Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৪ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৪ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৪ (২)
‎আফীফা আফনান

তুই নিজেকে কী ভাবিস মেহুল?আমার গায়ে হাত তুলে তুই আমার সমান হয়ে গেছিস? মনে রাখিস—তুই কখনো আমার বরাবর হতে পারবি না, আর না আমার মতো যোগ্য অন্য কাউকে তোরা কখনো গড়ে তুলতে পারবি! এই শিকদার সাম্রাজ্যের হাল ধরার মতো। কারন তোর বাবার হাতে আর বেশি দিন নেই। আর না তুই পারবি এই বিশাল ব্যবসা সামলে রাখতে ? তোর সেই যোগ্যতাও নেই? থাকলেও সময় পাবি না। এই ব্যবসা আমার, আর আমারই থাকবে। কারন আমি যদি একবার তোদের ব্যবসা ছেড়ে বেরিয়ে যাই তবে তোদের এই তাসের ঘরের মতো সাজানো সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে ভেঙে পড়বে। তোরা পথে বসে যাবি মেহুল, পথে বসে যাবি! উহু ভাবিস না আমি মজা করছি। কারণ আরমান কখনো মজা করে না!

‎মনে রাখবি, এই ব্যবসার জন্য হলেও ইকবাল সাহেবকে আর তোকে এই আরমানকেই প্রয়োজন!
‎ দিনশেষে তোকে আর তোর বাবাকে এই আমার জুতোই চাটতে হবে মিলিয়ে নিস!”
‎আকস্মিক চোখ খুলে গেলো মেহুলের। রাতের গভীরতা যত বাড়ছে, মেহুলের চোখের ঘুম যেন ততটাই দূরে পালাচ্ছে। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে বেশ কয়েকবার ঘুমানোর চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হলো। কোনোভাবেই যেন মস্তিষ্ক থেকে আরমানের সেই বিষাক্ত কথাগুলো বের করতে পারছে না সে।
‎মেহুলের এখনো মনে আছে, ​সকালে আরমানের গালে চড় কষানো আর গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার পর, আরমান কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। এরপর নিজের গালে হাত বোলাতে বোলাতে তার চোখ দুটো হিংস্র পশুর মতো লাল করে একপ্রকার তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিল সে।
‎অতঃপর মেহুলের দিকে এক পা এগিয়ে এসে দাঁত কিড়মিড় করে ছুড়ে দিয়েছিল সেই মারাত্মক কথাগুলো। এরপর থেকে আরমানের সাথে মেহুলের আর দেখা হয়নি। সে কোথায় গিয়েছে, কী করছে—তা নিয়ে মেহুলের কোনো ধারণাও নেই, আর জানার আগ্রহও নেই।
‎​কিন্তু ওই শেষ কথাগুলো… কিছুতেই মাথা থেকে যাচ্ছে না, মেহুল চেষ্টা করেও ভুলতে পারছে না।যতোবার ঘুমানোর জন্য চোখ বুজছে ঠিক ততোবার কথাগুলো যেন তীরের মতো তার মস্তিষ্কের ভেতর ঘুর পাক খাচ্ছে।

‎​ঘুম আসছে না দেখে মেহুল অবশেষে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পরনের আরামদায়ক সুতি কর্ডসেটের ওপর একটা ওড়না ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে সে ব্যালকনির স্লাইডিং দরজাটা খুলল। দরজা খুলতেই রাতের একঝলক শীতল হাওয়া এসে তার সারা অঙ্গে যেন দোলা দিয়ে গেল। এরপরেই মেহুল ধীর পায়ে ব্যালকনিতে এসে রেলিঙের দিকে উল্টো ঘুরে, পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ জোড়া তখন ঘরের ভেতরের শূন্যতার দিকে নিবদ্ধ।
‎​সে সকাল থেকে আরমানের বলা প্রতিটি শব্দ নিয়ে কাটাছেঁড়া করে চলেছে। আরমান তাকে ঠিক কী ইঙ্গিত করতে চাইল? মেহুল নিশ্চিত, ওই তীব্র অহংকার আর কুৎসিত খোঁটার আড়ালে অন্য কোনো বড় রহস্য লুকিয়ে আছে। কারণ মেহুল এখন আরমানকে এক বিন্দুও বিশ্বাস করে না। যে ব্যক্তি দীর্ঘ দুটো বছর তাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আড়ালে অন্য একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারে—সেই মানুষটা সব করতে পারে। হয়তো এমন কোনো ষড়যন্ত্র, যা মেহুলের ভাবনারও অতীত!

‎​মেহুল যখন নিজের মস্তিষ্কের সাথে আরমানের কথার মারপ্যাঁচের এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে ভীষণ ব্যস্ত, ঠিক তখনই—”ধুপপপ!”
‎​হঠাৎ ভারী কিছু একটা পড়ার প্রচণ্ড শব্দে পুরো ব্যালকনিটা কেঁপে উঠল। নিঝুম রাতে আকস্মিক এমন আওয়াজে মেহুলের কলিজা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল! সে চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখাল—কুচকুচে কালো পোশাক আর মুখে একটা ভয়ানক ভূতুড়ে মুখোশ পরা এক দীর্ঘকায় অবয়ব তার দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে!

‎​হুট করে মাঝরাতে নিজের ব্যালকনিতে এমন কিছু দেখেই মেহুল আতঙ্কে নিজের জীবন বাঁচাতে যেই না একটা আকাশফাঁটা চিৎকার দিতে যাবে—অমনি ওই অবয়বটি নিজের মুখের মুখোশটা এক ঝটকায় টেনে খুলে ফেলল!
‎​”সারপ্রাইজ, সিস্টার!”
‎​মুখোশটা সরতেই বেরিয়ে এলো মিনারের চেনা মুখ। সে বত্রিশটা দাঁত কেলিয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে। যেন মাঝরাতে বোনের হার্ট অ্যাটাক প্রায় করিয়ে দেওয়াটা দুনিয়ার সবচেয়ে পুণ্যির কাজ!
‎​মিনারকে এই রূপে দেখেই মেহুলের ভয়ার্ত মুখটা এক সেকেন্ডে রাগে লাল হয়ে গেল। সে নিজের বুকের ওপর হাত রেখে ধকধক করতে থাকা হার্টটাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় এগিয়ে গিয়ে মিনারের পিঠ লক্ষ্য করে ধুমধাম কয়েকটা কিল বসিয়ে দিল!
‎​”অসভ্য, বাঁদর কোথাকার! তোর এই মাঝরাতের ফাজলামি কোনোদিন যাবে না, না? আর একটু হলে তো আমি হার্ট অ্যাটাক করে ওখানেই মরে যেতাম!” মেহুল দাঁত কিড়মিড় করে আরও একটা কিল তুলতে তুলতে বলল।

‎এদিকে কিল খেয়ে ​মিনার পিঠ চুলকাতে চুলকাতে ব্যালকনির রেলিঙে গিয়ে বসল। মুখে ব্যথার ভান করলেও তার চোখ-মুখের দুষ্টুমি তখনও একটুও কমেনি। সে হাসতে হাসতেই বলল, “আরে আরে, শান্ত হও বাঘিনী! সকালবেলা ওমন রানি ভিক্টোরিয়ার মতো আমার আরমান ভেপিকে চড় মারলে আর গাড়ি পুড়ালে, আর এখন একটা ছোট্ট জাম্পেই কেঁপে উঠলে? আমি তো ভাবলাম আমার ড্যাশিং বোনকে একটু স্পাইডারম্যান স্টাইলে এসে সারপ্রাইজ দেবো! কিন্তু…..!”
‎​মিনারের এই অদ্ভুত যুক্তি আর মুখের অদ্ভুত এক্সপ্রেশন দেখে মেহুল রাগ ধরে রাখতে পারল না। তার ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। মিনার সবসময়ই এমন—ভীষণ গম্ভীর আর থমথমে পরিবেশটাকেও সে নিজের এই পাগলামি দিয়ে এক নিমিষে হালকা করে দিতে পারে।
‎মিনারের সেই ফাজলামি আর পিঠ চুলকানির মাঝেই হঠাৎ করে মেহুলের রুমের দরজায় সশব্দে কড়াঘাত হলো—’খট খট খট!’
‎​নিঝুম রাতে এই আকস্মিক আওয়াজে দুই ভাইবোনই একটু থমকে গেল। মেহুল মিনারকে ইশারা করে বলল, ” এতো রাতে কে এলো? তুই এখানে বোস, আমি দেখে আসছি কে এলো।”

‎কিন্তু মিনার এক লাফে রেলিঙ থেকে নেমে মেহুলকে হাত দিয়ে আটকে দিল। চোখ টিপে ফিসফিস করে বলল, “আরে, তুই দাঁড়া! আমি যাই, দেখি কোন পেত্নী কড়া নাড়তাছে!”
‎বলেই ​মিনার ধীরপায়ে গিয়ে লকটা ঘুরিয়ে যেই না দরজাটা খুলল, অমনি সামনে দাঁড়ানো মানুষের চেহারা দেখে তার নিজেরই হাসির বাঁধ ভেঙে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে স্বয়ং ফরিদা! তবে তার মুখের ভঙ্গিটা দেখার মতো—নাক-মুখ কুঁচকে, চোখ ছোট ছোট করে সে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন দুনিয়ার সব তিতা করলার রস একসাথে গিলে এসেছে।
‎​মিনার ফরিদাকে এই রূপ দেখেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে অট্ট হাসিতে হেসে উঠে ফরিদার গালটা টেনে ধরে রসিকতার সুরে বলল, “ওরে আমার ফরিদা ডার্লিং যে! তা এই মাঝরাতে এভাবে ডায়নির মতোন চোখ মুখ কুঁচকাইয়া তাকাইয়া আছো ক্যা হে? রূপ কি একটু বেশিই ফাইটা পড়তাছে?”

‎​ফরিদা মিনারের হাতটা ঝটক দিয়ে সরিয়ে দিয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে মুখ বাঁকাল। আড়চোখে তাকিয়ে বলে উঠল, “ছ্যামড়া! সর তো দিকি, যত্তসব ঢং আর ন্যাকামি! তর এই ফ্যাচফ্যাচানি মার্কা ন্যাকামি আর ভালো লাগে না বাপু।”
‎​সে মেহুলের ঘরের দেয়াল ঘড়ির দিকে একবার চোখ গরম করে তাকিয়ে আবার মিনারের দিকে ঘুরল। কোমরে হাত দিয়ে ত্যাড়ছা গলায় বলল, “কয়টা বাজে খেয়াল আছে তর, হ্যাঁ? রাইত এহন দুইটা বাজে! আর তুই এই অসময়ে আমারে ঘুম থেইকা উঠাইয়া এইহানে আনাইছস? তা-ও আবার এই কয়লার মতো দেখতে কেক নিয়া?”
‎ফরিদার কথা শুনে মিনার শব্দ করে হেসে উঠল। সে ফরিদার হাতে ধরা ব্ল্যাক ফরেস্ট কেকের বক্সটি একরকম কেড়ে নিয়ে, ফরিদার দিকে তাকিয়ে চোখ মেরে বলল, “এটা কয়লা না ডার্লিং, এটা কেক! খাবা নাকি, হু?”
‎​ফরিদা আন্টি আবার নাক-মুখ কুঁচকে মুখ বাঁকাল, “আমনে খান বাপজান, যত্তসব! আমার ঘুম ধরছে। এরপরে যদি আমারে ডাইকা তুলছো বড় ভাইজানরে বিচার দিমু কইলাম।” বলেই সে আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে গজগজ করতে করতে রুমের সামনে থেকে চলে গেল।

‎​এদিকে মিনার ফরিদাকে জ্বালিয়ে চরম মজা পেয়ে হাসতে হাসতে মেহুলের রুমের দরজা আটকে ভেতরে ঢুকল। মেহুল মিনারকে মাঝরাতে কেক হাতে ব্যালকনির দিকে আসতে দেখে অবাক হয়ে বলল, “এত রাতে কেক কোথায় পেলি তুই?”
‎​মিনার ব্যালকনির ফ্লোরে ধপাস করে বসতে বসতে বলল, “আরে, রাতে আসার সময় তোর জন্যই এনেছিলাম। কিন্তু মা বলল তুই নাকি শুয়ে পড়েছিস, তাই ফ্রিজে রেখে দিয়েছিল। এখন তোর রুমের লাইট অন দেখে ফরিদা আন্টিকে একটু ভালোবেসে ডেকে আনিয়ে নিলাম আরকি!”
‎​মেহুল চোখ কপালে তুলে বলল, “এত রাতে তুই ফরিদা আন্টিকে ঘুম থেকে উঠিয়েছিস? উনি নিশ্চিত রেগে গিয়েছেন !”
‎মিনার হেসে কুটিপাটি হয়ে বলল, “রেগে মানে? বাপরে বাপ, সে কী ঝাড়ি! এতক্ষণ তো ওনার হাতের ঝাড়িই খেলাম।”
‎​মেহুলও না হেসে পারল না, “তুই পারিসও বটে! সারা বাড়িতে একমাত্র তুই-ই আছিস, যার সাথে ওনার চব্বিশ ঘণ্টা যুদ্ধ লেগেই থাকে।”

‎মিনার কেকের বক্স খুলতে খুলতে বলল, “আরে, ওনারে রাগাতে খুব মজা লাগে রে, হেব্বি বিনোদন! একটু কিছু বললেই শিং মাছের মতো লাফ দিয়ে উঠেন”
‎এদিকে ​ততক্ষণে মিনার কেকের একটা বড় পিস কেটে মেহুলের দিকে এগিয়ে দিল। কিন্তু মেহুলকে কেকটা না নিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে থাকতে দেখে মিনার ভ্রু কুঁচকে বলল, “কী হলো, খাচ্ছিস না কেন? তোর ফেভারেট দেখেই তো আনলাম। নে খা! কী ভাবছিস তুই এত?”
‎​মেহুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সকালে আরমানের বলা কথাগুলো ভাবছি মিনার। কোনোভাবেই কথাগুলো মস্তিষ্ক থেকে বের করতে পারছি না।”
‎​মিনার কেকের একটা চামচ মুখে পুরে দিয়ে বলল, “আরে ধুর! ওই দুশ্চরিত্র বেইমান ব্যাটা তো এখন পাগল হয়ে গেছে। ওর কথা মনে করে হুদাই টেনশন নিস না তো।”
‎​মেহুল রেলিং ধরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “না মিনার, আমার মনে হচ্ছে আরমান ভেতর ভেতর বড় কোনো চাল চালছে। কারণ সকালে যখন ও কথাগুলো বলছিল, আমি ওর চোখে এক ধরনের অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস দেখেছি। অন্য রকম কিছু একটা। ও আসলে কি করছে আমাদের সত্যিটা জানতে হবে।”
‎​মিনারের চিবানো থামল। সে কিছুটা চিন্তিত মুখ নিয়ে বলল, “তার মানে তুই বলছিস আরমান ব্যাটার ওপর নজর রাখতে হবে?”

‎মেহুল শুধু মিনারের দিকে তাকাল। তার চোখের ভাষাই বলে দিচ্ছিল, সে কতটা সিরিয়াস।
‎হঠাৎই ​ব্যালকনিতে কিছুক্ষণের জন্য এক নিথর নীরবতা নেমে এলো। একসময় নীরবতা ভেঙে মেহুল শান্ত গলায় বলল, “আরমান আমাদের কোম্পানি সম্পর্কে খুঁটিনাটি অনেক কিছুই জানে। কারণ বাবা ওকে নিজের হাতে তৈরি করেছেন, ব্যবসার সব মারপ্যাঁচ ওর নখদর্পণে।”
‎”হুম, তাহলে এখন কী করবি?” মিনার জিজ্ঞেস করল।
‎মেহুল শক্ত গলায় জবাব দিল, “অফিস থেকে আরমানকে চিরতরে সরাতে হবে। আর তার জায়গায় আমাদের পরিবারেরই অন্য কাউকে বসাতে হবে।”
‎​মেহুলের কথা শুনে মিনার প্লেটের বাকি কেকটুকু একবারে মুখে চালান করে দিল। তারপর গাল ভর্তি কেক নিয়ে মুখ নাড়তে নাড়তে বলে উঠল, “আমাদের পরিবারে আর কে আছে যে এই ধকল নিতে পারবে? আরমান ব্যাটা লোকটা যেমনই হোক না কেন, বিজনেসের লাইনে কিন্তু হেব্বি ট্যালেন্টেড! এটা মানতেই হবে।”
‎​মেহুল মিনারের কথা শুনলো কিন্তু কোনো কথা বলল না। সে নিজের শান্ত, স্থির দৃষ্টিটা মিনারের ওপরই নিবদ্ধ করল।
‎​মিনার তখনো সামনে তাকিয়ে মুখ নাড়ছিল বলে প্রথমে মেহুলের তাকানো খেয়াল করেনি। কিন্তু মেহুলকে হঠাৎ একদম চুপ হয়ে যেতে দেখে সে যেই না মেহুলের দিকে ঘাড় ঘুরাল, অমনি দেখল মেহুল পলকহীন চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। মিনার একটু থমকে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে? এভাবে দেখছিস কেন?’

‎ঠিক তখনই ​মেহুল মুচকি হেসে আলতো করে চোখের পলক ফেলল।
‎​ইশারাটা বুঝতেই মিনার বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা করে দ্রুত মুখের কেকটা গিলে চেঁচিয়ে উঠল, “একদম না! আমাকে এগুলোর মধ্যে জড়াবি না বলে দিলাম। আমি শান্তিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি দেখে তোর গায়ে লাগছে, তাই না? খবরদার! এসব ব্যবসা-ট্যাবসা আমার দ্বারা হবে না। খবরদার মার সামনে ভুলেও এই কথা তুলবি না, তাহলে আমার মাথা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে ওনি!”
‎মিনার থামতেই ​মেহুল অত্যন্ত ঠান্ডা আর শান্ত কণ্ঠে মিনারকে বলল, “একটু আগেই না তুই বললি আরমান খুবই ট্যালেন্টেড? কিন্তু আমার দৃষ্টিতে আরমানের চেয়ে আমার ভাই মিনার বেশি ট্যালেন্টেড। এমন কোনো কাজ নেই যা তুই পারিস না। আর আমার বিশ্বাস, আমাদের এই ব্যবসা তুই ছাড়া আর কেউ ভালোভাবে সামলাতে পারবে না।”
‎​মিনার এক ঝটকায় ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়াল। মেহুলের দিকে হাত জোড় করে মিনতি করার ভঙ্গিতে বলল, “ক্ষেমা দে মা আমাকে! পায়ে পড়ি, এগুলোর মধ্যে আমাকে প্লিজ জড়াস না।”

‎​মেহুলও উঠে দাঁড়িয়ে মিনারের মুখোমুখি হলো। অটল কণ্ঠে বলল, “আমি কোনো আপত্তি শুনতে চাই না মিনার। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি, আর আমি যা সিদ্ধান্ত নিই, তা করেই ছাড়ি—তা তো তুই ভালো করেই জানিস। আজ রাতটা তোকে সময় দিলাম, ভেবে দেখিস। এত বছর ধরে অনেকের অনেক কটু কথা তো শুনেছিস, হয়তো সময় এসেছে এবার সবাইকে যোগ্য জবাব দেওয়ার।”
‎​কথাটা বলতে বলতেই মেহুল মিনারকে ঠেলতে ঠেলতে রুমের দরজার দিকে নিয়ে এলো। দরজাটা খুলে মিনারকে বাইরে বের করে দিয়ে বলল, “আজ রাতটুকু ভাবার সময় দিলাম। আর হ্যাঁ, তোকে একটু পর ফোনে এক জনের নাম ঠিকানা পাঠাচ্ছি। ওর সম্পর্কে একটু খোঁজ নে। আশা করছি, ওর সাথে দেখা করলে আরমানের ব্যাপারে অনেক গোপন তথ্য আমরা জানতে পারব।”
‎​মিনার পাল্টা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মেহুল তার মুখের ওপর সপাটে দরজা বন্ধ করে দিল।
‎​মিনার চলে যাওয়ার পর মেহুল বিছানা থেকে নিজের মোবাইলটা তুলে নিল। গ্যালারি থেকে একটা ছবি সিলেক্ট করে মিনারের নাম্বারে একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়ে দিল।

‎​সব কাজ শেষ করে মেহুল আবারও ব্যালকনিতে ফিরে এলো। তার কেকের অংশটুকু তখনো ফ্লোরে পরে আছে। মেহুল গিয়ে ফ্লোর থেকে কেকের প্লেটটা তুলে নিয়ে যখন ঘরের দিকে ফিরতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখ গেল বাড়ির সীমানার বাইরে—ইট-সিমেন্টের তৈরি সুনসান রাস্তাটার ওপর।
‎​রাত তখন আড়াইটা পার হয়ে গেছে। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় রাস্তাটা কোনোমতে দৃশ্যমান। আর সেই অস্পষ্ট আলো-ছায়ার মাঝেই মেহুল দেখল, রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে! মেয়েটার কোলে একটা ছোট বাচ্চা। মেয়েটির দৃষ্টি যেন সোজা মেহুলের ব্যালকনির দিকে।
‎​এত গভীর রাতে, একটা অচেনা মেয়েকে কোলে বাচ্চা নিয়ে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে হঠাৎ মেহুলের হাত কেঁপে উঠল। হঠাৎই তার হাত থেকে কেকের প্লেটটা সশব্দে ফ্লোরে পড়ে গেল।
‎​প্লেটটা পড়ার আওয়াজে মেহুল এক মুহূর্তের জন্য চমকে নিচের দিকে তাকাল। আর পরমুহূর্তেই যখন সে আবারও রাস্তার দিকে তাকাল, তখন দেখল—সেখানে কেউ নেই! রাস্তাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। মেয়েটা যেন এক পলকে হাওয়ার মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল!

‎​মেহুল চোখ রগড়ে অন্ধকারের মাঝে এদিক-সেদিক তন্নতন্ন করে খোঁজার চেষ্টা করল, কিন্তু কোথাও কোনো মানুষের চিহ্ন দেখতে পেল না। নিঝুম রাতের এই অদ্ভুত ও গা ছমছমে কাণ্ডে মেহুলের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা ভয়ের স্রোত বয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও ব্যালকনির খোলা বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস করলো না। তাই দ্রুত ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে স্লাইডিং দরজাটা শক্ত করে লক করে দিল।
‎​ঘরের ভেতরের চেনা আলোয় এসে সে যখন বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং কম্বলটা গায়ের ওপর টেনে নিল। আরমানের রহস্যময় কথা, মিনারের ভবিষ্যৎ আর এই মাঝরাতের রহস্যময়ী মেয়ে—সবমিলিয়ে এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় মাথাটা ঝিমঝিম করতে করতেই মেহুল একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

‎​বাংলাদেশের ঘড়িতে যখন গভীর রাত ঠিক তখন সিঙ্গাপুরের সময় ভোর রাত ৪:০০ টা।
‎​সিঙ্গাপুরের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশ্ববিখ্যাত আলিশান হোটেলের রাজকীয় ভিআইপি স্যুট। পুরো রুমের প্রতিটি কোণ যেন আভিজাত্য আর আধুনিকতার এক অনবদ্য মিশেল। চোখধাঁধানো ঝাড়বাতি আর দামি আসবাবে সাজানো সেই নিস্তব্ধ রুমে এক অন্যরকম গাম্ভীর্য বিরাজ করছে।
‎​রুমের বিশাল এলইডি টিভির সামনে আয়েশ করে বসে আছে এক অত্যন্ত সুদর্শন ও পুরুষালী চেহারার যুবক। তার চুলে মেসি টেক্সচার্ড লং লেয়ার্ড কাট দেওয়া। ডান হাতের ফর্সা আঙুলে জ্বলজ্বল করছে একটি খাঁটি রূপার আংটি, আর কবজিতে জড়ানো একই ধাতুর একটি ব্রেসলেট। দুই আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত দামি ব্যান্ডের সিগারেট থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উড়ছে আকাশে। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে টিভির পর্দায় ভেসে ওঠা আন্তর্জাতিক খবরের দিকে তাকিয়ে আছে।

‎​তার ঠিক পাশেই সোফায় বসে আছে ধ্রুব সালমানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং ব্যক্তিগত সেক্রেটারি। ধ্রুব বেশ কিছুক্ষণ ধরে কোলে রাখা স্তূপীকৃত ফাইলগুলো এক এক করে ঘেঁটে, বিভিন্ন কোম্পানির নতুন বিজনেসের প্রপোজালগুলো সালমানকে পড়ে শোনাচ্ছে। সালমান টিভির পর্দা থেকে চোখ না সরিয়েই অত্যন্ত নিস্পৃহভাবে তা শুনে চলেছে।
‎​ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা সালমানের আইফোনটি তীব্র কম্পনে বেজে উঠল।
‎​সালমান ধীরভঙ্গিতে টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ভেসে উঠল তার খাস লোক ‘ছোটন’-এর নাম।

‎কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ছোটনের অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো:
‎​”ভাই… পুরো সিলেট আমরা তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফেলেছি। এমন কোনো এলাকা, এমন কোনো ছোট গলি বা বাড়ি বাকি নেই যেখানে আমরা ভাবিকে খুঁজিনি। এত খোঁজার পরও ওনার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না ভাই! বিগত পাঁচ বছরে এই নিয়ে আমরা অন্তত ৫০ বারের ওপর ভাবিকে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেছি, কিন্তু প্রতিবারই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। আমার তো এখন মনে হয় ভাই, ভাবি হয়তো সিলেটের স্থায়ী বাসিন্দা কখনোই ছিলেন না। অন্য কোনো এলাকা বা অন্য কোনো শহর থেকে ভাবি সাময়িকভাবে সিলেটে এসেছিলেন।”

‎​ছোটনের কথা শেষ হওয়া মাত্রই সালমানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে ঠোঁটের কোণের সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে পিষে নিভিয়ে দিল। অতঃপর পুরো রুমে তার সেই চাবুকের মতো গুরুগম্ভীর ও শীতল কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত করে বলল:
‎​”‘না’ শব্দটা শোনা আমার একদম পছন্দ নয় ছোটন, তা তুই খুব ভালো করেই জানিস। সিলেটে পাওয়া যায়নি তো কী হয়েছে? দরকার পড়লে পুরো বাংলাদেশ ইঞ্চি ইঞ্চি করে খুঁজে ওকে আমার সামনে এনে দাঁড় করা!”
‎​ওপাশ থেকে ছোটন ভয়ে ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “জি ভাই, আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
‎​অতঃপর ওপাশ থেকে কলটা কেটে গেল। ফোনটা সোফায় ছুড়ে ফেলে সালমান ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। তার পরনে থাকা ট্রাউজারের পকেটে হাত দিয়ে সে এগিয়ে গেল হোটেলের সেই সুবিশাল কাচের দেয়ালের সামনে, যেখান থেকে পুরো সিঙ্গাপুর শহরের রাতের আলো এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে।
‎অতঃপর ​সালমান পকেট থেকে তার চামড়ার কালো মানিব্যাগটি বের করল। অত্যন্ত সযত্নে সেটির ভেতর থেকে একটি পুরনো, কিছুটা বিবর্ণ হয়ে আসা ছবি চোখের সামনে তুলে ধরল।
‎​ছবিটি মেহুলের। ইন্টার পাস করার পর, সেই কৈশোর আর বয়ঃসন্ধিকালের মাঝামাঝি সময়ের মেহুল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে—দুপাশে দুটো কিউট বিনুনি করা, পরনে সাধারণ সালোয়ার-কামিজ। অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখে মেহুল একটি মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে দূরের কোনো দিকে তাকিয়ে মনখোলা হাসি হাসছে। সেই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল এক স্বর্গীয় পবিত্রতা।

‎​সালমান অপলক দৃষ্টিতে ছবিটির ওপর নিজের আঙুল বোলাল। তার চোখের কোণে তখন তীব্র অধিকারবোধ আর ব্যাকুলতার আগুন। সে জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল:
‎​”পাঁচ বছর… দীর্ঘ পাঁচ-পাঁচটি বছর ধরে তোমাকে পৃথিবীর বুকে খুঁজে চলেছি। কোথায় লুকিয়ে আছ তুমি? আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছ, তাই তো? নাও, আমিও দেখি আর কতদিন তুমি আমার চোখ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারো! সময় এখন তোমার কিন্তু যেদিন আমার নজরের সীমানায় তোমাকে একবার শুধু দেখতে পাব, ঠিক সেদিনই এই সালমান শাহ নেওয়াজ তোমাকে চিরতরে নিজের করে ছিনিয়ে নেবে, হরিণী!”

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৪

‎​সে ছবিটা বুকের কাছে চেপে ধরে জানালার বাইরে দূর আকাশের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে তখন এক অটল প্রতিজ্ঞা:
‎​”শুধু এবার তোমাকে খুঁজে পাওয়ার পালা। খুব শীঘ্রই আমাদের দেখা হচ্ছে…..!”

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৫