শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৪
আফীফা আফনান
”প্রতিটি সকাল মানুষের জীবনে এক নতুন দিক ও সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়; পুরনোকে মুছে দিয়ে আমাদের সুযোগ দেয় নতুন করে বাঁচবার।”
মেহুলের জীবনেও আজকের ভোরের সকালটা ঠিক তেমনই এক নতুন রূপ নিয়ে এসেছে। আজ তার মনে আর কোনো পিছুটান নেই, বেইমানদের আঁকড়ে ধরে রাখার কোনো তাড়া নেই। মেহুল এখন মুক্ত, স্বাধীন। সে এখন শুধুমাত্র নিজের জন্য বাঁচবে, নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য লড়বে এবং তার যা কিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে—সবকিছু এক এক করে আবারও নিজের আয়ত্তে ফিরিয়ে আনবে।
তইতো প্রতিদিনকার মতোই মেহুল আজ ভোরেও ঘুম থেকে উঠল। তার ঘরের লাগোয়া খোলা ব্যালকনিটার বিশাল সেই খোলা চত্বরে পা রাখতেই সকালের একঝলক ঠান্ডা ও মুক্ত বাতাস তার মুখ ছুঁয়ে গেল। মেহুল দুই চোখ বন্ধ করে বুক ভরে সেই পবিত্র বাতাস নিজের মাঝে আহ্বান করল। এই ভোরের আলো যেন পূর্বের সকল গ্লানি আর চোখের জল মুছে দিয়ে তাকে এক নতুন সূচনার যাত্রায় স্বাগত জানাল।
এই বিশাল ব্যালকনির চারপাশ জুড়ে মেহুলের পরম যত্নে গড়ে তোলা বাগান। বড় বড় টবে সারিবদ্ধভাবে লাগানো আছে তার বেশ কিছু প্রিয় ফুল গাছ। অতঃপর মেহুল একটা পানির ঝারি হাতে নিয়ে গাছগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। একে একে সতেজ সবুজ পাতা আর ফুলের ওপর পানি ছিটিয়ে দিতে লাগল সে। গাছের পাতায় টুপটুপ করে পানি পড়ার শব্দে পুরো পরিবেশটা যেন স্নিগ্ধ হয়ে উঠল।
বেশ কিছু গাছে পানি দেওয়ার পর, মেহুল হঠাৎ একটা বড় টবে লাগানো লাল গোলাপ গাছটির সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। সে অপলক ও একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল গাছটির দিকে।
মেহুলের স্পষ্ট মনে আছে, বছরখানেক আগের এক বিকেলের কথা। এই গাছটি তাকে আরমান উপহার হিসেবে এনে দিয়েছিল। মেহুলের বরাবরই হলুদ গোলাপ ভীষণ পছন্দের। আরমান সারা শহর খুঁজেও সেদিন কোনো নার্সারিতে হলুদ গোলাপ পায়নি, তাই অবশেষে এই লাল গোলাপের গাছটিই ভালোবেসে কিনে এনেছিল। শুধু এনেই ক্ষান্ত হয়নি আরমান, নিজ হাতে টবের মাটি খুঁড়ে গাছটি রোপণ করে ব্যালকনির এই নির্দিষ্ট কোণটায় এনে রেখে দিয়েছিল।
সেদিন আরমানের আনা এই ছোট্ট উপহারটুকু পেয়ে মেহুলের আনন্দের যেন সীমা ছিল না! তার মনে হয়েছিল, এটিই বুঝি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কোনো উপহার। কত যত্ন, কত আদিখ্যেতা আর ভালোবাসার পরিচর্যায় গাছটিকে সে বড় করেছে। আর আজ, তার সেই ভালোবাসার ফল হিসেবে গাছটিতে চমৎকার একটি রক্তলাল গোলাপের কলি ফুটে উঠেছে।
কলিটার দিকে তাকিয়ে মেহুল হঠাৎই তাচ্ছিল্যভরে হেসে উঠল। তীব্র অবহেলার এক বিষাক্ত হাসি! কারণ, এই লাল টুকটুকে সুন্দর কলিটি এখন আর ভালোবাসার প্রতীক নয়, বরং তাকে আরমানের দেওয়া চরম প্রতারণা আর বেইমানির কথা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।
মেহুলের চোখের মণি দুটো এক লহমায় কঠোর হয়ে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও ভাবল না। ডান হাতটা বাড়িয়ে এক ঝটকায় সেই সুন্দর কলিটিকে গাছ থেকে ছিঁড়ে ফেলল। শুধু ছিঁড়েই ক্ষান্ত হলো না; কলিটিকে মেঝের ওপর ফেলে নিজের শক্ত পা দিয়ে পিষে একাকার করে দিল।
সাথে সাথেই লাল পাপড়িগুলো থেঁতলে গিয়ে মেঝের সাথে মিশে গেল। এই নিষ্ঠুর আঘাতের মাধ্যমে মেহুল যেন আরমানের দেওয়া শেষ স্মৃতিটুকুও নিজের জীবন থেকে চিরতরে মুছে দিল এবং নিজের ওপর হওয়া প্রতিটি অন্যায়ের এক নীরব অথচ তীব্র প্রতিবাদ জানাল। আজ থেকে আরমানের দেওয়া কোনো চিহ্নের স্থান মেহুলের জীবনে আর নেই।
অতঃপর মেহুল ব্যালকনি ছেড়ে ধীরপায়ে নিজের ঘরের ভেতরে ফিরে এলো। তার চোখ দুটো এবার স্থির হলো ঘরের আলমারি আর ড্রয়ারগুলোর ওপর। আজ তার জীবনের পাতা থেকে আরমান নামক অধ্যায়টার শেষ অবশিষ্টাংশটুকুও উপড়ে ফেলার দিন।
সে ঘরের প্রতিটি কোণ তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করল। বিগত বছরগুলোতে আরমানের দেওয়া ছোট ছোট সমস্ত উপহার সে এক এক করে আলমারির গোপন খোপ আর ড্রয়ারের তলদেশ থেকে টেনে বের করতে লাগল। মেহুল কোনো রকম মায়া বা দ্বিধা না রেখে, নিস্পৃহ ভঙ্গিতে সেই জিনিসগুলো ফ্লোরের ওপর ছুড়ে ফেলতে থাকল।
একসময় যখন আরমানের দেওয়া শেষ উপহারটুকুও ড্রয়ার থেকে বেরিয়ে এলো, তখন মেঝেতে জমে থাকা সেই স্তূপটার দিকে তাকিয়ে মেহুল হঠাৎই আপনমনে হেসে উঠল। এক চরম তাচ্ছিল্য আর কৌতুকের হাসি!
মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সাধারণ কিছু নোটবুক, একটা সস্তা ডায়েরি, সস্তার কিছু কলম, একটা সাধারণ পেন্সিল বক্স, চুলে দেওয়ার ক্লিপ আর একটা অচেনা ব্র্যান্ডের লিপস্টিক। এই রকম অসংখ্য অতি সাধারণ উপহার আরমান তাকে বিভিন্ন সময়ে দিয়েছিল, যার একটাও মেহুল কখনো ব্যবহার করেনি। অবহেলায় নয়, বরং আরমানের ছোঁয়া লেগে আছে বলে সে এগুলোকে কোনো অমূল্য রত্নের মতো সযত্নে আগলে রেখেছিল বুকের ভেতর।
জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে মেহুলের মনে হলো—বড় অদ্ভুত আর করুণ এই সমীকরণ! আর একটা মজার ব্যাপার! আরমান যখনই তাকে এই সস্তা আর সাধারণ জিনিসগুলো উপহার দিত, মেহুল তখন প্রতিদানে আরমানকে সবসময় দুহাত উজাড় করে দামি দামি সব জিনিস উপহার দিত। আরমানের হাতের দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি, তার ল্যাপটপ, আইফোন—সব মেহুলেরই দেওয়া। এমনকি আরমান বর্তমানে যে বিলাসবহুল গাড়িটি চড়ে ঘুরে বেড়ায়, সেটাও মেহুল নিজে তার বাবা ইকবাল সাহেবকে বুঝিয়ে, আরমানের জন্মদিনের উপহার হিসেবে পাইয়ে দিয়েছিল।
অথচ, আরমানের দেওয়া এই সস্তা উপহারগুলো নিয়ে মেহুলের কোনোদিনও বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষোভ বা আক্ষেপ ছিল না। আরমান যদি তাকে রাস্তা থেকে কিনে এক টাকার একটা সাধারণ চকলেটও এনে হাতে দিত, মেহুলের কাছে সেটাই মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে মহামূল্যবান কোনো রাজমুকুট! সে আরমানকে নয়, আসলে আরমানের সাথে জড়িয়ে থাকা নিজের পবিত্র ভালোবাসাটাকে পুজো করেছিল।
মেঝেতে ছড়ানো উপহারগুলোর দিকে তাকিয়ে মেহুল নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল—এই সস্তা জিনিসগুলোর মোহে পড়েই কি সে নিজের এতগুলো বছর এক বেইমানের পেছনে নষ্ট করল?
তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই হিমশীতল, অটল হাসিটা ফুটে উঠল। আজ তার চোখ সম্পূর্ণ মুক্ত। সে বুঝতে পেরেছে, প্রেম মানুষকে কতটা অন্ধ আর বোকা বানিয়ে রাখতে পারে। তবে আজ আর কোনো আফসোস নেই। মেঝেতে পড়ে থাকা এই আবর্জনাগুলোই প্রমাণ করছে যে আরমান নামক মানুষটার যোগ্যতা আসলে ঠিক কতটুকু ছিল, আর মেহুল তাকে নিজের মনের সিংহাসনে বসিয়ে কতটা ভুল করেছিল।
একসময় মেহুল বিছানার ওপর থেকে নিজের মোবাইলটি হাতে তুলে নিল। একটুও সময় নষ্ট না করে সে সোজা বাড়ির হলরুমের ল্যান্ডফোন নাম্বারে কল লাগাল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, এই সাতসকালে তার এখন যাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সে এই মুহূর্তটাতে ঠিক হলরুমেই থাকবে।
কয়েকবার রিং হতেই ওপাশ থেকে কলটি রিসিভ হলো। মেহুল ওপাশের মানুষটিকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই অত্যন্ত স্বাভাবিক অথচ স্পষ্ট গলায় বলে উঠল, “একটু ওপরের তলায় আমার রুমে আসুন তো। এক্ষুনি আসুন, আপনাকে আমার বিশেষ দরকার আছে।”
কলটি কেটে মেহুল শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় হন্তদন্ত হয়ে, পরনের শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে মেহুলের রুমে প্রবেশ করল ফরিদা। ফরিদা আন্টি এই শিকদার বাড়ির বহু বছরের পুরনো আর বিশ্বস্ত গৃহকর্মী।
রুমে পা রাখতেই ফ্লোরের ওপর আরমানের দেওয়া উপহারগুলোর এমন এলোমেলো ছড়াছড়ি আর স্তূপ দেখেই ফরিদর চোখ চড়কগাছ! সে চরম অবাক হয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “ওমা আম্মা! আপনি তো কোনোদিন নিজের ঘর এত নোংরা করেন না। সব গুছগাছ কইরা রাখেন। তা আজকা হুট কইরা ফ্লোরের ওপর এত নোংরা জমাইছেন যে? কী হইছে আম্মা? এইডি কি আমি সব গুছাইয়া আলমারিতে তুইলা দিমু?”
মেহুল মেঝের আবর্জনাগুলোর দিকে একবার নির্লিপ্ত নজরে তাকাল। তারপর এক ফোঁটা মায়া না দেখিয়ে বলল, “না ফরিদা আন্টি। এগুলো কিচ্ছু গোছাতে হবে না, এগুলো সব আপনি ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন।”
ফরিদা আন্টি হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে একটা ডায়েরি আর পেন্সিল বক্স হাতে তুলে নিল। উল্টেপাল্টে দেখে কপাল কুঁচকে বলল, “কন কী আম্মা! এইডি দেইখা তো মনে হইতেছে একদম নতুন জিনিস। সবডি তো ভালো , হেলাফেলা করার মতো তো কিচ্ছু নাই। তবে এত ভালো জিনিসগুলা অকারণেই ফালাইবেন ক্যান?”
মেহুল একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলল, “ওগুলোতে বিষাক্ত আর দূষিত ছোঁয়া লেগে আছে আন্টি, যা আপনি বুঝবেন না। আপনার ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না। আপনি শুধু কষ্ট করে এই আবর্জনাগুলো একটা ব্যাগে ভালোভাবে গুছিয়ে নিয়ে নিচে চলে আসুন। আমি নিচে আছি।”
কথাটা বলেই মেহুল ধীরপায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার ঠিক চৌকাঠের সামনে এসে সে আচমকা থমকে দাঁড়াল। কী যেন একটা ভেবে সে পেছন ফিরে ফরিদাকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা আন্টি, নিচে লিভিং রুমে এখন কে কে আছে?”
ফরিদা ততক্ষণে ফ্লোরে বসে তার শাড়ির আঁচল টেনে বেঁধে একটা পুরানো বড় কাপড় বিছিয়ে জিনিসগুলো সব এক জায়গায় দলা পাকিয়ে বাঁধতে শুরু করেছে। সে মেহুলের প্রশ্নের উত্তরে মাথা না তুলে বলল, “নিচে তো আম্মা আপনার ছোট খালাম্মা আছে আর আপনার ফুফুরে দেখলাম রুম থেইকা বাহির হইতে। বাকিরা এহনো ঘর থেইকা কেউ বাইর হয় নাই, মনে হয় ঘুমাইতাছে।”
পরক্ষনেই ফরিদা মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠলো, “ওই ডাইনিডা আ সয়তানডাও রুমে! এহনো বাহির হয় নাই। আপনে রুমে তালা দেওয়ার পরে রাইতে গেস্ট রুমে যাইয়া ঘুমাইছে দুইজনে।”
”হুমমম…” মেহুল আলতো করে মাথা নাড়ল।
তার মানে বেইমান দুটো বাসর ঘরের দরজায় তালা ঝুলতে দেখে শেষমেশ অন্য ঘরে গিয়ে রাত কাটিয়েছে এবং লজ্জায় এখনো মুখ দেখানোর সাহস পায়নি। মেহুলের ঠোঁটের কোণে আবারও সেই রহস্যময় ও ধারালো হাসিটা ফুটে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে নিজের ঘর থেকে বের হয়ে এলো। বেইমানদের সকালটা যে আজ আরও বেশি বিষাদময় হতে চলেছে, তা নিচে নামার আগেই স্পষ্ট টের পাচ্ছিল মেহুল।
মেহুল যখন ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো, তখন ড্রয়িং আর ডাইনিং রুমের চিরচেনা দৃশ্যটাই তার চোখে পড়ল। রান্নাঘর থেকে বের হয়ে মিনারা বেগম পরম যত্নে নাস্তার পদগুলো এক এক করে ডাইনিং টেবিলে সাজাচ্ছেন। আর অন্যদিকে সুমনা বেগম ড্রয়িংরুমের সোফায় আয়েশ করে বসে একাগ্রচিত্তে মোবাইল টিপতে ব্যস্ত।
মেহুল বছরের পর বছর ধরে এই বৈষম্য দেখে আসছে, কিন্তু কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি। অথচ আজ তার মনে হলো—বড্ড ভুল করেছে সে, প্রতিবাদটা অনেক আগেই করা দরকার ছিল। কারণ, মানুষ যখন কোনো খাতির ছাড়াই দিনের পর দিন ফ্রিতে সবকিছু পেয়ে যায়, একসময় সে ওই ফ্রি পাওয়া জিনিসটাকেই নিজের জন্মগত অধিকার মনে করে বসে।
মেহুল কোনো শব্দ না করে চুপচাপ ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল এবং একটা চেয়ার টেনে বসল। সে বসার পরপরই লক্ষ্য করল, তার বাবা ইকবাল সাহেব মেইন দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছেন। তাঁর সাথে আছেন তাঁর বহু বছরের পুরনো সঙ্গী এবং পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট লিয়াকত আলী।
লিয়াকত আলীকে মেহুল বরাবরই ‘আঙ্কেল’ বলে সম্বোধন করে। লোকটা এই বাড়ি থেকে ঠিক বিশ মিনিটের দূরত্বের একটা ফ্ল্যাটে নিজের পরিবার নিয়ে থাকেন। কিন্তু প্রতিদিন কাকভোরে নিয়ম করে তিনি এ বাড়িতে চলে আসেন ইকবাল সাহেবকে মর্নিং ওয়াকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য। এই নিয়মটা গত এক যুগ ধরে চলে আসছে, এক দিনের জন্যও এর নড়চড় হয়নি। লিয়াকত সাহেব আসলে ইকবাল সাহেবের অ্যাসিস্ট্যান্ট কম, বিশ্বস্ত বন্ধু আর ছায়াসঙ্গীই বেশি। ইকবাল সাহেবও এই মানুষটাকে নিজের অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন, আর আজ পর্যন্ত লিয়াকত সাহেব সেই বিশ্বাসের গায়ে সামান্যতম আঁচড়ও লাগতে দেননি।
ইকবাল সাহেব আর লিয়াকত সাহেব দুজনে হাঁটাহাঁটি শেষে ডাইনিং টেবিলের কাছাকাছি এসে দাঁড়াতেই মেহুল মিষ্টি হেসে বলে উঠল, “গুড মর্নিং, বাবা। গুড মর্নিং, লিয়াকত আঙ্কেল।”
ইকবাল সাহেব মুচকি হাসলেন, অন্যদিকে লিয়াকত সাহেবও চওড়া হাসলেন, “গুড মর্নিং, মা। কেমন আছ তুমি?”
মেহুল মাথা নেড়ে হাসিমুখে জবাব দিল, “খুব ভালো আছি, আঙ্কেল। খারাপ থাকার কথা ছিলো নাকি?”
মেহুলের এহেন কথায় হেসে উঠলেন লিয়াকত সাহেব।
এর পরেই লিয়াকত সাহেব এগিয়ে গিয়ে মিনারা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আসসালামু আলাইকুম, মিনারা আপা। কেমন আছেন?”
মিনারা বেগম ট্রে হাতে ঘুরে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে সালামের উত্তর নিলেন, “ওয়ালাইকুম আসসালাম, লিয়াকত ভাই। আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো। আপনি ভালো আছেন?”
”জি আলহামদুলিল্লাহ।”
মিনারা বেগমের সাথে কথা শেষ করে লিয়াকত সাহেব সোফায় বসা সুমনা বেগমের দিকে তাকিয়ে বিনীতভাবে বললেন, “আসসালামু আলাইকুম, সুমনা আপা। শরীর-গতিক ভালো তো আপনার?”
কিন্তু সুমনা বেগম এমন একটা ভাব করলেন, যেন লিয়াকত সাহেব নামের কোনো অস্তিত্বই এই ঘরে নেই! তিনি মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ না তুলেই চরম অবহেলার সাথে ওপাশ ফিরে রইলেন। লিয়াকত সাহেবের কোনো কথাই যেন তাঁর কানে পৌঁছায়নি। এই অহংকারী আচরণ দেখে লিয়াকত সাহেব কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে চুপ হয়ে গেলেন।
ওদিকে ইকবাল সাহেব ততক্ষণে বেসিনে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এসে ডাইনিং টেবিলের নিজের নির্দিষ্ট চেয়ারটায় বসলেন। তিনি বসার পরপরই নিচের তলার রান্নাঘরের কোণার দিকের রুমটা থেকে মেহুলের মামী শিরিনা হুইলচেয়ার ঠেলে মামা আজমল সাহেবকে নিয়ে বের হয়ে এলেন। মেহুল তার মামাকে দেখেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অকৃত্রিম ও মায়াবী হাসি ফুটিয়ে তুলল। আজমল সাহেবও ভাগ্নির দিকে তাকিয়ে তাঁর বিবর্ণ মুখে একটা মলিন কিন্তু স্নেহময় হাসি ফিরিয়ে দিলেন।
শিরিনা বেগম আজমল সাহেবের হুইলচেয়ারটা এনে ইকবাল সাহেবের ঠিক পাশের খালি জায়গাটাতে বসিয়ে দিলেন।
মিনারা বেগম ততক্ষণে সবার প্লেটে প্লেটে গরম নাস্তা পরিবেশন করা শুরু করে দিয়েছেন। ঠিক তখনই লিয়াকত সাহেব ইকবাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “স্যার, তাহলে আমি আজ আসি? এবার বাড়ি যাওয়া দরকার। অফিসে দেখা হবে।”
বলেই লিয়াকত সাহেব পা বাড়াতে নিলেই মেহুল মাঝখান থেকে তাকে আটকে দিল। পাশের একটা খালি চেয়ার দেখিয়ে মেহুল জোর দিয়ে বলল, “কোথায় যাবেন আঙ্কেল? নাস্তা না করে একদম যাওয়া যাবে না। বসুন এখানে।”
লিয়াকত সাহেব প্রথমে একটু ইতস্তত করে বারণ করতে চাইলেন, কিন্তু মেহুলের স্নেহের আবদার আর জোরাজুরির কাছে শেষমেশ হেরে গিয়ে তিনি বাধ্য হয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়লেন।
পরিবেশটা তখন মোটামুটি শান্ত আর স্বাভাবিক। ঠিক এমন সময়ে, ড্রয়িংরুমের দিকের একটা ঘরের দরজা খুলে গেল। মৃদু হাসির গুঞ্জন আর ফিসফিসানি কথা বলতে বলতে ঘর থেকে বের হয়ে এলো নতুন বিবাহিত জোড়া—আরমান ও আনিকা।
মেহুল দূর থেকেই তীক্ষ্ণ নজরে লক্ষ্য করল, আনিকার চুলগুলো তখনো ভেজা, আর তার গলার এবং কাঁধের আশপাশের উন্মুক্ত চামড়ায় কিছু অস্পষ্ট, গাঢ় লাল দাগ। আনিকা ইচ্ছে করেই তার গলার ওপরের ওড়নাটা সরিয়ে রেখেছে, যেন ওই দাগগুলো মেহুলের চোখে পড়ে। মেহুলের যতখানি কাছে তারা এগিয়ে আসছিল, আরমান আর আনিকার ভেতরের প্রচ্ছন্ন অহংকার আর ঔজ্জ্বল্য যেন ততটাই চড়া হচ্ছিল। পুরো হাবভাবে স্পষ্ট—তারা যেন মেহুলকে এই দৃশ্যটা দেখিয়ে বুকটা জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্যই এত আয়োজন করে তাড়াহুড়োয় ঘর থেকে বেরিয়েছে!
কিন্তু মেহুল বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। তাদের এই ন্যাক্কারজনক সস্তা চেষ্টা দেখে তার ঠোঁটের কোণে কেবল এক অতি সূক্ষ্ম, রহস্যময় আর বিপজ্জনক হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে বলল—উপভোগ করে নে তোদের এই শেষ উৎসবের কটা দিন, হিসাবের খাতা যে আমি আজ থেকেই খুলতে যাচ্ছি!
আরমান আর আনিকা ডাইনিং স্পেসে পা রাখতেই সুমনা বেগম আর শিরিনা বেগমের মুখে যেন খৈ ফুটল। অপরদিকে নতুন বউয়ের ভেজা চুল আর গলার লালচে দাগগুলো দেখে সুমনা বেগম এক গাল হেসে আরমানকে বললেন, “বাবা আরমান, আয়, নাস্তা করতে বোস।”
মায়ের কথা মতো এক গাল হেসে আরমান যেই না তার চিরচেনা চেয়ারটায় বসতে যাবে, অমনি দেখল সেখানে লিয়াকত সাহেব বসে আছেন। মুহূর্তের মধ্যে আরমানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। নিজের ভেতরের নব্য জমিদারের দাম্ভিকতা প্রকাশ করে সে লিয়াকত সাহেবের নাম ধরে সরাসরি অবজ্ঞার সুরে বলল, “লিয়াকত আলী! আপনি এই চেয়ারে বসেছেন কেন? উঠুন, এটা আমার চেয়ার। আমি সবসময় এটাতেই বসি! আপনি বরং অন্যটায় গিয়ে বসুন।”
আরমানের এমন অভদ্রতায় ডাইনিং টেবিলের শান্ত পরিবেশটা এক লহমায় থমথম করে উঠল। লিয়াকত সাহেব চরম অপমানিত বোধ করে মাথা নিচু করে ফেললেন।
এদিকে ইকবাল সাহেব আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি হাতে থাকা চামচটা টেবিলে ছুড়ে মেরে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “আরমান! এটা কেমন ব্যবহার? বড়দের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় তা-ও ভুলে গেছ?”
আকস্মিক ধমক খেয়ে আরমান একটু দমে গিয়ে চুপ হয়ে গেল। অন্যদিকে লিয়াকত সাহেব পরিস্থিতি সামাল দিতে থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইলেন, “সমস্যা নেই স্যার, আমি ওদিকটায় গিয়ে বসছি…”
ঠিক তখনি, ”আপনি কোথাও যাবেন না আঙ্কেল! আপনি ঠিক এখানটাতেই বসবেন।”
মেহুলের বরফ-শীতল কিন্তু অনমনীয় কণ্ঠস্বর পুরো ডাইনিং রুমে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। সে আরমানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে লিয়াকত সাহেবকে বসিয়ে দিয়ে বলল, “এই চেয়ারটা কারো নামে রেজিস্ট্রি করাও নয়, আর না কারো বাপের টাকায় কেনা। বরং আমার বাপের পরিশ্রমের টাকাতে কেনা তাই আমি বলছি, আপনি এখানেই বসবেন। অন্য কারো যদি বসার খুব ইচ্ছে থাকে, তবে আশেপাশে অনেক চেয়ার খালি আছে, সেখানে গিয়ে বসতে বলুন!”
লিয়াকত সাহেব বাধ্য হয়ে আবার বসে পড়লেন। কিন্তু আরমান অপমানে আর ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে থমথমে মুখে মেহুলের দিকে তাকিয়ে রইল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আনিকা ন্যাকামি মেশানো সুরে আরমানের হাত টেনে ধরে, “বেবি চলো আমরা ওদিকে বসি।” বলে অন্যদিকে নিয়ে গেল।
তবে মুখে ভয়ের ভান করলেও, আনিকার চোখ-মুখে মেহুলকে হারানোর এক কুৎসিত খুশির আভা চকচক করছিল।
এই উত্তেজনার মাঝেই মুন্নি আর মিনার নিচে নেমে এলো। মিনার এসে সোজা বসল মেহুলের পাশের চেয়ারটায়, আর মুন্নি বসল মিনারা বেগমের পাশে।
এদিকে মিনারা বেগম টেবিলে একে একে ইকবাল সাহেব, লিয়াকত সাহেব, মিনার, মুন্নি, মেহুল এবং আজমল সাহেবের প্লেটে নাস্তা বেড়ে দিলেন। এরপর নিজের প্লেটটা টেনে নিয়ে যেমন খেতে শুরু করলেন, অমনি শিরিনা বেগম বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “আপা! আপনি সুমনা আপা, আরমান আর আনিকাকে নাস্তা দিলেন না যে?”
মিনারা বেগম মুখে নাসতা তুলতে তুলতেই অত্যন্ত নির্বিকার গলায় জবাব দিলেন, “সবার হাত-পা অক্ষত আছে ভাবি। যার যার খিদে লাগবে, সে নিজে নিয়ে খাবে। আমি এই বাড়ির কারো কেনা চাকর নই যে সবাইকে পাতে পাতে পরিবেশন করব!”
ননদের মুখে এমন সপাটে জবাব শুনে শিরিনা বেগম আর কথা বাড়ানোর সাহস পেলেন না। তিনি নিজেই মুখ কালো করে উঠে গিয়ে সুমনা বেগম আর আরমান-আনিকার পাতে নাস্তা তুলে দিলেন।
সবাই যখন চুপচাপ খাচ্ছে, ঠিক তখনই ফরিদা মেহুলের রুম থেকে সেই কাপড়ে বাঁধা বিশাল পোটলাটা পিঠে নিয়ে নিচে এসে হাজির হলো। সে সোজা মেহুলের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আম্মা, আপনি যা যা কইছিলেন সব নিয়া আইছি। এহন এই আবর্জনাডি কই ফালামু কন দেহি?”
ফরিদার এই আকস্মিক কথায় ডাইনিং টেবিলের সবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। সবাই উৎসুক আর সন্দিহান চোখে ফরিদার পিঠের সেই বোঁচকাটার দিকে তাকাল। এদিকে মিনার তাকিয়ে ছিলো মেহুলের দিকে মেহুল বুঝলো তাই সেও তাকালো আর ঠিক তখনই মিনার তার দুই ভ্রু নাচিয়ে ইশারাতে মেহুলকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার ? কী চলতাছে?’
মেহুল মিনারের দিকে তাকিয়ে কেবল এক চিলতে রহস্যময় মুচকি হাসি হাসল।
ঠিক তখনই তার কানে ভেসে এলো আনিকার ছোড়া শব্দবান, সে আরমানকে বলছ, ” বেবি আমরা হানিমুনে কিন্তু সুইজারল্যান্ড এই যাবো কেমন। আর আজ আমরা লং ড্রাইভে জাবো কেমন। অনেক ঘুরবো। শপিং করবো। আনিকা যখন কথা গুলো বলছিলো তার চোখ ছিলো মেহুলের দিকে। অন্যদিকে আরমান হালকা হেসে সায় দিয়ে চলছিলো।
আনিকার কথা শেষ সুমনা বেগম হেলো বলে উঠবে, “ঘুরবে অবশ্যই ঘুরবে! এখন তো তোমাদেরই দিন। বিয়ের পরে একটু আকটু ঘুরতে হয়। এখন নাস্তা করে নাও বলেই হেসে উঠলেন।
তখনি ফরিদা আবারও মেহুলকে ডেকে ওঠে, “আম্মা কই ফালাম? ”
এদিকে মেহুল এতোক্ষন চুপচাপ বসে সবটা শুনলেও একসময় ফরিদার ডাকে সে কোনো কথা না বলে সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ফরিদাকে বলে, “বাইরে বাগানের ঘাসের ওপর নিয়ে চলো, ফরিদা আন্টি।”
মেহুলের কথামতো ফরিদা বোঁচকাটা নিয়ে বাগানের দিকে চলে গেল, আর মেহুল সবার চোখের আড়ালে সোজা পা বাড়াল রান্নাঘরের দিকে। বাড়ির সবাই তখন খাওয়া ভুলে একদৃষ্টে মেহুলের গমনপথের দিকে তাকিয়ে আছে—মেয়েটা আসলে কী করতে চাইছে, তা বোঝার সাধ্য যেন কারো নেই।
মেহুল যখন রান্না ঘরে গেলো, তার ঠিক কয়েক মিনিট পরেই সে আবারও বেরিয়ে এলো কিন্তু কজরো দিকে না তাকিয়ে সোজা চলে গেলো বাড়ির বাহিরে। আর মেহুল যাওয়ার ঠিক কয়েক মিনিট পর।
হঠাৎ করেই ডাইনিং রুমের বড় কাচের জানালা দিয়ে বাইরের বাগানে আগুনের এক তীব্র লালচে আভা দেখা গেল, আর সেই সাথে কুন্ডলী পাকিয়ে উঠতে লাগল কালো ধোঁয়া। এই সাতসকালে হঠাৎ বাহিরে আগুন ও ধোঁয়া দেখে কী ঘটল, তা দেখতে সবাই যখন হুড়মুড় করে ঘর থেকে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।
ঠিক তখনই বাইরে আসতেই সবার চোখ ছানাবড়া!
বাগানের সবুজ ঘাসের ওপর দাউদাউ করে জ্বলছে একটা বিশাল অগ্নিকুণ্ড। আরমান বিগত কয়েক বছরে মেহুলকে যত উপহার দিয়েছিল—নোটবুক, ডায়েরি, লিপস্টিক, ক্লিপ—সবকিছু সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আর তার ঠিক পাশেই একটা বেতের চেয়ারে পরম আয়েশে বসে আছে মেহুল। তার কোলে একটা পুরনো ছবির অ্যালবাম। সে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে অ্যালবাম থেকে আরমান আর নিজের বিভিন্ন সময়ে একসাথে তোলা হাসিমুখের ছবিগুলো একটা একটা করে ছিঁড়ছে আর জ্বলন্ত আগুনের বুকে ছুড়ে মারছে।
মেহুলের এই ভয়ঙ্কর শান্ত অথচ বিদ্রোহী রূপ দেখে ইকবাল সাহেব স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর শান্ত মেয়েটা আজ ভেতরের সব পুঞ্জীভূত অপমান পুড়িয়ে খাঁটি সোনা হয়ে বের হচ্ছে। অন্যদিকে আরমান, আনিকা, সুমনা আর শিরিনা বেগম এক নতুন, অচেনা ও রুদ্ররূপী মেহুলকে দেখে একটু ভড়কে গেলেন।
হঠাৎ মেহুল ছবি পোড়ানো থামিয়ে আরমানের দিকে তাকাল। সেই চাহনি এতটাই শীতল আর ধারালো ছিল যে আরমানের মেরুদণ্ড বেয়ে যেন ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। মেহুল বসা থেকেই তার ডান হাতে থাকা লাইটারটা আরমানের মুখের দিকে তাকিয়ে জ্বালাল। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক পৈশাচিক হাসি।
পরমুহূর্তেই মেহুল জ্বলন্ত লাইটারটি ছুড়ে মারল ঠিক পাশে পার্ক করে রাখা আরমানের সাধের বিলাসবহুল গাড়িটির দিকে। যা সে মাত্র ছয় মাস আগে আরমানের জন্মদিনে নিজের বাবার টাকা দিয়ে উপহার দিয়েছিল।
”নাআআআআ!” আরমান পাগলের মতো চিৎকার করে গাড়ির দিকে দৌড়ে গেল। সুমনা বেগম আর আনিকাও মাথায় হাত দিয়ে ‘হায় হায়’ করে উঠল।
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে! লাইটারটা গাড়ির গায়ে লাগতেই পুরো গাড়িটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। আগুনের লেলিহান শিখা নিমেষের মধ্যে পুরো গাড়িটাকে গ্রাস করে নিল। আসলে, রান্নাঘরে যাওয়ার বাহানায় মেহুল আড়ালে একটা জারে করে কেরোসিন নিয়ে এসেছিল এবং বাগানে আসার পথেই সে আরমানের প্রিয় গাড়ির চারপাশে আর বডিতে তা ভালো করে ছিটিয়ে দিয়েছিল। ফলে আগুন লাগার সাথে সাথেই তা পুরো গাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে।
নিজের সাধের গাড়িটাকে চোখের সামনে কয়লা হতে দেখে আরমান ক্ষোভে, অপমানে আর হিংস্রতায় পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গেল। সে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে মেহুলের দিকে তেড়ে এলো, “তোর এত বড় সাহস! তুই আমার গাড়ি পুড়িয়ে দিলি? তোকে আজ আমি…”
ওদিকে মিনার আর ইকবাল সাহেব আরমানকে প্রতিহত করার জন্য এক কদম বাড়িয়ে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁদের আর এগিয়ে আসার প্রয়োজনই পড়ল না।
আরমান রাগ দেখিয়ে মেহুলের গায়ের ওপর হাত তুলতে যেই না উগ্র হয়ে হাত বাড়াল, অমনি মেহুল চেয়ার ছেড়ে চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় উঠে দাঁড়াল। আরমান কিছু বুঝে ওঠার আগেই, মেহুল তার পুরো শরীরের শক্তি দিয়ে আরমানের ডান গালে সপাটে এক চড় কষাল—’ঠাসসস!’
আকস্মিক সেই চড়ের শব্দে পুরো বাগানবাড়ি যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। বাতাসে শুধু গাড়ি পোড়ার চড়চড় শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ রইল না। সুমনা বেগম আর আনিকা ভয়ে নিজেদের মুখ চেপে ধরল। আরমান নিজের গালে হাত দিয়ে চরম হতভম্ব আর স্তব্ধ হয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে রইল। যে মেয়েটা দুদিন আগে পর্যন্ত তার সামনে মাথা নিচু করে কথা বলত, সে আজ সবার সামনে তার গালে চড় মারল!
মেহুল আরমানের চোখের দিকে নিজের জ্বলন্ত চোখ দুটো রাখল। তার কন্ঠস্বরে তখন এক মহাপ্রলয়ের গর্জন। সে আরমানের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল:
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৩
”বলেছিলাম না আরমান? যা আমার, তা আমি ভালোবেসে ফিরিয়ে নেব। আর যদি সোজা আঙুলে না বের হয়, তবে তা বুক চিরে কেড়ে নেব! তবুও তোদের মতো বেইমান, বিশ্বাসঘাতকদের আমি এক চুলও ছাড় দেবো না!”
দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা বেইমানির উপহার আর গাড়ির আগুনের পটভূমিতে মেহুল তখন এক ধ্বংসাত্মক রানীর মতো দাঁড়িয়ে রইল, যার পায়ের নিচে আরমান আর আনিকার অহংকার ততক্ষণে ধুলোয় মিশে গেছে।
