শ্রাবণ ধারা পর্ব ১১
অনামিকা তাহসিন রোজা
—” স্যার? স্যার? ও স্যাররর?”
তিন বার ডাকার পরে অবশেষে নিজের প্রাণপ্রিয় অ্যাসিস্ট্যান্ট রবির ডাকে চমকে তাকাল শ্রাবণ। অবাক হলো এই ভেবে সে এতক্ষণ ডেস্কে বসে কী করছিল। এদিকে রবিকে নিজের মুখের উপর চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত হলো শ্রাবণ। ধমক দিয়ে বলল,
—” সমস্যা কী তোমার? চেঁচাচ্ছ কেনো?”
বেচারা হাবাগোবা কালবৈশাখীর ঝড়ে উড়ে যাওয়ার মত গড়ন নিয়ে পৃথিবীতে টিকে থাকা রবির বয়স মাত্র ২১। তবে শেখ ইন্ডাস্ট্রিতে তার পদার্পণ হয়েছে তিন বছর আগে৷ এবং মজার কথা হলো এতিম রবিকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছে সামিউল শেখ নিজে এবং কিশোর ছেলেটার দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়ে আরো ট্রেনিং দিয়েছে। ফলস্বরূপ তিন বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সে শ্রাবণ শেখের স্থায়ী অ্যাসিস্ট্যান্ট, বিশ্বস্ত সঙ্গীতে পরিণত হয়েছে ।
শ্রাবণ সত্যিই বুঝতে পারেনা, তার বাবা কি শুধু খুঁজে খুঁজে সব অনাথ, এতিম, অসহায় দেরই গ্রাম থেকে তুলে এনে তার ঘাড়ে ঝুলিয়ে দিয়ে খুব মজা পায়? এই রবি নামক আজব প্রাণী টাকেও শ্রাবণ খুব একটা পছন্দ করতো না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ছেলেটার সততা, পরিশ্রম, ভালো মানসিকতা ও বিশ্বস্ততায় মুগ্ধ হয়েছে শ্রাবণ। যদিও মুখে কখনোই স্বীকার করেনি। কিন্তু বলা বাহুল্য সে নিজের সব সমস্যার সমাধান রবির কাছ থেকেই পেয়ে আসছে।
শ্রাবণের ধমক খেয়ে রবি চোখ পিটপিট করে বলল,
—” সেই দুই মিনিট ধরে আপনাকে ডাকছি স্যার৷ কোন জগতে ছিলেন? চোখ তো খোলাই ছিল। তাহলে শুনছিলেন না কেনো?”
শ্রাবণ নিজেও অবাক হলো। আসলেই তো। সে এত অন্যমনস্ক কেনো আজ? গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে ফিট করল শ্রাবণ। সোজা হয়ে বসে সাফাই গাইতে বলল,
—” চোখ খোলা রেখে ইয়োগা করছিলাম ইডিয়ট। এখন বলো ছাগলের মত চেঁচামেচি করছো কেনো?”
রবি এবারে তার বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হাসল। এক হাতে থাকা ফাইলটা শ্রাবণের সামনে দিয়ে, আরেক হাতে থাকা একটা গোলাপ ফুল শ্রাবণের দিকে এগিয়ে দিল রবি।
শ্রাবণ চোখমুখ কুঁচকে নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টের দিকে তাকিয়ে রইল। বোঝার চেষ্টা করল কোনোভাবে ছেলেটা নিজের জেন্ডার ভুলে গেছে কিনা। রবি বিষয়টা বুঝতে পেরে লাজুক ভঙ্গিতে বলল,
—” ইয়ে মানে স্যার, আপনাকে বিয়ের শুভেচ্ছা জানাতে জিহান স্যার এই গোলাপ পাঠিয়েছে। বলেছে আপনার হাতে দিতে।”
শ্রাবণ এবারে বিরক্তিতে শ্বাস ফেলে গোলাপটা নিয়ে পাশে ফেলে রাখল। কেননা গোলাপটা পঁচে গেছে ইতোমধ্যে। এবং ইচ্ছে করে তাকে এমন গোলাপ দেয়া হয়েছে এ সম্পর্কেও অবগত শ্রাবণ। সে কপালে দু আঙুল ঘষে জিজ্ঞেস করল হতাশ হয়ে,
—” বলদ টা কোথায়? ”
তড়িঘড়ি করে মুখ চলল রবির,
—” সুলতানা ম্যডামের ডেস্কে বসে আছে স্যার। ম্যাডামকে পটানোর চেষ্টা করছে। ফ্লার্টিং লেভেল খুবই জঘন্য। ম্যাডাম যেকোনো সময়ে জিহান স্যারের মুখে জুতো ছুঁড়তে মারবেন বলে আশা করা যায়।”
শ্রাবণ মুখ কুঁচকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুঁজল। বিরক্ত হয়ে ইশারা করে বলল,
—” দ্রুত ওটাকে নিয়ে আয় এখানে।”
” ওকে স্যার”- বলে দ্রুত ছুটে গেলো রবি। তার প্রাণপ্রিয় বসের একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড জিহান স্যারের প্রতি তারও বেশ দরদ। সে মোটেই চায়না সুন্দরী এমপ্লয়ি সুলতানার হাতে জুতোর বাড়ি খেয়ে জিহানের অতি সুদর্শন চেহারার নকশা বদলে যাক। নইলে ভীষণ দুঃখ পাবে বেচারা রবিও।
পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে জাপানে ঘুরতে গিয়েছিল জিহান। কিন্তু সে কল্পনাও করতে পারেনি তার ন্যাংটা কালের বন্ধু তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিয়ের পাঠ চুকিয়ে ফেলবে। এটা এক ধরনের প্রতারণা বলে মনে করে জিহান। সে দুঃখ পেয়েছে ভীষণ। তাই বন্ধুকে শুভেচ্ছা জানাতে ফুলের তোড়া না এনে, এনেছে একটা পঁচা গোলাপ ফুল। সে এও মনে করে জিহান যে তাকে ফুলের কাঁটা ছুঁড়ে মারেনি এই ভেবে শ্রাবণের উচিত জিহানের পদতলে গড়াগড়ি খাওয়া।
কাঁটার কথা মনে পড়তেই জিহান শ্রাবণের বিশাল বিলাসবহুল কেবিনে ঢুকেই বিড়বিড় করে গেয়ে উঠল বিশ্রী সুরে,
—” পঁচা ফুলের কাঁটা
তোর বন্ধু কালা-মোটা
প্রেমের মানে বোঝে না!
ধিতাং ধিতাং ধিন তাক তাক!”
শ্রাবণ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইলো নাচতে নাচতে প্রবেশ করা জিহানের দিকে। রবি দুঃখী মনে ফিসফিস করে বলতে বাধ্য হলো,
—” গানটাকে তো ধ”র্ষ”ন করে দিলেন স্যার।”
জিহান সাথে সাথে চোখ বড় করে রবির দিকে তাকাল। এরপর সানগ্লাস খুলে শ্রাবণের সামনে চেয়ারে বসে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
—” ছি শ্রাবণ ছিহ! দেখ তোর অ্যাসিস্ট্যান্ট কেমন বাজে ভাষা উচ্চারণ করেছে। কী শিখিয়েছিস এসব ছ্যাঁহ। এই তোর শিক্ষা?”
শ্রাবণ দাঁত কটমট করে হেসে বলল,
—” যা বলেছে ঠিকই বলেছে।”
জিহান মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
—” যেমন গুরু, তেমন শিষ্য। শা’লা হারামি সব।”
তার মুখনিঃসৃত গালিকে শ্রাবণ পাত্তা দিল না বলে জিহান এবারে ঠিক আসল জায়গায় খোটা দিয়ে ত্যাড়া গলায় বলল,
—” প্রতারক! বেইমানের জাত! আমি যেই জাপান গেলাম, সেই তোর বিয়ে করার জন্য কৃমি কাঁমড়াল? ভাগ্যিস আরো দুদিন দেরি করিনি, নইলে এসে দেখতাম দুই বাচ্চার বাপ হয়ে বসে আছোস! শালা অ’শ্লী’ল ন’ষ্ট পোলাপাইন! বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে ছিল! বন্ধুর জন্য অপেক্ষাও করতে পারল না। শেইম অন ইউ।”
শ্রাবণ কিছু বলল না প্রথমে। চোখের ইশারায় রবিকে চলে যেতে বলল। রবিও মাথা নেড়ে বাধ্য ছেলের মত কেবিন থেকে বেরিয়ে পড়ল। এবারে শ্রাবণ ফর্মালিটিকে লাথি মেরে উঠে দাঁড়াল। জিহানের সামনে এসে তার হাঁটু বরাবর জোরে এক লাথি মেরে, পেটেও ঘুষি মারল। বেচারা জিহান আর্তনাদ করে চেয়ার থেকে পড়ে গেল,
—” ওরে শালা জল্লাদ! কি রে ভাই! ভূতে ধরল নাকি! ও মাগো! ভাইরে থাম। মারছিস কেনো?”
শ্রাবণ জিহানের কলার ধরে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
—” মা-বাবা যে লুকিয়ে আমায় জোর করে বিয়ে দেয়ার প্লান করছে এটা তুই জানতিস না? জানতিস না? সত্যি কথা বল, নাহলে গলা টি”পে মে”রে ফেলব।”
জিহান মেকি হাসল, এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
—” হে হে হে৷ না মানে,, ইয়ে মানে অল্প অল্প জানতাম।”
শ্রাবণের চোয়াল শক্ত হতেই জিহান তড়িঘড়ি করে বলল,
—” বাট বিশ্বাস কর দোস্ত, উনারা যে এই মাসেই তোরে বলি দেবে তা আমি জানতাম না। নইলে কি আমি তোকে রেখে জাপানে চিল করতে যেতাম? তোর বাসর ঘরের সিনারি মিস করতাম? বাই দ্য ওয়ে জাপানিজ মেয়েগুলা সেই সুন্দর।”
শ্রাবণ আবারো ঘুষি মেরে দুরে সরিয়ে দিল জিহানকে। দ্রুত এসে নিজের চেয়ারে বসে পড়ল। মাথায় হাত রেখে শ্বাস নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে জিহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” বাড়িটা জাহান্নাম মনে হচ্ছে আমার কাছে। মেয়েটা অত্যন্ত বিরক্তিকর।”
জিহান ভ্রু কুঁচকাল,
—” কেনো? দেখতে তো সুন্দর শুনেছি, শুধু নাকি গায়ের রঙ একটু চাপা। বাট দ্যাট ডাজেন্ট ম্যটার, রাইট? তুই ফর্সা, আবার তোর বউও দুধসাদা হলে তো তোদের বাচ্চা মূলার মত দেখতে হবে। সো, ঠিকই আছে।”
শ্রাবণ চোখ বন্ধ করে দাঁত খিঁচে বলল,
—” শাটাপ ননসেন্স। দ্যাট একচুয়ালি নেভার ডাজেন্ট ম্যাটার। আমি অন্য বিষয়ে বিরক্ত।”
—” কী?”
—” আরে ভাই, ও অকারনে আমার সব বিষয়ে নাক গলাতে আসে। নিজে থেকে আমার ঘর গুছিয়ে দেয়, সেদিন আমার শার্ট পুড়িয়ে ফেলেছে। কোনো ম্যানার্স জানে না। জাস্ট আনকালচার্ড! আহাম্মক আর এক নাম্বার বলদ। প্রথম দুদিন ভ্যাবলার মত তাকিয়ে ছিল। ধমক দিয়ে, রুড বিহেইভ করে কিছুটা কমিয়েছি। ডিজগাস্টিং কথাবার্তা! আর…
জিহান ভ্রু কুঁচকাল, —” আর?”
বলার মত আর কিছু পেল না শ্রাবণ। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
—” আর..জানি না। বাট মোটকথা, ওকে ভালোই লাগে না। একটুও পছন্দ হচ্ছে না। সহ্যই হচ্ছে না।”
জিহান চেয়ারে হেলান দিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
—” বুঝেছি। গ্রামের মেয়ে তো। তার উপর এতিম। একটু সময় লাগবে। বাই এনি চান্স, তুই কি সো কোল্ড মর্ডান, চরিত্রহী”ন, অশা”লীন মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিলি? ভালো জিনিস ভালো লাগছেনা?”
শ্রাবণ সাথে সাথে ধমক দিল ঠান্ডা স্বরে,
—” শাটাপ। মূর্খের মত কথা বলবিনা। একটা গুড স্টাটাস সবাই চায়। লেভেল বলতেও কিছু আছে। তুই নিজেও জানিস আমি ছোট থেকে এইসব বিষয়ে কনসার্ন। এন্ড শহরের সব মেয়ে সো কোল্ড মডার্ন হয়না। স্মার্টনেস বলতেও কিছু আছে। ভদ্র পরিবারের মেয়েও আছে।”
জিহান মাথা চুলকে বলল,
—” না ঠিক আছে। তোর কথাও ঠিক আছে। কিন্তু.. আচ্ছা বাই দ্য ওয়ে, তো তুই এখন কী করতে চাইছিস তাহলে?”
শ্রাবণ একটু অস্বস্থিবোধ করল। তবুও গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
—” ডিভোর্স দেয়া যায় কিনা ভাবছি।”
জিহান সাথে সাথে আঁতকে উঠল,
—” এ ভাই, এদিকে তাকাও সোনা। স্টাটাসের কথা যে বললি? এ কাজ করলে কি স্টাটাস তোমার বেড়ে যাবে বাবুসোনা? সবাই তোমাকে এসে ফুলচন্দন মাখিয়ে যাবে?”
—” আমার বিয়ের কথা কেও জানে না। অফিসে তো তুই আর রবি ছাড়া এখনো কেও জানে না। ওদিকে আমার চাচা-খালা-মামা এনারাই জানেন। পরিবারের বাইরে কেওই জানে না। সো ঠিকভাবে ম্যনেজ করা গেলে কেও জানতেও পারবেনা।”
জিহান মাথা নেড়ে বোঝার ভঙ্গি করল। শ্রাবণ একটু থেমে বলল,
—” বাবা ফিরে আসার আগে যা করার করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব। ”
জিহান ভ্রু কুঁচকাল,
—” কেনো?”
—” বাবা বলেছে বাড়িতে ফিরে গেট টুগেদারের আয়োজন করবে। বাড়িতে বড় অনুষ্ঠান হবে জাস্ট আমার বিয়ের ঘোষনা দেয়ার জন্যই। এমনকি সেখানে নাকি ওই মেয়েকেও আমার ওয়াইফ হিসেবে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। অফিসের সবাইও ইনভাইটেড। সো ওই গেট টুগেদারের আগে যা করার করতে হবে। নইলে আমার মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে।”
জিহান ভ্রু কুঁচকে পাত্তা দিল না। হাই তুলে আয়েশ করে হেলান দিল চেয়ারে। বিড়বিড় করে শ্রাবণের উদ্দেশ্যে বলল-” মারা খাও।”
শ্রাবণ তৎক্ষনাৎ টেবিলের নিচ দিয়ে লাথি মারল জিহানের পায়ে। কিন্তু ভুলবশত হাঁটুর উপরে লাথি টা লাগল তার। সাথে সাথে জিহান নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি চেপে ধরে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল। পিছিয়ে গিয়ে বুকে হাত রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—” শালা রাক্ষস! এখনি তো আমার বাপ হওয়ার স্বপ্ন টা ভেঙে দিতি। এমন রিস্কি কাজ কেও করে অভদ্র ছেলে। তুই জীবনে ডিভোর্স দিতে পারবিনা অভিশাপ দিলাম। ”
শ্রাবণ পাত্তা দিল না। জিহান কিছুক্ষণ পর চেয়ারটা টেনে নিরাপদ দূরত্ব নিয়ে বসে পড়ল। ভরসা নেই শ্রাবণ শেখের পায়ের উপর। যেকোনো সময় হামলা হতে পারে। সম্পত্তি রক্ষা করা জরুরি জিহানের কাছে। একটু পর কিছু একটা মনে পড়তেই জিজ্ঞেস করল,
—” শুনলাম নীলবাবু এসেছে।”
নীলের কথা মনে পড়তেই একটু সজাগ হলো শ্রাবণ। মুখের বিরক্তি মুছে গিয়ে কেমন যেন চিন্তিত রেখা ফুটে উঠল তার কপালে। অন্যমনস্ক হয়ে জবাব দিল,
—”হুম গতরাতে এসেছে।”
জিহান হেসে বলল,
—” একবার গিয়ে দেখা করে আসব। ওর সাথে বেশ জমে আমার। তোর মত নিরামিষ না ও। এক্কেরে পারফেক্ট ভাইব।”
শ্রাবণ কোনো গভীর চিন্তায় ডুব দিল। অনেকটা সময় নিয়ে চিন্তা করার পর জিহানের দিকে তাকিয়ে ডাকল,
—” আচ্ছা শোন তো..
—” হুম বল।”
শ্রাবণ ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
—” ধর একটা মানুষ ইন্ট্রোভার্ট। কখনো সহজে কারো সাথে মিশতে পারেনা, বা করে না। আর কখনো হাসতেও দেখা যায় না তাকে। সবসময় ভয় পেয়ে থাকে। অদ্ভুত ভাবে চুপচাপ থাকে। কারো সাথে সহজে কথাই বলতে পারেনা।”
জিহান মনোযোগ দিয়ে গালে হাত দিয়ে শুনতে থাকলো শ্রাবণের কথা। শ্রাবণ আবার বলল,
—” এরকম একটা মানুষ যদি মাত্র পাঁচ মিনিটে অপরিচিত কারো সাথে হেসে হেসে দ্বিধা ছাড়া বেশ অবলীলায় কথা বলে, তার সাথে সহজে মিশে যায়,…মানে সেইরকম কম্ফোর্ট জোনটা মাত্র কয়েক ঘন্টাতে পেয়ে যায়, তাহলে সেটাকে কী বলে? এটার কারন কী?”
জিহান চোখ পিটপিট করে তাকাল। শ্রাবণের কথা মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে তার। কিন্তু যতটুকু বুৃঝেছে সেটার ভিত্তিতে জিহান দুর্বল কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—” কার কথা বলছিস তুই দোস্ত?”
শ্রাবণ আবারো গলা পরিষ্কার করল। খুক খুক করে কেশে নড়েচড়ে চেয়ারে বসে বলল
—” কারো কথা না। এমনিতেই জিজ্ঞেস করছি।”
জিহান এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে দার্শনিক হয়ে ভাবল। এরপর বিজ্ঞের মত জবাব দিল,
—” এক্ষেত্রে তাহলে অপর পক্ষের মানুষটা বেশ মিশুক, ভালো এবং ভরসাযোগ্য। সেজন্যই ইন্ট্রোভার্ট সেই মানুষটা তাকে এত সহজে আপন করে নিয়েছে, বা হেসে হেসে কথা বলতে পেরেছে। আসলে এরকম মানুষেরা খুব সহজে ভরসাযোগ্য স্থানটা খুঁজে নিতে পারে। কেও যদি ভরসার যোগ্য হয়, তাহলে তার সাথে মিশে যেতে সময় লাগে না। সো, বলা যায়, অপর পক্ষের মানুষটা অমায়িক আর চমৎকার। এটাই মূল কারন।”
শ্রাবণের মুখে কেনো যেন আঁধার নেমে এলো। সে কোনোমতে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে একটা ফাইল হাতে উঠিয়ে নিল এবং সেটা চেক করার ভান করতে থাকল। কিন্তু কপালের টানটান শিরাগুলো এবং শক্ত চোয়ালটা চোখ এড়ালোনা জিহানের। সে ঠোঁট কাঁমড়ে ভাবুক ভঙ্গিতে পর্যবেক্ষণ করল নিজের বন্ধুকে। পুরোপুরি ব্যাপার টা ধরতে না পারলেও নীলের নাম শুনে প্রসঙ্গ টা এসেছে দেখে একটুআধটু ধরতে পারল সে। মনে মনে বাঁকা হাসল। আবারো বিড়বিড় করে গেয়ে উঠল,
—” মনে জ্বালা জ্বালা জ্বালা জ্বালা
তোমার আগুন বাড়ে
জ্বালা জ্বালা জ্বালা জ্বালা,
কি প্রেম দিলা রে, বাড়ে
জ্বালা জ্বালা জ্বালা জ্বালা।”
শ্রাবণ জুতো ছুঁড়ে মারার আগেই গানটা গাইতে গাইতে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল জিহান। কেননা তার বাবা হওয়ার ক্ষমতা রক্ষা করা অতিব জরুরি। এদিকে আহাম্মকের মত তাকিয়ে রইল শ্রাবণ। এমন গানের কারন বুঝলো না। বোঝার চেষ্টাও করল না। তার মাথায় এখন শুধু কিছু দৃশ্য ভাসছে। যা নিয়ে তার মাথা ব্যাথা থাকার কথা না, কিন্তু অদ্ভুতভাবে মাথার সাথে বুকও ব্যাথা করছে।
নিজেই নিজেকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল শ্রাবণ শেখ- ” Am I jealous? Impossible! ”
সমস্ত কাজকর্ম শেষ করে দুপুরের খাবারের পর্বও চুকিয়ে ফেলল নীল। সালমা বেগম কোঁমড়ের ব্যাথায় আর টিকতে পারলেন না। দ্রুত ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নেন তিনি৷ ধারা এর মধ্যে তার রান্না করা মুরগির মাংসের দিকে তাকিয়ে থাকে। নীল এবং সালমা বেগম ধারার রান্না করা মুরগির মাংস খেয়ে প্রশংসায় আটখানা হয়েছেন, এতে খুশি হয়েছে ধারা। কিন্তু যার জন্য বিশেষ করে রান্না করল, তার কি ভালো লাগবে? একটুখানি প্রসংশা কি করবে সে? ধারা মনে মনে হাজারো জল্পনা কল্পনা করল, এরপর দৃষ্টি ফেলে তাকাল ঘড়ির দিকে৷ হিসাব মতে একটু পরেই বাড়ি ফিরবে শ্রাবণ। খেতেই আসবে, এরপর আবার অফিস যাবে। সালমা বেগম অনুপস্থিত, মনে হয় এতক্ষণে ঘুমিয়েও গিয়েছেন। শ্রাবণকে একা আপ্যায়ন করতে হবে ভেবেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে ধারার। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে শ্রাবণের প্লেট গুছিয়ে রাখল।
ঠিক তখনই হঠাৎ করে কলিং বেলের শব্দে চমকে উঠল ধারা। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল তার। এক মুহূর্তের জন্য মনে করল উনি চলে এসেছেন! হাতের কাজ ফেলে প্রায় দৌঁড়েই দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। ওড়নাটা তাড়াহুড়ো করে ঠিক করে নিয়ে দরজার কপাট খুলতেই দেখল ভ্রু কুঁচকে সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্রাবণ। সূর্যের আলো পেছন থেকে এসে পড়েছে তার উপর। সাদা রঙের ফর্মাল শার্ট, টাই একটু ঢিলা, কপালে হালকা ঘাম, আর সেই চিরচেনা গম্ভীর, বিরক্ত মুখ। ধারার বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। খুব নিচু, সাবধানী ভঙ্গিতে সে সরে দাঁড়িয়ে জায়গা করে দিল শ্রাবণকে। শ্রাবণ ভেতরে ঢুকল, কিন্তু একবারও তার দিকে তাকাল না। যেন দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেছে। জুতা খুলে ভেতরে ঢুকতেই ধারা একটু ইতস্তত করে বলল,
—” আপনি…হাত-মুখ ধুয়ে নিন। আমি.. খাবার দিচ্ছি।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল তার। তবুও নিজেকে সামলে নিল কোনোভাবে। শ্রাবণ এবার থামল। খুব অল্প সময়ের জন্য পাশ ফিরল। এক ঝলক তাকাল ধারার দিকে, সেটা একদম নিরাবেগ দৃষ্টি।
—” মা কোথায়?”
আজ প্রথমবার শ্রাবণ নিজে থেকে কোনো প্রশ্ন করল ধারাকে। এক মুহুর্তের জন্য ধারা চমকালেও পরমুহূর্তে কাঁপা গলায় বলে,
—” ঘুমাচ্ছেন। শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল..!”
শ্রাবণ আর কিছু বলল না। সোজা ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। ধারা কিছুক্ষণ দরজার দিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর হালকা শ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে ছুটল। হাত কাঁপছে তার, তবুও যত্ন করে প্লেটে ভাত, ডাল, আর নিজের হাতে রান্না করা মুরগির মাংস তুলে সাজাতে লাগল। প্রতিটা পদ রাখতে রাখতে মনে মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে তার, একটু, শুধু একটুখানি যদি বলেন, ভালো হয়েছে। প্লেটটা টেবিলে রেখে দাঁড়িয়ে রইল ধারা। অপেক্ষা। শুধুই অপেক্ষা। মিনিট দুয়েক পর শ্রাবণ এসে চেয়ারে বসল। পরনের শার্টটা খোলেনি। ধারা অবাক হলো। শ্রাবণ কখনো এভাবে বাইরে থেকে এসে কাপড় না বদলে খেতে বসে না।
শ্রাবণ চোখ না তুলেই হাত বাড়িয়ে খাওয়া শুরু করল। ধারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। নড়ছে না। শ্রাবণ প্রথম লোকমাটা মুখে দিল। ধারার বুকের ধকধক শব্দ যেন নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে সে। মাংস মুখে নেয়ার কয়েক সেকেন্ড পর শ্রাবণের হাত থামল এক মুহূর্তের জন্য। ধারার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷ কিছুক্ষন থেমে সে আবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খেতে শুরু করল। কোনো পরিবর্তন নেই মুখে। কোনো মন্তব্য নেই। একটুও না। ধারার চোখের আলো নিভে গেল ধীরে ধীরে। সে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল। হালকা করে বলল,
—” আর কিছু লাগবে..?”
শ্রাবণ আধোস্বরে বলল,
—” চিকেন..
ধারা তড়িঘড়ি করে আরো মুরগির মাংস উঠিয়ে দিল শ্রাবণের প্লেটে। অজান্তেই তার ঠোঁটে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। তার মানে রান্না ভালো হয়েছে। ধারা আরেকবার বলল,
—” আরো কিছু?”
শ্রাবণ এবার বিরক্ত স্বরে বলল,
—” না। দরকার হলে বলব।”
একটা সাধারণ উত্তর। ধারা আর কিছু বলল না। ধীরে ধীরে পেছন ঘুরে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। তার পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল শ্রাবণ কয়েক সেকেন্ড। খাওয়া থামিয়ে তাকিয়েই রইলো। মায়ের হাতের রান্না সবাই চেনে। মুরগির মাংস সালমা বেগম রান্না করেনি শ্রাবণ মুখে নেয়ার সাথে সাথেই বুঝেছে। এবং কে রান্না করেছে তাও স্পষ্ট। যদিও ইগো ধরে তার উচিত ছিল এটা না খাওয়া। কিন্তু স্বাদটা লোভনীয় হওয়ায় চুপচাপ খেয়ে নিয়েছে সে। তবে এতে সে নিজেই একটু বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকাল। নিজের মনেই বিড়বিড় করল,
—” রান্নার দক্ষতা শো অফ করছে! ”
ধারার মনে শান্তি মিলল না। একটুখানি মন্তব্য বা প্রশংসা পেতে সে আকুল হলো। নির্লজ্জ উপাধি টা ধরে রেখে সে আবারো খেতে থাকা শ্রাবণের পাশে এসে দাঁড়ালো। আঙুল কচলাতে কচলাতে জিজ্ঞেস করল,
—” চিকেন..কেমন হয়েছে?”
শ্রাবণ এবারে খাওয়া থামাল। কিন্তু তাকাল না। বরং ত্যাড়া গলায় বলল,
—” লবন কম।”
যদিও এটা মিথ্যে। একদম পারফেক্ট রান্না করেছে ধারা, শ্রাবণ নিজেও জানে। শুধু শুধু ধমক দেয়ার জন্যই বলেছে এমন।
লবণ কম হয়েছে শুনে ধারা অস্থির হলো। তড়িঘড়ি করে বলল,
—” কিন্তু নীল ভাই আর মা তো বলল ঠিকই আছে সব।”
সালমা বেগমের কথাটা শুনতে না পেলেও নীলের নাম শুনে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল শ্রাবণ। এমনিতেই এটা নিয়ে মেজাজ খারাপ ছিল শ্রাবণের। এর মাঝে নীলের নাম শুনে শ্রাবণের মাথা গরম হয়ে গেল। খাওয়ার রুচিও চলে গেল। শ্রাবণ সাথে সাথে ধাক্কা দিয়ে প্লেট সরিয়ে দিয়ে গর্জে উঠে বলল,
—” তাহলে নীলকে গিয়েই এসব খাওয়াও ইডিয়ট। ওকেই গেলাও তোমার রান্না।”
শ্রাবণের কণ্ঠে এমন তীব্রতা ছিল যে মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। প্লেটটা টেবিলের উপর ধাক্কা খেয়ে হালকা শব্দ তুলতেই ধারা চমকে উঠল। সে কিছু বলার আগেই শ্রাবণ গটগট পায়ে চলে গেল নিজের ঘরের দিকে। ধাম করে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা এবার আগের থেকেও বেশি ভারী লাগল।
ধারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। যেন বুঝতেই পারছে না ঠিক কী হলো। হাত দুটো এখনো সামনে জড়ো করা, আঙুলগুলো একটার সাথে আরেকটা চেপে আছে। চোখ ধীরে ধীরে নেমে এলো টেবিলের দিকে।
আধখাওয়া ভাত, সেই মুরগির মাংস, যেটা সে এত যত্ন করে রান্না করেছিল। ইশ রে! লোকটা না খেয়েই উঠে গেলো? গলা শুকিয়ে এলো তার। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে টেবিলের পাশে দাঁড়াল ধারা। খুব আস্তে করে প্লেটটা ঠিক করে দিল, যেন কেউ দেখলে মনে না করে এখানে কোনো ঝড় বয়ে গেছে। কিন্তু তার নিজের ভেতরেই যে ঝড়টা উঠেছে, সেটা সামলানোর ক্ষমতা তার নেই। মেয়েটা চুপচাপ প্লেটটার দিকে তাকিয়ে রইল। একটু আগেও সে কতটা আশা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। একটা ছোট্ট প্রশংসা, একটা সাধারণ ভালো হয়েছে—এইটুকুই তো চেয়েছিল সে। অথচ..ধারার চোখে পানি চলে এলো ধীরে ধীরে। সাথে সাথে মুছেও নিল, যেন কারো নজরে না পড়ে।
কিন্তু নিজেকে দোষী মনে হলো তার। শ্রাবণের রাগের কারনটা না বুঝলেও সে ভীষণ মন খারাপ করল এই ভেবে মানুষটা তার জন্য না খেয়ে চলে গেল। নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল ধারা। মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল— ” আমি কি ভুল কিছু বলেছি?” কিছুতেই মিলল না উত্তর। নীলের নামটা কি বলা উচিত হয়নি? কিন্তু সেটাই বা এমন কী! সে তো শুধু সত্যিটাই বলেছে। তাহলে কেন এমন রাগ? কেন এমন আচরণ?
শ্রাবণ ধারা পর্ব ১০
ধারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে প্লেটটা তুলে নিল। রান্নাঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল, যেন সে আবারও কোনো অদৃশ্য পরীক্ষায় ফেল করেছে, যার নিয়ম সে কখনোই জানে না।
শ্রাবণ এই ভাত আর খাবেই না তা জানে ধারা। তাই রান্নাঘরের মেঝেতে বসে শ্রাবণের এঁটো ভাতটুকু সবটা খেয়ে নিল ধারা। শুধু মুরগির মাংসটুকু একটা বাটিতে করে ফ্রিজে রেখে দিল সে। সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে বাকি প্লেট ধুতে গিয়ে হাত কাঁপছে তার। পানির ধারা বয়ে যাচ্ছে, আর সেই সাথে তার চোখের কোণ থেকেও কয়েক ফোঁটা জল পড়ে মিশে গেল পানির সাথে। অদৃশ্য হয়ে গেল ঠিক যেমন তার কষ্টগুলোও চুপচাপ হারিয়ে যায়।
