Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৯

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৯

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৯
অনামিকা তাহসিন রোজা

নীল আজ এক বিরাট ভুল করে ফেলল বোধহয়। বাড়িতে ফেরার পথে হাতে করে নিয়ে এলো কিছু বেলী ফুল। সেই সময় ধারা সালমা বেগমের সাথে রান্নাঘরে হাতে হাতে কাজ করছিল, রাতের খাবার তৈরীতে। শ্রাবণ ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে ছিল, কোলে ল্যাপটপ নিয়ে কি যেন জরুরি প্রেজেন্টেশনের কাজে ব্যস্ত ছিল। নীল তখনই বাড়িতে ফিরে কারো সাথে কোনো কথা না বলে নির্দ্বিধায় রান্নাঘরেই গিয়ে সালমা বেগমের সামনেই ডেকেছে ধারাকে।
—” ধারা, তোমার জন্য একটা গিফট এনেছি।”
বেলন হাতে নিয়ে রুটি তৈরী করছিল ধারা। তার হাতে মুখে আটার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। ওদিকে নীলকে রান্নাঘরে যেতে দেখে শ্রাবণও ভ্রু কুঁচকে সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে। গিফটের কথা শুনে হাতও মুঠো হয়েছে তার। সালমা বেগম বেশ উচ্ছ্বসিত হলেন,

—” গিফট? ধারার জন্য? কী এনেছিস?”
নীল এবারে ধারার দিকে ম্যাজিকাল চোখে তাকিয়ে ধুম করে বেলি ফুলের মালা দুটো তার চোখের সামনে ঝুলিয়ে চমক দিয়ে বলে উঠলো,
—” বুমমমমম! সারপ্রাইজ!”
ধারা আসলেই চমকে গেছে। তবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রিয় একটা ফুলের ঘ্রান নাকে পৌঁছাতেই তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সালমা বেগমও নীলের কাজটাকে বাচ্চামো মনে করে স্বভাবসুলভ হাসলেন। অথচ ঠিক বিপরীত প্রতিক্রিয়া ঘটল শ্রাবণের মনে। সে ল্যাপটপ টা কোল থেকে নামিয়ে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ভীষনভাবে খুশি হওয়া ধারার দিকে। মনে হলো চোখ দিয়েই মেয়েটিকে হুমকি দেয়ার চেষ্টা করছে শ্রাবণ। কিন্তু ধারা তা দেখলো? নাহ দেখেনি। সে তো হেসে বলল,
—” ফুলটা অনেক সুন্দর। অনেকদিন আগে দেখেছিলাম। ঘ্রানটাও দারুণ। আপনি কীভাবে জানলেন এটা আমার পছন্দের?”
নীল কিছুক্ষণ চোখ সরু করে ভেবে বলল,

—” উমম..হয়তো স্বপ্নে বলেছো।”
বলেই ফিক করে হাসলো। ধারাও মুচকি হাসল। নীল এবারে তাড়াহুড়ো করল,
—” কি আশ্চর্য! নেবে না মালাটা? নাও।”
শ্রাবণের চোয়াল ক্রমশ শক্ত হয়েই যাচ্ছে। সে দাঁত কিড়মিড় করে দুর থেকে দৃশ্য টা কোনোমতে দেখছে। নীলের কথা শুনে ধারা এবারে হতাশ চোখে নিজের আটামাখা হাতের দিকে তাকাল। এরপর দুহাত তুলে ধরে নীলের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে ভদ্রভাবে হেসে বলল,
—” আমার হাতে তো আটা…
নীল ঠোঁট গোল করে বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
—” ওহহো। হুমম…
তাহলে এক কাজ করি? তোমার চুলে ক্লিপ লাগানো আছে? আমি চুলে ক্লিপের সাথে লাগিয়ে দিই। তুমি কাজ শেষ করে হাতে পড়ে নিও।”
এবারে ঝট করে উঠে দাঁড়াল শ্রাবণ। না পারছে কিছু করতে, না পারছে কিছু বলতে। এমন জঘন্য পরিস্থিতিতে সে কখনোই পড়েনি। সে নিজেও বুঝতে পারছেনা বিষয়গুলো তার কাছে এত অসহ্যকর লাগছে কেনো। এত বিরক্তিকর মনে হচ্ছে কেনো। শুধু এটুকু জানে ধারার সাথে নীলের এত মাখোমাখো সম্পর্ক সে মেনে নিতে পারছে না। অজানা কারনেই মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে বারংবার। এদিকে চুলে ক্লিপ দিয়ে মালাটা পড়িয়ে দেয়ার প্রস্তাব টা শুনে ধারার প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না। তবে জিনিসটা তার কাছে বিভ্রান্তিকর। সে হতাশ চোখে সালমা বেগমের দিকে তাকাল। সালমা বেগম এবার নিজেই হেসে নীলের হাত থেকে মালাটা নিতে চাইলেন,

—” দে আমায় দে। আমিই পড়িয়ে দিচ্ছি। কাজ শেষে হাতে পড়ে নেবে।”
ধারা এবারে খুশি হলো। যদিও শ্রাবণ একটু শান্ত হলো তবে, বিরক্ততা কমলো না। বরং সালমা বেগম যখন ধারার চুলে ফুলের মালাটা পড়িয়ে দিচ্ছিলেন, সেই সময়ে মেয়েটার চোখেমুখে উজ্জ্বলতা, সজীবতা, খুশি দেখে শ্রাবণের বুক কাঁমড়ে ধরল। মনে হলো কেও বুকে পাথর চেপে ধরেছে। দৃশ্যটা নিতে পারল না শ্রাবণ।
সালমা বেগম খুব যত্ন করে মালাটা ধারার চুলের ক্লিপে আটকে দিতে যাচ্ছিলেন। ধারা আয়নার মতো স্টিলের থালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছিল। বেলী ফুলের ঘ্রাণে তার মুখটা কেমন কোমল হয়ে উঠেছে। ঠিক তখনই হঠাৎ করেই ছুটে একটা শক্ত হাত এসে সালমা বেগমের হাত থেকে মালাটা টেনে নিল। এত দ্রুত সবটা ঘটল যে কেও বোঝার সুযোগ পেল না। পরের মুহূর্তেই শ্রাবণ দাঁতে দাঁত চেপে ফুলের মালাটা দু’হাতে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলল। সাদা বেলী ফুলগুলো ছিটকে পড়ে গেল পুরো রান্নাঘরের মেঝেতে, কারো পায়ের কাছে। কিছু ফুল তো গড়িয়ে গিয়ে দরজার কাছেও থামল। পুরো রান্নাঘর নিস্তব্ধ হলো মুহুর্তেই।
ধারার ঠোঁটের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল মেঝেতে পড়ে থাকা ফুলগুলোর দিকে। নীল হতবাক হয়ে শ্রাবণের দিকে তাকাল,

—” ভাইয়া…!”
সালমা বেগমও চমকে তাকালেন,
—” এই কী করলি তুই?”
শ্রাবণের চোখ রাগে লাল হয়ে আছে। চোয়াল তীব্র শক্ত। সে সরাসরি নীলের দিকে তাকিয়ে বিষাক্ত কণ্ঠে বলল, —” এত দরদ দেখানোর কী আছে? একটা বাইরের মেয়ের জন্য এসব আলগা পিরিত দেখাতে হবে কেন? কী শুরু করেছিস তুই?”
কথাটা শুনে ধারা যেন জমে গেল। বাইরের মেয়ে? কে? ধারা? শব্দ দুটো কানের ভেতর ধাক্কা মারল তার। নীল ভ্রু কুঁচকে বলল,

—” বাইরের মেয়ে মানে? আমি তো শুধু…
শ্রাবণ এবার গর্জে উঠল,
—”শুধু কী? ফুল এনে দিবি, মাথায় পরিয়ে দিবি, সারপ্রাইজ দিবি! এসব কী? নাটক চলছে এখানে? তামাশা চলছে এ বাড়িতে?”
নীল এবার সত্যিই বিরক্ত হলো,
—” ভাইজান, তুমি কিন্তু ওভাররিঅ্যাক্ট করছো। ফুলই তো..
শ্রাবণ এমনভাবে ধমক দিল যে ধারা পর্যন্ত কেঁপে উঠল,
—” চুপ! জাস্ট শাট আপ! আমার বাড়িতে কে কতটুকু লিমিটে থাকবে সেটা আমি ঠিক করব। যাকে-তাকে নিয়ে অত মাখামাখির দরকার নেই। এগুলো আমার পছন্দ না।”
ধারার গলা শুকিয়ে গেল। সে আস্তে বলল,
—” আমি তো কিছু করিনি…”
শ্রাবণ তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল তার দিকে,
—” তোমাকে কিছু বলতে হবে না। যেটুকু বুঝার আমি বুঝে গেছি।”
ধারা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। কী বুঝেছে মানুষটা? সে নিজেও জানে না। শ্রাবণ এবার বিদ্রুপভরা হাসি দিয়ে বলল,
—” কিছু মেয়েদের স্বভাবই হচ্ছে, দুটো ভালো ব্যবহার দেখলেই মাথায় উঠে বসা।”
সালমা বেগম এবার রেগে উঠলেন,

—” শ্রাবণ! মুখ সামলে কথা বল।”
কিন্তু শ্রাবণ তখন রাগে অন্ধ। সে থামল না,
—” আমি ভুল কিছু বলিনি মা। সারাদিন দেখি কথা বলা, হাসাহাসি, ফিসফাস। এখন আবার ফুল! এসব নোং’রামো আমার বাড়িতে চলবে না।”
ধারার চোখে পানি চলে এলো। কিন্তু সে কাঁদল না। শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। মেঝেতে পড়ে থাকা ছিঁড়ে যাওয়া বেলী ফুলগুলোর দিকে। একটু আগেও যেই ফুলের ঘ্রাণে তার মন ভালো হয়ে গিয়েছিল, এখন সেগুলো মাটিতে পিষে যাচ্ছে। নীল এবার কঠিন গলায় বলল,
—” তুমি ঠিক কোন জিনিসটাকে নোংরামো বলছো ভাইজান? এক্সপ্লেইন মি প্লিজ।”
শ্রাবণ সাথে সাথে ঠান্ডা চোখে তাকাল,
—” তুই চুপ কর। একটা মেয়ের জন্য এত দরদ দেখাতে হলে বাইরে গিয়ে দেখাস। আমার সামনে না।”
কথাটা বলেই শ্রাবণ ঝটকা মেরে চেয়ার সরিয়ে দিল।এ পর্যায়ে সালমা বেগম আরো বেশি ধমকে উঠলেন,
—” চুপ কর শ্রাবণ। যথেষ্ট হয়েছে। কী শুরু করেছিস তুই হ্যাঁ? পাগল হয়ে গেছিস? মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এখানে তুই বাদে আর কেও নাটক করছে না বুঝেছিস? তামাশা কে আগে শুরু করেছিল আশা করি তোর খুব ভালো করেই মনে আছে।”
শ্রাবণ রেগেমেগে আরো কিছু বলতে চাইলে সালমা বেগম শাড়ির আঁচল কোঁমড়ে গুঁজে নিজেই এগিয়ে এসে ভ্রু কুঁচকে শক্ত গলায় বললেন,

—” তোর সমস্যাটা কোথায় শ্রাবণ? এ কূলও চাস, আবার ও কুলও চাস? দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা এত সহজ মনে করেছিস? কোনো কিছুই ভালো লাগে না তোর? কী সমস্যা এখানে হ্যাঁ.? নীল ধারাকে একটা ফুলের মালা এনে দিয়েছে, এতে সমস্যা কোথায় তোর? তোর সমস্যা কোথায়? ধারা কি তোর কিনে নেয়া গোলাম? ও কি তোর কেও?”
শেষের দুটো কথা বলে সালমা বেগম স্পষ্ট করে শ্রাবণকে মনে করিয়ে দিলেন, নীলের সামনে ধারা শ্রাবণের স্ত্রী তো দূরে থাক, কিছুই না, কেও না। শ্রাবণ পুরোপুরি চুপ না হলেও একটু দমে গেল। বড় বড় শ্বাস নিয়ে সে রক্ত গরম চোখে তাকাল ধারার দিকে। মেয়েটা কোনো কথা না বলে আটামাখা হাতটা মুঠো করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর থেকে অসহায় কোনো কিছু পাওয়া যাবেনা বোধহয়।
নীল এতদিন চুপ থাকলেও এবারে ঠান্ডা কন্ঠে একটু খোটা দিয়ে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” খালামনি কিছু মনে কোরো না, কিন্তু আমি সত্যিই বুঝতে পারছিনা ভাইজানের এমন অদ্ভুত আচরণের কারন। সমস্যা টা কী ভাই? ধারার সাথে আমি বন্ধুত্ব করেছি। ও আমার বন্ধু। এখানে আমাদের মধ্যে ভাইজান কেনো কথা বলছে, নাক গলাচ্ছে? খালামনি কাহিনী টা কী বলোতো?”
নীলের গলায় এমন ত্যাড়া কথা শুনে শ্রাবণ সাথে সাথে তার শার্টের কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
—” কোনো কিছু না জেনে না বুঝে কথা বলতে আসবি না নীল। আমার হাতের মা’র কিন্তু অনেক শক্ত।”
সালমা বেগম রেগে গিয়ে তৎক্ষনাৎ ধমক দেন,

—” শ্রাবণ!!!”
মায়ের ধমকে নীলের কলার ছেড়ে দেয় শ্রাবণ। সালমা বেগম আর নিতে পারলেন না। একমাত্র সন্তানের এমন দুর্দশা, এমন অশান্তি সইতে না পেরে তেড়ে এসে শ্রাবণের গালে একটা চড় বসালেন ভদ্রমহিলা। চোখে টলমল করা পানি নিয়ে বাধ্য হলেন নিজের আদরের একমাত্র ছেলের গায়ে হাত তুলতে। সাথে সাথে শ্রাবণের মুখটা একপাশে ঘুরে গেল। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, সালমা বেগম তাকে চড় মেরেছেন।
ধারা আঁতকে উঠে দুপা এগিয়ে এসেও থেমে গেল। চোখ বড় বড় হয়ে গেছে তার। বুকের ভেতর ধকধক করছে ভয়ানকভাবে।
নীলও হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এত বছরেও হয়তো এই প্রথমবার দেখল সালমা বেগম ছেলের গায়ে হাত তুলেছেন। সালমা বেগমের চোখ টলমল করছে। রাগে, অপমানে, কষ্টে পুরো শরীর কাঁপছে তার। তিনি কাঁপা গলায় বললেন,

—” কী বানিয়ে ফেলেছিস নিজেকে তুই? হ্যাঁ? কী ভাবিস নিজের সম্পর্কে? সবাই তোর ইশারায় চলবে? ফেলনা পেয়েছিস সবকিছু? যখন যা মন চাইবে, তখন তা-ই করবি?”
শ্রাবণ ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল মায়ের দিকে। চোয়াল শক্ত। কিন্তু কোনো কথা বলল না। সালমা বেগম এবার আঙুল তুলে কাঁদতে কাঁদতেই বললেন,
—” আজকে আমি লজ্জা পেয়েছি শ্রাবণ। নিজের ছেলেকে দেখে লজ্জা পেয়েছি। একটা মেয়ে এতক্ষণ ধরে চুপচাপ অপমান সহ্য করে দাঁড়িয়ে আছে আর তুই? তুই তাকে কী কী না বললি!”
ধারা চমকে গিয়ে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে। তার চোখেও পানি এসে গেছে। সালমা বেগম আবার শ্রাবণের দিকে তাকালেন,
—” একটা ফুলের মালা! একটা সামান্য ফুলের মালা নিয়েও তোর এত সমস্যা? কেন? সে তো তোর কেও না। ধারার প্রতি কীসের অধিকার তোর? নীলকে জবাব দে, নীলকে বল ধারা কে তোর? কোনো অধিকার আছে? তোর মতে তো নেই। তাহলে কী চাস তুই? এভাবে একটা মানুষকে প্রতিদিন অপমান করে মেরে ফেলতে?”
শ্রাবণ এবার নিচু গলায় বলল,

—” মা, তুমি বিষয়টা…
—” আমি সব বুঝি!” হঠাৎ করেই চিৎকার করে উঠলেন সালমা বেগম।
—” তোর চোখ দেখলেই বুঝি। তোর রাগ দেখলেই বুঝি। তুই নিজেও জানিস না তোর সমস্যা কোথায়!”
পুরো ঘর নিস্তব্ধ। শ্রাবণ এবার সত্যিই থেমে গেল। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। কিন্তু মুখে আর কোনো কথা নেই। সালমা বেগম চোখ মুছতে মুছতে ক্লান্ত স্বরে বললেন,
—” যা। আমার সামনে থেকে চলে যা। এখনই চলে যা। আজ তোর মুখ দেখতেও ইচ্ছে করছে না আমার।”
কথাটা শুনে শ্রাবণের চোখের ভেতর কেমন যেন কিছু কেঁপে উঠল। কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করল না। শুধু শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ধারার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হলো, তার জন্য, সব তার জন্য। এই বাড়িতে আসার পর থেকেই যেন সব অশান্তির শুরু। শ্রাবণ তার জন্য মায়ের হাতে মার খেল। সালমা বেগম কাঁদছেন। নীল অপমানিত। সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। ধারার চোখ বেয়ে এবার নিঃশব্দে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে মাথা নিচু করে ফেলল দ্রুত, যেন কেউ দেখে না ফেলে। তার ভীষণ ইচ্ছে করছিল বলে উঠতে,
—” দোষ উনার না মা…সব দোষ আমার।”
কিন্তু পারল না। গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। শ্রাবণ একবার খুব ক্ষণিকের জন্য তাকাল ধারার দিকে। মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করছে। সেই দৃশ্যটা বুকের কোথায় যেন ধাক্কা দিল শ্রাবণের। কিন্তু পরক্ষণেই সে মুখ ফিরিয়ে নিল।
শ্রাবণ কে চুপ করে থাকতে দেখে আরো বেশি রেগে গেলেন সালমা বেগম। এ পর্যায়ে তিনি আরো গর্জে ওঠার আগেই ধারা তার বাহু আঁকড়ে ধরে বাচ্চাদের মত বলে উঠলো,

—” এমন করবেন না মা। প্লিজ শান্ত হন। রাগারাগি করবেন না। আপনার প্রেশার বেড়ে যাবে৷ অসুস্থ হয়ে যাবেন।”
সালমা বেগম একটু একটু করে শান্ত হলেন। ধারা ভয় পাচ্ছে বুঝে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটার হাত চেপে ধরলেন। ধারা এবারে কিছুক্ষণ চোখ বুঁজে থেকে শ্রাবণের বলা কথাগুলো আবারো মাথায় আনলো। শুধু তাই নয়, এ বাড়িতে আসার পর থেকে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা, ও শ্রাবণের করা সব অপমানের স্মৃতিচারণ করল সে। এরপর ধপ করে চোখজোড়া খুলে তাকাল। তবে এবারে কেন যেন তার দৃষ্টিটা ভীষণ কঠিন মনে হলো।
ধারা বড় করে শ্বাস নিয়ে নিজেকে শক্ত করল। ধীরে ধীরে নিচু হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা ফুলগুলো কুড়াতে শুরু করল। খুব যত্ন করে। যেন কেউ তার খুব প্রিয় কিছু ভেঙে ফেলেছে। সালমা বেগমের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল দৃশ্যটা দেখে। আর নীল, সে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল ধারার দিকে। প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, এই মেয়েটার কষ্টটা হয়তো সে যতটা ভেবেছিল, তার থেকেও অনেক গভীর। ধারা সব ফুলগুলোই হাতে কুড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বিভ্রান্তিতে ভুগা নীলের দিকে তাকিয়ে চোখে পানি নিয়েই জোরপূর্বক হেসে বলল,

—” ফুলের জন্য ধন্যবাদ নীল ভাই। আপনি আমায় সত্যি অনেক গিফট দিয়েছেন, এমন এমন গিফট দিয়েছেন যা এ জীবনে আমি কখনোই পাইনি। ভীষণ খুশি আমি। আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।”
ধারা জোর করে ঠোঁটের কোণে হাসি ধরে রাখল। অথচ চোখের কোণে জমে থাকা পানিগুলো স্পষ্ট কাঁপছে। নীল কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। কেন যেন মনে হলো এখন কোনো সান্ত্বনার কথাও এই মেয়েটার কাছে পৌঁছাবে না। ধারা এবার ধীরে ধীরে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল। হাতে মুঠো করে ধরা সাদা ফুলগুলো। ঠিক দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল শ্রাবণ। চুপচাপ, শক্ত মুখ নিয়ে। কিন্তু তার বুকের ভেতরটা যে কী ভয়ানক অস্থির হয়ে আছে, সেটা হয়তো সে নিজেও বুঝতে পারছে না।

ধারা এগিয়ে এলো। আর পাশ কাটানোর ঠিক আগমুহূর্তে থামল না, কিছু বলল না। শুধু তাকাল। এক মুহুর্তের জন্য চলন্ত পা দুটো থামিয়ে অদ্ভুত একটা দৃষ্টি ছুঁড়ল সে শ্রাবণের দিকে। অশ্রুতে ভরা, অথচ ভীষণ কঠিন সেই চোখ। সেই চোখে আজ কোনো অভিমান নেই, কোনো অনুরোধ নেই, কোনো মায়াও নেই। শুধু একরাশ আহত ঘৃণা। এমন দৃষ্টি, যেটা শ্রাবণ শেখ এর আগে কখনো ধারার চোখে দেখেনি। মুহূর্তের জন্য শ্রাবণের বুক ধক করে উঠল।
ধারা খুব আস্তে ঠোঁট চেপে অন্যদিকে তাকিয়ে চলে গেল। তার চলে যাওয়ার পরও বেলী ফুলের মিষ্টি গন্ধটা বাতাসে রয়ে গেল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই গন্ধ এখন শ্রাবণের কাছে অসহ্য লাগছে। সালমা বেগম ক্লান্ত চোখে ছেলের দিকে তাকালেন। কিছু বললেন না আর। শুধু হতাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বড় টুলে বসে পড়লেন।
নীলও এবার আর কোনো কথা বলল না। সে না চাইতেও নড়তে পারছে না। পুরো বাড়িটা হঠাৎ করেই অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শ্রাবণ কিছুক্ষণ দরজার সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথার ভেতর বারবার শুধু সেই দৃষ্টিটাই ঘুরছে। ঘৃণা! ধারা তাকে ঘৃণা করেছে। এই উপলব্ধিটা কেমন যেন বুকের কোথাও ধারালো কিছুর মতো বিঁধল তার। হঠাৎ করেই রান্নাঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা দু-একটা ছিঁড়ে যাওয়া বেলী ফুলের দিকে চোখ গেল তার। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে শ্রাবণ হঠাৎ বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিল। সে আসলে নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা এড়িয়ে যেতে চাইছে। তারপর কোনো কথা না বলে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করে দিল।
নীল এবারে ক্লান্ত হয়ে বসে থাকা সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

—” ভাইজানের সমস্যা কী খালামনি? ধারা যখন তার বউ-ই হয়, তো মুখে বললে কী সমস্যা বুঝতে পারছি না তো। স্বীকারও করবে না, আবার স্বামীর অধিকারও ফলাবে। স্ট্রেন্জ!”
সালমা বেগম এবারে চোখ বড় করে তাকাল নীলের দিকে। অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলল,
—” ত-তুই জানিস? কীভাবে জানলি?”
নীল এবারে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিল। মাথার পেছন চুলকে বলল,
—” অনেকদিন সন্দেহ করেছি। একটু আগে ধারা যে তোমায় মা বলে ডাকল,সেটা শুনে নিশ্চিত হলাম। কাহিনী টা মনে হয় বুঝেছি।”
কিন্তু নীল এটা বলল না যে প্রথম দিন থেকেই সন্দেহ করে সে ফলো করে সবাইকে, আর কোনো এক রাতে সে সালমা বেগম ও ধারার কথোপকথন ভুলে, লুকিয়ে শুনে ফেলেছিল। তখন থেকে সব জানে। এসব সে বলল না সালমা বেগমকে। অথচ যেটুকু বলেছে সেটুুকু শুনেই সালমা বেগম কিছুক্ষণ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে স্তব্ধ হয়ে রইলেন। এরপর মাথা হেলিয়ে দিয়ে নীলের দিকে তাকিয়ে হতাশ হয়ে বললেন,

—” যখন জানিসই, তখন ধারার সাথে অত মাখোমাখো হয়ে কথা বলিস কেন বাপ? দুরে দুরে থাকতে পারিস না? আমি তো তোকে ইচ্ছে করে কিছু বলিনি, কারন তুই তো আর জানিস না ধারা অলরেডি এ বাড়ির বউ।”
নীল গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
—” ভাবি হবে তো কী হয়েছে? ফ্রেন্ড ইজ ফ্রেন্ড। আমি সত্যিই তোমার বউমাকে ফ্রেন্ডের মত করেই দেখি। আমার ভাইজানের জিনিসের প্রতি লোভ নেই। আমার তো নিজেরই গার্লফ্রেন্ড আছে।”
একের পর এক চমক আর নিতে পারলেন না সালমা বেগম। নিজের কপালে দুহাত চেপে রেখে তিনি মাথা নিচু করে ফেললেন। নীল এবারে আগ্রহ নিয়ে বলল,
—” আমাকে পুরো কাহিনী বলো না খালামনি। দেখি তোমার ছেলে-বউমার কোনো সাহায্য করতে পারি কিনা। সংসার ব্যবস্থা করে দিতে পারি কিনা।”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৮

ভ্রু কুঁচকালেন সালমা বেগম,
—” আর কী করবি তুই?”
—” চেষ্টা করব?”
—” তুই পারবি?”
—” চেষ্টা করতে ক্ষতি কীসের? তুমি আগে ফুল ফ্লাশব্যাক দ্রুত বলো। বাকিটা দেখছি আমি।”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here