শ্রাবণ ধারা পর্ব ১২
অনামিকা তাহসিন রোজা
শ্রাবণ মনে হয় যেকোনো সময় ব্লাস্ট করবে। বুকটা অদ্ভুতভাবে উঠানামা করছে তার। যেন দম আটকে আসছে। টাইটা খুলে ছুঁড়ে ফেলল বিছানার উপর, তারপর দুই হাত দিয়ে চুলে আঙুল চালিয়ে অস্থির ভঙ্গিতে এদিক-সেদিক পায়চারি করতে লাগল সে। হঠাৎ করেই দেয়ালে ঘুষি মারল, ব্যথা পেলেও যেন সেটা টেরই পেল না। রাগটা ঠিক কোথায় সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছে না। ধারা কি এমন কিছু বলেছে? না। ভুল কিছু করেছে? তাও না। তবুও কেন যেন সহ্য হচ্ছিল না। নীলের নামটা কানে যেতেই মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। কেন? সেটার উত্তরও শ্রাবণের কাছে নেই। শ্রাবণ থেমে গেল হঠাৎ। নিজের শ্বাসের শব্দটা শুনতে পেল পরিষ্কার। বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত চাপ লাগছে।
—”উফফ কী হচ্ছে আমার!”
নিজেকেই বিড়বিড় করে বলল সে।
একটু পায়চারি করে শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে দিল সে। এসি ছেড়ে দিয়ে বিছানার ধারে বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর হঠাৎ করেই ফোনটা তুলে নিল। কন্ট্যাক্ট লিস্টে না তাকিয়েই ডায়াল করে দিল। ওপাশ থেকে কল ধরতেই ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ,
—” হ্যালো মন্টুমিয়া, খবর কও!”
—” শাটাপ জিহান!”
প্রায় গর্জে উঠল শ্রাবণ। ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর একটু ধীর গলায় জিহান বলল,
—” তোর গলাটা আবারো ঢোলের মত শোনাচ্ছে কেনো দোস্ত? রেগে আছিস?”
শ্রাবণ দাঁত চেপে বলল,
—”এই মেয়েটা অসহ্য! একদম অসহ্য! আমার লাইফটা নরক বানিয়ে ফেলেছে! ও এসব বন্ধ না করলে আমার হাতে খু’ন হবে জিহান। ও সিরিয়াসলি আমার কাছে খু’ন হবে। ”
জিহান ভ্রু কুঁচকালেও ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে রাখল। রহস্য নিয়ে বলল,
—”কোন মেয়েটা? কে সেই নিরীহ মানুষ? তোর বউ?”
—”আর কে! আর কে হবে!”
চেঁচিয়ে উঠল শ্রাবণ। একটু থেমে বলল,
—” আর বউ কে রে? কীসের বউ? ও আমার বউ না।”
জিহান মাথা নেড়ে বলল,
—” ওও ঠিক আছে। তাহলে আমার ভাবি?”
—” শাটাপ। খবরদার ওই বেয়াদবকে ভাবি ডাকবি না।”
শ্রাবণের গর্জনে জিহান মুখ কুঁচকে তাকাল আকাশের দিকে। বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো,
—” ডোন্ট টেল মি, নানি বলে ডাকতে হবে।”
শ্রাবণের মেজাজ বিগড়ানো বুঝতে পেরে জিহান শান্ত গলায় বলল,
—” ওকে দোস্ত, কিন্তু কী হয়েছে? অমুক কী করল আবার?”
শ্রাবণ উঠে দাঁড়িয়ে আবার হাঁটাহাঁটি শুরু করল,
—” সবকিছুতে ঢুকে পড়ে! আমি কিছু বলি না তাও নিজের মতো কাজ করে যায়। আজ আবার রান্না করেছে। কেউ তাকে বলেছে রান্না করতে? কে বলেছে? তবুও রান্না করেছো খুব ভালো কথা। মহৎ কাজ করেছো। এক সেকেন্ডের জন্য ভেবেছিলাম আমার জন্য রান্না করেছে। কিন্তু এইযে এদিকে রান্না করে এসে আবার দাঁড়িয়ে থেকে আমাকে বলে, কেমন হয়েছে? ভালো লেগেছে? আর ওদিকে বলে, নীল ভাই এই বলেছে সেই বলেছে। মুখে সারাক্ষন নীল ভাই নীল ভাই কেনো? হোয়াট দ্য হেল!”
জিহান এবার ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে ভেবে বলল,
—” বিষয়টা আসলেই দুঃখজনক। যাকগে, বউয়ের হাতে, আই মিন অমুকের হাতের রান্না খেয়েছিস?”
—”হ্যাঁ খেয়েছি তো! না খেয়ে উপায় আছে?”
বিরক্ত গলায় বলল শ্রাবণ।
—”কেমন হয়েছিল?”
এক সেকেন্ড থামল শ্রাবণ। তারপর মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
—” ভালো।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর খুব ধীরে জিহান বলল, —”ওকে, তারপর?”
—” আমি তবুও বলেছি লবণ কম হয়েছে।”
—” গ্রেট, একদম হাজবেন্ডের মত কাজ। তারপর?”
—”তারপর আবার নীলের নাম! ‘নীল ভাই বলেছে ভালো হয়েছে’—মানে কী? হোয়াট ডিড শী মিন? নীল ভালো বললেই ভালো? আমি কী? আমি কি কেউ না?”
জিহান এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হালকা হেসে ফেলল,
—”ওহহ। সো, প্রবলেমটা এখানে!”
—”কী এখানে? কী বলতে চাইছিস তুই?”
খেঁকিয়ে উঠল শ্রাবণ।
—”না না কিছু না। তুই কন্টিনিউ কর।”
শ্রাবণ বিরক্ত হয়ে বলল,
—”এই মেয়েটার কোনো লিমিট নেই। কাল রাতে দেখলাম নীলের সাথে গল্প করছে। একটা ঘরে একা। তুই ভাবতে পারছিস কতটা বেয়াদব ও? কি সুন্দর হেসে হেসে কথা বলছিল। এই জন্মে তো আগে কখনো এত খিকখিক করে হাসতে দেখিনি। আর নীলের সাথে কথা বলতে গেলে হেসে ম’রে যাচ্ছে যেন। আজ আবার.. একদম লজ্জা নেই! কমনসেন্স জিরো! জাস্ট বেয়াদব, অভদ্র মেয়ে একটা।”
জিহান এবার পুরোপুরি সোজা হয়ে বসল। মনে মনে হিসাব কষলো। সকালে শ্রাবণ অফিসে তাকে যেই কথাগুলো জিজ্ঞেস করেছিল, সেগুলো কার উদ্দেশ্যে ছিল এবার পুরোপুরি বুঝতে পারল সে। উপলব্ধি করতেই পেট ফাটিয়ে হাসিও পেল তার। কিন্তু হাসতে না পেরে কেশে উঠল। সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—” বাট দোস্ত, একটু কথা বললেই বা কী হয়? এতেও কি সমস্যা?”
দাঁত চেপে শ্রাবণ বলল,
—”হ্যাঁ সমস্যা! অনেক বড় সমস্যা। আমার সামনে এত ভদ্র, চুপচাপ..যেন বোবা, আর অন্য কারো সাথে…
কথাটা শেষ করতে পারল না সে। নিজেই অবাক হলো শ্রাবণ। অজান্তে মুখ ফঁসকে এটা কী বলল, কেনো বলল নিজেই বুঝলো না।
ওপাশে জিহান নিঃশব্দে হাসল। মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে গাইল, —” খাঁচার পাখি কভু খাঁচায় থাকেনা!”
—”কী বললি?”
সন্দেহজনক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল শ্রাবণ।
—”না কিছু না। আমি ভাবছি তোর জন্য ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিই কিনা।”
—”হোয়াট?”
চোখ কুঁচকে গেল শ্রাবণের।
জিহান এবার স্পষ্ট হেসে ফেলল,
—”দোস্ত, তুই ঠিক আছিস তো? মানে তুই যা বলছিস, শুনে মনে হচ্ছে তোর সমস্যা অমুকের না, সমস্যা তোর নিজের মাথায়! ”
রেগে গেল শ্রাবণ,
—” কানের নিচে জুতার বাড়ি দেব ননসেন্স৷ আ’ম সিরিয়াস।”
হাসতে হাসতেই জিহান বলল,
—”আমিও সিরিয়াস ম্যান। তুই পাগল হয়ে যাচ্ছিস। অমুক তোর সাথে কথা বললেও তোর সমস্যা, অন্য কারো সাথে কথা বললেও সমস্যা। তোর কাছে খাবার কেমন হয়েছে জানতে চাইলেও সমস্যা, আবার অন্য কেও খাবারের মন্তব্য করলেও তোর সমস্যা। জাস্ট থিংক, ডিভোর্সের কথা বলেছিলি না? ভবিষ্যতে, অমুক কে অন্য কেও বিয়ে করলেও তোর সমস্যা থাকবে মনে হচ্ছে। নিজেও সংসার করবিনা, অন্যকেও করতে দিবিনা।”
একটু থেমে জিহান দুষ্টু গলায় যোগ করল,
—”এটা কিন্তু ভালো লক্ষণ না বস।”
শ্রাবণ চুপ করে গেল। কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পেল না। জিহান এবার মজা করে বলল,
—”দেখ, আমার ফাইনাল ডায়াগনোসিস। তুই কেস খেয়েছিস। সিরিয়াস কেস। সলিড কেস খেয়েছিস!”
গর্জে উঠল শ্রাবণ,
—”শাট আপ!”
—”হ্যাঁ হ্যাঁ। শাটাপ হোক, আর সেভেন আপ। তুই শ্যাষ। তোর দ্বারা আর ভন্ডামি হবেনা। তুই খাতাম, টাটা, বাই বাই! ”
শ্রাবণ বিরক্ত হয়ে বলল,
—” ফোন রাখছি আমি।”
জিহানও তড়িঘড়ি করে বলল,
—” হ্যাঁ রাখ, আর আয়নায় নিজের মুখটা দেখে নিস। অনেক কিছু বুঝে যাবি।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোনটা কেটে দিল শ্রাবণ। ঘরে আবার নীরবতা নেমে এলো। শ্রাবণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে দেয়ালের দিকে তাকাল। মনে মনে একটা কথাই ঘুরছে—আসলেই তো! আমার হয়েছে টা কী?
ধারা মন খারাপ করে অনেকক্ষণ সোফায় বসে রইলো। শ্রাবণ খাবার শেষ করেনি কথাটা মনে করতেই তার ভীষন কষ্ট হতে থাকল। ইশ রে! কেনো যে কথাটা সে বলতে গিয়েছিল। মানুষটা কি সুন্দর করে খেতে বসেছিল। আজ তেমন রেগেও ছিল না। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল ধারা। হুট করে মনে পড়ল বিকেলে নীল তাকে পেছনের বড় বাগানে ডেকেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকাল ধারা। দ্রুত ওড়না ঠিক করে নিয়ে বাড়ির পেছনের বাগানে দৌঁড়ে এলো। নীল একটা কাঠের চেয়ারে হালকা কাত হয়ে বসে আছে। সামনে রাখা একটা মাঝারি সাইজের ক্যানভাস, স্ট্যান্ডে ঠেস দিয়ে। হাতে ব্রাশ, আর পাশে রঙের প্যালেট। প্যালেটের উপর নীল, সবুজ, হলুদ, লাল। রঙগুলো যেন এলোমেলো অথচ নিজের নিয়মে সাজানো। নিচে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে আরও কিছু তুলি, পানিভর্তি কাঁচের জার, আর রঙের টিউব।
ধারা এগিয়ে এসে নীলের পাশের চেয়ারে বসে পড়ল,
—” সরি নীল ভাই। দেরি করে ফেললাম মনে হয়। আপনি কখন এসেছেন?”
ক্যানভাসে কিছু একটা আঁকিবুঁকি করতে ব্যস্ত ছিল নীল। ধারাকে দেখেই খুশির ঝলকে চোখ জ্বলজ্বল করল তার। হেসে বলল,
—” আরে ব্যাপার না। সময় মেইনটেইন করার কী আছে? আমরা আমরাই তো। আমি মিনিট দশেক আগে এসেছি।”
ধারা এবারে উঁকি মেরে দেখল নীলের আশেপাশে আরো আঁকাআঁকির সরঞ্জাম রেখেছে। আগ্রহভরা চোখে সে সবকিছু দেখল। এ যেন তার জন্য একেবারে নতুন জগৎ। ক্যানভাসে ইতোমধ্যে একটা দৃশ্য ফুটে উঠেছে। নরম বিকেলের আলোয় বসে থাকা একটা মেয়ের অবয়ব। মেয়েটা যেন নদীর ধারে বসে, চারপাশে হালকা সবুজ আর পানির নীল মিশে গেছে। মুখটা এখনো পুরো আঁকা হয়নি, কিন্তু ভঙ্গিটা এত জীবন্ত যে মনে হচ্ছে সে বুঝি একটু পরেই কথা বলবে।
ধারা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে বলল,
—” আপনি এগুলো কাল এঁকেছেন?”
নীল একটু গর্ব, একটু লজ্জা মেশানো হাসি দিল,
—” হ্যাঁ, গতরাতেই শুরু করেছিলাম। শেষ করতে পারিনি, তাই এখন বসেছি।”
ধারা এবার আরও কাছে ঝুঁকে প্যালেটটার দিকে তাকাল। আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে গিয়েও আবার থেমে গেল,
—” এগুলো সব রঙ? এতগুলো রঙ একসাথে লাগাতে হয় নাকি?”
নীল হেসে বলল,
—” হুম, একটা ছবি বানাতে শুধু এক রঙে হয় না। অনেকগুলো রঙ মিশে তবেই আসলটা আসে।”
ধারা মাথা নেড়ে বোঝার চেষ্টা করল। তারপর কৌতূহলী কণ্ঠে আবার জিজ্ঞেস করল,
—” আর এইটা?”
সে পানিভর্তি জারের দিকে তাকাল।
—” ব্রাশ পরিষ্কার করার জন্য। এক রঙ থেকে আরেক রঙে যেতে হলে ব্রাশ ধুতে হয়। না হলে সব মিশে কাদা হয়ে যাবে।”
ধারা হালকা হেসে ফেলল,
—” ঠিক মানুষের মনটার মতো। সবকিছু একসাথে মিশে গেলে কিছুই আলাদা করে বোঝা যায় না।”
নীল এক সেকেন্ড থমকে গেল। তারপর তাকিয়ে রইল ধারার দিকে। মুচকি হেসে বলল,
—” তুমি কিন্তু বেশ গভীর কথা বলো মাঝে মাঝে। খুব ম্যাচিইউর্ড মনে হয় তখন।”
ধারা একটু লজ্জা পেল। চোখ সরিয়ে আবার ক্যানভাসের দিকে তাকাল।
—” আমি কখনো এসব কাছ থেকে দেখিনি। আমাদের গ্রামে তো এমন কিছু ছিল না।”
—” শিখতে চাও? আঁকবে?”
হঠাৎ করেই বলে উঠল নীল।
ধারা চমকে তাকাল,
—” আমি? আমি পারব নাকি?”
নীল হেসে স্বাভাবিক গলায় বলল,
—” কেন পারবে না? আঁকা মানে শুধু হাত না, মন লাগে। আর তোমার সেটা আছে।”
ধারা কিছু বলল না। শুধু ক্যানভাসটার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে একটা নতুন ঝিলিক নিয়ে কিছুক্ষণ বাদে বলল,
—” কিন্তু এক মন সব জায়গায় বসে না।”
নীল একটু অবাক হলো। কথাটা মিথ্যে নয়। জবাবে হাসল সে। হালকা বাতাসে ধারার ওড়নাটা দুলে উঠছে, আর পাশে বসে থাকা নীল আবার ব্রাশটা রঙে ডুবিয়ে খুব যত্ন করে ছবির একটা অংশে টান দিল। এই মুহূর্তটা খুব সাধারণ, তবুও অদ্ভুত সুন্দর।
পেইন্টিং টা শেষ করতেই ধারা আগ্রহ নিয়ে বলল,
—” আমার গিফট টা?”
নীল হাসল। পাশ থেকে একটা মাঝারি বড় আকারের ক্যানভাস বের করল। দু’হাতে ধরে ধারার দিকে বাড়িয়ে দিল।
—”এই যে, তোমার গিফট।”
ধারা অবাক হয়ে ক্যানভাসটার দিকে তাকাল। উল্টো করে ধরা, তাই কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ভ্রু কুঁচকে বলল,
—”এটা? কিন্তু, কী আছে এতে?”
নীল চোখে রহস্য নিয়ে বলল, —”দেখে নাও।”
ধারা একটু ইতস্তত করে ক্যানভাসটা হাতে নিল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে সেটাকে ঘুরিয়ে সোজা করল। সাথে সাথে সে থমকে গেল। চোখ বড় হয়ে উঠল তার। ক্যানভাসে একটা মেয়েকে আঁকা, আর যে মেয়েটাকে আঁকা, সে আর কেউ না, ধারা নিজেই। একদম তার মতো করে লম্বা বিনুনি, সাদামাটা পোশাক, মুখে একধরনের নরম, শান্ত অভিব্যক্তি। চোখ দুটো যেন কিছু বলছে, অথচ কিছুই বলছে না। পেছনে হালকা ঝাপসা সবুজ, যেন এই বাগানটাই, এই মুহূর্তটাই। ধারার হাত কেঁপে উঠল হালকা। সে কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু শব্দ বের হলো না। গলা আটকে গেল যেন। খুব ধীরে, অবিশ্বাস ভরা কণ্ঠে বলল সে,
—” এটা..এটা আমি?”
নীল হেসে মাথা নেড়ে বলল,
—”হুম। গতকাল রাতে যখন তোমায় প্রথম দেখলাম, তখনই মাথায় ছবিটা চলে এসেছিল। আজকে একটু সময় নিয়ে শেষ করলাম।”
ধারা খুশিতে কেঁদে ফেলল। ছুঁয়ে দেখল ছবিটা। নীল হেসে আবারো বলল,
—” ট্রাস্ট মি ধারা, তোমার লম্বা বিনুনি টা আমায় ইমপ্রেস করেছিল বলেই এঁকেছি। নইলে আমি সুন্দরী মেয়েদের আঁকতে পছন্দ করিনা।”
বলেই ভাব নিয়ে টি শার্ট ঝাকালো নীল। যেন তার খুব অহংকার। ধারার চোখে পানি চিকচিক করে উঠল। ফিক করে হাসল নীলের কথা শুনে। কিন্তু মনে মনে সত্যিই খুব মুগ্ধ হলো। এতদিনে কেউ তাকে এভাবে, এভাবে দেখেছে? কেনো যেন ধারার মনে হলো এই প্রথম কেও তাকে সম্মান করছে। সে ধীরে ধীরে ক্যানভাসটা বুকের সাথে চেপে ধরল। কাঁপা গলায় বলল,
—” আমি সুন্দর কিনা জানি না, তবে আপনি আমায় খুব সুন্দর করে এঁকেছেন। আচ্ছা, আমি কি বাস্তবেও এত সুন্দর?”
নীল চোখ কুঁচকে মজা করে বলল,
—” নাহ। আমার ক্যানভাসের মেয়েটাই বেশি সুন্দর।”
ধারা ফিক করে হাসল আবারো। নীলও তাল মিলিয়ে হাসল। ধারা মাথা নেড়ে বলল,
—” ঠিক বলেছেন। এই ধারা বেশি সুন্দর।”
কথা শেষ করতে পারল না সে। শুধু মাথা নেড়ে হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু সেই হাসির মাঝেই জল গড়িয়ে পড়ল। খুব সন্তপর্ণে চোখ মুছতে মুছতে ধারা বলল,
—”ধন্যবাদ। সত্যিই… অনেক ধন্যবাদ নীল ভাই।৷ আমাকে কেউ কোনোদিন…এভাবে…
নীল একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বলল,
—”আরেহ, এত ইমোশনাল হওয়ার কী আছে! ভালো লেগেছে, এটাই তো সবচেয়ে বড় কথা। তুমি তো বড্ড ঝামেলার। কথায় কথায় ইমোশনাল হয়ে যাও।”
শ্রাবণ ধারা পর্ব ১১
ধারা হাসলো। আবার ক্যানভাসটার দিকে তাকাল, বারবার। যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না এটা সত্যি। এত কিছুর মধ্যে কেউ খেয়াল করল না। অনেকক্ষন আগেই বারান্দার কাঠের খুঁটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে একটা পরিচিত অবয়ব। তার দু’হাত পকেটে ঢুকানো। চোখ স্থির। কিছু বলছে না। কোনো শব্দ নেই তার। শুধু তাকিয়ে আছে শীতল দৃষ্টিতে। ধারার মুখে সেই আলো, সেই আবেগ, আর নীলের দিকে তার কৃতজ্ঞ দৃষ্টি সবকিছু খুব স্পষ্ট দেখছে শ্রাবণ তার চোয়াল ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল। চোখের দৃষ্টি ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে যেন কিছু একটা নিঃশব্দে জ্বলে উঠছে। সে ডাকল না। সামনে এগোল না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই ঝড় জমতে শুরু করেছে।
