Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৮

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৮

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৮
জাবিন ফোরকান

আমার আজ কান্না পাচ্ছে না। বরং হাসি আসছে। জীবন আমাকে এত সস্তা সস্তা কাহিনী দেখায় যে নিজের ভাঙাচোরা জোড়াতালি দেয়া ভাগ্যটার উপর না হেসে পারিনা।
“আরে, সাবিন? আপনি এসে পড়েছেন?”
উৎফুল্ল কন্ঠস্বরটি আমার কানে যেতেই মাথা হেলিয়ে তাকালাম। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। ম্যাজেন্ডা বর্ণের একটা অরগাঞ্জা শাড়ী পরনে হাস্যোজ্জ্বল রাঙা চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে আরওয়া। এগিয়ে এলো সে আমার দিকে।
“আমি খুবই কৃতজ্ঞ যে আপনি আজ এখানে এসেছেন। আপনার পিৎজা শহরে খুবই জনপ্রিয়। আমার বন্ধু বান্ধবেরা তো আবদার করেই রেখেছিল, মেন্যুতে পিৎজা আসবে তো একমাত্র স্যাভেজ সাবিনের পিৎজা স্টেশন থেকেই!”
আরওয়ার হাসি দেখে আমার ঠোঁটজোড়া মন্থর গতিতে বাঁকা হলো খানিক।

“জেনে খুশি হলাম, আমার এত কদর।”
“অবশ্যই। কদর আপনি ডিজার্ভ করেন। এই দেখেছ? আমিও কেমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনাকে ওজন বওয়াচ্ছি। আসুন এদিকে, টেবিল…”
মাথা ঝাঁকিয়ে মাপা মাপা পদক্ষেপে এগোলাম। ছেলেরা খাবারের টেবিলের মাঝ বরাবর কেক সেট করে ফেলেছে। আমি পিৎজা বক্সগুলো একপাশে রেখে ট্রেতে সাজাতে সাজতে তাদের বাকিগুলো নিয়ে আসতে ইশারা করলাম। তারা চলে যেতেই আনমনে কন্ঠে আরওয়াকে বললাম,
“কেকের উপর কিছু লিখতে হবে? আপনি তো স্পেসিফিকালি কিছুই বলেননি। আমিও জানতাম না অনুষ্ঠানটা কিসের ছিল!”
দাঁতে দাঁত পিষে ফেললাম শেষ দিকে, তবে মুখের অভিব্যক্তি যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখতে চাই। আমার প্রধান লক্ষ্য এখন যত দ্রুত সম্ভব এই স্থান ত্যাগ করা। আরওয়া আমার দিকে নরম দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
“আমি দুঃখিত। আপনার যদি খারাপ লাগা কাজ করে থাকে, তবে সেটা একদমই আমার উদ্দেশ্য ছিলনা। আমি বরং অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়ে নেব। আপনি..”

“আমিই লিখব আরওয়া!”
গুরুগম্ভীর আওয়াজে উত্তর করলাম।
“পিৎজা স্টেশন সম্পূর্ণ সার্ভিসই দেয়। নিজেদের প্রোডাক্ট অন্য কারো কেয়ারে ছেড়ে দেইনা আমরা।”
আরওয়া আমার দিকে স্থির চেয়ে রইল। আমি বেশি পাত্তা না দেয়ার চেষ্টা করে চকলেট কোণ তুলে নিলাম। বললাম,
“কি লিখতে হবে?”
“জায়দান আরেফিন এক্স আরওয়া এহসান।”
বুকের ভেতর যে খামচে ধরার মতন অনুভূতি হলো সেটা তীব্রভাবে উপেক্ষা করলাম। হাত সামান্য কাঁপলো। নিজের অন্তরকে শাসিয়ে দ্রুতহাতে লিখতে শুরু করলাম।
“আরে আরওয়া, তুই এখানে কি করছিস? তোকে তোর ড্যাড খুঁজে…!”
হঠাৎ করেই দৃশ্যপটে উদয় হলেন রুশমি এহসান। ভদ্রমহিলা আরওয়ার মা, চেনাজানা হয়েছিল আমার নিজের বিয়ের রিসিপশনে। ওইটুকুই। টেবিলের কাছাকাছি এসে বলতে বলতেই থমকে গেলেন তিনি আমাকে দেখে। নিষ্পলক চেয়ে রইলেন। অপরদিকে আমি এক নজর দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিজের কাজে মনোনিবেশ করলাম।
“এই মেয়ে এখানে কি করছে?”

খানিকটা উত্তেজিত কণ্ঠস্বরেই বলে বসলেন রুশমি। তাতে আশেপাশের অনেকেরই মনোযোগ আকর্ষিত হলো। ফিরে তাকাল সকলে। আরওয়া খানিকটা ব্যাস্ত হয়ে মায়ের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো।
“মম, আস্তে। এভাবে রিয়্যাক্ট করার কি আছে? ওনাকে আমি ডেকেছি, আর উনি কাজে এসেছেন।”
“তোর মাথা ঠিকঠাক আছে? তুই জানিস না এই মেয়েটা কে? কোন আক্কেলে তুই আমার বাড়ির চৌকাঠে এই মেয়েকে ঢুকতে দিলি?”
“প্রথম কথা…”
আমার কন্ঠস্বর ধ্বনিত হতেই সকলের মনোযোগ আকর্ষিত হলো। রুশমি ভ্রু কুঁচকে নিঃশব্দে তাকালেন আমার দিকে। হাত থেকে চকলেট কোণ রেখে দিয়ে নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করলাম,
“আমার একটা নাম আছে, সাবিন, ইন কেইস ইউ ফরগট। আর আমি এখানে বিজনেসের কারণে এসেছি। আপনার মেয়ে আমার কাছে পিৎজা আর কেক অর্ডার দিয়েছিল, সেটাই ডেলিভারি দিতে এসেছি। এর মধ্যে স্থান, কাল, পাত্রভেদে এত হম্বিতম্বি করার কিছু দেখছি না, আন্টি।”

“ও অর্ডার দিলো বলেই তোমার চলে আসতে হলো? তোমার একটুও লজ্জা নেই? ওহ, নেই তো। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। জেসমিন আমাকে বলেছিল, তোমার মতন বেহায়া, বেশরম…”
“কোয়াইট! আপনি গুরুজন এবং কাস্টমার বলে আমাকে যাচ্ছেতাই বলে যাবেন, এবং আমি চুপচাপ শুনে জ্বি ম্যাম বলব ভেবে থাকলে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। এতই সমস্যা হলে আপনার মেয়েকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, শহরে এত এত সার্ভিস শপ থাকতে সে কেন আমাকেই অর্ডার দিয়েছে? তাও অনুষ্ঠানের উপলক্ষ্য না জানিয়ে? খুব বেশি কাকতালীয় হয়ে গেলো না বিষয়টা? নাকি আপনার মেয়ে চেয়েছিল, তার উড বি ফিয়ন্সের এক্সের সামনে শো অফ করতে?”
দৃশ্যমানভাবে আরওয়াকে চমকে উঠতে দেখলাম। আমার সুচারু দৃষ্টি তার এবং রুশমির মাঝে ঘুরে বেড়ালো। রুশমি খানিকক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে থেকে আড়চোখে একবার নিজের মেয়েকে দেখে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তবে আরওয়া হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলো।
“মম, প্লীজ তুমি সিন ক্রিয়েট করোনা। সাবিন আমাদের গেস্ট, দ্যাটস ইট। তুমি যাও ড্যাডের কাছে, আমি আসছি।”

রুশমি রাগ চেপে ফোঁসফোঁস করে বললেন,
“যাচ্ছি। পেমেন্ট করে এই মেয়েকে বিদায় করো তাড়াতাড়ি।”
গটগট করে হেঁটে চলে গেলেন তিনি। তৎক্ষণাৎ আমার দিকে ফিরে তাকাল আরওয়া। চেহারায় আগের সেই উচ্ছল প্রাণবন্ত ভাবটি আর নেই। এর বদলে এক অদ্ভুতুড়ে ভার।
“আপনি বোধ হয় আমাকে ভুল বুঝেছেন, সাবিন।”
“আমি আপনাকে কেমন বুঝেছি না ভবিষ্যতে বুঝব সেটাকে নিজের মাথাব্যথার কারণ বানানোর প্রয়োজন নেই। আপনার মা ঠিকই বলেছে, পেমেন্ট ক্লিয়ার করে দিন, আমি চলে যাই।”
“খেয়ে যাবেন।”
তীর্যক হাসলাম। টেবিলের উপর দুহাত রেখে ঝুঁকে রমণীর নয়নে নয়ন রেখে বললাম,
“আরওয়া। হয় আপনি খুব বেশি বোকা, নয়ত খুব বেশি ধুরন্ধর!”
আমাদের নিবিড় দৃষ্টি বিনিময় দীর্ঘ হলো। যেন কেউ কারো নয়ন থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেই আমাদের পরাজয় ঘটবে। ঠিক তখনি গেটের কাছের গুঞ্জণ বেড়ে গেল। মাথা কাত করে তাকাতেই দেখলাম দূরে গেটের ওপাশে কয়েকটি গাড়ি এসে থেমেছে। বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলনা আমার।
“আপনার পেমেন্ট। থ্যাংকস ফর দ্যা সার্ভিস।”

খানিকটা গম্ভীর মুখেই বলল আরওয়া, যেন আমার প্রতি তার অভিমান জন্মেছে! অভিমান? আসলেই কি তাই? পরিহাসের হাসি হেসে টেবিলে ঠেলে দেয়া টাকার এনভেলপ নিজের কার্ডিগানের পকেটে রাখলাম। আরওয়া আর দাঁড়িয়ে নেই, গুটিগুটি পায়ে হেঁটে অতিথিদের ভিড়ে আড়াল হয়ে গিয়েছে। সময় ঘনিয়ে এসেছে, আমারও আর অপেক্ষা করা উচিৎ হচ্ছেনা। গেটের কাছে বরপক্ষের আগমন ঘটেছে বিধায় ভিড় জমে গিয়েছে খানিকটা।
অনুভব করলাম আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে। হাত দুটো বারংবার ঘেমে উঠছে। ছেলেদের তাড়া দিলাম কাজ শেষ করতে। দুজনই টেবিলে এনে অবশিষ্ট পিৎজা বক্সগুলো সাজিয়ে রাখছে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা আর। তাই গলা উঁচু করে বললাম,

“তোমরা কাজ শেষ করে ভ্যানে চলে আসো। আমি অপেক্ষা করছি।”
এটুকু বলেই ঘুরে দাঁড়ালাম। একটি প্রশ্বাস টেনে নিজের হৃদস্পন্দন শান্ত করার বৃথা প্রচেষ্টা করতে করতে দৃষ্টি লুকিয়ে এগোলাম। কিন্তু চাইলেই কি অবাধ্য নয়নকে ঢেকে রাখা যায়?
গোটা আরেফিন পরিবারের আগমন ঘটেছে প্রাঙ্গণে। এহসান পরিবারের হর্তাকর্তা এবং গুরুজনেরা ব্যস্ত কোলাকুলি করে অতিথি আপ্যায়নে। জামদানী শাড়ী পরনে জেসমিনকে দেখলাম। হাসিমুখে বাক্য বিনিময় করছেন রুশমির সঙ্গে। উনি না চোদ্দ দিন আগে স্ট্রোক করেছিলেন? হায় রে! কে বলবে সেই কথা এখন তার হাসিখুশি চেহারা দেখলে? পাশেই নেওটা আয়দান দাঁড়ানো। পাঞ্জাবী পরনে, কুচকুচে কালো। একদম ওই ছেলের মনের মতোই রংটা! এই ছেলেকে একা পেলে আমি এই মুহূর্তে জুতো খুলে আরেক দফায় ঠাটাতাম! প্রচন্ড ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে দুহাত মুষ্টি চেপে ফেললাম, হালকা নখ গেঁথে গেল বুঝি চামড়ায়, তবুও ছাড়লাম না। ছেলে নিজের মায়ের কাঁধে হাত জড়িয়ে খানিক উদ্বিগ্নতা এবং সতর্কতা মাখা চেহারায় আশপাশ দেখছে। জেসমিনের বডিগার্ড যেন! অপর দিকে জাফরকেও দেখলাম, আরওয়ার বাবার সঙ্গে কথা বলছেন। দেখতে ইচ্ছা হলনা আর, চোখ সরিয়ে নিতেই অবশেষে আমার নয়নজোড়া খুঁজে পেলো তাকে।

গাঢ় খয়েরী বর্ণের স্যুট অঙ্গে জড়ানো। সুউচ্চ দীর্ঘ অবয়বে আবৃত মসৃণ বস্ত্র হালকা সূর্যের আভায় অদ্ভুত দ্যুতি ছড়াচ্ছে। বুকপকেটের কাছে স্বর্ণালী জ্বলজ্বলে গোলাপের আদলে তৈরি ব্রুচ্। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা, তার ওপাশে শীতল বাদামী জহরতজোড়া। চশমার লেন্সের উপর কপালের এক গুচ্ছ চুল গড়িয়ে পড়েছে। তাতে ভিন্ন রকমের এক সত্তা প্রকাশ পাচ্ছে মানুষটার।
পদক্ষেপ থমকে গেল আমার। অনুভব করলাম, পৃথিবীটা এখানেই থেমে গিয়েছে বুঝি। দৃষ্টিসমুখ থেকে সকলকিছু গায়েব হয়ে গেল। যেন অবস্থান শুধু আমার আর তার। আমার প্রাক্তনের, আমার না পাওয়া ভালোবাসার, আমার না হওয়া একটা সুখের সংসারের।
জায়দানের সঙ্গে দাঁড়ানো মিসির। অফহোয়াইট বর্ণের স্যুট। মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে জায়দানকে হয়ত কিছু বলছিল সে। বেশ মনোযোগ দিয়ে শূন্যের দিকে চেয়ে তার কথা শুনছে জায়দান। একদম হঠাৎ করেই মিসিরের চোখ ঘুরে এসে পড়ল আমার উপর। তৎক্ষণাৎ জমে গেল সে। ঠোঁট দুটো চেপে ফেললো। তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে জায়দান মাথা হেলিয়ে তাকালো।

অজান্তেই শিহরিত হলাম। সামান্য কেঁপে উঠলাম ওই বাদামী সমুদ্রের গভীর নজর টের পেয়ে। অথচ নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে পারলাম না হাজার চাওয়া সত্ত্বেও। জায়দান স্থির তাকিয়ে রইল, বরাবর আমার নয়নমাঝে। মুখের অভিব্যক্তির কোনো পরিবর্তন ঘটলনা। শুধুমাত্র ওই চোখজোড়ার মাঝে বুঝি অব্যক্ত কোনো ঝিলিক খেলে গেল। হয়ত এসব আমার কল্পনা? ওই চোখে আমি অনুভূতি দেখতে চাই বিধায় দেখছি? কে জানে!
শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করে সহসাই নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। তাকালাম ভিন্নদিকে। দুবাহু আনমনে বুকের উপর চাপলাম। কেমন যেন ব্যথা টের পাচ্ছি ভেতরে। এখানে থাকলে আমি নিশ্চিত টিকতে পারবনা। পা চালালাম দ্রুত। বেরিয়ে যেতে চাই যত জলদি সম্ভব।
“আরে, আপনি সাবিন না?”
কোথা থেকে ঠিক কে বলে উঠল বুঝতেও পারলাম না। গেটের কাছে প্রায় পৌঁছেই গিয়েছিলাম কিন্তু এর আগেই আমার হাত ধরে টেনে কেউ লনের মাঝখানে নিয়ে এলো। আশেপাশে তাকিয়ে বুঝলাম কিছু যুবক যুবতী এবং কিশোর ছেলেমেয়েরা। ফ্যালফ্যাল করে তাকালাম তাদের দিকে।

“হ্যাঁ?”
“আপনি তো একদম সোশ্যাল মিডিয়া ভাইরাল, সাবিন আপু! আপনি এখানে এসেছেন!”
“ইয়ে মানে কিছু ডেলিভারির কাজ ছিল…”
“ইয়েস! আপু, দূর্দান্ত একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে এখানে। আপনি তো চমৎকার সুন্দর নাচতে পারেন। ফেসবুকের ভিডিওতে দেখেছি।”
ভীষণ বিব্রতবোধ করলাম। আমি আর মীরা বেশ কিছুদিন আগে একটা নাচের ভিডিও করেছিলাম অবশ্য, সেটাই দেখেছে হয়ত এরা।
“আমাদের সাথে নাচুন না, সাবিন আপু! প্লীজ! একটা নাচ!”
আঁতকে উঠলাম রীতিমত।
“না না! আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি কিন্তু আমার সত্যিই যেতে হবে।”
“এভাবে বলছেন কেন? সবাই যখন এত রিকুয়েস্ট করছে তখন রাখুন সকলের কথা? এই আনন্দ অনুষ্ঠানে সামিল হন আমাদের সাথে?”

কথাটা যে কে উচ্চারণ করেছে তাকে দেখতেও পেলাম না ভিড়ভাট্টার মধ্যে। একইসাথে অস্বস্তি এবং মিশ্রিত এক আতঙ্ক কাজ করছে আমার মাঝে।
“আমি সত্যিই দুঃখিত কিন্তু, সম্ভব না। আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি না এই মুহূর্তে আনন্দ উদযাপনে। অন্য কোনো সময়ে যদি ভাগ্যে থেকে থাকে তবে অবশ্যই। আপনারা প্লীজ এনজয় করুন, আসছি আমি।”
কোনমতে বলেই চকিত পায়ে উল্টো ঘুরলাম। তবে বেশিদূর যেতে পারলাম না। কয়েক পা এগোতেই একজনের মুখোমুখি হয়ে বরফখন্ডে পরিণত হলাম। আমার বরাবর বিপরীতে দন্ডায়মান জেসমিন।
প্রাক্তন শ্বাশুড়ি বেশ সুচারু নয়নেই আপাদমস্তক দেখলেন আমায়। তার চেহারার ফ্যাকাশে ভাবটা মেকআপে ঢাকার চেষ্টা করা হলেও কাছ থেকে ভালই বোঝা যাচ্ছে তিনি আসলেই অসুস্থ খানিক। আমায় দেখে ছোট্ট হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। বাইরের যে কেউ দেখলে ভাববে ওটা স্নেহের হাসি। অথচ একমাত্র আমি উপলব্ধি করতে সক্ষম, এর অর্থ কি। দুহাত মুঠো পাকিয়ে শক্ত করে ফেললাম নিজের দুপাশে।
“বাড়ি বয়ে আনন্দঘন মুহূর্তে সামিল হতে এসেছ, এত সহজে তোমায় ছেড়ে দেয়া যায় নাকি মেয়ে?”
জেসমিনের কন্ঠস্বর অশুভ শোনালো খানিক। ভ্রু কুঁচকে তাকালাম আমি তার নয়নমাঝে। হাসিখানি বিস্তৃত হলো তার। আশেপাশে চেয়ে বললেন,

“স্টেজ ফাঁকাই আছে। তোমার জাতের কাজই তো মনোরঞ্জন করা। সবাই যখন এত আবদার করছে, আজ নাহয়, মুজরা দেখিয়েই সকলকে মুগ্ধ করে দাও?”
পিনপতন নীরবতা ভর করল সমস্ত প্রাঙ্গণজুড়ে। প্রত্যেক জোড়া দৃষ্টি এই মুহূর্তে চেয়ে আছে আমার এবং জেসমিনের দিকে। এর মাঝে অধিকাংশই জানেনা কি হচ্ছে। যারা জানে, তারা নিজেদের স্থানে শক্ত পাথরের মতন দাঁড়িয়ে। সতর্ক, উত্তেজিত এবং অস্থির।
আমার সমস্ত শরীর অজানা কারণে কাঁপছে। নিজেকে ঠিক কোন পর্যায়ে গিয়ে শান্ত রেখেছি তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। আমি কয়েক মাস আগের সাবিন হলেও বিনা দ্বিধায় এই মুহূর্তে জেসমিনের উপর চড়াও হতে ভুল করতাম না। অথচ ওই ক্রোধে উন্মত্ত সত্তার উপর মোহর ফেলে দিয়েছে যে মানুষটা, সে খানিকটা দূরেই দাঁড়িয়ে। প্রসারিত দৃষ্টি মেলে তাকে খুঁজলাম আমি। নির্বাক চেয়ে জায়দান, বোধ হয় নিজের মায়ের কথা নিজেও হজম করে উঠতে পারেনি এখনো।
তার কাছ থেকে আমি আর কিছু আশা করিনা অবশ্য।
আমি চাইলে এখন হেঁটে চলে যেতে পারি। সেটাই চাইছেন জেসমিন প্রাণপণে। দেমাগের পরাজয় হবে তাহলে আমার। এই কথার উত্তর না দেয়ার অর্থ নিজের অপমান মুখ বুঁজে মেনে নেয়া। অতর্কিতে আমার ঠোঁটে হাসি ছুঁয়ে গেল। মাথা কাত করে বলে বসলাম,

“আপনার কি ধারণা? আমি আপনার ছেলের শুভ বাগদান অনুষ্ঠানে প্রাণখুলে আনন্দভরে নাচতে পারবনা?”
জেসমিনকে খানিক দ্বিধাগ্রস্ত দেখাল। একপাশ থেকে রুশমি কিছু বলতে চাইলেও হাত তুলে বান্ধবী এবং ভবিষ্যত বেয়াইনকে থামিয়ে দিলেন তিনি। সরাসরি আমার পানে চেয়ে বলে উঠলেন,
“বললামই তো। বুকের পাটা থাকলে দেখাও তোমার মুজরা!”
নিগূঢ়, ধারালো এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় হলো আমাদের মাঝে। অস্বস্তিদায়ক নীরবতা ভেঙে একেবারে হঠাৎ করেই ধ্বনিত হলো অপ্রত্যাশিত একটি কন্ঠস্বর,
“নাচলে সাবিন একা নাচবে কেন? আমিও নাচবো ওর সাথে। আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের বাগদান বলে কথা!”
হতচকিত হয়ে ঘুরে তাকালো সকলে। এমনকি আমিও। কয়েক পা হেঁটে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো মিসির। ঠোঁটে মোলায়েম হাসি, যেন এখানে অস্বাভাবিক নয় বরং অত্যন্ত স্বাভাবিক কোনো ঘটনাই হচ্ছে। এক নজর জেসমিনের দিকে তাকাল মিসির। অতঃপর হাত বাড়িয়ে আমার একটি হাত ধরল, এগোলো সামনের দিকে, বলল,
“চিন্তা করো না আন্টি। তোমার ছেলের বাগদানের অনুষ্ঠান একেবারে জমে ক্ষীর হয়ে যাবে।”

সবাইকে চেয়ারে বসতে দেয়া হয়েছে। জেসমিন নিজের চেয়ারে বসে অস্ফুট স্বরে ঘ্যানঘ্যান করে যাচ্ছেন।
“ওই মেয়ে এইখানে কেন? কত্ত বড় নির্লজ্জ্ব হলে এমন করতে পারে? এখন সবকিছু নষ্ট করার ধান্দা বুঝি ওর?”
“জেসমিন, তুমি এত ছটফট করোনা। কিছুই হবেনা। সব ঠিকঠাক থাকবে।”
জাফর পাশ থেকে ঠান্ডা স্বরে স্ত্রীকে শান্তনা দিতে চাইলেন। আয়দান বুকে দুবাহু বেঁধে পা ঝোলাতে ঝোলাতে নিজের বড় ভাইকে দেখল। চেয়ারে হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে শিরদাঁড়া টানটান করে বসে আছে। ভ্রু জোড়ায় হালকা কুঞ্চন। যেন কি ভেবে চলেছে একমনে। আয়দান একবার ভাবলো, ডেকে কিছু বলবে নাকি। অথচ পারলনা। এর আগেই চড়া মিউজিকে সমস্ত প্রাঙ্গণ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
—সজনী, সজনী তোমারে দেখিয়া
মাতাল হইয়া রাতের ঘুম গেলো উড়িয়া
খানিকটা দূরেই লনের ফাঁকা জায়গায় ড্যান্স পারফরমেন্সের মতন করে দাঁড়িয়েছে সকলে। যদিও কোনো কো অর্ডিনেশন নেই, তবুও আপাতদৃষ্টিতে দেখতে খারাপ লাগছেনা। বিশেষ করে সবার মাঝখানে থাকা মিসিরকে অন্যরকম সুন্দর দেখাচ্ছে। গানের তালে তালে মাথায় যা আসছে তাই নেচে চলেছে, অথচ ভীষণ রকমের মানানসই লাগছে তা। আয়দান ঝুঁকে এলো। মগ্ন হয়ে গেলো পরিবেশনায়।

—সখা গো, প্রেমে মোর দিওনা ধরা
ধরা দিলে তোমার মন ভাইঙা হবে গুঁড়া গুঁড়া
পরিবেশনায় প্রবেশ ঘটল সাবিনের। সেও বিশেষ কোনো স্টেপস অনুসরণ করছেনা। যেমন মানানসই মনে হচ্ছে তেমনটাই করছে। মিসিরের সঙ্গে একদম খাপে খাপ মিলে গিয়েছে তার মুখ এবং অঙ্গভঙ্গি। যেন দুজন আগে থেকেই প্র্যাকটিস করে এসেছে। অথচ তেমন কিছুই ঘটেনি। আশেপাশে অনেকেই তালে তালে গেয়ে উৎসাহ দিচ্ছে এবং ভিডিও করছে। অনুষ্ঠান ধারণে আসা ক্যামেরাম্যান সবচেয়ে ভালো অ্যাঙ্গেল থেকে সবটা ফ্রেমবন্দী করছে।
—তুমি কোন শহরের মাইয়া গো, লাগে উড়াধুরা।
মিউজিক চড়াও হলো। মিসিরের দুবাহু জড়িয়ে গেল সাবিনের কোমরজুড়ে। সন্নিকটে টেনে নিলো নিজের। সুরের তালে তালে একজোড়া ঢেউয়ের ভঙ্গিতে দুলতে লাগল দুজনের শরীর। সাবিনের চেহারায় চওড়া হাসি। অপরদিকে মিসিরের চোখজুড়ে উৎফুল্ল ঝিলিক। উভয়ের মিশেল উল্কাপাতের ন্যায় যেন কাঁপিয়ে দিল চারপাশ। চিৎকার করে উৎসাহ দিলো একদল। অপর কোনো দল হাততালি দিয়ে উঠল। সবকিছু ছাপিয়ে আড়চোখে নিজের বড় ভাইকে পর্যবেক্ষণ করল আয়দান।

নিজের চেয়ারে ওই একই ভঙ্গিতে বসে আছে জায়দান। পার্থক্য শুধু, পা দুটো অস্বাভাবিক কম্পনে দুলিয়ে যাচ্ছে। একটি হাতের তর্জনী আঙুল ঠোঁটে ঠেকানো। চশমার লেন্সের আড়ালে বাদামী নয়নজোড়া নিবদ্ধ সামনের দৃশ্যপটে। ঠিক যেখানে সাবিন এবং মিসির নেচে চলেছে আপন মর্জিতে। শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করল জায়দান। তার গ্রীবাদেশের অ্যাডামস অ্যাপল খানিকটা উঁচু হয়েই আবার নেমে গেল। অস্থির দেখালো তাকে খানিক। তারপরই একদম হঠাৎ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল জায়দান। আয়দান স্পষ্টত লক্ষ্য করল তার ঘাড় এবং কপালের এক পাশে জমা কয়েক বিন্দু ঘাম। এই শীতের মাঝেও এভাবে অস্থির হয়ে পড়েছে কেন সে?
বুঝতে পারলনা আয়দান। শুধু কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে দেখল লাউড মিউজিকের মাঝে জায়দান সরে গেলো। অদূরে একপাশে বসে থাকা আরওয়াকে ঝুঁকে কিছু বলল সে। পরক্ষণেই আরওয়া উঠে দাঁড়িয়ে খানিকটা উদ্বিগ্ন হয়েই অনুসরণ করল জায়দানকে। দুজনই বাড়ির ভেতরে আড়াল হয়ে গেল।
নিজের চেয়ারে বসে বসে আয়দান ভাবলো, ব্যাপারটা এইমাত্র কি হয়ে গেল?

বাড়ির ভেতরে এই মুহূর্তে কেউই নেই। সকলেই বাইরের প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানে মেতেছে। গমগমে আওয়াজ ভেসে আসছে বাইরে থেকে। একান্তে নিড়ালায় এসে থামলো যুগল। আরওয়া নিজের শাড়ীর আঁচল টেনে ঠিকঠাক করে সামনে দন্ডায়মান সুউচ্চ ভবিষ্যত বাগদত্তের দিকে তাকাল।
“কি হয়েছে, জায়দান? আপনি কি অসুস্থবোধ করছেন? হঠাৎ এভাবে নিয়ে এলেন? কিছু বলবেন?”
জায়দান নিজের ফরমাল প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে আরওয়াকে দেখল। চশমার আড়ালে বাদামী সমুদ্রমাঝে শীতল বরফের প্রলেপ পড়ল যেন। তার কন্ঠ শোনালো বরফের চাইতেও হিমশীতল।
“সাবিন এখানে কি করছে?”
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল আরওয়া। চোখ পিটপিট করে বলল,
“মা…মানে?”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৭

এক পা অগ্রসর হলো জায়দান। ঝুঁকে এসে আরওয়ার চোখে চোখ রাখল। ওই বাদামী নয়নজোড়া যেন শরীর ভেদ করে পৌঁছে যাচ্ছে অভ্যন্তরে।
“আপনার চেহারা যতটা নিষ্পাপ, আপনার মস্তিষ্ক ঠিক ততটাই ধুরন্ধর। আমি আপনার কাছে এতটা সস্তা পরিকল্পনা আশা করিনি, মিস আরওয়া এহসান!”
প্রসারিত নয়নে জায়দানের দিকে নিষ্পলক চেয়ে রইল আরওয়া।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৮ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here