Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৬

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৬

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৬
‎আফীফা আফনান

‎গুররর… গুররর… গুররর…
‎ওয়াশরুমের থমথমে, আর্দ্র পরিবেশের নীরবতা চিরে হঠাৎ বেজে উঠল মোবাইলের ভাইব্রেশনের গুররর গুররর শব্দ। কমোডের ওপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে থাকা মেহুল ধীরে ধীরে মাথাটা তুলল। লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটি মুছে, কাঁপাকাঁপা হাতে হোয়াইট অ্যাপ্রনের পকেট থেকে ভাইব্রেশন মোডে কাঁপতে থাকা মোবাইলটা বের করে সামনে ধরল। দেখলো স্ক্রিনের ওপর মিনার নামটা স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে।
‎​মেহুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে মিনারের তাড়া দেওয়া ফাজিল কণ্ঠ ভেসে এলো—
‎”সিস্টার, রুমের দরজা লক করে ভেতরে কী করছিস? কখন থেকে তোর দরজায় তবলা বাজাচ্ছি, খুলছিস না কেন?”

‎​মেহুল চমকে উঠে প্রশ্ন করল, “তুই হসপিটালে এসেছিস?”
‎​”জি, আমি হসপিটালে এবং সশরীরে আপনার কেবিনের দরজার সামনেই দণ্ডায়মান! তাই দয়া করে দরজাটা খুলে আমাকে একটু উপকৃত করুন ম্যাডাম!” পরক্ষনেইওপাশ থেকে আদেশের সুরে একটু তাড়া দিয়ে মিনার আবার বলল, “তাড়াতাড়ি কর, তোর সাথে ইম্পর্টেন্ট একটা কথা আছে!”
‎​কথাটা শুনেই মেহুল আর দেরি করল না। কমোডের ওপর থেকে ঝটপট উঠে দাঁড়াল। ওয়াশরুমের বেসিনের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই নিজের ফোলা চোখ আর বিষণ্ণ মুখটা নজরে এলো। সে চটজলদি মাথার এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে একটু ঠিকঠাক করে নিল, তারপর পানির ট্যাপটা ছেড়ে দিয়ে মুখে পরপর কয়েকটা কড়া পানির ঝাপটা দিল। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার ব্যর্থ চেষ্টা করল সে। ঠোঁটের কোণে জোর করে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল, যাতে তার এই ভাঙাচোরা রূপটা মিনারের ধারালো চোখ এড়াতে পারে।
‎অতঃপর ​দ্রুত ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে মেহুল গিয়ে রুমের লকিং হাতলটা ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই—বাহির থেকে মিনার প্রায় হাওয়া বেগে হুড়মুড় করে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল!

‎​মেহুলকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই মিনার সোজা গিয়ে বসলো মেহুলের পেছানো রিভলভিং চেয়ারটায়। এরপর টেবিলের ওপর রাখা স্ট্রেথোস্কোপটা তুলে নিয়ে একদম বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ভঙ্গিতে নিজের গলায় ঝুলাল। চেয়ারটা দু-একবার গোল গোল ঘুরিয়ে, মেহুলের জিড়ো পাওয়ার চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে একদম গাম্ভীর্যের ভাব নিয়ে বসে পড়ল! এদিকে
‎​মিনারের এমন ঢং আর ডাক্তারের মতো পোজ দেওয়া দেখে মেহুল রিতিমতো তার কপাল কুঁচকে নিলো।
‎”তুই এখন এই সময় এখানে? আজ থেকে না তোর অফিসে জাওয়ার করার কথা ছিল?”—মেহুল দুই হাত বুকে বেঁধে মিনারের ফাজিলিয়াত দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল।
‎​মিনার গলার চারপাশে ঝুলানো স্ট্রেথোস্কোপটা এক হাত দিয়ে ভাব নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে, এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে রাজকীয় ভঙ্গিতে বলল, “যাব তো! এত তাড়া কিসের?”
‎মিনারের এমন কথাতে ​মেহুল তার বাম হাতের ঘড়িটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “একটু পরেই দুপুর হয়ে যাবে, আর তুই এখন অফিসে যাওয়ার কথা বলছিস? আজকে না অফিসে ইম্পর্টেন্ট মিটিং ছিল? বাবা তো বলল আজ মিটিংয়ে বোর্ডের সবার সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে তোর পরিচয় করিয়ে দেবে। তো অফিসে না গিয়ে এখানে আমার ঘাড়ে এসে উঠলি কেন?”

‎​মেহুলের একের পর এক জেরা শুনে মিনার একগাল হেসে নাক-মুখ কুঁচকে নিল। তারপর গলার স্ট্রেথোস্কোপটা দিয়ে মেহুলের দিকে নির্দেশ করে বলল, “ভাইরে ভাই! এ সময় এখানে এসেছি তার মানে নিশ্চয়ই কোনো কাজে এসেছি, শুধু শুধু এই অসময়ে তোর বিদঘুটে চেহারাটা দেখতে তো আর এতদূর আসিনি? তোর উইজডম আর কমনসেন্সগুলো কি ওয়াশরুমের বদনাতে রেখে এসেছিস নাকি?”
‎​”একদম ফালতু কথা বলবি না মিনার!” মেহুল চোখ পাকিয়ে হুমকি দিল, “ঝটপট বল কেন এসেছিস? আমাকে আবার গাইনি ওয়ার্ডের রাউন্ডে যেতে হবে।”
‎​মেহুলের তাড়া দেওয়ার কথা শুনে মিনারের মুখের ঢং আর হাসির রেখা মুহূর্তেই উবে গেল। তার চেহারায় ফিরে এলো সেই তীক্ষ্ণ আর চতুর গম্ভীর ভাব। মিনার আলতো ইশারায় সামনের খালি চেয়ারটা দেখিয়ে মেহুলকে বসার ইঙ্গিত করল।
‎​মেহুল মিনারের চোখের ইশারা আর সিরিয়াস লুকটা দেখেই বুঝে গেল—বিষয়টা সাধারণ কিছু নয়। তাই সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মিনারের মুখোমুখি খালি চেয়ারটায় বসে পড়ল। ব্যাকুল গলায় বলল, “এবার তো বল, কী এমন জরুরি কথা বলতে হসপিটালে ছুটে এসেছিস?”

‎​মিনার মেহুলের দিকে আরেকটু ঝুঁকে এলো। গলাটা একধাপ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “একটা গরম একদম তাজা আর ইম্পর্টেন্ট ইনফরমেশন পেয়েছি সিস্টার!”
‎​মেহুলের ভ্রু কুঁচকে গেল, “কিসের ইনফরমেশন?”
‎​মিনার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল, “কোম্পানির নতুন যে জায়ান্ট প্রোডাক্টটা লঞ্চ হচ্ছে, যার ক্রুশিয়াল ডিল মিটিং আজ সকালে ফাইনাল হওয়ার কথা ছিল… সেই ক্লায়েন্ট হঠাৎ কিছু পার্সোনাল কজের জন্য মিটিংটা সকালে না করে দুপুরে পিছিয়ে দিয়েছেন! সো, ডিলটা এখনো সাইন হয়নি।
‎”হুম তো এটাতে কি এমন আহামরি ইনফরমেশন হলো। মিটিং হয়নি হবে এখন না হোক দু ঘন্টা পরে হবে।”
‎”মেহুলকে কথার মাঝে কথা বলতে দেখে মিনার তাকে থামিয়ে আবারও বললো, “কিন্তু আসল ধামাকা তো এটা নয় , আসল ধামাকা হচ্ছে আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় আরমান ভাইয়া এই ডিল মিটিংয়ে ক্লায়েন্টদের ইমপ্রেস করতে আর তোকে ও আঙ্কেল-কে হেয় করতে একটা মাস্টারপ্ল্যান বানিয়েছে!”

‎​”কীসের মাস্টারপ্ল্যান?” মেহুল উৎসুক চোখে তাকাল।
‎​মিনার এবার একটা অট্টহাসি চেপে মুখ সোজা করে বলল, “আমাদের আরমান সাহেবের প্রজেক্টের মেইন ফিমেল মডেল নাকি শেষ মুহূর্তে ভেগে গেছে! আর সেই জায়গায় ডিল মিটিংয়ে আমাদের কূলবধূ, মানে আনিকাকে একবারে রাজকীয় স্টাইলে প্রধান মডেল বানিয়ে শুটে নামানো হচ্ছে! আরমান তার নতুন বউকে স্ক্রিনে গ্ল্যামারাস মডেলে রূপান্তর করে পুরো বোর্ডের সামনে হিরো সাজতে যাচ্ছে সিস্টার! আর যার শুট ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গিয়েছে!”—মিনার কথাটা শেষ করে মেহুলের দিকে চেয়ে এক গা-জ্বালানো হাসি দিল।
‎​মেহুল সামান্য অবাক হয়ে মিনারের দিকে চোখ সরু করে তাকাল। ভ্রু জোড়া কিছুটা কুঁচকে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তুই এই খবর জানলি কীভাবে? আরমান তো গোপনীয়তা বজায় রেখে এসব শয়তানি কাজ করার কথা!”

‎​মিনার এবার একদম হিরোদের মতো কায়দা করে চুলে হাত চালাল। নিজের শার্টের কলারটা একটু সোজা করে, বেশ স্টাইল মেরে বলে উঠল—
‎​”কোম্পানিতে আরমান বেটার ঘনিষ্ঠ কিছু চাটুকার আর চামচা যেমন গুটি চালছে, ঠিক তেমনি তোর এই ভাইটারও তো কিছু বিশ্বস্ত ভাই-ব্রাদার আছে রে সিস্টার! হেড অফিসের ইনসাইড ইনফরমেশন বের করা আমার জন্য ডাল-ভাত! তোর ভাইটা আর যাই হোক, এতটা আকাম্মা নয়, বুঝলি তো?”
‎​মিনার এক চোখ টিপ মেরে ঠোঁটের কোণে এমনভাবে হাসল যেন সে কোনো মহা মিশন জয় করে এসেছে!
‎​মেহুল তার ভাইয়ের এই ভাবসাব দেখে নিজের মনের সমস্ত ভার ভুলে মৃদু হেসে ফেলল। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখের মণি দুটো আবার বরফের মতো ঠান্ডা ও ধারালো হয়ে উঠল। আরমান আর আনিকা মিলে তবে আজ এই নতুন চাল চেলেছে! প্রজেক্টের বাজেট আর ফান্ড নিয়ে ছিনিমিনি খেলার জন্য আনিকাকে এখন ‘মডেল’ বানিয়ে সামনে দাঁড় করানো হচ্ছে!

‎​মেহুল নিজের চেয়ারে আরেকটু সোজা হয়ে বসল। হাতের আঙুলগুলো টেবিলের ওপর ছন্দে ছন্দে বাজাতে বাজাতে বলল, “বাহ্‌! আরমান ভাইয়া আর আনিকা ম্যাডামের নাটক তো বেশ জমে উঠেছে তাহলে! মডেলিংয়ের শখ আর জালিয়াতির মাস্টারপ্ল্যান… এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা!”
‎​মিনার তার গলার স্ট্রেথোস্কোপটা টেবিলের ওপর রেখে গম্ভীর গলায় বলল, “এখন বল মেহুল, কী করবি? মিটিং কিন্তু দুপুরেই, আর শুটও অর্ধেক শেষ! আঙ্কেল কিন্তু এখনো কিছু জানে না বলতে গেলে ব্যবসায় একদম অন্ধের মতো আরমানকে বিশ্বাস করে বসে আছেন। আজ যদি প্রজেক্টের ডিলটা একবার সাইন হয়ে যায় আর কোনমতে যদি ফান্ডটা ঘুরে আরমানের ওউ বেনামী অ্যাকাউন্টে চলে যায়, তবে আঙ্কেলের ব্যবসাকে রাস্তায় বসা থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না !”
‎”আমাদের কিছু করতে হবে,আর আজই করতে হবে মিনার খুব দ্রুত!
‎নক… নক…

‎কথোপকোথনের ​মাঝে হঠাৎ দরজায় আলতো করাঘাত হতেই মিনার আর মেহুল দুজনেই ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল। অতঃপর কোন পেশেন্ট এসেছে ধরেই মেহুল বেশ স্পষ্ট গলায় বলল, “ভেতরে আসুন!”
‎​কথাটা শেষ হতেই দরজা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিলেন ত্রিশ, বত্রিশ বছর বয়সের এক মহিলা। ওনার কোলে বছর ছয়ের একটা রোগা-পাতলা বাচ্চা ছেলে। মেহুল অমায়িক গলায় বলে উঠল, “জি, বলুন?”
‎​মহিলাটি একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে রুমে প্রবেশ করলেন এবং মেহুলের ঠিক পাশেই রাখা খালি চেয়ারটায় বসলেন। তবে চেয়ারে বসেই তিনি আসল ডাক্তার মেহুলকে উপেক্ষা করে, গলায় স্ট্রেথোস্কোপ ঝুলিয়ে ডাক্তারের চেয়ারে আয়েশ করে বসে থাকা মিনারের দিকে তাকালেন! পরম বিশ্বাস নিয়ে মিনারকেই ডাক্তার ভেবে অত্যন্ত বিনীত ভাষায় নিজেদের কষ্টের কথা বলতে শুরু করলেন—
‎​”ডাক্তার সাহেব, আমি খুব সমস্যায় পড়ে আপনার কাছে এসেছি। বেশ কিছুদিন ধরে শরীরটা একদম ভালো যাচ্ছে না। প্রেসারটা সবসময় অনেক হাই থাকে, তার ওপর রাতে একদম ঘুম হতে চায় না। সেই সাথে কিছু প্রসূতি ও নারীঘটিত জটিলতাও দেখা দিয়েছে… কী যে করি বুঝতে পারছি না!”

‎​এদিকে মিনারের অবস্থা তখন দেখার মতো! গলায় ঝুলানো স্ট্রেথোস্কোপ আর ডাক্তারের চেয়ারে বসে থাকার কাণ্ড যে এভাবে হিতে বিপরীত হবে সে ভাবতেই পারেনি। মিনার এক চরম অসহায় আর করুণ মুখ বানিয়ে পাশে মেহুলের দিকে তাকাল। আর মেহুল? সে তখন ভেতরের সব হাসিকে ঠোঁট টিপে চেপে রেখে মিনারের এই দুর্গতি দারুণ উপভোগ করছে!
‎এদিকে রোগীকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে একসময় ​মিনার গলা ঝেড়ে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আকুল গলায় বলল, “ইয়ে মানে… মিস, আসলে আমি ডাক্তার নই! আপনার পাশে যিনি বসে আছেন, উনিই আসল ডাক্তার। আপনার যা যা সমস্যা, উনাকে বলুন!”
‎​মহিলাটি কিছুটা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে মেহুলের দিকে তাকালো। তারপর আবার মিনারকে দেখে একটু খটকা নিয়ে বলে উঠলো, “তাহলে আপনি ওখানে কেন বসে আছেন?”
‎​কথাটা শুনেই মেহুল আর হাসি ধরে রাখতে পারল না, হালকা হেসে পাশ থেকে বুঝিয়ে বলল, “আসলে ও আমার ভাই। আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল তো, তাই আমিই ওকে ওখানে বসতে বলেছি। আপনি একদম চিন্তা করবেন না, আপনার যা যা কষ্ট বা সমস্যা, আমাকে বলুন।”

‎​মহিলাটি এবার আশ্বস্ত হয়ে একে একে তার শারীরিক সমস্যাগুলোর কথা মেহুলকে বিশদভাবে বলতে শুরু করলো। মেহুল মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনল, প্রেসারটা মেপে দেখে একটা কাগজে সুন্দর করে প্রেসক্রিপশন লিখে দিল।
‎​চিকিৎসাপত্রটি হাতে নিয়ে মহিলাটি সেটির দিকে বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তারপর বেশ দ্বিধা নিয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “ম্যাডাম, এখানে লেখা সব ওষুধগুলো কি হসপিটাল থেকে ফ্রিতে পাওয়া যাবে?”
‎​মেহুল আর মিনার দুজনেই এক মুহূর্তের জন্য মহিলাটির নিরীহ মুখের দিকে তাকাল। মেহুল একটা মায়াবী মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল, “কয়েকটা ওষুধ আপনি নিচের সরকারি ফার্মেসি থেকে একদম ফ্রিতেই পেয়ে যাবেন। তবে একটা জরুরি ওষুধ আর ইনজেকশন আপনাকে একটু কষ্ট করে বাহিরের দোকান থেকে কিনে নিতে হবে।”

‎তৎক্ষনাত ​মহিলাটির চোখে-মুখে শঙ্কা জেগে উঠল, তিনি ধীর গলায় শুধালেন, “কত টাকার মতো খরচ হতে পারে ডাক্তার ম্যাডাম?”
‎​”এইতো… হাজার পনেরশো টাকার মতো, হয়তো একটু বেশিও হতে পারে বা আরেকটু কম এমন,” মেহুল সহানুভূতির সাথে উত্তর দিল।
‎​’হাজার পনেরশো’ শব্দটা শুনতেই যেন মহিলাটির পুরো চোখ-মুখ এক লহমায় ফ্যাকাসে আর উদাস হয়ে গেল! বুক চিরে একটা নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো তার। সে চরম ইতস্তত করে খুব নিচু গলায় মেহুলকে বলল, “ম্যাডাম, ওষুধটা কি এখনই খেতেই হবে? একটু পরে বা আগামী মাসে কিনলে কি চলবে না?”
‎​মেহুল নরম সুরে বোঝাতে চাইল, “পরে খেলেও চলবে না তা নয় ম্যাম, কিন্তু এতদিন যে আপনার এই কষ্টটা সহ্য করতে হবে! এখন কিনে নিলে আপনার এই শারীরিক সমস্যা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ হবে। আপনি কিছুটা স্বস্তি পাবেন।”

‎​মেহুলের এই সত্যি কথাটা শুনে মহিলাটির চেহারা আরও মলিন আর করুণ হয়ে উঠল। কোলে থাকা সন্তানটিকে এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরে, চোখ দুটো অপরাধীর মতো নিচু করে তিনি বলে উঠলেন—
‎​”আসলে ম্যাডাম… আমার কাছে এখন মাত্র ৫০০ টাকা আছে। এই টাকা দিয়েই আমাকে এই পুরো মাসের বাকি দিনগুলো পার করতে হবে।”
‎​মহিলাটির এই একটি বাক্যে ঘরের ভেতরের পরিবেশটা মুহূর্তে যেন এক ভারী ও করুণ স্তব্ধতায় রূপ নিল! মিনার আর মেহুল নীরব দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকাল।
‎ঠিক তখনই মহিলা আবারও বললেন, “এই টাকা দিয়ে আমি নিজের ওষুধ কিনব, নাকি বাচ্চার খাবার আর নাকি বাকি মাসের বাজার করব?”—বলেই মহিলাটির কণ্ঠ ধরে এলো, চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।
‎​কথাটা শুনে মিনার আর স্থির থাকতে পারল না। কিছুটা অবাক আর ব্যথিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন ? আপনার হাজবেন্ড কোথায়? উনি কি কোনো কাজ-কম করেন না?”
‎​মহিলাটি একটা বিষাদের তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো। দৃষ্টিটা মেঝের দিকে নিবদ্ধ রেখে বললো, “হাজবেন্ড ছিল… তবে এখন আর নেই।”
‎​কথাটার মর্মার্থ বুঝতে পেরে মিনার আর মেহুল দুজনেই একটু লজ্জিত ও ব্যথিত হলো। মিনার অপরাধবোধ থেকে দ্রুত বলে উঠল, “ওহ, রিয়েলি সরি… আমরা আসলে বুঝতে পারিনি।”

‎​”নাহ নাহ, উনি মারা যাননি!” মহিলাটি হুট করেই একরাশ তিতা ক্ষোভ নিয়ে বলে উঠলেন, “আমাকে ডিভোর্স দিয়েছেন। দুটো বাচ্চা হওয়ার পর নাকি আমি মোটা হয়ে গেছি, চেহারা নষ্ট হয়ে গেছে… ওনার চোখে নাকি আমাকে আর আগের মতো সুন্দর লাগে না! তাই নিজ অফিসের এক কচি মেয়ের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন।”
‎​কথাগুলো শোনামাত্রই মেহুলের বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে কেঁপে উঠল! মেহুলের স্মৃতিপটে ধপ করে ভেসে উঠল সেই অভিশপ্ত বিয়ের দিনের কথা। আরমানও তো তাকে ঠিক এই কথাগুলোই বলে আঘাত করেছিল! আরমান বলেছিল—মেহুল নাকি মোটা হয়ে গেছে, দেখতে কদাকার লাগে, আর সবচেয়ে বড় কথা তার নাকি মেহুলকে নিয়ে সবার সামনে যেতে লজ্জা করে।
‎​মেহুলের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। কিন্তু এক মুহূর্ত পর সে চমকে উঠল এক অদ্ভুত হিসাব মেলাতে গিয়ে—মেহুলের না হয় সন্তান হবে না বলে আরমান চলে গেছে, কিন্তু এই মহিলাটি তো দুটি সন্তানের মা! তাও তাকে একই অপবাদ দিয়ে ফেলে দেওয়া হলো?
‎​মেহুল নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনার দুটো বাচ্চা আছে… তাও আপনাকে ছেড়ে দিল? বাচ্চাদের আকুতি, ওদের ভবিষ্যতের কথাও কি লোকটার একবার মনে পড়ল না?”

‎​মহিলাটি একফালি তেতো হাসি হেসে উত্তর দিলেন, “ছেড়ে যাওয়ার মানুষের আসলে ছেড়ে যাওয়ার সময় কাউকে মনে থাকে না ম্যাডাম! স্বার্থপরের কাছে সন্তানের মায়াও তুচ্ছ।”
‎​মিনার এবার গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করল, “আপনাকে আমি কোথাও যেন দেখেছি? কেমন যেন চেনা লাগছে আচ্ছা আপনার হাজবেন্ড কোথায় জব করেন একটু বলুন তো?”
‎​মহিলাটি ওড়নার খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছে শান্ত গলায় বললো, “শিকদার এন্টারপ্রাইজে।
‎ এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার হিসেবে আছেন।”
‎​”কী বললেন?!”—মেহুল আর মিনার দুজনেই যেন একযোগে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল!
‎​মিনার চেয়ার থেকে কিছুটা ঝুঁকে এসে তীব্র কৌতূহল নিয়ে জেরা করতে শুরু করল, “আপনি সিওর তো? শিকদার এন্টারপ্রাইজেই উনি কাজ করেন?”

‎​”জি, একদম সিওর। কারন এই চাকরির কতো দম্ভ তার!”
‎​মিনারের মনের কোণে একটা পরিচিত নাম খটকা মারল। সে কিছুটা দ্বিধা আর বিস্ময় নিয়ে শুধাল, “আচ্ছা, আপনার হাজবেন্ডের নাম কি আলতাফ মাহমুদ ইমন?”
‎হটাৎ মিনারের প্রশ্ন শুনে ​মহিলাটি তাজ্জব হয়ে মিনারের দিকে তাকালো, “জি! জি! আলতাফ মাহমুদ ইমন! কিন্তু আপনি কীভাবে চিনলেন ওনাকে?”
‎​মিনার এবার শব্দ করে হেসে উঠলো হাসতে হাসতেই বলল, “চিনি চিনি! খুব ভালো করেই চিনি। ওনাকে চিনবো না। তা আমরা তো জানতাম আলতাফ ভাই শহরের কোন এক উঠতি মডেলকে নাকি বিয়ে করেছিল! তও ভালোবেসে, লাভ ম্যারেজ! কী যেন নাম ছিল… হে হে শ্রাবণী? তারমানে… আপনিই কি সেই শ্রাবণী?”
‎​মহিলাটি বিষাদমাখা চোখে মাথা নেড়ে বললেন, “জি, আমিই সেই শ্রাবণী। একসময় আমি মডেলিং করতাম ঠিকই। কিন্তু বাচ্চা হওয়ার পর সংসার আর ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে ক্যারিয়ার ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনারা আমাকে আর আমার হাজবেন্ডকে এভাবে কীভাবে চেনেন?”

‎​ঠিক তখনই মেহুল ধীরেসুস্থে এগিয়ে এলো। শ্রাবণীর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “কারণ, উনি যে অফিসে চাকরি করেন—সেই ‘শিকদার এন্টারপ্রাইজ’ আমাদেরই পারিবারিক প্রতিষ্ঠান।”
‎​শ্রাবণী কথাটা শুনে একদম স্তব্ধ হয়ে গেলো! তার মুখ থেকে আর কোনো শব্দ ফুটল না। কারন শিকদার পরিবারের মালিকদের সামনে এভাবে নিজের করুণ পরিস্থিতি প্রকাশ হয়ে পড়বে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি।
‎​ঠিক তখনই মেহুলের চটপটে মগজে যেন এক চমকপ্রদ বুদ্ধির আলো খেলে গেল! সে হঠাৎ মিনারের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক মারাত্মক চতুর আর বিষাক্ত হাসি ফুটাল। মিনার প্রথমে মেহুলের এই আচমকা হাসির অর্থ বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
‎অতঃপর বিভ্রান্তে থাকা​ মিনারকে উপেক্ষা করে মেহুল আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে সোজা শ্রাবণীর দিকে ফিরে অত্যন্ত গম্ভীর ও গুরুত্বের সাথে বলল, “মিস শ্রাবণী… আপনি কি আবার নিজের ক্যারিয়ারে ফিরতে চান? যদি সুযোগ পান তাহলে কি আরো একবার আপনি মডেলিং করবেন?

‎”আমাকে এখন কে দেবে কাজ মেডাম, এখন তো কতোশক নতুন মডেল আছে। আর আমাকে চেনেই বা ক’জন যে আসাকে যেচে পরে কাজে ডাকবে? তার ওপড় আমার বাচ্চা আছে।”
‎”আমি দেব!আমি আপনাকে একটি কাজ দিতে চাই। যদি আপনার আপত্তি না থাকে।” মেহুল বলে উঠলো।
‎​শ্রাবণী একদম নিস্তব্ধ হয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে রইলো। কাজ? এই মুহূর্তে তার জন্য কাজ মানে বেঁচে থাকার একমাত্র আলো! তিনি এক পলক নিজের কোলের সেই অসহায় বাচ্চাটার মুখটার দিকে তাকালেন, তারপর মেহুলের দিকে ফিরে বুকভরা সাহস নিয়ে বললেন, “আপনি আমাকে যে কাজই দেবেন, আমি করব ম্যাডাম! যেকোনো কাজ! আমার নিজের জন্য আর আমার দুটো নিষ্পাপ বাচ্চার জন্য আমাকে লড়তেই হবে।”
‎অতঃপর ​মেহুলের ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার আরও ধারালো হয়ে উঠল। আরমানের সাজানো নতুন মডেলিং প্রজেক্ট আর ক্ষমতার চক্রান্ত চুরমার করে দিতে শ্রাবণীই যে তার গোপন তুরুপের তাস হতে যাচ্ছেন, তা মেহুলের এই রাজকীয় চোখ দুটো স্পষ্ট বলে দিচ্ছে!

‎‘শিকদার এন্টারপ্রাইজ’—শহরের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও প্রাচীন বিজনেস সাম্রাজ্য। বহু বছর ধরে জাফর ইকবাল শিকদারের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম, সততা আর নিখুঁত পরিকল্পনায় তিল তিল করে গড়ে উঠেছে এই প্রতিষ্ঠান। কত শত পরিবারের রুটি-রুজির একমাত্র অবলম্বন এই ভবনটি! আধুনিক স্থাপত্যের বিশাল এই অফিসের ভেতরের পরিবেশটাও বেশ গোছানো ও প্রাণবন্ত। লাঞ্চ টাইম মাত্র শেষ হয়েছে; চারপাশের কর্মব্যস্ততা তুঙ্গে। কেউ একরাশ জরুরি ফাইল হাতে নিয়ে এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে প্রায় ছুটে যাচ্ছে, কেউ কাজের ফাঁকে সহকর্মীর সাথে হালকা ঠাট্টা-তামাশায় মেতে উঠছে, আবার কেউ দীর্ঘ কাজের ক্লান্তি কাটাতে কফি কাউন্টারে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফির লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।

‎​ঠিক এই সময়েই মেহুলের গাড়ি এসে থামল শিকদার এন্টারপ্রাইজের প্রবেশদ্বারে।
‎​মিনার আগেই শ্রাবণীকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। হসপিটালে শ্রাবণীর বলা সেই অন্যায়ের কথা মাথায় রেখে, মিনারের কাজ এখন একটাই—শ্রাবণীকে নিয়ে একদম ওপরের তলার সেই গোপনীয় ‘অ্যাড শুটিং স্টুডিও’-তে পৌঁছানো, যেখানে এতক্ষণ ধরে আনিকাকে কেন্দ্র করে মেকআপ ও এডিটিংয়ের নোংরা চাল চালছিল আরমান। মিনার শ্রাবণীকে নিয়ে ভেতরে চলে গেলেও মেহুল নামল না। সে গাড়ির পেছনের সিটেই বসে রইল।
‎​মেহুলের ঠিক পাশেই বসে আছে শ্রাবণীর ছয় বছরের ফুটফুটে বাচ্চা ছেলেটি। মায়ের ফোনটা হাতে নিয়ে সে একমনে কার্টুন দেখছে আর মাঝে মাঝেই তুলতুলে গাল দুটো ফুলিয়ে মিষ্টি করে হেসে উঠছে। মেহুল ইচ্ছা করেই বাচ্চাটির থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে সিটের কোণে চেপে বসেছে। নিষ্পাপ শিশুটির দিকে তাকালেই মেহুলের বুকের গহীনে জমে থাকা সেই পুরোনো হাহাকার আর অতল শূন্যতা জেগে ওঠে!

‎​এক অদ্ভুত ভীতি আর সঙ্কোচে মেহুল বাচ্চাটির সাথে কোনো কথা বলল না। তবে গাড়ির কাচে নিজের প্রতিফলন আড়াল করে, আড়চোখে বারবার বাচ্চাটার খিলখিল করে হেসে ওঠার কাণ্ডকারখানা দেখল সে। একটা নিষ্পাপ শিশুর এই অমলিন হাসি যেন মেহুলের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে অদ্ভুত এক শীতল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল।
‎​এভাবে কেটে গেল প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট।
‎​হঠাৎ মেহুল গাড়ির জানলা দিয়ে দেখতে পেল—মিনার ধুলো উড়িয়ে হন্তদন্ত হয়ে তার দিকেই ছুটে আসছে! মিনারের ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক চরম বিজয়ী আর চতুর মুচকি হাসি। মেহুল এক পলক তাকাতেই বুঝে গেল—তাদের অর্ধেক মিশন সফল!
‎​মেহুল এবার ধীরস্থির পায়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। অফিসে প্রবেশের আগে সে গাড়ির কাছে গিয়ে নিচে থাকা প্রধান দারোয়ানকে ডেকে বলল, “আঙ্কেল, পেছনের সিটে বাচ্চাটা খেলছে। ও যেন একা বাইরে না আসে, একটু খেয়াল রাখবেন প্লিজ। আর কোন সমস্যা হলে খবর পাঠাবেন।” দারোয়ান মাথা নেড়ে স’সম্মানে সম্মতি জানাল।

‎​এবার মেহুল ও মিনার তাদের মূল লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে অফিসের দিকে পা বাড়াল।
‎​মিনার যখন মেহুলকে নিয়ে দোতলার মূল ব্লকে প্রবেশ করল, চারপাশের পরিবেশ নিমেষেই বদলে গেল। বসের একমাত্র গুণবতী ও ডক্টর মেয়েকে এভাবে অফিসে আসতে দেখে স্টাফদের মাঝে মৃদু আলোড়ন সৃষ্টি হলো। করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় প্রত্যেকেই অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে মেহুলকে মাথা খাইয়ে সালাম ও সম্মান জানাতে লাগল। মেহুলও তার স্বভাবজাত স্নিগ্ধ ও নম্র হাসিতে সবার সম্মানের প্রতিউত্তর দিতে দিতে এগিয়ে চলল।
‎একদিকে য​খন মেহুল এগোচ্ছে তখন অন্যদিকে, অফিসের হাই-টেক কনফারেন্স রুমে তখন ব্যস্ততার চরম শিখর!

‎​আরমান নিজের ল্যাপটপ প্রজেক্টরের সাথে কানেক্ট করে বিশাল স্ক্রিনে নতুন প্রজেক্টের প্রেজেন্টেশন দেখাতে ব্যস্ত। আজ প্রথমবারের মতো এই হাই-প্রোফাইল মিটিংয়ে আরমানের সাথে উপস্থিত হয়েছে আনিকা। ইকবাল সাহেব অফিসে ঢুকে আনিকাকে দেখে ভেতরে ভেতরে কিছুটা অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হলেও, উপস্থিত এত সব সম্মানীয় ক্লায়েন্ট ও বোর্ড মেম্বারদের সামনে কিছুই বলেননি। কারণ যাই ঘটুক না কেন, আনিকাকে তিনি সব সময় মেহুলের মতো বাড়িরই মেয়ে মনে করেতেন; তাই পারিবারিক মর্যাদা আর ঘরের মেয়েদের সম্মান নষ্ট হোক, তা ইকবাল সাহেব কখনোই চান না।

‎এদিকে ​প্রেজেন্টেশন চলাকালীন আরমানের চোখে-মুখে অহংকার আর অন্ধ আত্মবিশ্বাসের এক কুটিল উন্মাদনা ভেসে উঠছে। আরমান যেন ধরে নিয়েছে—আজকের এই ডিলটাই তাকে শিকদার এন্টারপ্রাইজের মুকুটহীন সম্রাট বানিয়ে দেবে!
‎​পাশেই বসে থাকা আনিকা একদৃষ্টিতে আরমানের দিকে তাকিয়ে আছে। অফিসের এসব জটিল ফাইন্যান্স বা বিজনেস পলিসি সে ছাই-পাঁশ কিছুই বোঝে না, তবে তার চোখ-মুখে উপচে পড়ছে এক রাজকীয় গর্ভ! আরমানের মতো এমন এক সুদর্শন, ড্যাশিং আর ট্যালেন্টেড পুরুষ তার স্বামী—ভাবতেই যেন আনিকার নিজের প্রতি অহংকার বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

‎অতঃপর ​একসময় আরমানের সাবলীল প্রেজেন্টেশন সমাপ্ত হলো।
‎​ইকবাল সাহেব সহ মিটিং রুমের বাকি সব ক্লায়েন্ট ও বিদেশি প্রতিনিধিরা মুগ্ধ হয়ে করতালি দিয়ে আরমানকে সাধুবাদ জানালেন। একের পর এক প্রশংসার জোয়ার ভেসে আসতে লাগল আরমানের দিকে—
‎”ব্রিলিয়ান্ট ওয়ার্ক, আরমান! ইকবাল সাহেব, আপনার কোম্পানিতে এমন একজন দূরদর্শী ডিরেক্টর আছেন, সত্যি আপনি ভীষণ ভাগ্যবান!”

‎অন্য এক ক্লায়েন্ট হেসে বললেন, “আরমান স্যারের এই ব্রেইন আর স্ট্র্যাটেজির জন্যই শিকদার এন্টারপ্রাইজের এত সুনাম বজায় আছে স্যার!”
‎​কথাগুলো শুনে ইকবাল সাহেব সৌজন্যমূলক হাসলেও আরমানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত চক্রান্তের তাচ্ছিল্য। কারন সে জানে তার জালিয়াতির চাল তখনো একদম নিখুঁতভাবে এগোচ্ছে!
‎​ঠিক তখনই মিটিংয়ের প্রধান ক্লায়েন্ট বেশ উৎসুক হয়ে বললেন, “অলরাইট আরমান! প্রজেক্টের কনসেপ্ট তো চমৎকার। এবার প্রজেক্টের মূল আকর্ষণ—মানে যে ভিডিও অ্যাড শুটটা তোমরা তৈরি করেছ, সেটা আমাদের একটু স্ক্রিনে প্লে করে দেখাও।”
‎​কথাটা শোনামাত্রই আরমান এক গা-জ্বালানো তৃপ্তির হাসি হেসে পাশে বসা আনিকার দিকে তাকাল। তৎক্ষনাতা আনিকাও ভাব নিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল। কারণ কিছুক্ষণ আগেই স্টুডিওতে আনিকাকে কড়া মেকআপ আর ঝকঝকে পোশাকে সাজিয়ে খুব গর্ভের সাথে এই বিজ্ঞাপনের শুট শেষ করা হয়েছে! আর সবাই এতো প্রশংসা করেছে যে আনিকা নিশ্চিত আজ সে বাজিমাত করবেই।

‎ঠক সেই মুহুর্তে ​আরমান তার পেছনে থাকা টেকনিশিয়ানকে ইশারা করতেই সে একটি মেমোরি ড্রাইভ ল্যাপটপে ইনসার্ট করল। আরমান সগৌরবে বড় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে প্লে বাটন প্রেস করল—
‎​কিন্তু… পরের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো মিটিং রুমে যেন এক বজ্রপাত নেমে এলো!
‎​স্ক্রিনে বিজ্ঞাপনটি চলতে শুরু করতেই আরমান আর আনিকার মুখে এতোক্ষণ থাকা হাসির রং যেন এক লহমায় ফ্যাকাসে, ম্লান আর নীল হয়ে গেল!
‎​স্ক্রিনের কোথাও আনিকা নেই! বরং সেখানে গ্ল্যামারাস, নিখুঁত রূপ আর অতুলনীয় ভঙ্গিমায় ফুটে উঠেছে অন্য এক নারী! নিখুঁত মেকআপ ও আভিজাত্যের মোড়কে আবৃত সেই নারীটি অত্যন্ত দক্ষ ও পেশাদার মডেলেও চেয়েও নিখুঁতভাবে স্ক্রিনে নিজের ম্যাজিক দেখাচ্ছে!

‎​আর সেই নারীটি আর কেউ নয়—শ্রাবণী! অন্যদিকে ​মিটিং রুমের এক কোনায় বসা এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার আলতাফ মাহমুদের হাত থেকে সাথে সাথে কাচের গ্লাসটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো! আলতাফ যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না! এটা কি সত্যি সেই শ্রাবণী? যাকে সে ‘মোটা, দেখতে কদাকার আর কুৎসিত’ বলে ডিভোর্স দিয়ে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল?
‎এদিকে স্ক্রিনের এই নিখুঁত, অসম্ভব রূপসী আর ট্যালেন্টেড শ্রাবণীর সাথে হসপিটালের সেই কান্নাকাটি করা অসহায় শ্রাবণী যেন অন্যকেউ একদম আসমান-জমিন তফাত!
‎​আরমান নিজের চোখ দুটো ছানাবড়া করে আনিকার দিকে হিংস্র চোখে তাকাল। আনিকা তখন ভয়ে আর আতঙ্কে কাঁপছে, তার নিজের মুখ দিয়েও কোনো কথা বের হচ্ছে না! দুজনেই থরথর করে কাঁপছে—এটা কীভাবে সম্ভব?! ভিডিও ফাইল তো লক করা ছিল! আনিকার শুট বদলালো কীভাবে?!

‎​সারা রুমে যখন শ্রবণীর কাজ নিয়ে প্রশংসা গুঞ্জন আর বিস্ময়ের তীব্র ঝড় বইছে, ঠিক তখনই—
‎​ক্লিক!
‎​সবাইকে চমকে দিয়ে বিশাল মিটিং রুমের ভারী সাউন্ডপ্রুফ কাচের দরজাটা ধীর গতিতে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল দুজন—মেহুল এবং মিনার!
‎​মেহুলের পরনে সাধারন ড্রেসআপ, চোখে হিমশীতল প্রতিশোধের ধার আর ঠোঁটের কোণে এক মারাত্মক চতুর ও বিজয়ী তাচ্ছিল্যের হাসি!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৫ (২)

‎​মেহুল ধীর পায়ে হেঁটে টেবিলের একদম সামনে এসে দাঁড়াল। আরমানের ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া আতঙ্কিত মুখের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ চোখ দুটি নিবদ্ধ করে আরেকেটু কাছে গিয়ে মিষ্টি গলায় ফিসফিসিয়ে বলল—
‎​”কী হলো আরমান ভাইয়া? স্ক্রিন দেখে অত চমকে গেছ কেন? নাটক তো কেবল শুরু হলো… আসল চমক তো এখনো বাকি!”

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৬ (২)