শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২২ (২)
আফীফা আফনান
হাসপাতালের কেবিনের স্নিগ্ধ ও থমথমে চারদেয়াল। জানালায় ঝুলে থাকা হালকা পর্দার ফাঁক গলে সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে ধবধবে সাদা বিছানাটার ওপর। এরি মাঝে
পিটপিট করে মাত্র চোখ খুলে তাকাল মেহুল।
সে কোথায় আছে তা চিনতে বেগ পেতে হলো না কারন তার নাকে এসে বারবার বাড়ি খাচ্ছে হাসপাতালের সেই চিরচেনা অ্যান্টিসেপ্টিক আর ওষুধের ঝাঁঝালো গন্ধ। অতঃপর মাথার ওপর ধীরগতিতে ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানটার দিকে কিছুক্ষণ ঘোর লাগা চোখে চেয়ে রইল সে।
শরীরের রগে রগে বিষাক্ত ক্লান্তি আর তীব্র অবশ ভাব। মেহুল বাঁ হাতটা একটু নাড়ানোর চেষ্টা করতেই তীব্র যন্ত্রণায় রেখা ফুটে উঠল তার কপালে। ক্যানোলা পরানো হাতের ওপর ব্যান্ডেজ করা; একটু টান লাগতেই সে যন্ত্রণায় চোখ-মুখ কুঁচকে বন্ধ করে নিল। কিন্তু চোখ দুটো বন্ধ হতেই মাথার ভেতর প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ল গত রাতের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি!
ঝুম বৃষ্টি, অন্ধকারের জঙ্গল, পাচারকারী রবিনের পৈশাচিক হাত থেকে বাচ্চাটার পানিতে তলিয়ে যাওয়া, আর সেই গভীর পুকুরে নিজের জীবন বাজি রেখে ঝাঁপ দেওয়া—সবটা যেন এক লহমায় প্রকাণ্ড ধাক্কা দিল তার মস্তিষ্কে!
স্মৃতিতে সেই বিভৎস ঘটনা ফুটে উঠতেই মেহুল তড়াক করে চোখ খুলল! বিছানায় একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল সে। কিন্তু উঠে দাঁড়ানো তো দূর, সামনের দিকে নজর পড়তেই তার গলার সমস্ত স্বর যেন এক নিমেষে উবে গেল! সে যেন তার সমস্ত চেতনাই হারিয়ে ফেলল!
বিছানার ঠিক সামনের সিঙ্গেল সোফাটিতে হেলান দিয়ে অত্যন্ত শান্তভঙ্গিতে বসে আছে এক মানুষ। চোখে স্নেহের গভীর এক চাহনি। তার দৃষ্টি সোজা গিয়ে বিঁধেছে মেহুলের ওপর।
মেহুল পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল, নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলো—এ কি তার কোনো হ্যালুসিনেশন, নাকি কোনো অলৌকিক স্বপ্ন?
মেহুলের এই থমকে যাওয়া, স্তব্ধ ও পলকহীন চাহনি দেখে মানুষটির ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, প্রচ্ছন্ন আর প্রচণ্ড অধিকারমূলক প্রাগৈতিহাসিক হাসি। তিনি নিচু ও গভীস্বরে বলে উঠলেন—
“এভাবে কী দেখছিস, মেহু?”
মানুষটির মুখের সেই বুনো শব্দ আর স্নেহের কণ্ঠস্বরটা কেবিনের নীরবতা চিরে মেহুলের কানে বাজতেই তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল! সে যেন স্পষ্ট বুঝতে পারছে—এটা কোনো স্বপ্ন নয়, ঘোর বাস্তব! অতঃপর মেহুলের কম্পিত অধরযুগল সামান্য নড়ে উঠল। চরম আতঙ্ক, অবর্ণনীয় বিস্ময় আর ভীতিতে থরথর করে কাঁপতে থাকা গলায় সে কোনোমতে অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করে বলে উঠল— “আম্মু!”
মেহুল চোখ জোড়া ফের বন্ধ করল, আবার পিটপিট করে খুলল। না, সামনের মানুষটার মধ্যে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন নেই! সে আগের মতোই ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক মায়াবী ও চিরচেনা প্রশান্তির হাসি বজায় রেখে মেহুলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। মেহুলের মন আর মস্তিষ্ক মুহূর্তেই চরম দ্বন্দ্বে মেতে উঠল। তড়িৎ গতিতে আসা চিন্তার মিছিলে মেহুল নিজেকেই প্রশ্ন করে বসল—”মৃত মানুষ কি কখনো জীবন্ত হয়ে ফিরে আসতে পারে? বিজ্ঞান তো তা বলে না! তবে কি এটা কোনো অলৌকিক মায়া, নাকি আমার মনস্তাত্ত্বিক ভুল?”
ঠিক তখনই সামনে বসে থাকা মানুষটি মৃদু ও মিষ্টি সুরে হেসে উঠল। মেহুলের মনের সেই গুমোট ঝড় যেন সে পড়তে পেরেছে! হাসতে হাসতেই নরম গলায় বলল—
“আমাকে সামনে দেখে খুব অবাক হচ্ছিস মেহু? ভাবছিস মরা মানুষ তোর সামনে কীভাবে জ্যান্ত হয়ে বসে আছে, তাই তো?”
মানুষটির কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই মেহুলের চোখের কোণ বেয়ে অবাধ্য দুটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল। সে বিছানায় একটু ঘেঁষে বসে কাঁপানো গলায় আকুল হয়ে বলল—
“তু-তুমি সত্যি এসেছ আম্মু…?”
মোহনা শিকদারের মায়াবী চোখ দুটি ছলছল করে উঠল। হালকা মাথা নেড়ে বললেন—
“আমাকে যে আসতেই হতো, আমার মেয়েকে আমি না সামলালে কে সামলাবে বলো?”
মেহুলের যেন চোখের পলক পড়ছে না! বহু দিন… না, বহু দিন নয়, বহু যুগ পরে সে দেখছে সেই পরম মমতা ভরা চেহারা, সেই স্নিগ্ধ হাসি আর গাঢ় স্নেহে ভরা চোখের চাহনি! মোহনা শিকদার! হ্যাঁ, তার মা… মেহুলের জীবনের অস্তিত্বের মূল উৎস আজ রক্ত-মাংসের রূপ নিয়ে তার সামনে বসে!
মেহুল অপলক চেয়ে রইল। পরক্ষণেই সে দেখল, মোহনা শিকদার সোফা থেকে উঠে আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে আসছেন। শুধু এগিয়ে আসাই নয়, এসে মেহুলের একদম মুখোমুখি বিছানার এক কোণে বসলেন। পরম মায়ায় মেহুলের ওপর নিজের দৃষ্টি রাখলেন।
অতঃপর মোহনা শিকদার একটু অভিমানী ও চিন্তিত কণ্ঠে বললেন—
“একটি সম্পূর্ণ অপরিচিত বাচ্চার জন্য তুমি এভাবে নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে পানিতে ঝাঁপ দিলে মেহু? তুমি তো সাঁতার কাটতে পারো না, তা জেনেও ওই গভীর পুকুরে নামলে! যদি তোমার কিছু হয়ে যেত? বুকটা কি একবারও ভয়ে কাঁপেনি তোমার?”
মায়ের কথাতে মেহুল চোখের পানি মুছতে মুছতে মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলে উঠলো—
“ভয় তো করেছিল আম্মু… খুব ভয় করছিল। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছিল, ওই বাচ্চাটাকে আমার বাঁচাতেই হবে! কোনো অবস্থাতেই ওকে আমি মরতে দিতে পারতাম না। এমন মনে হচ্ছিল ওর কিছু হলে আমিই মরে যাবো!”
মোহনা শিকদার একটু কৌতূহলী দৃষ্টিতে মেহুলের দিকে চাইলেন, “কেন? এমন কেন মনে হচ্ছিল? বাচ্চাটা পুঁচকু বলে? ওর প্রতি আলাদা টান অনুভব করো তাই?”
মেহুল মাথা নেড়ে ধীর গলায় বলল—
“না আম্মু… পুঁচকুর জায়গায় অন্য যেকোনো বাচ্চা থাকলেও আমি ঠিক এই একই কাজ করতাম।”
”কিন্তু আমি তো জানি তুমি তো ওখানে পুঁচকুকেই খুঁজতে গিয়েছিলে,” মোহনা শিকদারের গলায় এক প্রচ্ছন্ন যুক্তি, “তার মানে পুঁচকু তোমার কাছে স্পেশাল, তাই না?”
”তেমনটা নয় আম্মু…”—মেহুল ম্লান হেসে মায়ের হাতটা ধরতে চাইলো, কিন্তু তার আগেই
মোহনা শিকদার আদুরে গলায় ডেকে উঠলেন, “তাহলে কেমন, মেহু?”
মেহুল মায়ের কথাতে চোখ বন্ধ করে কাতর কণ্ঠে বলে উঠলো —
“বাচ্চাটা বড্ড অভাগী আম্মু! একদম অনাথ, এই দুনিয়ায় ওর বলতে কেউ নেই। তুমি জানো, ওকে আমি কীভাবে আর কোথায় পেয়েছিলাম? এতটুকু একটা নিষ্পাপ ছানাকে নির্দয়ভাবে কেউ রাস্তার ধারে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল! তাই আমি চেয়েছিলাম ও অন্তত একটা ভালো পরিবার পাক, একটু শান্তিতে আর সুখে বড় হোক…”
মোহনা শিকদার হালকা হেসে মেহুলের কথার প্রতিউত্তর করলেন, “তাহলে তুমি নিজে ওকে নিজের কাছে রাখছ না কেন?”
মেহুল বিষণ্ণ চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
“আমি ওকে কীভাবে রাখব বলো আম্মু? আমার যে এখনও সেই সামর্থ্য বা পরিস্থিতি হয়নি…আর আমি তো…”
মোহনা শিকদার মেহুলের কথা শেষ করতে দিলেন না। অত্যন্ত দৃঢ় ও মমতাময়ী কণ্ঠে বলে উঠলেন—
“তুমি কিছুই না মেহু! সব সংশয় আর ভয় মন থেকে ঝেড়ে ফেলো। শুধু মনে রাখবে—তুমি একজন নারী, আর একজন নারী চাইলে সব পারে! সব লড়াই জিততে পারে !”
মেহুল চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে অভিমানের সুর তুলে বলল—
“যেমনটা তুমি পেরেছিলে… তাই না আম্মু?”
মোহনা শিকদারের চোখে এক চিলতে গর্বের আলো ফুটে উঠল, “তুমি আমার সন্তান মেহু… আমার উত্তরসূরি।”
কথাটি শোনামাত্রই মেহুলের বুকের ভেতরের এত বছরের জমানো কষ্ট আর ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে বের হলো! সে মায়ের কোলে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। চরম আকুলতা আর বুকভাঙা অভিমান মিশিয়ে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল—
“তাহলে কেন আমায় এত ছোট বয়সে একা ফেলে চলে গেলে আম্মু? কেন আমাকে এই নির্দয় পৃথিবীর বুকে একলা ফেলে দিয়ে দূরে হারিয়ে গেলে? তুমি জানো, তোমার মেহু তোমাকে কতটা মিস করে? কত রাতে তোমার নাম ডেকে ডেকে একা একা কেঁদেছে, তুমি টের পাওনি?”
মোহনা শিকদার পরম স্নেহে মেযের দিকে তাকালেন মেহুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে গিয়েও যেন থমকে গেলেন, অতঃপর বললের—
আমি তো কখনো তোমাকে ছেড়ে যাইনি মেহু, সব সময় তোমার সাথেই আছি… তোমার ওই ব্যাকুল হৃদয়ের গহীনে। তাই তো সব সত্যি জানার পরেও আমায় তুমি ঘৃণা করতে পারোনি, আর না পেরেছ আমার স্মৃতিগুলো মন থেকে মুছে ফেলতে।”
মেহুল মায়ের কোলের উষ্ণতায় নিজের ভেজা মুখটা আরও গভীরে গুঁজে দিল। অশ্রুসজল চোখে আকুল হয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল—
“আমার জীবনে তুমিই একমাত্র সত্য আম্মু! খুব ভালোবাসি তোমাকে, বড্ড ভালোবাসি! তোমার জায়গা এই দুনিয়ায় কেউ নিতে পারবে না আম্মু… কখনো না!”
মেহুলের কথাতেে মোহনা শিকদারের মায়াবী চোখ দুটো এক অলৌকিক আলোয় দীপ্ত হয়ে উঠল। তিনি ধীর ও কোমল স্বরে শুধালেন—
“তাহলে ওই নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে কেন নিজের থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছ মেহু? ওকেও আপন করে নাও…”
মায়ের মুখে কথাটা শুনতেই মেহুল যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো থমকে গেল! তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের ভয় আর দ্বিধা এক লহমায় তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরল। সে কণ্ঠের সমস্ত শক্তি হারিয়ে যেন নিজের কথা নিজেই হারিয়ে ফেলল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল—
“আমি… আমি পারব না আম্মু! আমার এই অভিশপ্ত, ছারখার হয়ে যাওয়া জীবনে আর কাউকে জড়াতে আমি পারব না। তুমি জানো না আম্মু, এই সমাজ, এই মানুষগুলো কত কী বলেছে আমাকে! কত হাজারো অভিযোগ, কত কলঙ্ক আর অপমানের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে এই বুকে! তবুও দেখো, বেঁচে আছি সব অপূর্ণতা আর যন্ত্রণা নিয়ে। আমি চাই না আমার সেই অভিশপ্ত জীবনের কোনো কালো ছায়া ওই নিষ্পাপ বাচ্চাটার ওপর পড়ুক…”
“বলুক না! তাদের চোখে না হয় তুমি অপূর্ণ… তবে এবার তুমি নিজেকে পূর্ণ করে দেখিয়ে দাও ওদের।”
মেহুল অশ্রুসিক্ত চোখে বোকার মতো তাকাল, “কীভাবে আম্মু…?”
”একদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব অভিযোগ করেছিলে মনে আছে তোমার?”—মোহনা শিকদারের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল পরম মমতার এক চিলতে হাসি, “খোদাকে ডেকে বলেছিলে, কেন তিনি তোমার কপালটা এমন মন্দ করে লিখলেন? কিন্তু খোদা তো তোমার ভাগ্য সোনা দিয়ে খচিত কলমে রূপায়ণ করেছেন মেহু! যার ফল আজ তোমার চোখের সামনে। সব সময় একটা কথা মনে রাখবে—জন্মদাত্রী হলেই অনেক সময় আসল ‘মা’ হয়ে ওঠা যায় না। আবার কখনো কখনে গর্ভে জন্ম না দিয়েও মা হওয়া যায়!”
মেহুল মন্ত্রমুগ্ধের মতো মায়ের প্রতিটি কথা শুনতে লাগল। মায়ের মুখ থেকে ঝরে পড়া প্রতিটা বাণী যেন তার হৃদয়ের দীর্ঘদিনের ক্ষতগুলোতে সুশীতল প্রলেপ বুলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু হঠাৎই কথার মাঝে সে হাত দুটো বাড়িয়ে আকুল কণ্ঠে কেঁদে উঠল—
“আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো না আম্মু! কতদিন… কত বছর তোমাকে একটু ছুঁয়ে দেখি না! আমার যে বুকটা ফেটে যাচ্ছে আম্মু…”
কিন্তু ঠিক তখনই মেহুল দেখল, মোহনা শিকদার ধীরপায়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পেছনের দিকে সরে যাচ্ছেন!
মেহুল বিছানা থেকে উঠে হাত বাড়াল, আকুল হয়ে ছটফট করে বলে উঠল—
“আমি তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরতে চাই আম্মু! একটু তোমার শরীরের সেই চিরচেনা সুবাস নিতে চাই… যেও না আম্মু!”
মোহনা শিকদার মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। উনার কণ্ঠে এক করুণ ও অলৌকিক সুধা—
“মৃত মানুষকে যে জড়িয়ে ধরা যায় না, মা…”
”একবার… শুধু একবার আম্মু! শুধু একটু ছুঁতে দাও! একটা বার আমাকে তোমার বুকে নাও না!”—মেহুল তার ধোঁয়াটে হয়ে আসা চোখে করুণ মিনতি ঝরিয়ে চিৎকার করে উঠল।
মোহনা শিকদার দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। পেছনের মায়াবী আলোয় উনার অবয়বটা যেন এক শুভ্র মায়ায় পরিণত হচ্ছিল। অতঃপর তিনি মিষ্টি সুরে বলে উঠলেন—
“বুকে নিতে চাও? নাও… আমি তো তোমার খুব কাছেই আছি। কোনো এক নিষ্পাপ রূপ চিত্তে আমায় খুঁজে নাও, চিনে নাও… জড়িয়ে নাও! ভাবো এরপরে হাত বাঁড়াও দেখবে আমাকে ছুতে পারছো।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো কেবিনের চারদেয়াল ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে যেতে লাগল! মায়ের রূপটি যেন বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে!
মেহুল উন্মাদের মতো বিছানা ছেড়ে ওঠার চেষ্টা করে হাত বাড়াল—
“আম্মু! তুমি কোথায় যাচ্ছ?! দাঁড়াও আম্মু… আমাকে ছেড়ে যেও না!”
”ম্যাম! ম্যাম কী হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেন!”
এক নার্সের সচকিত ও চিন্তিত ডাকে হঠাৎ করেই মেহুলের ঘোর কেটে গেল! মেহুল চমকে উঠে ধড়ফড় করে চোখ মেলল। না… কেবিনে কোনো ধোঁয়াশা নেই, সোফাতেও কেউ বসে নেই। চারপাশের চিরচেনা হাসপাতালের শীতল নীরবতা আর নাকে আসা অ্যান্টিসেপ্টিকের গন্ধ। পাশে ডিউটি নার্স ব্যাকুল হয়ে তার কপালে হাত দিয়ে ধরে আছে। মেহুল হাঁপাতে হাঁপাতে বুঝতে পারল—সবটাই ছিল তার এক অলৌকিক ও হৃদয়স্পর্শী স্বপ্ন!
কিন্তু এটা কি কেবলই স্বপ্ন ছিল? না! হঠাৎ মেহুলের উপলব্ধি করলো তার বুকের ভেতরের এতদিনের জমাট বাঁধা বরফ আর কান্নাগুলো যেন এক নিমেষে গলে পানি হয়ে যাচ্ছে। মেহুল বুঝলো স্বপ্নের আঁধারে মা এসে যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা তাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন আর তা হলো—অন্যদের দেওয়া অপমান আর সমাজের অপূর্ণতাকে নিজের মাতৃত্বের ভালোবাসায় পূর্ণতায় রূপান্তর করতে হবে!
হাসপাতালের ইমার্জেন্সি আইসিইউ ব্লকের সামনে এক থমথমে ও দমবন্ধ করা আবহ। লাল বাতিটা একটানা জ্বলে আছে, যা চারপাশের পরিবেশকে আরও ভীতিকর করে তুলেছে। আইসিইউ-এর দীর্ঘ করিডোরে শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো অবস্থায় বাঘের মতো পায়চারি করছেন সালমান শাহ নেওয়াজ। তার চেহারায় প্রখর কঠোরতা, চয়াল শক্ত হয়ে আছে, আর চোখের কোণে জমে আছে এক ভয়ংকর দাবানল। এদিকে করিডোরের বাহিরের এক কোণে হুমা নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অন্যদের সাথে সাথে তারও ভেতরে প্রবেশ করা বারন, তাই আপাতত অন্য সবার সাথে তার মনোযোগ কেবল কাঁচের ওই পাশের দিকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে মেডিকেল টিমের হেড ডাক্তার ফাইল হাতে করিডোরে এলেন। তাকে দেখামাত্রই সালমান এক মুহূর্তের জন্য থামলেন। তার তীক্ষ্ণ ও নির্দেশক দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ডাক্তারের ওপর, “কোন আপডেট!”
ডাক্তার সোজা সালমানের সামনে এসে ফাইলটা খুলে গলার স্বর নামিয়ে বললেন, “কিছুটা আপডেট আছে, স্যার।”
সালমান এক পা এগিয়ে এসে সরাসরি ডাক্তারের চোখের দিকে তাকালো। তার কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই, কেবল বরফশীতল নির্দেশ, “বাচ্চাগুলোর কন্ডিশন কী? রিকোভারি কি শুরু হয়েছে?”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ব্যাপারটা বেশ জটিল। পাচারকারী চক্র বাচ্চাগুলোকে শান্ত রাখার জন্য আর পাচারের সুবিধার্থে একটা বিশেষ মারাত্মক রাসায়নিক সেনসিটিভ ড্রাগ ব্যবহার করেছিল। এই ড্রাগটা মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের কড়া এনাস্থেসিয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। উদ্ধার হওয়া সাতটা বাচ্চার মধ্যে পাঁচ জনের শরীর থেকে ড্রাগের প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসছে, তারা রেসপন্স করছে।”
সালমান দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করলেন, “আর বাকি দুজন? যাদের জন্য এত ক্রিটিক্যাল পরিস্থিতি?”
ডক্টর চিন্তিত মুখে বললেন, “ওদের শরীরে ড্রাগের মাত্রা অতিরিক্ত চলে গেছে। তাদের রেসপিরেটরি সিস্টেম মারাত্মকভাবে ব্লক হয়ে গেছে—দুজনেরই অবস্থা সংকটাপন্ন। আগামী বারো ঘণ্টা তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ড্রাগের বিষক্রিয়া কাটানো না গেলে… পরিস্থিতি খুব একটা অনুকূলে নেই।”
ডক্টরের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে করিডোরের তাপমাত্রা যেন আরও কয়েক ডিগ্রি নিচে নেমে গেল। সালমান এক মুহূর্তের জন্য কাঁচের দরজার দিকে তাকালো। তার চোখ গিয়ে ঠেকলো একটি সিটে যেখানে অসংখ্য নল আর ভেন্টিলেটর সাপোর্টে ধুঁকছে ছোট্ট প্রাণটি। আর যা দেখে সালমানের চোখের তারায় এবার ফুটে উঠল এক পৈশাচিক হিংস্রতা। সে ডাক্তারের কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে গর্জনের মতো করে বললেন, “আমি জানি না আপনারা কী করবেন। কিন্তু যেকোনো মূল্যে ওই বাচ্চা দুটোকে আমার ফেরত চাই। আর ওই ড্রাগ সাপ্লাইয়ের রুটটা বের করতে আমি নিজেও নেমে পড়ছি। আজ কোনো অপরাধীই ছাড় পাবে না!”
অতঃপর সালমান আর দেরি করলো না। হনহন করে করিডোর চিরে বেরিয়ে গেলেন। তার দীর্ঘ ছায়া আর পদশব্দে হাসপাতালের ঠান্ডা করিডোর তখনও কেঁপে উঠছে।
ঘণ্টা খানেক পার হয়ে গেছে। আইসিইউ-এর ভেতরে ছোট্ট শিশুগুলোকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। বাইরের করিডোরে এক চাপা উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠা। এরি মাঝে করিডোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে সিনিয়র এক নার্স এসে দাঁড়ালেন, চশমাটা
নাকের ডগায় নামিয়ে হাতের ফাইল থেকে মুখ না তুলেই ব্যস্ত গলায় হাঁক ছাড়লেন, “ঘণ্টা খানেক আগে ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে ভর্তি করানো সিরিয়াল নং দুই বাচ্চাটার সাথে কে আছেন?”
কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। করিডোরে তখন মানুষের আনাগোনা কমে এসেছে। নার্স এবার বিরক্তি নিয়ে চশমাটা ঠিক করতে করতে পুনরায় হাঁক ছাড়লেন, “কথা শোনেন না নাকি বলছি? ঘণ্টা খানেক আগে ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে ভর্তি করানো বাচ্চাটার সাথে কে আছে?”
”আমি!”
কিছুটা দূর থেকে গম্ভীর, ভারিক্কি আর আদেশসূচক একটা কণ্ঠ ভেসে এলো। নার্স এবারও ফাইলের পাতায় চোখ রেখেই একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে উঠলেন, “কথাটা বলতে কি খুব কষ্ট হয় নাকি? একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে আমি বুঝবো কী করে? কে আছে না আছে!
তা বাচ্চার সাথে আপনার সম্পর্ক কী?”
” আমি বাচ্চার বাবা।”
উত্তরটা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, দৃঢ় এবং চরম অধিকারবোধে পরিপূর্ণ। কথাটার ওজন এতই বেশি ছিল যে, নার্স এবার মুখ তুলে তাকাতে বাধ্য হলেন। বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে তিনি জিজ্ঞেস করতে গেলেন, “আপনার নাম কি…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটির দিকে তাকাতেই নার্সের শিরদাঁড়া দিয়ে যেন বরফ-শীতল একটা স্রোত বয়ে গেল! মানুষটিকে চেনা মাত্রই নার্সের হাতের ফাইলটা হাত থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো, সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠলো। গলা দিয়ে কোনো শব্দ পর্যন্ত ফুটলো না তার। পুরো করিডোরের বাতাস যেন এক লহমায় ভারী হয়ে গেল।
এদিকে নার্সের বিহ্বল ভাবের মাঝেই অত্যন্ত গম্ভীর, শান্ত অথচ অকাট্য মেজাজে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি নিজের নাম জানিয়ে দিলেন—
“বাবার নামের স্থানে লিখুন, সালমান শাহ নেওয়াজ।”
নামটি শোনার পর নার্সের অবস্থা যেন আরও শোচনীয় হয়ে পড়ল। তিনি কোনোমতে ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, “জ্বি… জ্বি স্যার।”
নার্সের কাজ শেষ, সালমান হনহন করে চলে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই নার্স আমতা আমতা করে ডাকলেন, “স্যার… আসলে…”
সালমান থমকে দাঁড়ালো। সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে শীতল দৃষ্টিতে তাকালো, “কিছু বলবেন?”
নার্স ভয়ার্ত চোখে আশেপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন, “স্যার, বাচ্চার মায়ের নামটা কি? লিখবো, মানে… ফাইলে তো নামটা প্রয়োজন।”
সালমান এক মুহূর্তের জন্য চুপ থাকলো। নার্সের ঘামাক্ত চেহারার দিকে তাকালো। অতঃপর পকেট থেকে টিস্যুর প্যাকেট বের করে নার্সের দিকে লগিয়ে দিতে দিতে অত্যন্ত কর্তৃত্বপূর্ণ আর গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো—
”অপেক্ষা করুন বাচ্চার মায়ের পরিচয় একটু পরেই সে নিজে এসে দিয়ে যাবে।”
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২২
কথাটা বলেই সালমান আর দাঁড়ালো না। তার বলিষ্ঠ পদচারণায় হাসপাতালের করিডোর প্রকম্পিত করে করিডোরের শেষ মাথায় মিলিয়ে গেলো। অপরদিকে নার্সটি তখন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে, তার মাথায় তখনো ঘুরপাক খাচ্ছে সালমানের ওই শেষ বাক্যটা।
