শ্রাবণ ধারা শেষ পর্ব
অনামিকা তাহসিন রোজা
পুনরায় তিন কবুলের মাধ্যমে বিয়ে হলো শ্রাবণ ধারার। ধারা কবুল বলতে গিয়ে চোখের পানি ফেলেছে। যা দেখে নীল ও এশাও আবেগী হয়ে গিয়েছে। সত্যি বলতে শ্রাবণ ধারার আজ এই বিয়েটা অনেক মানুষের এতদিনের স্বপ্ন ও আবেগকে সফলতা দিয়েছে। এতগুলো মানুষের আনন্দ মিশে রয়েছে এতে। বিয়ের পর্ব চুকে গেছে অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। নীল নিজের বউ নিয়ে চলে গিয়েছে গ্রামের উদ্দেশ্যে। নীলের পরিবার সেখানে নতুন বউকে বরণ করে তোলার অপেক্ষায় রয়েছে। এদিকে আত্মীয় স্বজনরাও যে যার মত চলে গেছে। কয়েকজন গেস্ট রুমে থেকে গেছে। জিহানও চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু সামিউল শেখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে সে এগোনো পা ফিরিয়ে এনে চুপচাপ বসে পড়েছে সোফায়।
কিন্তু শ্রাবণ আছে মহাচিন্তায়। বিয়ে শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সালমা বেগম ধারাকে নিয়ে উধাও হয়েছেন। শ্রাবণ বারবার উঁকি মেরে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজের বউটাকে খুঁজছে। অথচ মেয়ের কোনো দেখা নেই। মনে মনে আশঙ্কা করল শ্রাবণ। তার আজ বাসর হবে তো? ধারাকে কি ঘরে পাঠাবে না? এমনটা হলে অনশনে বসবে বলে কঠিন সিদ্ধান্ত নিল শ্রাবণ শেখ। মনের আগুন মেটাতে সে জিহানের ঠ্যাং ধরে ছাদে নিয়ে গেল। জিহানও সুযোগ পেয়ে থেমে গেল না। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
—” কী ব্যপার বন্ধু? এত ঘামছো কেন? নার্ভাস?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকাল। বিয়ের পাঞ্জাবিটা বড্ড কচকচে। ভেতরে কটমট করে শরীরের চামড়ায় লাগছে তার। এজন্য অস্থিরও লাগছে।
—” কি আশ্চর্য! নার্ভাস হবো কেন?”
—” ও হ্যাঁ সেটাই তো। তুমি যে একটা নির্লজ্জ বেহায়া অশভ্য প্রাণী তা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। বাসর রাতে নার্ভাস হয় ভালো, ভদ্র ছেলেরা। তোমার মত ষাঁড় কেন নার্ভাস হবে?”
শ্রাবণ আবারো মুখ কুঁচকাল,
—” আমি ভদ্র না? এই হারামি, আমি এখনো পিওর ভার্জিন। হুহ!”
ভাব নিতে কলার ঝাঁকাল শ্রাবণ। অনেক গর্বের কথা এটা। যদিও বাইরের মানুষ শুনলে নাকমুখ কুঁচকে শ্রাবণকে কলিকাতা হারবাল খাওয়ার পরামর্শ দিতে পারে, যেহেতু বিয়ের অনেকদিন হয়েছে।
জিহান তার কাঁধে হাত বুলিয়ে সান্তনা দিল,
—” আহারে, তুমি এখনো ভার্জিন? কি দুঃখের কথা। কষ্ট পেও না। আগামী দু বছরেও ভার্জিনই থাকবে।”
শ্রাবণ চোখ সরু করে তাকাল। মনে মনে ভাবল- “বলেছে তোকে? দুই ঘন্টার মধ্যে ভার্জিন ট্যাগ সরাচ্ছি দাঁড়া।” কিন্তু মনের কথা বাইরে এনে কিছু বলল না সে। কেননা শ্রাবণ শেখ ইজ আ জেন্টেলম্যান। নিজের ইজ্জত হারাবে এটা এত ঘটা করে বলার কী আছে!
জিহান দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিল। মুখে সেই চিরচেনা শয়তানি হাসি।
—” আচ্ছা বন্ধু, একটা কথা বলি?”
শ্রাবণ বিরক্ত চোখে তাকাল। বলল,
—” তুই যখনই বলিস ‘একটা কথা বলি’, তখনই আমার জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে যায়।”
জিহান হো হো করে হেসে উঠল,
—” ভয় পাচ্ছিস নাকি?”
—” কীসের?”
—” বাসর রাতের।”
শ্রাবণ নাক সিটকাল,
—” ধুর। ”
—” ধুর মানে? তুই তো এখনো প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষাই দিসনি। শুধু থিওরি পড়ে ডাক্তার হওয়া যায়?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
—” তুই একটা ছাগলের জাত, বিষয়টা জানিস?”
—” নো, এখন জানলাম। বাট সিরিয়াস কথা বলছি। বাসর ঘরে ঢুকে যদি মুখ থেকে একটাও কথা না বের হয়? যদি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু আ…উম…মানে… করিস?”
শ্রাবণ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—” আমি তোর মতো না।”
—” অবশ্যই না। আমি হলে অন্তত আগে থেকে ডায়লগ মুখস্থ করে যেতাম।”
শ্রাবণ এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
—” তোর সমস্যা কী?”
জিহান নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চাপড়ে বলল,
—” সমস্যা হলো, আমার এত বছরের বন্ধু আজ বাসর করতে যাচ্ছে। অথচ আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।”
দাঁত খিঁচিয়ে শ্রাবণ হেসে বলল,
—” তাহলে কি তোকে সাথে করে নিয়ে যাব?”
—” যাহ দুষ্টু। আমি ওসব দেখতে চাই না।”
—” তোর উপর আল্লাহর গজব পড়ুক। তোর মুখে ঠাডা পড়ুক। বেয়াদব! ”
—” আরে শোন তো।”
আবার গম্ভীর হওয়ার ভান করল জিহান,
—” একটা উপদেশ দিয়ে দিই।”
শ্রাবণ সন্দেহের চোখে তাকাল, ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
—” কী?”
জিহান আঙুল গুনতে শুরু করল,
—” এক নম্বর, বেশি স্মার্ট হতে যাস না। দুই নম্বর প্রথম পাঁচ মিনিটে কোনো রোমান্টিক কবিতা আবৃত্তি করবি না। তিন নম্বর, যদি ভাবি তোকে লাথি মারে, সম্মানের সঙ্গে মেনে নিবি। কারন তুই এটা ডিজার্ভ করিস।’
শ্রাবণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। জিহান আবার বলল,
—” আর চার নম্বর…
বলে শ্রাবণের কানের কাছে এসে বাকিটা ফিসফিস করে বলল জিহান। শ্রাবণের চেহারা দেখে মনেই হলো জিহান কোনো সুশীল কথা বলেনি। সে নাকমুখ কুঁচকে তাকালো জিহানের দিকে।
—” এমন জায়গায় লাথি মারব, কাওকে দেখাতে পারবি না।”
জিহান নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—” আমার তো তোমার মত দেখানোর মানুষও নেই। না দেখাতে পারলেও চলবে।”
কথাটা শেষ হতেই নিজেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল জিহান। শ্রাবণও আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বিরক্ত মুখেই হেসে ফেলল।
—” শালা অ”শ্লীল। ”
—” সেটা তো বহু আগেই জানি।”
ঠিক তখনই ছাদের দরজাটা খুলে গা ভর্তি গয়না, শাড়ি পরা শ্রাবণের এক দূরসম্পর্কের ছোট বোন, তানহা আসল। মুখ বাড়িয়ে মুচকি হেসে বলল,
—” ভাইয়া…”
শ্রাবণ তাকাল,
—” কী হয়েছে?”
তানহা মুখ চেপে হাসতে হাসতেই বলল,
—” খালামণি আপনাকে নিচে ডাকছেন।”
শ্রাবণের বুক ধক করে উঠল,
—” কেন?”
তানহা ইচ্ছে করেই কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে দুষ্টু হাসি হেসে বলল,
—” আপনার ঘরে যেতে বলেছেন।”
জিহান সঙ্গে সঙ্গে মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। তানহা আবার যোগ করল,
—” আর ভাবিকেও তৈরি করে ঘরে বসিয়ে দিয়েছেন।”
কথাটা শেষ হতেই জিহান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কেশে বলল,
—” যাও বাছাধন! শুভযাত্রা!”
শ্রাবণ একবার জিহানের দিকে তাকাল, আরেকবার ছাদের দরজার দিকে। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে এমন ভাব করল যেন ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক।
—” হুম… আচ্ছা… যাচ্ছি।”
সে এগোতেই জিহান পেছন থেকে চিৎকার করে উঠল,
—” এই যে শ্রাবণ শেখ!”
শ্রাবণ ঘুরে তাকাল। জিহান দুই হাত মুঠো করে গম্ভীর মুখে বলল,
—” সাহস রাখো, সৈনিক! দেশ তোমার জন্য গর্বিত!”
এক সেকেন্ড নীরবতার পরের মুহূর্তেই শ্রাবণ নিজের পায়ের স্যান্ডেল খুলে ছুড়ে মারতে উদ্যত হতেই জিহান হো হো করে হাসতে হাসতে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল।
ছাদের নির্জনতায় শ্রাবণের মুখেও অগোচরে একটা হাসি ফুটে উঠল। বুকের ভেতরটা আজ অদ্ভুতভাবে কাঁপছে। আজ আর কোনো ভয় নেই। শুধু অপেক্ষা তার ধারার কাছে যাওয়ার।
ঘরজুড়ে মৃদু বেলী ফুলের সুবাস। বিছানার চারপাশটা খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ নয়। বরং একদম রুচিশীলভাবে সাজানো। সাদা বেলীর মালা বিছানার চার কোণে ঝুলছে। মাঝেমধ্যে লাল গোলাপের ছোট ছোট গুচ্ছ। নরম হলুদ আলোয় পুরো ঘরটা যেন শান্ত এক প্রশান্তিতে ভেসে আছে। জানালার পর্দা হালকা বাতাসে দুলছে। ঘরের এক কোণে বড় আয়নার সামনে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে ধারা। আজ তার সাজটা খুবই সাধারণ। সালমা বেগম বিয়ের পর তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে সাজিয়ে দিয়েছেন। গাঢ় লাল ভারী বেনারসী পাল্টে হালকা রঙের শাড়ি। মাথার খোঁপা জুড়ে বেলী ফুলের মালা। তার মাঝেই দু-একটা লাল গোলাপ। মেহেদী রাঙা হাতে কয়েকটা চুড়ি। মুখে একদমই মেকআপ নেই। তবুও আজ তাকে অপার্থিব সুন্দর লাগছে।
ধারা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। মনে হলো এই মেয়েটাকে সে যেন আগে কোথাও দেখেনি। এ কি সেই ধারা, যে একদিন কান্না লুকিয়ে নতুন এক সংসারে পা রেখেছিল? যে নিজের স্বামীর চোখে নিজের জন্য কোনো জায়গা খুঁজে পায়নি? যে রাতের পর রাত স্টোররুমের ঠান্ডা মেঝেতে শুয়ে থেকেছে? যে নিজের কষ্টগুলোকে চুপচাপ বালিশের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল? ধারার বুকটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। সে খুব আস্তে নিজের গালে হাত রাখল। আজকের এই সাজ, আজকের এই বাসর, সবই তো একদিন তার স্বপ্ন ছিল। যে স্বপ্নটাকে সে নিজেই একসময় কবর দিয়ে দিয়েছিল। ভাবত, হয়তো তার জীবনে আর কোনোদিন এমন সকাল আসবে না। যেখানে অতীতের দুঃখ নয়, ভবিষ্যতের সুখ নিয়ে ভাবা যাবে। তার ঠোঁট কেঁপে উঠল। চোখের কোণ বেয়ে কয়েকটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু আজকের কান্নাটা কষ্টের নয়। এটা স্বস্তির। এটা ফিরে পাওয়ার। এটা নতুন শুরুর। ধারা দুহাত তুলে বুকের কাছে জোড় করল। মাথাটা আলতো করে নিচু হয়ে এলো। মৃদু কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
—”আলহামদুলিল্লাহ…”
তারপর চোখ বন্ধ করল। মনে মনে দোয়া করতে লাগল খোদার কাছে। বিড়বিড় করল,
—” আল্লাহ! আপনি আমার জীবনে যত পরীক্ষা দিয়েছেন, সবকিছুর জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। হয়তো আমি অনেক সময় বুঝিনি, তবুও আপনি আমার জন্য যা লিখেছেন, আজ বুঝতে পারছি তার মাঝেও রহমত ছিল। আমার এই সংসারটা আপনি হেফাজত করুন। আমার স্বামীর অন্তরকে সবসময় হেদায়েতের ওপর রাখুন। আমাদের মাঝে যেন আর কখনো ভুল বোঝাবুঝি, অহংকার বা দূরত্ব না আসে। আমাদের ভালোবাসাকে হালাল, পবিত্র আর স্থায়ী করে দিন। আমরা যেন একে অপরের জন্য শান্তির কারণ হতে পারি। আর যদি কোনোদিন আবার অন্ধকার নেমেও আসে, তাহলে যেন আমরা দুজন একসাথে হাত ধরে সেই অন্ধকার পার হতে পারি।”
দোয়া শেষ করে ধারা ধীরে ধীরে চোখ খুলল। আয়নায় আবার নিজের দিকে তাকাল। এবার আর আগের সেই ভাঙা মেয়েটাকে দেখতে পেল না। দেখল এক নতুন ধারাকে। যে কষ্ট পেয়েছে, হারিয়েছে, আবার পেয়েছে৷ যে আজ শুধু একজন স্ত্রী নয়, একটা নতুন জীবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক সুখী নারী।
ঠিক তখনই ঘরের দরজা খোলা ও কারও পায়ের মৃদু শব্দ ভেসে এলো। ধারার বুক ধক করে উঠল। এই পদচারণার মানুষটার জন্যই সে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল। তবে লজ্জায় ঘুরে তাকাল না ধারা। ভুলে গেল সবকিছু। শ্রাবণ ঘরে ঢুকে ধারাকে এভাবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়েছে। সে এক পা দুপা করে এগিয়ে এসে ধারার পেছনে দাঁড়াল। আয়না দিয়ে ধারাকে দেখে মুগ্ধ হলো। এরপর কোনো কথা না বলে আলতো করে ধারার কাঁধে নিজের থুতনি ঠেকিয়ে দিয়ে বলল,
—” আমার বউ কাঁদছে কেন?”
ধারা চোখে পানি নিয়েই হেসে বলল,
—” আনন্দে কাঁদছে।”
—” তাই বুঝি?”
—” জ্বি।”
খুব ভাবান্তর সুরে শ্রাবণ বলল,
—” কিন্তু আমি তো এখনো আদর করিনি।”
ধারা আয়না দিয়েই চোখ পিটপিট করে শ্রাবণের দিকে তাকাল। কথাখানার গভীর অর্থ বুঝতে সময় লাগল তার। আর বোঝার সাথে সাথে দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে লজ্জা পেয়ে বলল,
—” ইশ! খোদা! কি ঠোঁটকাটা মানুষ হয়েছে! আগেই ভালো ছিল লোকটা।”
শ্রাবণও হো হো করে হাসল। এরপর সেভাবেই ধারাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তবে মিশিয়ে নিল নিজের সাথে। ধারার মুখ থেকে দুহাত জোর করে সরিয়ে নিজের বুকের উপর রাখল। কোঁমড় পেচিয়ে ধরে থুতনিতে আঙুল রেখে মুগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল লাজেরাঙা মুখটার দিকে। এরপর পরখ করে ফিসফিস করে বলল,
—” মাশা-আল্লাহ। খুব সুন্দর লাগছে।”
ধারা আবারো লাজুক মুখে হেসে মাথা নিচু করল। এদিকে শ্রাবণের অন্য এক সমস্যা হচ্ছে। আর সহ্য করতে না পেরে সে ফট করে বলেই ফেলল,
—” আমি যদি এখনই পাঞ্জাবিটা খুলে ফেলি, তুমি কি আমাকে অভদ্র বলবে?”
ধারা চোখ বড় করে তাকাল
—” এহ?”
শ্রাবণ দুঃখী কন্ঠে বলল,
—” ভীষণ কটমট করছে শরীরে। গা চুলকাচ্ছে আমার। অস্বস্তিতে আধমরা হয়ে যাচ্ছি। আর থাকা যাচ্ছে না।”
ধারা সাথে সাথে তাড়াহুড়ো করে কাবার্ড থেকে টি শার্ট আর ট্রাউজার বের করে দিল,
—” হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি চেন্জ করে আসুন দ্রুত। আমি অনুষ্ঠানের সময় বৃঝতে পারছিলাম আপনার অস্বস্তি হচ্ছে। ভুলে গিয়েছিলাম।”
শ্রাবণ খুশি হলো। অবাকও হলো একটু। ধারার হাত থেকে টি শার্ট আর ট্রাউজার নিয়ে তার কপালে সময় নিয়ে চুমু খেল,
—” থ্যাংক ইউ সোনা।”
ধারা বাচ্চাদের মত করে বলল,
—” তাহলে আমিও শাড়ি খুলে ফেলি?”
শ্রাবণ দুষ্টু চোখে এক ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল,
—” খুলে ফেলবে?”
থতমত খেয়ে গেল ধারা,
—” আরে আরে, না। মানে চেন্জ করে নিই? সুতি শাড়ি পড়ি?”
শ্রাবণ হাসল। এরপর ধারার মুখের কাছে এসে নাকে আঙুল দিয়ে টোকা মেরে বলল,
—” অবশ্যই না ম্যডাম। আমি আপনার মত অত ভালো নই। এভাবেই থাকুন। আপনাকে দেখা শেষ হয়নি আমার। চোখের শান্তি মেলে নি। ”
ধারা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল। শ্রাবণ নিজে থেকেই আবার বলল,
—” আমার চোখের তৃষ্ণা মিটলে নিজেই খুলে দেব। ডোন্ট ওরি। শাড়ি, খোপা যা আছে সব খোলার পরিশ্রম আমি করব। ওকে? টাটা।”
বলেই ওয়াশরুমে চলে গেল শ্রাবণ। হতবাক হয়ে চোখ বড় করে তাকিয়ে রইলো ধারা। কান গরম হলো। ছি ছি! সব কথাই এত বাজেভাবে বলছে লোকটা! নাকি তারই মন নেগেটিভ হয়ে গেছে? ট্রমায় চলে যেতে থাকল ধারা। গভীর ভাবনায় গিয়ে সে বিছানায় বসে পড়ল।
শাওয়ারের পানি বন্ধ হওয়ার শব্দ ভেসে এলো। ধারার বুকটা অকারণেই ধুকপুক করে উঠল। সে নিজের মনে নিজেকেই বকতে লাগল। এত লজ্জা পাচ্ছি কেন? আমারো মাথা খারাপ হয়ে গেছে।’ তবুও হাতের আঙুলগুলো বারবার জড়িয়ে যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল। ধারা অবচেতন মনেই মুখ তুলে তাকাল। কিন্তু মুহূর্তের জন্য যেন সময় থেমে গেল। শ্রাবণ ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো। সে সুযোগ পেয়ে গোসলই করে ফেলেছে। চুলগুলো ভেজা। কপাল বেয়ে দু-এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে ঘাড়ে নেমে যাচ্ছে।কিন্তু পড়েছে শুধু কালো ট্রাউজার। গায়ে টি-শার্টটা নেই। একেবারে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। ধারার নিঃশ্বাস আটকে গেল। এতদিন সে কখনো এভাবে শ্রাবণকে দেখেনি। নিজের অজান্তেই চোখদুটো এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল। পরক্ষণেই সম্বিত ফিরে পেয়ে তড়িঘড়ি করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। গালদুটো টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।
মনে হলো শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুতের মতো একটা শিহরণ বয়ে গেল। শ্রাবণ ঠোঁট চেপে হাসি আটকে রাখল। ইচ্ছা করেই টি-শার্টটা পরেনি সে। দেখার জন্য তার লাজুক বউটার প্রতিক্রিয়া কী হয়। কয়েক কদম এগিয়ে এসে ভান করে অবাক হওয়ার সুরে বলল,
—”আরে? কী হয়েছে ধারা? এমন মুখ ঘুরিয়ে নিলে কেন? গরম লাগছে?”
ধারা মুখ না ফিরিয়েই তাড়াহুড়ো করে বলল,
—”আপ…আপনি টি-শার্ট পরেননি কেন?”
শ্রাবণ নিচের দিকে তাকিয়ে যেন তখনই খেয়াল করল
—”ওহহো!”
তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—” একদম ভুলে গেছি।”
ধারা এবার ঘুরে তাকাল,
—”ভুলে গেছেন?”
—”হ্যাঁ।”
—”হাতে তো টি-শার্ট ছিল!”
শ্রাবণ খুব গম্ভীর মুখ করে বিছানার দিকে তাকাল।
সত্যিই টি-শার্টটা ওখানেই পড়ে আছে। তবে ওটা একটু আগেই ছুঁড়ে ফেলেছে সে। শ্রাবণ মাথা নেড়ে বলল,
—”দেখো, বলেছিলাম না? পাঞ্জাবিটা এমন কটকট করছিল যে মাথাটাও কাজ করছে না।”
ধারা বিশ্বাস করল না। একটুও না। লোকটার ঠোঁটের কোণে যে চাপা হাসিটা খেলা করছে, সেটাই সব বলে দিচ্ছে। সে চোখ সরু করে বলল,
—”আপনি ইচ্ছে করে করেছেন। অশভ্য লোক! লজ্জা নেই?”
শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—” লজ্জা? এটা কি খায় নাকি মাথায় দেয়?”
ধারা এবার লজ্জায় হেসেও ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে আবার হাসিটা চাপা দিয়ে বলল,
—”আপনি একটা অভদ্র। ”
—”সত্যি?”
—”জ্বি।”
—”তাহলে… আমার শাস্তি কী?”
ধারা পাশে থাকা টি-শার্টটা তুলে নিয়ে প্রায় ছুঁড়ে দিল তার দিকে,
—”আগে এটা পরুন।”
শ্রাবণ টি-শার্টটা হাতে নিয়েও পরল না। বরং মুচকি হেসে বলল,
—” ধারা, লজিকালি ভাবো, একটু পর তো খুলতেই হবে, শুধু শুধু পড়ে লাভ কী?”
ধারা এবার আর এক মুহূর্তও তাকিয়ে থাকতে পারল না। দু’হাত দিয়ে নিজের উত্তপ্ত গাল দুটো ছুঁয়ে অবাক হলো, এরপর দুহাতে শ্রাবণের মুখ চেপে ধরল,
—” ইশ! চুপ করুন। ছি ছি।”
ধারার রিয়েকশন দেখে শ্রাবণ হাসতে হাসতে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ধারাও চোখমুখ কুঁচকেই হাসল। শ্রাবণ হাসি থামিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” তোমার খিদে পেয়েছে?”
—” উহু। মা খাইয়ে দিয়ে পাঠিয়েছে।”
—” গুড। কিন্তু আমার তো খিদে পেয়েছে।”
ধারা থমকে গিয়ে খুব অপরাধবোধ করল। ইশ রে! সে একা একা খেয়েছে। লোকটার খোঁজ নেয়নি। সে দ্রুত বিছানা থেকে নামতে নামতে তাড়াহুড়ো করে বলল,
—” আমি এখখুনি খাবার গরম করে আনছি। আপনি একটু অপেক্ষা করুন। ফ্রিজে পোলাও, মাংস আছে। আমি নিয়ে আসছি থামুন!”
কিন্তু সে বিছানার নিচে পা রাখার আগেই শ্রাবণ ধারার কব্জি ধরে হ্যাঁচকা টান মারল। টাল সামলাতে না পেরে সে শ্রাবণের দিকে ছিটকে গেল। শ্রাবণ ধারাকে নিজের বুকে দিকে টেনে বিছানায় শুয়ে দিল। নিজেও তার ওপর উপুড় করে শুয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে দিল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এতকিছু হওয়ায় ধারা চমকে তাকাল। শ্রাবণ ধারার চুলের খোপা থেকে ফুলগুলো একটা একটা করে খুলে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” আমি তো একবারো বলিনি আমি খাবার খাব।”
ধারা ইনোসেন্টলি চোখ পিটপিট করল,
—” বললেন যে খিদে পেয়েছে?”
শ্রাবণ এবারে ধারার পুরো খোপা খুলে দিয়ে বিছানার চারিদিকে চুল ছড়িয়ে দিল। এরপর তার হাতের চুড়িগুলো খুলতে খুলতে রহস্যে ভরা কন্ঠে বলল,
—” তা তো পেয়েছেই।”
ধারা বিষয়টা মাথায় নিয়ে স্বামীর কথা উপলব্ধি করার আগেই শ্রাবণ আর সময় দিল না তাকে। এক মুহুর্তেই ধারার ঠোঁটের ভাজে ঠোঁট মিশিয়ে দিল। কোঁমড়ে হাত রেখে টেনে নিল নিজের দিকে। ধারা প্রথমে বরফের ন্যয় জমে গেলেও স্বামীর স্নেহভরা আদরে গলে না গিয়ে পারল না। চোখ বুঁজে নিজেও শ্রাবণের ঘাড়ে হাত গলিয়ে দিল। নীরবে সমর্পণ করল প্রিয় মানুষটার নিকট। অজান্তেই একে অপরে মত্ত হয়ে গেল তারা। সময় নিয়ে ঠোঁটে আদর করে শ্রাবণ ধারার কপালে কপাল ঠেকিয়ে দিল। এরপর চোখ বন্ধ করল। দুজনেই কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। নীরবতাও কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর ভাষা হয়ে ওঠে।
সময় নিয়ে শ্রাবণ ফিসফিস করে বলল,
—” আর কখনো তোমায় কষ্ট পেতে দেব না। কখনো এই শ্রাবণ শেখের কাছ থেকে আর আঘাত পাবে না তুমি। আজ থেকে আমি তোমার। প্রমিজ। এখন, তুমি শুধু আমার হয়ে যাও।”
ধারার চোখের কোণ থেকে পানি পড়ে ফোঁটায় গিয়ে বিছানায় ছিটিয়ে থাকা গোলাপের একটা পাপড়ির উপর পড়ল। সে চোখ খুলল না। শুনে গেল। এরপর বলল,
—” ষোলো বছরের মেয়েটা যখন প্রথম আপনাকে স্বামীরূপে দেখেছিল, তখনই আপনাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছে শেখ সাহেব। নতুন করে দেয়ার মত আর কিছু নেই তার। তবে, পাওনা রয়েছে অনেক।”
মুচকি হাসল শ্রাবণ। ধারার শাড়ির আঁচল পেরিয়ে উন্মুক্ত পেটে হাত গলিয়ে দিয়ে আরেক ধাপ টেনে নিল নিজের দিকে। ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে বলল,
—” পাওনা শোধ করছি ম্যাডাম। ধৈর্য্য ধরুন। সুদসমেত সব শোধ করে দেব। ”
ধারা চোখে পানি নিয়ে হাসল। শ্রাবণ একে একে ধারার চোখের পাতায়, নাকে, দুই গালে চুমু খেল। এরপর কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,—” ভালোবাসি!” সেখানেও কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে থামল না সে। বৈশাখের উত্তপ্ত ঝড়ের ন্যায় আঁছড়ে পড়ল ধারার ঘাড়ে। পাগলের ন্যায় আদরে ভরিয়ে দিতে থাকল মেয়েটার সর্বাঙ্গে। অসহ্যকর সুখকর অনুভূতিতে শ্রাবণের উন্মুক্ত পিঠে খাঁমচে ধরল ধারা।
শ্রাবণ ধারার শাড়ির আঁচলটা আস্তে আস্তে সরিয়ে দিল। তার হাতের আঙুলগুলো ধারার কাঁধ, ঘাড়, পিঠ বেয়ে নেমে যেতে লাগল। প্রতিটা স্পর্শে যেন দিনের পর দিনের অতৃপ্তি, কষ্ট আর অপেক্ষা মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। ধারা চোখ বন্ধ করে শ্রাবণের বুকে মুখ গুঁজে দিল। তার শরীরটা কাঁপছিল। লজ্জায়, আবেগে, আর অপার্থিব এক সুখের প্রত্যাশায়। শ্রাবণ ধারাকে আরও কাছে টেনে নিল। তার ঠোঁট ধারার ঠোঁট, গাল, ঘাড় সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে লাগল। ছুঁইয়ে দিল বুকের বাম পাশে থাকা হৃদয়ে। ধারার হাত দুটো শ্রাবণের পিঠ আঁকড়ে ধরল সজোরে। দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাস একসাথে দ্রুত হয়ে উঠল। ঘরের মৃদু হলুদ আলোয়, বেলী ফুলের সুবাসে, আর বাইরের হালকা বৃষ্টির শব্দে দুটো অতৃপ্ত আত্মা অবশেষে এক হয়ে গেল। শ্রাবণ ধারাকে যত্ন করে, ভালোবাসায় ভরিয়ে, ধীরে ধীরে নিজের করে নিল। ধারা প্রথমে একটু কুঁকড়ে গেলেও, পরক্ষণেই স্বামীর বুকে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল। তাদের শরীর আর আত্মা একসাথে মিলে গেল।
শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩৭
হয়তো বাইরে আকাশে চাঁদটা লজ্জাতেই মুখ লুকিয়ে নিল মেঘের আড়ালে। বৃষ্টির ফোঁটা যেন আকাশের চোখের সুখের অশ্রু। পুরো প্রকৃতি সাক্ষী হয়ে রইল দুটো ভাঙা হৃদয়ের পুনর্মিলনের। দুটি ক্লান্ত হৃদয়, বহু ঝড় পেরিয়ে, অবশেষে খুঁজে পেল আশ্রয়। রাতের বাতাস সাক্ষী রইল। বেলী ফুলের সুবাস সাক্ষী রইল। জানালার পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছ, মেঘলা আকাশ, আর অসংখ্য তারাও সাক্ষী রইল -দীর্ঘদিনের দুটি অতৃপ্ত আত্মা, অবশেষে ভালোবাসার পূর্ণতায় একে অপরের মধ্যে খুঁজে পেল নিজের ঘর।
সমাপ্ত
