Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৩

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৩

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৩
অনামিকা তাহসিন রোজা

ধারা কেন যেন ভীষণ খুশি। এর আগে পুকুর থেকে শাপলা তুলতে পারলে যেমন ভালোলাগা কাজ করতো, আজ পেইন্টিং এ নিজেকে দেখে তার তেমনই ভালো লাগা কাজ করছে। এত খুশি সে হাতে গোনা কয়েকবারই হয়েছে। নীলের পাশে বসে অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিল ধারা। কখন যে সময় গড়িয়ে গেছে, সেটা বুঝতেই পারেনি। মাঝে মাঝে নীল কিছু জিজ্ঞেস করেছে, মাঝে মাঝে নিজেই গল্প করেছে। আর ধারা চুপচাপ শুনেছে, কখনো হেসেছে, কখনো বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকেছে তার আঁকার দিকে। শেষে যখন আলোটা একটু নরম হয়ে এলো, আকাশে সন্ধ্যার রঙ মিশতে শুরু করল, তখন ধারা ধীরে উঠে দাঁড়াল। ক্যানভাসটা সে দু’হাতে খুব যত্ন করে ধরে আছে। যেন এটা শুধু একটা ছবি না, খুব আপন কিছু।

—”আমি এখন তবে যাই নীল ভাই…আপনি চা খাবেন?”
নরম গলায় বলল সে।
—”চায়ের ক্ষেত্রে আমি না করবনা। আর এটা সাবধানে রেখো কিন্তু। ইটস স্পেশাল।”
হেসে বলল নীল।
ধারা মাথা নাড়ল। চোখে সেই একই উজ্জ্বলতা নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। সোজা নিজের ছোট্ট ঘরটার দিকে। দরজাটা ভেতর থেকে হালকা বন্ধ করে ধারা ধীরে ধীরে ক্যানভাসটা নামাল। আগে যেটা নীল তাকে দিয়েছিল, সেটা যেখানে রেখেছিল, ঠিক তার পাশেই নতুন ছবিটা ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর একটু দূরে সরে এসে দাঁড়াল। দুটো ছবির দিকে তাকিয়ে রইল সে। একটা নদীর ধারে বসে থাকা মেয়েটা। আরেকটা সে নিজে। ধারার ঠোঁটের কোণে আস্তে আস্তে একটা হাসি ফুটে উঠল। এমন হাসি যা খুব সহজে আসে না। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে নিজের আঁকা ছবিটার সামনে দাঁড়াল ধারা। আঙুল বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল খুব হালকা করে, ঠিক মুখের অংশটা।

—” আমি কি এমন নিঁখুত? কাগজে রঙটা যেমন আমায় রাঙিয়েছে, আমি কি সত্যি এমন রঙিন?”
ফিসফিস করে বলল সে, যেন নিজেকেই চিনতে পারছে নতুন করে। চোখ দুটো আবার ভিজে উঠল, তবে এবার সেটা কষ্টের না, অদ্ভুত এক ভালো লাগা। এই অনুভূতিটা তার নতুন। অনেকদিন পর মনে হচ্ছে তারও জীবন আছে। সে একটু বিশেষ।
কিছুক্ষণ এভাবেই দাঁড়িয়ে রইল ধারা। সময় থেমে গেছে যেন। হঠাৎ করেই বাইরে থেকে ভেসে এলো আজানের শব্দ। সেই পরিচিত সুরটা ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল। ধারা চমকে উঠল না, শুধু ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল। ছোট্ট জানালাটা দিয়ে আকাশের এক টুকরো দেখা যায়। সেই আকাশ এখন গাঢ় কমলা থেকে ধীরে ধীরে নীলচে অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। বাড়ির উঠোনে আলো জ্বলে উঠেছে, দূরের রাস্তায় গাড়ির হেডলাইট একটার পর একটা জ্বলছে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আবার একবার ছবিগুলোর দিকে তাকাল। মনে হলো, আজকের দিনটা একটু আলাদা। একটু বেশি রঙিন। আর সেই রঙগুলো সে খুব যত্ন করে মনে রেখে দিতে চায়।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার ধারা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সালমা বেগমের ঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকল সে। তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে হবে। না জানি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন কিনা। ধারা তো খোঁজও নিতে পারেনি। ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকল ধারা। তার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা মলিন হতে থাকল একটু একটু করে। কেননা তার মাত্র আবারো মনে পড়ল শ্রাবণ দুপুরে আধখাওয়া প্লেট ফেলে চলে গিয়েছে, রাগ করে।
উপরওয়ালা বোধহয় ধারাকে সংকেত দিয়েছিল। শ্রাবণের কথা মস্তিষ্কে আসার কয়েক সেকেন্ড পর ধারা যখন সিঁড়ির প্রায় কাছে চলে আসল, তখনই কারো শক্ত হাত তার কবজি চেপে ধরল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই হাত তাকে হ্যাঁচকা টান মারল। মুহূর্তের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে দেয়ালের সাথে গিয়ে ঠেকে গেল ধারা। পিঠে ধাক্কা লাগতেই শরীর কেঁপে উঠল তার। এতটাই আকস্মিক, এতটাই দ্রুত সব হলো যেন চারপাশের সবকিছু এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। অবশেষে নিজেকে দেয়ালের সাথে ঠেসানো অবস্থায় আবিষ্কার করতে পারল ধারা। ভয়ে সে চোখ খিঁচে বন্ধ করল। বুক ধড়ফড় করতে লাগল। শ্বাস আটকে এলো। হাতটা এখনো কারো শক্ত মুঠোয় বন্দি। সেই চাপটা এতটাই দৃঢ়, মনে হচ্ছে নড়তেও পারবে না।

চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু নিজের দম নেওয়ার শব্দটা কানে বাজছে মেয়েটার। কয়েক সেকেন্ড খুবই নীরবতার মধ্যে গেল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলল ধারা। আর খুলেই স্থির হয়ে গেল। মুখের ঠিক সামনে একদম কাছে শ্রাবণ শেখকে দেখে ধারা যে অজ্ঞান হয়নি এ-ই অনেক। ধারা অবাক হয়ে তাকানোরও সুযোগ পেল না। তার মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে। নইলে বাস্তবে আগে কখনোই ধারা শ্রাবণকে এত কাছ থেকে দেখেনি। লোকটার মুখ এতটাই কাছে যে নিশ্বাসের উষ্ণতা পর্যন্ত অনুভব করা যাচ্ছে। চোখ দুটো গাঢ়, তীক্ষ্ণ, কেমন যেন অচেনা, অস্বস্তিকরভাবে গভীর।
ধারা আকাশ থেকে পড়ার মতো তাকিয়ে রইল। কণ্ঠ আটকে গেল তার। শ্রাবণের এক হাত দেয়ালে, আরেক হাত এখনো শক্ত করে ধরে আছে ধারার কবজি। যেন তাকে সরার কোনো সুযোগই দিচ্ছে না। তার চোয়াল শক্ত। শ্বাস ভারী। চোখে অদ্ভুত এক চাপা আগুন, যেটা সে নিজেও হয়তো পুরোটা বুঝতে পারছে না।
ধারা ভয়ে, বিস্ময়ে, অপ্রস্তুততায় একেবারে জমে গেছে। শরীরটা দেয়ালের সাথে ঠেসে আছে, সামনে থেকে শ্রাবণের এই হঠাৎ আগমন, সবকিছু মিলে মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গেছে তার। কিছু বলতে চাইল, পারল না। বিষয়টা ভ্রম কিনা বোঝার জন্য ধারা নিষ্ঠুর লোকটার মুঠোয় বন্দি হাতটা নাড়াতে চাইল। কিন্তু পারল না।
ধারা শুকনো ঢোক গিলল। ঠোঁট ভিজিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল,

—” আপ..আপনি?”
কন্ঠে কাঁপছে তার। জীবনে এত কাঁপা-কাঁপি করেনি ধারা সে নিশ্চিত। শ্রাবণ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল। একদৃষ্টে। আর সেই দৃষ্টির ভেতর রাগ আছে, বিরক্তি আছে, আর তার চেয়েও বেশি কিছু, যেটা শব্দে বোঝানো যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায় স্পষ্টভাবে। পরিস্থিতিটা এতটাই হঠাৎ, এতটাই ঘন, যেন বাতাসটাও ভারী হয়ে গেছে। ধারা বুঝতেই পারছে না, সে কী ভুল করেছে আবার, না কি, কিছুই না, তবুও ঝড় আসতে যাচ্ছে।
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই শ্রাবণ এবারে আরো জোরে দেয়ালে চেপে ধরল ধারার কব্জি, দুরত্ব মেটালো আরেকটু। ধারা ঘামতে শুরু করল। তার শরীরও অবশ হয়ে এলো শ্রাবণের দেহের চাপে। এত চাপাচাপি করছে কেনো লোকটা? দেয়ালে পিষে মেরে ফেলতে চায় নাকি? ধারার উথাল-পাতাল চিন্তার ব্যাঘাত ঘটিয়ে শ্রাবণ গম্ভীর কিন্তু বিপদজনক শক্ত কন্ঠে বলে,
—” তুমি একটা বেয়াদব মেয়ে। তোমার মত অভদ্র আমি লাইফে দুটো দেখিনি। বারবার..বারবার আমায় বিরক্ত করছো। শান্তিতে থাকতে দিচ্ছো না কেনো হুম? সমস্যা কী তোমার?”
ধারা শুকনো ঢোক গিলে বলল,

—” আমি..আবার কী করেছি?”
শ্রাবণ এবারে হিসহিসিয়ে রাগ নিয়ে বলল,
—” আমি যখন বলেছি রান্না ভালো হয়নি, তারমানে ভালো হয়নি। কোথাকার কোন নীল-সবুজ কী বলেছে সেটা আমার দেখার বিষয় না। কোন সাহসে তুমি তখন আমার উপরে কথা বলেছো হ্যাঁ? আমি যখন বলেছি, লবণ কম হয়েছে, তখন ভদ্র মেয়ের মত তোমার সেটা মেনে নেয়া উচিত ছিল, রাইট? বাট তুমি সেটা করোনি। কেনো? এখন তোমাকে আমার উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা উচিত না বলো?”
ধারা ভয়ার্ত চেহারা বানিয়ে ফেলল। শ্রাবণের অর্ধেক কথা কান দিয়ে বেরিয়ে গেল তার। তবে রান্নার কথাটা শুনে সে ঠোঁট কাঁমড়ে একটু ভেবে বলল,
—” আপ-আপনি ওটার জন্য রাগ করে খেলেন না? আচ্ছা.. আমি কথা ফিরিয়ে নিচ্ছি। তাহলে কি লবণ দিয়ে মাংসটা আরেকটু কষিয়ে নেব?”
শ্রাবণ তৎক্ষনাৎ বলল,

—” না। সব ঠিকই আছে। লবন ঠিক আছে। ”
—” একটু আগেই না বললেন লবণ কম।”
—” একটু আগে বলেছি। এখন বলছি ঠিক আছে। আমি যখন যা বলব, তখন সেটাই ঠিক। গট ইট?”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে মাথা উপর-নিচ করল, যার অর্থ হ্যাঁ সে বুঝেছে। কিন্তু বেচারি এটা বোঝেনি শ্রাবণ শেখের মাথা কবে নষ্ট হলো। শ্রাবণ আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই শোনা গেল সিঁড়ি দিয়ে কারো ওঠার শব্দ। নীল সব আঁকাআঁকির জিনিসপত্র নিয়ে উপরে উঠছে। ধারা ও শ্রাবণ নিচ থেকে আসা শব্দ শুনে বুঝে ফেলল সেটা। সাথে সাথে আঁতকে উঠল ধারা। জোরপূর্বক শ্রাবণের মুঠো থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল,

—” ছাড়ুন। তাড়াতাড়ি ছাড়ুন। উনি দেখে ফেলবে।”
শ্রাবণের মাথায় আগুন ধরে গেল। ও আবারো দেয়ালের সাথে চেপে ধরল ধারাকে। এবারে গমগমে স্বরে বলল,
—” সো হোয়াট? কী বোঝাতে চাইছো তুমি? ও দেখে ফেললে কি তোমাকে আর ভালো করে ট্রিট করবেনা এই ভয় পাচ্ছো? তুমি চাইছো ও জানুক তুমি সিঙ্গেল?”
ধারা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাত ছাড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করে বলল,
—” পাগল হয়ে গিয়েছেন আপনি? কী যা-তা বলছেন? আপনিই তো চেয়েছেন নীল ভাই যেন আমাদের সম্পর্কে কিছু জানতে না পারে। এখন একসাথে দেখে ফেললে সন্দেহ করবেনা? আপনি কি তা-ই চান? আপনার মান-সম্মান ধুলোয় মিশাতে চান?”

শেষের কথাটা একটু তাচ্ছিল্য করেই বলল ধারা। তার এবারে বিরক্ত লাগছে পুরো পরিবেশটা।
শ্রাবণের মাথায় এবারে ব্যাপার টা আসল। কিন্তু সে ধারাকে ছাড়ল না। বরং দ্রুত প্রায় টেনে হিঁচড়ে নিজের ঘরে ঢুকিয়ে দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করে দিল শ্রাবণ। সঙ্গে সঙ্গেই লক হলো দরজা। শব্দটা ঘরের ভেতরে প্রতিধ্বনি হয়ে কেমন ভারী হয়ে রইল। ধারা দম নেওয়ার আগেই আবার দেয়ালের সাথে চেপে ধরল তাকে সে। এবার আরও কাছে। আরও শক্ত। ধারার বুক ধড়ফড় করছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে বুঝতেই পারছে না, এটা রাগ, না অন্য কিছু, নাকি দুটোই মিশে গেছে।
শ্রাবণ নিচু হয়ে তার চোখের সমান হয়ে তাকাল। চোখ দুটো লালচে, তীক্ষ্ণ। ধীরে, চাপা গলায় বলল সে,

—”বেশ মজা হচ্ছিল, তাই না?”
ধারা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল, —”মানে ?”
শব্দগুলো প্রায় চেপে চেপে বের হলো শ্রাবণের মুখ থেকে,
—”ওর সাথে বসে গল্প, হাসাহাসি, তারপর গিফট আদান-প্রদান। খুব স্পেশাল লাগছে না ব্যাপারটা?”
ধারা কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না কী বলবে। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,
—”আপনি কী বলতে চাইছেন?”
শ্রাবণ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল,
—”আমি কী বলতে চাইছি, সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো।”
ধারা এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে উঠল,
—”না, আমি কিছুই বুঝছি না। স্পষ্ট করে বলুন।”
শ্রাবণ আরও কাছে ঝুঁকল,
—”ও যে তোমার ছবি এঁকে দিয়েছে, সেটা নিয়ে এত খুশি হওয়ার কী আছে হ্যাঁ? কিসের এত হাসি? কিসের এত আবেগ? এত কথা কীসের তোমাদের?”
ধারা থমকে গেল। তার চোখে আবার সেই অবাক ভাবটা ফিরে এলো। বলল,

—” কথা বললে সমস্যা কোথায়?”
শ্রাবণ ব্যঙ্গ ভরা হাসল,
—” ওহ আচ্ছা। মানে এতদিন আমাকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করে যখন ব্যর্থ হলে তখন নীলকে ইমপ্রেস করছো। নিজে থেকে এত মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলছো রাইট? সিমপ্যাথি পাওয়ার চেষ্টা করছো?”
ধারার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল এবার। সে ভাবতেও পারল না শ্রাবণের মনে এত কটু চিন্তা ভাবনা চলছে।
—”আপনি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।”
শ্রাবণ থামল না। বলতে থাকল,
—”তুমি তো বেশ চুপচাপ, ভদ্র টাইপের, তাই না? আমার সামনে তো কথা-ই বের হয় না। আর ওর সামনে, মনে হয় একদম অন্য মানুষ। হাসছো, গল্প করছো, আর এখন..
হঠাৎ করেই তার কণ্ঠটা আরও নিচু, আরও ধারালো হয়ে উঠল, —”নিজের ছবি নিয়ে আবেগে ভাসছো। খুব ভালো লেগেছে?’
ধারা এবার চোখ তুলে সোজা তাকাল তার দিকে। শ্রাবণের প্রতি না চাইতেও ঘৃনা জন্মাল তার। চোখ দিয়ে পানি পড়ল টপটপ করে। প্রচুর জেদ জন্ম নিলে, শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় ধারা বলল,

—”হ্যাঁ, ভালো লেগেছে। খুব ভালো লেগেছে। কারণ কেউ কোনোদিন আমাকে এভাবে দেখেনি। কেও আমায় এতটা স্নেহ করেনি, সম্মান করেনি।”
শ্রাবণ থমকে গেল এক সেকেন্ডের জন্য। ধারা থামল না।
—”আপনার কাছে আমি কী, সেটা আমি জানি। কিন্তু অন্য কেউ যদি আমাকে মানুষ হিসেবে সম্মান করে, সেটাতে সমস্যা কোথায়?”
ঘরের বাতাস যেন জমে গেল। শ্রাবণের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল আবার। ধীরে প্রশ্ন ছুঁড়ল সে,
—”সম্মান? তুমি কি নিশ্চিত ওটা শুধু সম্মান?”
ধারা এবার সত্যিই ক্ষেপে গেল। তার কণ্ঠে কাঁপন থাকলেও চোখে ছিল স্পষ্ট প্রতিবাদ,
—”আপনি কী বোঝাতে চাইছেন? সবকিছুর খারাপ মানে বের করা বন্ধ করুন। সবাই আপনার মতো নিচু প্রকৃতির না।”
কথাটা সরাসরি আঘাত করল শ্রাবণকে। ধীরে ধীরে সে ধারার কব্জি ছেড়ে দিল। চোখে মুহূর্তের জন্য ঝলক খেলল, যেখানে রাগ, অপমান আর কিছু অদ্ভুত আছে। ধারা হাত ছাড়া পেতেই চোখের সামনে এনে দেখল। কব্জি টা লাল হয়ে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। দেখে কান্না পেল ধারার। আজ অনেকদিন পর নিজের গায়ে এমন চিহ্ন দেখল সে।
ধারা চোখে একরাশ পানি নিয়ে শ্রাবণের দিকে তাকাল। গলা ভেঙে কান্না আসছে তার। কিন্তু যথাসম্ভব নিজেকে শক্ত রাখার নিদারুণ চেষ্টা করে কাঁপা গলায় ধারা বলল,

—” আপনি একটা অমানুষ। আপনার মত নিচু প্রকৃতির মানুষ আমি কখনো দেখিনি। কীভাবে এতটা ছোট মন হয় আপনার? কেমন নোংরা চিন্তা ভাবনা হলে আপনি এসব ভাবেন? আমি কি লোভী? আমি কি কিছু চেয়েছি আপনার কাছে? কোন হিসেবে আপনি মনে করেন আমি একজন বাইরের পুরুষকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করব? আপনার ভাষায় আমি নীল ভাইকে পটানোর চেষ্টা করছি তাই তো? আমি আপনার চোখে এমন তাই তো? বেশ। আমি তাহলে এমনই। যা খুশি ভাবুন আপনি।”
কথাগুলো বলতে বলতেই কেঁদে ফেলল ধারা। দুহাতে অস্থির হয়ে চোখের পানি মুছে আবারো কাঁপা গলায় কিন্তু কষ্টে বলল,
—” আপনি নীল ভাইয়ের কথা বলছেন না? অন্তত উনি একজন ভালো মানুষ। তার মানসিকতা ভালো। পুরুষ হয়ে নিশ্চয়ই আরেক পুরুষের দৃষ্টি বোঝেন, আপনি দয়া করে আমার প্রতি ওই মানুষটার দৃষ্টি দেখে আসবেন। উনি আমাকে সম্মান করে, আমায় মানুষ হিসেবে দেখে। তাহলে উনার প্রতি আমার সম্মান আসবে না কেনো? কেনো উনাকে পছন্দ করবনা? শুধু আমি কেনো? পৃথিবীর যেকোনো মেয়ে নীল ভাইকে পছন্দ করবে।”

—” তুমি পছন্দ করো নীলকে?”
এতক্ষন সবকিছু মনোযোগ দিয়ে হজম করলেও শেষ কথাটা শুনে শ্রাবণ শীতল গলায় প্রশ্নটা ছুঁড়তে বাধ্য হলো। ধারাও একটুখানি থামল। বুঝল কথাটা বেশি হয়ে গেছে। ভুল অর্থে চলে গিয়েছে। কিন্তু সে পিছিয়ে গেল না। শান্ত স্বরে বলল,
—” মানুষ হিসেবে অবশ্যই পছন্দ করি। কিন্তু… আমার এও মনে আছে আমি বিবাহিত।”
দুজনেই চুপ রইলো অনেকটা সময়। খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। শ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে। শ্রাবণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ধারার চোখের দিকে। যেন কিছু খুঁজছে, অথবা নিজেকেই বোঝার চেষ্টা করছে। তারপর হঠাৎ করেই অপর হাতটা ছেড়ে দিল। ধারা দেয়াল থেকে একটু সরে দাঁড়াল, কিন্তু এখনও দম নিতে পারছে না ঠিকমতো।
শ্রাবণ মুখ ঘুরিয়ে বলল, —”দূরে থাকো ওর থেকে।”
কণ্ঠটা ঠান্ডা। কিন্তু সেই ঠান্ডার ভেতরে আদেশ লুকানো। ধারা অবাক হয়ে তাকাল, —”কেন?”
শ্রাবণ তাকাল না। শুধু বলল, —”আমি বলেছি বলে।”
ধারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,

—”সবকিছুতেই আপনার কথাই শেষ কথা না। আমি আপনার কথা শুনব না।”
এই এক বাক্য ঘরের ভেতর আবার ঝড় তোলার মতো যথেষ্ট। শ্রাবণ চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,
—” সাহস থাকলে আবার বলো।”
ধারা কান্না আটকাতে পারছেনা। সে আবারো টপটপ করে পড়তে থাকা অশ্রুকণা মুছতে মুছতে বলল,
—” মা বলেছে নীল ভাই যতদিন এ বাড়িতে আছেন, ততদিন আপনি আমার কাছে পরপুরুষ। আমি যেন আপনাকে স্বামীর চোখে না দেখি। তাই আমি আপনার কোনো কথা শুনব না। আর… আমি ধারা, এখন এই মুহুর্তে আপনাকে বলছি, শুধু এখন কেনো? আমি ভবিষ্যতে কখনোই আপনাকে আর ভালো চোখে দেখব না, আপনার কথাও শুনব না। দরকার নেই আমার কোনো সংসার! নামমাত্র স্বামীর দরকার নেই। আপনি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিন। এখনি তালাক দিন আপনি। এখনি মুখে তালাক দিন। তিন তালাক বলুন। বলুন, বলুন! এখনি বলুন!”
কাঁদতে কাঁদতে খেই হারালো। এক পর্যায়ে শ্রাবণের বুকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বসলো। কয়েক পা পিছিয়ে গেল শ্রাবণ। এমনিতেও শক্ত করে নিজেকে রাখেনি সে। ক্লান্ত হয়েই ভারসাম্য হারিয়েছে। ধারা আবারো চোখ মুছলো। কি আশ্চর্য! এত চোখের পানি কেনো পড়ছে।
শ্রাবণ কিছুক্ষণ কান্নারত ধারার দিকে তাকিয়ে থেকে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
—” সত্যিই মুখে তালাক দেব এখন?”
ধারা ভেজা চোখ মেলে তাকাল শ্রাবণের দিকে। কান্নার তোপে বুক ওঠানামা করছে তার। অসহায় চোখদুটো লুকাতে ব্যর্থ সে, তবুও সাহস করে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝালো। শ্রাবণ এক পা এগিয়ে এসে আবারো শীতল কন্ঠে নিশ্চিত হতে বলল,
—” সত্যিই তো? এখনই তালাক দেব?”

ঘরটা নিস্তব্ধ। শুধু দুজন মানুষের ভারী শ্বাসের শব্দ, একটা দমবন্ধ করা, টানটান নীরবতা। শ্রাবণের চোখ দুটো এবার আর আগের মতো জ্বলে উঠছে না, কিন্তু ভেতরে যেন অদ্ভুত কিছু ঘূর্ণি পাক খাচ্ছে। রাগ, অপমান, আর অস্বীকার করা সেই এক অনুভূতি। ধারার চোখ এখনো ভেজা। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। কিন্তু মাথাটা নড়েনি। হ্যাঁ বলার সেই সাহসটা এখনো ধরে রেখেছে।
শ্রাবণ নিচু হয়ে তার চোখের দিকে তাকাল। খুব কাছে। এতটাই কাছে যে ধারার শ্বাস তার গালে লাগছে।
—” সত্যিই তো?”
ধারা কাঁপা গলায় বলল, —” হ্যাঁ..!”
কয়েক সেকেন্ড চুপ রইলো শ্রাবণ। তারপর হঠাৎ হেসে ফেলল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই। তাচ্ছিল্য মাখা, ঠান্ডা, কেমন যেন কাঁটার মতো।
—” এত সহজ মনে হয় তোমার? তিনটা শব্দ বললেই সব শেষ?”
ধারা ভ্রু কুঁচকাল। বুঝতে পারল না। শ্রাবণ এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

—” তালাক কোনো খেলনা না মেয়ে। রাগ হলো, কাঁদলাম, আর বললাম, শেষ? এত সস্তা?”
ধারার বুকটা ধক করে উঠল। কিন্তু সে চুপ রইলো। সে নিজেও জানে একটা সম্পর্কের মানে। শ্রাবণ এবার হঠাৎ ঘুরে তাকাল,
—” আর একটা কথা শুনে রাখো। আমি যেটা শুরু করেছি, সেটা আমি শেষ করব। কিন্তু আমার ইচ্ছায়। তোমার কান্নায় না, তোমার জেদের জন্যও না।”
ধারা এবার গলা শক্ত করে বলল,
—” আমারও কোনো ইচ্ছা নেই এই সম্পর্ক রাখার। আমি আপনাকে পছন্দ করিই না।”
শ্রাবণ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো আবার। চোখে সেই বিপজ্জনক স্থিরতা।
—” সমস্যা সেখানেই।”
ধারা কিছু বলার আগেই সে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
—” তুমি যতই বলো তোমার দরকার নেই, তোমার প্রতিটা কাজ বলে তুমি এই সম্পর্কটাকে ভীষণ সিরিয়াসলি নিচ্ছো। আর পছন্দ করার বিষয়টা বললাম না। তুমি আমায় পছন্দ করতে পারো এমন কোনো কাজই করিনি আমি। বাট তুমি আর যাই হোক না কেনো, স্ত্রীর দায়িত্ব তো হারে হারে পালন করছো।”
ধারা হতবাক হয়ে তাকাল,

—” মা-মানে?”
শ্রাবণ থুতনিতে হাত বুলিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
—” মানে সেটাই। নাহলে একজন তোমার ভাষায় নিচু প্রকৃতির লোকের জন্য এত যত্ন নিয়ে রান্না করো কেন? অমানুষটা না খাওয়ায় কষ্ট পাও কেন? তার একটা কথায় কেঁদে ফেলো কেন?”
ধারার চোখ আবার ভিজে উঠল। কিন্তু এবার সে কাঁদল না। শুধু তাকিয়ে রইল। চেঁচিয়ে বলতে মন চাইল, সম্পর্কের মানে আপনি কী বোঝেন? শ্রাবণও তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বলল,

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১২

—” ডিভোর্স চাও? গুড। পাবে।… কিন্তু আজ না। এখন না।”
ধারার বুক কেঁপে উঠল। শ্রাবণ পেছন ঘুরে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
—” যেদিন আমি চাই, সেদিন!”
আর একবারও পেছনে না তাকিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল শ্রাবণ। ঘরে দাঁড়িয়ে রইল ধারা। হাত কাঁপছে, বুক ভারী, চোখে জমে থাকা পানি ঝাপসা করে দিচ্ছে সবকিছু। কিন্তু এবার সে কাঁদল না। শুধু ধীরে ধীরে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। মুখ দুহাত দিয়ে ঢেকে কেঁপে উঠল। মনে একটা কথাই ঘুরছে—এই মানুষটা আসলে কী চায়?

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here