শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৮
অনামিকা তাহসিন রোজা
নীল বেরিয়ে যাওয়ার পর ধারা রান্নাঘরের সব কাজ শেষ করল। আজ সে নিজের মনের মত করে রান্নাঘরে কাজ করতে পেরেছে। ভাগ্যিস সালমা বেগমের কোঁমড় ব্যাথার জন্য কিছু করতে পারছেন না, নইলে ধারা তো বুঝতেই পারতো না সংসারের কাজ করতে কত ভালো লাগে। সব কাজ শেষে সোফায় সালমা বেগমের পাশে এসে বসল ধারা। টিভির দিকে তাকিয়ে দেখল একটা সিরিয়ালের রিপিট টেলিকাস্ট দেখছে তার শ্বাশুড়ি। এত মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখে অবাক হলো ধারা,
—” মা? আপনি তো এটা গত রাতেই দেখেছেন। আবারো কেনো দেখছেন?”
সালমা বেগম টিভির দিকে চোখ রেখেই হাসলেন,
—” ধুর। একবার দেখে মন ভরে নাকি। তুই খেলি মা? নাস্তাটা করে নে যা।”
ধারা মুচকি হেসে বলল,
—” পরে খাব। এখন খিদে নেই।!”
সালমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরপর আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে ফিসফিস করে বললেন,
—” শ্রাবণ কোথায়?”
—” উপরে আছে মা। উনার ঘরে৷ ”
ভ্রু কুঁচকালেন ভদ্রমহিলা,
—” বদমাশটা অফিস যাবেনা?”
ধারা কাঁধ উঁচিয়ে মাথা নাড়ালো। যার অর্থ সে তো জানে না। সালমা বেগম রিমোট ঠোঁটে চেপে ভেবে বললেন,
—” তুই এবার বিশ্রাম নে যা। যাওয়ার সময় একটু ওর ঘরে উঁকি মেরে দেখে নিস কী করছে। অফিস তো যাওয়ার কথা।”
ধারা হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে সোফা থেকে উঠে সিঁড়ির দিকে গেল। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। নিচে টিভির শব্দ এখনো ভেসে আসছে ক্ষীণভাবে। পুরো বাড়িটা কেমন অলস বেলার আবেশে ডুবে আছে। এক হাতে ওড়নার কোণা চেপে ধরে সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই থমকে গেল ধারা।
শ্রাবণ নিজের ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুহাত বুকের কাছে গুটানো। এলোমেলো চুল এখনো পুরো ঠিক হয়নি। মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব। চোয়াল খানিক শক্ত করে রাখা। কিন্তু আজ তার চোখদুটো অদ্ভুত। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ধারার দিকে। এমন সেই দৃষ্টি যেন অনেকক্ষণ ধরে ধারার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
ধারার বুক ধক করে উঠল। পা দুটো কেমন থেমে গেল মাঝপথে। কেন যেন হঠাৎ অকারণে ভয় লাগতে শুরু করল তার। গতরাতের কথা মনে পড়তেই আরো অস্বস্তি হলো। শ্রাবণ কিছু বলল না। শুধু তাকিয়েই রইল। সেই দৃষ্টি এড়িয়ে ধারা দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে গুটিগুটি পায়ে নিজের স্টোররুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল। মনে মনে শুধু একটাই চিন্তা, পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে যেতে পারলেই বাঁচা যায়।
করিডোরটা এখন যেন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সরু লাগছে। ধারা খুব সাবধানে শ্রাবণের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। ঠিক তখনই, শীতল এবং নিচু কন্ঠে অপ্রত্যাশিত ভাবে শ্রাবণ ডাকল,
—” ধারা।”
ধারার পা সাথে সাথে থেমে গেল। কেননা শ্রাবণ শেখের মুখে নিজের নাম এই প্রথমবার শুনলো সে। এর আগে সর্বদাই এই মেয়ে, এই বেয়াদব, এসব ছাড়া কিছু শোনেনি ধারা। মেয়েটা ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। বুকের ভেতর আবার ধুকপুক শুরু হয়েছে। শ্রাবণ এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। দরজার ফ্রেম থেকে সরে এলো আস্তে করে। চোখদুটো এখনো ধারার উপর স্থির। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীরে বলল,
—” একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”
ধারা শুকনো ঢোক গিলল,
—” জি?”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। তারপর খুব ধীরস্বরে বলল,
—” গতরাতে…আমি কি খুব বাজে কিছু করেছি?”
প্রশ্নটা শুনে ধারার বুক কেঁপে উঠল। গতরাতের দৃশ্যগুলো আবার হুড়মুড় করে মাথায় ভেসে উঠল। রাস্তার বেঞ্চ। মাতাল শ্রাবণের বকবক। আমার বউ আছে বলা। তারপর সেই জড়িয়ে ধরা। ধারা তড়িঘড়ি চোখ সরিয়ে নিল। গালদুটো অকারণেই উষ্ণ হয়ে উঠছে।
—” না তো। আর..আমি..কী করে জানবো?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকাল,
—” মিথ্যে বলছো?”
ধারা চমকে তাকাল। দুদিকে ঝটপট মাথা নাড়াল। মিথ্যে বলছে না সে, বরং বড়সড় মিথ্যে বলছে। শ্রাবণ ধীরে ধীরে আরো এক পা এগিয়ে এলো। নিচু গলায় বলল,
—” আমার কিছুই মনে নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে, আমি এমন কিছু করেছি, যেটা করা উচিত হয়নি।”
ধারার গলা শুকিয়ে গেল। শ্রাবণ এবার খুব মনোযোগ দিয়ে তাকাল তার চোখের দিকে। তারপর হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডাকল,
—” এদিকে আসো।”
ধারা চমকে থমকে তাকাল। গতরাতের মত স্তব্ধ হয়ে বলল,
—” এহ? কী?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে আবারো বলল,
—” এদিকে আসতে বলেছি।”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে অবুঝ হয়ে দুপা এগিয়ে আসল। শ্রাবণের মনপুত হলো না, সে আবারো অন্যদিকে তাকিয়ে আদেশ ছুঁড়ল,
—” আরো তিন পা এগোও।”
ধারা যে গলে গিয়েছে এমনটা না। সে মূলত ভ্রু কুঁচকে আহাম্মকের মত শ্রাবণের আদেশ মানছে। বুঝতে পারছেনা এখানে হচ্ছে টা কী তার সাথে। ধারা আবারো শুকনো ঢোক গিলে দুই পা এগোতেই আবিষ্কার করতে পারল আরেকপা এগোলে তার আর শ্রাবণের দুরত্ব খুব কমে যাবে, যা আগে কখনো হয়নি, গতরাত ব্যতীত। তাই ধারা আর এগোলো না।
শ্রাবণ বিরক্ত হয়ে নিজেই দুই পা এগোলো। ধারার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল মুহুর্তেই। রীতিমতো ঘাড় খানিকটা উঁচু করে শ্রাবণের চোখের দিকে তাকাতে হচ্ছে পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চির ধারাকে। সে চোখ পিটপিট করে বোঝার চেষ্টা করল শ্রাবণ এখনো নেশার মধ্যে আছে কিনা। নইলে তো এত কাছে আসা সম্ভব না। ধারার এই চমকপ্রদ চেহারাকে পাত্তা না দিয়ে শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর খুব ধীর গতিতে মাথা নামিয়ে ধারার কান বরাবর নেমে এলো। ধারা প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই, কিছু বুঝে ওঠার আগেই শ্রাবণ ধারার ঘাড়ের কাছে নাক নিয়ে এসে গভীরভাবে শ্বাস টেনে নিল। চোখ বুঁজে ঘ্রাণ নিয়ে আবারো ধীরে ধীরে সরে এলো শ্রাবণ।
ধারা পাথরের মত জমে রয়েছে। মনে হলো সময় থেমে গেছে। পুরো করিডোরটা হঠাৎ নীরব হয়ে গেল যেন। নাহ, সে একটুও শ্রাবণের স্পর্শ পায়নি। এত কাছে কোনোদিন আসেনি শ্রাবণ। গতরাতে এসেছিল, কিন্তু সেটা ছিল নেশার ঘোর। সেখানে হুঁশ ছিল না, সংকোচ ছিল না, বোঝাপড়া ছিল না। কিন্তু এখন?এখন মানুষটা সম্পূর্ণ জেগে আছে। সম্পূর্ণ সচেতন। আর সেই লোকটাই কয়েক মিলিমিটার দুর থেকেই তার ঘাড়ের কাছে এসে ঘ্রাণ নিয়েছে। কিন্তু কীসের ঘ্রাণ? ধারা নড়তে পারল না।শুধু নিজের বুকের শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে। স্পর্শ না পেলেও মানুষটাকে তো অনুভব করতে পেরেছে।
ধারার পুরো শরীর কেঁপে উঠল ভেতরে ভেতরে। হাতের আঙুলগুলো অসাড় হয়ে এলো। মনে হলো হাঁটুতে আর জোর নেই। তার বুকের ভেতর কেমন হালকা শিরশিরে একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল, যা সে আগে কখনো অনুভব করেনি। এটা ভয়? নাকি অন্য কিছু? ধারা বুঝতে পারল না। সে শুধু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেল যেন। তার মনে হচ্ছিল যদি একচুলও নড়ে, তাহলে হয়তো এই মুহূর্তটা ভেঙে যাবে।
শ্রাবণ ধীরে ধীরে মুখ সরিয়ে আনল। কিন্তু পুরোপুরি সরে গেল না। এখনো খুব কাছে দাঁড়িয়ে। এতটাই কাছে যে ধারা একটু নড়লেই শ্রাবণের থুতনি ছুঁতে পারবে। ধারার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল। শ্রাবণ এবার চোখ নামিয়ে তাকাল তার মুখের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে সেই দৃষ্টি গিয়ে থামল ধারার চোখে। ধারা খেয়ালই করেনি সে কখন চোখ বুঁজে ফেলেছিল। চোখদুটো কাঁপছে হালকা।
শ্রাবণের মুখে হঠাৎ খুব ক্ষীণ কিছু একটা ফুটে উঠল। অবাক হওয়া? স্বস্তি? নাকি নিজের সন্দেহ সত্যি হওয়ার পরের অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা? সে কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল ধারার দিকে।
ধারা কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। এখনো শ্রাবণকে এতটা কাছে দেখে সে নিজেই এবারে অস্বস্তিবোধ করল। মাথা নামিয়ে এক পা পিছিয়ে এসে বলল,
—” কী সমস্যা আপনার?”
শ্রাবণ একটুও অবাক হলো না। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—”স্মেলস গুড। কোন পারফিউম ইউজ করেছো?”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকাল। অবাক হয়ে বলল,
—” পারফিউম?”
এসনভাবে বলল যেন এই নাম আগে কখনো শোনেনি। এরপর সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—” আমি কখনো পারফিউম ইউজ করিনি।”
শ্রাবণ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল ধারার দিকে। যেন কথাটা মিলিয়ে দেখছে নিজের মাথার ভেতর। পারফিউম ইউজ করেনি? তাহলে এই ঘ্রাণটা…তার চোখের ভেতর আবারো খুব ক্ষীণ একটা ভাব ফুটে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সেটা চেপে ফেলল সে। মুখ ফিরিয়ে হালকা কাশল একবার। তারপর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
—” ওহ। তাহলে হয়তো শ্যাম্পু বা সাবান।”
ধারা এখনো ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ব্যাপারটা তার মোটেও স্বাভাবিক লাগছে না। মাথাটাথা গেছে নাকি লোকের।
—” আপনি হঠাৎ এসব জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
শ্রাবণ নির্লিপ্ত গলায় বলল,
—” এমনি।”
—” এমনি কেউ এভাবে… ”
ধারা শেষ করল না বাক্যটা। এইবার শ্রাবণ এক সেকেন্ড থামল। তারপর ধীরে ধীরে তাকাল ধারার দিকে। ঠোঁটের কোণে খুব হালকা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
—” এভাবে কী?”
—” কীসের ঘ্রান নিলেন?”
—”কে বলেছে ঘ্রান নিয়েছি?”
ধারা সাথে সাথে থমকে গেল।
—” আমি তো দেখেছি!”
—” ভুল দেখেছো।”
—” এত্ত কাছাকাছি এসে…
—” তোমার সমস্যা কী?” শান্ত গলায় কথার মাঝখানেই থামিয়ে দিল শ্রাবণ।
— “তুমি কি চাও আমি স্বীকার করি যে আমি তোমার ঘাড়ের কাছে গিয়ে স্মেল নিয়েছি?”
ধারা একদম চুপ করে গেল। মুখ লাল হয়ে গেছে মুহূর্তেই। শ্রাবণ এবার বিরক্ত ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—” সবসময় বেশি ভাবো তুমি ইডিয়ট। আমি তো জাস্ট দেখছিলাম স্মেলটা কীসের। ভাবলাম আমার পারফিউম ইউজ করেছো কিনা। স্মেলটা চেনা লাগছিল।”
এ পর্যায়ে চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর কন্ঠে ধারা
—” আমার ঠ্যাকা পড়েনি আপনার পারফিউম ইউজ করার। আমার ওসবের দরকার হয়না।”
শ্রাবণ মাথা নাড়াল। স্পষ্ট সুরে বলল,
—” ও আচ্ছা। হাউএভার, নাটক কম করো। তুমি এমন ভাব করছো যেন আমি ভয়ংকর কিছু করে ফেলেছি।”
ধারা হতভম্ব হয়ে বলল, —” ভয়ংকর না?”
—” না।”
—” তাহলে কী?”
শ্রাবণ কাঁধ ঝাঁকাল, —” কিছু না।”
তারপর একটু থেমে আবারো খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
—” আর যাই হোক, অন্তত এখন এটা নিশ্চিত হয়েছি যে গতরাতে আমি যার-তার সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করিনি।”
কথাটা বলেই সে গভীর একটা শ্বাস ফেলল। যেন সত্যি সত্যিই বুকের উপর থেকে বিশাল পাথর নেমে গেছে। ধারা কেমন থমকে তাকিয়ে রইল।
—” মানে?”
শ্রাবণ সাথে সাথে বুঝতে পারল মুখ ফসকে বেশি বলে ফেলেছে। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ ঘুরিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,
—” তোমার মত বলদ বুঝবে না। এখন আমার চোখের সামনে থেকে যাও তো।”
ধারা চোখ পিটপিট করল। বিরক্ত হলো প্রচুর। নিজেই ডেকে এখন নিজেই তাড়িয়ে দিচ্ছে যেন ধারা ইচ্ছে করে এসেছে। তাই ধারা কঠিন স্বরে বলল,
—” আমি যাব না।”
চোখ সরু করে তাকাল শ্রাবণ,
—” আমার চোখের সামনে থাকতে চাইছো?”
সাথে ঝটপট মাথা নাড়াল ধারা,
—” না। একদম না।”
—” তাহলে গেট আউট অফ মাই সাইট!”
ধারা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বড় বড় শ্বাস ফেলে রাগান্বিত চোখে তাকাল শ্রাবণের দিকে। আগের থেকেও চড়া সুরে বলল,
—” এভাবে বলার কী আছে?নিজেকে কী মনে করেন? রাজা-বাদশা? আপনি নিজেই আমাকে ডেকে এখন এমন ভান করছেন যেন আমি আপনার সাথে কথা বলার জন্য বসে ছিলাম। এরকম অদ্ভুত আচরণ করার মানে কী? আপনার মত মানুষের সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই আমার।”
ধারার গলা যথেষ্ট কঠিন শোনালেও শেষের দিকটায় অজান্তেই একটু কেঁপে গেল। সে নিজেও সেটা টের পেল। আর সেই কারণেই আরো বেশি বিরক্ত লাগল নিজের উপর। কেন পারে না সে? কেন এই মানুষটার সামনে এলেই তার সব রাগ, সব আত্মসম্মান, সব ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখা কথাগুলো এলোমেলো হয়ে যায়? সে তো ঠিক করেছিল এবার থেকে দূরে থাকবে। কথা কম বলবে। পাত্তা দেবে না। কিন্তু বাস্তবে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, শ্রাবণ দুটো কথা বললেই তার বুক ধুকপুক শুরু হয়ে যায়।
ধারা দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল। যেন নিজের দুর্বলতা লুকাতে পারে। শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর দেয়াল থেকে সরে এসে ধীর পায়ে একটুখানি কাছে দাঁড়াল। এবার গলায় সেই আগের খিটখিটে ভাবটা নেই। বরং অদ্ভুত শান্ত।
—” তুমি রাগ করেছো?”
ধারা একটু অবাক হলো, তবে সাথে সাথে জবাব দিল,
—” না।”
কিন্তু উত্তরটা এতটাই দ্রুত বের হলো যে দুজনেই বুঝে গেল সেটা মিথ্যে। শ্রাবণের ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। ধারা সেটা দেখে আরো বিরক্ত হয়ে গেল।
—” হাসছেন কেন?”
—” কারণ তুমি খুব বাজে মিথ্যে বলো।”
ধারা চোখ গোল করে তাকাল,
—” আমি মিথ্যে বলছি?”
—” হুম।”
—” কীভাবে বুঝলেন?”
শ্রাবণ কাঁধ ঝাঁকাল,
—” মিথ্যে বললে তোমার চোখে পানি এসে যায়।”
ধারা এক সেকেন্ড থেমে গেল। তারপর তড়িঘড়ি করে নিজের টোখ ছুঁয়ে দেখল। পরক্ষণেই সত্যি সত্যি চোখে পানি এসে গেছে বুঝতে পেরে লজ্জা আর রাগে মুখটা আরো লাল হয়ে গেল। শ্রাবণ এবার সত্যিই হালকা হেসে ফেলল। খুব ছোট্ট একটা হাসি। কিন্তু সেই হাসিটা দেখে ধারার বুকের ভেতর কেমন থমকে গেল। এই মানুষটাকে খুব কম হাসতে দেখেছে সে। বরং বলা চলে হাসতেই দেখেনি। কিন্তু যখনই দেখে, কেমন অদ্ভুত লাগে।
ধারা তড়িঘড়ি চোখ সরিয়ে নিয়ে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল,
—” আমি যাচ্ছি।”
ঘুরে হাঁটতে যাবে, ঠিক তখনই শ্রাবণ আবার ডাকল, —” দাঁড়াও। ”
ধারা জাদুর বলে থামল। কিন্তু ঘুরল না। শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলল,
—” থ্যাংক ইউ! ”
ধারার বুকটা কেমন ধক করে উঠল। সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। শ্রাবণ এবার চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। যেন সরাসরি কথাটা বলতে অস্বস্তি হচ্ছে তার। ধারা অবাক হলো। শ্রাবণ শেখ তাকে থ্যাংক ইউ বলছে? এটাও সম্ভব। ধারার এই অবাক হওয়াকে পাত্তা না দিয়ে শ্রাবণ নিজের মত করে বলল,
—” মায়া হয়েছে বলে করুণা করেছো, নাকি অন্য কোনো অনুভূতি তা জানি না। তবে মানবতার খাতিরে হলেও যে এক ভঙ্গুর মানুষকে রাস্তায় ফেলে আসোনি, তার জন্য থ্যাংক ইউ। হিসেব তোলা রইলো। এই ঋন কোনো একদিন পরিশোধ করব ইনশাআল্লাহ।”
ধারার গলা শুকিয়ে এলো। কিছু বুঝলো না, অত গভীর চিন্তায় গিয়ে বোঝারও চেষ্টা করল না। এই মানুষটা সরাসরি ভালো কিছু বললে কেন যেন আরো বেশি কষ্ট লাগে তার। কারণ সে জানে, এইটুকু নরম হওয়ার পরেই শ্রাবণ আবার দেয়াল তুলে ফেলবে নিজের চারপাশে। তাই আর কিছু ভাবলো না মেয়েটা।দ্রুত দৌঁড়ে নিজের ঘররূপি স্টোর রুমে ঢুকে পড়ল। ঠাস করে দরজা আটকে বসে পড়ল মেঝেতে।
নিজ ঘরে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল শ্রাবণ। তারপর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে তার। যেন ভেতরে কোথাও কিছু বদলে যাচ্ছে, কিন্তু সে নিজেই সেটা ধরতে পারছে না। ঘরটা এখনো এলোমেলো।
বিছানার পাশে গতরাতের খুলে ফেলে দেয়া শার্টটা পড়ে আছে কুঁচকে। শ্রাবণের দৃষ্টি গিয়ে থামল ওটার উপর। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে। নিচু হয়ে শার্টটা হাতে তুলে নিল। কাপড়টা এখনো হালকা ভাঁজ হয়ে আছে। শ্রাবণ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে সেটা উল্টেপাল্টে দেখল। তারপর কেমন যেন অদ্ভুত টানে শার্টটা নাকের কাছে আনল। গভীরভাবে শ্বাস টানল। আর পরক্ষণেই থেমে গেল। ভ্রু কুঁচকে আবারো ঘ্রাণ নিল সে। এবার একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে। মেয়েলি এই ঘ্রানটা ধারার মত না? সেই একই নরম গন্ধ। একই। একদম একই। কয়েক মিনিট আগেও এই ঘ্রাণ সে পেয়েছে। ধারার ঘাড়ের কাছ থেকে। খুব কাছে দাঁড়িয়ে। এতটাই কাছে যে তার নিঃশ্বাস পর্যন্ত অনুভব করেছিল সে। শ্রাবণের হাত ধীরে ধীরে স্থির হয়ে গেল। মাথার ভেতর আচমকা কিছু অস্পষ্ট দৃশ্য ঝলকে উঠল। রাতের রাস্তা। ঠান্ডা বাতাস। কারো নরম শরীরের উষ্ণতা। কারো গলার কাছে মুখ গুঁজে থাকা। আর সেই একই ঘ্রাণ। শ্রাবণ এবার ধীরে ধীরে বিছানার কিনারায় বসে পড়ল। শার্টটা এখনো তার হাতে। তারপর খুব আস্তে বিড়বিড় করল, —” তাহলে..গতরাতে…
শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৭
বাকিটুকু আর বলল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার শার্টটা নাকের কাছে আনল সে। নাহ, সন্দেহ নিশ্চিত করার জন্য নয়। বরং ঘ্রানটা ভালো লাগছে তার৷ অন্যরকম শিহরণে ছুঁয়ে দিচ্ছে তাকে। হ্যাঁ। ভুল হয়নি। গতরাতে যার ঘাড়ে মুখ গুঁজে ছিল সে, অন্য কেউ না। ধারা। সাথে সাথে বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা চাপ অনুভব করল শ্রাবণ। স্বস্তি? লজ্জা? নাকি এমন এক অনুভূতি, যেটার নাম সে নিজেই জানে না। সে চোখ বন্ধ করল। তারপর হঠাৎ করেই শ্রাবণের ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। নিজের অজান্তেই।
