শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮৭
নূরজাহান আক্তার আলো
শুদ্ধ কেবিনে পা রাখতে যাবে তখনই মধ্যবয়সী একজন নার্স দ্রুতপায়ে এগিয়ে এলেন। হাতের বন্ড পেপার সপাটে মেলে ধরে তাড়া দিলেন সই করার জন্য। বন্ড পেপার দেখে কেন জানি তার হাতটা মৃদুভাবে কাঁপছে।
একঝাঁক কষ্টরা বুকে দলা পাকিয়ে জমাট বেঁধে আছে। তবুও আর সময় নষ্ট না করে পাথরের মতো শক্ত হয়ে বন্ডে সই করে দিল সে। নার্স পেপার হাতে ছুটলে শুদ্ধও দ্রুত কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল, শীতল পেট চেপে ধরে গুমরে গুমরে কাঁদছে। কারো উপস্থিতি বুঝে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখামাত্রই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে কোনোমতে পেট আঁকড়ে ধরে উঠে বসল।
তাকে উঠতে দেখে শুদ্ধ দ্রুত গিয়ে বুকে আগলে নিলো। যত্ন করে মাথায় হাত বুলালেও তার মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হলো না। তখন শীতলই ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
_’পে..পেটে…বাবু।’
পেটের অসহ্য যন্ত্রণায় কুঁজো হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। তবুও দুই হাতে পরম মমতায় নিজের গর্ভকে রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তার কথাতে বুঝতে বাকি নেই তাকে সবটা জানানো হয়েছে। মেয়েটা বরাবরই বাচ্চা পাগল। সুন্দর বাচ্চাদের দেখলে চেপে ধরে চুমু-টুমু খেয়ে, গাল চটকে একাকার করে। সেই মেয়েই নিজের বাচ্চাকে টিকে রাখতে পারছে না৷ পরিস্থিতি সামাল দিতে শুদ্ধ আগে নিজেকে সামলে নিলে। তারপর শীতলের চোখ মুখে দিয়ে বেশ নরম সুরে বলল,
—’ কাঁদে না। শান্ত হও, আবা..আবার হবে।’
একথা শুনে শীতল কাঁদতে কাঁদতে শুদ্ধর পায়ের কাছে বসে পড়ল। খুব ভালো করেই বুঝল শুদ্ধও ডাক্তারের মতো অ্যাবরশনের কথায় তাকেই বলবে। যথাসাধ্য বোঝাবে অ্যাবরশনের করানোর জন্য। কিন্তু সে সেটা কিছুতেই মানতে পারছে না। বুঝতে পারছে না এসব কোন ভুলের মাসুল দিচ্ছে। জীবন তাকে নিয়ে এ কোন খেলায় মেতেছে? অসহায় সুরে শব্দ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
_’আমার শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিতে দিয়েন না। ওদের কে বারণ করুন। আমি কিছুতেই অ্যাবরশন করব না। ও তো আমাদের অংশ, আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন, আমাদের বৈধ সম্পর্কের পবিত্র প্রাপ্তি, তাহলে ওকে কেন মেরে ফেলতে হবে? কেন আমার থেকে আলাদা করে দিতে হবে?’
শীতলের আর্তনাদগুলো শুদ্ধের বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে শুকনো ঢোক গিলে শীতলকে বাহুডোর আগলে নিলো। তারপর শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ভেজা কন্ঠে বলল,
_’ আল্লাহ আবার আমাদের দেবেন….আবারও হবে। কিন্তু আগে তোকে তো বাঁচতে হবে!’
_’না, আমার এটাই চাই, একেই চাই। অ্যাবরশন করালে আমি মরে যাব, সত্যিই মরে যাব। ওদের বারণ করুন। আমি জানি…আমার মন বলছে আমার বাবা আমার সন্তান হয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছে। একবার বাবাকে হারিয়েছে, আর না। একটু রহম করুন আমার উপর। আমি যে আর পারছি না। আর কত? আর কত সহ্য করব আমি!’
শুদ্ধ কথা খুঁজে পেল না। শীতলের মুখটা দুহাতে আগলে ধরে কপালে কপাল ঠেকিয়ে ভাঙা গলায় বলল,
_’তোর কষ্ট হচ্ছে আমার হচ্ছে না? এত পাষাণ ভাবিস আমাকে? আমার রক্ত, আমার অংশ, আমারই আদেশে আজ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে আমার
বুক কাঁপছে না? খারাপ লাগছে না? আমিও ভেতর ভেতর মরে যাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছিস না? অ্যাবরশন না করালে তুই মরে যাবি। তখন কার জন্য বাঁচব আমি? আর কে আছে আমার?’
শুদ্ধর কথা শুনে আচমকা শীতলের কান্না থেমে গেল। সে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইল তার বিশুদ্ধ পুরুষটার দিকে। বিশুদ্ধ পুরুষটাও কষ্ট পাচ্ছে? না, না, এটা হতে দেওয়া যাবে না। পৃথিবী সমান কষ্ট এসে তার বুকে জমা হলেও সে প্রার্থনা করবে তার প্রিয় পুরুষটা সবসময় ভালো থাকে। সুস্থ থাকে। সে শুদ্ধর হাতটা নিজের কপালে ঠেকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পেটে যেমন ব্যথা বুকে তার থেকেও শতগুন বেশি ব্যথা। তখন রুবাবসহ বাড়ির অন্য সদস্যরা উপস্থিত হলো। সিমিন মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। তখন নার্স এসে ইশারা করতেই শুদ্ধ কাঁধ জড়িয়ে ধরে শীতলকে অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে নিয়ে গেল। আসতে গেলে
করুণ চাহনিতে না সূচক মাথা নাড়াল। তার ভয় লাগছে। বড্ড অসহায় লাগছে। অগত্যা শুদ্ধ ডাক্তারকে রিকুয়েষ্ট করায় থাকার অনুমতি পেল।
অতঃপর ডাক্তাররা টুকটাক কিসব করল। শীতল শক্ত করে শুদ্ধর হাত ধরে নিশ্চুপ তাকিয়েই রইল। চোখের কার্নিশ বেয়ে জল গড়াতে গড়াতে ধীরে ধীরে তার চোখ জোড়া বুঝে এলো। তারপর আর কিছু মনে নেই।
ডাক্তারদের মাথার উপরে থাকা টিভির মতো স্কিণে কিছু একটা শুদ্ধকে দেখিয়ে জানালেন, শীতলের ভ্রূণের আকার খুব একটা বড় না। তবে ব্যথার তীব্রতা বেশি। তাই উনারা চাচ্ছেন পেটে ছোট ছিদ্র করে যন্ত্রের মাধ্যমে টিউব থেকে ভ্রূণটি বের করে আনতে। ভাগ্যিস টিউব ফেটে রক্ত ক্ষরণ হয় নি, যদি হতো তাহলে ওপেন সার্জারির করতে হতো। শুদ্ধ চুপ করে সব শুনল। শীতলের যা অবস্থা তাকে পুরোপুরি অজ্ঞান করে কাজ করা হচ্ছে। যাতে গভীর ঘুমে থাকে এবং কোনো ব্যথা অনুভব না করে।
ভ্রূণটিকে যখনই টেনে বের করল শুদ্ধ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। তারপর
শীতলের দিকে একবার তাকিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো। দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে অসাড় হয়ে বসে রইল। অন্যরা এসে বুঝ দিলো। কত কী বলে বোঝাল। সবই চুপচাপ শুনল শুদ্ধ। বেশ কিছুক্ষণ পর অপারেশন থিয়েটারের দরজার উপরে থাকা লাল বাতিটা নিভে গেল। ওটি থেকে দুজন ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। উনাদের দেখে শুদ্ধ উঠে এগিয়ে গেল।
তার মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা থমকে যাচ্ছে। শরীরও অসাড় হয়ে আসছে।
ডাক্তার শুদ্ধকে দেখে মাস্ক খুলে ক্লান্ত স্বরে বললেন,
-‘শি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার, বাট আই এম সরি মিস্টার শোয়াইব। উই কুডন্ট সেভ দ্য বেবি।’
শুদ্ধ মলিন হাসল। তার কানে শুধু ‘আই এম সরি’ শব্দটকুই প্রতিধ্বনির মতো বাজতে লাগল। এক প্রিয়কে বাঁচাতে গিয়ে সে আরেক প্রিয়কে চিরতরে হারিয়ে ফেলল। ভেবেছিল আজকের দিনটা তার জন্য শুভ।
বছরের পর বছর কষ্ট করে নিজের তৈরি আবিষ্কারে সফলতা এসেছে। অবশ্যই আজকের দিনটা অন্যতম। কিন্তু মোটেও না, আজকের দিনটা তার জীবনের সবচেয়ে জঘন্য দিস। এমন দিন, ক্ষণ শত্রুও জীবনেও না আসুক। এমন অভিজ্ঞতা কারো না হোক।
অতঃপর কয়েক ঘন্টা পর শীতলকে কেবিনে নেওয়া হলো। অবচেতন এখনো। কেবিনে নেওয়া মাত্র কেবিনের সামনে পুলিশ পাহারায় থাকল। বাড়ির সদস্যরা একে একে দূর থেকে দেখলেন প্রতিনিয়ত জীবন নিয়ে যুদ্ধ করা আদুরে মেয়েটাকে। যে পুতুলের মতো আদর-যত্নে বড় হলেও বর্তমান পরিস্থিতি বয়সের তুলনায় বড় করে তুলেছে। অনেকক্ষণ হলো মাগরিবের আজান হয়েছে। একজন পুলিশ ভিড় না করে বাসায় যেতে বললেন। উনার কথায় সিতারা আর শুদ্ধ থাকল হসপিটালে। শারাফাত চৌধুরী আর রুবাব থাকতে চাইলে পুলিশ এলাও করলেন না। অগত্যা চোখের জল ফেলতে ফেলতে উনারা বাড়ির দিকে রওনা হলেন। শুদ্ধ আর সিতারা কেবিনের সামনেই বসে রইলেন। শুদ্ধ কিছু একটা ভেবে
মায়ের দিকে তাকাল। জানাল, উনি যেন এখানেই থাকেন সে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে এক্ষুণি চলে আসবে। সিতারা সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালে শুদ্ধ ডাক্তারের চেম্বারের দিকে গেল। যেতে যেতেই কিছু হিসাব মিলিয়ে নিলো।
সাধারণত দেড় মাসের ভ্রূণ কোনো পূর্ণাঙ্গ মানব শিশুর অবয়ব পায় না। এটি মূলত রক্ত জমাট বাঁধা একটি মাংসপিণ্ডের মতো দেখায়।মেডিকেল প্রটোকল এবং আইনি দিক থেকে দেড় মাসের ভ্রূণকে স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয় না। মেডিকেলের নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এগুলোকে বায়োলজিক্যাল ওয়েস্ট হিসেবে বিশেষ প্রক্রিয়ায় নষ্ট করে ফেলে। কারণ এত ছোট ভ্রূণ দেখলে বাবা-মায়ের মানসিক ট্রমা বাড়তে পারে, এজন্যই মূলত ডাক্তাররা এটি দেখাতে চান না। কিন্তু শুদ্ধ দেখবে।
যেভাবেই হোক একবার হলেও তার অংশকে ছুঁয়ে দেখবে। এসব ভেবেই
সে হন্ন হয়ে শীতলের সার্জারি করা ডাক্তারকে খুঁজে বের করল। ডাক্তার পেশেন্ট দেখে বাসায় যাওয়ার তৈরি হচ্ছিলেন। শুদ্ধ কথা বলতে চাইলে বিরক্ত হলেও চেপে গেলেন। শুদ্ধ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে খুব কাতর স্বরে অনুরোধ করল শেষবারের মতো তার সন্তানকে দেখতে চায় সে। তার সন্তানের অবয় না হোক, মানব গঠনের আকার না থাকুক তবুও সে
দেখবে। একটু ছুঁয়ে দেখবে এবং নিজে হাতে দাফন করবে। মধ্যেবয়সী ডাক্তার তার কথা শুনে চশমা খুলে হাতে নিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন,
_’প্রথম সন্তান ছিল?’
_’জি।’
_’ ইয়াংম্যান, সবই বুঝছি। কিন্তু হসপিটালের নিয়ম অনুযায়ী যা চাচ্ছেন দেওয়ার নিয়ম নেই।’
_’ ও তো বেঁচে নেই। হেলায় ফেলে দিবেন। এরচেয়ে আমার আংশ নাহয় আমাকেই দিন, প্লিজ।’
ডাক্তার কয়েক সেকেন্ড শুদ্ধর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কেন জানি কাতর সুরে বলা কথাটা ফেলতে পারলেন না। নার্সকে ডেকে নিচু স্বরে আদেশ করলেন ভ্রূণটা আনতে। নার্স একটা ছোটো কাঁচের জারে ছোট্ট একদলা রক্তাভ মাংসপিণ্ড এনে শুদ্ধর হাতে দিলে। শুদ্ধও কাঁপাকাঁপা হাতে সেটা নিল। দেড় মাসের সেই ছোট্ট অস্তিত্বটি দেখে তার মনে হলো
কেউ কলিজাটা টেঁনে ছিঁড়েছে। এটাই সেই প্রাণ যার জন্য শীতলের এত আকুতি। সে কম্পিত হাতে আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে সেই নরম পিণ্ডটা ছুঁয়ে দেখল। এটাই তার আর শীতলের ভালোবাসার ফল, যাকে হারিয়ে ফেলল। তাকে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডাক্তার সাবধান করে দিলেন এসব কথা কেউ যেন না জানে। শুদ্ধ মাথা নাড়িয়ে জারটি টিস্যুতে মুড়িয়ে নিলো। তারপর ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল। ডাক্তার তার যাওয়ার দিকে একপলক তাকিয়ে নিজেও বেরিয়ে গেলেন। রোজ রোজ কত ঘটনার সাক্ষী হতে হয়। আর মানুষ অভ্যাসের দাস। আগে এসব দেখে খারাপ লাগলেও নিত্যনতুন ঘটনার সাক্ষী হয়ে অভ্যাস হয়ে গেছে।
সিতারা চৌধুরী ওখানেই বসে আছেন। শুদ্ধ একটি ব্যাগ নিয়ে মায়ের পাশে বসল। মা ও ছেলে রনীরাবতার মাঝেইবেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। শুদ্ধকে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখে সিতারা হঠাৎ ছেলের কাঁধে রাখতেই শুদ্ধ তাকাল। তার চোখ জোড়া জলে টইটুম্বুর। চোখের পলক ফেলতে না চাইলেও ঝরঝর করে অশ্রু ঝরে গেল। মায়ের সামনে কান্না করা যায় নাকি? সে পালিয়ে বাঁচতে দ্রুত চোখ মুছে উঠে দাঁড়াতে গেলে সিতারা হাত ধরে থামিয়ে দিলেন। ছেলের বুকে, পিঠে, মাথায় মমতার হাত বুলাতে বুলাতে ব্যাকুল স্বরে বললেন,
_’কষ্ট পাস না বাবা। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
শুদ্ধর মনে পড়ে না সে মায়ের সামনে শেষ কবে কেঁদেছে। এতদিন পর! এতবছর পর, আজকে এ মুহূর্তে নিজেকে বড্ড অসহায় বোধ করল সে। এদিকটায় কেউ আসছে না দেখে মায়ের পায়ের কাছটায় হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। মুখ লুকালো মমতাময়ী মায়ের কোলে। চোখের পানি ঝরঝরিয়ে ঝরতে লাগল। শক্তমনের ছেলেটাকে এভাবে কাঁদতে দেখে সিতারা দিশা হারিয়ে ফেললেন। নিজেও কাঁদতে কাঁদতে পাগলের মতো ছেলের বুকে, মাথায়-পিঠে একবার করে হাত বুলাতে লাগলেন। মায়ের সামনে ছেলে কাঁদলে কোনো মা শান্ত থাকতে পারে? শুদ্ধ বরাবরই উনার বাধ্য ছেলে।
অথচ সেই ছেলে আজ ভেঙে পড়ছে। না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে ছেলেটা।
শুদ্ধ এতক্ষণ নিজেকে সামলে নিলেও কেন জানি আর পারল না। ধৈর্য
হারা হলো। সহ্যশক্তির মাত্রা অতিক্রম করে বাচ্চাদের মতো মায়ের হাত আঁকড়ে ধরল। তারপর মায়ের কোলে মুখটা লুকিয়ে কান্নাভেজা স্বরে বিরবির করে বলল,
-‘শুনেছি, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভেদ্য আশ্রয় নাকি মায়ের শাড়ির আঁচল! আম্মু, ও আম্মু, আজ তোমার ওই আঁচলটা দিয়ে আমায় একটু আড়াল করো না, প্লিজ! তোমার আঁচলের নিচে আমাকে এমনভাবে লুকাও যেন বাইরের কেউ আমার কান্নার শব্দ শুনতে না পায়, কেউ যেন আমার নিঃস্ব হওয়া দেখতে না পায়। আম্মু…আম্মু আজ এই হাতে…এই হাতে আমি ওকে স্পর্শ করেছি। ও আমার অংশ, আমাদের সন্তান ও, আমার আদেশেই ওকে মেরে ফেলা হয়েছে৷ আমার কি দোষ, বলো? ও এভাবে কেন এলো? এলোই যখন এভাবে কেন? ও তো কেবল রক্তপিণ্ড মাত্র, তবুও আমার এত কষ্ট হচ্ছে কেন? কেন এই ব্যর্থতাটুকু সইতে পারছি না আমি? কেন আজ যুক্তি দিয়েও নিজেকে সামলাতে পারছি না। তোমার শক্ত-সমর্থ ছেলেটা যে আজ তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে যাচ্ছে আম্মু, দোহায় লাগে সেটা এই নিষ্ঠুর পৃথিবীকে বুঝতে দিও না। বুঝতে দিও না শুদ্ধরাও ভাঙে, শুদ্ধদেরও কষ্ট হয়, আপনজন হারিয়ে শুদ্ধদেরও বুকের ভেতরটাও রক্তাক্ত হয়, অসহ্য যন্ত্রনায় কাতর হয়। আজ তোমার ছেলে হেরে গেছে আম্মু… গো হারান হেরে গেছে। আজ এ অপূর্নতাটুকু শুদ্ধকে ভেঙ্গে-চুরে চুরমার করে দিয়েছে। শীতলকে বুঝ দিলেও নিজেকে আজ সামলাতে পারছি না আম্মু…একটুও পারছি না…আমাকে একটু লুকিয়ে রাখো আম্মু, প্লিজ একটু লুকিয়ে রাখো!’
শুদ্ধর প্রতিটা কথা সিতারার বুকে গিয়ে বিঁধল। উনি কিছু বলতে চেয়েও পারলেন না। উনার চোখের পানিতে বুকের কাছটা ভিজে একাকার। কি বলবেন? কি করবেন? কি করলে ছেলের বুকের লাভা নিভবে? আজকে সায়ন থাকলে কতই না ভালো হতো। শুদ্ধকে আগলে নিতে পারত। উনি মনে মনে কত করে সায়নকে ডাকলেন। পাজিটা উনার ডাকে সাড়া দেয় না। আম্মু বলে ডাকে না। এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ থেকে শুদ্ধ সোজা হয়ে বসল। দুই হাতে মুখ মুছে নিলো। শীতল ঘুমাচ্ছে রাতে জাগবে বলে মনে হয় না। সে রিসিপশনের গিয়ে আরেকটা কেবিন নিয়ে সিতারাকে রেস্ট
করতে বলল। সে ভালো করেই জানে রুবাব হসপিটালের আশেপাশেই আছে। ফোনকল করে ওপরে আসতে বলে ব্যাগটা নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। তারপর হসপিটাল থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়েই ছুটল বাড়ির পথ
ধরে। জ্যাম পেরিয়ে নার্সারি চোখে পড়লে গাড়িটা থামিয়ে একটা বকুল ফুলের চারা কিনল। তারপর বাড়ির গেট পেরিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করল।
একহাতে ব্যাগ আর অন্যহাতে বকুলের চারাটি নিয়ে এগোলো বাগানের একপাশে। হাঁটু মুড়ে বসে কাঁপাকাঁপা হাতে ছোট্ট করে গর্ত খুঁড়ল। খু্ব সাবধানে, যেন ব্যথা না লাগে সেভাবে ছোট্ট মাংস পিণ্ডটি মাটির গভীরে শুইয়ে দিল। তারপর ঝাপসা চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
_ ‘তোকে বাঁচাতে পারলাম না ডাস্টবিনেও ফেলতে পারলাম না। জীবন্ত অবস্থায় না থাকলি মৃত অবস্থায় অন্তত চোখের সামনে থাক।’
একথা বলে শার্টের হাতায় চোখ মুছল। তারপর কাপড়ে মোড়ানো সেই পিণ্ডটির উপর মাটির দিয়ে দিলো। সামান্য এই কাজটুকু করতে গিয়ে তার মনে হলো মংসপিন্ড নয় নিজের কলিজাটাকেই কবর দিচ্ছে। এই দৃশ্যটুকু অদূরে দাঁড়িয়ে দেখলেন শারাফাত চৌধুরী। মলিন হেসে বললেন,
শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮৬
_’ এক টুকরো মাংসপিণ্ডের জন্য তোমার আজ কত মায়া, কত দরদ! আজ কি তবে বুঝতে পারলে বাবা—সন্তান ভালো হোক কিংবা খারাপ, সুস্থ হোক কিংবা অসুস্থ, প্রতিটা বাবার কাছেই তার সন্তান কলিজার টুকরো। যার অস্তিত্ব এখনো পৃথিবীর আলো দেখেনি, তার জন্যই যদি তোমার বুকটা এভাবে ফেটে যায়, তবে ভেবে দেখো তোমাদের কারো কোনো অমঙ্গল দেখলে আমার এই কলিজাটার কী দশা হয়!’

Next part
প্লিজ আপু এক্সাইটেড হয়ে গেছি, তাড়াতাড়ি বাকি পর্বগুলো দাও
Next
Next part please
Porbo gula eltu taratari dile valo hoy
Next part
Apu next prat aktu taratari dio