শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৩
আফীফা আফনান
চেয়ারে হেলান দিয়ে পরম আয়েশে মিষ্টি খাচ্ছে মেহুল। মিষ্টি জিনিসটা বরাবরই তান ভীষণ প্রিয়। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো কান্না নেই—মেয়েটা এমনভাবে মিষ্টির স্বাদ নিচ্ছে, যেন চারপাশে কোনো কিছুই হয়নি!
এদিকে উপস্থিত সবাই তাকে এমনভাবে দেখছে, যেন জলজ্যান্ত কোনো ভূত দেখছে তারা। আরমান, আনিকা, মামী, সুমনা ফুফু থেকে শুরু করে স্বয়ং ইকবাল সাহেব ও মিনারা বেগম পর্যন্ত মেহুলের এই অদ্ভুত হাবভাব আর স্বভাবের সমীকরণ মেলাতে পারছিলেন না। মেহুলের এমন অবিশ্বাস্য শান্ত রূপ যেন উপস্থিত সবার পিঠ বেয়ে হিমেল স্রোত বইয়ে দিল।
একসময় সবার এই ঘোরগ্রস্ত নীরবতা ভাঙল যখন কাজী সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে হাঁক ছাড়লেন, “আলহামদুলিল্লাহ্, বিয়ের সময় তো হয়ে এসেছে।এবার শুভ কাজটা শুরু করা যাক? আপনারা এবার আসুন। বর-কনে পক্ষের কে কে সাক্ষী থাকবেন, এগিয়ে আসুন।”
কজীর কথাতে সবাই মেহুলকে উপেক্ষা করে বর-বউয়ের দিকে তাকাল। আরমান আর আনিকাও নিজেদের ঠোঁটে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে তাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই প্রাপ্তির মুহূর্তটি উপভোগ করার জন্য প্রস্তুত হলো।
এদিকে ইকবাল সাহেব আরও একবার নিজের মেয়ের দিকে তাকালেন। কিন্তু মেহুল তখনো নিশ্চুপ বসে, তার মুখে সেই রহস্যময় শান্ত ভাব। শুধু ইকবাল সাহেবকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে বাবার চোখের ভাষা পড়ে সে আলতো করে মাথা নাড়ল। অতঃপর এক বুক-কাঁপানো তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইকবাল সাহেব নিজের আসন থেকে উঠলেন। তিনি ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে হুইলচেয়ারে বসা আনিকার বাবার কাছে গেলেন, মানুষটার ওপর তার কোন রাগ নেই কারন মানুষটা নিজেই অসহায়। ছয় বছর আগে সেই যে স্ট্রোক করে এই চেয়ারে বসেছেন আর উঠতে পারেন নি। অতঃপর চাকা ঘুরিয়ে আজমল সাহেবের হুইলচেয়ারটা টেনে নিয়ে গেলেন স্টেজের কাছাকাছি।
তাঁরা পৌঁছাতেই কাজী সাহেব বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন। ধর্মীয় রীতির আবহে যখন সেই বহুল প্রতীক্ষিত ‘কবুল’ শব্দটি উচ্চারিত হলো, এক লহমায় আরমান ও আনিকা জড়িয়ে গেল এক পবিত্র অথচ বিশ্বাসঘাতকতার বন্ধনে। মেহুল দূর থেকে একদৃষ্টে, চোখের পলক না ফেলে চুপচাপ সবটা দেখল। তার বারো বছরের ভালোবাসা আর স্বপ্নগুলো কীভাবে অফিশিয়ালি অন্যের হয়ে যাচ্ছে, কিভাবে দু’টো মানুষ দিনের পর দিন তাকে ঠকিয়ে আজ নিজেদের স্বপ্নের সর্গ বানিয়ে নিলো। মেহুল শুনলো চারপাশের মানুষের কথা, কতো রকমের মন্তব্য আরমান আর আনিকাকে নাকি বেশ মানিয়েছে। কেউ কেউ তো বলেই বসলো আরমানের জন্য নাকি আনিকাই বেস্ট। আর সেই কথাগুলো আর দৃশ্যটা একদম শান্ত রুপে বিন্দুমাত্র না কেঁদে অবলোকন করল মেহুল।
এদিকে বিয়ের কবুল পড়ানোর পরেই খাতায় সই করার পালা আসতেই কাজী সাহেব সবার উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করলেন, “মেয়ের পক্ষের সাক্ষী হিসেবে কে সই করবেন?”
প্রশ্নটি শেষ হতে না হতেই আনিকার মা শিরিনা বেমম অত্যন্ত দ্রুততার সাথে, মুখে গদগদ হাসি টেনে ইকবাল সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, “ভাইজান, আমাদের তো আপনি ছাড়া আর আপন বলতে কেউ নেই! বিয়েটা যেমন ভাবেই হোক হচ্ছে তো তাই আমার মেয়েটার বিয়ের প্রধান সাক্ষী আপনিই হবেন ভাইজান। এটা আমার আর আপনার ভাইয়ের ভীষণ ইচ্ছে। না করবেন না!”
কথাটা শুনে মিনারার হাত দুটো রাগে মুঠো হয়ে গেল, কিন্তু ইকবাল সাহেব নিথর হয়ে রইলেন। তিনি শুধু মনে মনে দেখে গেলেন—কীভাবে তাঁর আর তাঁর মেয়েটার বুকে ক্ষত সৃষ্টি করতে পুরো পরিবারটা আজ একজোট হয়েছে! কতটা নির্লজ্জ হলে একটা মেয়েকে এভাবে ঠকানোর পর, তারই বাবাকে দিয়ে নিজের মেয়ের বিয়ের সাক্ষী করানো যায়! কিন্তু ইকবাল সাহেব মুখে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না, কোনো ক্ষোভ দেখালেন না। কারণ, তিনি যে তাঁর কলিজার টুকরো মেহুলকে কথা দিয়েছিলেন—আজ যাই হয়ে যাক না কেন, তিনি সবটা চুপচাপ মেনে নেবেন।
তইতো তিনি পাথরের মতো শক্ত মুখে কলমটা হাতে তুলে নিলেন। ইকবাল সাহেব যখন কাঁপতে থাকা আঙুলে সাক্ষীর ঘরে নিজের নাম স্বাক্ষর করছিলেন, ঠিক তখন তাঁর পাশেই হুইলচেয়ারে বসা আজমল সাহেব চরম অপরাধবোধে মাথা নিচু করে রইলেন। তাঁর চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ছিল। এই পঙ্গু মানুষটা কখনোই চাননি তাঁর মৃত বোনের মেয়ের সাথে, মেহুলের সাথে এমন নির্মম একটা কিছু ঘটুক। একে তো নিজের মেয়ে আনিকা মেহুলেরই হবু বরকে কেড়ে নিয়ে বিয়ে করে নিল, তার ওপর তাঁর লোভী স্ত্রী মেহুলের বাবাকে দিয়েই সেই পাপের সাক্ষী স্বাক্ষর করিয়ে নিল! আজমল সাহেবের ইচ্ছা করছিল চিৎকার করে কাঁদতে, কিন্তু এই অপরাধের স্তব্ধতা ভাঙার ক্ষমতা আজ তাঁর পঙ্গু শরীরের ছিল না।
এদিকে ইকবাল সাহেবের স্বাক্ষর শেষ হতেই কাজী সাহেব খাতাটা ঘুরিয়ে নিলেন। চশমার ওপর দিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “মেয়ের পক্ষের সই তো হলো। এবার ছেলের পক্ষ থেকে সাক্ষী কে হবেন? এগিয়ে আসুন।”
কাজী সাহেবের কথা শেষ হতে না হতেই, এতক্ষণের থমথমে নীরবতা ভেঙে হলের এক কোণ থেকে মেহুলের কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল। কোনো দ্বিধা বা কাঁপুনি ছাড়া, অত্যন্ত উচ্চ ও গম্ভীর স্বরে সে উচ্চারণ করল—
”আমি! আমি হব আরমান ভাইয়ের পক্ষের সাক্ষী!”
মেহুলের এই একটা কথায় পুরো আসর যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সোফায় বসা আরমান আর আনিকা—দুজনেই চমকে উঠে ঝটকা দিয়ে তাকাল মেহুলের দিকে। সেই সাথে শিরিনা বেগম ও সুমনা বেগমের মুখের চওড়া হাসিটা এক লহমায় মিলিয়ে গেল। উপস্থিত আত্মীয়রা একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল, কেউ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না!
মেহুল ঠোঁটের কোণে সেই চেনা হিমশীতল হাসিটা ধরে রেখেই হাতের মিষ্টির প্লেটটা নিয়েই সে ধীরপায়ে এগিয়ে এলো একদম স্টেজের সামনে—আরমান ও আনিকার মুখোমুখি।
তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল দৃঢ় আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। আরমানের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, কাজী সাহেবের টেবিলের ওপর ঝুঁকে সে কলমটা তুলে নিল। তারপর আরমান ও আনিকার চোখের দিকে চেয়ে শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় বলল:
”আফটার অল, এই দিনটার জন্য ওরা দুজনে বহু দিন ধরে চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেছে। আপনি আর কত অপেক্ষা করাবেন কাজী সাহেব? ওদের এই পরম প্রাপ্তির দিনে আমিই না হয় সাক্ষী হয়ে তাদের অপেক্ষার অবসান করে দি।”
মেহুলের কথাগুলো যেন আরমানের মুখে সপাটে এক চড় কষাল। মেহুলও বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে, অত্যন্ত নিখুঁত টানে ছেলের পক্ষের সাক্ষীর ঘরে নিজের নামটা সই করে দিল।
সই শেষ করে কলমটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে মেহুল আরমান আর আনিকার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কোনো করুণা বা অসহায়ত্ব ছিল না, ছিল কেবল এক চরম হিসাব চুকানোর ইঙ্গিত।
মেহুল কলমটা মাত্র রাখতে যাবে, ঠিক তখনই কাজী সাহেব খাতাটার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বলে উঠলেন, “মা, তুমি ছেলের পক্ষের সাক্ষী হিসেবে সই করলে তা তো ঠিক আছে। কিন্তু তুমি একা সাক্ষী হলে তো হবে না, আরেকজন মহিলা লাগবে। কারণ ইসলামে সাক্ষীর ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। দুজন পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে, আর যদি দুজন পুরুষ না থাকে, তবে একজন পুরুষ ও দুজন নারীর সাক্ষ্য লাগবে। এখন তুমি তো এখানে একা নারী, মা! আরেকজন নারী সাক্ষী না হলে তো আইনি ও ধর্মীয়ভাবে এই বিবাহ সম্পূর্ণ হবে না।”
কাজী সাহেবের এই আইনি মারপ্যাঁচের কথা শুনতেই আনিকা একটু ঘাবড়ে গেলো। অন্যদিকে মেহুল এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে চট করে ঘুরে মিনারা বেগমের দিকে তাকাল।
মেহুলের চোখের সেই অবাধ্য চাহনি দেখেই মিনারা বেগম একদম পরিষ্কার বুঝে গেলেন মেয়েটার মনে এখন কী চলছে! মেহুল তাকেও এই পাপের ভাগীদার করতে চাইছে। মিনারা বেগম সাথে সাথে নিজের মাথাটা দুই পাশে সজোরে দুলিয়ে উঠলেন। তাঁর দুচোখে স্পষ্ট অসম্মতি—তিনি কোনোভাবেই এই বেইমানদের বিয়ের কাগজে সই করে মেহুলের ওপর হওয়া অন্যায়কে স্বীকৃতি দেবেন না!
কিন্তু মেহুল তো আজ কোনো কিছু ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়! সে যে আজ এক অন্য ধাতুতে গড়া নারী।
তইতো সে স্টেজ থেকে নেমে এসে মিনারা বেগমের কাছে এগিয়ে গেলো, কোনো কথা না শুনেই তাঁর হাতটা শক্ত করে ধরল। তারপর প্রায় জোর করেই মিনারা বেগমকে টেনে হিঁচড়ে এনে দাঁড় করাল কাজী সাহেবের টেবিলের সামনে। মিনারা বেগম তখনো হাত টেনে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু মেহুলের আজব শক্তির কাছে তিনি পেরে উঠলেন না। অতঃপর তিনি হার মানলেন।
মেহুলও টেবিল থেকে কলমটা তুলে নিয়ে জোড় করে মিনারা বেগমের হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। মিনারা বেগম যখন ক্ষোভে আর অপমানে কাঁপছিলেন, মেহুল প্রথমে নিজের হাত দিয়ে মিনারা বেগমের হাতটা চেপে ধরে কাগজের ওপর বসাল। তারপর ঠান্ডা মাথায়, প্রথমে নিজে চাপ দিয়ে মিনারা বেগমের হাত দিয়ে সাক্ষীর ঘরে কলমের টানে প্রথম স্বাক্ষরটা করাল, এবং ঠিক তার পর মুহূর্তেই মিনারা বেগমকে দিয়ে পুরো স্বাক্ষরটা সম্পন্ন করিয়ে নিল।
সইটা শেষ হতেই মেহুল মিনারা বেগমের হাতটা ছেড়ে দিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি হাসল। পুরো হলরুম তখন মেহুলের এই জেদ আর দুঃসাহস দেখে অবাক হয়ে গেছে। আরমান আর আনিকার মুখের রঙ ততক্ষণে চুন হয়ে উঠেছে, কারণ তারা বুঝতে পারছে না মেহুল আসলে কি করতে চাইছে।
এদিকে কাজটি সম্পর্ণ হতেই মেহুল তার শান্ত অথচ একজোড়া হিমশীতল চোখ স্থির করলো নতুন দম্পতির ওপর।
মেহুল প্রথমে তাকাল আরমানের দিকে। মেহুলের সাথে বিয়ে উপলক্ষে কেনা শেরওয়ানিতেই সুসজ্জিত হয়ে বসে আছে পুরুষটি। মেহুল নিজে পছন্দ করে তার লেহেঙ্গার সাথে মিলিয়ে মেরুন কালারের শেরওয়ানি কিনেছিলো। ঠিক একই জামা, একই সাজ, নিখুঁত পরিপাটি অবয়ব—কিচ্ছু পরিবর্তন হয়নি। শুধু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পরিবর্তন হয়ে গেছে মানুষটার ভেতরের নোংরা মনটা।
এবার আরমানকে ছেড়ে মেহুলের দৃষ্টি গেল আনিকার ওপর। মেহুল নিজের বিয়ের দিনের সাজ নিয়ে ঠিক যেমন যেমনটা স্বপ্ন বুনেছিল, আনিকা আজ ঠিক তেমনটাই সেজেছে। একটুও এদিক-ওদিক হয়নি। এমনকি আনিকা যে বিয়ের লেহেঙ্গাটা পরে বসে আছে, সেটাও মেহুলেরই কেনা। শুধু কি পোশাক? আনিকার শরীরে জড়িয়ে থাকা মহামূল্যবান গহনাগুলোও মেহুলেরই!
মাত্র দু মাস আগে মেহুল যখন তার বাবার সাথে হঠাৎ করেই দুবাই গিয়েছিলো তখন নিজের বিয়ের জন্য কিছু গহনাগাঁটি কিনে এনেছিল। বাড়ি ফেরার পর আনিকা যখন গহনাগুলো দেখে আফসোসের সুরে বলেছিল, “ইশ রে! আমারও যদি এমন এক সেট গহনা থাকত! আব্বু যদি সুস্থ হতো তাহলে হয়তো আমারও এমন গহনা হতো।”, তখন মেহুলের মনটা কেঁদে উঠেছিল। মামা তো অসহায়, পঙ্গু হয়ে হুইলচেয়ারে বসা—কে-ই বা পূরণ করবে মামাতো বোনের শখ? তাই মেহুল নিজের বোন ভেবে দ্বিধাহীনভাবে কিছু গহনা আনিকাকে উপহার দিয়ে দিয়েছিল। আর আজ সেই দান করা গহনা আর লেহেঙ্গা পরেই মেয়েটা তার ভালোবাসার মানুষটার পাশে কনে সেজে বসেছে!
মেহুল মনে মনে এক বিষাক্ত হাসি হাসল। তার যা বোঝার, এতক্ষণে সব বোঝা হয়ে গেছে। এই মানুষগুলো বছরের পর বছর ধরে তার মাথার ওপর কাঁঠাল ভেঙে খেয়েছে, আর সে সরল মনে ভেবেছে এরা তার আপন! তাকে ভালোবাসে অথচ এর ভেতরের রুপ ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎই মেহুল একটু ডানপাশে তাকাল। ঠিক তখনই তার চোখের সীমানায় এসে ধরা দিল মিনার আর তার পাশে থাকা মুক্তা। মিনার—তার মনি মিনারা বেগমের ছেলে। তার ভাই ও প্রিয় বন্ধু, দুজনেই সমবয়সী হওয়াতে ভালোই বন্ডিং দুজনার মাঝে। কিন্তু আরমানের চোখে মিনার হলো এক বাউন্ডুলে, উচ্ছন্ন যাওয়া ছেলে, যার দ্বারা জীবনে কিচ্ছু হওয়া সম্ভব নয়। অপরদিকে মেহুলের চোখে মিনার হলো এক ‘সবজান্তা’ জাদুকর—এমন কোনো কাজ নেই যা মিনার পারে না।
তাই তো নিচে নামার ঠিক আগমুহূর্তে মেহুল মিনারকে ফোন করে একটা বড়সড় আর গোপন গুরুদায়িত্ব দিয়ে এসেছিল। আর মিনার যখন মেহুলের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ঝুলাল, মেহুল বুঝে গেল—মিনার তার দেওয়া কাজ একদম নিখুঁত আর ঠিকঠাক মতো সেরে ফেলেছে!
অতঃপর হঠাৎ সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে মেহুল পাশে থাকা সাউন্ড সিস্টেমের কর্ডলেস মাইকটা হাতে তুলে নিল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে সে এক টুকরো মিষ্টি হাসল। এরপরেই মিনারের দিকে তাকাতেই সেই মুহূর্তেই মিনার চটপটে পায়ে এগিয়ে গিয়ে স্টেজে উঠে আরমানের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গেলো। মুখে এক আকাশ অমায়িক হাসি টেনে মিনার আরমানকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে লাগল, “অভিনন্দন বস! অভিনন্দন। দাম্পত্য জীবন সুখের হোক। গোলাপের গায়ে যত কাঁটা থাকে, সেই সব কাঁটা সমেত আস্ত গোলাপটাই যেন তোমাদের জীবনে ফুটে ওঠে!
মিনারের এমন কথা শুনে আনিকা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই আনিকাকে এভাবে তাকাতে দেখে মিনার মাথা চুলকে, মুখের অবয়বে এক দলা নিষ্পাপ ভাব ফুটিয়ে হেসে বলল, “উপস, আম জোকিং!”
এদিকে মিনারের এই আকস্মিক কাণ্ডে আরমান পুরোপুরি বোকা বনে গেল। কারণ মিনারের সাথে আরমানের সম্পর্কটা কোনোদিনই ভালো ছিল না—বলা চলে সাপে-নেউলে সম্পর্ক।
ওদিকে মিনার যখন আরমানকে জড়িয়ে ধরে অভিনয় করছে, ঠিক তখনই হলরুমের স্পিকারে মেহুলের শান্ত অথচ গমগমে কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল, “আজ আপনারা এখানে উপস্থিত হয়েছিলেন আমার বিয়ে উপলক্ষে। কিন্তু, বিয়েটা শেষ পর্যন্ত আমার হয়নি। কারণ, আমার হবু বর আর আমার পরম প্রিয় মামাতো বোন আনিকা বিগত দুটো বছর ধরে একে অপরকে পছন্দ করে। আসলে পছন্দ বলা ভুল হবে, ওরা গভীর একটা সম্পর্কে আছে। তাই আমি স্বেচ্ছায় ওদের মাঝখান থেকে সরে দাঁড়িয়েছি। কারন কারো ভালোবাসার মাঝে আমি কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাই না। অন্তত আমার বাবা আর মনি আমাকে এই শিক্ষাটা দেয়নি। হয়তো ভাগ্যেও এমনটাই লেখা ছিলো।”
পুরো হলরুমে উপস্থিত আত্মীয়দের মাঝে একটা চাপা গুঞ্জন আর ধাক্কার ঢেউ খেলে গেল। মেহুল বিন্দুমাত্র না দমে মাইকে আবারও বলতে লাগল, “আমি মনে করি, আমি ওদের দুজনের মাঝ থেকে সরে গিয়ে সবচাইতে বড় ঠিক কাজটি করেছি, কারন আমার সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ার পরেও তারা যখন আড়ালে সম্পর্কে জড়াতে পারে, তবে বিয়ের পরে তারা আরও অনেক কিছুই করতে পারত। তার ওপর, আমার জীবনে এখনো অনেক কিছু অর্জন করা বাকি। তাই আমি যেমন উদার মনে ওদের সম্পর্কটা মেনে নিয়েছি, আশা করছি আপনারা সবাই ওদের মেনে নেবেন এবং ওদের নতুন জীবনের জন্য প্রাণভরে দোয়া করবেন।”
কথাটা শেষ করেই মেহুল সামনে উপস্থিত সবার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো , একটু আগে ও যে মানুষগুলো আরমান ও আনিকাকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করছিল। ঠিক তাদের মাঝেই এখন এদের নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল। যেন মুহূর্তের মাঝে গিরগিটির মতো রুপ পাল্টালো সকলে। অতঃপর মেহুর আরমানের দিকে ঘুরে তাকাল।
আরমান ততক্ষণে অপমানে আর রাগে ফুঁসছে। সে কল্পনাতে আনেনি মেহুল সবার সামনে তাকে এভাবে অপদস্ত করবে। আরমান পারছে না ছুটে গিয়ে মেহুলের থেকে মাইকটা কেড়ে নিতে। এদিকে আনিকাও ঘাবড়ে গিয়ে আরমানের হাত চাপ দিয়ে ধরেছর। অতঃপর আরমান আর থাকতে না পেরে মেহুলকে ধমক দিয়ে কিছু একটা বলতে যেই না মুখ খুলল, ঠিক সেই মুহূর্তেই আরমানের বুকের ওপর মিনারের শক্ত হাতের ধাক্কা এসে লাগল। সাথে সাথেই আরমানকে কিছু বুঝে উঠতে না দিয়েই মিনার এক ঝটকায় তার হাতের মোবাইল স্ক্রিনটা আরমান আর আনিকার চোখের সামনে তুলে ধরল।
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে বিগত দুই বছর ধরে আরমান আর আনিকার বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি, রেস্তোরাঁয় বসা এবং একান্ত সময় কাটানোর অজস্র গোপন ছবির একটা নিখুঁত ভিডিও ক্লিপ।
ভিডিওর দিকে তাকিয়ে আরমানের মুখের সমস্ত রক্ত যেন এক লহমায় চুষে নিল কেউ। সে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল।
মিনার আরমানের কানের কাছে মুখ নিয়ে চাপা অথচ বরফ-শীতল গলায় বলে উঠল, ” চালাক হওয়া ভালো কিন্তু অতি চালাক হওয়া একদমই ভালো না। তোর চোখে তো আমি সবসময় একটা বাউন্ডুলে, উচ্ছন্ন যাওয়া ছেলে ছিলাম আরমান! কিন্তু এই বাউন্ডুলে যে তোর অজান্তে কী কী করতে পারে, তা তোর ধারণারও বাইরে। তাই বলছি, আমার বোনের দিকে এক পা-ও আর বাড়াবি না। যতটুকু সম্মান এখনো তোর অবশিষ্ট আছে, ভদ্র ছেলের মতো চুপচাপ বসে থাক। নয়তো এই ভিডিও আমি এখন হলের বড় স্ক্রিনে চালিয়ে দেবো। তখন বাকি জীবনের জন্য সমাজে মুখ দেখানোর দফারফা হয়ে যাবে!”
আকস্মিক এমন পরিস্থিতিতে আরমান যেন পুরোপুরি দমে গেল। পায়ের নখ থেকে মাথা পর্যন্ত অপমানের এক ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল তার। সে কেবল ভেজা বিড়ালের মতো মিনারের দিকে তাকিয়ে রইল, আর কোনো কথা বলার সাহস তার রইল না।
এদিকে মেহুল মাইকটা একপাশে রেখে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল হলের কাজী সাহেবের পাশে থাকা টেবিলটার দিকে, যেখানে তার অর্ধেক খাওয়া মিষ্টির প্লেটটা রাখা ছিল।
মেহুল প্লেটটা হাতে তুলে নিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে এসে দাঁড়াল নতুন কনে আনিকার সামনে। মিষ্টির একটা টুকরো আঙুলে তুলে সে পরম স্নেহের ভান করে আনিকার মুখের সামনে ধরল, যেন সে খুশি মনে নিজ হাতে তার মামাতো বোনকে খাইয়ে দিতে চায়।
এদিকে মেহুলের এই খাওয়া মিষ্টির টুকরোটা দেখে আনিকা কিছুটা কুঁচকে গেল। সে মুখটা সামান্য সরিয়ে নিয়ে আমতা-আমতা করে বলল, “মেহুল… এটা তো তোর খাওয়া এঁটো মিষ্টি! আমি কীভাবে খাব?”
আনিকা যখন মিষ্টিটা খেতে চাইল না, তখন মেহুল বিন্দুমাত্র রাগ করল না। সে শুধু সামান্য ঝুঁকে এলো আনিকার একদম কাছাকাছি। তার ঠোঁটের কোণে তখন লেগে রইল এক টুকরো শীতল হাসি। অতঃপর মেহুল প্লেটটা ধরে রেখেই, পাশে বসা আরমান যেন স্পষ্ট শুনতে পায়—এমন নিচু অথচ ধারালো ফিসফিসানি স্বরে আনিকাকে বলে উঠল:
”আমার পরা জামা, আমার কেনা গহনা গায়ে জড়িয়ে, আমারই হবু বরকে আজ এভাবে বিয়ে করতে পারলি; আর এখন আমার খাওয়া মিষ্টি খেতে তোর ঘেন্না লাগছে, আনিকা?কই আমার ব্যবহার করা মানুষটাকে বিয়ে করার সময় তো মুখে হাসি ফুটছিলো তখন বুঝি ঘেন্না লাগে নি।” বলেই মেহুল আনিকার মুখে মিষ্টিটি ঠেসে দিয়ে তার কাজ সম্পন্ন করে ধীরপায়ে বিয়ের আসর থেকে বেরিয়ে এলো।
আর অপরদিকে তার পেছনে তখন এক শ্মশানের নীরবতা। আরমান আর আনিকা—দুজনে নবদম্পতির সাজে সোফায় বসে থাকলেও তাদের মুখ দুটো অপমানে আর লজ্জার গ্লানিতে কয়লার মতো কালো হয়ে গেছে। পুরো হলরুমের বাতাসও যেন মেহুলের রেখে যাওয়া সেই চাবুকের মতো সত্যের আঘাতে ভারী হয়ে আছে।
মেহুল সোজা নিজের রুমে এসে পৌঁছাল। ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়েই সে সটান খাটের ওপর শুয়ে পড়ল।
চারপাশে তখন এক অদ্ভুত, নিরেট নীরবতা। সেই নিথর স্তব্ধতার মাঝে কয়েকটা মুহূর্ত কেটে গেল। আর তার পরই, ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে মেহুল হঠাৎই খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো হাহাকার ছিল না, ছিল না কোন কান্না; ছিল শুধু এক চরম তৃপ্তি আর বিজয়ের উন্মাদনা। সে পেরেছে! ওই ধূর্ত, লোভী প্রতারকগুলোকে তাদের যোগ্য স্থানটা দেখিয়ে দিতে সে পেরেছে। যে মেহুলকে তারা কাচের মতো ভেঙে চুরমার করতে চেয়েছিল, সেই মেহুল আজ তাদের আস্ত জ্যান্ত লাশ বানিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিয়ে এসেছে।
কিন্তু পরক্ষণেই মেহুলের হাসির শব্দটা মিলিয়ে গেল। সে ঝটকা দিয়ে খাটের ওপর উঠে বসল। তার চোখের মণি দুটো আবার তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। কারণ, আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ যে তার এখনো বাকি আছে!
মেহুল উঠে দাঁড়ালো এগিয়ে গেলো আলমারির দিকটাতে। আলমারি খুলে ভেতর থেকে একটা ভারী লোহার তালা আর চাবি হাতে তুলে নিল। তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে আবার রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
সে ধীর, শব্দহীন পায়ে করিডোর দিয়ে হেঁটে এসে সোজা দাঁড়াল আরমানের ঘরের দরজার সামনে। হ্যাঁ, এটি আরমানেরই রুম। তবে এককালে এই রাজকীয় ঘরটি মেহুলের নিজের ছিল। আরমান এ বাড়িতে থাকতে আসার পর ঘরটি তার বড্ড পছন্দ হয়েছিল, আর একসময় আরমানের সেই চাওয়ার মূল্য দিতে গিয়ে মেহুল এক বাক্যে নিজের সাধের ঘরটি আরমানকে ছেড়ে দিয়েছিল।
আজ এই ঘরটিকেই আরমান আর আনিকার বাসর রাতের জন্য নতুন করে সাজানো হয়েছে। দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে রজনীগন্ধার সুবাস আর লাল গোলাপের পাপড়ির সাজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এই বিছানাতেই আজ অন্য কেউ এসে মেহুলের হকের জায়গায় অধিকার ফলাতে চেয়েছিল।
নাহ! মেহুল আর কাউকে, বিন্দুমাত্র কোনো কিছুতেই নিজের জিনিস নিয়ে অধিকার ফলাতে দেবে না। অনেক হয়েছে ত্যাগ, অনেক হয়েছে সরলতার নামে বোকামি। এবার আর এক ইঞ্চি জমিও সে বেইমানদের ছাড়বে না।
ভবনা মতো মেহুল ঠোঁটের কোণে এক চিলতে নিষ্ঠুর হাসি ফুটিয়ে দরজার দুটো কড়া একসাথে মেলালো। তারপর হাতের সেই ভারী তালাটা কড়ার মাঝে গলিয়ে দিয়ে ‘খটাশ’ করে শব্দ করে লক করে দিল। চাবিটা ঘুরিয়ে নিতে নিতে সে তালাটার ওপর আলতো করে হাত বোলালো।
বাসর ঘরের দরজায় ঝুলল মেহুলের দেওয়া প্রতিশোধের তালা। এবার মেহুল শুধু অপলক দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল, আর মনে মনে অপেক্ষা করতে লাগল সেই গভীর রাতের—যখন নতুন বর-বউ তাদের বাসর ঘরে ঢোকার জন্য এখানে এসে দাঁড়াবে! আর তার তরফ থেকে সেরা উপহারটা পাবে।
রাত তখন বেশ গভীর। বাড়ির অতিথিরা বহু আগেই বিদায় নিয়েছেন। কোলাহলমুখর বাড়িটাতে এখন এক থমথমে নীরবতা। নিচে নবদম্পতির বরণ থেকে শুরু করে সব নিয়মকানুন শেষ করে অবশেষে আরমান ও আনিকাকে বাসর ঘরের সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে।
সেখানে উপস্থিত আছে আরমানের মা সুমনা বেগম, আনিকার খালাতো বোনেরা, আরমানের ছোট বোন কেয়া এবং মুন্নি। আনিকার খালাতো বোনেরা রীতিমতো হাততালি দিয়ে আরমানের কাছে থেকে বাসর ঘরের দরজা খোলার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করবে বলে হাসাহাসি করছে। হাসি-ঠাট্টা আর খুনসুটিতে মেতে সবাই যেই না ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল এবং সামনের পর্দাটা সরাল, অমনি সবার চোখের পলক আটকে গেল।
দরজায় ঝুলছে একটা মস্ত বড় লোহার তালা!
দৃশ্যটা দেখে সবার মুখে এতোক্ষণ থাকা হাসির রেখাটা এক লহমায় যেন উধাও হয়ে গেল। সুমনা বেগম তো রীতিমতো রেগে আগুন হয়ে গেলেন। কোনো কিছু না ভেবেই তিনি চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন, “এই ঘরে তালা মারল কে? কার এত বড় সাহস!”
তাঁর চিৎকারে বাড়ির অন্য সদস্যরা—মিনারা বেগম থেকে শুরু করে গৃহকর্মীরা সহ বাকি সবাই ছুটে এসে সেখানে জড়ো হলো। সবাই অবাক হয়ে বাসর ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। আরমানও তখন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চড়া গলায় জিজ্ঞেস করল, “এই কাজটা কে করেছে? কার এত বড় স্পর্ধা?”
”আমি করেছি!”
সবার পেছন থেকে অত্যন্ত শান্ত আর স্বাভাবিক কণ্ঠে জবাব দিল মেহুল। অতঃপর সে ধীরপায়ে ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল।
মেহুলকে দেখেই সুমনা বেগমের রাগ যেন সপ্তমে চড়ল। তিনি তেড়ে এসে বললেন, “এসব কী ধরনের অসভ্যতামি মেহুল? আমার ছেলের বাসর ঘরে তালা দেওয়ার সাহস কীভাবে হলো তোর?”
আরমানও তার রাগ চেপে রাখতে পারল না। সে মেহুলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কঠোর গলায় বলল, “এসব সস্তা নাটক করে তুই কী প্রমাণ করতে চাইছিস, মেহুল? সকাল থেকে তো অনেক কিছুই করলি, এবার অন্তত থাম! আমি তোকে বিয়ে করিনি দেখে তোর মনে এত হিংসা জমেছে?”
ঠিক তখনই আরমানের পেছন থেকে আনিকা এগিয়ে এলো। সে আরমানের হাতের ভেতর নিজের হাতটা ঢুকিয়ে দিয়ে, অত্যন্ত ন্যাকামি মেশানো আদুরে গলায় মেহুলকে বলল, “মেহুল…, তুই এসব কেন করছি বল তো? তোর যদি আমাদের বিয়েতে এতই আপত্তি থাকত, তবে আগেই বলে দিতে পারতি। আমরা তো আর তোকে না জানিয়ে বা লুকিয়ে কিছু করিনি!”
এদিকে এতক্ষণে মিনারা বেগম তখন মেহুলের পিছনে দাঁড়ানো ছিলো। তাই মেহুলের ওপর সবার এই অন্যায় আক্রমণ দেখে তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি এগিয়ে এসে মেহুলের পাশে দাঁড়ালেন এবং আনিকার দিকে তাকিয়ে চড়া গলায় বলে উঠলেন, “তোর কি বিন্দুমাত্র লজ্জা করছে না, আনিকা? তুই কোন মুখে এই কথাগুলো বলছিস? নিজের আত্মসম্মান, লজ্জা সব তো অনেক আগেই বেঁচে দিয়ে এসেছিস! একন কি চক্ষু লজ্জাটাও খেয়েছিস।”
মিনারা বেগমের কথায় সুমনা বেগম আরও রেগে গেলেন। তিনি মিনারা বেগমের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, “মিনারা! তুমি আমার ছেলের বউয়ের সাথে এভাবে কথা বলছ কেন? ও কী করেছে? যা করার তো এই মেহুল করছে! ওকে জিজ্ঞেস করো, কিসের জন্য ও আমার ছেলের রুমে তালা দিয়েছে? ওকে এখনই তালা খুলতে বলো!”
মিনারাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন তিনিও গলা উঁচিয়ে বলে উঠলেন, “ও আপনার ছেলের বউ হওয়ার আগে আমার ভাইয়ের মেয়ে! আমার ভাইজি, ওযদি অন্যায় করলে আমি অবশ্যই ওকে শাসন করব। আর ওকে শাসন করতে আমার কারো থেকে অনুমতি নিতে হবে না। ”
এদিকে মেহুল এতক্ষণ চুপচাপ মতো দাঁড়িয়ে সবার সব কথা শুনছিল। কিন্তু এবার সে সুমনা বেগমের দিকে চোখ তুলে তাকাল। তার সেই চোখ জোড়ায় ছিল তীব্র অবহেলা আর বরফ-শীতল ঠান্ডা ভাব। সে শান্ত কণ্ঠে বলল, “ফুপি, তোমার কি স্মৃতিশক্তি দিন দিন লোপ পাচ্ছে? আমার তো মনে হয় তা-ই। তা না হলে আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে, আমারই সামনে এভাবে গলা উঁচিয়ে কথা বলার সাহস তুমি অন্তত করতে না।”
মেহুলের এই এক চাবুকের মতো কথায় সুমনা বেগম হঠাৎ করে চুপ হয়ে গেলেন। তাঁর মুখটা অপমানে লাল হয়ে গেল। অন্যদিকে মেহুলের এমন কথাতে আরমান ভ্রু কুঁচকে রেগে বলল, “কী বলতে চাইছিস তুই?”
মেহুল আরমানের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় জবাব দিল, “বলতে চাইছি—এই বাড়িটা আমার, আর এই রুমটাও আমার। ভুলে গেলে নাকি আরমান ভাই? ভিক্ষুকের মতো চেয়ে নিয়েছিলে আমার এই রুমটা। তখন দয়া করে দিয়েছিলাম। আর আজ নিজের জিনিসটা আবারও নিজের অধিকারে নিয়ে নিলাম। কথা এতটুকুই।”
মেহুলের এই অকাট্য যুক্তির সামনে আরমান স্তব্ধ হয়ে গেল। ঠিক তখন আনিকা অসহায় মুখে বলে উঠল, “তাহলে আমরা বাসর কোথায় করব?”
মেহুল তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ধারালো আর মুচকি হাসি ফুটিয়ে বলল, “তোদের বাসর তোরা কোথায় করবি তা তোদের ইচ্ছে! গোয়ালঘরে করবি, ময়লার ভাগাড়ে করবি, নাকি খোলা মাঠে করবি—সেটা তোদের ব্যাপার। আমার রুমে তোদের কোনো জায়গা নেই।”
এরপরেই মেহুল একটু উচ্চস্বরে তাদের বাড়ির পুরাতন গৃহকর্মীকে ডেকে উঠলো, “ফরিদা আন্টি!”
”জি আম্মা!”
”দু দিনের মধ্যে এই রুমের সবকিছু আমার পরিবর্তন চাই। বিছানার কভার থেকে শুরু করে দেয়ালের রং সবটাই। কারন কারো অপবিত্র ছোঁয়া আমি আমার আশেপাশেও আর চাই না।”
মেহুলের এই মোক্ষম জবাব শেষ হতে না হতেই সবার পেছন থেকে মিনার সুর করে শিস বাজাতে শুরু করল, আর সাথে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো, “জিও সিস্টার, জিও! একদম ফাটিয়ে দিয়েছিস!”
এদিকে মিনারা বেগমও মেহুলের এই রূপ দেখে আড়ালে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। মেহুল আর সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। শুধু যাবার সময় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্তম্ভিত, অপমানিত মানুষগুলোর দিকে শেষবারের মতো এক নজর তাকিয়ে, মুখে মুচকি হাসি নিয়ে সে ধীরপায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
রুমে এসেই মেহুল দরজাটা আটকে দিল। আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে সে সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে একটা দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করল। ঝরনার পানির প্রতিটি ফোঁটা যেন তার শরীর থেকে সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি, অপমান আর বিষাক্ত মানুষের দেওয়া বোঝা এক নিমেষে ধুয়ে মুছে দূর করে দিল। গোসল শেষ করে মেহুল একটা হালকা সুতি পোশাক পরে যখন ঘরের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল।
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২
রাতের ফুরফুরে হাওয়া তার ভেজা চুলে এসে দোলা দিয়ে গেল। মেহুল আকাশের দিকে তাকাল। আজ আকাশের চাঁদটা বড্ড উজ্জ্বল, বড্ড মোহনীয়। চাঁদের সেই স্নিগ্ধ আলোয় পুরো ব্যালকনিটা ভেসে যাচ্ছে। মেহুলের মনে হলো, রাতের ওই চাঁদটা যেন আজ মেহুলের দিকে তাকিয়ে পরম মায়ায় মুচকি হাসছে। তার দীর্ঘ বারো বছরের অন্ধ বিশ্বাসের খাঁচাটা ভেঙে আজ সে মুক্ত। বেইমানদের তাদের সঠিক যোগ্যতা বুঝিয়ে দিয়ে মেহুলের মনটা আজ এক গভীর, প্রশান্ত শান্তিতে ভরে উঠেছে। অতঃপর সে বুক ভরে রাতের তাজা বাতাস টেনে নিল—কারণ মেহুল জানে, আজ থেকে আর কোনো পিছুটান নেই; আজ থেকে সে মুক্ত, তার এক নতুন জীবনের শুরু।
