Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩৬

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩৬

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩৬
অনামিকা তাহসিন রোজা

সালমা বেগম ছেলেকে ভীষণ ভালোবাসেন। নিজের ছেলের দুঃখী মুখ তার আর সহ্য হচ্ছিল না। দায়িত্বশীল শ্বাশুড়ির মত তাই শ্রাবণকে লাথি মেরে নিজের ঘরে পাঠিয়েছেন তিনি। সামিউল শেখ দ্বিমত করেন নি। একসাথে থাকুক আজ থেকেই। শ্রাবণ কোনোমতে একটা বালিশ বুকে চেপে ধরে ধীরপায়ে এসে নিজের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা আধখোলা। কি আশ্চর্য! নিজের ঘরে ঢুকতেই তার অস্বস্তি হচ্ছে। হুট করে শ্রাবণের মনে হলো ধারা অজান্তেই তাকে ক্ষমা করেছে। বিষয়টা মাথায় আসতেই বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিল শ্রাবণ। এরপর দরজা ঠেলে ঢুকে গেল ঘরে। দেখল ধারা বিছানার পাশে হাঁটুমুড়ে বসে বারান্দার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। শ্রাবণ কিছুটা অবাক হলো। মাঝে মাঝেই সে ধারাকে এমন অন্যমনস্ক দেখছে। মেয়েটা কি সবসময় এমন? নাকি কিছু হয়েছে? তার কি মন খারাপ? এখনো কি মন ভালো করতে পারেনি শ্রাবণ? শ্রাবণ চিন্তিত হলো। শুকনো ঢোক গিলে গলা খাঁকারি দিল। একটুখানি কাশির শব্দে ধারা চমকে দরজায় তাকায়। নিজের স্বামীকে অসহায় নেত্রে বালিশ বুকে চেপে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখেমুখে কৌতূহল। শ্রাবণ নিজেই আমতা আমতা করে বলে,

—” ইয়ে..মানে..মা স্টোররুম তালা মেরে দিয়েছে। গেস্ট রুম নীল দখল করে রেখেছে। তাই…
বাকিটা বলল না শ্রাবণ। এ ঘরে তার উপস্থিতিই সব বুঝিয়ে দিয়েছে। ধারা কিছু না বলে অনুভূতিশূন্য স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শ্রাবণ মনে করল ধারা তাকে থাকতে দিবেনা নিজের সাথে। মেয়েটাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইল না শ্রাবণ। নিজে থেকেই আবারো বলল,
—” সমস্যা নেই, আমি ড্রয়িং রুমেই ঘুমোচ্ছি। তুমি এখানে ঘুমোও। ”
ধারা সাথে সাথে ডাকল
—” থামুন।”
শ্রাবণ তটস্থ হলো। ধারা বলল
—” আমি এমনিতেও একা বিছানাতে ঘুমোই না। মেঝেতেই শুতাম। আপনি বিছানায় শুয়ে পড়ুন।”
বলে কোনো জবাবের অপেক্ষা করল না ধারা। দ্রুত গতিতে বিছানা ঝেড়ে দিয়ে শ্রাবণের শোয়ার ব্যবস্থা করল, এরপর ভদ্রভাবে সুলভ ভঙ্গিতে হেসে একটা বালিশ নিয়ে মেঝেতে রাখল। এরপর বসে পড়ল সেখানেই। বলল,
—” ঘুমিয়ে পড়ুন। চাইলে আলো নিভিয়ে দিতে পারেন।”
শ্রাবণ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে রইলো ধারার দিকে। কিছু একটা ভেবে বলল

—” আচ্ছা। ”
ধারা তা শুনে শুয়ে পড়ল মেঝেতে। ওড়না দিয়ে নিজেকে ঢেকে চোখ বুঁজে ফেলল একপাশে কাত হয়ে৷ শ্রাবণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সত্যি সত্যি আলো নিভিয়ে দিল। কিন্তু বিছানায় গেলো না। বরং নিজেও শ্রাবণ ধারার পাশে মেঝেতে বালিশ রেখে শুয়ে পড়ল। ধারার চোখ বন্ধ। কিছুক্ষণ আগেই তো বন্ধ করেছে। শ্রাবণ ধারার দিকে কাত হয়ে সেই বদ্ধ চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ধারা তৎক্ষনাৎ চোখ খুলে শ্রাবণকে দেখে চমকে গেল,
—” এ কি! আপনি মেঝেতে কেন?”
—” ঘুমোবো।”
—” বিছানা করে দিয়েছি তো।”
শ্রাবণ হাসল। বলল
—” তোমার সাথে ঘুমোবো। তুমি বিছানায় শুলে আমিও শোবো। নইলে নয়।”
ধারা আবারো দমে গেল। মিনমিন করে বলল,

—” আমায় একটু সময় দিন।”
—” সারাজীবনটাই নাও। আমি অনুমতি ব্যতীত তোমায় স্পর্শ করব না। কিন্তু তাই বলে দুরত্বও রাখতে পারছিনা। কষ্ট হচ্ছে। দুরত্বের যন্ত্রণা কতটা পোড়ায় তা তো তুমি ভালো জানো।”
ধারা মুচকি হাসল। আজ জোছনার আলো নেই। মেঘে ঢাকা আকাশটা অন্ধকারে ছেঁয়ে গেছে। তবুও শ্রাবণ ধারার জ্বলজ্বল করা চোখদুটোর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। দুজনের দৃষ্টি মিললে ধারা বলে,
—” একরাশ দুরত্বে থাকার পর হুট করে এত কাছে এলে খুব বেমানান লাগবে শেখ সাহেব। বিষয়টা অনেক বেশি কৃত্রিম অনুভূতিকে ইঙ্গিত দেয়। আমার বারবার মনে হচ্ছে আপনি অভিনয় করছেন। আপনার ভালোবাসা নাটক, অভিনয়। আমি জানি এটা ভুল। কিন্তু মানতে পারছিনা এখনো। আপনি আমায় ঘৃনা করতেন, এটা সত্য ছিল, তাই মেনে থেকেছি। কিন্তু এখন এমন এক ক্ষত হৃদয় হয়েছে যে এ ভালোবাসা সত্যি তা এ মন মানতে নারাজ।”
শ্রাবণও একইভাবে মলিন হাসলো। বলল,

—” এই ভাবনাটাই আমায় পোড়ায় ধারা। যখনই বুঝতে পারি তুমি আমায় বিশ্বাস করছো না, ভরসা করতে পারছো না, ভালোবেসে তাকাচ্ছো না, তখনই বুকটা পুড়ে যায়। ঠিক কী করলে আমি তোমায় বোঝাতে পারব কতটা ভালোবাসি? ঠিক কীভাবে বোঝাব তোমায়? কলিজাটা বের করে যদি দেখাতে পারতাম, তবেও বোধহয় বিশ্বাস করতে না। কারন আমি সেই বিশ্বাস হারিয়েছি। এখন আমি অসহায় এক স্বামী ছাড়া আর কিছু নই। তোমায় প্রাণভরে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু করার ক্ষমতা নেই আমার সোনা। বিশ্বাস করো, তোমার স্বামী অপারগ, অক্ষম। সে পারছেনা তোমায় ফিরিয়ে আনতে। মাঝে মাঝে মন চাইছে নিজেকে শেষ করে দিই। এই অপরাধবোধ নিয়ে আর চলতে পারছিনা বউ। আর পারছি না। তোমার চোখে এখনো সেই ভয়, অস্বস্তিবোধ, হয়তো ঘৃনাও- এসব সহ্য হচ্ছে না।”
বলতে বলতে কেঁদে ফেলল শ্রাবণ। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। বালিশ ভিজে গেছে ইতোমধ্যে। দুজনের চোখেই পানি। তবে ধারা আজ শ্রাবণের মত শব্দ করে কাঁদতেও পারছে না। সে শুধু আকুল নয়নে তাকিয়ে রয়েছে তার স্বামীর দিকে, যাকে ভালোবাসার জন্য ধারার বুক পোড়ে, যাকে বিশ্বাস করার জন্য ধারার হৃদয় ছটফট করে। সে কীভাবে এই অসহায় মানুষটাকে বোঝাবে সে নিজেই পুড়ছে। নিজেই কষ্টে ভেঙে পড়েছে!
ধারা শব্দ ছাড়াই চোখের পানি ফেলছিল। একটা সময়ে সেও শব্দ করে ফুঁপিয়ে ওঠে। নাক টেনে আবদার করে বলে,

—” একবার আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন?”
শ্রাবণ চোখ বুঁজে কাঁদছিল। ধারার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে চোখে চোখ রেখে তাকাল। অবিশ্বাস্য দৃষ্টি দেখে ধারা আবারো বলল,
—” অনেক বছর কেও মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় নি। কেও আদর করেনি। কেও ভালোবাসেনি। কেও না। কেও কপালে চুমু খেয়ে বলেনি, আমি পাশে আছি। কেও হাতে হাত রেখে আশ্বাস দেয়নি। আমি যদি এখন আপনাকে অনুমতি দিই, আপনি কি আমায় একটুখানি… আদর দেবেন? মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন?”
কথাগুলো শুনে শ্রাবণ নিজেই শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো। দুহাত বাড়িয়ে ধারার মুখটা টেনে নিল। কপালে কপাল ঠেকিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজে ফেলল দুজনেই। শ্রাবণের বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সে কোনো উত্তর দিতে পারল না। শুধু কাঁপতে থাকা দুটো হাত আরও একটু শক্ত করে তুলে খুব যত্ন করে ধারার দুই গাল জড়িয়ে ধরল। ভয় হচ্ছে তার, একটু জোরে ধরলে যদি মেয়েটা ব্যাথা পায়। ধারা চোখ বন্ধ করে ফেলল। শ্বাস কাঁপছে দুজনেরই। শ্রাবণ কাঁপা আঙুলে খুব ধীরে ধীরে ধারার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুকণাগুলো মুছে দিল। তারপর সেই হাতটাই আলতো করে তুলে রাখল ধারার মাথায়। খুব ধীরে ধীরে আঙুলগুলো তার নরম চুলের ভেতর দিয়ে বুলিয়ে দিল। সব যত্ন মিশিয়ে ধারার কপালে, মাথায়, চুলে হাত বুলোতে থাকল শ্রাবণ। ধারার ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। শব্দ করে কেঁদে উঠল।

—” আমি…আমি খুব ক্লান্ত শেখ সাহেব…”
শ্রাবণের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল,
—” জানি সোনা… জানি…”
আবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। এবার আরও ধীরে, আরও যত্নে। মনে হলো, প্রতিটা স্পর্শ দিয়ে সে এতদিনের সমস্ত অবহেলা মুছে দিতে চাইছে। ধারা চোখ বন্ধ রেখেই মাথাটা একটু এগিয়ে আনল নিজের অজান্তেই। হাতের ছোঁয়াটা আরেকটু বেশি সময় ধরে রাখতে চায় সে। শ্রাবণ খুব আস্তে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। দীর্ঘ একটা চুমু খেয়ে কপালটা সেখানেই ঠেকিয়ে রেখে ফিসফিস করে বলল,

—” তোমাকে আর কখনো কষ্ট পেতে দেব না সোনা। কখনো না। হৃদয়রাজ্যে রাণী করে রাখব তোমায়।”
ধারা কেঁদেই চলেছে। হঠাৎ দুহাত তুলে শ্রাবণের টি-শার্টের বুকের অংশটা শক্ত করে মুঠো করে ধরল। লোকটা আবারো হারিয়ে ফেলার ভয় আঁকড়ে ধরেছে তাকে। যেন ছেড়ে দিলেই সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে। শ্রাবণও আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে খুব ধীরে ধারাকে নিজের বুকের কাছে টেনে আনল। একটুও জোর করল না। শুধু এমনভাবে জড়িয়ে ধরল যেন কোনো বিড়ালছানাকে আগলে নিচ্ছে সে। ধারা মাথা রেখে দিল তার বুকের ওপর। দুজনের কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। এই কান্নায় অভিযোগ আছে, অভিমান আছে, অপেক্ষা আছে, হারিয়ে ফেলা অসংখ্য দিনের শোক আছে…আর আছে ফিরে পাওয়ার অদ্ভুত স্বস্তি।

ঠিক তখনই, দূরের আকাশে গম্ভীর শব্দ তুলে মেঘ ডেকে উঠল। গুড়ুম গুড়ুম শব্দে এতক্ষণ ধরে আটকে রাখা সমস্ত জল একসাথে ঝরে পড়ল পৃথিবীর বুকে। মুহূর্তের মধ্যেই জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে নামতে শুরু করল। বারান্দায় বৃষ্টির শব্দ এক অদ্ভুত ছন্দ তুলল। ঘরের অন্ধকার আরও গভীর হয়ে গেল। বাতাসে ভিজে মাটির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। শুধু আকাশই নয়, দুজন মানুষের বুকের ভেতরেও জমে থাকা বহু বছরের মেঘ আজ একসাথে ভেঙে পড়েছে। শ্রাবণ কোনো কথা বলল না। শুধু এক হাতে ধারার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে যেতে লাগল। মাঝে মাঝে তার আঙুলে জড়িয়ে যাচ্ছে ধারার এলোমেলো চুল। সে থামছে না। কারণ আজ প্রথমবার এই মানুষটা নিজের স্ত্রীকে আদর করার অধিকার পেয়েছে। একটুখানি জিনিসই তো আবদার করেছে।

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩৫

সারারাত আদর করলেও তো শান্তি পাবেনা শ্রাবণ। চোখ বন্ধ করে সবটুকু অনুভব করে নিশ্চিন্ত মুখশ্রীতে এলিয়ে থাকা ধারাকে হাজারবার দেখেও তো মন ভরবে না। অনেক বছরের তৃষ্ণার পর যেমন শুকনো মাটি প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা নীরবে শুষে নেয়, ধারাও তেমন করেই শ্রাবণের প্রতিটা স্পর্শ নিজের হৃদয়ের গভীরে জমা করে রাখল। বাইরে অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে
ভেতরে দুটো মানুষ কাঁদছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কান্নাগুলোর একটা বোধহয় এটাই, যেখানে কেউ কাউকে হারিয়ে কাঁদে না, বরং অবশেষে ফিরে পাওয়ার স্বস্তিতে কাঁদে।

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here