সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১
jannatul firdaus mithila
দীর্ঘ তিনমাসের বিদেশ যাত্রা শেষে অবশেষে বাড়ি ফিরছেন এহসান বাড়ির মধ্যমনি, ড.ইফতেখার এহসান রৌদ্র। সঙ্গে তার ছোট্ট আদুরে বউজান অরিনও যে আছে! তিনমাসের ফেলোশিপ প্রোগ্রাম কমপ্লিট করে বাড়ির বড় ছেলে এবং মেয়ে বাড়িতে ফিরছে এ নিয়েই সেই সকাল থেকে এহসান বাড়িতে চলছে ব্যপক তোড়জোড়। এর আগে রৌদ্র বেশ কয়েকবছর বিদেশ কাটালেও অরিনটা যে এই প্রথম এতগুলো দিন দেশের বাইরে ছিলো। সাব্বির এহসান এবং রাফিয়া বেগমও মেয়ের অনুপস্থিতিতে এক’দিনেই কেমন মূর্ছা গেছেন মনে হচ্ছে। মেয়ের আগমনী বার্তা পেয়ে মূর্ছা পড়া মানুষ দুটোর মুখে আজ কেমন হাসি ফুটেছে। ওদিকে কবির সাহেবেরও যে একই হাল।গম্ভীর মুখো কবির সাহেব বাড়ির মূখ্য কর্তা হওয়ার দরুন খুব একটা আনন্দ প্রতিক্রিয়া না দেখালেও মনে মনে তিনি বেশ খুশী!
আধুনিক সাজসজ্জায় সজ্জিত এহসান বাড়ির বড় ডাইনিং রুমটার বা-দিকে রান্নাঘরের অবস্থান। সেথায় আপাতত বাড়ির চার বধূ রান্নার কাজে ব্যস্ত। বড় বধূ জুবাইদা বেগম দক্ষ হাতে খুন্তি নাড়ছেন কড়াইয়ে।সম্পূর্ণ রান্নাঘর জুড়ে ম ম করছে কাতল মাছের পাতলা ঝোলের সুঘ্রাণ। তার পাশের চুলোতেই মাংস কষাতে ব্যস্ত রাফিয়া বেগম। দুই বেয়াইন মিলে হাসছে আর টুকটাক কথা বলছে।তাদের হাতদুটোও কেমন দক্ষতার সাথে রান্নায় মত্ত! তাদের থেকে খানিকটা দূরে সবজি কাটাকুটিতে মত্ত হয়েছে বাড়ির কাজের মেয়ে ফুলি।আটপৌড়ে গ্রামের নরম-সরম স্বভাবের ফুলিটা কাজের চাইতে সাজসজ্জায় বেশি মনোযোগী। শ্যমবরণ মুখের পুরোটায় তার লেপ্টে আছে টেলকম পাউডারের উপস্থিতি। ঠোঁট ভরে রেখেছে গোলাপি রঙের লিপস্টিকে,মাথার ঘনকালো চুলগুলোতে এক কোষ তেল দিয়ে টেনে দু’পাশে দিয়ে বেধেঁ রেখেছে দু’দুটো বিনুনি। মেয়েটা গুনগুন করে গান গাইছে আর চাক চাক করে কেটে দিচ্ছে গোল বেগুনগুলো।একটু পরেই ভাজতে দেওয়া হবে এগুলো। অন্যদিকে বাড়ির সেজো বউ মাইমুনা বেগম ব্যস্ত গোছগাছে।তাকে আগ বাড়িয়ে সাহায্য করছেন ছোট বউ রাইসা বেগম। মানুষটার আবার রান্নার নাম শুনলেই গায়ে জ্বর আসে।তার বাদবাকি বড় জা’য়েরা রান্নাবান্নায় ভারি পটু হলেও তিনি এক্ষেত্রে লবডঙ্কা! যদিও এসব নিয়ে বাড়ির বড় বউদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। কেননা সবাই যে সবটা পারবে তেমনটা তো কোনো কথা নয়।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
বাড়ির ড্রয়িং রুমের বড় সোফাটায় আয়েশ করে বসে আছেন কবির সাহেব। হাতে তার গরম ধোঁয়া ওঠা এককাপ লাল চা। তার পাশের সোফাটায় বসে আছেন সাব্বির সাহেব। মানুষটার উৎসুক দৃষ্টি ক্ষনে ক্ষনে গিয়ে ঠেকছে ড্রয়িং রুমের দেয়ালে সগৌরবে ঝুলে থাকা দেয়ালঘড়িটার পানে। আহারে! বেচারার কাছে হুট করেই কেন যেন মনে হচ্ছে আজ আর সময়টা বুঝি পার হবার নয়। কবির সাহেব বারকয়েক আড়চোখে পরোখ করলেন ছোট ভাইয়ের হাবভাব। পরক্ষণেই চায়ের কাপে একটু-আধটু চুমুক বসিয়ে সময় নিয়ে বললেন,
“ বারবার ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালে কি সময় তারাতাড়ি কাটবে?”
আচমকা এহেন কথায় থতমত খেয়ে বসলেন সাব্বির সাহেব। ঠোঁটের কোণে ভ্যাবলাকান্তের ন্যায় বেশখানিকটা হাসি টানলেন। সদ্য আধঁ-পাক ধরা মুখভর্তি খোঁচাখোচাঁ দাঁড়ি গুলোতে খানিক আঙুল চালিয়ে বলতে লাগলেন,
“ না মানে ভাইজান… ঐ আরকি!”
কবির সাহেব গম্ভীর মুখেই হাসলেন একটুখানি। কাপের গায়ে পরবর্তী চুমুকটা বসিয়ে ফের বললেন,
“ প্ল্যান লেন্ড করবে বিকেলের দিকে। অথচ এখন বাজে মাত্র সকাল ১০টা। তাই অপেক্ষা দীর্ঘায়িত না করে অফিসে চল।কাজ আছে! ”
অন্যসময় হলে সাব্বির সাহেব হয়তো একছুটে লাফ দিয়ে তৈরী হয়ে যেতেন অফিস যেতে। তবে আজ কেন যেন মানুষটার গায়ে আলসেমি ভর করেছে। তিনি বড় ভাইয়ের বলা সত্বেও চুপচাপ মাথা নুইয়ে বসে রইলেন নিজ জায়গায়। কবির সাহেব দেখলেন সবটা। কাপের অবশিষ্ট চা-টুকু গিলে নিয়ে অবশেষে বললেন,
“ কিরে? যাবি না?”
সাব্বির সাহেব মাথা তুলে চাইলেন। ঠোঁটের কোণে একটুখানি জোরপূর্বক হাসি টেনে দোনোমোনো করে বলতে লাগলেন,
“ ভাইজান বলছিলাম কী… আজ আর না গেলে হয়না?”
বিচক্ষণ কবির সাহেব আগেই আন্দাজ করে নিয়েছিলেন এমন প্রতিত্তোর। তাই তিনি মোটেও অবাক হলেন না।বরঞ্চ হাতের খালি কাপটা সোফার সামনের টেবিলের ওপর ওপর রেখে উঠে দাঁড়ালেন গম্ভীর মুখে। অতঃপর গায়ের সফেদ রঙা কটনের কাতুয়াটা খানিক ঠিকঠাক করে নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“ বয়স হলো তবে ভারবুদ্ধিটা আর হলোনা!”
মুচকি হাসলেন সাব্বির সাহেব। এগিয়ে এসে সোফার ওপর থেকে বড় ভাইয়ের ব্যাগটা আগ বাড়িয়ে হাতে তুলে নিলেন। পরক্ষণেই বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ চলো এগিয়ে দিয়ে আসি!”
অগত্যা সামান্য ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলে হাঁটা ধরলেন কবির সাহেব। সাব্বির সাহেবও পা বাড়ালেন ভাইয়ের পিছুপিছু।
“ সেজো ভাই? ও সেজো ভাই? বলি কই তুমি?”
ছাঁদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন তায়েফ এহসান। পুলিশ স্টেশন থেকে জরুরী একটা কল আসায় ছাঁদে এসে কথা বলছেন তিনি। ভারপ্রাপ্ত ডিসি হওয়ায় মানুষটার হয়েছে যত জ্বালা! বাড়িতে বসেও দুদণ্ড শান্তি মিলবার জো নেই! যখন না তখন ঠিক কল করে কাজ ধরিয়ে দেবে তাকে।ধূর! এসবও কোনো কাজ হলো? তায়েফ সাহেব বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছেন। এমন সময় ছাঁদের দিকে ধেয়ে আসে তাশরিক সাহেবের হাঁক ডাক। হাঁক তুলে তায়েফ সাহেবকে ডাকতে ডাকতে বেচারার প্রাণ বেরিয়ে আসবার যোগাড় যেন! তায়েফ সাহেব তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে দাঁড়ালেন। গলা উঁচিয়ে ছোট ভাইয়ের ডাকে সাড়াঁ দিয়ে বললেন,
“ তশু! আমি এখানে। ছাঁদে আছি।”
অতঃপর তার ওমন সাড়া পেয়ে মিনিট খানেকের মাঝে হন্তদন্ত পায়ে ছাঁদে এলেন তাশরিক সাহেব। দু’হাতে তার দু’দুটো পাঞ্জাবি। তিনি হাসিমুখে পাঞ্জাবি দুটো নিয়ে এগিয়ে আসেন তায়েফ সাহেবের নিকট। বলেন,
“ সেজো ভাই একটা হেল্প করো তো!”
তায়েফ সাহেব হাতের ফোনটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে সটান হয়ে দাঁড়ালেন। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ কী হেল্প বল?”
তাশরিক সাহেব গালভর্তি হাসি টানলেন। নরম রোদের আলোয় তার ফর্সা মুখের আদলটা কেমন চিকচিক করছে যেন। তিনি পরমুহূর্তেই হাতের পাঞ্জাবি দুটো তায়েফ সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ এদুটোর মধ্যে তোমার কোনটা পছন্দ বলো তো?”
তায়েফ সাহেব একপলক তাকিয়ে রইলেন পাঞ্জাবি দুটোর দিকে। একটার রঙ কালচে নীল আরেকটা ঘিয়ে রঙা। কেন যেন তায়েফ সাহেবের ঘিয়ে রঙা পাঞ্জাবিটাই বেশ লাগলো। তিনি আলতো করে হাত রাখলেন সেটার গায়ে। পরক্ষণেই হালকা হেসে বললেন,
“ এটাই তো ভাল্লাগছে!”
তাশরিক সাহেব দুষ্ট হাসলেন এবার। তৎক্ষনাৎ ঘিয়ে রঙা পাঞ্জাবিটা চেপে ধরলেন নিজের বুকের সঙ্গে। আর অপর পাঞ্জাবিটা এগিয়ে দিলেন তায়েফ সাহেবের দিকে।দুষ্ট হেসে বললেন,
“ নাও ধরো।এটা তোমার!”
তায়েফ সাহেব অবাক হলেন এরূপ কান্ডে। তিনি পছন্দ করলেন ঘিয়ে রঙা পাঞ্জাবিটা অথচ তাকে কিনা দেওয়া হলো নীল রঙেরটা! এ আবার কেমন কথা? তায়েফ সাহেব হতবিহ্বলের ন্যায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ এটা কী হলো?”
তাশরিক সাহেব প্যাকেট থেকে ঘিয়ে রঙা পাঞ্জাবিটা বের করতে করতে বলতে লাগলেন,
“ কী আবার? দুটো পাঞ্জাবি এনেছিলাম। ভাবলাম তুমি আধবুড়ো বয়সের মানুষ, একটা নাহয় তোমাকেই দেই। তাই দিয়ে দিলাম তোমায় একটা। দেখলে.. আমি কত উদার।”
তায়েফ সাহেব চটে গেলেন মুহুর্তেই। কোমরের দু’ধারে হাত রেখে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন,
“ উদার না ছাই! এই তোকে আমি বলেছিলাম আমায় পাঞ্জাবি দিতে? তুই কেনো আগ বাড়িয়ে পাঞ্জাবি আনলি? আবার আনলি তো আনলি,আমি যেটা পছন্দ করলাম সেটা নিজে নিয়ে গিয়ে আমায় অন্যটা দিলি যে? তাহলে জিজ্ঞেস করলি কেনো কোনটা পছন্দ?”
তাশরিক সাহেব বাঁকা হাসলেন।এগিয়ে এসে সেজো ভাইয়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন আলগোছে। অতঃপর ভীষণ বিজ্ঞ ভাবসাব নিয়ে বললেন,
“ আরে সেজো ভাই! তুমিও না.. তোমায় দেখলে আমার সত্যি মনে হয় তোমার চুল পেকেছে বাতাসে নট বয়সে। দেখো.. আমি সেই সকাল থেকে ভেবে যাচ্ছিলাম তোমায় কোনটা দিব। একবার ভাবলাম নীলটা দেই,তবে পরক্ষণেই মনে হলো ঘিয়ে রঙের চাইতে আমায় বোধহয় নীলটায় বেশি মানাবে।মানে মোদ্দা কথা, আমি যেটাই তোমার জন্য চুজ করতে যাই আমার তখনি মনে হয় তোমার জন্য চুজ করা পাঞ্জাবিটা বোধহয় আমারটার চাইতে বেশি সুন্দর! যার এক ঠ্যাঙ তরে আরেক ঠ্যাঙ কবরে তার আবার এই বয়সে এতো বেশি সুন্দর লাগলেই কী আর না লাগলেই কী বলোতো? তাই কনফিউশান দূর করতে তোমার কাছে এলাম।তুমি যেহেতু বললে ঘিয়েটা তোমার পছন্দ হয়েছে তারমানে এটা বেশি সুন্দর। তাই নিয়ে নিলাম। বুঝছো না ব্যাপারটা?”
তায়েফ সাহেব ফুঁসছেন রীতিমতো। কথায় কথায় তাকে বয়স নিয়ে খোঁটা দিচ্ছে কোন সাহসে? কি’বা এমন বয়স হয়েছে তার? তিনি কি আর ওতো বুড়ো হয়েছেন নাকি? তায়েফ সাহেব তৎক্ষনাৎ ঝটকা মেরে তাশরিক সাহেবের হাতটা সরিয়ে দিলেন কাঁধ থেকে। পরক্ষণেই মনে মনে দুষ্ট হেসে কপট ভাব নিয়ে বলতে লাগলেন,
“ একচুয়েলি তুই একদম ঠিক বলেছিস তশু। ঐ ঘিয়ে রঙা পাঞ্জাবিটা থেকে এটা বেশি সুন্দর। আই মিন, দেখ! এটার এমব্রয়ডারিটাও কতটা নিখুঁত। ফিনিশিংটাও বেশ সুন্দর। যাকগে ভালোই হলো।তুই ঐটাই রাখ।আমি নাহয় এটাই রাখলাম। ”
কথাটা বলেই অলক্ষ্যে বাঁকা হাসলেন তায়েফ সাহেব। পাঞ্জাবিটা নিয়ে হাঁটা ধরলেন সামনের দিকে। ওদিকে তাশরিক সাহেব পড়লেন এবার মহা চিন্তায়। তার মগজে এখন শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে — তবে কি সত্যিই সেজো ভাইয়েরটা বেশি সুন্দর?
সকাল পেরিয়ে বেলা নামবার যোগাড়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরটিতে মৃদুমন্দ ঠান্ডা বাতাস বইছে। খাটের ওপর বেঘোরে ঘুমুচ্ছে অনিক। এহসান বাড়ির ২য় নবাব পুত্তুর! ঘুম কাতুরে ছেলেটা ঘুমের মাঝেই একবার পাশ হাতড়ে খুঁজলো কাউকে। তবে পাশে প্রিয় মানুষটার উপস্থিতি টের না পেয়ে ঘুমের মাঝেই চোখদুটো আপনা-আপনি কুঁচকে আসে তার। সে তৎক্ষনাৎ চোখদুটো মেলে তাকায়। এদিক-ওদিক চেয়ে খুজঁতে থাকে কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তিকে। পরক্ষণেই গলা উঁচিয়ে ডেকে ওঠে,
“ বউ? এই বউ! কোথায় তুমি? বউউউ!!”
হঠাৎ এহেন হাঁক-ডাকে তড়িঘড়ি করে অর্ধ ভেজা কাপড়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে ইকরা। মেয়েটার চোখেমুখে একরাশ ভীতির ছাপ।সে এগিয়ে এসে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ কী হলো? এভাবে চেচাচ্ছো যে? কোনো দুঃস্বপ্ন দেখলে না-কি? ”
অনিক মেকি রাগ নিয়ে কিছু বলতেই যাবে ওমনি তার নজর গিয়ে ঠেকলো ইকরার ভেজা গায়ের দিকে। মেয়েটা বুঝি সবে গায়ে পানি ঢেলেছিল, চুলগুলো থেকে তার এখনো টুপটুপ করে ঝড়ছে পানির ফোঁটা। পরনের সালওয়ার-কামিজটাও ভিজে গিয়ে লেপ্টে আছে গায়ের সঙ্গে। ফলস্বরূপ নারীদেহের প্রতিটি ভাজঁ আপাতত স্পষ্ট চক্ষুগোচর হচ্ছে তার।অনিক একমুহূর্তের জন্য দিনদুনিয়া ভুলে ভ্যাবলার মত তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। ওদিকে ইকরা অস্থির! কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নোত্তর না পেয়ে মেয়েটা চিন্তিত হয়ে আরেকটু এগিয়ে আসে অনিকের নিকট। পরক্ষণেই একহাত বাড়িয়ে রাখলো অনিকের কপাল বরাবর। অতঃপর চিন্তিত সুরে বলে,
“ কী হলো আপনার? কথা বলছেন না কেনো? শরীর খারাপ লাগছে?”
অনিকের কী হলো কে জানে! ছেলেটা কেমন হতবুদ্ধির ন্যায় ওপর নিচ মাথা নাড়ালো আলতো করে। তা দেখে ইকরা এবার বেজায় চিন্তিত।সে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে বলে,
“ একটু বসুন। আমি কাপড়টা পাল্টে আসছি!”
কথাটা বলেই সেখান থেকে চলে যেতে কদম বাড়ায় ইকরা।তবে তক্ষুনি ঘটলো আরেক বিপত্তি! পেছন থেকে হুট করেই তার একহাতের কব্জি টেনে ধরে অনিক।ইকরার কদম থমকায়।সে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পেছনে। ইশারায় জিজ্ঞেস করে — কী?
অনিক মোহগ্রস্তের ন্যায় ঠোঁট কামড়ে হাসলো একটুখানি। পরমুহূর্তেই মেয়েটার হাত টেনে তাকে এক ঝটকায় এনে ফেললো নিজের বুকের কাছে। ঘটনার আকস্মিকতায় বেচারি ইকরা হতভম্ব। কি থেকে কি হলো সেটা টের পাওয়ার আগেই তাকে শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরে অনিক। ইকরার কাঁধে আলতো করে নাক ঘষে নেশালো কন্ঠে বলে ওঠে,
“ আমাকে পাগল করে কোথায় যাওয়া হচ্ছে মেডাম?”
তৎক্ষনাৎ খানিক কেঁপে ওঠে ইকরা। পিঠের শীরদাড়া বেয়ে এই বুঝি নেমে গেলো এক অদ্ভুত শীতল স্রোত! অনিক সময় নিয়ে ইকরাকে নিজের বুক থেকে সরালো।পরমুহূর্তেই মেয়েটাকে আলতো করে শুইয়ে দিলো বিছানায়। অতঃপর মেয়েটার দিকে কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বললো,
“ সুন্দর লাগছে বউ!”
ইকরা লাজুক হাসলো। চোখদুটো তার হুট করেই নেমে গেলো লাজুকতার ভারে।অনিক বেশ মুগ্ধ হয়ে দেখলো সবটা। পরক্ষণেই মেয়েটার দিকে এগিয়ে আসতেই ইকরা কেমন ইতস্তত হয়ে বলে ওঠে,
“ এখন না প্লিজ! নিচে সবাই ডাকছে।”
অনিক পাত্তা দিলোনা মেয়েটার এহেন বাক্যে।সে এগিয়ে এসে দুম করে মুখ গুঁজে দিলো ইকরার কন্ঠদেশে। সেথায় মুখ রেখেই হিসহিসিয়ে বললো,
“ জাস্ট ফোকাস অন মি বেইব।বাকিটা আমি দেখবো।”
বাড়ির ড্রয়িং ভর্তি মানুষজন। কিছুক্ষণ আগেই বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছেন আমরিন বেগম ও তার পরিবার।
ইফতি এতক্ষণ সবার মাঝে বসে থাকলেও এখন একটুখানি ফাঁক পেয়েই সুড়সুড় করে চলে গেলো সিঁড়ির দিকে।গুণে গুণে পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে দুরুদুরু বুকে। কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই সামনে পড়লো অনিক। ইফতি তাকে দেখতে পেয়েই আলতো হেসে কুশলাদি বিনিময় করে। অনিক ও করলো, তবে ছেলেটার চোখেমুখে কেমন দুষ্টমির ছাপ স্পষ্ট! সে কন্ঠ খাদে নামিয়ে ইফতিকে কেমন সন্দিহান গলায় বললো,
“ কী ব্যাপার সম্বন্ধী? কই যাও?”
ইফতি ঢোক গিললো একটু। এহেন কথার প্রতিত্তোরে বলার মতো কথা গোছাতেই চলে গেলো মিনিট খানেক সময়। অনিক এবার বাঁকা হাসলো। পা ফেলে ইফতিকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতেই সুর টেনে বলতে লাগলো,
“ প্রেমের মরা জলে ডুবে নাআআআআ!”
কথাটা শেষ করে অনিক আর থামলো না সেথায়। গলায় আগের ন্যায় সুর টেনে চলে গেলো সিঁড়ি বেয়ে। এদিকে তার এরুপ কথায় বেশ কিছুটা অবাক হলো ইফতি। হয়তো সে ভাবছে — অনিক ভাই কী তবে তার ব্যাপারে কিছু টের গেলো? পরমুহূর্তে আবার নিজের এহেন ভাবনায় নিজেই চিন্তিত হলো ছেলেটা। ভাবলো — সে না বললে অনিক ভাই জানলো কীভাবে? ইফতি নিজের এহেন ভাবনায় মত্ত থেকেই পা বাড়ায় দোতলার দিকে। মাথানিচু করে করিডরে হাঁটতে হাঁটতেই সে যখন অরিনের শূন্য ঘরটাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো ঠিক তখনি ঘটলো আরেক কান্ড! হুট করেই একজোড়া হাত এসে তাকে তৎক্ষনাৎ টেনে নিয়ে গেলো অরিনের ঘরে। অতঃপর সে হাতজোড়ার মালিক তাকে কোনরূপ কথাবার্তার সুযোগ না দিয়ে তৎক্ষনাৎ তাকে ঠেসে ধরে দেয়ালের সাথে। ঘটনার আকস্মিকতায় বেচারা ইফতি হতভম্ব হয়ে গেলো একমুহূর্তের জন্য! সে তৎক্ষনাৎ চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখে আহিরা কেমন রণমুর্তি ভাব ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার ফর্সা মুখের আদলটাও রাগের কারণে লালবর্ণ হয়ে গেছে। নাকের ডগাটুকুও ফুলে বালিশ! ইফতি ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিললো কয়েকটা। আহিরা নাকের পাটা ফুলিয়ে, নিজেদের মধ্যকার বেশ খানিকটা দুরত্ব ঘুচিয়ে দাঁড়ালো। একহাতের কনুই দিয়ে হুট করেই চেপে ধরলো ছেলেটার গলা। ভীষণ চটে গিয়ে কর্কশ গলায় বলতে লাগলো,
“ কয়টা কল দিয়েছি সকাল থেকে? ফোন কোথায় থাকে? কী সমস্যা আপনার? কল ধরলেন না কেন? প্রেমটাও এখনো শুরু হলোনা ঠিকঠাক মত আর ওমনি শুরু হয়ে গেলো আপনার ইগনোর করা?”
ইফতি কেমন দোনোমোনো করছে দাঁড়িয়ে থেকে। তা দেখে আরেকধাপ চটলো আহি। কর্কশ গলায় ফের আগুন নিয়ে বলল,
“ ওহ আচ্ছা! এখন কথা বলতেও ইচ্ছে করছে না? ঠিক আছে ফাইন! বায়..!”
বলেই সে তৎক্ষনাৎ সরে দাঁড়ায়। গটগট পা ফেলে ঘর ছেড়ে বেরোবে ওমনি পেছন থেকে তার একহাত টেনে ধরে ইফতি।আহি থামলো, তবে পেছনে না ফিরেই কাঠকাঠ কন্ঠে বললো,
“ হাত ছাড়ুন!”
ইফতি ছাড়লোনা।উল্টো নিজ থেকে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মেয়েটার একদম কাছাকাছি। অতঃপর ভীষণ নরম কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ সরি!”
ভেতর ভেতর এহেন নরম কন্ঠ শুনে রাগ গলে পানি আহির।তবুও বাইরে থেকে নিজের মুখভঙ্গিতে কপট রাগী ভাব নিয়ে বলল,
“ হাত ছাড়ুন আর ঢং করতে হবে না।”
ইফতি হঠাৎ করেই ছেড়ে দিলো আহির হাত। আহি হতবাক হয়ে গেলো এহেন কান্ডে। সে তৎক্ষনাৎ পেছনে তাকায়। হতবাক কন্ঠে বলে,
“ এটা কী হলো?”
ইফতি নিশ্চুপ! বুকের কাছে দু’হাত বেঁধে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে আহির দিকে। চোখেমুখে তার নেই কোনরূপ ভনিতার ছাপ। সে সময় নিয়ে চমৎকার হাসলো।অতঃপর মুগ্ধ কন্ঠে বললো,
“ আমি আবার আজ্ঞাকারী পুরুষ মেডাম! প্রেমিক হিসেবেও যেমন আজ্ঞাকারী, স্বামী হিসেবেও তেমন আজ্ঞাকারী থাকবো বলে আশাবাদী।আপনি চাইলে পরিক্ষা করে দেখতে পারেন।কী হবে না-কি এক-আধটা পরিক্ষা?”
