Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৪

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪
সুমাইয়া ইসলাম নূর

“শোন ইনায়া… ভালোবাসা এত সহজ কিছু না, যেটা শুধু ‘ভালো লাগে’ বললেই হয়ে যায়।”
ইনায়া চুপচাপ শুনছে।
রিমঝিম তার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলতে লাগল—
“ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে পছন্দ করা না…
ভালোবাসা মানে—কারো হাসিতে নিজের শান্তি খুঁজে পাওয়া।
তার কষ্টে নিজের বুকটা ভারী হয়ে যাওয়া।”
একটু থেমে আবার বলল—
“যার জন্য তুই নিজের অহংকার ছেড়ে দিতে পারবি,
যার পাশে থাকতে গেলে তোর ভয় লাগবে না, বরং শান্তি লাগবে…
যার সাথে কথা না বললে দিনটা অসম্পূর্ণ মনে হবে—

ওটাই আসল ভালোবাসা।”
ইনায়া মুগ্ধ হয়ে শুনছে।
রিমঝিম আবার বলল—
“আর সবচেয়ে বড় কথা জানিস?
ভালোবাসা কখনো জোর করে হয় না…
না চাইলে, না বুঝে—কাউকে ভালোবাসা যায় না।”
ইনায়ার চোখে তখন একটু অন্যরকম ভাব।
“তুই বললি, রুদ্র অন্য কাউকে ভালোবাসে—
তাতে তোর কষ্ট হয়নি, শুধু রাগ হয়েছে… তাই না?”
ইনায়া মাথা নাড়ল।
“তাহলে বুঝে নে—ওটা ভালোবাসা না, শুধু একটা অনুভূতি ছিল…
যেটা সময়ের সাথে ঠিক চলে যাবে।”
রিমঝিম মৃদু হেসে তার কপালে আলতো টোকা দিল।

“যেদিন সত্যি ভালোবাসবি না…
সেদিন বুঝবি—
কাউকে হারানোর ভয়টা কতটা কষ্ট দেয়।”
ইনায়া চুপ করে রইল।
তার মনে যেন নতুন কিছু ভাবনার জন্ম নিচ্ছে।
…নিজেকে আর কখোনো কারো কাছে প্রকাশ করবো না। যার প্রয়োজন সে এমনি তে খুজে নিবে….।
রিমঝিম ধীরে বলল—

“আর একটা কথা মনে রাখিস—
যে তোকে সত্যি ভালোবাসবে,
সে তোকে কখনো ছোট করে দেখবে না…
তোকে বুঝবে, তোর পাশে থাকবে…
তোর না বললেও তোর মনটা পড়ে ফেলবে।”
ইনায়া চোখ বন্ধ করে রিমঝিমের কোলে একটু জড়িয়ে ধরল।
তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—
“আমার জন্য কি তেমন কেউ আছে…?”
দূরে কোথাও হালকা বাতাসে দুলছে শিমুল ফুল…
আর চৌধুরী ভিলার নীরব আকাশ যেন সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রেখেছে…
রাত নেমেছে চৌধুরী ভিলায়।

চারপাশে নীরবতার মাঝে আলোর ঝলকানি—বড় ডাইনিং হলটা আজ যেন একটু বেশি জীবন্ত।
সবাই একসাথে ডিনারের টেবিলে বসেছে।
এই বাড়িতে এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে, যখন পরিবারের প্রায় সব সদস্য একসাথে বসে খায়।
আজ সেই বিরল একটা রাত।
শুধু পিয়াসা আর মেরিন ছাড়া—বাড়ির সবাই উপস্থিত।
বড় টেবিল জুড়ে সাজানো নানা রকম খাবার।
রেশমা চৌধুরী আর বাড়ির অন্য গিন্নিরা সবার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন।
ইনায়া তখনো আসেনি।
ও একটু ব্যস্ত, তাই বলেছে—আর দশ মিনিট পর খাবে।
সবাই যখন খাওয়া শুরু করতে যাচ্ছে,
ঠিক তখনই ইউভি হঠাৎ গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল—
“বাবা… চাচ্চুরা… আমি এখন থেকে এই বাড়িতেই থাকব।”
মুহূর্তেই পুরো টেবিল নিস্তব্ধ।
সবাই যেন একসাথে থমকে গেল।
অবাক দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল সবাই।
সবার নীরবতা ভেঙে সেজো চাচ্চু রবিউল চৌধুরী হেসে বললেন—
“বাহ! বেশ তো! বাড়ির ছেলে বাড়িতেই থাকবে—এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে!”
কিছুজনের মুখে খুশির ছাপ ফুটে উঠলেও…
বাড়ির বড় কর্তা রাতিব চৌধুরীর মুখটা কঠিন হয়ে রইল।
তিনি ধীর গলায় বললেন—

“তাহলে তুমি কী বলতে চাও…?
তুমি এখন নূরের যোগ্য হয়েছ?”
টেবিলের চারপাশে চাপা উত্তেজনা।
ইউভি শান্তভাবে মাথা তুলে তাকাল।
তার চোখে দৃঢ়তা—
“হ্যাঁ, বাবা।
আমি এখন প্রতিষ্ঠিত।
আমার নিজের বাড়ি আছে, গাড়ি আছে…
আর আমার নিজস্ব ব্যবসাও আছে।”
রাতিব চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে বললেন—
“ব্যবসা? কীসের ব্যবসা?”
ইউভির ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল—

“যে কোম্পানিকে টেক্কা দিতে তোমরা তিন ভাই দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করো…
সেই IVA কোম্পানির মালিক—শেহেজাদ ইউভি চৌধুরী।”
কথাটা শুনে যেন পুরো ঘরটা স্তব্ধ হয়ে গেল।
কারো হাতের খাবার মাঝ আকাশে থেমে রইল।
কারো চোখে অবিশ্বাস, কারো মনে বিস্ময়।
রাতিব চৌধুরী হতভম্ব হয়ে বললেন—
“কি বলছো তুমি! এতদিন আমাদের কিছুই বলোনি কেন?”
ইউভি শান্ত গলায় উত্তর দিল—
“বললে কি হতো, বাবা?”
তার কণ্ঠে কোনো অহংকার নেই…
শুধু চাপা কষ্ট।
রাতিব চৌধুরীর কণ্ঠ এবার একটু কঠোর—

“তুমি আমাদের ছেলে হয়েও এভাবে আমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছো?
তুমি জানো আমরা কতটা চাপের মধ্যে থাকি এই কোম্পানির জন্য?”
ইউভি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“আপনারা জানেন…
আমি কীভাবে ছিলাম ওই নির্জন বাড়িটায়…?
আপনাদের ছাড়া…
আমার ‘আদর কে’ ছাড়া…
দশ বছর কেটেছে আমার।”
কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।
“আর আপনি-ই তো বলেছিলেন, বাবা—
আপনাদের মেয়ের যোগ্য হতে হলে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে…”
একটু থেমে ইউভি মাথা তুলে তাকাল।
ঠোঁটের কোণে হালকা দুষ্টু হাসি—

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩

“দেখিয়ে দিলাম, বাবা…
আমি যোগ্য।”
পুরো ডাইনিং হল নিঃশব্দ।
কারো মুখে কোনো কথা নেই
শুধু বাতাসে ভাসছে ইউভির কথার ভার…

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫