শ্রাবণ ধারা পর্ব ২০
অনামিকা তাহসিন রোজা
সূর্য ডুবেছে ঘন্টাখানেক আগে। চারিপাশে নিস্তব্ধতা। বিশেষ করে শেখ বাড়িতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি নীরবতা। সালমা বেগম ঘুমিয়েছিলেন বিকেলে, মাগরিবের নামাযে বসে তিনি কেঁদেছেনও একটু। একটা মাত্র ছেলে তার, তাও খুব আদরের। তার গায়ে হাত তোলাতে মাতৃমনে ভীষণ আ ঘা ত লেগেছে। ঘুমিয়ে মাথা ঠান্ডা করার পর আফসোসও করেছেন যে কেন তিনি ছেলেটাকে মা রতে গেলেন। হুঁশ হারিয়ে আজ আর তিনি রাগ ধরে রাখতে পারেন নি। তবে ছোট থেকেই তো শ্রাবণ এমনই ছিল- একগুঁয়ে, জেদী, রাগী। তাই ছেলে যেমনই হোক না কেনো, সালমা বেগম তো মা। তিনি কি আর পারেন ছেলেকে দুরে সরিয়ে দিতে।
মাগরিব পেরোনোর পর সালমা বেগম ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে অপেক্ষা করছেন কখন তার ছেলেটা ঘর থেকে বেরোবে, অথচ শ্রাবণ সেই যে ঘরে ঢুকেছে, আর বেরই হলো না। খায়ও নি ছেলেটা। খিদে পায়নি বুঝি! আরো আশ্চর্যকর বিষয় হলো পতিভক্তি ধারাও নিজ ঘর থেকে একবারো বের হয়ে জিজ্ঞেস করেনি শ্রাবণ খেয়েছে কিনা। অথচ আগে তো এসে চিন্তা করতো কখন শ্রাবণ খাবে। অবস্থা দেখে সালমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, এরপর টিভি অন করে সিরিয়াল দেখাতে মনোযোগ দিলেন। আর আধঘন্টা মত শ্রাবণের বেরোনোর অপেক্ষা করবেন তিনি, এরপর নিজেই ছেলের ঘরে যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন।
এদিকে নিজের পাতানো বিছানার উপরে উবু হয়ে শুয়ে রয়েছে ধারা। তার চোখে মুখে মলিনতা, নিস্তব্ধতা ছেয়ে গিয়েছে তার গোটা চেহারায়। তবে আজ কেন যেন তার সেই চেহারায় নেই কোনো চিন্তা, ভাবনা, কারো জন্য অস্থিরতা। বরং স্থিরতা ও নির্বিকারতায় ভীষণ ভাবে ডুবে রয়েছে মেয়েটা। হাতের মুঠোয় এখনো সেই ফুলগুলো, যদিও ইতোমধ্যে সেগুলো পচে গিয়েছে খানিকটা। হুট করে ধারার চোখ পড়ল জানালার বাইরে, অন্ধকার হয়ে এসেছে দেখে বুঝলো বেলা ডুবে গেছে। সে এবারে সোজা হয়ে বসে পড়ল। এরপর কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো নিজের আলমারির দিকে।
নিজের ঘরের বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বসে ছিল শ্রাবণ। চারপাশে ঘন অন্ধকার। দূরের রাস্তার বাতিগুলো ঝাপসা হলুদ আলো ছড়িয়ে রেখেছে। মাঝে মাঝে হালকা বাতাস এসে পর্দা উড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ সেই বাতাসেও আজ কোনো শান্তি নেই। দুপুরের পর থেকে একবারও ঘর থেকে বের হয়নি সে। ল্যাপটপ খোলা ছিল সামনে, কিন্তু কাজের এক লাইনও এগোয়নি। মাথার ভেতর শুধু একই দৃশ্যগুলো ঘুরছে বারবার। ধারার চোখ, আজকের সেই দৃষ্টি, যেখানে শুধুই ঘৃণা। শ্রাবণ চোখ বন্ধ করল। কিন্তু তাতেও শান্তি মিলল না। বরং আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল মেয়েটার মুখ। মেঝেতে বসে ফুল কুড়ানো। ঠোঁট চেপে কষ্ট লুকানো। আর শেষে সেই জলে ভরা শক্ত দৃষ্টি। হঠাৎ করেই বিরক্তিতে মাথার চুলে হাত চালালো শ্রাবণ। নিজেকেই সহ্য হচ্ছে না তার। সে কি বেশি বলে ফেলেছে? না, ভুল বলেনি। নিশ্চয়ই ভুল বলেনি। তাহলে কেন বুকের ভেতরটা এমন করছে? কেন বারবার মনে হচ্ছে আজ কিছু একটা ভেঙে গেছে?
শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল আকাশের দিকে। কালো আকাশ। কোনো উত্তর নেই সেখানে। বৃষ্টি আসবে বুঝি? একটা সময় পর সে নিচে তাকিয়ে নিজের হাত মুঠো করল। মাথার ভেতর হঠাৎ করেই দুপুরের একটা কথা ভেসে উঠল-“ও কি তোর কেও?” চোয়াল শক্ত হয়ে গেল শ্রাবণের। না। কেও না। তাহলে এত রাগ কেন হয়েছিল? আসলেই কেও না? কেন নীলের হাতে ফুল দেখে তার মাথা গরম হয়ে গেল? কেন মনে হচ্ছিল কেউ তার জিনিসে হাত দিচ্ছে? এই ভাবনাটাতেই হঠাৎ থমকে গেল সে। তার জিনিস? সাথে সাথে বিরক্তিতে দাঁত চেপে ফেলল শ্রাবণ। দেখেই মনে হলো সে নিজের চিন্তাকেই অস্বীকার করতে চাইছে। কিন্তু যতই নিজেকে বোঝাতে যাচ্ছে, ততই একটা সত্যি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ধারার সেই দৃষ্টি সে সহ্য করতে পারেনি। একদমই পারেনি। হঠাৎ করেই শ্রাবণ উঠে দাঁড়াল। এমনভাবে উঠে দাঁড়াল যেন আর এক সেকেন্ডও এখানে বসে থাকা সম্ভব না। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক জেদ জমেছে। বিরক্তি, অস্থিরতা, রাগ, সব মিলেমিশে এক অচেনা অনুভূতি। সে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
করিডোর নিস্তব্ধ। ঘরের দরজা খট করে খোলার শব্দে সালমা বেগম উপরে তাকালেন। শ্রাবণকে বের হতে দেখে ভাবলেন তাকে ডাকবে। কিন্তু ছেলেটার ভাব ভঙ্গিমা দেখে তিনি থেমে গেলেন। শ্রাবণ কোনোদিকে তাকাল না। শুধু গটগট করে হাঁটতে লাগল সোজা ধারার ঘরের দিকে। তার হাঁটার শব্দেই বোঝা যাচ্ছে মাথার ভেতর ঝড় চলছে। একসময় এসে থামল দরজার সামনে। দরজাটা বন্ধ। শ্রাবণ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বুক ওঠানামা করছে ধীরে ধীরে। ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। অদ্ভুতভাবে বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল তার। কেন যেন মনে হলো, ধারা কাঁদছে না। আর এই না-কাঁদাটাই বেশি ভয়ংকর।
পৃথিবীর সমস্ত রাগ ও জেদ নিয়ে শ্রাবণ হাত ওঠালো দরজায় নক করার জন্য। কিন্তু তার আগেই নিজে থেকে দরজাটা খুলে যেতে দেখে সে অবাক হলো। রান্নাঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হওয়া ধারাও চমকে গেল শ্রাবণকে দেখে। সে আশাও করেনি দরজা খোলার সাথে সাথে শ্রাবণকে দেখে। অস্ফুটস্বরে ধারা বলল,—” আপনি?”
অপ্রস্তুত ছিল শ্রাবণ। তবুও শক্ত কন্ঠে বলল,
—” তোমার সাথে কথা আছে।”
ধারার চোয়াল শক্ত হলো কোনো এক কারনে। সে বড় করে শ্বাস নিয়ে কঠিন গলায় বলল,
—” আমার কোনো কথা নেই। সরে দাঁড়ান, নিচে যাব আমি।”
ধারা পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইতেই শ্রাবণ হঠাৎ হাত বাড়িয়ে দরজার ফ্রেমে ঠেকাল। পথ আটকাল না পুরোপুরি, কিন্তু বুঝিয়ে দিল কথা শেষ না করে সে সরবে না। কণ্ঠটা আগের মতোই শক্ত, তীক্ষ্ণ,
—” এত অ্যাটিটিউড দেখানোর দরকার নেই। দুটো কথা বলতে এসেছি, শুনে তারপর নাটক কোরো।”
ধারা থেমে গেল। ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল তার দিকে। আর সেই দৃষ্টিটা দেখেই শ্রাবণের বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা ধাক্কা লাগল। কারণ এই চোখ সে চেনে না। এই মেয়েটা তো এতদিন তার একটুখানি কথাতেই চুপ হয়ে যেত। অপমান করলেও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকত। অথচ আজ? আজ ধারার চোখে পানি আছে ঠিকই, কিন্তু সেই পানির নিচে জমে আছে কঠিন কিছু। একরাশ ক্লান্তি। আর ভয়ংকর রকমের দূরত্ব। ধারা ধীরে ধীরে বলল,
—” নাটক আমি করছি?”
শ্রাবণ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল এক মুহূর্ত। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
—” তাহলে কী? একটা ফুলের মালা নিয়ে এমন ভাব করছো যেন..
—” ওটা ফুলের জন্য ছিল না।”
ধারা কেটে দিল তার কথা। কণ্ঠ খুব শান্ত। এতটাই শান্ত যে সেটাই আরো বেশি ভয়ংকর লাগল। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকাল। ধারা এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।
—” আপনি জানেন আজ সবচেয়ে বেশি কষ্ট কীসে পেয়েছি?”
সে নিজেই আবারো উত্তর দিল,
—” আপনি আমাকে অপমান করেছেন, এতে না। আপনি তো সবসময়ই করেন। নতুন কিছু না।”
শ্রাবণের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ধারা নির্বিকারভাবে বলে গেল,
—” কষ্ট পেয়েছি কারণ আমি এতদিন নিজেকে বোঝাতাম, আপনি আসলে খারাপ না। শুধু রাগী। শুধু জেদী। শুধু প্রকাশ করতে পারেন না।”
একটু থামল ধারা। চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” কিন্তু আজ প্রথমবার মনে হয়েছে, আমি হয়তো ভুল মানুষকে বুঝতে চেয়েছি।”
কথাটা শ্রাবণের বুকের কোথায় যেন গিয়ে বিঁধল। সে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
—” এত সহজে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে?”
ধারা মুচকি হাসল। সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই। বলল,
—” সহজ?”
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—” মানুষ একটা মরুভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে দূরে পানি দেখে বাঁচার আশা করে। তারপর কাছে গিয়ে বুঝে, ওটা মরিচীকা। তখন সে কষ্ট পায়, ঠিকই। কিন্তু বারবার একই মরিচীকার পেছনে দৌড়ানো বোকামি।”
শ্রাবণ স্থির হয়ে গেল। ধারা এবার একদম সোজাসুজি তাকাল তার চোখে।
—” আমি বোকা হতে হতে ক্লান্ত।”
শ্রাবণ মনে মনে চরম আকারের অবাক হলেও বাঁকা হেসে বলল,
—” হুট করে এত চ্যাটাং চ্যাটাং কথা কোথা থেকে শিখলে? নীল শিখিয়েছে?”
ধারা এক পা এগিয়ে এলো। শান্ত গলায় বলল,
—” নীল ভাই সম্পর্কে একটা বাজে কথাও বলবেন না আপনি। অন্তত ওই মানুষটা সম্মান করতে জানে, শ্রদ্ধা করতে জানে। তার চোখে আমি শ্রদ্ধা ছাড়া আর কিছুই দেখিনি। সবার আপনার মত নিচু মন-মানসিকতা নেই। ”
একটু থেমে ধারা অস্ফুটস্বরে হাসলো,
—” অবশ্য আপনার মত মানুষকে এসব কথা বলেও লাভ নেই। নিজেকে পরিবর্তন করুন, মনকে বড় করুন। নইলে ভবিষ্যতে কেওই থাকবে না আপনার। আপন মানুষ হাতড়ে খুঁজলেও পাবেন না।”
চারপাশ নিস্তব্ধ। নিচে টিভির শব্দ খুব ক্ষীণভাবে ভেসে আসছে। শ্রাবণ প্রথমবারের মতো বুঝল, ধারা শুধু অভিমান করেনি। সে দূরে সরে যেতে শুরু করেছে। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই উপলব্ধিটাই তাকে ভেতর থেকে অস্থির করে তুলল। ধারা আর দাঁড়াল না। খুব শান্তভাবে বলল,
—” সরে দাঁড়ান। রান্নাঘরে যেতে হবে। মা এখনো কিছু খাননি।”
শ্রাবণ এবারও সরল না। শুধু তাকিয়ে রইল। দেখে মনে হলো কিছু বলতে চাচ্ছে, কিন্তু ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। ধারা কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে নিজেই তার পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। আর শ্রাবণ? সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তার। অনেকদিন পর প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, হয়তো সত্যিই সে কিছু একটা হারাতে বসেছে। সবকিছু উলোটপালোট মনে হতে লাগলো তার। ধারা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলে রেগে শ্রাবণ দরজাতে একটা ঘুষি মা রল, এরপর আবারো নিজের ঘরে গিয়ে ঠাস করে দরজা আটকালো। পুরো দৃশ্যটাই এতক্ষণ যাবৎ পর্যবেক্ষণ করল নীল। সে নিচে যাওয়ার জন্য এদিকে আসছিল, হুট করে শ্রাবণকে ধারার ঘরের দরজার সামনে দাড়িয়ে থাকতে দেখে সেও থেমেছিল। এরপর যা যা হলো, তা দেখে নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝলো অবস্থা। জল কতদূর গড়িয়েছে সেটাও উপলব্ধি করে সে পকেট থেকে ফোন বের করে কল দিল জিহানকে। এই মুহুর্তে তারও সাহায্যের প্রয়োজন।
ধারা নিচে নেমে আসতেই সালমা বেগম টিভি থেকে চোখ সরিয়ে তাকালেন। এক সেকেন্ডেই ভ্রু কুঁচকে গেল তার। মেয়েটার চোখদুটো কেমন লালচে। মুখটাও ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।
—” কী হয়েছে মা? শরীর খারাপ?”
ধারা কিছু বলল না। শুধু ধীরে ধীরে এসে সালমা বেগমের পাশে বসে পড়ল। তারপর হঠাৎ করেই ছোট বাচ্চাদের মতো ঝুঁকে গিয়ে ভদ্রমহিলাকে জড়িয়ে ধরল। আচমকা এমন আচরণে সালমা বেগম থমকে গেলেন।
—” আরে? কী হলো?”
ধারা মাথা নামিয়ে তার কাঁধে মুখ গুঁজে রইল। অনেকক্ষণ কিছু বলল না। শুধু নিঃশ্বাসগুলো কেমন কেঁপে উঠছে বারবার। সালমা বেগমের বুকটা ধক করে উঠল। মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় বললেন, —” ধারা? কাঁদছিস নাকি মা?”
ধারা দ্রুত চোখ মুছে ফেলল। জোর করে হেসে বলল, —” না তো।”
মিথ্যে। গলাটাই বলে দিচ্ছে সে কাঁদছে। সালমা বেগম আরো চিন্তিত হলেন,
—” তাহলে এভাবে জড়িয়ে ধরেছিস কেনো?”
ধারা এবার খুব আস্তে বলল, —” এমনি। কখনো কখনো না…খুব ইচ্ছে করে কেউ একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিক। মনে হয় পৃথিবীতে অন্তত একটা জায়গা থাকুক, যেখানে মানুষ ক্লান্ত হলে ফিরে আসতে পারে।”
সালমা বেগমের মুখটা নরম হয়ে এলো। তিনি মায়াভরা চোখে তাকালেন ধারার দিকে,
—” পাগলি মেয়ে। আমি আছি না? এই বাড়িটা তোরও তো।”
ধারা চোখ নামিয়ে ফেলল। ঠোঁট কেঁপে উঠল সামান্য।বলল, —” সব জায়গা সবার হয় না মা। কিছু জায়গা শুধু দূর থেকে দেখতেই ভালো লাগে।”
ভদ্রমহিলা পুরো কথার অর্থ বুঝলেন না। শুধু এটুকু বুঝলেন, মেয়েটা ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট পেয়েছে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধারার কপালে হাত রাখলেন।
—” কেউ কিছু বলেছে তোকে?”
ধারা সাথে সাথে মাথা নাড়ল, —” না।”
তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে খুব আস্তে যোগ করল, —” মানুষ কখনো কখনো কথার চেয়েও বেশি আঘাত দেয়, তাই না মা?”
সালমা বেগমের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে ভারী পায়ের শব্দ ভেসে এলো। ধারা আর সালমা বেগম দুজনেই একসাথে মাথা তুলে তাকাল। শ্রাবণ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। কালো গেঞ্জির উপর তাড়াহুড়ো করে একটা শার্ট পড়ছে সে। হাতার বোতামও পুরো লাগানো হয়নি। মুখ শক্ত। চোখদুটো অস্বাভাবিক রকম ঠান্ডা। মনে হচ্ছে নিজের ভেতরের ঝড়টাকে কোনোমতে চেপে রেখেছে। সে নিচে নেমেও কারো দিকে তাকাল না। না নিজের মায়ের দিকে। না ধারার দিকে। সরাসরি জুতোর র্যাকের সামনে গিয়ে জুতো পরে নিল। সালমা বেগম সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
—” কোথায় যাচ্ছিস? রাত হয়ে গেছে। কিছু খেয়েছিস?”
শ্রাবণ থামল না। শুধু নিচু গলায় বলল,
—” কাজ আছে।”
—” এই অবস্থায় আবার কীসের কাজ? দুপুর থেকেও কিছু খাসনি
—” ক্ষুধা নেই।”
গলাটা এতটাই শুষ্ক ছিল যে ধারা অজান্তেই তাকিয়ে রইল তার দিকে। কেন জানি মনে হলো মানুষটা রাগ নিয়ে যাচ্ছে না, বরং কিছু থেকে পালিয়ে যাচ্ছে।
সালমা বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন,
—” শ্রাবণ, আমি কথা বলছি!”
এইবার সে থামল। কিন্তু ঘুরল না। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে শুধু বলল,
—” একটু বাইরে যাচ্ছি মা। ফিরব।”
তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। ঠাস করে দরজাটা বন্ধ হতেই পুরো বাড়িটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ধারা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল বন্ধ দরজার দিকে। বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা জমছে। অথচ কিছুক্ষণ আগেই তো সে ঠিক করেছিল আর ভাববে না মানুষটাকে নিয়ে। তবুও কেন মনে হচ্ছে, এই মানুষটা যত দূরেই যাক, তার ভেতরের অস্থিরতা যেন এই বাড়িটাতেই রেখে গেছে। বড় শ্বাস ফেলে আবারো নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে আনল ধারা। আজ শ্রাবণ সারারাত বাড়িতে না ফিরলেও সে চিন্তা করবে না, ভাববে না মানুষটার জন্য। যা খুশি করুক!
ঠিক তখনই ওপরতলার দিক থেকে আবার তাড়াহুড়ো পায়ের শব্দ ভেসে এলো। ধারা আর সালমা বেগম দুজনেই একসাথে মাথা তুলে তাকাল। নীল প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। এক হাতে ঘড়ি পড়ছে, আরেক হাতে ফোন। চুল এলোমেলো। দেখে মনে হচ্ছে কোথাও যুদ্ধ করতে যাচ্ছে। সালমা বেগম চোখ বড় বড় করে বললেন,
—” তুই আবার কোথায় যাস বাপ?”
নীল জুতো গলাতে গলাতে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—” জাতির ক্রান্তিলগ্নে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমার বের হওয়াটা জরুরি খালামনি।”
সালমা বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,
—” বাংলা সিনেমার ডায়লগ বন্ধ করে আসল কথা বল।”
নীল গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল,
—” একটা আহত গণ্ডারকে খুঁজতে যাচ্ছি।”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকাল। সালমা বেগম তো আরো বিভ্রান্ত,
—” কীসের গণ্ডার? মানে?”
নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাটকীয় কণ্ঠে বলল,
—” অত্যন্ত বিরল প্রজাতির রাগী গণ্ডার। সারাদিন না খেয়ে থাকে, মানুষজনকে ধমকায়, তারপর রাতের আঁধারে অভিমান করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। পরিবেশের জন্য খুব ক্ষতিকর।”
ধারার মুখে না চাইতেও হালকা হাসি ফুটে উঠল। কথার মানে না বুঝলেও নীলের বলার ভঙ্গিতে সে হাসলো। তবে সালমা বেগম এবার বুঝে ফেললেন। বিরক্তিতে কপালে হাত ঠেকালেন।
—” উফফ! তোরা দুইজন মিলে আমার জীবনটাই শেষ করে দিবি।”
নীল হেসে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
—” টেনশন নিও না খালামনি। গণ্ডারটাকে খুঁজে পেলে শিক্ষা দিয়ে কান ধরে বাড়ি নিয়ে আসব।”
তারপর হঠাৎ থেমে ধারার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে একটু নরম স্বরে বলল,
—” তোমার বিচার এসে করব আমি। সাহস তো কম না! আমার ভাইয়ের সাথে উঁচু গলায় কথা বলো।”
ধারা কিছু বলল না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। এরপর ঠোঁট চেপে হাসল। নীল আবার আগের মতই হালকা ভঙ্গিতে স্যালুট ঠুকল,
শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৯
—” আচ্ছা, আমি গেলাম। দেশের পরিস্থিতি ভালো না।”
ঠাস করে দরজা আটকে নীল-ও বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। দরজা বন্ধ হতেই সালমা বেগম আর ধারা দুজনেই কিছুক্ষণ আহাম্মকের মত দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সালমা বেগম হঠাৎ বিরক্ত মুখে বিড়বিড় করলেন,
—” আল্লাহ জানে এরা দুইটা মানুষ নাকি সার্কাসের জোকার!”
