাবে তা আল্লাহ জানে। গায়ের সাদা পাঞ্জাবিটা সামনে টেনে ঘাড় এদিক ওদিক করলো। আঙুল গুলো ফুটিয়ে নিলো মটমট শব্দ করে। হাতের সাহায্য বিচরণ ঘটালো চুলের ভাজে। পরিপাটি এখন পূর্ণ। এতটা গোছালো সে অথচ মৃত্তিকা’র সামনে যাওয়ার আগে নিজেকে আরেকদফা গুছিয়ে নেয়। লম্বা লম্বা পা ফেলে নিজের বলিষ্ঠ লম্বাটে দেহটা নিয়ে হাজির হলো মৃত্তিকা’র সামনে। মৃত্তিকা একপলক তাকিয়েই সালাম দিয়ে মাথা নামিয়ে নিলো। সাদা পাঞ্জাবি পড়েছে পূর্ণ। এর মানে সমাবেশ আছে। সাদা পড়ে নিজেকে নেতা ভাবে প্রদর্শন করে পূর্ণ। আজও ব্যাতিক্রম হয় নি। হওয়ার কথা না। এমন গোছালো নেতা নেতা ধাঁচের হয় ই বা কয়জন? সালামের জবাব ঠান্ডা স্বরে দিয়েই তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুঁড়লো পূর্ণ,

— গত কাল না আসার কারণ?
— আ..আমি আব্বুর সাথে ছিলাম।
— জিজ্ঞেস করেছি না আসার কারণ?
এবারেরটা ছিলো ধমক। দুই পা পেছালো মৃত্তিকা। পূর্ণ রেশপূর্ণ নজরে পর্যবেক্ষণ করলো ওকে। ঝাঁঝালো কণ্ঠে আবার শুনা গেলো,
— মিথ্যা সহ্য হয় না আমার মৃত্ত। আপনি আমাকে এতটা কেন অসহায় করে তুলেন যে রাগতে বাধ্য হচ্ছি আমি। আগেও বলেছিলাম আপনার রাগ বা ভয় ভাঙানোর দায়িত্ব নিয়ে বসে থাকতে পারব না আমি। বরাবরই অবাধ্য আপনি। কেন আসেন নি? বলুন? বলি নি আমি আসতে?
ভয়ে ভয়ে এক পা এক পা করে পেছালো মৃত্তিকা। চোখে তখন তার জলের ধারা। দুরুদুরু বুকে শুধু বললো,

— আব্বু আসতে দেয় নি।
— আর আপনি? আসতে চেয়েছিলেন?
— উহু। ভয় পেয়েছিলাম।
পূর্ণ’র ফোনটা হঠাৎ সশব্দে চেঁচিয়ে উঠলো। ধরলো না সে। এগিয়ে এসে নিচু কন্ঠে শাসিয়ে বললো,
— আমার থেকে দূরে যাওয়ার কথা আপনার এই ছোট্ট মন থেকে বের করুন মৃত্ত। ট্রাই টু বি মাইন। এখন থেকেই প্রস্তুত হন। এতটা অবাধ্যতা মানব না আমি। তুলে নিয়ে আমার করে রাখতে টাকা বা সময় কোনটাই গুণতে হবে না আমার। সো বি কেয়ারফুল মৃত্ত।
মৃত্তিকা তখন আশ্চর্য আর ভয়ের মিশ্রণের অনুভূতিতে ডুবে যাচ্ছে। কিন্তু হায় ডুবতে পারলো কই? তার আগেই পূর্ণ আবারও বলে উঠলো,

— নির্বোধের মতো আচার আচরণ বাদ দিন। বাসায় একটা পুরুষ এলো আর আপনি ঢ্যাং ঢ্যাং করে তার সামনে ওরণা ছাড়া খোলামেলা পোশাকে যাবেন তারউপর এটা আমাকে মানতেও হবে, ভাবা যায়? জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিব ঐসব মৃত্ত। প্রথম বলে ছেড়ে দিলাম। ছোট খুকি না আপনি। যথেষ্ট বড়।
মৃত্তিকা এই ব্যাপারে এতটা কটু কথা শুনে চরম অপমানিত ফিল করলো। বাসায় কি বোরকা পড়ে থাকবে? পরক্ষণেই খেয়াল হলো আসলেই তো ও তো মাত্র একটা ঢোলা টিশার্ট আর প্লাজো পড়া ছিলো। যেই না পূর্ণ সে তো এমনিতেই এসব নিয়ে সিকিউর। যেখানে কাছে এসে ঘেঁষে বসে না সেখানে ওরকম পোশাকে দেখে রাগটাই স্বাভাবিক। মৃত্তিকা’কে একধ্যানে থাকতে দেখে পূর্ণ গলা খেঁকালো। তাতেই সফল। ধ্যান ভেঙেছে মৃত্তিকা’র। বিষাদে রূপান্তরিত হলো তার মুখখানা। নিশ্চিত অপরাধবোধ অনুভব করছে তার মৃত্ত? পূর্ণ পুনরায় গলা ঝেড়ে বললো,

— সকালে খেয়েছিলেন?
— আব্বু খিচুড়ি রান্না করেছিলো। সেটাই খায়িয়ে দিয়েছিলো।
–ওহ্। ভালোই। আপনার আব্বু যথেষ্ট ইয়াং। বুঝা দায় এত বড় একটা মৃত্ত আছে তার।
মৃত্তিকা হেসে উঠলো। আসলেই তার বাবা যুগ বা বয়স অনুযায়ী বেশিই হ্যান্ডসাম। প্রফুল্ল চিত্তে মৃত্তিকা বুলি ফুটালো মুখে,
— জানেন কিছু দিন আগে কি হলো?
পূর্ণ মাথা নাড়লো দু’দিকে। এর মানে স্পষ্ট সে জানে না কি হয়েছিলো। এতে যেন মৃত্তিকা’র শ্যামা মুখটা ঝলমলিয়ে উঠলো। পূর্ণ তাকিয়ে। অনির্মেষ। পলক ফেলা যাবে না এখন। তার মৃত্ত এতটা খুশি। কারণটা কে? পূর্ণ না মৃত্ত’র বাবা? যাই হোক এতটা সহজ ভাবে এই প্রথম মৃত্ত তার সাথে কথা বলছে। ব্যাপারটা মোটেও সহজ নয়। পূর্ণময়ীর প্রথম ধাপ এটা তার পূর্ণ’র কাছে আসার।

ঝলমলিয়ে হেসে উঠলো মৃত্তিকা। টোলহীন গাল দুটোর উপর চোখের নীচে গর্ত হলো। এ কেমন টোল? এ কি আদো ও টোল? চোখের নীচে গালের উপরের দিকে হচ্ছে গর্তটা। পূর্ণ’র ইচ্ছে হলো ছুঁয়ে দিক একটু। নিষিদ্ধ ইচ্ছেটা দমন করাটা কঠিন। ভীষণ কঠিন। এই নারীর গালে এতটা শক্তি যে পূর্ণ ‘র মতো পুরুষ’কে কাবু করে ফেলছে? মৃত্তিকা বহু কষ্টে হাসি থামালো। কথা বলার আগেই নিজে নিজে মনে করে যাচ্ছে আর হেসে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকা দুজন কখন যে গাছের গোড়ায় বসেছে খেয়াল নেই কারো। মৃত্তিকা হাসি কোন মতে চেপে ধরে বললো,
— আমি আর আব্বু শপিং এ গিয়েছিলাম। তো আব্বু ববাবরই আমার জামা কাপড় নিজেই পছন্দ করছিলো। সেই সেল্স গার্ল ভেবেছে আমি আব্বুর ছোট বোন। আব্বু’কে বলে কি না, ভাইয়া বোনের জন্যই নিলে হলে বউয়ের জন্য নিতে হবে না।

বলেই উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো মৃত্তিকা। অন্য সময় হলে পূর্ণ নিজেই ধমক দিতো এতটা জোরে হাসার জন্য কিন্তু আজ দিলো না। থাক না। একটু হাসুক। একদিন জোরে হেসে নিজেকে প্রকাশ করুক এই লাবণ্যময়ী নারী। এক পলক হাত ঘড়িতে দেখে নিলো কথার ফাঁকে। সমাবেশের সময় হয়েছে। আজকে পূর্ণ’র ভাষণ আছে সেখানে ছাত্রদলের নেতা হিসেবে। গণ্যমাণ্য ব্যাক্তি বর্গ রাও আসছেন। অথচ পূর্ণ’র মন মানছে না যেতে। আরেকটু আরেকটু করে প্রায় আধ ঘন্টা পার করলো সে। এবার যে যেতেই হয়। হালকা গলায় শুধালো পূর্ণ,

— ক্লাস আছে না মৃত্ত?
— না ল্যাব।
— আচ্ছা চলুন তাহলে।
— আরেকটু থাকি?
নিদারুণ আবদার। এই আবদার কি না তার মৃত্ত করলো? হায় আফসোস পূর্ণ পারলে সময়টা না থামিয়ে দিত। পাল্লায় দ্বিতীয় দিকে তার রাজনীতি নাহয় আজ সব ছেড়ে সে থাকতো। কোন প্রতিকূলতা বিবেচনায় নিত না। কিছুটা মানানোর স্বর পূর্ণ’র।

— আজ ল্যাবে যান মৃত্ত। মিস দেয়া যাবে না। সন্ধ্যায় দেখা করে যাব। কথা দিচ্ছি না। যদি সময় পাই।
ঠোঁট দুটো উদাসী ভঙ্গিতে বাঁকালো মৃত্তিকা। মাথা নেড়ে পা বাড়ালো ফিরে আসতে। মেয়েটা চোখের আড়াল হতেই খারাপ লাগায় ছেয়ে গেলো পূর্ণ’র মন৷ আজই কি না তার মৃত্ত’র তার সঙ্গ চাইলো একটু বেশি। আজই কথার ফুল ঝরলো। এমনিতে তো অল্পভাষী পূর্ণ কথা বলে আর হু হা করতো অথচ আজ? কত কথা বললো। দীর্ঘ শ্বাস টানতেই ছেলেপেলেরা হাজির হলো ওকে ধীরে। পরিস্থিতি র কথা জানাচ্ছে তারা। পূর্ণ মনোযোগ দিলো তার রাজনৈতিক কাজে। আজকের সমাবেশটা বেশ জরুরি। আজকে বড়বড় মন্ত্রীরা আসবে। এদের সাথে টাচে থাকা তার রাজনৈতিক লাইফে ভালো ইফেক্ট ফেলবে।

ল্যাবে আজ দেড়ীতে ঢুকলো হিমু। উজ্জ্বলের সামনে আসতেই ও মুখ ঘুরিয়ে বললো,
— শ্যালা সর। যা তোর রুপা’র কাছে। নিশ্চিত ওই ছেমড়ির পিছনে ছিলি এতক্ষণ?
হিমু লজ্জা পেলো। হ্যাঁ আজ সে রুপা’র সাথে ছিলো। ক্যানটিনে একসাথে চা’য়ে চুমুক বসিয়েছিলো দুজন। তেমন কথা হয় নি শুধু নোটস আর কিছু কাজ নিয়েই কথা হচ্ছিলো তবুও খুশি। সবচেয়ে বেশি খুশি যখন চায়ের বিলটা সে দিতে সক্ষম হলো। বিশ টাকার কচকচা একটা নোট দিয়েছে। রুপা’র সাথে চা। ইশ! এই চায়ের স্বাদ ই ভিন্ন ছিলো। প্রেম প্রেম গন্ধ ছিলো তাতে। সেই স্বাদেই ডুবেছিলো হিমু। তার যে ল্যাব তা যেন প্রেমের ঘোরে ভুলতে বসেছিলো। অবশেষে মনে পরে যখন কল আসে উজ্জ্বলের। হিমু’কে সবচেয়ে বেশি খোঁচায় এই উজ্জ্বল আবার বন্ধুত্বের হকটা ও আদায় করে বেশি। মৃত্তিকা ওদের দিকে এসে নিজের হাতটা দেখিয়ে বললো,

— দ্যাখ তো একটু। হাইড্রোক্লোরিক এসিডের ছিটে এসেছে। কিছু হবে?
উজ্জ্বল টিপকুনি কেটে রসিকতার সুরে বললো,
— আহাগো চান্দের বাত্তি আমার তোমার এই বদনে এসিড কিভাবে লাগলো? দাঁড়া খবর দেই পূর্ণ ভাই’কে। সমাবেশ ছেড়ে দৌড়ে আসবে।
মৃত্তিকা ট্যাব ছেড়ে হাতটা ধুতে ধুতে কৌতুহল চাহনি দিলো। হিমু সেটা লক্ষ্য করে বললো,
— আরে ভাই তো আজকে সমাবেশে ভাষণ দিবে। অনেক বড় বড় পার্টিরা আসবে। আমরা ও যাব দেখতে। বস’রে আমার সেই লাগে।
–বস?
অবুঝ স্বর মৃত্তিকা’র। উজ্জ্বল হিমুর কাঁধে হেলান দিয়ে বললো,
— পূর্ণ ভাই। পুরো ভার্সিটির বস। নিশ্চিত এবার জিতে যাবে।

পূর্ণ’র ভাষণ শুরু হবে। তখনই ব্যাগ হাতে অনেকেই ছুটছে রোডে। সেই দলে মৃত্তিকাও আছে। হিমু দৌড়াতে গিয়ে দুই দুই বার উস্টা খেতে খেতে বেঁচে গেলো। উজ্জ্বল বিরক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে গেল,
— বা’ল এই শরীর নিয়ে দৌড়াতেই পারস না আবার রপা’কে পালব?
উত্তরে দাঁত কেলিয়ে হাসলো হিমু। ওর কাজই এটা। হাসা। তাই হয় তো ওর বন্ধর সংখ্যা বেশি আর শত্রু কম। যারা কখনো বাচবিচার ছাড়া, কথা কাটাকাটি ছাড়া শুধু হাসে তাদের শত্রুর সংখ্যা আসলেই কম।

চারদিকে মানুষ গিজগিজ। অনেকেই এই পর্যন্ত বক্তব্য পেশ করেছেন। এখন করবে পূর্ণ। লম্বা চওড়া পূর্ণ হাজির হলো জন সমাগমে। মৃত্তিকা’র বুকে কোথাও যেন হাতুড়ি পেটা হলো। সাদা পাঞ্জাবি পড়া এমন সুশ্রী সুদর্শন যুবক। নজর কাড়া সুন্দর। মৃত্তিকা’র সেই পবিত্র পুরুষ। যাকে বাবা’র পরেই কল্পনায় আনে সে। হঠাৎ সালাম শুনা গেলো। পূর্ণ দিয়েছে। গমগমে জায়গাটা শান্ত হয়ে এলো। গম্ভীর্যপূর্ণ স্বরে লোম দাঁড় করানো কন্ঠের মালিক সে। মুগ্ধ হয়ে যাকে শুনা যায়। অতি সংক্ষিপ্ত ভাবে নিজের বক্তব্য পেশ করে পুণরায় সালাম জানালো সে। তার বক্তব্যের কোথাও কোন চাটুকারিতা নেই। নেই তেল-মশলা। আছে দায়িত্ব বোধ। নিজে থেকে কিছু করা।

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৫+৬

এতে শুধু কিছুটা সাহায্য চেয়েছে সে সরকারের আর কিছুই না। কারো পা চাটা গোলাম পূর্ণ হবে না। সেটা পূর্বেই সকালের জানা। সেচ্ছাসেবী সংগঠন ভার্সিটি সহ আলাদা করে আছে তার। গরীব আর পথশিশুর জন্যই পুরোটা। নিজ পকেট থেকে খরচ ও করে সে অথচ বেনিফিট হিসেবে গ্রহণ করে সেই অসহায় চোখগুলোর না বলা হাসি। কড়াতালিতে যখন চারদিক মুখরিত তখন মৃত্তিকাও জোরে হাত তালি দিচ্ছে। উজ্জ্বল সিটি বাজাচ্ছে। সব যেন মুহূর্তেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। বিকট শব্দে বি*স্ফো*র*ণ ঘটলো। কতগুলো কাক কা কা শব্দ তুলে গাছ থেকে উড়ে চলে গেল। সাদা আকাশে তখন কালো ধুয়ায় ভরপুর। কিছু স্বপ্ন হয়তো শেষ হলো কিছুটার হয়তো নতুন উদ্দ্যমে শুরু।

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৯+১০