Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৩

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৩

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৩
জাবিন ফোরকান

আমি মানুষটাই আগাগোড়া ভুলে গড়া। এর প্রমাণ গত কয়েক বছর যাবৎ বারংবার পেয়েছি। আজ আবারও পেলাম। ক্ষণিকের আবেগ অতি যত্নে বছর বছরে গড়ে তোলা সম্পর্ক নষ্টের জন্য যথেষ্ট।
জায়দানের ঠোঁটে আমি আজীবন হাসি দেখতে চেয়েছিলাম। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের হাসি। আমি আমার স্বামীর চেহারায় খুশির অনুভূতির ছোঁয়া দেখতে চেয়েছিলাম। ভীষণ সুখে হাসলে তাকে দেখতে কেমন লাগে সেই কল্পনা আমার ইদানিংকালের পছন্দের সময় ক্ষেপণ। আজ, একেবারে হঠাৎ করেই আমার ইচ্ছা পূরণ হয়ে গেল। অথচ সুখ কোথায়? তাকে তো আমি খুশির কারণে হাসতে দেখতে চেয়েছি, নিদারুণ যাতনায় নয়।
চোখ বেয়ে পানি উপচে গড়াতে চাইলেও দিলাম না। কাঁপা কাঁপা একটি হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে চাইলাম প্রাক্তনকে।

“জায়দান…”
আমাকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে জায়দান ঘুরে গেল। এক লহমায় হাসিখানি উধাও হয়ে পুনরায় নেমে এলো শীতলতা। ঝুঁকে গেল সে মীরার কাছে। খানিকটা ঠান্ডা মাথায় দেখার পর বুঝতে পারলাম, সে আসলে মীরার পালস চেক করছে।
আশঙ্কা এবং অদ্ভুতুড়ে স্বস্তির মিশ্রিত এক অনুভূতি আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ানক এক ভীতি ভর করল বুকজুড়ে। মীরা! কি হয়েছে তার?
ধপাস করে বিছানার একপাশে বসে পড়লাম। মীরার মাথাটা নিজের কোলে তুলে হালকা চাপড় দিতে লাগলাম গালে।
“মীরা? এই, আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস? কি হয়েছে তোর? জেগে ওঠ, প্লীজ?”
কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলনা। রমণীর শরীর স্পর্শ করতেই টের পেলাম কনকনে শীতে শক্ত পাথরের মতন হয়ে গিয়েছে। কে জানে কতক্ষন যাবৎ ছিল এই অবস্থায়?
বুকে কাপড় নেই, ওড়না মেঝেতে, পরনের জামা বেশ খানিকটা এলোমেলো। এমন দৃশ্য একটি ঘটনারই নির্দেশ ঘটাতে পারে। আড়চোখে ভয় নিয়ে দেখলাম জায়দানকে। উঠে গেল সে বিছানা ছেড়ে। হেঁটে চলল ক্লোজেটের দিকে। নিঃশব্দে বের করে আনলো একটি ভারী কোট। ফিরে এসে কোটটি মীরার শরীরে জড়িয়ে দিলো।
যে মানুষ কোনোদিন অনুমতি ছাড়া তার বিবাহিতা স্ত্রীকেও স্পর্শ করেনি, সে কি অন্য কোনো রমণীর সঙ্গে বাজে ব্যবহার করতে পারে?

উপলব্ধিটি হলো হঠাৎ করেই। যা এতক্ষণ যাবৎ আমার তপ্ত মস্তিষ্ক ভেবে কূলকিনারা করতে পারেনি।
সবকিছু পরে ভেবে দেখা যাবে। আপাতত আমার প্রধান ফোকাস মীরা।
জায়দান আমার সঙ্গে কোনো কথা না বলে নিজের পকেট থেকে ফোন বের করল। কাকে যেন কল করল। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই জানাল,
“ইমারজেন্সি গাড়িটা বের করুন, একজনকে হাসপাতালে নিতে হবে।”
ফোন আবার পকেটস্থ করে ফিরে এলো সে। এবারেও আমার সঙ্গে কোনো কথাই বলল না। নিঃশব্দে ঝুঁকে মীরার শরীরটা পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। সটান লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। আমার অপেক্ষা না করেই জায়দান এগোতে শুরু করল। মেঝে থেকে তার চশমা এবং হলরুম থেকে মীরার হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে আমি হন্তদন্ত হয়ে পিছু নিলাম।
অতঃপর যা হলো, তা ভীষণ দ্রুত। অচেতন মীরাকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছলাম আমরা। তক্ষুণি তাকে নিরীক্ষণ করা শুরু হলো। এদিক সেদিক দৌঁড়ে কাগজপত্র সাইন করলাম আমিই। রিসিপশনের কাছে দাঁড়িয়ে যখন ফর্ম ফিলআপ করছি, তখনো আমার হাত কাঁপছে থরথর করে। কতক্ষণ পেরিয়েছে হিসাবেও রইলনা। ইমারজেন্সি থেকে ডাক্তার বের হতেই ছুটে গেলাম। আমাকে অত্যন্ত শঙ্কা এবং দুশ্চিন্তা নিয়ে তাকিয়ে থাকে দেখে ডাক্তার বলতে শুরু করলেন,

“পেশেন্ট এখনো সম্পূর্ণ চেতনা ফিরে পাননি। ওনার শারীরিক লক্ষণগুলো এমন ধারণা দেয় যে, হয়ত ওনার উপর কোনো ধরনের সেডেটিভ বা চেতনানাশক ঔষধ প্রয়োগ করা হয়েছে। ঠিক কোন ড্রাগ, সেটা আমরা রিপোর্ট আসার পরপরই বলতে পারব।”
শক্ত একটি ঢোক গিললাম আমি। চেতনানাশক ঔষধ? কেন? মাথার ভেতর সবকিছু জট পাকিয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার খানিকটা সময় আমাকে এবং অদূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু নীরবে শুনতে থাকা জায়দানকে দেখলেন। পরক্ষণে খানিকটা ইতস্ততবোধ ঝেড়ে বললেন,
“শারীরিক আঘাতের বড় কোনো চিহ্ন পাওয়া না গেলেও ছোটখাট কিছু দাগ দেখা গিয়েছে। সেসব জোরজবরদস্তি করে ধরে রাখার কারণে হতে পারে। আমরা কিছুই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছিনা। তবে এটুকু স্পষ্ট, উনি খুব বড় একটা মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত আমরা এটাকে ‘সাসপেক্টেড অ্যাবিউজ’ হিসাবে ধরে চিকিৎসা দিচ্ছি।”
জায়দানের দিকে একনজর চেয়ে মাথা দুলিয়ে ডাক্তার চলে গেলেন। অতঃপর আমার হঠাৎ করেই মনে হলো আমি নিজের পায়ে আর কোনো জোর পাচ্ছিনা।
ভোর থেকে এখন অবধি ঘটনাগুলো আমার শরীরের সবটুকু শক্তি নিংড়ে ফেলেছে। নিজেকে শক্তভাবে ধরে রাখা সম্ভব হলোনা। দেয়াল ঘেঁষে ধপাস করে ওয়েটিং চেয়ারের উপর বসে পড়লাম। শত সহস্র চিন্তারা ক্ষণে ক্ষণে আমায় বিদ্ধ করতে লাগল।

জোরজবরদস্তি? অ্যাবিউজ? এবার আর কোনো সন্দেহ নেই। এই সম্পূর্ণ ঘটনার সঙ্গে জায়দানের কোনো সম্পর্কই নেই! কিন্ত, কে করল এমনটা? কার এত বড় বুকের পাটা আমার সহজ সরল মীরাটার সাথে এমন জঘণ্য ধরনের আচরণ করতে পারে?
তীব্র সন্দেহজনক একটি নাম আমার মাথায় এলো। অথচ, আমি নিশ্চিত হতে পারছিনা। ঘটনা যেভাবেই চিন্তা করিনা কেন, সবকিছুই ওই একটি বান্দাকেই নির্দেশ করছে। তবে আপাতত, রিপোর্ট আসা এবং মীরার জ্ঞান ফেরা অবধি আমার অপেক্ষা করতে হবে।
মীরার জ্ঞান ফিরল পাক্কা দুই ঘণ্টা পর। তারও প্রায় এক ঘন্টা বাদে আমরা তাকে দেখার অনুমতি পেলাম।
কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সামনের দৃশ্য আমাকে ভেঙে চুরমার করে দিলো আরো একবার। বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে মীরা। চোখজোড়া সিলিংয়ের দিকে আবদ্ধ। ওই দৃষ্টির মাঝে সামান্যতম নড়চড় নেই। পাথরের মতন স্থির। ত্বক অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাশে। কান্না পেয়ে গেলো আমার। এই মেয়েটিকে কোনো সময়ে এমন অবস্থায় দেখতে হতে পারে কখনো কল্পনাও করিনি আমি।
ধীরপায়ে এগিয়ে গেলাম। কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে আলতো করে মীরার বুকের উপর ভাঁজ করে রাখা রীতিমত নিথর হাতটা তুলে নিজের গালে ছোঁয়ালাম।

“মী..রা?”
কন্ঠস্বর কাঁপলো আমার। মীরা চোখ ঘুরিয়ে দেখল আমাকে। অথচ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালোনা। কেমন রোবটের মতন নির্লিপ্ত এক দৃষ্টি। চোখ ঠিকরে অশ্রু বেরোতে চাইলেও দিলাম না। স্বাভাবিক আচরণ করলাম সম্পূর্ণ। অপর হাতটি বাড়িয়ে কপাল ছুঁয়ে দিলাম মীরার।
“কেমন লাগছে, এখন? কোথাও কষ্ট হচ্ছে?”
এবারেও উত্তরহীন মীরা। শুধু নিষ্পলক চেয়ে আছে আমার দিকে। ভীষণ কষ্ট হলো আমার।
“তুই দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবি। বাসায় চলে যাব আমরা।”
দীর্ঘক্ষণ যাবৎ কেবিনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একদম নিঃশব্দে আমাদের পর্যবেক্ষণ করল জায়দান। প্রতিক্রিয়াহীন মীরার দিকে অত্যন্ত ধীরে কয়েক পা এগিয়ে এলো। জায়দানকে দেখে মীরার পাথুরে প্রথমবারের মতন বিস্ময় দেখলাম। তার সঙ্গে চাপা একটি আতঙ্ক।
“আমি দুঃখিত।”

ছোট্ট দুটি শব্দ উচ্চারণ করল জায়দান। একটি হাত তুলল, খুব সম্ভবত মীরার হাত অথবা কপাল ছুঁয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে। অথচ বিছানায় থাকা মীরা সটান পিছু হটলো। এক হাতে আমার হাতটা শক্তভাবে চেপে ধরে বিছানার অপরপাশে নিজেকে সরিয়ে নিলো। ঠিক যেমন করে ভয় পেয়ে থাকা বিড়ালকে ধরতে গেলে প্রচন্ড আতঙ্কে সেটি লাফিয়ে উঠে, অনেকটা তেমন করেই। প্রথমবারের মতন মীরার ভাঙা কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম,
“আমাকে স্পর্শ করবেন না প্লীজ।”
থমকে গেল জায়দান। শীতল নয়ন মেলে দেখলো মীরাকে।
“পুরুষের স্পর্শ আমার আর সহ্য হয়না।”
এইটুকুই। তৎক্ষণাৎ নিজের হাত গুটিয়ে নিল জায়দান। আমি বিছানায় বসে মীরাকে আগলে নিলাম নিজের বুকে। অনুভব করলাম, থেকে থেকে কাঁপছে মেয়েটার সমস্ত শরীর।
মীরার প্রতিক্রিয়ার পরপরই বিছানা থেকে কয়েক হাত দূরে সরে দাঁড়াল জায়দান। একবারও আমার দিকে তাকাল না। বরং বরাবর মীরার দিকেই তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমি জায়দান আরেফিন, তোমার বান্ধবীর এক্স হাসব্যান্ড। সরি, পরিচয়টা দিতে খুব দেরী করে ফেলেছি। প্রথম দেখায় দিয়ে দিলে হয়ত আজ তোমাকে এই হাসপাতালের বিছানায় থাকতে হতোনা।”
কিছুই বুঝতে পারলাম না আমি। হতবিহ্বল হয়ে একবার জায়দান আরেকবার মীরাকে দেখতে লাগলাম। উভয়ের মাঝেই অব্যক্ত কিছু উক্তির আদান প্রদান হলো যেন।
জায়দান নিজের পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে এগিয়ে এসে বিছানার পাশের টেবিলের উপর রেখে দিল। মৃদু গলায় বলল,

“এটা আমার কার্ড। তোমার জন্য এখানে থাকলো মীরা। যদি কখনো প্রয়োজন মনে হয়, নিঃসংকোচে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। আরেকটা কথা।”
অন্তিম মুহূর্তে বরাবর মীরার উদ্ভ্রান্ত চোখের দিকে চাইল ওই বাদামী সমুদ্রের ন্যায় নয়নজোড়া।
“কাউকে এত সহজে বিশ্বাস করো না। বিশেষ করে, কোনো পুরুষকে।”
সামান্য বিরতি দিলো সে। অতঃপর যুক্ত করল,
“অনেকে বলে বিশ্বাস নাকি কাঁচের মতন, ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগেনা। অথচ আমি বলব, বিশ্বাস হলো কর্পূর। একবার বাতাসে উবে গেলে জোড়া লাগানোর জন্য কোনো টুকরো অবধিও খুঁজে পাবেনা।”
জায়দান কথাগুলো মীরাকে বলেছে। অথচ আমার ভেতর এতটা কষ্ট হচ্ছে কেন? কেন মনে হচ্ছে অভ্যন্তরে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে? পায়ের তলা থেকে মাটি এবং মাথার উপর থেকে ছাদ সরে যাচ্ছে?
প্রাক্তন আমার আর দাঁড়ালোনা। স্তব্ধ মীরা এবং আমাকে রেখে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো।
কি হলো জানিনা আমার। মীরাকে সামান্য সময়ের জন্য একলা রেখে পাগলপ্রায় হয়ে ছুটলাম বাইরে। করিডোর বেয়ে অদূরে ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যাচ্ছে জায়দানের সুদীর্ঘ অবয়বখানি। দৌঁড়ে গেলাম, হাঁপিয়ে উঠে ডেকে উঠলাম,

“জায়দান!”
থমকালো প্রাক্তন স্বামী। হালকা খানিক ঘুরে দাঁড়ালো। এক হাত দূরে থেমে গেলাম আমি। ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ফেলতে ফেলতে বিভ্রান্ত এবং বিচলিত অস্থির দৃষ্টিতে দেখলাম তাকে। গালের দিকটায় একটা ব্যান্ডেজ জড়ানো আছে। কখন লাগিয়েছে খেয়াল করিনি। হাহাকার করে উঠল আমার ভেতরটা।
“তোমার চশমা।”
এগিয়ে দিলাম মীরাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগে মেঝেতে পরে থাকা চশমাটা। জায়দান নিঃশব্দে সেটি হাতে নিলো। এতটা সাবধানে যে সামান্যতম স্পর্শও হলোনা আমাদের আঙুলে। নিজেকে সামলানো কষ্টকর হয়ে পড়ল। ছলছল করে উঠল আমার আঁখিজোড়া।
“জায়দান, আমি সরি, হয়ত না বুঝে ভুল….!”
হায়রে অভাগা সাবিন! তুই কি জানতিনা এটাই তোর প্রাপ্য?
এক দন্ড দাঁড়ালোনা জায়দান। চশমাটা হাতে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে উল্টো ঘুরে গেল। লম্বা লম্বা পা ফেলে অতি দ্রুত আড়াল হয়ে গেলো আমার দৃষ্টিসীমার।
॥অথচ ভেবেছিলাম, হয়ত তুমি এইবার সত্যিই বদলে গিয়েছ॥
অতঃপর আমি আবিষ্কার করলাম, এটাই আমার ভালোবাসার মানুষটার আমাকে বলা শেষ কথা ছিল!

দুপুরের আগমুহূর্ত। অথচ শীতের কারণে বোঝার উপায় নেই। আজ ভোর থেকেই আকাশটা কেমন গুমোট হয়ে আছে। যদিও বৃষ্টির দেখা নেই। আবহাওয়ার কেমন যেন একটা দুঃখী দুঃখী ভাব।
আরামদায়ক একটা ঘুম এবং গরম পানিতে লম্বা একটা গোসল সেরে নিচে নেমে এলো আয়দান। হালকা ভেজা চুলগুলো থেকে টপটপ করে পানি গড়াচ্ছে। লিভিং রুমের সোফায় বসে একটি ম্যাগাজিন পড়ছেন জেসমিন। জাফর মাত্রই বাড়িতে এসেছেন নিজের স্টাডি থেকে কিছু ফাইল সংগ্রহের জন্য। ব্যবসার কাজে ফিরে যাওয়ার আগে সোফায় বসে এক কাপ উষ্ণ ধোঁয়া ওঠা চা পান করে নিচ্ছেন। আয়দান নিচে নেমেই উঁচু গলায় ডেকে উঠলো,
“রোজিনা, আমাকে দুটো ওয়াফেল করে দে তো! প্রোটিন শেক আর হানি দিস। খবরদার চিনি মেশাবিনা।”
“ঠিক আছে ছোট ভাইজান!”

রান্নাঘর থেকে রোজিনার বাজখাঁই গলা ভেসে এলো।
“ওয়াফেল কোনো খাবার হলো? কতবার বললাম, সকাল সকাল উঠে মাম্মির হাতের রুটি, পরোটা, ভাঁজি খাও। পেট টা ভরা থাকবে। কে শোনে আমার কথা?”
জেসমিনের আদুরে অভিমানে আয়দান খিলখিল করে হাসলো। সোফার দিকে এগিয়ে ঝুঁকে জননীর গালে কয়েক দফা চুমু দিয়ে বলল,
“সরি মাম্মি। কালকে থেকে পাক্কা সকালে উঠব। ১২ টায়!”
জন্মদাত্রী গাল ফুলিয়ে স্নেহের সন্তানকে খানিক দেখলেন। তবে অভিমান করে থাকা গেলোনা। দ্রুতই হেসে ফেললেন। আয়দান টেবিলের দিকে এগোলো। রোজিনা মাত্রই প্রোটিন শেকটা দিয়ে গিয়েছে।
বাড়ির মূল দরজা হঠাৎ করেই সশব্দে খুলে গেল। ভারী এবং দ্রুত পদশব্দ শোনা গেলো। সকলেই খানিক উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল। দেখল, ভেতরে প্রবেশ করেছে জায়দান।

এহেন দৃশ্য অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক হলো জায়দানের চলন। সদা নির্লিপ্ত, নির্বিকার শীতল মূর্তির মাঝে ভীষণ ধরণের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেন শক্তিশালী কোনো ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে উপকূল ধ্বংস করে দেয়ার উদ্দেশ্যে। পরনের কালো শার্টের হাতা জায়দান লম্বা পা ফেলে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে নিলো একেবারে কনুই অবধি। গলার টাই এক টানে খুলে পেঁচালো হাতের মাঝে।
“আরে ভাইয়া? ফিল্ড ট্রিপ….আক্বক!”
আয়দান বলতে নিচ্ছিল কিছু একটা। পারলোনা। জায়দানের শক্তিশালী হাতের মুঠো ঘুষি পাকিয়ে আছড়ে পড়ল তার চোয়াল বরাবর। এতটা জোর সেই আঘাতে যে আয়দান ছিটকে পড়ল ডাইন ইন টেবিলের উপর। মেঝেতে পড়ে ঝরঝর করে ভেঙে গেল বেশ কতক কাঁচের গ্লাস।
“খোদা!”
জেসমিনের তীক্ষ্ণ ভয়ার্ত চিৎকার ধ্বনিত হলো। তবে ধ্বংসযজ্ঞের সামনে তা নিতান্তই তুচ্ছ। আয়দানের ঘাড় ধরে টেবিল থেকে টেনে তুলে পাশের দেয়ালে আছড়ে ফেলল জায়দান। মুখটা চেপে ধরলো শক্ত পাথুরে দেয়ালের মাঝে। যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠে ছাড়া পেতে মরিয়া হয়ে উঠল আয়দান।

“জায়দান, কি করছ তুমি?”
চেঁচিয়ে উঠলেন জাফর। অথচ এগিয়ে গিয়ে কাউকে থামানোর সাহস করলেন না। উভয় সন্তানের জন্মের পর থেকে কোনোদিন এই বাড়িতে এমন কোনো দৃশ্যের অবতারণা হয়নি বিধায় তিনি বুঝতে পারছেন না বাবা হিসাবে এই মুহূর্তে তার কি করা উচিত!
গোলমালের শব্দ শুনে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো রোজিনা এবং আরো দুজন স্টাফ। বিহ্বল চেয়ে দেখল সবকিছু। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সদা শান্ত শিষ্ট এই বাড়িটি ধারণ করেছে কুরুক্ষেত্রের রূপ।
“ভাইয়া! ব্যথা পাচ্ছি! মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে তোমার?”
আয়দানের ঘাড় ধরে চেপে সামনের দিকে ছুঁড়ে দিলো জায়দান। কোনোমতে নিজের গলা চেপে কেশে উঠল ছোট ভাই। নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। জিভের ভেতর র*ক্তের নোনতা স্বাদ টের পাচ্ছে। প্রচন্ড আক্রোশ নিয়ে ফিরে তাকালো আয়দান। কর্কশ কন্ঠে চিৎকার ছুঁড়ল,
“ইউ ম্যাডম্যান!”
“আই অ্যাম!”

চকিতে আয়দানের গলা চেপে ধরলো জায়দান। তার শক্তি হাতের মাঝে ছটফট করে উঠল ভাইয়ের শরীরটা।
“তোমাকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে তার অপব্যবহার করার জন্য নয়। অনেক সুযোগ দেয়া হয়েছে তোমায়, কিন্তু আজ তুমি সীমা লঙ্ঘন করে গিয়েছ।”
শীতল আতঙ্কে দৃষ্টি প্রসারিত হয়ে উঠল আয়দানের। চোখের সামনে যেন নিজের শান্ত – ভদ্র, পারফেক্ট ভাইকে নয়, বরং কোনো রুদ্রচিত্তকে দেখছে সে।
“যে স্বাধীনতা তোমাকে একজন নারীর সম্মান নিয়ে খেলতে শেখায়, সেই স্বাধীনতা গুঁড়িয়ে দেয়ার সময় হয়েছে!”
“জায়দান!”
নিজের বাহুতে জোরালো টান অনুভব করল জায়দান। আয়দানকে ক্ষণিকের জন্য ছাড়তে বাধ্য হলো। পিছন ফিরতেই দেখল নিজের পিতাকে। অত্যন্ত উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন জাফর। সঙ্গে চাপা ক্রোধ।
“কি করছ তুমি? আমার চোখের সামনে তোমার ছোট ভাইয়ের গায়ে হাত দেয়ার সাহস কোথায় পেলে তুমি?”
“আমি না দিলে কে দেবে? তুমি?”

তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল জায়দান। পরক্ষণেই গলা উঁচু করে ঘোষণা করল,
“এই বাড়িতে আদর দিয়ে একটা ভবিষ্যত রে*পিস্টকে বড় করে তুলছ তোমরা! ইউ থিংক আম গনা সিট ডাউন অ্যান্ড ফাকিং ওয়াচ?!”
জাফর বুঝি ঝটকা খেলেন একটা। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে একবার দেখলেন নিজের ছোট সন্তানকে। পরক্ষণেই ফিরে তাকালেন বড় জনের দিকে।
“কিঃ? কি করেছে ও?”
“আয়দান! ওই পশুটা আমার ছেলেটাকে মে*রে ফেললো গো!”
একেবারে অতর্কিতে চেঁচিয়ে উঠলেন জেসমিন। সবকিছু ফেলে তিনি ছুটে আসছিলেন কিন্তু একপাশে থাকা রোজিনাকে জায়দান ইশারা করতেই মেয়েটি ধরে ফেলল তাকে। নিজেকে ছাড়াতে রীতিমত ধস্তাধস্তি আরম্ভ করলেন জেসমিন। বিষাক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলেন জায়দানের উদ্দেশ্যে।
“একটা দানব তুই! ছোটবেলায় ভাইটাকে খেয়ে হজম করতে পারিসনি! এখন আবার ওকে খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে তোর তাইনা? এত লোভী তুই? জানোয়ার!”
নিজের বাবাকে পাশ কাটিয়ে মায়ের দিকে এগিয়ে গেল জায়দান। সুচারু নজরে দেখল তাকে। অতঃপর গভীর স্বরে বলল,

“যদি সঠিক সময়ে শাসন করতে, তবে আজ আমায় জানোয়ার হতে হতনা।”
জমে গেলেন জেসমিন। স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন জায়দানের পানে। এই ছেলে তার সঙ্গে এভাবে কথা বলা শিখল কবে? মায়ের চোখের বিস্ময় দেখার অপেক্ষায় জায়দান নেই। হনহন করে এগোলো সে রুদ্রমূর্তি হয়ে।
“মাম্মির সাথে উল্টোপাল্টা কথা বললে আমি ভুলে যাব তুমি আমার বড় ভাই!”
আয়দানের ঝাঁঝালো কন্ঠে জায়দান থামলো। কয়েক মুহূর্তের পিনপতন নীরবতা। যেন ঝড়ের পূর্ব মুহূর্তের শান্ত আকাশ। তারপরই ঘটল ঘটনাটি।
জায়দান নিজের ক্রিশ্চান লুউবটন পরিহিত পা খানি তুলে সজোরে লাথি হাঁকালো আয়দানের বুক বরাবর। মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়তে বাধ্য হলো ভাই তার। ধপাস করে সোফায় বসে পায়ের উপর পা তুলে বসল জায়দান। আয়দান তার পায়ের কাছে নুয়ে এক হাতে বুক খামচে ধরতেই অপর প্রান্তে নিজের পা ঠেসে ধরল সে। প্রচন্ড ব্যাথা এবং ক্রোধে হুংকার দিয়ে উঠল আয়দান,

“আমার সঙ্গে এত নীচ ব্যবহার করার তুমি কে?”
চেয়ারের হাতলে নিজের কনুই ঠেকিয়ে চশমার অন্তরাল থেকে ধারালো দৃষ্টিতে তাকাল জায়দান, গুরুগম্ভীর শক্তিশালী গর্জনের মতন শোনালো তার কন্ঠস্বর,
“এই বাড়ির বড় ছেলে।”
সকলে জমে গেল আশেপাশে। বিস্ফারিত নয়নে দেখতে লাগলো এমন একজনকে যে এর আগে কোনোদিনও নিজের পারিবারিক প্রতিপত্তি এবং ক্ষমতা সম্পর্কে মুখ খোলেনি। হতবিহ্বল আয়দানের চোখে চোখ রাখল জায়দান, দ্বিতীয় দফায় বলল,
“তোর মতন কাপুরুষকে শাসনে যদি পরিচয়পত্রের দরকার হয়, তাহলে শুনে রাখ, আমি আরেফিন বাড়ির বড় ছেলে আর জাফর আরেফিনের সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পদ- ক্ষমতার প্রথম মালিক!”
তুমি—সম্বোধন পেরিয়ে গিয়েছে জায়দান। এই কীটকে আপাতত আর ঘনিষ্ট সম্বোধনের ইচ্ছাটুকুও হচ্ছেনা। পায়ের জুতো তুলে বাকরুদ্ধ আয়দানের থুতনিতে ঠেকালো সে, চিকচিক করে উঠলো ঠোঁটের কোণে জমা র*ক্তবিন্দু। সেই দৃশ্য দেখে তীর্যক এক অভিব্যক্তি ফুটল জায়দানের চেহারায়।
“আব্বু ইহলোক ত্যাগের পর আমি চাইলে তুই প্রাসাদের রাজা, আর না চাইলে পথের ভিখিরি।”
“ভাইয়া!”

চিৎকার করে ঘুষি হাঁকাতে হাত উদ্যত হলেও আয়দান কিছুই করতে পারলনা। ক্ষিপ্রতায় তার কব্জিতে নিজের টাই বেঁধে সজোর টানে তাকে হাঁটুর উপর আছড়ে ফেলল জায়দান। পরাজিতের ভঙ্গিতে বিহ্বল তাকালো আয়দান।
“আমার ছেলেকে শেষ করে ফেললো! জাফর!”
জেসমিনের জোরালো আর্তনাদে টনক নড়ল পিতার। বরফ অবস্থান ছেড়ে তিনি এগোতেই যাচ্ছিলেন কিন্তু পারলেন না। বড় সন্তান হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। যেন তিনি পিতার স্তর থেকে সন্তানের স্তরে নেমে গিয়েছেন, অপরদিকে সন্তান পিতার স্তরে উঠে এসেছে এমনটাই অনুভূত হলো। প্রথমবারের মতন নিজের বড় ছেলেকে ভয় পেলেন জাফর! ভীষণ ভয়!
“বাবা মা হিসাবে যে শাসন তোমাদের করা উচিৎ ছিল, সেটা যখন করতে পারোনি, তখন এবার আমাকে বড় ভাই হিসাবে শাসনের দায়ভারটি ছেড়ে দিয়ে তুমি যাও আব্বু, নিজের ব্যবসা সামলাতে যাও! এই পরিবারে তোমার প্রয়োজন যেমন আগে পড়েনি, আজও পড়বে না!”

“মাম্মি! মাম্মি!”
ছটফট করতে লাগল আয়দান। জায়দানের হাঁটু খামচে ধরে নিজেকে রক্ষা করতে চাইল। পারলোনা।
তখনি সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ ঘটল আরেক দলের। ভীষণ রকমের বিস্মিত পরিবারটি দেখলো আরেক বিস্ময়কর দৃশ্য। ভেতরে এসেছে পুলিশের পোশাক পরিহিত একটি দল। এর মধ্যে অফিসার গোছের ব্যক্তিকে চেনা সকলের, জায়দানের একজন বন্ধু হিসাবে। পুলিশে কর্মরত, উচ্চপদস্থ একজনই, নাম নেওয়াজ। নেওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ বিচলিত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে মিসির।
“পুলিশ!”
অস্ফুট স্বরে কে যেন বলে উঠল কেউই বুঝতে পারলোনা। সকলের মস্তিষ্কই এই মুহূর্তে যেন শাট ডাউন পর্যায়ে চলে গিয়েছে। মিসির আশেপাশে চেয়ে শেষমেষ সোফায় জায়দান এবং তার পায়ের কাছে ছটফট করতে থাকা আয়দানকে দেখতে পেলো। জেসমিন রোজিনাকে ঠেলেঠুলে মিসিরের দিকে ছুটে গেলেন।
“মিসির! দেখ, দেখে ওই বজ্জাতটা পাগল হয়ে গিয়েছে! ওকে ধর, ওকে ধর তুই আমি আমার ছেলেটাকে বাঁচিয়ে আনি!”

“আন্টি, আন্টি আপনি শান্ত হন। কিছু হবেনা, এইতো আমি এখানে।”
জেসমিনকে বুকে টেনে খানিকটা জোর খাটিয়েই শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করতে লাগল মিসির। সবকিছুকে পেরিয়ে সমস্ত বাড়িজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো জায়দানের কন্ঠস্বর,
“নেওয়াজ!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২২

পুলিশের অফিসার বন্ধুটি এক পা অগ্রসর হলো, চোখেমুখে তীক্ষ্ম দৃষ্টি। জায়দান আয়দানের হাতে টাইয়ের জোর বাড়িয়ে টেনে ধরে হিসহিস করে উঠল,
“এই কুলাঙ্গারটাকে ধরে থানায় নিয়ে যা। যদি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপর পক্ষ মামলা না করে, তাহলে বাদী হয়ে মামলা দায়ের করব আমি স্বয়ং!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here