Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৪

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৪

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৪
জাবিন ফোরকান

“তুই একটা আহাম্মক, মীরা!”
আমার হঠাৎ গর্জনে বিছানার উপরে এক কোণায় কম্বল মুড়ি দিয়ে গুটিশুটি হয়ে থাকা মীরার চোখজোড়া অতি বিস্ময়ে জ্বলজ্বল করে উঠতে দেখলাম আমি। অথচ আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিনা। সকল আশঙ্কা, ভয়, বিরক্তি একত্রিত হয়ে ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে।
হাসপাতালে থাকতে রাজী হয়নি মীরা। রিপোর্ট আসার পরপরই চেকআপ করিয়ে তাকে বাসায় নিয়ে এসেছি। এই মুহূর্তে কি করব, কোথায় যাব, কি রেখে কি সামলাবো কিছুই আমার মাথায় ঢুকছেনা। নিজেকে কূলহারা কলঙ্কিনীর ন্যায় লাগছে।
আমি জানি মীরার সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি করা এই মুহূর্তে উচিত হচ্ছে না। কিন্তু ভেতর থেকে হতাশারা বেরিয়ে আসছে এক এক করে। ক্রোধ আমি কাকে দেখাবো? যার যত ক্ষতি করার ইতোমধ্যে করা হয়ে গিয়েছে। এমন ক্রান্তিকালীন সময়ে আদর আসছেনা আর আমার ভেতর থেকে। গুটিশুটি দিয়ে থাকা মীরাকে লক্ষ্য করে আরেক দফায় হতাশাবোধ করলাম। দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে নিজেকে সামলাতে চাইলাম।

“একটা ছেলে, তুই তাকে চিনিস না, জানিস না, দুইদিনের পরিচয়। আর তুই ওই ছেলের সাথে তার ফ্ল্যাটে চলে গেলি? লাইক, সিরিয়াসলি? তোর ব্রেইন কি গরু চড়াতে গিয়েছিল? এই ব্রেন নিয়ে তুই ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছিস কি করে?”
মীরার চোখমুখ থেকে বিস্ময়টুকু মুছে গেল সম্পূর্ণ। একদম স্থির চেয়ে আছে সে এখন আমার দিকে। বারংবার হাত মুষ্টিবদ্ধ করতে লাগলাম, আবার ছাড়তে লাগলাম।
“মানছি, আমি তোকে কখনো আমার এক্স হাসব্যান্ড কিংবা তার পরিবার সম্পর্কে বলিনি। কিন্তু, তুই যদি শুরু থেকে আমার সঙ্গে সবটা শেয়ার করতি তাহলেই তো আমি বুঝে যেতাম, মীরা! কেন লুকোচুরি করলি তুই? কার জন্য? ওই দুই দিনের কুলাঙ্গারটার জন্য? ওটাকে চিনিস তুই? মানুষের পয়দা জানোয়ার একটা! আর ওই জানোয়ারের জন্য তুই আমার সঙ্গে অবধি লুকোচুরি করতে দুইবার ভাবলি না!”
“তোর ভিকটিম ব্লেমিং শেষ হয়েছে সাবিন?”
মীরার ঠান্ডা কন্ঠে জমে গেলাম। চোখ পিটপিট করে তাকালাম। ঘোর থেকে বের হয়েছি এমন অনুভূত হলো ওই টানা নয়নজুড়ে শীতলতার প্রলেপ দেখে। আমার মীরা কোনোদিন এমন ছিলনা। অথচ আজ বাস্তবতার কষাঘাতে তার চেহারায় বরফকাঠিন্য।

“আমি মানছি আমার ভুল ছিল। কাউকে এতটা বিশ্বাস করা উচিৎ হয়নি। কিন্ত তুই আমাকে একটা কথা বল। আমার ঐ সময়টায় কি করা উচিত ছিল? বিশ্বাস না করা? সন্দেহ করা? যদি মানুষটা আদতে ভালো হত, যদি তার মাঝে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য না থাকতো? বিশ্বাস করে আমি ভুল করেছি, নাকি অন্যজন আমার বিশ্বাস ভেঙে অপরাধ করেছে, কোনটা? যদি এভাবেই পৃথিবীর মানুষগুলো একে অপরকে বিশ্বাস করা ছেড়ে দেয়, তাহলে মানবিক সম্পর্ক বলে আর কি থাকবে কিছু?”
নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম। মীরা বরাবরই আলাদা চিন্তার অধিকারী। তার মানসিকতা জাগতিক সকল ধূসরতা থেকে মুক্ত। সেখানে খেলা করে বৃহত্তর স্বার্থের গল্প।
“আমার সঙ্গে যা হয়েছে তার দায় সমাজ আমাকে দেবে, ঠিক তোর মতন! আমি কেন সেখানে গিয়েছি! কারণ কি জানিস? কারণ হলো আমি একটা মেয়ে। কেউ ওই ছেলেটাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে না একটা মেয়ের বিশ্বাস ভাঙার অধিকার তাকে কে দিয়েছে? ঠিক যেমনটা তুই করিসনি। আমি সমাজের কাছ থেকে সকল প্রকার আঘাত আশা করেছিলাম, কিন্তু অ্যাট লিস্ট তোর কাছ থেকে না!”

মনে হলো ভেতরে ভেতরে একটা ঝটকা খেলাম। নিদারুণ কষ্টে সংকুচিত হয়ে গেল হৃদয়। নিঃশ্বাস নেয়াও দুষ্কর ঠেকল। মীরার চোখেমুখে আমি স্পষ্টত দেখতে পাচ্ছি, আমার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে সে। এই সময়টায় আমার ভরসার দরকার ছিল তার, অথচ আমি নিজের জীবনের দুঃসহ যন্ত্রণার উৎস হিসাবে তাকেই দোষারোপ করে চলেছি!
“মীরা…আমি সরি, আমি মানে…”
সম্পূর্ণ উচ্চারণ করতে পারলাম না। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। সতর্ক হয়ে গেলাম উভয়ে। মীরার দিকে শেষ একবার অসমাপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে শেষমেষ আমি এগিয়ে গেলাম। দরজা খুলতেই সামনের দৃশ্য ক্ষণিকের জন্য আমায় স্তব্ধ করে দিলো।
সামনে দন্ডায়মান আমার প্রাক্তন শ্বশুড়, জাফর আরেফিন!
সুচারু বাদামী চোখ এবং ছ ফুট দীর্ঘ উচ্চতা, আরেফিন পরিবারের ছেলেদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। পিতার মধ্যে যা সীমাহীন। জাফরের মাঝে আলাদা একটা প্রভাব আছে, তিনি উপস্থিত থাকলেই সেটা টের পাওয়া যায়।
আমাকে হতবাক চেয়ে থাকতে দেখে প্রাক্তনের পিতা গম্ভীর গলায় শুধালেন,

“ভেতরে আসতে পারি? সাবিন?”
একটি ঢোক গিললাম। চোখেমুখে সন্দেহ ভর করলেও এই মুহূর্তে তাকে বাসায় ঢুকতে না দেয়ার বিশেষ কোনো কারণ নেই। দরজা ছেড়ে তাকে প্রবেশ করতে দিলাম। একটা চেয়ার টেনে এনে রাখলাম ছোট টি টেবিলের পাশে। তিনি বসলেন। একপাশের বিছানায় মীরা তখনো একই ভঙ্গিতে বসে আছে। তার চেহারায় এখন বিশেষ অনুভূতি নেই। একদম ঠান্ডা নয়নে দেখে যাচ্ছে জাফরকে। আমি নিশ্চিত, এই মেয়ের চিনতে বাকি নেই মানুষটা কে।
বিছানার এক কোণায় বসলাম আমি। অতিথি বাড়িতে আসলে শুরুতে অন্তত পানি অবধি সাধা উচিৎ। অথচ এই লোকটাকে সঙ্গত কারণেই আমার বিন্দুমাত্র আপ্যায়নের ইচ্ছা নেই। উল্টো, মুখটা দেখেই আমার আক্রোশ জেগে উঠছে। বিশেষ জানোয়ারটার প্রতিচ্ছবি ভাসছে চোখে। যদি আগের সাবিন হতাম, তবে চটাং চটাং দুটো কথা হলেও শুনিয়ে দিতাম। কিন্তু, আজকের হাসপাতালে বিনা বাক্যে জায়দান চলে যাওয়ার পর থেকে আমার হৃদয়ে যেন পাথর পড়েছে। যেকোনো কাজ করতে গেলে দুইবার ভাবে!
“শুরুতেই আমি দুঃখিত, অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা ঘটতে দেয়ার জন্য।”
জাফর শুরু করলেন। কন্ঠস্বর শুনেই অহংবোধ টের পাওয়া যায়। নেহায়েত বাধ্য না হলে কারো কাছে দুঃখ প্রকাশের অভ্যাস নেই তার। আলগোছে মীরার দিকে তাকালেন তিনি।
“আমার ছেলের পক্ষ থেকে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। একটা ভুল করে ফেলেছে সে। আশা রাখছি, বড় মন রেখে তুমি ওকে ক্ষমা করে দিতে পারবে।”

পিত্তি জ্বলে ওঠার মতন কথাটা শ্বশুড় মশাই অবশেষে উচ্চারণ করেই ফেললেন। মীরা জবাব দেয়ার আগেই রীতিমত অট্টহাসি হেসে উঠলাম আমি। হাঁটুর উপর চাপড় দিতে দিতে খিলখিলিয়ে বললাম,
“হাহাহা…নাইস জোক আব্বু…আই মিন মিস্টার আরেফিন!”
মুখজুরে গম্ভীর কালো এক ছায়া পড়ল জাফরের। তীক্ষ্ণ নয়ন মেলে পর্যবেক্ষণ করলেন তিনি আমায়। দুই হাঁটুর উপর কনুই রেখে ঝুঁকে এলাম। তীর্যক হাসি নিয়ে জানালাম,
“একটা ভুল? ক্ষমা? বড় মন? আফসোস! আমাদের মনটা বড়ই ছোট! এইতো, একটুখানি! পকেটে ভরে রাখতে পারবেন। এই মনে রাগ, ঘৃণা, যন্ত্রণা থাকলেও ক্ষমা পোষার জায়গা নেই।”
“সাবিন, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছিনা।”
“কিন্তু আমি আপনার সঙ্গেই কথা বলছি!”
সজোরে টেবিলের উপর এক চাপড় দিয়ে হুংকার দিয়ে উঠলাম। দৃশ্যমানভাবে কেঁপে উঠলেন জাফর। পরোয়া করলাম না বিন্দুমাত্র।

“একটা ভবিষ্যত ধর্ষ*ককে বাঁচাতে পাগলপ্রায় হয়ে ছুটে এসেছেন, মিডিয়া জানতে পারলে কি নিউজ করতে পারে বলুন তো? আপনি জেনে অবাক হবেন, আমার কাছে মিডিয়ার পাওয়ার অনেক! ভাইরাল মানুষ কিনা! আপনার মনে হয়, ওই জানোয়ারের পয়দাটাকে এত সহজে নিস্তার দিয়ে দেব? ও যে আমার প্রাণটা নিয়ে খেলা করেছে! প্রাণের দাম কি?”
জাফরের দৃষ্টিতে আতঙ্ক, শঙ্কা, হতাশা, লজ্জা এবং ক্রোধের সংমিশ্রণ দেখলাম। কিছুক্ষণ নীরবে চেয়ে রইলেন তিনি, বরাবর আমার নয়নমাঝে। অতঃপর অতি ধীরে নিজের গায়ে জড়ানো দামী স্যুটের পকেটে হাত গুঁজলেন। ভেতর থেকে যা বের হলো তা মীরার জন্য অপ্রত্যাশিত হলেও আমার জন্য মোটেও নয়।
চেকবুক।
ধনীদের চিরায়ত ক্ষমতা। যেকোন সমস্যা সমাধানের মোক্ষম হাতিয়ার।
আমার এবং মীরার সামনেই একটা ব্ল্যাংক চেকে সাইন করলেন জাফর। এতক্ষণে তিনি বুঝে গিয়েছেন, মীরার গার্জিয়ান আমিই। তাই চেকটা টেবিলের উপর এগিয়ে দিয়ে চোখে চোখ রেখে বললেন,

“নিজের ইচ্ছামতো যেকোন সংখ্যা বসিয়ে নিও। শুধু আমার ছেলেটাকে ছেড়ে দাও। আইনী ঝামেলায় ওকে জড়িও না। বিনিময়ে আয়দান আর কোনোদিন তোমাদের জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করবে না সেই গ্যারান্টি আমার। ক্ষমতার প্রদর্শন না ভেবে একজন পিতার করজোড় আবেদন ভেবে নাও।”
আমাদের জবাবের অপেক্ষা অবধি করলেন না জাফর। সটান উঠে দাঁড়ালেন। স্যুটের পকেটে কলম এবং চেকবুক রেখে ঘুরে দেখলেন একবার মীরাকে।
“আমি সত্যিই নিজের ছেলের কাজে লজ্জিত। এই বয়সে এসে চাইনা তার জীবনে বড় কোনো ক্ষতি হোক। একটা পরিবারের সম্মান এবং মর্যাদার প্রশ্ন। ওকে ওর বড় ভাই থানায় পাঠিয়ে দিয়েছে, ওর মা ভীষণ রকমের চিন্তিত হয়ে আছে। চাইলেই আমি অন্য পন্থা অবলম্বন করতে পারি, কিন্তু এক্ষেত্রে করলাম না কারণ আমি জানি তোমার ক্ষতি হয়ত কোনো কিছু দিয়েই পুষিয়ে দেয়া যাবেনা। তাই আমার সামান্য উপহারটুকু গ্রহণ করে এই ব্যাপারটাকে এখানেই ছেড়ে দাও। মামলা মোকদ্দমার ঝুট ঝামেলা মেয়েদের শোভা পায়না।”

“হিপোক্রেট, নারসাসিস্ট, কোল্ড ব্লাডেড ম্যানিপুউলেটর। আরেণ্ট ইউ?”
দাঁতে দাঁত পিষে উচ্চারণ করলাম। কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো শুধু আমার। টেবিল থেকে ব্ল্যাংক চেকটা তুলে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে দিলাম জাফরের মুখ বরাবর। আমায় স্থির চেয়ে দেখল মীরা, কোনো প্রতিক্রিয়া করলনা। জাফরের দৃষ্টি প্রসারিত হলো। শীতল ক্রোধ চেপে দুঃসহ্ দৃষ্টিতে আমায় দেখলেন তিনি।
“এক ছেলের জন্য দুনিয়া কোরবানী, অপর ছেলে বুঝি বন্যার পানি?”
আমার হঠাৎ কথায় জাফর খেঁকিয়ে উঠলেন,
“সাবিন! মুখ সামলে কথা বলো! জানো তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছো? আমি তোমার গুরুজন!”
“অ্যাই, একদম চুপ! আপনি জানেন না আমি কত্ত বড় বেয়াদব? সেখানে গুরুজনের সম্মান আশা করেন কিভাবে? গুরুজন যদি কুকুরের চাইতেও অধম হয়, তাহলে তাকে জন্তু ট্রিটমেন্ট দেয়ার মতন বেয়াদবির ক্ষমতা এই সাবিনের আছে! আর ভুলে যাবেন না, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন আমার বাসার ভেতর! এই বাসায় আমি রানী না, রাজা!”
জাফরের চেহারায় বাকরুদ্ধ অভিব্যক্তি ভর করল। ক্রোধে আমার সমস্ত শরীর তিরতির করে কাঁপছে। কোনো সীমা পরিসীমা নেই এই অনুভবের। একচুল দ্বিধা করলাম না, চড়া গলায় গর্জে উঠলাম,

“আইন? আইন যে আপনার মতন মানুষের প্যান্টের পকেটে বাস করে তা আমার থেকে ভালো কে জানে? আপনার ঐ অজাতের পয়দাটাকে পেলে আমি আগে নিজে ধোলাই করব। অতঃপর যদি একটাও হাড়গোড় আস্ত পাওয়া যায়, তাহলে ওটাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলব। পুরুষের তো আবার, খুবই অবাধ্য নাছোড়বান্দা এক অতি বিশেষ অঙ্গ থাকে তাইনা? যেখানে সেখানে ঢুকিয়ে দিতে খুব মজা লাগে! ওই অজাতটার ওটাকে আমি টুকরো টুকরো করে রাস্তার কুত্তাদের দিয়ে খাওয়াবো! ওই ব্যথায় বাঁচবে না আপনার আদরের দুলাল! একবার যদি ধরতে পারি, তাহলে ওটাকে খু*ন করে আমি নিজে জেলে যাব !”
কাঁপতে লাগলেন জাফর। ভয়ে নাকি ক্রোধে বুঝতে পারলাম না।
“বদ্ধ উন্মাদ তুমি মেয়ে! একটা আস্ত ডাইনী!”
“হাহা! এতদিনে চিনলেন নাকি আমায় ডিয়ার এক্স শ্বশুড়? আপনি তো আরো আগেই আমার আসল রূপ জেনেছিলেন, তাই না?”

দাঁতে দাঁত ঘষলেন জাফর। অন্তিম মুহূর্তে আমার সঙ্গে মোকাবেলা করতে না পেরে তাকালেন মীরার দিকে।
“এই মেয়ের মাথা গরম। তুমি তো ঠান্ডা মাথার মেয়ে, তবে শুনে রাখো। আমি হুমকি দিতে চাইনি, কিন্তু এখন কিচ্ছু করার নেই। আইন রুখতে যা যা করার আমি করব। সেহেতু তোমার ভালো এটাই হবে মহান হয়ে ক্ষমা করে চুপচাপ যা দেয়া হয়েছিল তা পকেটে নিয়ে নেয়া। স্বীকার করো কিংবা না করো, এই পৃথিবী টাকার গোলাম। তুমি কিংবা তোমার এই মাথা নষ্ট বান্ধবী সেই নিয়মের বাইরে নও। তার উপর মেয়ে মানুষ। মেয়েদের তো টাকার চাইতে ইজ্জত বড়!”
জাফর আর দাঁড়ালেন না। ঘুরে গেলেন। হনহন করে হেঁটে দরজা খুলে বাসার বাইরে বেরিয়ে গেলেন। তীব্র ক্রোধে আমি দরজা বরাবর জোরসে এক লাথি হাঁকিয়ে সেটা বন্ধ করলাম। আপনমনে খেঁকিয়ে উঠলাম,
“পুরো গুষ্টি নষ্টের আখড়া!”
“নাহলে কি একজনের প্রতিশোধ অন্যজনের উপর নিতে পারে?”
পিছন থেকে মোলায়েম অথচ শীতল কন্ঠটি ভেসে আসতেই জমে গেলাম। পাই করে ঘুরে দাঁড়ালাম। দেখলাম পাথরমূর্তি মীরাকে। তখনো ওই একই ভঙ্গিতে বিছানার কোণায় বসে আছে।
“মীরা! আসলে…”
“আমার খুব ক্লান্ত লাগছে সাবিন। লাইট টা অফ করে অন্য রুমে যা প্লীজ। আমি একটু ঘুমাবো।”

মধ্যরাত।
নিস্তব্ধপুরী আরেফিন বাড়ি। এমনিতেও এই অভিজাত মহল অতীব শান্ত। তবে আজকের প্রগাঢ় নিস্তব্ধতার বিশেষ উৎস রয়েছে। কেমন একটা থমথমে পরিবেশ। ভারী বাতাস। এই বাতাসে প্রাণভরে প্রশ্বাস টানাও দায়।
আয়দানকে নেওয়াজ নিয়ে গিয়েছে। যদিও মামলার পূর্বে এভাবে থানায় নেয়ার নিয়ম নেই, তদুপরি বিশেষ ব্যবস্থায় করা হয়েছে। কারণ, আগামীকাল দুপুরের মধ্যে মীরার পক্ষ থেকে আইনী ব্যবস্থার ঘোষণা না আসলে জায়দান নিজে মামলা করবে, এমনটাই সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আজ মিসির নিজের বাড়ি ফিরে যায়নি। থেকে গিয়েছে জেসমিনের কাছে। কারণ, আয়দানের অনুপস্থিতিতে একমাত্র সেই জেসমিনকে সামলাতে সক্ষম। নিজের পরিবারের অন্য কারো সঙ্গেই জেসমিন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। আয়দানের শোক যে দারুণভাবে জননীকে ঘায়েল করবে, তা জায়দান খুব ভালো করেই জানতো।
এমতাবস্থায়ও ডেডলাইনের আগে সেমিস্টার পেপার প্রশ্নপত্র সাবমিট করে তবেই বিছানায় গা এলিয়ে শুতে পারল জায়দান। চশমার আড়ালে বাদামী জহরতজোড়া নিবদ্ধ সিলিংয়ের উদ্দেশ্য। আধুনিক ইন্টেরিয়র এবং ঝাড়বাতির জৌলুসের ছোঁয়া লাখবার দেখা হয়ে গিয়েছে তার। বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই তাই এর মাঝে। দুই চোখে আজ ঘুম আসবেনা জায়দান জানতো। তবে নতুন করে স্লিপিং মেডিসিন নেয়ার ইচ্ছা হচ্ছে না।

জায়দান আজকাল একটি অনুভূতি আবিষ্কার করেছে। সেই অনুভূতির নাম, কষ্ট। বিশেষ এই অনুভূতি চেনার পর থেকে এটি ছাড়া আর কিছুই অনুভূত হচ্ছে না হৃদয়জুড়ে। আপনজনের হাসিতে কষ্ট, তাদের কান্নায় কষ্ট, বাস্তবতায় কষ্ট, পৃথিবীতে কষ্ট, সর্বোপরি এই জীবনটাই কষ্ট! মানুষের নাকি আরো নানান অনুভূতি হয়? খুশির, আনন্দের, বিস্ময়ের, ভয়ের, ভালোবাসার! সেসব জায়দানের জীবনে কোথায়? আছে আদও? নাকি সকল অনুভূতিই পর্দা টেনেছে কষ্টের আড়ালে?
খানিকটা চোখ বোঁজার চেষ্টা করল জায়দান। অথচ চোখের সামনে যে মুখটা ভেসে উঠল, সেটা সে কোনোদিনও কল্পনা করতে চায়নি। হঠাৎ দুঃস্বপ্ন দেখলে যেমন ছটফট করে মানুষ জেগে ওঠে, তেমন করেই উঠে পড়ল জায়দান। সটান সোজা হয়ে বসল। প্রচন্ড বিতৃষ্ণা এবং কষ্টে আবারো জর্জরিত হলো তার অস্তিত্ব।
হাত বাড়িয়ে নাইটস্ট্যান্ড থেকে নিজের ফোনটা নিলো জায়দান। বিশেষ একটি নাম্বার বের করল। এই নাম্বার তার কাছে থাকলেও কোনোদিন যোগাযোগ করা হয়নি। অধিকাংশ কথাবার্তা ই মেইলেই আদান প্রদান করেছে। আজ, সকল নিয়ম তুচ্ছ করে জায়দান ফোন করল। প্রথমবারের মতন সুপুরুষের তকমায় মধ্যরাতে এক রমণীকে কল করার মতন দাগ লাগতে দিলো। ওপাশ থেকে রিসিভ হতে স্বাভাবিক কারণেই বেশ খানিকটা সময় লাগলো। অতঃপর ভেসে এলো ঘুম জড়ানো আধভাঙা কন্ঠ,

“হ্যালো?”
“আরওয়া। আমি জায়দান আরেফিন বলছি।”
এক মুহুর্ত নীরবতা। আরওয়া যে বিস্মিত তা নীরবতাতেই স্পষ্ট। সামান্য গলা খাঁকারি দিলো জায়দান। আগে কোনোদিনও সে ফোন করেনি এই কথা উত্থাপনের আগেই শীতল গলায় বলল,
“আমার আপনাকে একটা জরুরী প্রশ্ন করার ছিল। যদি এখনই উত্তর দিতে পারেন, তাহলে কৃতজ্ঞ থাকব।”
“বলুন, কি প্রশ্ন?”
নিজেকে অতি কষ্টে স্বাভাবিক করেছে তা রমণীর হালকা কম্পিত কণ্ঠস্বরে বোঝা গেল। জায়দান সময় ক্ষেপণ করলোনা।
“আমাকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে আপনার মতামত কি? আপনার পরিবারের নয়, ব্যক্তিগত মতামত জানাবেন। হ্যাঁ, নাকি না?”
ভারী এক নিশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো।

“আপনি কি আমার উত্তর জানতে চাইছেন?”
“জ্বি। আশা রাখছি এতদিন একসাথে ঘোরাফেরার পর আপনার মতামত তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা।”
“সেসব জানতে মধ্যরাতে ফোন করেছেন? আপনি বেশ ইউনিক মানুষ দেখছি!”
“মধ্যরাতে ফোন দেয়ার জন্য দুঃখিত। কিন্তু উত্তরটা আমার এখন জানা জরুরী।”
“কেন জানা জরুরী?”
এই প্রশ্নের জবাব জায়দান দিলোনা। আরওয়া মোলায়েম হাসলো।
“ঠিক আছে। আমি আপনাকে আর খুব বেশি জ্বালাতন করবনা। আমার উত্তর হলো….”
যেন নাটকীয় ভঙ্গি আনতেই এমন বিরতি। অতঃপর আরওয়ার কন্ঠস্বর ধ্বনিত হলো ফোনের ওপাশ থেকে,
“হ্যাঁ। আমি আপনাকে বিয়ে করতে রাজী, মিস্টার জায়দান আরেফিন।”
হৃদপিন্ড খামচে ধরলে একটা অস্বস্তিকর ব্যথা ছড়িয়ে পরে বুকে। তেমনটাই টের পেল জায়দান। ফোনে চেপে বসল তার আঙুল। একটি ঢোক গলাধঃকরণ করল সে। অতঃপর সদা নির্লিপ্ত প্রাণহীন কন্ঠে বলল,

“ওহ। ধন্যবাদ।”
“শুধুই ধন্যবাদ? আর কিছু বলবেন না?”
“হুম। বলব। আপনার আমার বিয়েটা তবে এই মাসের শেষেই হচ্ছে। ভালো থাকবেন। শুভরাত্রি।”
আরওয়া বোধ হয় কিছু বলতে যাচ্ছিল। অথচ জায়দান সুযোগ দিলোনা। যেমন নিজের মর্জিমত ফোন করেছিল, তেমন মর্জিমত ফোনটা কেটেও দিলো।
ধপাস করে পুনরায় বিছানায় নিজেকে এলিয়ে দিলো জায়দান। স্থির চেয়ে থাকলো শূন্যের উদ্দেশ্যে। পরক্ষণে চোখ বুঁজে গভীর এক প্রশ্বাস টানলো।
একদম হঠাৎ করেই তার রুমের দরজায় ভীষণ ব্যস্ততায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
“জায়দান? জেগে আছিস? দরজা খোল, দ্রুত!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৩

মিসিরের উত্তেজিত কন্ঠস্বর শুনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জায়দান উঠে পড়ল। নাইটস্ট্যান্ড থেকে চশমা তুলে চোখে দিয়ে দরজা খুলে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে মিসিরের আতঙ্কিত চেহারা নজরে এলো।
“কি হয়েছে?”
মিসিরের কথা জড়িয়ে গেল যখন সে জানালো,
“আ..আন্টি…খুব সম্ভবত স্ট্রোক করেছে!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here