শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৬
নূরজাহান আক্তার আলো
রাতের ঘোর কাটিয়ে পরেরদিন নতুন এক সকালের সূচনা হলো। সকাল
সাড়ে আটটার মধ্যে বাড়িতে হইহট্টগোল শুরু হয়ে গেছে। নাস্তার পর্বও শেষ। তবে নবদম্পতিদের খাওয়ার টেবিলে ডাকা হয়নি ; রুমেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে সকালের খাবার। নতুন বিয়ে, একটু লজ্জা, একটু অস্বস্তি লাগবে এটা স্বাভাবিক। তাছাড়া ছেলে-মেয়েদের অকারণে লজ্জা দিতে চান নি কেউই। যদিও ভাবিরা গোসলের ব্যাপারে গাঁইগুঁই করছিল। মজা নেওয়ার জন্য ডাকতে যেতে চাচ্ছিল। কিন্তু সিরাত বারণ করলেন কারণ সায়ন এসব মজা বুঝলেও শুদ্ধ বুঝবে না। ওই ছেলের মুখ তো না যেন ধারালো ব্লেড। কি বলতে কী বলে বসবে তখন হবে আরেক বিপদ। আর
শুদ্ধ গতদিনও গোসলের জন্য বাগানে যেতে চাচ্ছিল না।
সিতারা বলে কয়ে রাজি করালেও পাজামা-পাঞ্জাবি পরে গিয়েছিল। হলুদে পরনের পোশাক নষ্ট করেছে, তবুও পাঞ্জাবি খুলে নি, লুঙ্গিও পরে নি। ভাবিদের হাতে গোসলের পানিও ঢালতে দেয়নি। তার মতে, সারাজীবন নিজেরা গোসল করতে পারলে বিয়ের দিন অন্যের সাহায্য লাগবে কেন? সাবান ঘষামাজা করার জন্য? নিয়মের দোহাই দিলে মা-চাচীরাই হলুদ ছুঁইয়ে একমগ পানি ঢালুক তবুও ভাবিরা না। না মানে না! বিয়ের আগের দিন যে ছেলেটা এত কাহিনি করল সেই ছেলেই সকালের গোসলের কাহিনি মানবে? মানবে না। বরং খুব রেগে যাবে। কারণ এটা কিসের গোসল তা সবাই জানে। কিছু কিছু ব্যাপার গোপনে সুন্দর। তাকে ডাকলে গেলে সে মুখের উপর চটাস করে বলে বসতে পারে, ‘বিয়ের পরদিন সকালবেলা লোক দেখিয়ে গোসল করলে পূন্য হয়? নেকি পাওয়া যায়?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আসলে কি যায়? যদি যায়, আগে প্রমাণ দেখানো হোক তারপর সে যাবে। শুধু বাড়ি না দরকার হলে সামনের চৌরাস্তায় গিয়ে গোসল সারবে। ছেলেটা যখন রেগে যায় তখন এভাবে কথা বলে। সকালবেলা শুধু শুধু তাকে রাগানো উচিত হবে না। এভাবে নানান কথার ছলে অনেকক্ষণ যাবৎ বোঝানোর চেষ্টা করলেন সিরাত। কিন্তু তারা শুনছে না। সিমিনও টু শব্দটি করছেন না, কারণ মেয়ে-জামাইকে নিয়ে কী বা বলবেন? বলা কি সাজে? তাই নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। উনাকে চুপ দেখে এবার বাধ্য হয়ে সিতারা মুখ খুললেন। বললেন,
_ ‘ওরা পড়াশোনা জানা বুঝদার ছেলে-মেয়ে ওদের আর কি শিখাবি?
যুগ কি আর এককালে পড়ে আছে? তাছাড়া রুমেই ওয়াশরুম আছে বাকিটা ওদের উপর ছেড়ে দে। তোরা নাস্তা-পানি কর ওরা একটুপরেই নেমে আসবে।’
_’মামনি তুমি..!’
_’শাপলা কথা বাড়াস না, মা। আমার শান্ত ছেলেটা রেগে গেলে আরেক বিপদ। তাছাড়া গতকাল কম ধকল গেল না একটু রেস্ট করুন। ধীরে সুস্থে আসুক। তোরা পেয়ারা খাবি? পেড়ে এনে দিবো?’
উনার কথা শুনে কেউ আর কিছু বলার সাহস করলেন না। তবে বিয়েতে এসে মনক্ষুণ্ণ হয়েছেন। সবকিছুতে বাধা দেয়। বিয়ে বাড়িতে হাসি-ঠাট্টা করবে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু না, গতদিনও শুদ্ধ গোসল করানোতে আপত্তি করল। ভাবিদের হাতে নাকি গোসল করবে না। সেই সঙ্গে জারি করল দূর সম্পর্কের ভাই বা দুলাভাই নতুন বউদের কোলে নিতে পারবে না। নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের আগের দিন বা পরেরদিন দেবরকে তো ভাবি গোসল করিয়ে দেয়। দুলাভাইরা মজা করে ভেজা গায়ে থাকা শালিদের কোলে নেয়। কত মজার মজার ইয়ারকি করে। প্রথম রাত নিয়ে পরামর্শ দেয়। বাঙালি বিয়েতে সচরাচর এমনই হয়ে থাকে। তাহলে এদের বেলা এত বাধা কেন? এতই যখন বাধা তাহলে ডেকেছে কেন? একা অনুষ্ঠান সারত?
এসব নিয়ে ফিসফাস করতে করতে তারা বাগানের দিকে চলে গেল। গিন্নিরা কেউ সেসব নিয়ে মাথা ঘামাল না। বাড়ির সন্তানদের নিজ হাতে পেলেপুষে বড় করেছেন উনারা। উনারা জানেন কে কেমন! কোন বিষয়টা ছেলেরা কীভাবে নিবে। বুঝ হওয়ার পর থেকে ছেলেরা টি-শার্ট ছাড়া ড্রয়িংরুম অবধি আসে না, খুব লজ্জা করে৷ উনারাও নক না করে ছেলেদের রুমে প্রবেশ করে না। এগুলো হচ্ছে ভদ্রতাবোধ। যতই তারা নিজেরা সম্পর্ক করে বিয়ে করুক গোসল নিয়ে বড়দের সামনে কাহিনি করলে লজ্জা পাবে। কি দরকার শুধু শুধু ওদের লজ্জায় ফেলার? সত্যি বলতে, এগুলো উনাদেরও পছন্দ না। আর মজার ছলে এগুলো প্রশ্রয় দেওয়ার মানে হয় না। বাড়ির ছেলেরা কোনোকালে ভাবিদের সাথে কেন কারোর সঙ্গে আবোলতাবোল ফাজলামি করে না। যা করে ভাই-বোনের সাথে। তাহলে আজ কেন করবে?
সিতারার কথা অনুযায়ী সত্যি সত্যি ঘড়ির কাঁটা যখন নয়ের ঘর ছুঁই ছুঁই তখন তিন জুটি ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হলো। বউয়ের পরনে সুতির শাড়ি,
ছেলেদের পরনে টি-শার্ট আর ট্রাউজার। ওরা নিজেরা কথাবার্তা বলছে। একে অপরকে পচাচ্ছে। ইশারায় কীসব বলে মিটিমিটি হাসছে।একটুপর
ছেলেরা গেল বাগানের আর মেয়েরা এলো রান্নাঘরে। রান্নাঘরের সামনে যারা কাজ করছিল স্বাভাবিকভাবে কথা বলল। গতদিনের কিছু ব্যাপার নিয়ে গল্প করল, হাসল। তবে ওদের তিনজনের চোখে, মুখে লজ্জাভাব তিন জা বুঝল। উনারা সহজভাবে এটা ওটা বলায় তাদের মধ্যে যতটুকু জড়তা ছিল নিমেষেই কেটে গেল। সত্যি বলতে স্বর্ণ, শীতল, ঐশ্বর্য নিচে নামতে বেশ লজ্জা পাচ্ছিল। এখন ঠিকঠাক। এরপর ভিডিও কলে তারা শখের সঙ্গে কথা বলল। তাড়া দিলো তাড়াতাড়ি আসার। বারোটার পর ড্রয়িংরুমে পা রাখল শখ ও অর্ক। তাদেরকেও পচানো হলো। গল্প হলো। গোল হয়ে বসে অনুষ্ঠানে পাওয়া উপহারগুলো দেখতে বসল। সিতারা তখন হাতে করে একটা ব্যাগ এনে বললেন,
_’ আজ সকালে এক লোক এসে এটা দিয়ে গেছে। দেখ তো বাবা কি আছে এতে?’
সায়ন আপেলে কামড় বসিয়ে চিবাতে চিবাতে সেটা খুলল। দেখল একই রকমের চারটা বক্স। বক্সে ডায়মন্ডের লেটেস্ট মডেলের নেকলেস। খু্বই সুন্দর দেখতে! সে চারটা নেকলেস নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে বলল,
-‘এটা আবার কোন ভূত দিয়ে গেল? একটা না, দুইটা না, চার..চারটা? ওমা গো টুরু বড়লোক দেখি!’
তার কথায় ছোটরা হেসে ফেললেও বড়রা ভ্রু কুঁচকে ফেললেন। ডায়মন্ড হাতের মোয়া নাকি? তাও চারটা! যে দিয়েছে তার অন্যকোনো উদ্দেশ্যে আছে বোধহয়। কোনো চিরকুট আছে কী না দেখতে রুবাব ব্যাগ হাতড়ে দেখল। আছে দেখে খুলে দেখল। চিরকুটে ছোট্ট করে লেখা, ‘ আমি কে, জানাটা কি খুব জরুরি? না জানলে উপহার গ্রহন করবেন না বুঝি? তবে বলি শুনুন, আমি হলাম পৃথিবীর পাপ।’
রুবাব লেখাটা পড়তেই তার দৃষ্টি ঘুরে গেল শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধ কমলার খোসা ছাড়িয়ে সাম্যের হাতের প্লেটে রাখছে। সেখান থেকে তুলে তুলে খাচ্ছে শীতল, সৃজন, সাম্য, শখ। সায়ন একবার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল। উপস্থিত মেহমান আছে দেখে কথা বাড়াল না। তবে কিছু বলে কথা কাটাতে হবে তাই বলল তাদের এক ফ্রেন্ডের কাজ।
তারপর সেগুলো সাইডে রেখে অন্যকিছু দেখায় মনোযোগী হলো। এসব করতে করতে আরো কয়েক ঘন্টা পেরিয়ে গেল। সময় যেন দৌড়াচ্ছে।
বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে দেখে সিতারা সবাইকে খেতে ডাকলেন। ছেলেরা সবাই বসল। অর্ক শুদ্ধর পাশে বসেছে। বেচারা হাসিমুখে খেতে বসলেও তার হাসি বেশিক্ষণ টিঁকলো না। নতুন জামাই বিধায় যে যা পাচ্ছে প্লেটে তুলে দিচ্ছে। প্লেট দেখে মনে হচ্ছে ছোটো খাটো খাবারের পাহাড়। তবুও থেমে নেয় কেউ। তার অবস্থা দেখে শীতল হাসি আঁটকে এগিয়ে এলো। শারাফাত চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বলল,
-‘বড় আব্বু খাবার টেবিলে রাজনীতি করা ঠিক হচ্ছে না। আমি মানব না এই অবিচার।’
-‘রাজনীতি? কে রাজনীতি করল আম্মাজান?’
-‘দেখাচ্ছি।’
একথা বলে সে সায়ন আর রুবাবের প্লেটে আরো খাবার তুলে দিয়ে মিষ্টি করে হাসল। বলল,
-‘বাড়ির সব জামাইদের সমান সমান অধিকার।’
অর্ক এবার নিজেও শীতলের মতো করে হেসে বলল,
-‘শালিকা দেখি বহুত চালাক। আমাদেরকে ফাঁসিয়ে দিয়ে নিজেরটাকে বাঁচিয়ে নেওয়া হচ্ছে বুঝি? সমস্যা নেই, আমাদের ভাইরা ভাইয়ের প্রতি এ অবিচার আমরাও মানব না।’
একথা বলতে বলতেই সায়ন আর রুবাব শুদ্ধর প্লেট ভর্তি করে দিয়েছে।
শুদ্ধ তাকাল শীতলের দিকে। এজন্য সে ব্যাঙাচিকে বলে আগ বাড়িয়ে পণ্ডিতি না করতে। তার তো কিছু হয় না বরং ওর পণ্ডিতির মাসুল তাকে গুনতে হয়। কি দরকার ছিল অন্যকে বাঁশ দিতে যাওয়ার? বড়রা আছে দেখে কেউ কিছু বলল না খেতে লাগল। একপর্যায়ে বড়রা খাওয়া শেষ করে ড্রয়িংরুম বসলেন। এদিকে সায়ন, শুদ্ধ, রুবাব, অর্ক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের একা দেখে চার মেয়েকে সিমিন ঠেলে দিয়েছে কার কী লাগবে তুলে দেওয়ার জন্য। অথচ তারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছে৷ ছেলেরা যে যতটুকু পারল খেলো। কিন্তু তাদের প্লেটে এখনো অনেক খাবার দেখে শুদ্ধ শীতলকে ডাকল। বলল,
-‘ খাবার যেন নষ্ট নাহয়।’
একথা বলে বেসিনে হাত ধুতে গেল। শীতল একবার তাকিয়ে বসে পড়ল শুদ্ধর চেয়ারে। শুদ্ধর এঁটো প্লেটে খেতে শুরু করল নিজের মতো করে।
না নাক ছিঁটকাচ্ছে আর না কোনো কথা বলছে। ভাবখানা এমন যে এটা খুব সাধারণ ব্যাপার। শুদ্ধর দেখাদেখি সায়ন, রুবাবও যার যার বউয়ের দিকে তাকিয়ে উঠে পড়ল। তবে অর্ক মুখ কাঁচুমাচু করে বসে আছে। সে কি করবে? শীতল যেটা অনায়াসে করল শখ সেটা করবে না। না করাটা স্বাভাবিক। তাকে এঁটো হাতে বসে থাকতে দেখে শীতল বলল,
-‘নতুন দুলাভাই খাচ্ছেন না কেন? আর কিছু লাগবে?’
-‘এই না প্লিজ। আসলে,,।’
-‘ আপু সামলে নেবে আপনি উঠতে পারেন।’
অর্ক একবার তাকালে শখ এসে পাশে বসল। নিজে টেনে নিলো অর্কের প্লেট। তখন অর্কও উঠে দাঁড়াল তবে তার চোখে, মুখে বিষ্ময়। সে ভাবতে পারে নি শখ তার এঁটো খাবার খাবে। তখন সায়ন হাসতে হাসতে পুরনো একটা কথা তুলল। সুযোগ বুঝে স্বর্ণের আঁচলে হাত, মুখ মুছে বলল,
-‘ শীতল যখন ছোটো ছিল আমরা খেতে বসলেই সবার প্লেট থেকে কিছু না কিছু সে খাবেই। খাবে মানে খাবেই। এটা তার রুটিন। আমাদের হাতে একবার করে খেলে ওর আলাদা প্লেটে না খেলেও হতো। ওর যা পছন্দ আমরা দিলেও শুদ্ধ কেন জানি দিতো না। সবাই দিচ্ছে, সে কেন দিচ্ছে না, এটাও মানতে পারত না শীতল। ভাবত শুদ্ধ দিচ্ছে না তারমানে ওর খাবারই বেশি স্বাদ। এই নিয়ে রোজ ওদের ঝগড়া হতো।’
এইটুকু বলতেই শীতল লজ্জায় মুখ কাচুমাচু করল। কোনোমতে মুখের ভাতটুকু গিলে বলল,
-‘থামো না ভাইয়া। এখন তো বড় হয়েছি।’
একথা শুনে সিমিন তরকারির বাটি দিতে এসে নিজেও হেসে ফেললেন।
তখন সায়ন পুনরায় বলল,
-‘ এক টেবিলে বসলে সে ঘুরে ঘুরে সবার কাছে যেতো। যা খেতে চাইত সবাই দিতো। শুদ্ধ দিতো না তবুও শীতল শুদ্ধর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকত।
শুদ্ধর খাবার যখন শেষের দিকে তখন রাগে কটমট করে বলত,’ আমি দাঁলিয়ে আচি তো নাকি? চোকে দেকে না।’ তখন শুদ্ধ জবাব না দিলে কিংবা মুরগির রান তাকে না দিলে আগে বাবার পেছনে দাঁড়াত। নিজের সেভ জোন বুঝে তারপর বলত, ‘শুদু বাইয়ের মুগলি গু কায়।’
সায়ন কথাগুলো বলতে বলতে নিজেও হো হো করে হাসছে। বাকিরাও তাই। শুদ্ধর ঠোঁটের কোণেও মুচকি হাসি। ব্যাঙাচিটা এভাবেই তো জোর খাটিয়ে মনের জায়গা দখল করেছে। শুধু দখল করে নি ঘরের বউ হয়ে তারপর থেমেছে। এসব কথার মাঝেই চোখাচোখি হলো শুদ্ধ-শীতলের।
দুজনের ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসি। চোখে মুখে পূর্নতার ছাপ। আর মনকুঠুরিতে একে অপরের প্রতি অসীম ভালোবাসা। অতঃপর এত এত হাসি-ঠাট্টার মধ্যে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ হলো। তারপরের সময়টুকু যেন তাড়াতাড়ি কেটে গেল। বিকেলের দিকে বাকিসব মেহমানরা বিদায় হলো। সন্ধ্যার পর রুবাব ঐশ্বর্য আর শতরুপাকে নিয়ে নিজেদের ফ্ল্যাটে চলে গেল। দেশ ছাড়ার আগে আরেকবার এসে দেখা করে যাবে। তারা যেতেই বাড়ি শান্ত হয়ে গেল। মন খারাপ হলো সবার তবুও যেতে দিলো।
তারা যাওয়ার পরপর শখ বইপত্র নিয়ে রেডি হলো। তাকেও যেতে হবে।
এখন তো পরের ঘরের প্রদীপ সে। পরের ঘর আলো করায় তার কাজ।
একরাশ মন খারাপ নিয়ে তারাও বিদায় হলো। অর্ক আজও কথা দিলো সময় পেলে তাকে নিয়ে আসবে। মেয়ে বিদায় করে একরাশ মন খারাপ নিয়ে বড়রা যে যার রুমে চলে গেলেন। ড্রয়িংরুমে ফাঁকা হতেই বাকি দুই জুটির একজোড়া ছাদে গেল আরেক জোড়া বেলকনিতে সময় কাটাল।
এরপরের দিনগুলো যেন চোখের পলকে পেরিয়ে গেল, রুবাবও দেশের বাইরে চলে গেল। নিজ নিয়মে দিন কাটতে লাগল। যখন ফ্রি থাকে তখন ভিডিও কলে একদৃষ্টিতে ঐশ্বর্যের মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকে। নীরবে, নিঃশব্দে দুজনের চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু ঝরে যায়। শূন্য বুকটা খাঁ খাঁ করে। ইচ্ছে করে মন-মালিনীকে শক্ত করে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে রাখতে। কিন্তু সেটা তো সম্ভব না। তাকে কাছে পেতে হলে ছয়টা মাস পার করতে হবে। যদিও সে পৌঁছে ক্যালেন্ডারের পাতায় ক্রস আঁকতে শুরু করেছে।
সবার সঙ্গে যোগাযোগ হয় তার। শতরুপা চৌধুরী ব্যস্ততা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। উনি এখন সময় দেন ঐশ্বর্যকে। দুজন ঘুরতে বের হয়। চট করে চৌধুরী বাড়ি থেকে ঘুরে আসে। শীতলরাও আসে সারাদিন কাটিয়ে চলে যায়। শপিং করার হলে প্ল্যান করে চারজন একসাথে বের হয়। সারাদিন বাইরে খেয়ে, ঘুরে, শপিং করে তারপর বাড়ি ফিরে। তাকে মন খারাপের
সুযোগটুকু কেউ দেয় না। এভাবে দিন কাটতে কাটতে রুবাবের যাওয়ার আরো একটা মাস পেরিয়ে গেল। এখনো পাঁচটা মাস। সময়কে কেন যে ঠেলে পার করা যায় না? কেন যে মানুষ পাখি হতে পারে না?পাখি নাহয় না হোক অলৌকিক শক্তি থাকলেও তো হতো। চুপসারে গিয়ে প্রিয়সীকে বুকে জড়িয়ে নিতো। এভাবে আরো কিছুদিন পর ঐশ্বর্য সবাইকে অবাক করে দিয়ে পুনরায় তার কাজে মুভ অন করল। বর্তমানে শুদ্ধর সঙ্গে তার ল্যাবে কাজ করছে ঐশ্বর্য।
মাস তিনেক পরের ঘটনা,
সামনে নির্বাচন বিধায় একটু বেশিই ব্যস্ত সময় কাটছে সায়নের। কখন ফিরে, কখন যায়, বলা মুশকিল। কদিন যাবত বাড়িতেও খাওয়া-দাওয়া করে না। সারাদিন পড়ে থাকে পার্টি অফিসে নতুবা শুদ্ধর ভাড়া নেওয়া সেই ফ্ল্যাটে। বর্তমানে ওখানে তার দলের ছেলেপুলেরা থাকে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ছেলেপুলে নিয়ে প্ল্যান অনুযায়ী এগোচ্ছে সে। ভোট আদায় করতে যা করা লাগে করছে। কারণ এ শহরে মেয়র হবে। জনসাধারণের পাশে দাঁড়াবে। নিজের শহরকে নিজের মতো করে সাজাবে। এ শহরের নানান পেশার মানুষের ভোগান্তি কমাবে। তবে যেভাবে ভাবছে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে আরো পথ হাঁটতে হবে। তার আগে তাকে বিপুল ভোটে জিতবে হবে। জেতার জন্য মানুষের কাছে যেতে হবে। তাদের মন জয় করতে হয়। মন জয় করলে না ভোট পাবে সে।
কিন্তু এগুলো এত সোজা না। সে যেভাবে দাপটের সাথে এ অবধি এসেছে তাতে প্রতি ধাপে ধাপে অনেক শত্রু বাড়িয়েছে। আর বাংলা প্রবাদে আছে দৃশ্যমান শত্রুর থেকে গোপনের শত্রু বেশি ভয়ংকর। কিন্তু চৌধুরীর পুত্ররা বুঝলে তো? তারা
তো ভয় পায় না। বরং সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এতদিন যেভাবে দাপিয়ে দেখিয়ে বেরিয়েছে এখনো তাই। কিন্তু মনে রাখা উচিত শত্রুকে কখনো দুর্বল ভাবতে নেই। শত্রু ক্ষমতাবান না হলেও শত্রু। আর শত্রুর কাজ বিধ্বংসী থাবা মারা। তারা মূলত থাকে সুযোগের অপেক্ষায়। আর সুযোগ পেলেই বিষদাঁত বসিয়ে বিষটুকু ঢেলে দেয়। আর এর জলজ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে আবু সিদ্দিকের কথায় ধরা যাক, রাজনৈতিক ক্ষমতা হারিয়ে তার অবস্থা এখন ঢোঁড়া সাপের মতো। না আছে বিষদাঁত আর না বিষ তবুও ফণা তুলতে ছাড়ছে না সে। পূর্বের মতো এখনো সায়নকে অপদস্ত করার ধান্দায় আছে।
সায়নও জেনে বুঝে হাসিমুখে সহ্য করছে কারণ ওই মানুষটার হাত ধরেই রাজনীতির মাঠে পা রেখেছিল। অনেক কিছু শিখেওছিল। কেন জানি কৃতজ্ঞাবোধ থেকে বার বার ছাড় দিচ্ছে। কিন্তু…কিন্তু তার ধৈর্য নির্ভর করে মুডের উপর। এখন ছাড় দিচ্ছে লিমিট ক্রস করলে তাকেও ক্রস সময় লাগবে না তার। রাজনীতির অবস্থা দেখে এ বছর সাধারণ মানুষজনও নির্বাচন নিয়ে চিন্তিত। আর সময় এগোচ্ছে একের পর ঝামেলা হতেই আছে। একদল পাতিনেতা ইচ্ছে করে অশান্তি সৃষ্টি করছে। নিজেরা ঝামেলা করে এর ওর গায়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। আর লোকমুখে শোনা যাচ্ছে মেয়রের পদে দাঁড়াচ্ছে তিনজন, তারা হলো শাহরিয়ার সায়ন, রবিউল কাউসার, কনক আলী। এই কনক সিদ্দিকের সাবেক সহকারী। বেশ কিছুদিন দেশের বাইরে থেকে ফিরেছে
নির্বাচন করার আশায়। সায়নের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই সে নিজ কাজে ব্যস্ত। তবে তার মাথাব্যথার কারণ হতে যাচ্ছিল অর্কের বাবা।
যদি উনি উপর মহল থেকে আসা লোভনীয় অফারে নির্বাচনে দাঁড়াতেন।শুধু সায়নকে থামানোর জন্য একদল উনাকে অফার করে যাচ্ছিল।বিনিময়ে উনাকে শুধু সায়নের বিপক্ষে নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে। কারণ তাদের মতে বর্তমানে সায়নের দল ভারী। অর্কের বাবা নির্বাচনে দাঁড়ালে পারিবারিক চাপ কিংবা বোনের সংসার বাচাতে সায়নকে থামতেই হবে। সবাই জানে চৌধুরীর পুত্ররা বোনদের জন্য কলিজা কেটে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু আশার কথা, অর্কের বাবা কোনোভাবেই রাজি নয় রাজনীতিতে জড়াতে। উনি বরাবরই শান্তিপ্রিয় মানুষ। এসব ঝামেলা এড়াতে সুযোগ বুঝে উনারাও দেশ ছেড়েছেন গতকাল মধ্যরাতে। নতুন আত্মীয়দের সঙ্গে ঠোকাঠুকির
ইচ্ছে নেই উনাদের। উনাদের দেশ ছাড়ার ঘটনা জানার পর শারাফাত চৌধুর সায়নকে ফোন করে ডাকলেন। একটেবিলে বসে খেলেন।
উনার অভ্যাস খাওয়ার আগে ছেলেদেরকে বকাবকি করেন না। যত বকাবকি করার খাওয়ার পর। আজও তিনি তাই করলেন, খাওয়ার পর সায়নকে নিজের পাশে বসিয়ে সুন্দর করে বুঝালেন রাজনীতির মধ্যে না জড়াতে। আলাদা অফিস করে দিবেন, নিজের হাতে কাজও শিখিয়ে দিবেন তবুও যেন এসবে না জড়ায়। আগে একা ছিল এখন স্বর্ণের কথা ভাবতে হবে। এখন দুজন আগামীতে তিনজন হবে। একটা পরিবারকে সুস্থ পরিবেশ দিতে হলে এসবে জড়ানো যাবে না। পূর্বের কথা বাদ এখন সরে আসুক।
রাজনীতি করলে কারো ভবিষ্যত সুন্দর হয় না। বরং দিনশেষে যা হয় তা হলো অপমৃত্যু। এক গালে হাত রেখে সায়ন বাবার কথা মন দিয়ে শুনল, ভাবল, তারপর হাঁক ছেড়ে স্বর্ণকে কাছে ডাকল। তারপর সবার সামনে জিজ্ঞাসা করল,
-‘আমাকে নিয়ে বা আমার কাজ নিয়ে তোর সমস্যা আছে? ভেবে বল।’
-‘হঠাৎ একথা?’
-‘ যা জানতে চাচ্ছি উত্তর দে।’
-‘রাজনীতি করো জেনে বুঝেই তো সম্পর্কে জড়িয়েছিলাম। নতুন করে কোনো সমস্যা দেখছি না। তাছাড়া সবাই যদি সাধারণ পেশা বেছে নেয় তাহলে রিস্কিগুলো কে নিবে? ভবিষ্যতের কথা যদি বলো তাতেও সমস্যা নেই। কারণ খুব বেশি হলে বিধবা হবো,, এছাড়া আর কিছু না। কাঁটার পথ হাঁটতে গেলে কাঁটার ভয় পাওয়া কি সাজে? সাজে না, ক্যারি অন।’
স্বর্ণের অকপটে বলা কথায় সকলে কথা ভুলে গেলেও সায়ন ঠোঁটে হাসি নিয়ে নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইল তার স্বর্ণকোমলের দিকে। অগাধ বিশ্বাস ছিল তার স্বর্ণ এমনই জবাব দেবে। তাছাড়া তাকে যদি জিজ্ঞাসাও করা হয় চৌধুরী বাড়িতে কেউ তোমার মন পড়তে পারে? গর্ব করে, দম্ভ নিয়ে
সিনা টান করে বলবে তার ভাই শুদ্ধ আর সহধর্মিণী স্বর্ণ তার মন পড়তে পারে। এরা দুজন সঙ্গে থাকলে সে দূর্গম পথও অতিক্রম করতে পারবে।
শারাফাত চৌধুরী আর কিছু বলতে পারলেন না দেখে উঠে চলে গেলেন।
সায়নও কনকের ফোনকল পেয়ে স্বর্ণকে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে বেরিয়ে গেল।
পার্টি অফিসের কাছে যেতেই দেখল আজমসহ বেশ কজন ছেলেপুলো স্ট্যাম্প হাতে দাঁড়িয়ে আছে। রবিউলকে নাকি মেরে ধরে খোঁড়া করবে।
সায়নও বুঝল রবি কিছু একটা করেছে যার কারণ আজম রেগে গেছে। সে পুরো ঘটনা শুনে বুঝল রবি নাকি সায়নের নামে মিথ্যা কথা রটাচ্ছে। সায়ন-স্বর্ণ নাকি আকাম কুকাম করতে গিয়ে ধরা পড়েছে তাই বাড়ির লোকরা তাড়াহুড়ো করে তাদের বিয়ে পড়িয়েছে। এমন আরো নোংরা কথা। সব শুনেও সায়ন আপাতত মাথা গরম করল না। তবে ছেলেদের শান্ত হয়ে বসতে বলল। তারা বসলে সে বলল,
-‘আলোচনা থেকে সমালোচনার সৃষ্টি। আমাদের সংস্পর্শে তিন ধরনের মানুষের বসবাস। একদল, যতক্ষণ না স্বার্থ ফুরাবে ততক্ষণ জানের বন্ধু, এরপর স্বার্থ ফুরালে পাখি ফুড়ৎ। দ্বিতীয়দল, যতক্ষণ তোর হাতে ক্ষমতা থাকবে ততক্ষণ তেল মেরে ফুলিয়ে রাখবে। এরপর ক্ষমতার দাপট শেষ তারাও উধাও। সর্বশেষ যে দলটার কথা বলব, এরা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি নিমকহারাম। এরা প্রথমে ছায়াসঙ্গী হয়ে কাছ ঘেঁষবে, মিশবে, বিশ্বাস অর্জন করবে একসাথে থাকবে, খাবে, ঘুরবে আবার সুযোগ বুঝে অন্য কোথাও গিয়ে ঠিকই সমালোচনার ঝড় তুলবে। বোঝার উপায়ই রাখবে না, এ সেই ব্যক্তি যে শুভাকাঙ্ক্ষী সেজে এতদিন তোরই ঘাড়ে বসে তোর গাছের কাঁঠাল ভেঙে খেয়ে আবার তোরই গায়ে বমি করছে।’
এইটুকু বলে সায়ন থামল। প্যান্টের পকেট থেকে চুইংগাম বের করে চিবাতে চিবাতে এদিক ওদিক তাকাল। আজম মন দিয়ে কথা শুনল। তারপর বলল,
-‘কিন্তু যা করি নাই তাই নিয়া ক্যান কথা হইব ভাই? আমরা রবির..!’
আজমকে থামিয়ে দিলো সায়ন। ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
-‘ সমালোচকের কাজ সমালোচনা করা। তুই যতই ভালো কাজ করিস তারা তোর সমালোচনা করবেই। তারা মূলত আসেই খুঁত ধরতে। যখন খুঁত পাবে না তখন অতীতে থাবা বসাবে। দুর্বলতা খুঁজবে। দুর্বলতার ধার ধরে তোকে টেনে নিচে নামানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু,,,কিন্তু এদের পাত্তা দেওয়া যাবে না। পাত্তা দিলেই এতদিনের টার্গেট লক্ষ্যচ্যুত!’
-‘তাহলে কি করব ভাই?’
-‘কি করবি?’
-‘হুম।’
একথা বলতে বলতে সায়ন এবার আজমের সামনে দাঁড়াল। বলল,
-‘ঠিক এভাবে আমার মতো প্রতিপক্ষের মুখোমুখি দাঁড়াবি। চোখে চোখ
রেখে ঈগল-দৃষ্টিতে তাকাবি। তারপর বাম হাত তার চোখের সামনে তুলে মধ্যমা আঙুল দেখিয়ে বলবি, ‘মাঠ প্রস্তুত, এসো খেলব! মাঠ অর খাট সিদ্ধান্ত তোমার বাট খেলা হবে।’
সায়নের কথা শুনে এতক্ষণ যারা রাগে ফুঁসছিল তারাও হেসে ফেলল।
সিরিয়াস মুহূর্তে হাসিয়ে ছাড়ে এই লোক। সত্যি বলতে, ঠিক এই কারণে তারা শাহরিয়ার ভাইকে এত পছন্দ করে। ভালোবাসে।
এদিকে অর্কের বাবা-মা চলে যাওয়ায় বাড়িটা ফাঁকা। এত বড় বাড়িতে প্রাণ বলতে শখ আর অর্ক।
পরীক্ষার পর বেশ কিছুদিনের ছুটি পেয়েছে শখ তাই আজ যাবে চৌধুরী নিবাসে। গতরাতে অর্ক বাড়ি যাওয়ার কথা বলার পর থেকে ভীষণ খুশি সে। যতই বাপের বাড়ি কাছে হোক, এক শহরে হোক, কেন জানি বাড়ি যাওয়ার কথা উঠলেই মন ভালো হয়ে যায়। ইচ্ছে করে বলামাত্রই ছুটে গিয়ে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে। মাকে জড়িয়ে ধরে মায়ের শরীরের স্নেহময়ী, মমতাময়ী প্রিয় গন্ধটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে টেনে নিতে৷ কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব না।
তবুও আফসোস নেই কারণ ভাগ্য করে শ্বশুরবাড়ি পেয়েছে। কিছু বলার আগে সবকিছু পেয়ে যায়। সেটা হোক খাবার-দাবার, পোশাক-আশাক কিংবা প্রসাধনী। তাকে মন খারাপ করে থাকতে দেখলে শ্বশুর-শাশুড়িও লেগে পড়ে মন ভালো করতে। কাছে টেনে, পাশে বসিয়ে, হাসির গল্প শোনান।
কি খাবে, কি পছন্দ, যেসবেও খেয়াল রাখেন। এর কারণ হচ্ছে বাড়িতে
বয়সের দিক থেকে সবার ছোট শখ। তাও বাড়ির একমাত্র পুত্রবধু। খুব পছন্দ করে তাকে বউ করে এনেছে তার শ্বশুর-শাশুড়ি। এজন্য বোধহয়
ভালোবাসতে কমতি রাখেন না। তবে উনারা ভালোবাসলেও এ বাড়িতে
আসা যার হাত ধরে এসেছে, সে এখনো মানুষটা অনেক পিছিয়ে আছে।
তার উপর আজকাল ব্যস্ত সময় পার করছে৷ সকালে নাস্তা করে বের হয় সারাদিন পর রাতে এসে কোনোমতে খেয়ে একটু রেস্ট করে চলে যায়। সময় দিতে না পারায় সরিও বলে। তার খারাপ লাগলেও হাসিমুখে মেনে নেয়। কারণ শুদ্ধকে দেখে জানে একজন সায়েন্টিস্ট কেমন হয়। তাদের সময় কীভাবে কাটে। সে অবশ্য কথা দিয়েছে একটু ফ্রি হলে তাকে নিয়ে
দেশের বাইরে ঘুরতে যাবে। ছুটির কদিন দিন বাড়ি থেকে ঘুরে এলে তার ভালো লাগবে। তাই পতিমহাশয়ের কথায আজকে যাচ্ছে বাবার বাড়ি।
অবশ্য অর্ক নিজেই ড্রপ করে দিবে জানিয়েছে। বেশ ক’দিন পর বাড়িতে
যাচ্ছে তাই ভাবল নাড়ু বানিয়ে নিয়ে যাবে। সাম্য, সৃজন শীতল খুব নাড়ু পছন্দ করে। বাড়িতে পা রাখতে না রাখতে আগে জিজ্ঞাসা করবে,
-‘আপু, নাড়ু আনোনি?’
তারপর শুরু হবে হাতাহাতি, কাড়াকাড়ি, একচোট মারামারি হলেও হতে পারে। ভাই-বোনদের কথা মনে করে হাসল। তারপর কাজ গুছিয়ে গেল রেডি হতে। চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে দৃষ্টি পড়ল আয়নার প্রতিবিম্বের দিকে। তার ঠোঁটের কাছটা একটু সামান্য ফুলে আছে। ঠোঁট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকাল ওয়াশরুমের বন্ধ দরজার দিকে। পানির শব্দ আসছে। অর্ক শাওয়ার নিচ্ছে। শাওয়ারের কথা মনে হতেই সে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মিটিমিটি হাসল। কেন জানি মন থেকে সরাতে পারে না সেদিনের সেই ঘটনা। আসলে ঘটনাটা ওদের বিয়ের দু’সপ্তাহ পরের ঘটনা। সেদিন সকালে ওরা শাশুড়ি ও বউমা মিলে নাস্তা তৈরি করছিল। সে শাশুড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ডিমের খোসা ছাড়াচ্ছিল। তখন তার শাশুড়ি ফল কাটতে কাটতে বললেন,
-‘ বিয়ের আজ দুই সপ্তাহ। এতগুলো দিনে একদিনও চুল ভেজা দেখলাম না। কোনো সমস্যা? সমস্যা হলে বল, আমি বলেছি না, আমাকে আগে ফ্রেন্ড ভাববে তারপর শাশুড়ি। ‘
উনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন বুঝতে কষ্ট হয় নি তার৷ কি বলবে, কি বলা উচিত বুঝতে না পেরে লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। এরপর কাজের বাহানায় কোনোমতে পালিয়ে বেঁচেছিল। সেদিনের পর আকার ইঙ্গিতে আরো কিছু বলতেন। ছেলের সঙ্গে প্রেম করতে পরামর্শ দিতেন। সেসব বলতে গিয়ে নিজে হো হো করে হেসেছেন। কোনোমতে হাসি থামিয়ে পুনরায় বুঝিয়েছেন সহজ হতে। এদিকে উনার ছেলে ভদ্র মহাশয়। বউয়ের প্রতি সব রকম খেয়াল থাকলেও আগ বাড়িয়ে কাছে আসে না। তাহলে মেয়ে হয়ে সে কীভাবে এগোবে? কিন্তু শাশুড়ির এমন কথা শুনলে লজ্জায় কুঁকড়ে গেলেও কিছু বলতে পারে না। তাই একদিন বুদ্ধি করে সকালে গোসল সেরে বের হতেই অর্কের মুখোমুখি পড়ে। সে ভেবেছিল অর্ক এখন উঠবে না। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ততক্ষণে অর্ক উঠে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ছিল। ধরা পড়ে থতমত খেয়ে কিছু বলার শব্দ খুঁজে পাচ্ছিল না। তাকে লজ্জায় লাল হতে দেখে অর্ক কিছু একটা আন্দাজ করেছিল। নিজেও মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলেছিল,
-‘মম কিছু বলেছে, তাই না?’
-‘ ন..না তেমন কিছু না।’
-‘বুঝেছি। তবে তুমি পারমিশন দিলে তোমাকে সাহায্য করতে পারি।’
-‘কি সাহায্য? ‘
-‘তুমি চাইলে রোজ সকালে তোমার ফরজ গোসলের কারণ হতে পারি।’
অর্কের মুখে একথা শুনে তার ইচ্ছে করছিল মাটির নিচে ডুকে যেতে।
তারপর থেকে অর্ক সুযোগ পেলেই একটু আধটু দুষ্টুমি করতো। কখনো কখনো লজ্জা দিয়ে খুব হাসত। তারপর কিভাবে কিভাবে যেন সম্পর্কটা সহজ হয়ে এলো। একটু একটু করে মানুষটাকে বেশ ভালো লাগতে শুরু করল। তার যত্ন, আগলে রাখা, ছোটো খাটো ব্যাপারে খেয়াল রাখা সব
মিলিয়ে দুর্বল হতেই হলো। এভাবে আরো কিছুদিন পর এক রাতে হঠাৎ গভীরভাবে ছুঁয়ে দেওয়ার আবদার করল। লজ্জায় মরি মরি হলেও সেও বাঁধা দেয় নি। অতঃপর ভালোলাগায় ভালোবাসায় দিনগুলো কাটছে।
-‘আরে শীতল রাণী যে, এত রোদের মধ্যে এখানে কেন, বাড়ি যাবে না?’
হঠাৎ কারো মুখে নিজের নাম শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল শীতল। পরনে কলেজ ড্রেস। কাঁধে কলেজ ব্যাগ। হাতে আধখাওয়া কোণ আইসক্রিম।
সে আপাতত দাঁড়িয়ে আছে ফটোস্ট্যাটের দোকানের সামনে। কিছু নোট ফটোকপি করতে হবে। পাশে দাঁড়ানো এই মানুষটাকে চিনে সে। অনেক আগে এ লোকটাকে সায়ন ভাইয়ার সঙ্গে দেখেছে। তবে নাম? হ্যাঁ নামটা বোধহয় কনক নতুবা রনক। এই দুই নকের ভেতর যে কোনো একটা নক হবে তা সিওর। সে যে নাম গুলিয়ে ফেলেছে বুঝতে দিলো না কনককে। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে জবাব দেওয়াটা ভদ্রতা। তাই সুন্দর করে জবাব দিলো,
-‘এইতো এই নোটগুলো ফটোকপি করে চলে যাব ভাইয়া।’
-‘ওহ। আচ্ছা শীতল তোমার ফ্রেন্ড কিয়ারা না কি যেন নাম ও কই? ওকে দেখি না কেন? ওর খোঁজ জানো?’
কিয়ারার কথা উঠায় ধপ করে শীতলের হাসিটুকু মুছে গেল। ছোট্ট করে উত্তর দিলো,
-‘না।’
-‘আমি জানি। তবে জানতে চাইলে সাইডে এসো। সব কথা সব জায়গায় বলা যায় না।’
একথা শুনে শীতল বিষ্ময় নিয়ে তাকাল। তারপর কনকের পিছু পিছু একসাইডে দাঁড়ালে কনক শুরু থেকে পুরো ঘটনাটুকু শীতলকে জানাল। সব শুনে শীতলের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। পরমুহূর্তে ওর মনে হলো এ লোকটা মিথ্যা বলতে পারে। হতেও পারে অন্য কোনো চাল। তাই
সব শুনেও সে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তাকে চুপ দেখে কনক পুনরায় জানাল কিয়ারার কথা নাকি শুদ্ধ, সায়ন আগে থেকে জানত, ইচ্ছে করে তাকে জানায় নি। সে মিথ্যা বলছে না, বিশ্বাস না হলে বাড়িতে গিয়ে যেন
সায়নকে জিজ্ঞাসা করে।
শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৫
একথা শুনে শীতল যেন বাকহারা হয়ে গেল। যদি এটা সত্যিও হয়, তবে ইয়াসির নামক লোকটাকে যতটুকু ঘৃণা করতো তার থেকে দশগুন বেশি ঘৃণা করবে। কারো মৃত্যুকামনা নাকি করতে নেই কিন্তু এ লোকটার জন্য আল্লাহর ত্রিশটা দিনই সে মৃত্যু কামনা করবে। এর আগে তাকে সায়নের মুখোমুখি হতে হবে। মনে মনে এসব ভেবে শীতল আর দাঁড়াল না হাতের আইসক্রিম ছুঁড়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির পথে রওনা হলো। কোনোমতে রিকশায় উঠে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।তার অশ্রুভর্তি চোখের তারায় ভেসে উঠল প্রিয় বান্ধবীর হাসিমাখা মুখ। ভেসে উঠল কতশত জমানো স্মৃতি। তার জন্য কিয়ারার এ হাল মানবে কিভাবে সে? কিভাবে সইবে এই কঠিন সত্য?

Next part kobe asbe?