Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২০ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২০ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২০ (২)
‎আফীফা আফনান

‎”পুঁচকুটা কে কোথায় রেখে এসেছিস রে, হুমা?”
‎—তপ্ত দুপুরের রোদ পেরিয়ে রাস্তার পাশ দিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে হুমাকে জিজ্ঞেস করল মেহুল।
‎​হুমা হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দিল, “মিতুর কাছে আছে, বুটিকে।”
‎​মেহুলের মনটা যেন শঙ্কাচ্ছন্ন হয়ে উঠল। সে একটু চিন্তিত গলায় শুধাল, “ঠিকঠাক রাখতে পারবে তো? কোনো অসুবিধা হবে না তো মিতুর?”
‎​”পারবে পারবে! একদম চিন্তা করিস না। দুধের বোতল, ডায়াপার যা যা লাগবে সব গুছিয়ে দিয়ে এসেছি।”—হুমা আশ্বস্ত করল।
‎​মেহুল হালকা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “হুম, ভালো করেছিস।”

‎অতঃপর ​কয়েক পা এগোনোর পর হঠাৎ হুমার গলায় মনখারাপের সুর ফুটে উঠল। সে একটু থেমে মেহুলের দিকে চেয়ে আবেগঘন গলায় বলল—
‎”মেহুল… আগামীকালই তো তুই চট্টগ্রাম ফিরে যাচ্ছিস! আবার কবে আমাদের দেখা হবে, আদৌ হবে কি না আমরা কেউ জানি না। পারলে, কালকে না গিয়ে আর দুটো দিন থেকে যা না আমার কাছে প্লিজ!”
‎​মেহুল ম্লান হেসে বান্ধবীর দিকে তাকাল। তার গলায়ও জমাট বাঁধল বিষাদ—
‎”থাকার প্রবল ইচ্ছে আছে হুমা… কিন্তু জানিসই তো, চাইলেও সব সময় নিজের ইচ্ছেমতো থাকা সম্ভব হয় না। আপন নিঁড়ে তো ফিরতেই হবে, আর ফিরেই হাসপাতালের ডিউটিতেও জয়েন করতে হবে। তার ওপর সবচাইতে বড় কথা আমি বাবাকে খুব মিস করছি, প্রায় অনেকগুলো বছর পর আমি এতদিন বাবাকে ছেড়ে বাহিরে।”
‎​হুমা একটা থমথমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হুম বুঝিরে সব, আমার তো মনে হয় তোর চাইতেও আঙ্কেল তোকে বেশি মিস করে। যে হারে উনি তোকে ফোন করে প্রতি মিনিটে মিনিটে। আঙ্কেলকে তোর জন্য এত চিন্তা করতে দেখে মাঝে মাঝে আমারও বাবার কথা মনে পড়ে যায়।

‎মেহুল হালকা হাসলো, “এ পৃথিবীতে একমাত্র বাবা মারাই তো ছেলে মেয়েদেরকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসে, যাদের ভালোবাসার কোন স্বার্থ থাকে না। না থাকে কোন বিনিময়ে কিছু পাওয়ার লোভ। তারপর আমার তো আবার বাবা ছাড়া আপন বলতে আর কেউ নেই। তাই বাবার মাঝেই আমার সকল সুখ। ”
‎হুমা তাকালো মেহুলের দিকে অতঃপর নিজের মনের অনুভূতি জানিয়ে বলে উঠলো, ” তুই এই কদিন আমার কাছে ছিলি, বিশ্বাস কর আমার এত ভালো লেগেছে! নইলে ওই ফাঁকা একলা ঘরটাতে মাঝে মাঝে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। তুই থাকাতে তাও এই কয়েকদিন বাড়িটা পুূর্ণ পুন্য লেগেছিল কিন্তু কাল থেকে আবারও আমার সেই পুরোনো একলা জীবন শুরু…”
‎​হুমায়রার বিষাদমাখা চেহারা দেখে মেহুল ঠোঁটের কোণে হালকা দুষ্টুমি মেশানো হাসি ফুটিয়ে বলল, “তার মানে তুই আমাকে ভীষণ মিস করবি, তাই তো হুমা?”
‎​হুমায়রার চেহারায় অনুভূতির ঘন মেঘ নেমে এলো। সে মেহুলের চোখের দিকে চেয়ে বিষণ্ণ গলায় বলল—
‎”সত্যি বলতে, হ্যাঁ আমি তোকে খুব মিস করব রে মেহু। কাল তুই চলে যাবি, তার ওপর এই ফুটফুটে বাচ্চাটাও একটা নতুন পরিবারে চলে যাবে… ঘরটা আমার আবার আগের মতোই খালি হয়ে যাবে। ইশ! যদি কোন মিরাক্কেল ঘটত, না তুই আর না পুঁচকু, দুজনের কেউ যদি আমার থেকে দূরে না যেত। কিন্তু তা তো সম্ভব না।”

‎​বান্ধবীকে এমন গোমরা মুখে বিষাদগ্রস্ত হতে দেখে মেহুল পরম মমতায় হুমায়রার কাঁধে হাত রাখল। সান্ত্বনা দিয়ে নরম গলায় বলল—
‎”আরে, এত মন খারাপ করছিস কেন বল তো? যেহেতু এতদিন পর আমাদের আবার নতুন করে যোগাযোগটা হয়েছে, এবার আর হুট করে হারিয়ে যাবো না! এখন তো সব সময় আমাদের মধ্যে কথা হবে। প্রযুক্তি কেন আছে বল? যখনই খুব মিস করবি, সঙ্গে সঙ্গে একটা ভিডিও কল দিবি, আর পুঁচকু তো তোর শহরেই থাকবে, যখনই মন চাইবে গিয়ে দেখে আসবি আর আমার সাথে কথা বলিয়ে দিবি। ব্যাস!”

‎​মেহুলের এই ভরসা জাগানো কথায় হুমার মনটা যেন একটু হালকা হলো। সে মেহুলের দিকে চেয়ে হাসিমুখে বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে উদ্দীপ্ত গলায় বলে উঠল, ” ডান!”
‎​অতঃপর দুজনে আবার হাঁটা শুরু করল। কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ কৌতূহলী হয়ে মেহুল জিজ্ঞেস করল—
‎”আচ্ছা হুমা, বাচ্চাটাকে দত্তক নেওয়ার ব্যাপারে তোর ওই শাহানা আপুর সাথে কি আর কোনো কথা হয়েছে? উনি আর কিছু জানিয়েছেন?”
‎​হুমা চট করে কপালে হাত দিয়ে বলল, “আরে তোকে তো বলতেই ভুলে গেছিলাম! গতরাতে টেক্সটে কথা হয়েছিল আপুর সাথে। উনি বললেন, ওনার ভাই আর ভাবি নাকি এই পুঁচকুর ব্যাপারে সরাসরি আমাদের সাথে দেখা করতে চেয়েছেন।”

‎​মেহুল আগ্রহ নিয়ে শুধাল, “কখন দেখা করতে চেয়েছেন?”
‎​হুমা জবাব দিল, “আপু বলেছেন, আমাদের যখন সুবিধা হয় তখনই নাকি দেখা করা যাবে।”
‎​কথাটা শুনে মেহুল আর বিন্দুমাত্র দেরি করতে চাইল না। সে চটপট ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল—
‎”তাহলে তো আর দেরি করার কোনো মানেই হয় না! এখনি আসতে বল না ওনাদের? আমরা তো আপাতত একদম ফ্রিতেই আছি। আশেপাশে ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে বসেই সামনাসামনি কথা বলে সব ফাইনাল করে ফেলি!”
‎​হুমা সায় দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, দাঁড়া আমি এখনই শাহানা আপুকে ফোন দিয়ে ভালো একটা রেস্টুরেন্টের লোকেশন জানিয়ে আসতে বলছি।”
‎এদিকে ​কিছুদূর এগোনোর পরই তাদের চোখে পড়ল শহরের বেশ খোলামেলা ও দৃষ্টিনন্দন একটা অভিজাত রেস্টুরেন্ট।
‎​হুমা মেহুলের হাত ধরে বেশ উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠল, “চল মেহু, ওই সুন্দর রেস্টুরেন্টটাতেই গিয়ে বসি। দেখে মনে হচ্ছে ভেতরের পরিবেশ নিশ্চয়ই বেশ ঠান্ডা হবে!”

‎​দুজনে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করলো, এরপরে একদম কর্নারের শান্ত একটা চার সিটের টেবিলে গিয়ে বসল। টেবিলের সামনে গিয়েই মেহুল ব্যাগটা চেয়ারে রেখে বলল, “হুমা, ব্যাগটা একটু দেখিস, আমি একটু ওয়াশরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
‎বলেই ​মেহুল ওয়াশরুমের দিকে যেতেই হুমা আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তার ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল। শাহানা আফরোজকে ফোন দিয়ে দ্রুত রেস্টুরেন্টের সঠিক নাম আর লোকেশন জানিয়ে দিল এবং বলল—যেন সেই দম্পতিকে অতি শীঘ্রই এখানে আসতে বলা হয়।
‎​একটু পরেই মেহুল ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে টেবিলে পৌঁছাল। মেহুল আসতেই হুমা তাকে মুচকি হেসে জানাল যে সেই দম্পতিকে আসার জন্য খবর দেওয়া হয়ে গেছে, ওনারা পথেই আছেন।

‎এরপরেই এবার হুমায়রাও উঠে গিয়ে ওয়াশরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এলো। ততক্ষণে দুজনের জন্য হালকা কিছু নাশতা ও ড্রিংকসের অর্ডার দিয়ে দিয়েছিলো মেহুল। খাবারগুলো টেবিলে পৌঁছাতেই দুজনে খাওয়া শুরু করল এবং টুকটাক কথাবার্তায় মেতে উঠল।
‎​কথার মাঝে এই তীব্র দাবদাহ আর আবহাওয়া নিয়ে আফসোস প্রকাশ করল হুমা—
‎”উফ মেহু, এই রাজশাহীর গরম যা না তা-ই! যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। বৃষ্টি হওয়ার কোনো লক্ষণই তো দেখা যাচ্ছে না। তার ওপর আবার ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা!”

‎​মেহুল জুসে চুমুক দিয়ে সায় দিল, “হুম, রোদের যা প্রখরতা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা দায়।”
‎​কথা বলতে বলতে খেতে খেতেই হঠাৎ হুমার চোখ গেল রেস্টুরেন্টের কাঁচের দেয়াল ঘেঁষে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবকের দিকে! লোকটা যেন গভীর নজরে ভেতরটা দেখছিল এবং তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল!
‎এদিকে তখন ​বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটি আর কেউ নয়—কবির! সে মেহুল আর হুমার ওপর কড়া নজর রাখছিল। কিন্তু হুমা চট করে তার দিকে তাকানোতেই কবিরের সাথে সোজা নজর মেলামেলি হয়ে গেল! যার কারনর কবির ভ্যাবা চ্যাকা খেয়ে উঠলো, অতঃপর মুহূর্তেই তড়ঘড়ি করে মুখ ফিরিয়ে সেখান থেকে সরে গেল। তবে সে বেশি দূরে গেল না, রেস্টুরেন্টের একটু আড়ালে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল—তারা কখন বের হয় তা দেখার জন্য।

‎এদিকে হুমাকে না খেয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেহুল একবার সেদিকে তাকিয়ে হুমাকে জিজ্ঞেস করে উঠলো, “কিরে ওদিকে তাকিয়ে আছিস যে। কি দেখছিস এভাবে?”
‎”আমার মনে হল বাইরে থেকে কে জানি আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে!”
‎তোমার কথাতে মেহুল আরো একবার বাইরের দিকে তাকানো কিন্তু কয়েকজন পথচারীর যাওয়া আসা ছাড়া সে তেমন কিছু লক্ষ্য করুন না অতঃপর তোমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, “হয়তো কেউ রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছিল অনেকে থাকে না বাইরে দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় মানুষের ঘরের ভেতরে কি হচ্ছে দেখতে উঁকি ঝুঁকি করে ওরকম কেউ হবে মনে হয়। কাচের দেওয়াল বাইরে থেকে সবটাই তো স্পষ্ট দেখা যায়।”

‎মেহুলের কথা শুনেই হুমাও তেমনি মনে করে আবারও খাওয়াই মনোযোগ দিলো, অন্যদিকে
‎​কবির সরে যাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় রেস্টুরেন্টের সামনে একটি চকচকে প্রাইভেট কার এসে থামল। দরজা খুলে সেখান থেকে এক সুবেশধারী পুরুষ ও এক আভিজাত্যপূর্ণ মহিলা নেমে প্রবেশ করলেন রেস্টুরেন্টের ভেতরে।
‎​ভেতরে ঢুকে মহিলাটি ব্যাগ থেকে ফোন বের করে একটি নম্বরে ডায়াল করতেই হুমার ব্যাগের ভেতর ফোনটি রিং হয়ে উঠল! শাহানা আফরোজ যে এদেরকেই হুমার নম্বর দিয়েছিলেন, তা আর বুঝতে বাকি রইল না। রিংটোনের শব্দ অনুসরণ করে দম্পতিটি বুঝতে পারলেন—সামনে বসে থাকা মেয়ে দুটোই তাদের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ!

‎পরক্ষণেই শব্দ অনুসরণ করে দম্পতিটি যখন কর্নারের টেবিলটার দিকে এগিয়ে এলেন, তখন তাদের চোখেমুখে সৌজন্যময় এক সুন্দর মৃদু হাসি।
‎​ওনারা ধীরপায়ে কাছে এসে হুমার সামনে দাঁড়াতেই পুরুষটি হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে শুরু করলেন—
‎”আসসালামু আলাইকুম। আপনিই কি মিস হুমা? আমি রবিন, আর উনি আমার স্ত্রী সিতারা। শাহানা আপু আমাদের আপনার নম্বরটা দিয়েছিলেন।”

‎​মেহুল ও হুমার ততক্ষণে খাওয়া প্রায় শেষ। হুমা তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল—
‎”ওয়ালাইকুম আসসালাম। জি,আমি হুমা আর ও আমার বান্ধবী মেহুল। আসুন, প্লিজ বসুন!”
‎​ওনারা কুশল বিনিময় করে মেহুলের টেনে দেওয়া চেয়ারে মুখোমুখি বসলেন। হুমা বেশ আদবের সাথে ওনাদের দুপুরের খাবারের অফার করলে রবিন সাহেব বিনীতভাবে হেসে হাত নেড়ে বললেন—
‎”আরে না না, ধন্যবাদ! আপনারা ব্যস্ত হবেন না। আমরা বাসা থেকে মাত্রই লাঞ্চ শেষ করে বের হয়েছি।”

‎​তবে মেহুল আন্তরিকতার ঘাটতি রাখল না। মিষ্টি হেসে বলল—
‎”তাতে কী হয়েছে! বাইরে যা কড়া রোদ আর গুমোট গরম, অন্তত ঠান্ডা কিছু কোল্ডড্রিংকস বা জুস তো নেওয়া যায়, তাই না?”
‎​মেহুলের এই উষ্ণ সৌজন্যতায় সিতারা নামক মহিলা বেশ মুগ্ধ হলেন। তিনি ভালোবেসে সায় দিয়ে বললেন—
‎”ঠিক আছে , আপনার মিষ্টি অনুরোধ ফেলা যাচ্ছে না। তাহলে হালকা কোল্ডড্রিংকসই চলুক।”
‎​ওয়েটার এসে ড্রিংকস দিয়ে যাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকতার বরফ গলল। টেবিলে এবার শুরু হলো পুঁচকুর দত্তক নেওয়ার আসল মূল আলোচনা। ​

‎”মিস শাহানার কাছে শুনলাম আপনারা বাচ্চা দত্তক নিতে চাইছেন! উনার কাছে শুনলেও আমরা আপনার থেকে শুনতে চাই, জানতে পারি কি? কি কারনে বাচ্চা দত্তক নিতে চাইলেন?”
‎মেহুলের কথাতে সিতারা গ্লাসে এক চুমুক দিয়ে খুব কোমল ও দরদী গলায় নিজেকে এক ব্যাকুল মা হিসেবে উপস্থাপন করলেন। চোখে বিষাদময় আকুলতা ফুটিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে বললেন—
‎”আসলে আমি কখনো মা হতে পারবো না। বিয়ের এতগুলো বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু আমাদের ঘর আলো করে কোনো সন্তান এলো না! একসময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানতে পারলাম আমার মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো….. তিনি একটি গভীর নিশ্বাস নিলেন, অতঃপর আবার বললেন, “ঘরটা কেমন খাঁ খাঁ করে প্রতিদিন। রবিন কখনো আমার অবহেলা করেনি, কিন্তু দিনশেষে আমি ওর কষ্টটা বুঝি। তাই দুজনের এই ছোট পরিবারে একটা বাচ্চা দত্তক নিতে চাইছিলাম কিন্তু মনের মত হচ্ছিল না। অবশেষে ওইদিন শাহানা আপুর মুখে আপনাদের বাচ্চাটার কথা শোনার পর ও তার ছবি দেখার পর থেকে আমার বুকটা যেন এক অজানা মাতৃত্বে কেঁপে উঠেছে। বিশ্বাস করুন, ও যদি আমার ঘরে আসে, তবে ওকে কোনো অভাব আমি ছুঁতেও দেব না। পরম স্নেহে, একদম নিজেদের রাজকন্যার মতো ওকে বড় করব!”

‎​মহিলাটির চোখের ব্যাকুলতা আর কথা বলার প্রণেয় ভঙ্গি দেখে মেহুল ও হুমার মনে হলো—সত্যিই, এই কোল খালি থাকা দম্পতির কাছে পুঁচকু হয়তো জীবনের সবটুকু ভালোবাসা, পরিচয় আর সুখ পাবে। সবচাইতে বেশি প্রভাবিত হলো মেহুল, ওই যে মহিলার মুখের একটি বাক্য যে সে কখনো মা হতে পারবেনা। তার জীবনের সবচাইতে বড় দুর্বলতা তো এই একটি বাক্যে। একটি বাক্য এতোটা শক্তিশালী যে মেহুলের সকল বুদ্ধি, জ্ঞান যেন লোপ পাইয়ে দেয়।
‎অতঃপর আরো কিছু কথা বলে, আ​র সব শুনে মেহুল অত্যন্ত গম্ভীর, দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতো চটপটে কণ্ঠে বলল—
‎”আপনাদের সদিচ্ছা আর আকুলতা দেখে আমাদের সত্যি ভীষণ ভালো লাগছে। তবে বাচ্চার অধিকার আর নিরাপত্তার খাতিরে আমরা চাই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই যেন পুঁচকুকে আপনার হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয়। এতে বাচ্চার ভবিষ্যৎ আর সুরক্ষা শতভাগ নিশ্চিত থাকবে। টেনশন করবেন না এই প্রসেসিং এর সবটুকু খরচ আমি বহন করব ”

‎​মেহুলের মুখে ‘আইনি প্রক্রিয়া’র কথাটা শুনতেই রবিন আর সিতারা প্রথমে একমুহূর্তের জন্য পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেলেন! ওনাদের চোখের তারায় যেন সাময়িক এক অচেনা অস্বস্তি আর ইতস্তত ভাব ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। তবে পরক্ষণেই নিজেদের সামলে নিয়ে রবিন সাহেব মুচকি হেসে রাজি হয়ে বললেন—
‎”হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই! আইনি কাগজপত্রের মাধ্যমে হওয়াই তো সবচেয়ে ভালো। আমরাও তো আইনিভাবেই সব সম্পন্ন করতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে কোনো জটিলতা না থাকে।”

‎​এদিকে মেহুল আর হুমার রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেরি দেখে কবির আবারও কৌতূহল সামলাতে না পেরে কাঁচের দরজার বাইরে উঁকি মারল। তখনই সে দেখল—ভেতরে বসে মেহুল ও হুমা সেই অচেনা আভিজাত্যপূর্ণ দম্পতি যারা একটু আগেই তার সামনে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করল তাদের সাথে অত্যন্ত গম্ভীর ও গোপন আলোচনায় মগ্ন।
‎​কবির আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। দ্রুত পকেট থেকে ফোনটা বের করে রবিন ও সিতারার সাথে মেহুলের কথা বলার কয়েকটি স্পষ্ট ছবি দূর থেকেই ফোকাস করে ক্লিক করে নিল! আর সাথে সাথেই পাঠিয়ে দিল, তা নির্দিষ্ট নাম্বার টিতে।

‎রাতের নিস্তব্ধতা ধীরপায়ে চারপাশটা আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আর এই সময়েই ​মেহুল তার ব্যাগ-পত্র, জামাকাপড় আর প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে ট্রলি ব্যাগে তুলে জিপারটা মাএ বন্ধ করল। আগামীকাল দুপুরের মাঝেই তাকে রাজশাহী ছাড়তে হবে। অতঃপর সব গোছগাছ শেষ করে সে খাটের একপাশে এসে বসল।
‎​তার ঠিক সামনে সোফার নরম তোশকে শুয়ে আছে একরত্তি মিষ্টি ছানা পুঁচকু। মেহুল আলতো হাতে বাচ্চাটির তুলতুলে গালে আর ছোট্ট কপালে হাত বুলাল। চোখ দুটো হঠাৎই ঝাপসা হয়ে এলো তার। অতঃপর মেহুল নিচু হয়ে ছানাটির একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে প্রণেয় ভরা ধীরকণ্ঠে বলতে লাগল—
‎​”তুমি কি জানো পুঁচকু, কাল সকালেই আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাব। হয়তো জীবনে তোমার সাথে আমার আর কোনোদিন দেখা হবে না… কিন্তু বিশ্বাস কর, তোমাকে আমি সারা জীবন মনের গহীনে আগলে রাখব। খুব মিস করব তোমাকে!”

‎মেহুল যখন কথা বলছে ​বাচ্চাটি যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ডাগর চোখে মেহুলের দিকে চেয়ে রইল। যেন তার সব কথা সে বুঝতে শুরু করেছে, যা দেখে মেহুল ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুটিয়ে আবার বলল—
‎​”তবে আমি তোমার জন্য ভীষণ খুশি সোনা! তুমি খুব সুন্দর আর চমৎকার একটা পরিবার পেতে যাচ্ছ। ওনারা তোমাকে অনেক ভালোবাসবেন, পরম আদরে আগলে রাখবেন। আজ ওনাদের সাথে কথা বলে আমার খুব ভালো লেগেছে… আমি বিশ্বাস করি তুমব অনেক সুখে থাকবে, বুঝলে?”
‎​কথাগুলো শেষ হতে না হতেই, অদ্ভুত এক অলৌকিকতায় বাচ্চাটি যেন মেহুলের বিদায়ের আকুলতা বুঝতে পারল! ছোট্ট দুটি হাত-পা শূন্যে ছুড়ে সে হুট করে ফুঁপিয়ে ওঠে সশব্দে কেঁদে উঠল!
‎এদিকে ​বাচ্চাটির কান্না থামানোর জন্য মেহুল যখন ব্যস্ত হয়ে তাকে বুকে তুলে নিচ্ছিল, ঠিক তখনই তার ফোনের স্ক্রিনটা ভেসে উঠল—বাবা ‘ইকবাল সাহেব কল করছেন।’

‎অতঃপর ​মেহুল একহাতে কান্নায় অস্থির ছানাটিকে সামলাতে সামলাতে দরজার দিকে চেয়ে জোরে ডেকে উঠল—
‎”হুমা! এই হুমা… রান্নাঘর থেকে একটু জলদি আয় তো! পুঁচকুটা ভীষণ কাঁদছে! তার ওপড় বাবা কল করেছে।”
‎মেহুলের ​ডাকেই হুমা হন্তদন্ত হয়ে ঘরে এসে মেহুলের হাত থেকে কান্নারত পুঁচকুকে কোলে নিয়ে বলল, “আহা রে! দে দে, আমার কাছে দে… তুই আঙ্কেলের সাথে কথা বল, আমি ওকে শান্ত করছি।”
‎​মেহুল পুঁচকুকে হুমার কাছে দিয়েই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা কানে চেপে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে দাঁড়াতেই রাতের শীতল হাওয়া তার গালে এসে স্পর্শ করছে। অতঃপর মেহু বলে উঠলো,
‎​”হ্যাঁ বাবা…”

‎​ওপাশ থেকে ইকবাল সাহেবের চিন্তিত ও দরদী স্বর ভেসে এলো—
‎”মা, সব গোছগাছ হয়েছে? আগামীকাল দুপুরে ট্রেনের টিকিট, তাই না? একদম তাড়াহুড়ো করবি না কিন্তু। সব সাবধানে গুছিয়ে নিবি।”
‎​মেহুল বাবার অনুরাগে ভরা কথা শুনে মুচকি হেসে বলল, “সব গুছিয়ে ফেলেছি বাবা, কোনো চিন্তা কোরো না।”
‎​ইকবাল সাহেব তাগিদ দিয়ে বললেন, “ঠিক আছে মা। কাল তুই স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই আমাকে জানাবি। আমি আর মিনার তোকে রিসিভ করার জন্য স্টেশনে আগেভাগেই গিয়ে অপেক্ষা করব। আর শোন, রাস্তায় কিন্তু নিজের খেয়াল রাখবি, একদম সাবধানে আসবি।”
‎​”ঠিক আছে বাবা, তোমরাও খেয়াল রেখো।”—বাবার সাথে কুশল বিনিময় শেষ করে মেহুল ফোনটা কাটল।
‎​বাবা-মেয়ের কথা শেষ হতেই মেহুল ফোনটা রেখে বারান্দা থেকে ভেতরের ঘরে প্রবেশ করতে যাবে, ঠিক তখনই অলক্ষে তার নজর গিয়ে পড়ল রাস্তার ওপাশের অন্ধকার দিকটায়! ​মেহুলের বুকটা এক নিমেষে ধক করে উঠল!
‎​সেই কালো রঙের রহস্যময় গাড়িটি! এই কয়েকদিন ধরে যে গাড়িটা সে মাঝে মাঝেই নিজের আশেপাশে সন্দেহজনকভাবে চক্কর কাটতে দেখেছিল! আজ রাত খুব বেশি গভীর না হওয়াতে আর রাস্তার স্ট্রিটলাইটের তীব্র আলোয় গাড়িটি মেহুলের চোখে একদম স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল।

‎​কিন্তু মেহুলকে তার চাইতেও কোটি গুণ বেশি তাজ্জব ও স্তব্ধ করে দিয়ে ঠিক তখনই গাড়ির ড্রাইভ সাইডের দরজা খুলে গেল!
‎​গাড়ি থেকে ধীর, দাপুটে ও অবিচল পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলো এক সুপুরুষ অবয়ব—সালমান শাহ নেওয়াজ!

‎​গাড়ির ছাদে কনুই ভর দিয়ে দাঁড়াল সালমান। তারপর সোজা মাথা তুলে উপরের দিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেহুলের দিকে স্থির, তীক্ষ্ম ও প্রখর নজরে তাকালো! যা দেখে তৎক্ষনাৎ ​মেহুলের চোখের তারায় নিমেষে ঘোর নেমে এলো! চোখ দুটো বিস্ময়ে আর আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল তার!
‎​বিগত বেশ কিছুদিন ধরে তার মনের ভেতরে যে ভয়টা তিল তিল করে জমছিল—যে কেউ একজন সবসময় তাকে ছায়ার মতো ফলো করছে—তবে কি সেই অনুমানই একদম সত্যি ছিল?

‎​মেহুল যখন হাজারো চিন্তার জালে জড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তখনই তার সব জল্পনা-কল্পনা আর শঙ্কাকে নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিল সালমান!
‎​বারান্দার আলো-আঁধারিতে মেহুলকে থমকে থাকতে দেখে সালমানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক প্রচ্ছন্ন, অধরা হাসি। অতঃপর সে আর এক মুহূর্তও গাড়ির পাশে দাঁড়াল না। ধীর, দাপুটে ও অবিচল পায়ে হেঁটে সোজা ঢুকে পড়ল মেহুলদের ঠিক সামনের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংটির ভেতরে!

‎​ঠিক তখনই সেই বিল্ডিংয়ের মেইন গেট দিয়ে কয়েকজন সুবেশধারী লোক দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলো সালমানকে অভ্যর্থনা জানাতে। তাদের অবয়বে সালমানের প্রতি সম্মান আর সমভ্রম একদম স্পষ্ট!
‎​দৃশ্যটি দেখে এতক্ষণ বুকের ভেতর চেপে থাকা মেহুলের ভয়ের পাহাড়টা নিমেষেই গলে পানি হয়ে গেল। স্তব্ধতা কাটিয়ে এক মূহূর্তের মধ্যে নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে নিল সে। তবে চোখের কোণে বিস্ময়ের ঘোর তখনও বাকি! ​মেহুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দার গ্রিল শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তারপর মনে মনেই বিস্ময় মেশানো কণ্ঠে বলে উঠল—
‎”বাহ্! একজন এমপির লোকের এত দাপট! এত খাতির-যত্ন দেখে মনে হচ্ছে সেই যেন এমপি… ভালো, বেশ ভালো! ”

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২০

‎অতঃপর ​ভয়ের কালো মেঘ কেটে গেলেও সালমানের সেই প্রখর চাহনির মাদকতা তখনও মেহুলের রক্তকণিকায় যেন মৃদু শিহরণ জাগিয়ে রেখে গেল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে এক নজর সামনের আলো ঝলমলে বিল্ডিংটার দিকে তাকিয়ে ধীরপায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। আর ঠিক তখনই, ওপাশের চারতলার অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করে একটি সুবিশাল কাঁচের জানালা ঘেষে এসে দাঁড়াল সালমান! তার হাতের স্পেশাল বাইনোকুলার আর ক্ষুরধার তীক্ষ্ম নজর মুহূর্তেই আছড়ে গিয়ে পড়ল মেহুলদের বিল্ডিং আর ঘরের হালকা পর্দা দুলতে থাকা ব্যালকনিটার ওপর!
‎​ঘরের হালকা আলোতে মেহুলের ঘরের ভেতর চলে যাওয়ার ছায়ামূর্তিটা স্পষ্ট ফুটে উঠতেই সালমানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক প্রগাঢ়, বিপজ্জনক আর গভীর ভালোবাসার প্রচ্ছন্ন মুচকি হাসি।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২১